#ফুলকৌড়ি
(৩৯)বর্ধিত অংশ
#লেখনীতে_শারমীন_ইসলাম
সেদিন রাতে মান্যতা তাকে দীবার বিষয়ে বলেছিলো।সেদিন যেমন কথাগুলো শুনতেই মনটা অদ্ভুত অনুভূতিতে খচখচ করেছিলো।আজও কথাগুলো বলতে গিয়ে কেমন তিক্ত অনুভব হলো। তবুও বললো কৌড়ি।কেনো জানি পাশের মানুষটার রিয়াকশন কেমন হয় জানতে মন চাইলো।মনের সেই তিক্ত অনুভব দময়ি রেখে আরও একটা প্রশ্ন করলো।
‘আর আপুর ভালোবাসা ঋনটা চোকাবেন কি-করে?তিনি কিন্তু আপনাকে….
‘কারও ভালোবাসার ভালোলাগার দ্বায় আমার হতে পারে-না।সে ভালোবাসে বলে আমাকেও তাকে বাসতে বাধ্য হতে হবে এটা বাধ্যতামূলক নয়।হতে পারেনা।
কৌড়ি হাসলো।মজার ছলে বললো–আমার দ্বায় আছে বলছেন?আমি বাধ্য?আমার জন্য বাধ্যতামূলক?
নিভান জানতো শান্তশিষ্ট বুদ্ধিমতী মেয়েটা তার কথার প্রেক্ষিতে এই কথাগুলো বলবে।ধপ করে চোখ খুললো।চোখ খুলে সহসা কৌড়ির দিকে এগিয়ে এসে উত্তেজিত গলায় বললো — হ্যা বাধ্য তুমি।অবশ্যই দ্বায় আছে তোমার।শুধু নিভান বলতে বাধ্যমূলক তুমি।তোমাকে যে দীবার কথা বলেছে,সে এটা বলেনি।দীবাতে আমি কখনোই ইন্টারেস্ট ছিলাম না আর না ছিলাম ওরজন্য পাগল।মা বলেছিলেন,সম্পর্কটা না হওয়ার ছিলো,দ্যাটস এ্যানাফ।তারপর ওর অন্যত্র বিয়ে,ভালো মন্দ কোনো কিছুতেই আমার কখনো যায় আসেনি।যায় আসেওনা।কিন্তু তোমার সবকিছুতে আমি ইন্টারেস্ট,তোমার ভালো মন্দ সবকিছুতে যায় আসে আমার।তুমি বুঝদার বুদ্ধিমতি মেয়ে হিসাবে নিশ্চয় এটা বুঝতে পরেছো?আর এটাও নিশ্চয় বুঝতে পেরেছো,
আমার জীবনের একান্ত নারী হিসাবে আমি শুধু তোমাকে পেতে চাই।তোমাকেই ছুঁতে চাই,তোমাকেই ভালোবাসতে চাই।আমার শুধু তোমাকে চাই কৌড়ি।শুধু তোমাকে।ওসব অযথা কথা টেনে তোমার জায়গায় অন্য নারীকে বসিয়ে তুলনা করে কথাবলাটাকে মোটেই আমি পছন্দ করছি-না।বুঝতে পারছো?দ্বিতীয়ত তুমি আর সে আমার জীবনে ভিন্ন দুজন নারী।যার একজন আমার জীবনের সব।অন্যজন সম্পর্কিত ব্যতিত কিছুই না।সো তোমার জায়গায় অন্য কাওকে নিয়ে আর কখনো উল্টো পাল্টা প্রশ্ন তুলবে-না।
জানা কথাগুলো আবারও সেই মানুষটার মুখ থেকে শুনে স্তম্ভিত হলো কৌড়ি।নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল সামনের হঠাৎই ক্ষেপে উঠা মুখটার দিকে।প্রকৃতির হিমশীতল বরফঠান্ডা হাওয়াটা যেনো অন্তরকোণে ছড়িয়ে পড়লো।ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হলো এলোমেলো সচ্ছ হাসিতে।নজর সরিয়ে অন্যত্র নিলো সেই হাসি আড়াল করার জন্য।নিভান সরে গিয়ে ফের মাথা এলিয়ে দিলো নির্দিষ্ট জায়গায়।ঘাড় কাত করে প্রসঙ্গ এড়াতে কৌড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো।
‘তোমার নেক্সট এক্সাম কবে?
কৌড়িও ততো সময়ে স্বাভাবিক করে নিলো নিজেকে।বললো — পৌরশু দিন।
‘সেদিন আমি যাচ্ছি।ওই গাধাটার সাথে তোমাকে আর পাঠাচ্ছি না।
‘এখানে ইভান ভাইয়ার কোনো দোষ নেই কিন্তু। অযথা আপনি তার উপর রাগ করে কথা বলছেন।আমি যেতে চেয়েছিলাম।দাদিআপাও জোর করলেন।তাই তিনি আর না করতে পারেননি।এখানে উনার দোষ কোথায়?
‘সবার প্রতি তোমার এতো মায়া।আমার বেলায় শূন্য হয়ে পড়ে কেনো সব?
উত্তর দিলো-না কৌড়ি।লজ্জায় ফের মুখ ঘুরিয়ে নিলো অন্য পাশে।নিভানও সেটা বুঝে আর কথা বাড়ালোনা।কৌড়ির জন্য বানানো কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেছে,কথা বলতে বলতে সেটা আর কৌড়ির খাওয়া হয়নি।নিজেরটাও অর্ধেক পড়ে আছে মগে।সময় চললো দু’জনে দুপাশে চুপচাপ বসে রইলো।
‘রুমে যাবেনা?ঠান্ডা লাগছে তো!
‘ঘুম আসছেনা!তাই যেতেও ইচ্ছে করছেনা।
সম্পর্কেটা হালাল হলে সময়টা হয়তো অন্যরকম ভাবে কাটতো।একই চাদরের নিচে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে রাতটা এখানেই পার করে দেওয়া যেতো অনায়াসে।মন উল্টো পাল্টা চাইতেই নিজেকে ভিতরে ভিতরে ধাতস্থ করলো নিভান।ফের বললো।
‘পরিক্ষা চলছে,ঠান্ডা লাগলে অসুবিধা।এই ঠান্ডায় আর থাকতে হবেনা।চলো।
উঠে দাড়ালো নিভান।কফি মগ দুটো হাতে নিয়ে কৌড়ির উঠার অপেক্ষা করলো।কৌড়ি উঠতেই চোখ দিয়ে তাকে সামনে এগোতে ইশারা করে সে পিছে হাটলো।ছাদের সিড়ি বেয়ে দোতলা থেকে নিচতলার সিঁড়িতে পা রাখতেই নিভান তাকে ডাকলো।
‘চাদরটা নেবে না?
কথাটা বললেও নিভানের গায়ে তখনও চাদরটা আষ্টেপৃষ্টে জড়ানো।দেওয়ায় মতিগতি যে নেই,শুধু কথা বাড়ানো বেশ বুঝলো কৌড়ি।সেটা খেয়াল করে বললো–‘আমার জিনিস আমার কাছে আর থাকছেই বা কোথায়?
কথাগুলো বলেই মুখ ঘুরিয়ে সিঁড়িতে দ্রুত পা চালালো কৌড়ি।নজরের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত সেদিকে তাকিয়ে রইলো নিভান।নজরের আড়াল হতেই মৃদুস্বরে আওড়ালো–এখনো আস্ত তোমাকেই তো পাওয়াা হয় নি।সেখানে আমার আবার প্রিয় জিনিস বলতে ভাগ্যদোষ আছে।হয়তো তারা আমার থেকে হারিয়ে যায় নয়তো কোনো বাধার দেয়াল এসে তাদেরকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।যানিনা তোমার আমার মাঝে আবার কোন বাঁধা এসে উপস্থিত হয়।তবে তুমি বলতে নিভান বিন্দুমাত্র কম্প্রোমাইজ করবে না।কৌড়ি বলতেই যে নিভানের চাই।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রুমে ঢুকলো নিভান।অথচ একজোড়া অশ্রুভেজা নয়ন তারপানে নিষ্পলক চেয়ে রইলো।সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল করলো-না সে। আর কিসের অপেক্ষায় আছে দীবা!কিসের?সে যে আশায় ছিলো,তা কি কখনো পূর্ণ হওয়ার ছিলো?ছিলোনা তো!তবুও তো মন আশা বেধে ছিলো।কোনো একসময় নিভান তাকে বুঝে তারকাছে ফিরবে।যদিও আশাটা নিতান্তই অবান্তর।নিভানের ব্যাক্তিত্বের কাছে এই আশা মূল্যহীন। তবুও মন-তো।সুক্ষ এক আশা মনের কোণে বেধেই ছিলো।কিন্তু কৌড়ি নিভানের জীবনে আসার পর একটু একটু করে সে আশা চুরমার হতে শুরু করলো।তা ভাঙা চূর্ণবিচূর্ণ টুকটো গুলো নিঃশেষ হতে হতে আজ বুঝি একেবারেই শূন্য হয়ে গেলো।নিজের হাতে নিজের সৌভাগ্য পায়ে ঠেলে নাশ করা যাকে বলে।যা এখন প্রতি পদেপদে সে ভোগ করছে।এই আফসোস বুঝি তাকে সারাজীবন বয়ে নিয়ে,আওড়ে যেতে হবে।অথচ সিয়াম তার পিছনে পাগলের মতো লেগে আছে।
ইভানের বিয়েতে আত্মীয়তা রক্ষা করতে তাদেরকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিলো।দীবা বাজেভাবে বারণ করায় আর আসেনি।অথচ দামী উপহার পাঠাতে ভুল করেনি।ভুল করেনি দীবার একাউন্টে তার নিজ খরচ পাঠাতেও।এটা নিয়েও ঝামেলা হয়েছে।সিয়াম
বারবার নিজের ভুল অন্যায় স্বীকার করছে।তবুও মন গলছেনা দীবার।মন পড়ে আছে নিভানকে পাওয়ার নিষিদ্ধ এক চাওয়ায়।যা অন্যায়!পাপ!
চলবে…

