কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ২৪.

0
363

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

২৪.

‘চলন্ত ট্রেনের দরজায় তাথৈয়ের অনেকটা কাছে দাড়ানো তাশদীদ। অকস্মাৎ গলায় ছুয়েছে ওর।’
চোখে এমন দৃশ্যপট ভেসে উঠতেই সর্বাঙ্গ ঝাঁকি দিয়ে ঘুম ভেঙে যায় তাথৈয়ের। চোখ মেলে নিজের অবস্থান আর আশপাশ পরখ করলো ও। মৃদ্যু আলোতে দেখলো, ট্রেনের সবই ঘুমোচ্ছে। নড়েচড়ে বসে পাশের জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে দিলো তাথৈ। জানালার কাচে ঘেমে ওঠার মতো পানিকনা জমেছে। ঘড়িতে দেখলো ভোর পাঁচটা চল্লিশ। বাইরে তখনো অন্ধকার। আস্তেধীরে সিট থেকে বেরিয়ে আসে তাথৈ। ওয়াশরুম থেকে ফেরার পথে ওর চোখে পরলো, সামনের দিকের একটা সিটের একজনের মাথার ওপরিভাগ ডানেবামে নড়াচড়া করছে। যখন সবাই ঘুমোচ্ছে, এ সময় না ঘুমিয়ে কেউ জেগে আছে কেনো? তাথৈয়ের অহেতুক আগ্রহ জাগে। কপাল কিঞ্চিৎ ভাজ করে একপা দুপা করে এগোতে থাকে ও। কাছাকাছি গিয়ে দেখলো, সিটটায় তাশদীদ বসে। পশ্চিমমুখো হয়ে বসে, হাটুতে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে সালাম ফেরাচ্ছে সে। তাথৈ অবিশ্বাসী চোখে চেয়ে রইলো ওর দিকে। এতো মানুষের ভীড়ে, এই একটা মানুষের এতোসব দিক কেনো ওরই সামনে আসে? কেনো নিগ্রহ স্বভাব বদলে, শুধুমাত্র তাশদীদ ওয়াসীর নামটায় ওর আগ্রহ জুড়ে যাচ্ছে? মুগ্ধতা একটা সাধারণ শব্দ থেকে ওর কাছে অনুভূতিতে রুপান্তরিত হচ্ছে কেনো?
সালাম শেষ করে চোখ মেলতেই হাতের বামে তাথৈকে চোখে পরলো তাশদীদের। মৃদ্যু হাসলো ও। ওর হাসিটা দেখে তাথৈয়ের ধ্যান ভাঙে। নিজেকে সংযত করে নেয় তৎক্ষনাৎ। তাশদীদ পাশের ঘুমন্ত টিটুকে দেখে নিয়ে ফিসফিসয়ে বললো,

– ঘুম আসছে না?

তাথৈ জবাব দিলো না। স্তব্ধ পায়ে আবারো নিজের সিটে এসে বসলো ও। পায়ের জুতা খুলে, দু পা সিটের ওপরে তুললো। তারপর দুহাতে হাটু জড়িয়ে বন্ধ করে নিলো চোখ। ওর মনে হতে লাগলো, ওর ঘুম পাচ্ছে, প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। যে ঘুম কারো শীতলতার স্পর্শ এসে ভেঙে দিয়ে গিয়েছিলো, কারো কথার আবেশ যেনো তারচেয়ে অনেকবেশি উষ্ণতায় ওকে নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি দিচ্ছে।
আলোর ডাকে সকালে ঘুম ভাঙলো তাথৈয়ের। ফ্রেশ হয়ে এসে মোবাইল চেইক করলো ও। রুমন ম্যাসেজ করেছে। শার্লিকে ম্যাসেজগুলো দেখিয়ে, খুশি হয়ে গেলো দুজনে। ওদের সকালবেলার খাবারটা ট্রেনেই দেওয়ার কথা। যেহেতু সবটার দায়িত্বে শান্ত ছিলো, ও, তাশদীদ, টিটু আর ওদের আরো দুজন বন্ধু মিলিয়ে সবাইকে খাবার সার্ভ করতে লাগলো। শান্ত আর তাশদীদ তাথৈদের পেছনদিক থেকে খাবারের প্যাকেটগুলো দিচ্ছিলো। তাথৈদের সিটে এসে শার্লিকে চোখে পরে ওর। তাথৈ, আলোকে প্যাকেট দিয়ে, শার্লিকে খাবার দেওয়ার সময় শান্ত হেসে বললো,

– বা শার্লি! তোমার ড্রেস সেন্স আগের চেয়ে আরো সুন্দর হয়ে গেছে দেখছি!

শার্লি কিছুটা অস্বস্তিতে পরে প্যাকেট হাতে নেয়। আলো নিজের ঠোঁটের জোরালো হাসিটা ঠিক রাখলো। মনেমনে হয়তো বললো, ‘হতেই হতো।শার্লিকে চুজ করা মানুষটাও তো…’ তাশদীদ শান্তর ওপরপাশে ছিলো। প্যান্টের পকেটে দুহাত গুজে, সিটের হাতলের ওপর বসে থেকে হেসে বললো,

– এন্ড শি ইজ লুকিং বিউটিফুল!

শার্লি মৃদ্যু হেসে বললো, ‘থ্যাংকিউ তাশদীদ ভাই’। শান্ত নিজের হাতের প্যাকেটগুলোর দিকে মলিন হাসলো। পা বাড়ালো সামনে। নিচদিক তাকিয়ে থেকে হাতের মাঝে থাকা প্যাকেটটা শক্ত করে মুঠো করে নেয় তাথৈ। মচমচ শব্দ করে ওঠে প্যাকেটটা। তাশদীদ উঁকি দিয়ে আওয়াজের উৎস দেখলো। তারপর চলে গেলো শান্তর সাথে। শান্ত তুল্যর কাছে এসে খাবারের প্যাকেটটা বাড়িয়ে ধরলো। তুল্য সিটের হাতলে হাত রেখে শক্ত করে হাতল ধরে রেখেছিলো। শান্তর দিকে চেয়ে হেসে, তবে রাগ নিয়ে বললো,

– জুনিয়র মেয়েদের ড্রেস সেন্স আপনার ভালোই মনে থাকে দেখছি শান্ত ভাই! তবুও আপনার সিজি খারাপ কেনো? পড়া মনে থাকেনা?

সবার সামনে কথাটা শুনে শান্তর হাসিটা গায়েব হয়ে যায়। আত্মসম্মানে আঘাত লেগে চোখমুখ শক্ত হয়ে আসে ওর। শার্লির পরিবর্তন প্রাণরসায়নের যে কারো চোখে পরার মতো। তাই তুল্য কথাটা যেভাবে বলেছে, সেটা শোনার মতো সহ্যশক্তি ওর নেই। ঝামেলা করতে উদ্যত হচ্ছিলো ও। তাশদীদ পাশেই ছিলো। ব্যাপারটা বুঝে উঠতেই ও পাশ থেকে বলে উঠলো,

– ঠিকি বলেছো তুল্য। জুনিয়র ছেলেরা দৈনিক কয়টা সিগারেট খেয়ে টপ করে, সেটাও ওর মনে থাকে। শুধু পড়াই মনে থাকে না। বাই দা ওয়ে, এনি সাজেশন ফ্রম ইউ?

শান্ত এগোতে গিয়েও থেমে যায়। তুল্য জবাব পেয়ে খাবারের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে অন্যদিক মুখ করে রইলো। তাশদীদের দিকে চেয়ে হাসলো শান্ত। প্রতিত্তোরে চোখ টিপে হাসলো তাশদীদও। নিজেদের কাজ শেষ করলো দুজনে। খাওয়াশেষে চা-কফির আড্ডায় আরেকদফায় কিছু ভিডিও নেয় তাশদীদরা।
জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বসে, মনোযোগ দিয়ে ওদের হুল্লোড় শুনছিলো তাথৈ। শার্লি, আলো নিজেরা কথা বলতে বলতে খেয়াল করলো, তাথৈ সকাল হবার পর একবারো কানে হেডফোন লাগায় নি। ওদের কথা শুনে জবাব না দিক, তাথৈয়ের ঠোটে ফোটা কিঞ্চিৎ হাসিটাই ওদের জন্য যথেষ্ট।
বেলা এগারোটার নাগাদ ট্রেন পৌছায় কক্সবাজার স্টেশনে। একঝাক তরুণতরুণী হৈচৈ বাধিয়ে ট্রেন থেকে নামে। তুল্য আগেআগে নেমে একপাশে দাড়ালো। তাশদীদ শান্তরা নেমে সবাইকে গুনে আগেআগে চললো। ওদের পেছন পেছন এগিয়ে গেলো বাকিসব। তাথৈকে বেরোতে দেখে তুল্য এগোলো। বললো,

– ট্রলিটা আমাকে দে।

– তোর হেল্পের দরকার নেই আমার।

স্পষ্ট জবাব দিয়ে, চোখে সানগ্লাস এটে পা বাড়ালো তাথৈ। ঠিক সেসময়ই শার্লি পাশ কাটালো তুল্যকে৷ তুল্য পেছন থেকে ডাক লাগালো,

– ওয় শার্লি!

চমকে দাড়িয়ে যায় শার্লি। দুরুদুরু বুক নিয়ে পেছন ফিরলো ও। তুল্য এগিয়ে শক্ত আওয়াজে জিজ্ঞেস করলো,

– তুই স্টেশনে ইশারা করেছিলি কেনো আমাকে?

শার্লি থতমত খেয়ে যায়। তবে চোখ তুলে তাকালো না ও। বহুকষ্টে সাহস করে জবাব দিলো,

– ট্ টিপটা ঠিক জায়গায় পরেছি কিনা। ভাইভার দিন তুই টিপ পরিয়ে দিয়েছিলি, তাই…

– তো? আমি একদিন টিপ পরিয়েছি বলে তুই দৈনিক টিপ পরবি? দৈনিক আমাকে জিজ্ঞেস করবি টিপ ঠিক আছে কিনা?

এবারে চোখ তুলে তাকালো শার্লি। রাগ হলো ওর। তখন তো ঠিকই টিপ ঠিক আছে বোঝালো। এখন এই ছেলে ওকে এটিচিউড দেখাচ্ছে। গলায় জোর সঞ্চার করে বললো,

– ওইদিন ঠিকঠাক পরিয়েছিলি বলে ভেবেছিলাম তোর অনেক এক্সপেরিয়েন্স আছে। তাই আজ পরেছি বলে জিজ্ঞেস করেছিলাম! আর পরবো না টিপ! জিজ্ঞেসও করবো না তোকে!

তেজ দেখিয়ে চলে আসছিলো শার্লি। পেছন থেকে ওর হাত কোমড়ে চেপে ধরে তুল্য। ‘দেখ তুল্য…’ বলে শার্লি মুখ খুলতে যাবে, তুল্য ওকে সুযোগ না দিয়ে বললো,

– লিসেন! তোর এই গেটআপ কেবল লোকজনের নজর কাড়ছে! এই তেজটা এই গেটআপে ঠিক মানাচ্ছে না। সো তেজ দেখাতে চাইলে, আগের মতো টমবয় সেজে, তারপর আসিস আমাকে তেজ দেখাতে! গট ইট?

বলাশেষে তুল্য শার্লির হাত ছেড়ে দিলো। হনহনিয়ে চলে গেলো ওকে পাশ কাটিয়ে। বহুদিন পর চোখ জলে ভরে উঠলো শার্লির। এই ছেলে কি চায়? এমন বাজে ব্যবহার কেনো করলো? এর আগেও তুল্য ওকে ধমকেছে। কিন্তু তখন তো ওর এমন খারাপ লাগেনি। তাহলে আজ কেনো এতোটা খারাপ লাগছে ওর? সবার থেকে পিছনে পরে যাওয়ায় তাথৈ পিছন ফিরে ডাক লাগালো ওকে। শার্লি দ্রুত পলক ফেলে অশ্রু সামাল দিলো। মৃদ্যুবেগে দৌড়ে তাথৈয়ের পাশে পাশে হাটতে লাগলো ও।

হোটেলে এসে এক রুমে পাঁচটা মেয়েকে দেখে মাথায় আকাশ ভেঙে পরলে তাথৈয়ের। রুমের দরজায় দাড়িয়ে ভেতরে আরো দুটো মেয়েকে দেখে কাচুমাচু মুখ করে তাথৈয়ের দিকে তাকালো আলো। যে মেয়ে আরেকজনের নিশ্বাসবায়ুতেও রাগ দেখায়, সে মেয়ে কি করে আরো চারজনের সাথে রুম শেয়ার করবে? স্টেশন থেকে হোটেলে লোকাল অটো করে আসতে হয়েছে ওদের। সেখানে ছয়জনের সিটের অটোতে তাথৈ যে অতি কষ্টে নিজেকে সংবরন করেছিলো, তা স্পষ্ট বুঝেছিলো আলো। রুমের ভেতরে দুটো বিছানার একটাতে মেয়েদুটো এসেই লাগেজের সব জিনিসপত্র নামিয়ে ফেলেছে। তাথৈ দুদন্ড ওদের কর্মকাণ্ড দেখে মুখ খুললো। সোজাসাপ্টা প্রশ্ন ছুড়লো,

– কোন ব্যাচ আপনারা?

– ফাইনাল ইয়ার।

জুনিয়র রুমমেটের আশা ভেঙে চুরমার হয়ে যায় আলোর। এখন এই সিনিয়র আপুদের সাথে তাথৈকে কি করে সামাল দেবে ও? তাথৈ বাহাতে কপালের ওপরনিচ বরাবর ডলতে লাগলো। শার্লি এতোক্ষণ চুপ ছিলো। কি ভেবে হাটা লাগালো ও। সোজা এসে রিসেপশনে বসা শান্তকে বললো,

– আমাদের রুমে দুজন সিনিয়র আপু আছেন। ওনাদের কোনোভাবে অন্যরুমে শিফট করানো যায় শান্ত ভাই?

কফি হাতে ফোনে স্ক্রল করছিলো শান্ত। তুল্যর ব্যবহারে জন্য শার্লিকে দেখে রাগ হলো ওর এ মুহুর্তে। বেশ কড়া গলায় জবাব দিলো,

– তোমাদের আবদার পুরনে বসে নেই আমি! বাজেটে যেভাবে প্লান করা গেছে, সেটাই করেছি! থাকার হলে থাকো, আদারওয়াইজ লিভ!

শান্তর উচ্চস্বর শুনে কিছুটা দুর থেকে ওরদিকে তাকালো তাশদীদ। শার্লি নিজেও অবাক হয়েছে ওকে চেচাতে দেখে। চুপচাপ চলে আসছিলো ও। তাশদীদ ওরদিক এসে বললো,

– কি সমস্যা শার্লি?

তাথৈয়ের ব্যাপারে তাশদীদকে জানালো শার্লি। তাশদীদ হতাশ হলো। গায়ের হুডিটা খুলে হাতে মুঠো করে, শার্লিকে পথ দেখিয়ে বললো,

– চলো।

শার্লি এগোলো। ওর পেছনপেছন তাশদীদও আসলো। ওরা রুমের সামনে এসে দেখে তাথৈ সেভাবেই কপাল ডলছে আর পায়চারী করছে। আলো দেয়াল ঘেষে দাড়িয়ে আছে চুপচাপ। তাশদীদ এসেই তাথৈয়ের ট্রলিটা ধরে দরজায় নক করলো। বড়বড় চোখে ওরদিক তাকিয়ে রইলো তাথৈ। তাশদীদ দরজা খুলে ট্রলিটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে, সোজা এসে হাত ধরলো ওর। তারপর ওকেও রুমে ঢুকিয়ে, হাত ছেড়ে দিলো। খালি বিছানাটা দেখিয়ে বললো,

– এটা চারজনের রুম। বাজেট সংকুলানের জন্য একরুমে পাঁচজনকে সেটেল করে দিতে হয়েছে। দুইবেডে দুজন দুজন করে চারজন, আরেকজন সোফায়। এখন ওরা দুইজন ওই বেড দখল করেছে। তো তুমি চাইলে একা এই বেড দখল করতে পারো, আলো-শার্লি সোফায় ঘুমোবে; নয়তো বেডটা আলো শার্লিকে দিয়ে তুমিই সোফায় ঘুমাতে পারো; আর নয়তো তিনজনে মিলে এক বেডে ঘুমাতে পারো। ইওর উইশ। দুইটায় লান্চ, ফ্রেশ হয়ে দোতলার বুফেতে চলে এসো।

একপলক রুমের বাকি চারজনকে দেখে নিয়ে বেরিয়ে গেলো তাশদীদ। ও চলে যেতেই সিনিয়র মেয়েদুটো কিছু একটা বলে শব্দ করে হেসে উঠলো। সেটুক কানে গেলো তাথৈয়ের। ধপ করে সোফায় বসে গেলো ও। দু হাটুতে দুহাতের কনুই ঠেকিয়ে, আঙুলগুলো ভাজেভাজে শক্তমুঠো করে নিলো। চোয়াল শক্ত করে নিচদিক তাকিয়ে রইলো ও। আলো-শার্লি একে অপরের দিকে তাকালো। ওরা বুঝলো, তাথৈ নিজের রাগ সংবরন করার চেষ্টা করছে। কেবল এটুকো বুঝলো না, তাথৈ কেনো নিজের রাগ সংবরন করার চেষ্টা করছে।

সুবিশাল জলরাশির সুউচ্চ ঢেউ একের পর এক আছড়ে পরছে ইনানী সি বিচে। বিচের অনেকটা দুরে দাড়িয়ে, বালুতীরে সহপাঠী, সিনিয়র, জুনিয়রদের দৌড়াদৌড়ি করতে দেখছে তাথৈ। দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রামশেষে সবাইমিলে বেড়াতে এসেছে বিচে। তাথৈয়ের ইচ্ছে ছিলো না আসার। কিন্তু ও না এলে আলো শার্লিও আসবে না বলছিলো। তাই বাধ্য হয়ে এসেছে ও। বাকিরা ছোটাছুটি করছে, সমুদ্রের পানিতে পা ভেজাচ্ছে, শার্লি বালুতে কিছু লিখছে, আবার মুছছে। আলো বালি দিয়ে ঘর তৈরীর চেষ্টা করছে। তাথৈ কিছুটা ডানদিকে তাকালো। তুল্য বিচের চেয়ারগুলোতে আধশোয়া হয়ে ডাবের পানি খাচ্ছে। ভাবখানা এমন, ও মোবাইল চালাচ্ছে। অথচ ওর দৃষ্টি শার্লির দিকে। শার্লি চেন্জ করে আবারো জিন্স টিশার্ট পরেছে এখন। এদিকটায় শীতের প্রকোপ তুলনামুলকভাবে কম। সমুদ্রের বুকে ডুব দেবে বলে বিকেলের সোনালী রোদটা বাতাসের সাথে মিশে বেশ আরামদায়ক পরিবেশ তৈরী করে দিয়েছে। ডাবের স্ট্র টা বের করে এক পর্যায়ে ছুড়ে মারলো তুল্য। তারপর মুখ লাগিয়ে খেতে লাগলো। ভাইয়ের রাগ দেখে অভ্যস্ত তাথৈ চোখ সরিয়ে নিলো। এরমাঝে কানে আসলো,

– এখানে দাড়িয়ে ঢেউ গুনছো? নাকি কোরাল পাথর গুনছো?

তাথৈ পাশে তাকালো। অফ হোয়াইট রঙের শার্ট আর জিন্স পরিহিত তাশদীদ ওর পাশে দাড়ানো। তাশদীদের শার্টের ওপরের দুইটা বোতাম খোলা, প্যান্টের নিচেরদিকটা ভাজ দিয়ে পায়ের গিটের ওপর অবদি তোলা। পকেটে দু হাত গুজে দাড়িয়ে আছে সে। তাথৈ জবাব দিলো না। জবাব না পেয়ে তাশদীদ দুপা এগোলো। আগ্রহ নিয়ে শুধালো,

– কি সমস্যা তোমার? বাধভাঙা আনন্দের স্বাদ নিতে ইচ্ছে করে না? সৌন্দর্য উপভোগের পিপাসা জাগে না?

– আনন্দ বলতে আমি কেবল আমার সঙ্গ বুঝি। আর সৌন্দর্য উপভোগের কিছু না, ওটা দেখার বস্তু৷

তাশদীদ হেসে ফেললো ওর কথায়। ওরদিক বাকা চোখে তাকালো তাথৈ। তাশদীদ হাসি কমিয়ে ওর সামনে এসে দাড়ালো। বললো,

– এতো ভুল জেনে টপ করো কি করে?
যাইহোক, লেট মি কারেক্ট ইউ। আনন্দ বলতে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গকে বুঝায়। তুমি নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারো, কিন্তু নিজেই নিজের ভালোবাসা হতে পারো না। রইলো বাকি সৌন্দর্য কি? সৌন্দর্যকে দেখার উদ্দেশ্যই হলো উপভোগ।

– যা ঘরে বসে উপভোগ করা যায়, তার জন্য এতোসব অনর্থক।

– যেটাকে তুমি অনর্থক বলছো, তা মোটেও অনর্থক না ম্যাডাম তাথৈ আলফেজ। আই’ল পারসোনালী মেক শিওর, এই ট্রিপে তুমি অভূতপূর্ব, অশ্রুতপূর্ব, অদৃষ্টপূর্ব কিছুর অভিজ্ঞতা পাও। এন্ড দ্যাটস মাই প্রমিস!

বড়সড় একটা হাসি দিয়ে বলা শেষ করলো তাশদীদ। তাথৈয়ের দিক তাকিয়ে দু পা পেছোলো ও। তারপর মৃদ্যুবেগে দৌড়ে চলে গেলো শান্তদের দিকে। তাথৈ একহাত বুকে গুজে আরেকহাতে গলার চেইনটা খামচাতে লাগলো। সামনে দেখার মতো এতোকিছু মাঝেও, ওর একজনে দৃষ্টি স্থির। গ্রুপফটো, সেলফি, ভিডিওতে হুল্লোড় মাতিয়ে রাখা সে চির-হাসোজ্জ্বল মুখটায়। তাশদীদ ওয়াসীরে।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here