কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ১৪.

0
490

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

১৪.

তাশদীদ মাথায় তোয়ালে চালাতে চালাতে ওয়াশরুম থেকে বেরোলো। কিন্তু ঘরের ভেতর রিংকিকে দেখেই থেমে গেলো ওর হাত। পড়ার টেবিলের সামনে থাকা চেয়ারটায় পিঠ ঠেকিয়ে, বুকে হাত গুজে দাড়িয়ে আছে রিংকি। কালো ট্রাউজার আর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত তাশদীদকে আপাদমস্তক দেখে নিলো ও। তারপর সোজা হয়ে দাড়ালো। ওর চাওনি দেখে প্রচন্ড পরিমানে বিরক্ত হয় তাশদীদ। হালকা ভেজা তোয়ালেটা ওয়ারড্রোবের ওপর রেখে, বিছানা থেকে টিশার্ট হাতে নিলো ও। গায়ে পরে স্পষ্ট গলায় বললো,

– তুমি এসময় এখানে কেনো?

– আন্টি বলেছে আমার এ বাসায় আসতে কারন লাগবে না। আপনার রুমে আসতে আমার কারন লাগবে কিনা, সেটা জানতে এসেছি তাশদীদ ভাই।

– কারো রুমে আসতে কারন লাগে না, রুমের মালিকের অনুমতি লাগে। পরেরবার থেকে এই আদবটা মনে রেখো। সে যার রুমেই যাও না কেনো।

মেজাজ পুরোদমে খারাপ নিয়ে জবাব দেয় তাশদীদ। ওর চেহারা দেখে বুঝলো রিংকি। যে ছেলে হাসি ছাড়া কারো সাথে কথা বলেনা, তার রাগী চেহারাটা চোখে পরার মতোই হয়। তবুও পুর্ন আত্নবিশ্বাস জুটিয়ে বললো,

– আম্মু এসেছে। আন্টির সাথে নাকি দরকার আছে তার। একা আসবে না তাই আমাকে সাথে নিয়ে এসেছে।

নামাজের টুপি আর ওয়ালেট হাতে নিয়ে ঘরে থেকে বেরিয়ে গেলো তাশদীদ। বারান্দায় এসে দেখে ওর মায়ের সাথে মিসেস সৈয়দ বসে আছে। তাশদীদ তাকে সালাম দিলো। ভদ্রমহিলা উত্তর নিয়ে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো। তাশদীদ বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,

– এসে কথা বলছি আন্টি। বসো।

চলে গেলো ও। রিংকি রুম থেকে বেরিয়ে কিচেনের দিকে গেলো। সেখান থেকে ড্রাইফ্রুটের বয়াম নিয়ে এসে মায়ের সোফার হাতলে বসলো। মিসেস ওয়াসীর হাসিমুখে বললেন,

– কিছু খাবে বলে কিচেনে গিয়ে, তুমি খুজেখুজে এটা নিয়ে আসলে রিংকি? আমিতো বললাম কি খাবে বলো, আমি এনে দিচ্ছি।

– আ’ম ডান আন্টি।

বাইরেরদিক তাকিয়ে বললো রিংকি। ওর ঠোঁটে মুচকি হাসি।
তাশদীদ নামাজ শেষে দ্রুতপদে বাসার দিক এগোচ্ছিলো। তামজীদ মসজিদ থেকে বেরিয়ে হুড়মুড়িয়ে জুতা পরলো। তাশদীদের পাশে হাটতে হাটতে বললো,

– এতো তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছিস? স্টুডেন্ট পড়াতে?

– না। বাবার আরেকটা জুতা পলিশ করতে।

ভাইয়ের জবাব শুনে তামজীদ থেমে যায়। শুকনো ঢোক গেলে একটা। আবারো ছুটে এসে তাশদীদের সাথে পা বাড়িয়ে বলে,

– বিশ্বাস কর ভাইয়া, আমি মাকে বলেছিলাম রিংকি আপুকে অহেতুক দাওয়াত না দিতে! জানতাম ও মার কথাকে সিরিয়াসলি নেবে! আমি আটকেছিলাম মাকে! বিশ্বাস কর!

একপলক ভাইয়ের দিকে তাকালো তাশদীদ। ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে আবারো হাটা লাগালো। আপাতত ওর মাথায় একটা বিষয়ই ঘুরছে, রিংকির বিষয়ে ওর মা-বাবাকে জানানো। যেহেতু আজ মিসেস সৈয়দ প্রীতিকার্নিশ এসেছেই, ও আজই বলবে তাকে, রিংকির চিন্তাভাবনা ঠিক না। ও আর ওকে পড়াতে যাবে না। বাসায় ঢুকে তিন নারীকে নিজের ঘরেই পেলো তাশদীদ। রিংকি আর ওর মা বিছানায় বসে কথা বলছে। সামনের ট্রে তে ফলের টুকরো, চানাচুর, বিস্কিট। রিংকি পড়ার টেবিলের এটা ওটা ধরছে, দেখছে, আবার যথাস্থানে ঠিকঠাকমতো রেখে দিচ্ছে। তামজীদ ভাইয়ের চেহারায় মোটেও সন্তুষ্টি খুজে পেলো না। আগেআগে ভেতরে ঢুকে ট্রে থেকে আপেলের টুকরো মুখে পুরলো ও। মিসেস ওয়াসীর বললেন,

– এসেছিস? তোর বাবা তো গেছে একজায়গায়, তোরাও দু ভাই যার যার মতো। প্রীতিকার্নিশে সন্ধ্যা মানেই আমার একাকীত্ব। আজকে ভাবী এসেছে, ভালোই লাগছে। তোদের বাসায় না ফিরলেও চলতো।

– জানোই তো আমরা দু ভাই কতোটা মা পাগল। তোমাকে ছাড়া ভাল্লাগেনা কিছুই। এ স্বভাবের জন্য বউ পালতে পারবো না দেখো।

বলতে বলতে তামজীদ মায়ের কোলে শুয়ে পরলো। মিসেস ওয়াসীর মার লাগালেন ওকে। হেসে দিলেন মিসেস সৈয়দ। রিংকি পেছন তাশদীদকে দেখে হাতের পেপারওয়েটটা টেবিলে রেখে দিলো। মায়ের কাছে গিয়ে বসলো ও। তাশদীদ ভেতরে ঢুকে ওয়ারড্রোবে হেলান দিয়ে দাড়ালো। বুকে হাত গুজে বললো,

– আন্টি? রিংকি বলছিলো তোমার নাকি দরকার বলে প্রীতিকার্নিশ এসেছো? ইমারজেন্সি কোনো?

মিসেস সৈয়দ হচকিয়ে যান। জবাব না খুজে মেয়ের দিকে তাকালেন তিনি। মিসেস ওয়াসীর বললেন,

– এসব কি কথা তাশদীদ? প্রীতিকার্নিশ আসতে দরকার কেনো থাকতে হবে ওনাদের?

– আমি বলিনি এটা। রিংকিই বলেছে।

সোজাসাপ্টা উত্তর দিলো তাশদীদ। রিংকি ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে, নিস্পলক তাকিয়ে আছে ওর দিকে। একপা পেছনে ঠেকিয়ে বাকা হয়ে দাড়িয়েছিলো তাশদীদ। রিংকির হাসিটা দেখে এবারে সোজা হয়ে দাড়ালো ও। রিংকিকে নিয়ে মিসেস সৈয়দকে কিছু বলতে উদ্যত হবে, তখনই ফোন বেজে ওঠে ওর। প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে দেখে সেটা রোজির নাম্বার। তাশদীদের ভ্রু কুঁচকে আসে। সামনে মিসেস সৈয়দকে বলে,

– তোমার ফোন কোথায় আন্টি?

– ফ্ ফোন? আমারটা…ও ওটা মনেহয় তোমাদের বারান্দার সোফার ওপর। কেনো তাশদীদ?

তাশদীদ জবাব না দিয়ে কল রিসিভ করলো। হ্যালো বলার আগেই ওপাশ থেকে রোজি বড়বড় দম নিতে নিতে বললো,

– ত্ তাশদীদ…আ্ আমার প্রচন্ড ক্ কষ্ট হচ্ছে। ব্ বাসায় কেউ…কেউ নেই…আমি…

ওর আওয়াজ শুনেই মস্তিষ্ক ফাকা হয়ে যায় তাশদীদের। ‘রোজি!’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে ও। মিসেস সৈয়দ বসা থেকে দাড়িয়ে গেলেন তৎক্ষনাৎ। ওপাশের সাড়াশব্দ না পেয়ে ফোন কান থেকে নামিয়ে নেয় তাশদীদ। কল কেটে গেছে। তাশদীদ মিসেস সৈয়দকে উচ্চস্বরে বললো,

– তোমরা রোজিকে একা রেখে এ বাসায় চলে এসেছো?

– ন্ না। ওর বাবা তো…কি হয়েছে রোজির তাশদীদ? রোজির…

তাশদীদ সময় নেয়না। তামজীদের সাইকেলের চাবিটা নিয়ে ছুট লাগায় ও। ফোন নিয়ে কল করে কাউকে। রিসিভ হলে বলতে থাকে,

– হ্যালো শুভ? আন্টিকে নিয়ে এক্ষণ সৈয়দ আঙ্কেলের বাসায় যা। ও বাসায় রোজি একা। ওর মনেহয় লেবার পেইন শুরু হয়েছে। আমি পাঁচমিনিটে আসছি।

ওপাশ থেকে কিছু একা শুনে তাশদীদ আবারো বললো,

– না না। এ্যাম্বুলেন্স আসতে সময় লাগবে। আমি সমরেশ কাকাকে বলছি সিএনজি নিয়ে আসতে। তুই আন্টিকে নিয়ে এক্ষণ যা!

তাশদীদ সাইকেল নিয়ে প্রীতিকার্নিশ থেকে বেরিয়ে আসছিলো। মিসেস সৈয়দ ইতিমধ্যে কান্না শুরু করে দিয়েছেন। মিসেস ওয়াসীর ওনাকে ধরে আছেন। ওদিকে রিংকি প্রতিক্রিয়া-বিহীন। বরাবরের মতো এখনো যেনো ওর দেখার একমাত্র বিষয়, কোন পরিস্থিতিতে তাশদীদ কি করে। তাশদীদ তামজীদকে বললো,

– ওদের নিয়ে ডিরেক্ট হসপিটাল চলে আয়। আমি রোজিকে নিয়ে যাচ্ছি।

দ্রুত মাথা ওপরনিচ করলো তামজীদ। তাশদীদ বেরিয়ে গেলো। মিসেস সৈয়দ কাদতে কাদতে রিংকির বাবার কথা বলতে লাগলেন। রিংকি হাতের ফোনটা নিয়ে কিছুটা সরে দাড়ালো। কল লাগালো বাবার নম্বরে। রিসিভ হলে বললো,
‘আম্মু তোমাকে বলেছিলো না জলদি বাসায় ফিরতে? ফেরো নি কেনো? আপু বাসায় একা ছিলো, ওর লেবার পেইন শুরু হয়েছে। তাশদীদ ভাই হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছে ওকে। যতো দ্রুত পারো হসপিটাল পৌছাও। তাশদীদ ভাইয়ের একা দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে।’

ব্রেক কষে তীব্র বেগের গাড়িটা থামিয়ে দেয় তাথৈ। দম ফেলে, একদন্ড সময় নিয়ে মনে করার চেষ্টা করলো, মুহুর্তের ব্যবধানে ঠিক কি ঘটে গেলো। দ্রুতগতিতে একটা রিকশাকে বা দিক দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলো ও। কিন্তু সেসময়েই রিকশাটা কিছুটা বামে চলে আসে। ফলশ্রুতিতে হুডের সাথে গাড়ির লুকিং মিরর লেগেছে। সেটাও বেশ জোরেসোরে। নক পরে গাড়ির জানালায়৷ তাথৈ সরি বলার উদ্দেশ্যে শ্বাস নেয়। কিন্তু জানালার কাচ নামিয়ে পাশ ফিরতেই থমকে যায় ও। খয়েরী পান্জাবী পরিহিত অন্তু ওর গাড়ির বাইরে। তাথৈ অন্তুর পেছনে তাকালো। রিকশায় সোহা বসে। ওর পরনে খয়েরী রঙের শাড়ী। তাথৈয়ের চোখ জ্বালা করতে শুরু করলো হঠাৎ। সম্পর্ক থাকতে অন্তু ওকে অনেকবার বলেছে, বিয়ের পর আমরা রিকশায় করে রাতের শহর ঘুরবো। গায়ে মাখেনি ও৷ কিন্তু আজ সেই একই জায়গায় সোহাকে দেখে বুকের ভেতরে অচেনা ব্যথা অনুভব হলো ওর। তাথৈ বুঝলো, এর নাম ঈর্ষা। দৃষ্টি সরিয়ে নিজেকে সংবরন করে ও। তখনই অন্তু বললো,

– ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছো?

তাথৈ বিস্ফোরিত চোখে চায়। অবুঝের মতো তাকিয়ে রয় অন্তুর দিকে। অন্তু আবারো বললো,

– সোহা যেদিন ক্যাম্পাসে গিয়েছিলো, তুমি সেদিন ওকে অপমান করেছিলে তাথৈ?

– বিয়ের দিন তো তুমি স্বাভাবিকই ছিলে। বিশ্বাস করো, আমার কোনো অপরাধবোধ নেই। আমি জানি, না তুমি আমায় ভালোবেসেছো, না আমার বিয়েতে তোমার কোনো কষ্ট আছে। আর তুমিও জানো, এটাই সত্যি। তবুও দিনকেদিন এমন টক্সিক হয়ে উঠেছো কেনো? সোহা আমার স্ত্রী বলে?

তাথৈ স্টেয়ারিং মুঠো করে রাগ সামলানোর চেষ্টা করলো। বড়বড় দম ফেলছে ও। অন্তু আবারো কিছু বলতে যাবে, গাড়ির দরজা খুলে দেয় ও। অন্তু সরে দাড়ায়। তাথৈ গাড়ি থেকে নেমে রিকশাওয়ালাকে স্পষ্ট গলায় বললো,

– আমার গাড়ি ডানে এসেছে নাকি তোমার গাড়ি বামে গিয়েছে মামা?

ওর ঝাঝালো গলা শুনে রিকশাওয়ালা থতমত খেয়ে যায়। অন্তুর দিকে তাকিয়ে বলে,

– হ্ হ মামা। রিকশা আমিই ডাইনে আনছি। আ্ আমারই ভুল।

চোখ বন্ধ করে নেয় অন্তু। ও জানে তাথৈ কেমন। সোহা এর আগেও তাথৈয়ের বিপরীতে ওকে বলেছে। সেদিন কথাটাকে গুরুত্ব দেয়নি বলে একদফা ঝগড়াও হয়েছে ওদের। আজকে তাথৈয়ের গাড়িটা রিকশাকে ধাক্কা দেওয়ার পর সোহা প্রতিক্রিয়া করেছে। কথাগুলো তাথৈকে না বললে সোহা আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে পরতো। অন্তু আপাতত ওর বৈবাহিক জীবনে কোনো ঝামেলা চায় না। তাই তাথৈ ইচ্ছাকৃত করেনি জেনেও কথাগুলো বলেছে ও। তাথৈ একপলক সোহার দিকে তাকালো। ওর আপাদমস্তকে নতুন বউয়ের সাজ। পাশের রিকশার হুডটাও দেখে নিলো ও। আবারো রিকশাওয়ালাকে বললো,

– হুডে কোনো সমস্যা হয়েছে?

– না মামা। ওইডা তো নামানোই। হয়নাই কিছুই।

ফিরে এসে গাড়ির দরজা খুললো তাথৈ। কি মনে করে আবারো থেমে গেলো। অন্তুর দিকে তাকিয়ে বললো,

– আমার সামনে এসো না অন্তু। আমি তোমাকে ভালোবাসিনা।

– আমাকে কেনো, তুমি কাউকেই ভালো বাসো না।

একপ্রকার চাপা কষ্ট নিয়ে বললো অন্তু। কি করেনি ও এই মেয়েটার জন্য? সম্পর্কটাকে বাচাতে আদর্শ প্রেমিকের একটাএকটা ভূমিকা পালন করেছিলো ও। বিনিময়ে ভালোবাসা পায়নি। কেবল পেয়েছিলো তাথৈয়ের আশেপাশে থাকার সুযোগ। অন্তুর প্রতিত্তোরে তাথৈয়ের ভেতরটা যেনো এঁফোড় ওঁফোড় হয়ে যায়। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ও অন্তুর দিকে। অন্তু একটা ঢোক গিলে বললো,

– অভিশাপ দিচ্ছি তাথৈ, আমার মতো যন্ত্রণা তোমারও হোক। অস্পর্শী প্রেম তোমার জীবনে এসে তোমাকে উন্মাদ করে দিক। গর্বের সাথে উচ্চারন করা ‘তাথৈ আলফেজ’ নামটা কারো জন্য শুধু ‘তাথৈ’ এ নেমে আসুক। অম্বুনীড় নামের ওই জমকালো বাসা ছেড়ে, কারো হৃদয়ে একটুখানি জায়গা পাবার জন্য তুমি দিশেহারা হও। আমার মতো তুমিও কারো একটুখানি ভালোবাসা পাওয়ার জন্য উদ্ভ্রান্ত হও। একটুখানি তার কাছে থাকা, পাশে থাকার জন্য তুমিও পাগলামি করো। পরিশেষে কারো না সূচক উত্তর, তোমাকে ছিন্নভিন্ন করে দিক। এই সব যন্ত্রণা তোমার হোক তাথৈ। অভিশাপ দিচ্ছি তোমাকে। এই সব যন্ত্রণা তোমার হোক!

তাথৈ শক্ত হয়ে দাড়িয়ে কেবল শুনলো। অন্তু বলা শেষে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো। দেখলো তাথৈর চোখ ছলছল করছে। কিন্তু কাদছে না ও। বা হাতে মুখ মোছার মতো করলো ও। সোহা ততোক্ষণে রিকশা থেকে নেমে ওর হাত ধরেছে। ‘চলো’ বলে অন্তুর হাত টানলো সোহা। তাথৈ একটা বড়সর দম নিয়ে বললো,

– ‘তাথৈ আলফেজ ভালোবাসতে জানেনা।’ কথাটা প্রথমদিনই তোমাকে বলেছিলাম অন্তু। ভুলে গেছো?

অন্তু জবাব দিলো না। কান্না লুকোতে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে, অন্যদিক তাকিয়ে রইলো। তাথৈ আর কিছু বললো না। গাড়িতে করে চলে গেলো ও। অন্তু চোখ বন্ধ করে সামলালো নিজেকে। ওর মন হয়তো তখন ওপরওয়ালার কাছে প্রার্থনারত, ‘আমার অভিশাপকে দুয়া হিসেবে কবুল করো ইয়া রব। তাথৈ বড়লোক বটে। কিন্তু ওর অনেক অভাব। ভালোবাসার অভাব।’
মাঝরাতে ডোরবেল বাজলো অম্বুনীড়ে। আওয়াজ শুনে চোখ মেললো তুল্য। আশপাশ দেখে বুঝলো, ড্রয়িংরুমের সোফাতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলো ও। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে, রাত দুটো বাজে। সহকারী একজন এসে দরজার দিকে যাচ্ছিলো। তুল্য ডাক লাগালো,

– রফিজ চাচা?

লোক থেমে যায়। তুল্য কোলে থাকা কুশন পাশের সোফায় ছুড়ে মেরে সরিয়ে উঠে দাড়ালো। গেন্জিটা টেনে ঠিকঠাক করে এগোলো দরজায়। দরজা খুলে দিলে তাথৈ ভেতরে ঢোকে। তুল্যকে না দেখার মতে করে পা বাড়ায় নিজের ঘরের দিকে। তুল্য বললো,

– আফিফ যে পনেরো হাজার টাকা চাইলো, ওইটা কি আমাদের জয়েন্ট একাউন্ট থেকে দেবো, নাকি আমার একাউন্ট থেকেই দেবো? সেকেন্ডটা করলে, তুই যে আমাকে পে ব্যাক করবি আমার সেটার একটা গ্যারান্টি চাই।

তাথৈয়ের কাধে ব্যাগ ছিলো। ব্যাগটা সেন্টার টেবিলে ফেলে দেয় ও। সেখানে থাকা ফলভর্তি সিরামিকের বাটিটা সাথেসাথে মেঝেতে পরে ভেঙে যায়। তাথৈ গুরুত্ব দিলো না। তুল্যর দিক ফিরে বললো,

– আমাকে দেখলে টাকা আর প্রোপার্টি ছাড়া আর কিছু মাথায় আসেনা তোর?

– তোর মাথায় ভাঙচুর ছাড়া আর কিছু আসে?

তাথৈ থামলো। তুল্য খেয়াল করলো, ওর তেজী চেহারায় চোরা কষ্ট এসে ভর করেছে। কিন্তু ঠিক পরমুহূর্তেই বদলে যায় সে চেহারাটা। তাথৈ চোখ তুলে ভাইয়ের দিক তাকিয়ে বললো,

– আমি, এমনই! এন্ড আ’ম নট গোয়িং টু চেন্জ!

ওপরে চলে গেলো তাথৈ। তুল্য ওর চলে যাওয়ার দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো। তারপর নিজেনিজেই বললো, ‘আর এজন্যই অন্তু ভেগেছিলো।’

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here