#মন_শহরে_বসন্ত_হাওয়া |৬|
#কে_এ_শিমলা ®
বাসার কাছে রিকশা পৌঁছাতেই দ্রুত বাড়া চুকিয়ে গেইটের ভেতর প্রবেশ করলো রণয়ী। ব্যস্থ হাতে এলোমেলো ভাবে গেইট বন্ধ করে দ্রুত পদে নিজেদের বাসার দিকে গেল। বারান্দার পা রাখতেই ভেতর থেকে কথার আওয়াজ পেল দুই কলিজার। মনে হলো এবার তাঁর শুকিয়ে যাওয়া কলিজায় পানি এসেছে। ক্লান্ত পায়ে দাঁড়িয়ে কলিং বেল চাপলে ওপাশে থেকে দরজা খুলে দিল রাইজু। এই সন্ধ্যায় ফুপি কে দেখে সে খুশিতে দুহাতে জাপটে ধরলো তাকে। কন্ঠে একরাশ মায়া মিশিয়ে বললো, ‘আমার ফুপি! আমার ফুপিমনি।”
রাজন এগিয়ে এলো তাদের ফুপি ভাইঝির নিকটে। বোন কে সরিয়ে যখন সে ধরতে যাবে তখনই কিচেন থেকে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো রিদিমা। ছেলে মেয়ের উদ্দেশ্যে বললো, ‘এই! আগে তাকে ভেতরে ঢুকতে দাও। কতবার বলেছি। এভাবে আসলে আগে তাকে ভেতরে আসতে দিবে। পানি দিবে। তারপর জড়িয়ে ধরবে। ফুপিমনি ক্লান্ত হয়ে আসে না কাজ করে?”
রণয়ী কোমল চোখে দেখে ভাবী নামের এই বোন কে। সে চাইলেই পারতো রণয়ীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রণয়ী কে মানসিক কিংবা শারীরিক ভাবেই কষ্ট দিতে। কিন্তু সে তা করেনি। বরং সে একজন বড় বোনের মতো রণয়ীর ভেঙ্গে পড়া খারাপ সময়ে মায়ের সাথে সাথে আগলে নিয়েছে। অথচ রিদিমা নিজেই প্রত্যক্ষদর্শী রণয়ীর করা কর্মকাণ্ডের। রণয়ীর বিয়ের আড়াই তিন বছর আগেই রনক রিদিমার বিয়ে হয়েছিল। রণয়ীর বাবা থাকাকালীন ঘরে পূত্র বধূ নিয়ে এলেন। রিদিমা চাইলেই পারতো রণয়ী কে কথার আঘাতে জর্জরিত করতে। বড় তো বাপ ভাইয়ের অবাধ্য হয়ে প্রেমিকের হাত ধরে ছিলো। নির্লজ্জের মতো বিয়ে বিয়ে করে বিয়ে করেছিল। অতঃপর এখন! কিন্তু না এমন কিছুই বলেনি রিদিমা। অতীতের গত হওয়া কোনো কথাই সে তুলে না। এই মানুষ গুলো আছে বলেই হয়তো রণয়ী এখনো ধরার বুকে আছে। নয়তো কবেই নিজেই নিজের জীবনের অবসান ঘটাতো কে জানে।”
মায়ের কথায় ছেড়ে দিল রাইজু রণয়ী কে। রাজন দূরে সরে গেল। রণয়ী সোফায় গিয়ে বসলো ধপ করে। রাজন এক গ্লাস পানি এনে দিল রণয়ী কে। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে কোলে বসালো রাজন কে। এক ঢোক পানি পান করে রিদিমার উদ্দেশ্যে বললো, ‘তোমাদের ফোন কোথায় ভাবী? না মায়ের ফোনে কল আসছে আর না তো তোমার?”
‘আর বলো না তো। তোমার ভাইঝি ভাইপো ফোনের চার্জ শেষ করেছে। তারপর বন্ধ করে সেই ফোন চার্জে লাগিয়েছে। তোমার কল এসেছিল সন্ধ্যায়। আমি তো তখন দুই রাকাত নফল নামাজে ছিলাম। তাই রিসিভ করতে পারিনি। এরপরে কল ব্যাক করতে পারিনি। ফোনের ব্যালেন্স শেষ। কিন্তু আম্মার ফোন বন্ধ হবে কেন? ওটা তো ঠিকই আছে। এই দশ পনেরো মিনিট আগেই তো ওরা কার্টন দেখলো।”
‘না ফোন বন্ধ। কল করলাম এতোটা আসেনি। ওখানে ভাইয়া তোমাদের কারোর ফোনে কল করতে না পেরে আমার কাছে কল করেছেন। বুঝতে পারছো আমাদের কী অবস্থা হয়েছিল? ছুটি নিয়ে এসেছি।”
‘বলো কী! দাঁড়াও তো দেখি মায়ের ফোন।”
‘আম্মু কোথায়?”
‘কোরআন তেলাওয়াতে ছিলেন তো। দাঁড়াও দেখি কী করছেন?”
রিদিমা শ্বাশুড়ির ঘরে প্রবেশ করে দেখলো তিনি জায়নামাজে সিজদারত। ওহ এর জন্যই তবে মেয়ে আসার পরেও ঘর থেকে বের হননি। রিদিমা বিছানার উপর থেকে মোবাইল ফোন নিল। সাইট বাটনে ক্লিক করে আলো জ্বলতেই চোখ গেল উপরে। সেখানে দৃষ্টি পড়তেই রিদিমার চোখজোড়া ছানাবড়া হয়ে গেল। এরোপ্লেন মোড করে রাখা। সিম বন্ধ! তাহলে কল আসবে কী করে? ফোন নিয়ে বের হলো রিদিমা। সোফার নিকট যেতে যেতে রণয়ীর উদ্দেশ্যে বললো, ‘কল আসবে কী করে? তোমার ভাইঝি ভাইপো দেখো কী করে রেখেছে ফোনের? সিম বন্ধ।”
রণয়ী মৃদু কন্ঠে বললো, ‘ওহ! তোমরা এভাবে ফোন বন্ধ করো না বাবারা। তোমাদের আব্বু কল করে পায়নি। ফুপিমনিও পাইনি। চিন্তা হয়। বুঝো না! তোমরা না আমার বুঝদার ছেলেমেয়ে।”
দুই ভাইবোন একে অপরের মুখের পানে চাওয়াচাওয়ি করলো। ঠোঁট উল্টে তাকায় ফুপিমনির দিকে। অতঃপর বললো, ‘আর এমন করবো না ফুপিমনি।”
মৃদু হাসলো রণয়ী তাদের কথায়। রিদিমা কে বললো, ‘ভাইয়া কাল আসবে। তুমি কথা বলে নিও।”
রিদিমা মাথা নাড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে গেল, ‘শুধু চা খাবে নাকি নাস্তা দেবো?”
‘এখন খাবো না ভাবী। খেলে নিজেই বানিয়ে নেবো।”
রণয়ী নিজের ঘরের দিকে অগ্রসর হলে বেরিয়ে এলেন রাবিয়া খানম। এই সময়ে মেয়েকে বাসায় দেখে খুশি হলেন তিনি। রণয়ী মৃদু হাসলো মায়ের দিকে তাকিয়ে। মা নামক মানুষটা এতো সুন্দর আর এতো মমতাময়ী।”
রণয়ী মায়ের সাথে অল্প কিছু কথা বলে ফ্রেশ হতে চলে গেল। রাইজু রাজন বসলো সোফায় দাদির পাশে। রিদিমা রনকের সাথে কথা বলতে বলতে এলো বসার ঘরে। ভিডিও কল দিয়েছে সে। রিদিমা রাবিয়া খানমের কাছে ফোন দিল। ছেলের সহিত দীর্ঘ তিনদিন পর কথা বললেন রাবিয়া খানম। তাদের কথাবার্তার মধ্যেই চুলে তোয়ালে পেঁচিয়ে বের হয়ে এলো রণয়ী। সুন্দর একটি হাসি খুশি পরিবার। যদি সংসারটা এখনো তাঁর থাকতো। তবে সেও আজ মা নামক মধুর সুন্দর ডাকটা শুনতে পারতো। এই সন্তানের জননী না হওয়াতেও অবশ্য শ্বাশুড়ি মায়ের চোখে বেশ খারাপ ছিল রণয়ী। যাকে বলে একপ্রকার চক্ষুশূল। অথচ রক্তিম বলেছিল পড়াশোনা শেষ করো। চাকরী করতে চাইছো চাকরী করো। তারপর বেবীর কথা। আর এখন পড়ালেখা শেষ হতে হতে সংসারটাই শেষ হয়ে গেল। না হলো তাঁর ঘরে থাকা কালীন সময়ে মা! আর না হলো চাকরী। এই তিন বছরে নিশ্চয় রক্তিম বাবা ডাক শুনেছে। তাঁর মা দাদি হয়েছেন। তাদের বংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। হাহ!”
আফসোস করে কী হবে? কিছুই পাওয়া যাবে না শুধু নিজেকে হীনমন্য করা ছাড়া। আর কষ্ট দেওয়া ছাড়া। রণয়ী ভাবলো না আর। এই সময়টুকু সে পরিবারের সাথে কাটাতে চাইলো অবসর মনে। সোফায় গিয়ে বসলো মায়ের কাছে। রাবিয়া খানম বড় ছেলের সহিত কথা বলছিলেন, এবার যোগ হলো সেখানে ছোট ছেলে রামিন তাঁর স্ত্রী তাদের আড়াই বছরের বাচ্চা সহ।”
রণয়ীর মাথার তোয়ালে খোলে চুল মুছে দিলেন রাবিয়া খানম। সোফার হাতলে মেলে দিলেন ভেজা তোয়ালে। ছোট থেকেই বড্ড আদরের মেয়ে উনার। দুই ছেলের পর এক মেয়ে। ঠিক যেন ফুলের মতো। আর সেই ফুলের মতোই মেয়েকে রেখেছেন। অবশ্য পরিবারের সবারই আদরের ছিল রণয়ী।”
সবাই দেখতে পারছে না ফোনে। তাই রণয়ী গিয়ে নিজের ল্যাপটপ নিয়ে এলো। এবার বড় করে সবাই কে দেখা যাচ্ছে। রিদিমার রান্না বান্না শেষ তাই সেও সবার সাথে বসেছে। এটা অবশ্য প্রায়দিনই হয়। রান্নাবান্না শেষ ছেলেমেয়ে কে পড়ালেখা দেখিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি শ্বাশুড়ির সাথে বসে গল্প গুজব করা। সে সময় পেয়েও মোবাইল ফোনে সময় কাটায় না। শ্বাশুড়ি মার বয়স বাড়ছে দিন দিন। তিনির সাথে বসে কথা বললে একাকী নিঃসঙ্গ বোধ করবেন না। তাছাড়া শ্বাশুড়ি মায়ের সাথে বসে কথা বলতৈ রিদিমার এমনিই ভালো লাগে।”
ছেলেমেয়ের ফুপিমনি বাসায় থাকলে তাদের পড়তে বসতে বিলম্ব হয়। কারণ সেদিন তাদের ঈদ আনন্দ। ফুপিমনির সাথে বসে কথা বলতে হবে তো। দু’জন এবার চাচাতো ভাই কে নিয়ে ব্যস্ত হলো। চাচা চাচীর কাছে তাদের অভিযোগ! কেন ভাইকে নিয়ে আসেন না? বাবাকেও অভিযোগ শুনালো কেন চাচার বাসায় আবার নিয়ে যান না? বাবু বড় হয়ে যাচ্ছে। তাকে নিয়ে খেলতে পারবে না আর তারা।”
রণয়ী উঠে গিয়ে চা করে আনলো। রাজন রাইজু্র হরলিক্স। তারা তাদের মগ দেখিয়ে দেখিয়ে বললো, রাফিন! তুমি আমাদের বাসায় আসলে তোমাকেও খাওয়াবো। আসো!”
রাফিন হাত নাড়াচ্ছে। রিমি এবার রাফিনের মগ দেখিয়ে বললো, ‘আমার ছেলের ও আছে পাকাবুড়ি! বুড়োআব্বা।”
খুনসুটিতে কেটে গেল বহুক্ষণ। অতঃপর সবার কথার সমাপ্তি টানা হলো। রণয়ী মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো সোফায়। রাইজু তাঁর পাশে বসে হাত নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। রাজন মায়ের পাশে অন্য সোফায় বসেছে। তাদের ও কথা আলাপ হলো অনেক। সময় কাটলো। রাজন রাইজু্ পড়তে বসলো। রণয়ী মায়ের কোলে শুয়েই থাকলো। রাবিয়া খানম এটা সেটা বলছেন। আর সে শুনছে। বেশি কথা বলতে পারে না সে এখন কারোর সাথেই। তবুও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে। মায়ের আশেপাশে থাকলে শান্তি পায় অশান্ত মনে। কিন্তু কেমন যেন হাঁসফাঁস লাগে। অপরাধী মনে হয় নিজেকে। প্রচন্ড আফসোস হয়। কেন এমনটা হলো তাঁর নিজের সাথে। অতঃপর হিসাবে গড়মিল! রণয়ীর মস্তিষ্ক ক্লান্ত। সে হার মানে বিশ্বাসের কাছে। নিজের নিটুর নিয়তির কাছে।”
রাত্রি ঘনিয়ে আসলো। রণয়ী নিজের ঘরে এলো। চিরুনি হাতে নিতেই ফোন বেজে উঠলো তাঁর। চার্জে দেওয়া ছিল। চার্জার খুলে ফোনে নাম্বার দেখে রণয়ী বেশ খানিকটা সময় নিয়ে রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে ঠান্ডা গলায় সালাম করলো দুর্জয় রণয়ীর পূর্বেই।”
রণয়ী সালামের জবাব দিল। দুর্জয় বললো, ‘বিরক্ত হলেন মিস রণয়ী রহিম?”
‘না না স্যার। বিরক্ত হইনি। আমি অবসরই বসে ছিলাম। আপনি বলুন।”
‘জনাব রবিন যে দুটো ফাইল আপনাকে দিয়েছিলেন। সেগুলো তো এখনো আপনার কাছেই আছে তাই না?”
‘জ্বী স্যার। আজকেই দিয়েছেন। হঠাৎ..!”
‘যদি ফাইল গুলো কমপ্লিট করে নিতেন। আমাদের মাস্ট লাগবেই লাগবে ফাইল গুলো। কাল তো অফিস বন্ধ থাকবে। পরের দিন দিতে হবে আপনাকে। আর আবু সাঈদ আপনাকে মেইল করে দিবেন বাকিসব। ওগুলোও দেখে নিবেন। তিনি ব্যস্থ বিধায় আমিই জানিয়ে দিলাম আপনাকে।”
‘ডোন্ট ওয়ারি স্যার। ফাইল একটি কমপ্লিট। দ্বিতীয়টিও করে নেবো আমি আমার সাথেই নিয়ে এসেছি।”
‘ওকেই! দ্যান রাখছি তবে।”
‘ওকেই স্যার।”
কল কাটার কথা বললেও কিছুটা সময় লাইনে থাকলো দুর্জয়। অতঃপর কেটে দিল। রণয়ী ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলো বেশ কিছুক্ষণ। অতঃপর মাথার চুল আঁচড়ে নিল। রিদিমার ডাক এলে পুনরায় গেল ঘরের বাহিরে। খাবার টেবিলে সবাই উপস্থিত। সেইই বাকি ছিল।”
নিয়মানুযায়ী রাত আরো গভীর হলো। ঘুমন্ত জনমানব! ঘুমন্ত পাখপাখালি! ঘুমন্ত নগরী! ঘুমন্ত ধরণী। সবকিছু ঘুমিয়ে গেলেও জাগ্রত কিছু মন ভাঙ্গা! হৃদয় ভাঙ্গা মানুষজন। তারা রাত জাগা পাখি। হয়তো নিকষ কালো কৃষ্ণ বর্ণীয় নিস্তব্ধতায় ঘেরা অম্বর নিচ দিয়ে উড়তে পারে না। ডানাবিহীন হওয়ায়। তবে নিজ কক্ষের অন্ধকারে তাঁরা ব্যস্থ স্মৃতিচারণে। স্মৃতির রাজ্যে তারা উড়ে বেড়াতে পারে খুব সহজেই। প্রত্যেকটা মানুষই ঘুরতে পারে উড়তে পারে খুব সহজে সে শহরে সে রাজ্যে। হয়তো সুখময় কিংবা বিষাদময় স্মৃতি ঘেরা থাকে। আবার অনেকেই হয়তো প্রিয় মানুষের আদর ভালোবাসায় মত্ত। যারা ভগ্ন হৃদয়ের। তাদের স্মৃতিচারণের ফলস্বরূপ নিঃশব্দে অশ্রু গড়াচ্ছে নেত্রযুগল বেয়ে। মনে করতে চাই না। মনে করবো না। বলেও কী হয়? মায়া মানুষ সহজে কাটাতে পারে না। মায়া এমন অস্ত্র! যার দ্বারা একজন মানুষ খু ন হয় বারংবার।”
কিছু সংখ্যক জাগ্রত পাখিদের মধ্যে রয়েছে রণয়ী ও। চোখ তাঁর বন্ধ। কিন্তু গালে লেপ্টে আছে নোনাজল। চোখের আশপাশ ভেজা। ভারী পল্লব লেপ্টানো। চোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে আবারো অশ্রুজল। বিছানায় উপুড় এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে সে। হাত একটি মাথার নিচে অপরটি ফোনের স্ক্রিনে। তাদের বিয়ের ছবিতে তাঁর দৃষ্টি। শত শত হয়ে হাজার ছবি সে মুছে ফেলেছে ফোন থেকে। কিন্তু মন থেকে মুছতে আদৌ সক্ষম হবে কী না? জানা নেই। বিয়ের এই ছবিটাই রয়ে গেছে শুধু। কেন যেন বুক কাঁপে রণয়ীর। কতবার ডিলিট করে আবার ট্রাশভিন থেকে ফিরিয়ে এনেছে। কী নির্মল চোখে দেখছে তাকে রক্তিম। কে বলবে রণয়ী এই মানুষের দ্বিতীয় ভালোবাসা! রণয়ীর একটাই দুঃখ।”
যা বিচ্ছেদের থেকেও বেশি আঘাত করে। সে পারেনি রক্তিমের মনে তাঁর প্রথম প্রেম প্রথম ভালোবাসাকে ছাপিয়ে দ্বিতীয় ভালোবাসা হয়ে জায়গা নিতে। রক্তিম হয়তো উপর উপর ভালোবেসেছিল ঠিক। কিন্তু তা অনন্তকালের জন্য নয়। না হলে প্রতারণাকারী যে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল। বলেছিল সে ছলনাময়ী। তাঁর কাছেই কেন ফিরবে আবার? তবুও ফিরতে হলে আগেই ফিরলো না কেন? তিন বছর! তিনটা বছর কী খুব কম সময় ছিল। এতো নিখুঁত অভিনয় করতে পারে রক্তিম। রণয়ীর ক্ষমতা থাকলে রক্তিম কে সে সেরা অভিনেতার উপাধিতে ভূষিত করতো। জীবন এলোমেলো করে দেওয়া পুরুষটি তাঁর ভালোবাসার। ভাবতেই বুকের ভেতর অসহনীয় এক ব্যথা হয়। সহ্য করা ভীষণ দায় তাও সহ্য করতে হয়।”
“মায়ায় কীভাবে জড়াতে হয়!
যত্ন করে শিখিয়ে গেলে!
অথচ মায়া কীভাবে কাটাতে হয়!
ভুল করেও শিখিয়ে গেলে না?”
“পেয়ে হারানো আমার প্রিয় পুরুষ।”
বিরবির করে কথা গুলো বললো রণয়ী অস্ফুট স্বরে। ফোন পাশে সরিয়ে রাখলো। টিমটিম আলোয় জ্বলতে থাকা নীলাভ আলোতে তাঁর দৃষ্টি। খোলা জানালা দিয়ে বাতাস প্রবেশ করছে। খানিকটা শীত শীত অনুভব হলেও নড়লো না রণয়ী। জানালায় গ্রিল থাকায় নিশ্চিন্তে খুলে দিয়েছে এই মধ্য রজনীতে ও।”
সকাল আটটায় ঘুম ভাঙ্গে রণয়ীর। খোলে রাখা জানালা গলিয়ে আলো আসছে। সকালের একফালি নরম রোদ্দুর এসে পড়লো তাঁর ফুলো চোখ ফুলো শুভ্র মুখশ্রীখানায়। বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলো রণয়ী। রাতে বালিশ ছাড়া শুয়েছিল এখনো সেই বালিশ ছাড়াই আছে। রণয়ী কে এই ঘুমন্ত অবস্থায় কেউ দেখলে বলতো এক বাচ্চা মেয়ে ঘুমিয়েছে এলোমেলো হয়ে। রণয়ী দৃষ্টি জানালা দিয়ে বাহিরে নিবদ্ধ করলো। কানে ভেসে এলো ভাইঝি ভাইপোর সালামের স্বর। তারা তাদের হুজুর কে সালাম করছে। তাঁর মানে বিদায়। অবশ্যই এখন দুই ভাইবোনের রণয়ীর ঘরে আগমন ঘটবে। তা হোক মায়ের আদেশে কিংবা নিজেদের ইচ্ছাতেই। ছেলে মেয়ে দুটো আছে বলেই বাসা ভালো লাগে রণয়ীর।”
~~~~~••••
বেলা গেল তেমনি। মধ্যাহ্নের শেষ দিকে বাসা থেকে বের হলো রণয়ী। উদ্দেশ্যে নয়নার বাসায় যাওয়া। সবাই ইতিমধ্যে বের হয়ে গিয়েছে। যারা নয়নার বাসার পাশেই তারা পৌঁছেও গিয়েছে। রণয়ীর জন্য অপেক্ষমান রোজা। তাঁর সাথেই যাবে রণয়ী।”
পথিমধ্যে পেয়ে গেল রোজা কে। দুজন দুজনের সহিত কথা বিনিময় করে পৌঁছাল এসে নয়নার বাসায়। সবার সাথে কুশলাদি বিনিময় হলো। গল্প গুজবে সময় পেরিয়ে গেল। নয়নার শ্বাশুড়ি ও তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। একটুও বাঁকা চোখে দেখেননি সেই বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা রণয়ী কে। তিনির সাথে কথা বলেও রণয়ীর খুব ভালো লাগলো। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে আবারো জিরিয়ে নিতে বসলো সবাই।
আর সেই বসাতেই রাত আটটা সাড়ে আটটা। ধীরে ধীরে সবাই বের হলো বাসা থেকে নিজ বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে।”
নয়নার শ্বাশুড়ি জমিলা খাতুন রণয়ীর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আবার আইসো মা! তোমরা আসলা! বাসাটা কত ভরা ভরা লাগলো। আর এতো ভেবো না মেয়ে। জীবনে এমন বাধাবিপত্তি থাকবোই তো। যা হারিয়েছে ভাবো তা তোমার ভাগ্যে নেই। যা আসলেই তোমার তা আবারও আসবো জীবনে। চিন্তা করে নিজেকে অশান্তিতে রেখো না। কেমন?”
কেমন মন জুড়িয়ে যাওয়ার মতোন কথা। রণয়ী মৃদু হেসে বললো, ‘আমার জন্য দোয়া করবেন খালামনি।”
‘সবসময় আছে মা। সাবধানে যেও। একদিন তোমাদের মা নিয়ে এসো।”
‘জ্বী ইনশাআল্লাহ আসছি তবে এখন! আসসালামু আলাইকুম।”
‘ওয়ালাইকুমুস সালাম!”
রণয়ী রোজা একসাথে বের হলো নয়নার বাসা থেকে। রাত তখন আটটা বেজে ছাপ্পান্ন মিনিট। নয়নার বাসা থেকে বের হয়ে বেশ খানিকটা রাস্তা হেঁটে আসলো সে এবং রোজা। মোড়ে এসে বিদায় নিল একে অপরের থেকে। গলায় গলা মিলিয়ে রোজা বললো, ‘যাও তবে! কাল দেখা হবে অফিসে।”
‘হুম তুমিও যাও। সাবধানে যেও। আল্লাহ হাফেজ।”
‘আল্লাহ হাফেজ!”
রোজা চলে গেলে রণয়ী একহাতে কাঁধে অবস্থানরত ব্যাগের ফিতা ধরে অপর হাত উঁচিয়ে সময় দেখে নিল পুনরায়। রিকশার জন্য দাঁড়ালো। বোধহয় দুই মিনিট পেরিয়ে গেল অথচ রিকশা নেই। তাই আরো কয়েক কদম এগিয়ে গেল। দাঁড়িয়ে রাস্তার তিন দিকেই তাকায়। একটুখানি দাঁড়াতে হবে। দাঁড়ালো রণয়ী পাশে চেপে। মৃদু হাওয়া গায়ে লাগছে। শব্দ তুলে গাড়ি এদিক থেকে সেদিক যাচ্ছে। ব্যস্থ পায়ে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। কেউ বা পাশের জনের সাথে কথা বলছে। কেউ ফোন কানে ধরে। কেউ বা আবার ফিরছে কলেজ অথবা স্কুল ব্যাগ কাঁধে রেখে। দেখা মিলছে কয়েকজন মেডিকেল স্টুডেন্টদের। মানুষের জীবনের গতিধারা কত বৈচিত্র্যময়। রণয়ী ফোন হাতে নিল। হয়তো কল আসতে পারে।”
হঠাৎ পরিচিত পুরুষালী কন্ঠস্বর ভেসে এলো কানে। রণয়ী ফট করে পাশে তাকায়।”
চলবে!

