#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো
(৪৭)
” ডিসিশন কি নিলে?”
” আই ওয়ান্ট টু বি হ্যাপি উইথ রোজী।”
” মনকে শান্ত করো। তোমার উদাসীনতা আমাদের কষ্ট দেয়। ”
তামিম মাথা নাড়ায়। ” জি পাপা।”
” সময় দাও। ঘুরো। দুজন দুজনকে চেনো। আমি রাজনৈতিক মানুষ। মানুষ চেনা আমার কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। তবুও পরখ করে দেখি। তানভীর যেমন আমাকে সময় দিয়েছে তেমন যদি তুমি আমাকে কিছুটা সময় দিতে তাহলে আজ এই দিন দেখতে হতো না। ”
” তানভীর তোমাকে সময় দেয়নি পাপা। সে নিজেই নিজেকে সময় দিয়েছে। আমি জানতাম তুমি আপত্তি করবে না। সেজন্যই খালামনিকে দিয়ে প্রস্তাব রেখেছি।”
” ক্রেডিট তাহলে তোমার খালামনিকে দেওয়া উচিৎ। বুদ্ধিমতী না হলে হুট করে রাজী কেউ হতো না। ”
” তাতো অবশ্যই পাপা। গাধাটা এভাবেই থাকতো। বিয়েও করতো না। লাবিবাকেও ছাড়তো না। ”
লাবিবা চলে যাবে । শ্বশুর ভাসুরের কাছে বিদায় নিতে এসে তাদের কথা শুনে চমকে যায়।
” কে আমাকে ছাড়তো না পাপা? ”
লাবিবার উপস্থিতিতে তামিম হাত বাড়ায়। ডাকে,
” আসো।”
” ভাইয়া? কে আমাকে ছাড়তো না?”
” আমাদের বাসায় একটা পাঁচ ফুট এগারো ফুটিয়া চিমটা আছে। সে তোমাকে ছাড়বে না। ”
তামিমের কথায় লাবিবা ফিক করে হেসে দেয়। হাসতে হাসতে সোফায় বসে। হাসি থামিয়ে বলে,
” আমাকে বোকা পেয়েছো ভাইয়া? এই বাড়িতে পাঁচ ফুট এগারো একমাত্র তোমার ভাই ই আছে। সে নাকি চিমটা! আমাকে ছাড়__কি?”
শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে হাসির ছলে বলতে গিয়ে কন্ঠ আটকে যায়। মুহুর্তেই একঝাঁক লজ্জাপাখি এসে ঘিরে ধরে। হুসে এসেই কাঁশতে থাকে। ফিরোজ খান ও খানিকটা কাশে। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
” সাবধানে যেও মা আমাকে রেষ্ট নিতে হবে। ”
তামিম লাবিবাকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করে,
” ফ্লোরার সাথে কথা হয়?”
” এখন হয়না। উনি নিষেধ করেছেন। ”
” আচ্ছা। ”
” রোজী আপু অনেক ভালো। ”
” আচ্ছা। ”
” আমাকে নিয়ে কি কথা বলছিলে?”
” তানভীর আর তোমাকে নিয়ে বলছিলাম। শুধু তোমাকে নিয়ে না। ”
” বলো। ”
তানভীরের ডাক আসে, ” লাবিবা। গাড়িতে এসো। ”
আর ওয়েট করা যাবে না। লাবিবা তামিমকে বলে,
” পরে শুনবো। বাই ভাইয়া। ”
” আচ্ছা। এসো। ”
তামিম দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। এটা প্রত্যেকের চোখেই পড়েছে। ছেলেটা হাসিখুশি থাকে সবসময়। কিন্তু স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে। তার ভেতর যে একটা কষ্ট রয়েছে বোঝার উপায় নেই। সেদিনের পর আর রোজীর সাথে কথা হয়নি। লাবিবা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ,
” ভাইয়া তুমি কতটা এবনর্মাল হয়ে যাচ্ছো একবার বোঝো। ”
” কোথায় এবনর্মাল?”
” যেভাবে সব সময় হাসিখুসি থাকছো এতে শুধু আমরা না প্রত্যেকেই বলবে পাগলের ডাক্তার পাগল।”
” সুস্থ মানুষ হাসে না? ”
” তোমার মতো হাসে না। একজন গম্ভীর মানুষ হুট করে হা হা করে উঠতে বসতে হাসলে থাকলে এটাতো পাগলের লক্ষন। ”
” কি চাও?”
” আগের মতো হয়ে যাও। এভাবে ফেইক হাসবে না। ”
” টপিক চেঞ্জ করো। ছোট মানুষ তুমি এতো বোঝবে না।”
লাবিবা অবাক হয়ে গেলো। সে নাকি ছোট মানুষ! আর কতো বড় হবে? তার বিয়ে হয়ে গেছে। থমথমে গলায় বললো, “মেডিসিন দাও ভাইয়া। ঠোঁটের নিচে জ্বর ফোটা হয়েছে। ”
তামিম একটা কাগজে লিখে লাবিবার হাতে ধরিয়ে দিলো।
” নিচে ফার্মিশিতে এটা দিলেই মেডিসিন দিয়ে দিবে। ”
” হাজার টাকার নোট নিয়ে বেরিয়েছি। আমি ভাঙাবো না। ”
” টাকা লাগবেনা। তুমি যাওয়ার সময় কাগজটা দিয়ে দিও ওরা তোমাকে মেডিসিন দিয়ে দিবে। এখানে সবাই তোমাকে চেনে। ”
লাবিবা হাঁসফাঁস করলো । সেতো এসব বলতে আসেনি। আসল কথাটাই তো বলতে সাহস পাচ্ছে না। যে মুড নিয়ে আছে! গাই গুই করে লাভ হবে না। তাই সরাসরিই বললো,
” ভাইয়া রোজী আপু তোমার সাথে ডেটে যাবে। ”
” কিহ?”
” হুম।”
” রোজী বলেছে?”
” হুম। ”
দাহা মিথ্যা। রোজীর হয়ে লাবিবাই বলছে। এতোবড় একটা ঘটনা তার হাত দিয়ে ঘটতে যাচ্ছে আর বলে নাকি ছোট! তামিম পুরো কনফিউজড হয়ে গেলো। রোজী মেয়েটাকে যা বুঝেছে নেশার ঘোরেও এই কথা বলবেনা। ” কবে ডেটে যেতে চেয়েছে?”
” তোমাকে ফিক্সড করতে বলেছে। ”
” ওকে আমি জানাবো।”
” আমাকে জানাবে। ”
” সরাসরি ওকেই জানাবো।”
” নাহ। আমাকে জানাবে। রোজী আপু ভীষন লাজুক। তোমার সাথে এই ব্যপারে কথা বলবেনা বলেই তো আমাকে দিয়ে বলালো। ”
” টেল মি ওয়ান থিংক লাব্বু! তোমার কবে থেকে এসব ঘটক গিরি করার প্রতি ঝোঁক হলো?”
” ঘটক! এভাবে বলোনা ভাইয়া। আমি স্ত্রীলিঙ্গ। ”
” আমি সরাসরি রোজীকেই জানাবো। ”
এবার লাবিবা মেকি রাগ দেখালো,
” লিসেন ভাইয়া!ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আম অলরেডি ম্যারিড। তোমার ভাইয়ের মতো যার বিয়ের ঘটকালি করতে যাবো তাকেই বিয়ে করে বসবো না। আমি যেহেতু প্রস্তাবটা রেখেছি সেহেতু আমিই ম্যানেজ করবো। ”
” উল্টোপাল্টা বলছো কেন? ”
” জানিনা ভাইয়া। আমাকেই জানিও। আসি এখন। পরে কথা বলবো। ”
” আরে __লাব্বু!”
ঘটনা কতদূর তামিমের বোঝতে দেড়ি নেই। লাবিবাকে পাঠিয়েছে রোজীকে আনতে। একটা রেস্টুরেন্টে টেবিল বুক করেছে। লাবিবা রোজীকে আনতে গিয়ে বিপত্তির জন্ম দেয়। রোজি বাড়ি থেকে বেরোতেই দু’জন তাঁদের ফলো করতে থাকে। লাবিবা না বুঝতে পারলেও রোজী ঠিক বোঝে। লাবিবার হাত চেপে ধরে প্রে করতে থাকে আল্লাহ বিপদ থেকে রক্ষা করো। সহি সালামতে পৌঁছতে দিও। খারাপ কিছু আর সে চায়না। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়না। মোড়ের মাথায় রিকশা পাওয়া যাবে। তার আগেই লোক দুটো ফাঁকা রাস্তা পেয়ে তাঁদের পথ আগলে ধরে। লোক দুটো রোজীর এক্স হাজবেন্ড আর ভাসুর। রোজী ভয়ে লাবিবার হাত আরো পাকড়াও করে ধরে। রোজীকে এভাবে ভয় পেতে দেখে লাবিবা কিছুটা আন্দাজ করে। চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
” কি চাই?”
” তোমার কোন প্রয়োজন নেই। সরে দাঁড়াও। ”
” কাকে অর্ডার করছেন? আপনি জানেন আমি কে?”
” সরে দাঁড়াও মেয়ে। রোজীকে সাথে কথা আছে।”
” রোজীর কারো সাথে কথা নেই। ”
” রক্ত গরম করো না। তোমাকে ভালো করেই চেনা আছে। ভাইয়ের প্রতিশোধ নিতে বাধ্য করো না।”
” আপনি মনে হয় আমাকে ঠিকভাবে চেনেন না। তাই চিনতে চাইছেন। সরুন। ”
কাঁধে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় লাবিবা। দু পা পিছিয়ে যায় লোকটা। আরেকজন আঙুল তুলে চিৎকার করে উঠে।
“এই মেয়ে। অতিরিক্ত সাহস দেখিও না। গায়ে হাত দিলে পরে সমাজে মুখ দেখাতে পারবেনা। এমপিও ছেলেও তাকিয়ে দেখবে না।”
” তাই নাকি? সাহস করে দেখুন। দিন গায়ে হাত। দেখি কত বড় কলিজা।”
” জহুর প্লিজ এটাকে সরা।”
রোজী এতোক্ষণ ভয়ে দুহাত বুকে চেপে ছিলো। লাবিবাকে হিট করার আগেই সে প্রতিবাদ করে উঠে,
” খবরদার হাত বাড়াবেনা। তোমার সাথে আমার কোন কথা নেই। আমার সামনে আসবেনা। তোমাকে আমার চাইনা।”
” পাখা বড্ড গজিয়েছে না? বিয়ে করবি? তোর বিয়ের সাধ আমি মিটিয়ে দিবো না? খুঁজে খুঁজে এমপির পোলারে ধরছিস। তোরা দুইটাই শালী গোল্ড ডিগার। ”
আর সহ্য করা গেলো না। কোমড় বরাবর লাথি দিয়ে ফেলে দেয় লাবিবা।
” খুব শক্তি না? মেয়ে মানুষ হয়ে পুলিশের সাথে লাগতে আসিস? দেখাচ্ছি শালী তোকে মজা। ভেবেছিলাম ছেড়ে দেবো তোকে। কিন্তু আর না। ”
” মেয়ে মানুষ বলে কি লাগাতে পারবোনা দুই চারটে ঘা? সবাইকে রোজী ভাবিস না। তোদের মতো লোককে কিভাবে ঘায়েল করতে হয় আমার ভালো করেই জানা আছে। ”
কথা বলতে বলতেই হাত মোজা দুটো ঝটপট পড়ে নেয় লাবিবা। লোক দুটোও ছাড় দেয় না। লাবিবা জানে কিভাবে নিজেকে প্রটেক্ট করতে হয়। এতো বছরের ক্যারাটে শিক্ষা নিজ কাজে লাগায়। রোজী লাবিবাকে দেখে অবাক হয়ে যায়। পুতুলের মতো ইনোসেন্ট মেয়েটার ভেতর যে এমন তেজ! ভুল করেও কেউ ধারণা করতে পারবেনা। প্রত্যেকটা মেয়ের উচিত নিজেকে কিভাবে প্রটেক্ট করতে হয় তা শিখে নেওয়া। পাঁচ জনের সাথে লড়তে না পারলেও তো অন্তত দু একজন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতে পারবে। সবার যদি এই শিক্ষা টা থাকতো তাহলে যেখানে সেখানে থেকে এতো এতো ধর্ষনের নিউজ পাওয়া যেতো না। মেয়েরা স্বাভাবিক জীবনে নির্ভয়ে ছুটতে পারতো। তাঁদেরকে কেউ প্রতিরোধ করতে পারতো না।
তামিমের সাথে রোজীকে দিয়ে লাবিবা অন্য টেবিলে বসলো। মনটা ভালো নেই। চোট লেগেছে একটু। এই ঘটনা না বলাই থাক। তামিম বললো,
” লাবিবা অর্ডার করো। ”
” পাঁচটা চিজ বার্গার। পাঁচটা স্যান্ডুইচ। পাঁচটা ক্যান। ”
” পাঁচটা?”
” তোমার বউকে আনতে গিয়ে অনেক এনার্জি লস করে ফেলেছি ভাই। এখন আমার বেশি বেশি খাবার চাই। ”
লাবিবার মুখে বউ শব্দে রোজী হালকা লজ্জা পেয়ে যায়। তামিম অর্ডার দেয়। লাবিবা বসে না থেকে এদিক সেদিক হাঁটতে থাকে। ছাদের দিকে নজর পড়তেই দেখে ছাদটা ভীষন সুন্দর। নিচ থেকেই যতটুকু বুঝা যায়। অনেকে গিয়ে পিকচার নিয়ে আসছে। লাবিবা গুটি গুটি পায়ে ছাদে উঠে। যতটুকু ভেবেছিলো তার থেকেও সুন্দর। দুপাশে সেলফি কর্ণারও করা আছে। ঝটপট কয়েকটা সেলফি নিয়ে নেয়। এদিক ওদিক কাপল রা হাত ধরে হাঁটছে। উফফ! ভালোবাসাগুলো দেখলেও ভালো লাগে। ভালোবাসার মানুষকে আরো বেশী ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। হটাৎ মনে হয় কেউ ওকে ডাকছে। আমলে নেয় না। পর পর ডাকে এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে। নিচের দিকে তাকাতেই দেখে তানভীর হাত নাড়ছে। লাবিবা অবাক হয়ে যায় তানভীরকে দেখে। বিষন্ন মনটা নিমেষেই পুলকিত হয়। ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। কোমড়ে দু হাত রেখে তানভীর লাবিবার হাসি মুগ্ধ চোখে দেখে।
” ছাদে কি করছো? নিচে আসো।”
লাবিবা রেলিংএ হাতে ভর দিয়ে দাঁড়ায়।
” আপনি নিয়ে যান আমাকে।”
” তুমি এসো।”
” আমার তো লাফ দিতে ইচ্ছে করছে।”
” দাও। ”
” সিরিয়াসলি? লাফ দিবো?”
” দাও।”
” সত্যি?”
” ভয় কিসের? আমি আছি তো। ”
লাবিবার চোখ জোড়া ছল ছল করে উঠলো। মুখ ভরা হাসি। এতো ভরসা! এতো শান্তি! এতো বিশ্বাস! আর কোথায় পাওয়া যাবে নিজের মানুষটাকে ছাড়া?
লাবিবা রেলিং পার হয়ে ছাদের কিনারায় দাঁড়ালো।ছোট্ট জায়গায় দু পা কোনো ভাবে ধরে আছে। নিচ থেকে যারা লাবিবাকে দেখতে পেলো তারা পর পর চিৎকার দিয়ে উঠলো,
” এই মেয়ে! কি করছো? হুয়াট য়্যা য়্যু ডুয়িং? পড়ে যাবে তো।”
লাবিবা মুক্ত বিহঙ্গের মতো হাসছে। তানভীর একপা দুপা করে এগিয়ে যায়। সামনে দিকে হাত বাড়িয়ে বাড়ায়। আস্থা দিয়ে বলে,
” এসো। ”
লাবিবা দুহাত দুপাশে মেলে দেয়। মোটেই ভয় পায়না। চোখে চোখ রেখেই হাসি মুখে দুতলা থেকে নিজেকে ছেড়ে দেয়। তানভীর আরো কয়েকপা এগিয়ে কেচ ধরে নেয়। লাবিবা কোলে গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে দেয়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে সকলের চোখ এখন তানভীর লাবিবার দিকে। কেউ কেউ হাসতে হাসতে বলে, পাগল ছেলে মেয়ে! কেউ কেউ আবার বাহবা দিতে থাকে। পুরো রেস্টুরেন্ট শোরগোল পড়ে যায়। লাবিবা ফিসফিসিয়ে বলে,
” খান সাহেব! জীবনটা এতো সুন্দর কেন?”
তানভীর লাবিবার মাথায় ছোট্ট চুমু এঁকে বলে,
” তুমি আমি আমরা মিলে এভাবেই ভালোবাসার কাব্য গাথঁবো।”
আপনাদের সবার কাছে আমার একটি অনুরোধ। আমি আমার গ্ৰুপ এবং পেইজেই শুধু গল্প দিই। আমার একার পক্ষে গল্পের প্রচার সম্ভব নয়। আপনারা যদি হেল্প না করেন আমার গল্প আন্ডাররেটেড ই থেকে যাবে। আপনাদের পরিচিত পাঠকদের ইনভাইট করবেন আমার গল্প পড়ার জন্য। গল্প পড়ে রিভিউ দিবেন যাতে অন্যরা উৎসাহিত হয়ে পড়তে আসে। আমার গল্পকে ছড়িয়ে দিবেন সকলের মাঝে। আসসালামুয়ালাইকুম।
চলবে __
Labiba Tanha Aliza-লাবিবা তানহা এলিজা

