#মন_শহরে_বসন্ত_হাওয়া |৪|
#কে_এ_শিমলা ®
কেবিন থেকে বের হতেই দেখা মিললো একজন সুন্দর মনের মানুষের সহিত। তাকে দেখেই একঝলক হাসলো নয়না। মৃদু হাসলো রণয়ীও। নয়না বললো, ‘কী ব্যাপার রণয়ী। আজ সারাদিনে দেখি খুব কাজ চলছে। অবশ্য তুমি তো প্রতিদিনই কাজে মজে থাকো।”
‘তুমি বুঝি করো না?”
‘করি তবে তোমার মতো এতোটা নয়। এটা তো সত্যিই।”
‘কাজ করতে আমার ভালো লাগে। তাই করেই যাই একটানা।”
‘হুম। কিন্তু আমার ভাই এতো কাজ করতে ভালো লাগে না। কিন্তু করতে হয় দেখো। বাই দ্য ওয়ে যাচ্ছ কোথায়?”
‘ক্যান্টিনে যাবো। এক কাপ কফির সাথে সোজা বারান্দার পশ্চিম দিকে।”
‘ওয়াও! দ্যাটস গ্রেট। চলো আমিও যাবো। তোমার মতো মানুষের পাশে থাকলে, দু’দিন টানা কাজ করে যদি দশ মিনিট কেউ বসে। তাহলে সব বিরক্তি ক্লান্তি শেষ হয়ে যাবে নিমিষেই।”
‘তাই!”
‘হ্যা। কেন তোমার বিশ্বাস হয় না? অন্যকারো কেমন লাগে জানিনা তবে আমি আমারটা বললাম। আমার তো তোমাকে খুব ভালো লাগে। পারলে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তোমার সাথে আরামে বসে কথা বলে যেতাম সময়ের খেয়াল না রেখে। মানুষ হিসেবে তুমি খুব চমৎকার।”
‘থামো থামো। আর বলিও না। তবে জেনে রাখো। আমার দেখা বলো আর মেলামেশা মানুষদের মধ্যে বলো। তুমি অন্যরকম। এবং খুব সুন্দর মনের মানুষ। খুব সরল সহজ।”
‘আচ্ছাহ! কী ভালো। কী চমৎকার। চলো যাই এখন।”
‘চলো।”
দুজনে একসাথে গেল ক্যান্টিনের দিকে। পথিমধ্যে রণয়ী বারান্দার ওপাশে চলে গেল। নয়না আর জোর করলো না তাকে। সে একাই চলে গেল। রণয়ী রেলিং এর নিকটে এসে থামলো। মৃদু হাওয়া ছুঁয়ে দিয়ে গেল পুরো শরীর। সূর্যের আলো ম্লান হয়ে আসছে ক্রমে ক্রমে। ডুবু ডুবু সূর্যের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং তারের উপর অনেক গুলো পাখি বসে আছে। ওপাশে দূরে কয়েকটি পাখি উড়ে গেল। মনে হলো ঠিক ডুবন্ত অর্ধ সূর্যের পার্শ্ব ঘেঁষে গেল তারা। কী চমৎকার সুন্দর দৃশ্য সেটি। রণয়ীর জায়গায় এখন একজন প্রকৃতি প্রেমী হলে নির্ঘাত একটি কবিতার কয়েকখানা লাইন লিখে ফেলতেন ছন্দাকারে। অবশ্য রণয়ী নিজেও একজন প্রকৃতি প্রেমী। প্রকৃতি অসম্ভব ভালো লাগে তাঁর।”
নিঝুম নিরালায় মৃদু হাওয়া গায়ে মেখে কিছুটা সময় বসে একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলে যেন সব ক্লান্তি বিরহ দূরীকরণ হয়ে যায় এক নিমিষে। বুক ভরে একটি নিঃশ্বাস গ্রহণ করলে আলাদা রকমের একটি প্রশান্তি কাজ করে বক্ষে।”
রণয়ী নিজের গ্রামের বাড়ি গেলে। খোলা মাঠে বসে সবুজের সমারোহে ঘেরা প্রকৃতিতে সে মজে থাকে দীর্ঘ সময় নিয়ে। নতুন নতুন সবুজ কচি ঘাসের উপর মাথা রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে যখন বিশাল ত্রুটিবিহীন নীল আকাশখানা কেউ দেখবে, সে তো প্রকৃতির প্রেমে পড়বে এমনিই। পড়বে স্রষ্টার সৃষ্টির মায়াতেও। শুকরিয়া আদায় করতে পিছুপা হবে না। বরং বাধ্য হবে সে। তবে রণয়ীর আর এই যান্ত্রিক শহরে আগমনের পর হতে এভাবে প্রকৃতিতে ডুব দেওয়া হয় না। উপর উপর যা উপভোগ করা যায় তাই। ছুটির দিনে সে বসে থাকে নিজ কক্ষের এক কোণে। নিজের জীবনের সমীকরণ মিলাতে মিলাতে আজ মস্তিষ্ক বড্ড ক্লান্ত। কিন্তু একাকীত্ব যখন জেঁকে বসে তখন সেই হিসাবটাই ক্লান্ত অবিশ্রান্ত মস্তিষ্ক করে যায় বারংবার। কোনো হিসাব গননার যন্ত্র কিংবা খাতাকলম ছাড়াই।”
‘এই নাও তোমার কাপ।”
নয়নার কথায় বাহিরের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আনে রণয়ী। পাশ ফিরে নয়নার হাত থেকে কফির কাপ নিতে নিতে বললো, ‘থ্যাংক ইয়ু সো মাচ।”
‘ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।
যাই বলো কফির স্বাদটা কিন্তু সেই। এখানকার চা বলো আর কফি। আমার দুইটার টেস্টই ভালো লাগার। দুইটা একসাথে খেতে মন চায়।”
নয়নার এহেন কথায় হাসলো খানিক রণয়ী। এই মেয়েটা পাশে দাঁড়ালে কথা না বলে থাকতেই পারে না। একটা মিনিট যদি চুপ করে দাঁড়ায় তো। খুব বেশি কথা বলতে জানে। সে বলে রণয়ীর পাশে দাঁড়ালে বিরক্তি ভাব উধাও হয়ে যাবে। অথচ তাঁর পাশে দাঁড়ালে সব মন খারাপি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে এক নিমিষেই। এবং সেটা দেখে নিয়েছে রণয়ী। আমাদের আশেপাশে এমন কিছু মানুষ আছে। ঠিক নয়নার মতোন। তাদের আশা পাশে থাকলেই অন্যরকমের ভালো লাগা কাজ করে। তারা তাদের সুন্দর কথার সৌন্দর্যে যেভাবে মানুষকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম। তেমনি তাদের কথায় মন খারাপিও দূর হয়ে যায়।”
প্রচন্ড মন খারাপে যখন একাকী ভালো লাগে না। রণয়ী অন্যকাউকে না বেছে তাকেই কল করে। অতপর সে শত ব্যস্ততার মধ্যেও রণয়ীর সঙ্গ দেয়। ফোনের ওপাশ থেকে তাদের স্বামী স্ত্রীর হঠাৎ এক দু টুকরো কথা ভেসে আসে। রণয়ী না চাইতেও শুনে নেয়। এখন অবশ্য এসব আর শোনা যায় না। নয়না যেমন ভালো তাঁর জীবনসঙ্গীও তেমন খুব ভালো। এবং খুব চমৎকার। যে যেমন তাঁর সাথে তেমনই মিলে। তবে অনেক জায়গায় গিয়ে ব্যতিক্রম হয়তো ঘটে। নতুবা সংসার করার পরেও কেন বিচ্ছেদ আসবে জীবনে। একজনের সাথে সংসার পাতার পর কেন রণয়ীর মতো মানুষ আসবে? তাঁর জীবনে। এর আগে আসলে কী হবে? হয়তো আসলেই ব্যতীক্রম তাই।”
‘এই জানো তো আগামী সোমবার কিন্তু তোমাদের সবার আমার বাসায় আসতেই হবে। কী আসবে তো? অফিস তো বন্ধই। কোনো চিন্তা নেই! সমস্যা নেই।”
রণয়ী মুখের কফি গলাধঃকরণ করে বললো, ‘অবশ্যই যাবো। তোমার কথা ফেলি কী করে।”
‘এজন্যই তোমায় এতো ভালো লাগে আমার। মানুষের মনের এতো যত্ন নাও তুমি। কারো মনে যেন আঘাত না লাগে সেদিকে কত খেয়াল। অথচ___ বাকিটুকু বলার পূর্বে থেমে গেল নয়না।”
রণয়ী বললো, ‘বলে ফেলো। সমস্যা নেই। সত্য লুকানোর নয়। আমি তাঁর মনে যেন আঘাত না লাগে তার দিকে কত সচেতনতা অবলম্বন করেছি। তাঁর মনের খেয়াল রেখেছি। কখনো মন খারাপি ঘেঁষতে দেইনি। তাঁর ভাঙ্গা হৃদয়ের একটু একটু করে ভালোবাসার প্রলেপ একে সারিয়ে তুলেছি। বিনিময়ে সে আমার মনটাই ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে চলে গিয়েছে। মানুষের জীবনমরণ যেমন ধ্রুব সত্য। আমার এটাও সত্যই। বলতেই পারো।”
‘তোমার কষ্ট হবে।”
‘মনে পড়বে ভেবে বলছো তো কষ্ট পাবো?
আমার মনে তো সবসময়ই সে থাকে। কথা শুনে আর কী মনে পড়বে বলো? কোনো সমস্যা নেই।”
‘তোমার মতো মানুষের সাথে এমনটা না হলেও পারতো।”
‘আমিও দোষেগুনে মানুষ নয়না। দুঃখ তো থাকবেই এই জীবনে। যা হবার তা তো হয়ে গিয়েছে। এতো ভেবে আর কী হবে?”
‘তুমি নিজেই ভেবে নিজের ভালো থাকাটাকে দূরে সরিয়ে রাখো।”
রণয়ী অদূরে দৃষ্টি রেখে ফিচেল হেসে বললো, ‘বিষাদ যন্ত্রণা নিয়ে কে ভাবতে চায় বলো? অথচ ভাবনাতে চলেই আসে। আমি যে মনে করে ভাবী এমনটা নয়। বরং মন জুড়েই থাকে।”
‘তোমার জীবনে ঠিক তোমার মতো একজন সুন্দর মনের মানুষ আসকু। অতীতের সব ভুলিয়ে তোমায় হাসাক। তুমি সুখী হও।”
ক্রমশ শক্ত হলো রণয়ীর মুখ। উদাস দৃষ্টি জ্বলজ্বল করে উঠলো। ভরাট গলায় বললো, ‘নাহ! আমার এ জীবনে আর কেউ না আসুক। সে তাঁর প্রাপ্যটুকু পাবে না। বঞ্চিত হবে সে। মনে একজন কে রেখে অন্য একজনের সাথে ঘর করা যায় ঠিক কিন্তু আমি অক্ষম নয়না। এতো কিছুর ভার সইতে পারবো না গো। আমি বড্ড ক্লান্ত।”
‘তুমি হাসবে একদিন এই কথাটি মনে করে। তবে তোমার অধর কোণে সুখের হাসি থাকবে। তোমার কষ্টের ভার নিতে একজন কেউ আসবে। তুমি তাকে নিজ জীবনে জায়গা দিতে সক্ষম হবে। সে ক্লান্ত তুমিটার শান্তি নিয়ে আসবে। তোমার সইতে না পারা ভারের বোঝা কমিয়ে দিতে আসবে। আসবেই দেখে নিও। একদিন তুমি নিজে দ্বিতীয় ভালোবাসার মূল্য দেবে। কদর করবে। আরো যত্নশীল হবে তুমি আপন মানুষটার প্রতি। তোমার মাঝে আর হারিয়ে ফেলার ভয় থাকবে না। কেননা সেই সংশয় বলো আর ভয় সে তোমার মধ্যে তৈরি হতেই দেবে না। ভাঙ্গা হৃদয় হয়তো আগের মতো জোড়া দেওয়া যায়না ঠিক। কিন্তু সে ফাটল ধরা ভগ্ন শুন্য স্থানে হাজার রঙের ভালোবাসার ফুল ফুটাবে। মিলিয়ে নিও তুমি।”
রণয়ী খানিকটা ভাবুক হলো। আসলেই কী তাই? দ্বিতীয়বার কাউকে ভালোবাসা যায়? একজন তালাকপ্রাপ্তা নারীর জীবনেও ভালোবাসা নিয়ে কেউ আসবে। না না! এটা নিছুকী কল্পনা মাত্র। রণয়ীর ঘোর আপত্তি নয়নার কথায়। সে কথা দীর্ঘ করলো না। যা কখনো হওয়ার নয়। তা নিয়ে কথা বলে শুধু শুধু ভেবে কী লাভ?”
কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকলো দু’জন বারান্দার শেষপ্রান্তে। আবছায়া ক্ষীণ আলো ম্লান হয়ে যাচ্ছে কীভাবে ধীরে ধীরে? তা দেখলো। আজান হয়েছে। অফিসের যাদের নামাজ পড়ার। তারা সবাই নির্দিষ্ট নামাজ কক্ষ গুলোতে গিয়ে নামাজ আদায় করে নিল। নয়না এবং রণয়ী নেই নামাজে। নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই নামাজের কক্ষ আছে দুটো।”
সোডিয়ামের আলো জ্বলে উঠলো খানিকটা দূরে দূরে। তমিস্রভাব খানিকটা ম্লান হলো সে আলোর ফলে। আশপাশ আলোকিত হলো। রাস্তা দিয়ে চলাচল করা গাড়ি গুলোর রং দেখা যাচ্ছে। নয়নার উদ্দেশ্যে চৈতি এসে বলে গেল, ‘তাঁর ফোনে কল এসেছে। হয়তো শ্বাশুড়ি মা। তাই ভেবে নয়না দ্রুত কেবিনের দিকে ছুটলো রণয়ীর থেকে বিদায় নিয়ে।”
রণয়ী এপাশ ফিরে তাঁর দ্রুত পদে হেঁটে যাওয়াটুকু দেখলো। বাসায় তাঁর তিন বছরের ছেলে আছে। কী সুন্দর বাচ্চা রেখেও নিশ্চিন্তে কাজ শেষ করে যেতে পারে নয়না। পরিবার থেকে কতটা সাপোর্ট সে পায়। তাঁর স্বামী নিজেও তাকে এই সুযোগ দিয়েছে। কেবল চার দেয়ালের মধ্যে থেকে সংসার জীবনেই নারীরা সীমাবদ্ধ নয়। এটা সে মেনে নিয়ে নিজ স্ত্রীর ইচ্ছায় তাকে রাত আটটা কিংবা সাতটা অব্দি বাহিরে কাজ করতে দিচ্ছে। নয়নার শ্বাশুড়ি! সেই বৃদ্ধা নারীও ভীষণ চমৎকার একজন মানুষ। সারাদিন মায়ের অনুপস্থিতিতে নাতিকে সামলে রাখেন। আগলে রাখেন। সময়ের সাথে সাথে খাওয়ানো। আবার কল করে পুত্রবধূ খেয়েছে নাকি শুধু কাজই করে যাচ্ছে সে ব্যাপারেও খোঁজ করেন। কয়েকদিন পর পর তাঁর ননদ নিজেও অফিসে এসে খাবার দিয়ে যায়। তাঁর বাসা অফিসের পাশে হওয়াতে কোনো সমস্যা হয় না। একটা মেয়ের ভাগ্য কতটা ভালো হলে এরকম মায়ের মতোন শ্বাশুড়ি পায়। এরকম স্বামী পায়। এরকম বোনের মতোন একজন ননদ পায়। এরকম একটি পরিবার পায়। নিঃসন্দেহে নয়না একজন সৌভাগ্যবতী নারী। আর তাঁর এই সুখ থাকুক অনন্তকাল। সৌভাগ্যবতীর কাতারেই থাকুক সে আজীবন। যে মেয়ে জানেনা সংসার জীবনের জটিলতা। তাঁর জীবনে জটিলতা না আসুক। যাকে কখনো বিচ্ছেদের বিষাদ ব্যথা ছুঁতে পারেনি। তাকে সে বিচ্ছেদ আর কখনো স্পর্শ না করুক।”
রণয়ী এবার ভাবলো নিজেকে নিয়ে। সে নিজে ও তো একজন ভালো শিক্ষার্থী ছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। কত পরিশ্রম ছিল তাঁর এর পেছনে। এডমিশনের সময় গুলো কতটা কষ্টে পারি দিয়েছিল। একটি চাকরি করবে। পরিবারের পাশে দাঁড়াবে। নিজের চাকরির প্রথম বেতনে পরিবারের সবাইকে উপহার দিবে। মাকে সুন্দর একটি শাড়ি। বাবাকে সুন্দর পাঞ্জাবি। ভাইদের কেও সুন্দর পাঞ্জাবি দিবে। ভাবী কে তাঁর পছন্দে যা বলবে তাই। পথের ধারের ছেলেমেয়ে গুলোকে একবেলা পেট পুরে খাওয়াবে। অথচ রণয়ীর সব ইচ্ছা স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয় এই ভালোবাসার কবলে পড়ে। অনার্সে থাকাকালীন সময়েই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলো। না তাঁর পরিবার থেকে তাকে কোনো জোর কিংবা চাপ প্রদান করা হয়নি। নিজ ইচ্ছায় সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। যখন ভালোবাসার মানুষটি বললো বিবাহের কথা। রণয়ী পিছু হটেনি। পাছে না সে হারিয়ে যায়। অতঃপর বিয়ের পরেও সে পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছিল। অনার্স মাস্টার্স কমপ্লিট করেছিল ঠিক। কিন্তু চাকরী আর করা হয়নি। এমনি করেনি কিন্তু করেছিল। তবে এসব ইচ্ছে আর পূরণ হয়নি।”
ফোন কানে ধরে এদিকেই আসছিল দুর্জয়। শেষপ্রান্তে দাঁড়ানো রমণী কে দেখে চেয়েও আর আগায় না সে। কয়েক হাত দূরেই তাকে থেমে যেতে হয়। সেখানে দাঁড়িয়েই কথার ইতি টানে। অবসরে কিংবা মাথায় ধরলে খানিকটা সময় এখানে এসে দাঁড়ায় দুর্জয়। তাঁর কেবিন থেকে এখানে আসার একটি দরজাও রয়েছে। বারান্দার সাথে লাগোয়া তাঁর কেবিন। আজ হঠাৎ এমন সময়ে তাকে দেখলো। অবশ্য এর আগেও বেশ কয়েকদিন দেখেছে। ভেতর থেকে সে সবাই কে দেখলেও তাকে আর কারো দেখা হয়না।”
গলা খাঁকারি দিয়ে দুর্জয় বললো, ‘আজকাল কাজ রেখে দেখি মানুষ প্রকৃতিতে মন দিয়েছে বেশ। ছুটির দিনে প্রকৃতি দেখলেও হয়। আজকাল অফিসে কাজের চাপ প্রচুর। কাজে মন দিলে একটু উপকৃত হয় অফিসখানা।”
কথাগুলো বলে আর এক মুহুর্ত ব্যয় না করে প্রবেশ করলো বড় দরজা দিয়ে। জানে কোনো প্রতিউত্তর এই নারীর থেকে পাওয়া যাবে না তবুও বললো দুর্জয়। বলতে ইচ্ছে হলো তাই বলে দিল। সে জানে রণয়ী কতটা পরিশ্রমী এবং কতটা কাজ করে। তাঁর সাথে উক্ত কথাটা যায় না। কিন্তু বললো আর কী।”
রণয়ী খুব বেশি অবাক হলো। সে দুর্জয়ের কথার মধ্যে তৎক্ষণাৎ তাঁর দিকে ফিরে তাকায়। এখানে সে আর দুর্জয় ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। সুতরাং তাকেই দুর্জয় কথাগুলো বলেছে। রণয়ী ওপাশে ফিরলো। কেমন যেন করে উঠলো ভেতর। বিষাক্ত সব! এতো কাজ করেও কাজ না করার তকমা সহ্য করা যায় কী? পাশের কফির কাপটা স্বজোরে চেপে ধরলো হাতের পাঁচটা আঙ্গুল দ্বারা। চোখ মুখ শক্ত। দাঁতে দাঁত চেপে থাকায় কপালের পাশের রগ গুলি ফুলে ফুলে উঠছে ক্রমেই। কাপ দুটো হাতে নিয়ে হেঁটে আসলো কক্ষে। হাতের কাপ দুটো রাখলো অন্য কাপ গুলোর সাথে। একসাথে এখানে কাপ জমা হওয়ার পর নিয়ে যাওয়া হয়। এটা এক সুবিধা নিচে যেতে হয় না আর কাপ দিয়ে আসার জন্য। অফিসে যারা ধোয়া মুছা করে তারাই একসাথে এসে একটি নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ে যায়। সারাদিনে কাজের মধ্যে এতো বেশি আর সময় কেউ পায় না। খেতে হলে লাঞ্চ টাইমে। আর এই সন্ধ্যায় খাওয়া হয় সবার।”
রণয়ী নিজের কেবিনে এসে বসলো চেয়ারে ধপ করে। বাহিরে কারো সাথে কথা বললো না। প্রচন্ড ক্রোধ নিয়ে ক্ষিপ্ত মেজাজে ফাইল খুললো। আজ রাত দশটা হলেও এই ফাইলটি সে কমপ্লিট করবে। আর তাঁর জন্য অবশ্যই মিস্টার দুর্জয় শাহরিয়ার ইমাম কে থাকতেই হবে অফিসে। এর আগে যাওয়া যাবে না।”
চলবে!

