#প্রিয়_অর্ধাঙ্গীনি
#সুমাইয়া_সুলতানা_সুমী
#পর্ব_৪১
,
“ভালোবেসেছি বলেই যে তাকে পেতে হবে এটা কোথায় লেখা আছে? বরং আমি তাকে ভালোবাসতে পেরেছি এটাই আমার কাছে অনেক। সব ভালোবাসাই যে পূর্ণতা পেতে হবে এমনটা তো নয়। কিছু কিছু ভালোবাসা দূর থেকেও সুন্দর। আর আমি সেই ভালোবাসাটা নিয়েই ভালো থাকতে চাই।
আমি তাকে তার অনুমতি বিহীন ভালোবেসেছি। তাই তার অজানায় আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবো। তাকে পাওয়ার জন্য তো আর তাকে ভালোবাসিনি। সে আমার ভাগ্যে নেই। ও শুধু আমার হৃদয়ে থাকবে আর অন্যকারো ভাগ্যে। এই জন্য আমিও আর তাকে পাওয়ার আশা করি নাহ। এখন আর এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই জোসেফ।
রোদ্রের কথা শুনে জোসেফ এর ভীষণ রাগ হলো। এতো চেষ্টা করেও কিছু হচ্ছে নাহ। এই ছেলেটা তো আমার কোনো কথায় বুঝতে পারছে নাহ। দেবদাস এর মতো বড় বড় কথা বলতে পারে শুধু। ফুপি তুমি আমায় এ কেমন কাজ দিলে। না না হারলে চলবে নাহ। যে করেই হোক কাজটা আমায় করতেই হবে। মনে মনে কথাগুলো বলে পুনরায় রোদ্রের উদ্দেশ্য বলল জোসেফ।
” কি সব বুড়ো লোকদের মতো কথা বলে যাচ্ছিস। এসব কথাশুধু শুনতেই ভালো লাগে। আর আমি তো একবারও বলছি নাহ যে তুই ওকে বিয়ে কর। তোর ভাইয়ের সংসার ভাঙ্গ। আরে আমিতো শুধু এটাই বলছি যে তোর উচিত তাকে সবটা জানানো। তারও তো অধিকার আছে কথাটা জানার। তুই একবার জানিয়ে তো দেখ।
“তারপর?
” মানে?
“মানে আমি ওকে জানালাম তারপর কি? এখন ওকে এসব কথা ঘটা করে জানানো কি আছে আমি এটাই বুঝতে পারছি নাহ জোসেফ। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। ভাইয়া আর শশী ভালো আছে। আমি কেনো এখন ওদের মাঝে কাঁটা হয়ে যাবো। তুই বুঝতে পারছিস নাহ তাই এমন বলছিস। ঠান্ডা মাথায় ভাব তাহলেই বুঝতেই পারবি।
কথাগুলো বলে রোদ্র জোসেফ এর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চলে গেলো। জোসেফ রোদ্রের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিকর ভাবে বলল।
” একে তো বোকা ভেবে ছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি ততোটাও বোকা নয়। হুম অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে দেখছি। কিন্তু যে করেই হোক সমুদ্রের বিরুদ্ধে রোদ্রকে উষ্কে দিতেই হবে। কিন্তু কীভাবে? এই রোদ্র তো আমার আর কোনো কথায়ই কান দিচ্ছে নাহ। হুম ফুপিকে সবটা জানাতে হবে।
,,,,,,,,,,,,,,
“তুমি আমায় সত্যি করে বলোত হয়েছে টা কি? সেদিন ফোনে আমায় শশীকে এখানে নিয়ে আসতে বললে কেনো? আমার কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে। সত্যি সত্যি বলে কি হয়েছে? আর আমি কিন্তু তোমাকে আগেও বলেছি আমার মেয়ের কিছু হলে তোমাকে আমি ছাড়বো নাহ৷ তোমার জন্য ওর চোখে একটু পানি আসলে আমি কিন্তু ওকে আমার কাছে নিয়ে আসবো।
“এই লোকটা কথায় কথায় এভাবে আমার বউকে নিয়ে টানাটানি কেনো করে বুঝলাম নাহ। যেদিন নিজের বউ চলে যাবে সেদিন বুঝবে বউয়ের থেকে দূরে থাকার কী জ্বালা।
মনে মনে কথাগুলো বলে সমুদ্র ওর শশুরের দিকে তাকালো। কালকে রাতেই ওরা হিজলতলী এসেছে। সাথে জয় আর জোনাকিও এসেছে। সকাল হতেই জামশেদ মাস্টার সমুদ্র কে ডেকে তার ঘরে নিয়ে গিয়ে কথাগুলো বলছিলো। সমুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল।
” আপনার কি মনে হয় আমি খারাপ লোক? বউকে দিনরাত মারধর করাই আমার কাজ? আরে ভাই
সমুদ্র কথাটা বলতেই ওর শশুর ওর দিকে তাকাতেই থেমে গেলো। গলা ঝেঁড়ে একটু কেঁশে বলল।
“না মানে আমি বলতে চাইছি যে ওহ আমার অর্ধাঙ্গীনি। ওর অর্ধেক আর আমার অর্ধেক জুড়েই আমরা এক। ওর উপর কোনো বিপদ আসার আগে আমার সাথে তাকে লড়াই করতে হবে।
সমুদ্রের কথাশুনো মনে মনে বেশ খুশি হলো জামশেদ। তবে মুখে সেটা প্রকাশ করলো নাহ৷ খানিকক্ষণ পর যখনি ওনি সমুদ্র কে কিছু বলতে যাবেন তখনি বাইরে থেকে পারভিন এর গলার আওয়াজ শোনা গেলো। তিনি আতংকিত গলায় বলছে।
“তোমরা তারাতাড়ি সবাই এসো। আমার শশী অঙ্গান হয়ে গেছে।
পারভিন এর চিৎকার শুনে সমুদ্ররা দুজনেই উঠে দাঁড়িয়ে গেলো। জামশেদ সমুদ্রের হাত ধরে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল।
” কি করেছো তুমি আমার মেয়ের সত্যি করে বলো?
শশুরের কথায় সমুদ্রের এবার বেজায় রাগ হলো। তবুও কোনোমতে নিজেকে ঠিক রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“আপনিও যেখানে আমিও সেখানেই। আমার নিশ্চয়ই কোনো অলৌকিক শক্তি নাই যেটার মাধ্যমে আমি এখানে বসে কিছু করবো। এবার দয়া করে আপনার সন্দেহ টা রেখে আমার সাথে চলুন। না জানি আমার বউটার আবার কি হলো।
,,,,,,,,,,,,
চশমাটা নাকের মধ্যভাগে রেখে খুবি মনোযোগ দিয়ে শশীকে পরিক্ষা করছে বিধান ডাক্তার। তার মুখটা এই মুহুর্তে খুবি সিরিয়াস। শশীর পাশেই চিন্তিত মুখে বসে আছে পারভিন। খাটের পাশে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখেই চিন্তার ছাপ। সমুদ্র ওর শশুরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে শশুর শাশুড়ীসহ বাড়ির গুরুজনেরা আছে বিধায় বউ এর কাছে যেতে পারছে নাহ। বেশ কিছুক্ষণ শশীকে দেখার পরে ডাক্তার নিজের জিনিসপত্র ব্যাগে রাখতে রাখতে বলল।
” ভাবছি তোমার সাথে এখন আমার আদেও কথা বলা উচিত হবে কিনা মাস্টার।
বাবার বয়সী ডাক্তারের মুখ থেকে এমন কথাশুনে জামশেদ মাস্টার খুবি চিন্তিত হলো। সমুদ্রের দিকে একবার গরম চোখে তাকিয়ে পুনরায় ডাক্তারের দিকে তাকালো। অতঃপর নরম কন্ঠে জবাব দিলো।
“জি কাকা আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম নাহ। কি হয়েছে আমার মেয়ের? ও এভাবে অঙ্গান হয়ে গেলো কেনো? সিরিয়াস কিছু হলে বলুন আমি এখনি সদরে নেওয়ার ব্যাবস্হা করছি।
” হয়েছেই তো অনেক বেশি সিরিয়াস কিছু হয়েছে। তুমি নানা হতে চলেছো আর আমি কিনা সুধোমুখে এই খবরটা দিচ্ছি। এখন বলো এরপরেও কী তোমার সাথে কথা বলা ঠিক?
ডাক্তারের কথা বুঝতে সবারই বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলো। যখনি সবাই বুঝতে পারলো সাথে সাথে সব হইহই করে উঠলো। পারভিন নিচু হয়ে শশীর কপালে চুমু দিয়ে আদর করে দিলো। জামশেদ মাস্টার খুশিতে হাসতে হাসতে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল।
“আমি আপনাকে বাজারের সেরা মিষ্টি খাওয়াবো কাকা।
কথাটা শুনে আবারও সবাই হেসে উঠলো। জামশেদ হাসতে হাসতে পাশে তাকিয়ে দেখে সমুদ্র ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। সমুদ্রের এভাবে তাকানো দেখে ওনি ঘাবড়ে গিয়ে বলল।
” কি হলো এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো? তুমি বাবা হচ্ছো এটা শুনে খুশি হওনি?
“হবো নাহ কেনো। তবে একটা কথা বলার আছে আপনাকে।
” কিহ?
“তখন নাহ বললেন আমি আপনার মেয়েকে কি করেছি। এভাবে অঙ্গান হয়ে গেলো কেনো? এবার তাহলে বলি আপনার মেয়েকে কি করেছি। কিসের জন্য এভাবে অঙ্গান হয়ে গেলো।
সমুদ্রের এমন ধারা কথাশুনে জামশেদ মাস্টার এর কান গরম হয়ে গেলো। বড় বড় চোখে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো।তিনি ভাবতেও পারেননি ছেলেটার এতো মুখ পাতলা। দেখে অন্তত সেটা মনে হয় নাহ। তিনি কাশতে কাশতে সবাইকে বলল মিষ্টি আনতে যাচ্ছে এটা বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। পারভিন একবার সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে এবার সবাইকে নিয়ে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। সবাই যেতেই সমুদ্র খাঁটের পাশে এসে দাঁড়ালো। শশী টুকুর টুকুর চোখে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখে সমুদ্র শশীর দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে। শশী কিছু বলার আগেই সমুদ্র বলল।
” এটা কী হলো? আমি তোমাকে নিষেধ করেছিলাম নাহ? বার বার করে বললাম তুমি আর একটু বড় হও তারপর না হয় এসব ব্যাপারে ভেবে দেখবো। কিন্তু তুমি আমার কথা শুনলে না কেনো?
সমুদ্রের কথা শুনে শশী ঠোঁট উল্টে বলল।
“আসলে এক্সিডেন্টলি হয়ে গেছে। আমার কি দোষ আমি বড় হতে হতে তো আপনি বুড়ো হয়ে যাবেন। তখন বেবি নিলে দেখা যাবে বেবি আপনাকে বাবা না ডেকে দাদু ডাকছে। তাই আপনার কথা ভেবেই তো এটা করলাম। আর আপনি এখন আমায় বকা দিচ্ছেন।
শশীর এমন কথাশুনে সমুদ্রের বেশ হাসি পেলো। তবে হাসলো নাহ। শশীর কাছে বসে নিচু হয়ে ওর কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো। অতঃপর শশীর বুকের উপর মাথা রেখে বলল।
” আমার ছোট্ট ভালোবাসাটা আরেকটা ছোট্ট প্রাণকে আনার জন্য তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসা। আমি অনেক খুশি হয়েছি। অনেক ভালোবাসি তোমায়। তুমি নিজেই এখনো ছোটো সেই জন্যই তো আমি এটার কথা ভাবতে গিয়েও ভাবিনি।
সমুদ্রের কথাশুনে শশী ভীষণ খুশি হলো। লোকটা বিয়ের এতোদিন পরে আজকে মুখ ফুঁটে ভালোবাসি বলল। সত্যিই ছেলেরা বাবা হওয়ার কথা শুনলে এতোটা খুশি হয়? শশী সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল।
“তাহলে আমায় কোলে নেন।
সমুদ্র মাথায় উঠিয়ে শশীর দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। শশী এবার লজ্জা পেয়ে দুইহাতে নিজের মুখ ঢেকে বলল।
” হুট আমি আর কিছু বলবোই নাহ। আপনি শুধু আমায় লজ্জা দেন।
#চলবে?

