#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
২৮.
গলায় শীতল কিছুর স্পর্শ পেয়ে কেপে উঠলো তাথৈ। গলায় তাকিয়ে ও হাত ছোয়ালো চেইনে ঝুলতে থাকা লকেটটায়। ওটা দেখে দৃষ্টি প্রসারিত হলো ওর। এটা ওর সেই নাম লেখা লকেটটা, যেটা প্রথমবার তাশদীদের সাথে দেখা হওয়ার সময় রাগে ছুড়ে ফেলেছিলো ও। তাশদীদ সাইকেল থেকে নামলো। ডাববিক্রেতার দোকানের কাছে পৌছে সাইকেল থামিয়েছে ও। তাথৈয়ের চেইনটা এতোদিন ওর কাছেই ছিলো। সে রাতে তাথৈ লকেটটা ছুড়ে ফেলার পর ও সেটা কুড়িয়ে নিয়েছিলো। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো কোথাও দান করে দেবে। কিন্তু তারপরও তাথৈয়ের সাথে দেখা হয়ে যাওয়ার পর ও সিদ্ধান্ত বদলায়। এভাবে নাম লেখা লকেটটা নিসন্দেহে ওর কোনো আপনজনই দিয়েছে ওকে। তাই চেইনটা তাথৈকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভেবে নেয় ও। যেহেতু তাথৈকে সামনে বসিয়ে সাইকেল চালিয়ে ফিরেছে ও, ওকে চেইনটা পরিয়ে দেওয়ার জন্য এ সময়টাই যথাপোযুক্ত মনে হয়েছে তাশদীদের। সাইকেল থেকে নেমে ঠিকমতো সাইকেলটা দাড় করালে তাশদীদ। তাথৈকে ইশারা করলে নামার জন্য৷ তাথৈ নামলো। তবে ওর বিস্ময়ের রেশ কাটে না। তাশদীদ নিজের হুডি ঠিকঠাক করতে করতে বললো,
– জানি অনেক উপকার করেছি তোমার৷ থ্যাংকিউ দিতে হবে না। রাগটা কমিও।
তাথৈয়ের চোখ ভরে ওঠে৷ লকেটটা তৈয়ব আলফেজের দেওয়া। শেষবার এই লকেটটাই তাথৈয়ের জন্য কিনেছিলেন তিনি। ওর খুব ইচ্ছে করছিলো তাশদীদকে শক্ত করে জরিয়ে ধরতে৷ সেটা করলো না তাথৈ। সকালসকাল সমুদ্র দেখতে অনেকেই এসেছে। আশেপাশে কোলাহল। তাথৈ লকেটটা ধরে পা বাড়ালো হোটেলের দিকে। তাশদীদ আরকিছু বললো না। পেছন থেকে ওকে চলে যেতে দেখলো। সামনে থেকে দেখলে হয়তো বুঝতে, কেবল রাগ দেখাতে জানা রাগান্বিতার মাঝে হাজারো নতুন অনুভূতি তৈরী করে দিয়েছে সে। তাথৈ মুগ্ধতায় হাসছে, খুশিতে কাদছে।
তাশদীদ ডাবওয়ালার দিকে এগিয়ে গেলো এবারে। সে বালির ওপর চট বিছিয়ে ডাব কাটছিলো। তাশদীদ তাকে সাইকেলটা দেখিয়ে বললো,
– এইযে মামা সাইকেল। যেভাবে নিয়েছি, ওভাবেই ফেরত দিয়ে গেলাম। এবার আমাকে কতো ফেরত দেবেন দিন।
ডাব কাটা বাদ দিয়ে তাশদীদের দিকে আহম্মকের মতো হা করে তাকিয়ে রইলো লোকটা। কি বলছে কি এই ছেলে? কিসের টাকা ফেরত চাইছে সে? পাঁচ হাজার পুরোটা তাকে সে একেবারে দেয়নি? প্রেমিকা নিয়ে সাইকেলে চরে মজা নিলো, বিনিময়ে পাঁচ হাজার টাকা দেবে না সে? ফেরত চাইছে আবার? তাশদীদ তার চাওনি দেখেই বুঝলো তার মনে কি চলছে। একটা ছোট্ট দম ফেলে বললো,
– এই মামা শোনো, ও আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড টার্লফ্রেন্ড না। টাকাটা তোমার কাছে বন্দক হিসেবে রেখে গিয়েছিলাম। এখন সাইকেল ফেরত দিয়েছি, টাকাটা দাও। আমার বাড়ির জন্য শপিং করা লাগবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ভার্সিটি-ট্যুরে এসেছি। খরচ আছে। আমার পকেটে আরকোনো টাকা নেই।
ভার্সিটির স্টুডেন্ট শুনে ডাববিক্রেতা আর একমুহূর্তও দেরি করলো না। কতো ছেলেপেলেরা এসে ভয় দেখিয়ে বিনা টাকায় ডাবেরজল খেয়ে যায়। ওদের সুবিধার মনে হয় না তার। কথা বাড়ালে ঝামেলা হতে পারে ভেবে পুরো টাকাটা তাশদীদকে দিয়ে দিলো সে। তাশদীদ টাকা গুনে দেখলো সেখানে পুরো টাকাটাই আছে। হেসে এক হাজারের একটা নোট আবারো দোকানদারকে ফিরিয়ে দিলো ও। বললো,
– এটা দিয়ে সাইকেলটা একটু ঘষেমেজে নিও। চেইনে জং পরেছে মনেহয়। আর বিকেলে বিশজনের একটা গ্রুপ নিয়ে আসবো। টাকা দিয়েই খাবো ডাব। এখানেই থেকো।
তাশদীদ হোটেলের দিকে পা বাড়ায়। খুশিমনে নিজের কাজে মন দেয় ডাববিক্রেতা। অভিজ্ঞতার খাতায় আজ আবারো জমা পরে, ‘সবাই এক না।’
তাথৈ রুমে ঢুকে দেখলো আলো সিনিয়রদের বিছানা ঠিকঠাক করছে। আর শার্লি সরু চোখে হাতের জামার দিকে তাকিয়ে আছে। তাথৈকে দেখেই ও বললো,
– সকালসকাল কোথায় গিয়েছিলি তুই?
– ওদের জিনিস কেনো গোছাচ্ছো?
আলোকে সরাসরি প্রশ্ন করলো তাথৈ। আলো নিজের কাজে মনোযোগ রেখে বললো,
– কাল দুপুর থেকে এই একই ড্রেসে আছো। যাও ফ্রেশ হয়ে চেন্জ করে নাও।
তাথৈ বুঝলো আলো ওর প্রশ্নকে পাশ কাটাতে চাইছে। শীতল দৃষ্টিতে শার্লির দিকে তাকালো ও। ওর চাওনি দেখেই ঘাবড়ে যায় শার্লি। গরগর করে বলতে লাগলো,
– সকালবেলা উঠে আমাদের কাজ ধরিয়ে দিয়ে, দুইটা ফেসপ্যাক লাগিয়ে ব্যালকনিতে বসে আরাম করছে। আলোকে বলেছে বেড গোছাতে, আমাকে বলেছে জামা ইস্ত্রি করতে। আমি কি এইসব পারি বল?
তাথৈয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। শার্লির হাত থেকে জামা নিয়ে বিছানায় ছুড়ে মারলো ও। আলো ওকে থামাতে এগিয়েও পারলো না। তাথৈ হনহনিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দেখে মেয়ে দুটো চেহারায় ফেইসপ্যাক লাগিয়ে সফটটুলে বসে। ফোনে একজন আরেকজনকে কিছু দেখাচ্ছে আর হাসছে। বারান্দার দরজায় নখে শব্দ করে বুকে হাত গুজে দাড়ালো তাথৈ। মেয়েদুইটা ওরদিক তাকালো। তাথৈ স্পষ্ট গলায় বললো,
– নিজেদের কাজ নিজেরা করতে পারেন না?
– পারি। কিন্তু করবো না। তোমরা থাকতে আমরা কেনো এতো কষ্ট করবো বলোতো?
নখ দেখতে দেখতে জবাব দিলো একজন। তাথৈয়ের গা জ্বলে ওঠে। ও জবাব দিলো,
– ওরা আপনাদের কাজ করবে না!
ওর জবাব শুনে আরেকজন মেয়ে উঠে দাড়ালো। এগিয়ে এসে একদম তাথৈয়ের সামনে দাড়িয়ে বললো,
– অনেক কথা বলতে জানো দেখছি। এই তুমি আগের সন্ধ্যায় ইচ্ছে করে আমাদের রুমে লক করে গিয়েছিলে। রাইট?
– জ্বী। অনেকবেশি আওয়াজ করে অনেক নির্লজ্জ কথাবার্তা বলছিলেন আপনারা। যাতে অন্যরুমে সাউন্ড না যায় তাই দরজা লক করে গিয়েছিলাম।
তাথৈয়ের যুক্তিতে আরকোনো কথা পায়না মেয়েটা। তবে রাগ হয় ওর। মেয়েটা চোয়াল শক্ত করে বললো,
– এতোই যখন ভেবেছো আমাদের নিয়ে, আমাদের কাজগুলো তুমিই করবে! এই তোমরা? সরো! বিছানাও ও গোছাবে, আর জামাগুলোও ওই…
মেয়েটা কথা শেষ করে না। তাথৈ একমুহূর্ত দাড়ালো না। হনহনিয়ে ভেতরে এসে বিছানার চাদর ধরে টান মারলো ও। ওর কাজ দেখে মেয়েদুইটা রীতিমতো পাথর হয়ে যায়। বিছানার ওপর থাকা ওদের একজনের ফোন, কয়েকটা সাজগুজের সরন্জাম নিচে পরে ভেঙে গেছে। ইস্ত্রি নিয়ে ওটা গরম করতে দিলো তাথৈ। একটা জামা নিয়ে উত্তপ্ত ইস্ত্রিটা তাতে ধরতে যাবে, এটা মেয়ে ছুটে এসে জামাটা কেড়ে নিলো ওর হাত থেকে। আরেকজন এসে নিচে পরে থাকা স্ক্রিনফাটা ফোনটা তুললো। জামা ধরে থাকা মেয়েটা বললো,
– এতোবড় সাহস তোমার! এইভাবে বেয়াদবী করছো! তোমার নামে কম্প্লেইন করবো আমি! বিছানা থেকে ফেলে ফোন ভেঙেছো, আমার জামাটাও পুড়িয়ে ফেলতে যাচ্ছিলে তুমি!
– কিন্তু আপনার বিছানার ধারেকাছে কেনো আসলাম আমি? আপনার জামাটাই বা আমার হাতে কি করে আসলো? আপনি কি আমাকে এমন কোনো কাজে বলেছিলেন?
দপ করে সবটুকো তেজ নিভে যায় মেয়েদুটোর। তাথৈ একদম গা ছাড়া ভাবে পাশ কাটিয়ে চলে আসলো ওদের। ব্যাগ থেকে নিজের জামাকাপড় বের করে ওয়াশরুমে যেতে গিয়ে, কি মনে করে ওদের সামনে থামলো। শান্তশীতল গলায় বললো,
– কেউ একজন আমাকে রাগ কমাতে বলেছে। তাই এটুকোতেই থামলাম। নইলে…এনিওয়েজ! নেক্সটটাইম, নট উইথ মি। প্লিজ! ওকে?
তাথৈয়ের কথা শুনে কথা বলা ভুলে যায় মেয়েদুটো। তাথৈ ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। অনেকটা সময় শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে দেখে, রুমটা ঠিকঠাকমতো গোছানো। মেয়েদুটো রুমে নেই। আলো-শার্লি নিজেদের বিছানায় বসে মিটিমিটিয়ে হাসছে। যার মানে, ওরাই ঘর গুছিয়ে বেরিয়ে গেছে। মাথায় তোয়ালে চালিয়ে মুচকি হেসে ব্যালকনিতে গেলো তাথৈ। ঝলমলে আলোভরা চারপাশ দেখে মন খুশি হয়ে গেলো ওর। প্রথমবারের মতো ওর অনুভব হলো, বাইরের রোদ্দুরের মতো ওর মনটাও আজ উজ্জ্বল, সবুজের মতো ওর প্রাণটাও আজ সতেজ, সমুদ্রের নীলের মতো ওর সর্বাঙ্গে আজ স্নিগ্ধতা, মৃদ্যু বায়বের মতো ওর মস্তিষ্ক আজ শীতল।
•
তিনদিন দুইরাত ট্যুরের আজকেই শেষদিন। দুপুরের খাবারটা সেরে বিকেলে সবাই কেনাকাটা করতে বেরিয়েছে। ছন্নছাড়া হয়ে ইচ্ছেমতো জিনিসপত্র কিনছে সবাই। আলো ভিডিও কলে মা বোনকে দোকানের জিনিসপত্র দেখাচ্ছে। কোনটা ভালো লেগেছে জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু ওরা কেউ কিছুই নিতে চাইছে না। কারন ওরাও জানে, আলোর কাছে টাকা নেই। আলো বুঝেছে ব্যাপারটা। আপাতত জিনিসপত্র দেখাতে লাগলো ও ওদের। যাওয়ার সময় কমদামী হলেও কিছু একটা নেবে এমনটা ভাবলো। শার্লি কেনার মতো কিছু পাচ্ছে না। এ দোকান, ও দোকান ঘোরার পরও কিছুই ওর মনমতো হচ্ছে না। তুল্য বাজার শুরুর দিকটায় এককোনে দাড়িয়ে সিগারেট টানছিলো। শার্লিকে দোকান ঘুরতে দেখছিলো চুপচাপ। শান্ত-তাশদীদ এখনো এদিকটায় আসেনি। একটা দোকানে ঝুলতে থাকা ঝিনুকের মালা চোখে পরে তুল্যর। বেশ সুন্দর ছিলো মালাটা। তুল্য এগোলো সেদিকে। মালাটা খুলে শার্লিকে ডাকলো ও। শার্লি চমকায়। তুল্য এগিয়ে এসে ঠোঁটে সিগারেট চেপে ধরলো। দুহাতে মালাটা শার্লির মাথার পেছনে ধরে একরাশ বিরক্তি বললো,
– এই খাটোখাটো চুলে কিচ্ছু মানাবে না। যা সর!
শার্লি মুখ ভেঙচিয়ে অন্যদিকে চলে গেলো। তুল্য দোকানীকে ফেরত দিলো মালাটা। আলো কয়েকটা দোকান ঘুরে এসে ওই মালাটাই হাতে নিলো। ছাড়া চুলগুলোতে গাজরার মতো করে গুজে ভিডিও কলে মাকে জিজ্ঞেস করলো কেমন দেখাচ্ছে? মায়ের সম্মতি পেয়ে মালাটা কিনে নিলো আলো।
কিছুটাসময় পর তাথৈ আসলো ওদিকটায়। মুলত তাশদীদকে খুজছিলো ও। ওর কেনার কিছু নেই। একসময় চোখে পরলো, তাশদীদ শুটকির দোকানগুলোর সামনে দাড়ানো। ফোনে কথা বলছে আর শুটকি দেখছে সে। ওপাশ থেকে মিসেস ওয়াসীর তাকে ফর্দ শোনাচ্ছে। বারো পদের শুটকি নেবার জন্য বলে কল কাটলেন তিনি। একটা লম্বা শ্বাস ফেলে দোকানে শুটকি প্যাকেট করতে বললো তাশদীদ। তাথৈ হাসলো নিশব্দে। ওকে হাসতে দেখে এগিয়ে আসলো শার্লি। বললো,
– তুই কখন এলি?
– সবেই।
তাশদীদদের দিক চেয়েই জবাব দিলো তাথৈ। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাশদীদকে চোখে পরে শার্লির। ও তাথৈকে আনমনে পেয়ে বললো,
– হোয়াটস্ সো স্পেশাল আবাউট হিম তাথৈ?
– জানিনা। অল আই নো ইজ, এই মানুষটাকে দেখার পর আমি বাকি সবকিছু দেখার কথা ভুলে গিয়েছি।
খুশিতে শার্লির চোখ ভরে ওঠে। তাথৈয়ের এতো সহজ স্বীকারোক্তি শুনে ভেতরটা খুশিতে ঝুমঝুম করে ওঠে শার্লির। একটু সময় নিয়ে তাশদীদের দিকে তাথৈয়ের মুগ্ধ চাওনি দেখলো শার্লি। তুল্য ওকে ম্যাসেজে বলেছে, আগেররাতে তাশদীদের সাথে ছিলো তাথৈ। ওকে বেশি প্রশ্ন না করতে। আলতোকরে তাথৈয়ের কনুইয়ের ওপরদিকটা ধরে ওকে নিজের দিক ফেরালো শার্লি। তাথৈয়ের হুশ ফিরলো। শার্লি ওর স্বীকারোক্তি শুনেছে সেটা টের পেলো ও। তবে প্রতিক্রিয়া পাল্টালো না। শার্লি ফিসফিসিয়ে বললো,
– তুই প্রেমে পরেছিস তাথৈ…
– ইচ্ছে করে পরিনি। বিশ্বাস কর!
অসহায়ের মতোকরে জবাব দিলো তাথৈ। ওর চোখমুখে ফুটে ওঠা অসহায়ত্ব দেখে শার্লি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো। এমন কাতর চেহারার তাথৈকে চেনেই না ও। যে তাথৈয়ের দৃষ্টি ফলার মতো তীক্ষ্ণ, যার হৃদয় পাথরের মতো কঠোর, যার কথার ভাজেভাজে বজ্রনাদ, ওর সামনে সেই তাথৈ না। ওর সামনে যেনো অন্য এক তাথৈ। যার চোখে এখন ওই একটা সাধারণ পুরুষের জন্য মুগ্ধতা, যার হৃদয়ে এখন তাশদীদের নামে শীতলতা, যার স্বরে এখন প্রেমসুলভ নম্রতা। একটু সময় নিয়ে হাসলো শার্লি। মাথা নেড়ে বললো,
– বলছিস কবে?
তাথৈ আবারো তাশদীদের দিকে তাকালো। ওরদিক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো,
– একজন আমাকে অনেকটা ভালোবেসেছিলো। তাকে হ্যাঁ বলেও কখনো ভয় হয়নি আমার। কিন্তু আজ যখন মনে হচ্ছে, আমি কাউকে ভালোবেসে ফেলেছি, প্রথমবারের মতো আমার ভয় হচ্ছে শার্লি।
শার্লির বিস্ময় বাড়লো। তাথৈয়ের চেহারায় সত্যিই ভয়ের রেশ। যে মেয়ে কখনো কোনোকিছু চাইলে তা নিয়ে আপোষ করতো না, আজ সে মেয়ে ভয় পাচ্ছে। পাওয়ার আগেই হারিয়ে ফেলার ভয়। তাথৈ বাহাত বুকে গুজে ডানহাতের কনুই বাহাতে ঠেকালো। গলার চেইনটার লকেটটা ধরে তাশদীদের দিকে তাকিয়ে রইলো ও।
তাশদীদের ফোন বাজে। রিংকির কল। শুটকির প্যাকেট হাতে নিয়ে কলটা রিসিভ করলো তাশদীদ। ওপাশ থেকে রিংকি বললো,
– কেমন আছেন তাশদীদ ভাই?
– আলহামদুলিল্লাহ ব্যস্ত। কোনো ইমারজেন্সি থাকলে দ্রুত বলো।
– আন্টি বললো আপনি শপিংয়ে গেছেন?
– হ্যাঁ। কেনো?
– আমার জন্য কিছু আনবেন না?
– কি চাই?
– আপনার পছন্দ করা ঝিনুকের মালা। ব্যস।
বিব্রত হলেও প্রকাশ করলো না তাশদীদ। ওকে বলে কলটা কাটলো। ঝিনুকের দোকানগুলোতে গিয়ে দুইটা একই মালা নিলো। রিংকি-রোজী দুজনের জন্য। চলে আসছিলো ও। হুট করে একটা বড় শঙ্খের দিকে নজর যায় ওর। তাশদীদ থামলো। আস্তেধীরে হাতে তুলে নিয়ে খুতিয়ে খুতিয়ে দেখতে লাগলো ওটা। শঙ্খটার ওপরের দিকে আটনয়টা খাজকাটা বাকা চুড়া আছে। একপাশ থেকে বড় থেকে ছোট হয়ে এসেছে খাজগুলো। হুবহু ঢেউয়ের মতো। খাজের আগা থেকে মাঝ অবদি আকাশী রঙটা হালকা হতে হতে সাদা হয়ে এসেছে৷ আর সেটা এতোটাই নিঁখুত যে, বোঝাই যাচ্ছে, শঙ্খের রঙটা সম্পুর্ন প্রাকৃতিক। তলার দিকে কোনো খাজ নেই৷ মৌখিক প্রান্ত দেখে নিয়ে মুচকি হেসে ওপরপাশ ঘুরাতেই একটুখানি থমকে যায় তাশদীদ। ওপরপাশের পিঠটায় বাকা হরফে খোদাই করা, ‘Tathai’. নাম খোদাই করা শঙ্খ নেওয়া তাশদীদের বিবেকে ঠেকলো। আবার এতো সুন্দর শঙ্খটা ছাড়তেও ইচ্ছে করছে না ওর। হাতে থাকা মালাদুটো দেখে পরমুহুর্তেই খুশি হয়ে যায় তাশদীদ। রোজীর মেয়ের কথা মনে পরলো ওর। হেসে দিয়ে দোকানদারকে শঙ্খটা প্যাক করে দিতে বললো ও।
একটা দোকান পরেই তাশদীদের বরাবর দাঁড়িয়ে ছিলো তাথৈ-শার্লি। তাথৈ স্পষ্ট দেখলো, তাশদীদ ওর নাম লেখা শঙ্খ কিনছে। ঠোঁটে হাসি ফোটে ওর। একটা দম নিয়ে ও শার্লিকে বললো,
– তবে আমি থেমে থাকবো না শার্লি। তাকে ভালোবাসার সাহসটা যখন দেখিয়েছি, ভালোবাসি বলে দেবার সাহসটাও আমি জোগার করে নেবো। ঠিক জোগার করে নেবো!
#চলবে…

