কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ২৯.

0
382

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

২৯.

ভ্রমনের শেষ সূর্যাস্তটা দেখতে লাবনী পয়েন্টে যাবে সবাই। কেনাকাটা শেষে আপাতত কফিশপ বসেছে বেশিরভাগই। শান্ত, টিটুদের সাথে তাশদীদ৷ তাথৈ-শার্লি একই টেবিলে। আলোকে দোকানে ঢুকতে দেখে থেকে হাত নাড়ালো শার্লি। আলো দেখলো তাথৈও সেখানে বসে। হাসিমুখে গিয়ে ওদের সাথে বসে গেলো আলো। কাধের ব্যাগটা নামিয়ে টেবিলে রেখে বললো,

– তোমাদের শপিং শেষ?

– আর শপিং! কিছুই পছন্দ হয়নি! কি কিনবো?

শার্লির জবাবে আলো হতাশ হলো৷ তবুও জোর গলায় বললো,

– আমাকে বলতে! আমি চুজ করে দিতাম! কি সুন্দর সুন্দর জিনিস সব, আর তোমার কিনা কিছুই পছন্দ হয়নি? এভাবে খালিহাতে বাসায় ফিরতে দিচ্ছি না তোমাকে। এখান থেকে বেরিয়ে আবারো দোকানে যাবো আমরা। ওকে?

– ছাড়ো মেরি মা! আমার এসব পোষায় না। আর ওমুখো হতে পারবো না! আমার কোনো ইচ্ছে নেই কিছু কেনার।

হাতজোড় করে বললো শার্লি। আলো তাথৈয়ের দিকে তাকালো। সে আয়েশে বসে মনোযোগ দিয়ে ওদের কথা শুনছে। আলো ওকে জিজ্ঞেসও করলো না কিছু কিনেছে কিনা। ও জানে, তাথৈ কিছু কেনে নি। নিজের কেনা দু তিনটে জিনিস ওদেরকে দেখাতে যাচ্ছিলো আলো। কিন্তু রিসেপশন থেকে টেবিলনম্বর বলায় ও শার্লির সাথে গেলো কফি আনতে। তাথৈ বাইরে তাকালো। কাচের দেয়াল পেরিয়ে ওর চোখে পরে কফিশপের সামনে। এক মহিলা ঝুড়িতে করে চুড়ি বিক্রি করছে। নিচে বসে তার কাছ থেকে চুড়ি দেখছে ওদের রুমের সেই মেয়েদুটো। এরমাঝেই তাশদীদ ফোনে কথা বলতে বলতে ওদের পাশ কাটিয়ে যায়৷ পরনে নেভি ব্লু শার্ট পরিহিত মানবকে চিনতে তাথৈয়ের দু সেকেন্ডও সময় লাগেনি। মেয়েদুটো কিছু একটা বলাবলি করলো। তারপর একজন একমুঠো চুড়ি নিয়ে দাড়িয়ে তাশদীদের পেছনপেছন এগোলো। তাথৈয়ের আগ্রহ বাড়ে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো ও। ঢোলাঢালা ছোট গোলজামাটার পকেটে দুহাত গুজে বেরিয়ে আসলো কফিশপ থেকে। বাইরে এসে দেখে মেয়েটা তাশদীদকে চুড়ি দেখিয়ে কিছু একটা বলছে। লজ্জা পাচ্ছে ও। মেয়েটা মুলত তাশদীদকে ওকে চুড়ি পরিয়ে দিতে বলছিলো। তাশদীদ জোরালো হেসে বললো,

– দোকানী খালা পরাতে পারে না?

– পারে। কিন্তু আমি আপনার হাত থেকে চুড়িগুলো পরতে চাইছি।

– কারন?

মেয়েটা একপা এগোয়৷ কিছুটা দুর থেকে তা দেখে তাথৈ হাতমুঠো করে নিলো। এই মেয়ে আসার পর থেকেই তাশদীদকে নিয়ে বলাবলি করে চলেছে। ও কেবল চুপচাপ শুনেছে। রাগ হলেও সেভাবে প্রকাশ করতে পারেনি। কারন কেনো রাগ হচ্ছে এ নিয়ে ও নিজের কাছেই নিরুত্তর ছিলো। কিন্তু এবার নিজের রাগের কারন স্পষ্ট বুঝলো তাথৈ। তবুও স্থির রইলো। এদিকে মেয়েটাকে দুরুত্ব ঘোঁচাতে দেখে বিব্রত হলো তাশদীদ। কিছুটা পিছিয়ে দাড়ালো ও। মেয়েটা তবুও ওর বেশ কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বললো,

– ট্রেনে আপনার পাশের সিটটা আমার জন্য রাখবেন। কারনটা পথজুড়ে বলবো না হয়?

তাশদীদ বুঝলো ও কি বুঝাতে চাইছে। বাহাতে গালের ছোটছোট দাড়িগুলো ডললো ও। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে, বেশ শান্তস্বরে জবাব দিলো,

– লিসেন, আর অল্পকিছু মুহুর্ত এই সুন্দর জায়গাটায় আছি আমরা। ডোন্ট স্পয়েল ইট প্লিজ। তোমার হাতে চুড়ি পরানোর বা তার কারন শোনার, কোনোটারই ইচ্ছে আমার নেই। এন্জয় দ্যা ট্রিপ।

ফোনে তাকিয়ে মেয়েটাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় তাশদীদ। কিন্তু ওর কথা মেয়েটার গায়ে লাগলো না বোধহয়। হ্যান্ডসাম ছেলেদের এটিচিউড থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। হেসে আবারো চুড়িওয়ালার কাছে আসলো ও। মুঠোর বাকি চুড়িগুলো চাইলো। চুড়িওয়ালী মহিলা পাশে কাউকে দেখিয়ে জবাব দিলো,

– বাকিগুলা তো হেয় নিলো।

মেয়েটা পাশে তাকায়। কিন্তু সেখানে দাড়ানো তাথৈকে দেখে চেহারার রঙ পাল্টে যায় ওর। হালকা নীল রঙের জামা পরিহিত রমনীর হাতে ওর সেই গাঢ় নীল রেশমি চুড়িগুলোই। তাথৈ শক্তপোক্ত চেহারায় যৎসামান্য হাসিটা দেখে মেয়েটা থতমত খেয়ে যায়। তবুও নিজেকে সামলালো সে। জুনিয়রের সামনে ভয় তো আর প্রকাশ করা যাবে না। হাত বাড়িয়ে বললো,

– চুড়িগুলো দাও। এগুলো আমি আগে চুজ করেছি।

তাথৈ চুড়িগুলো তুলে ধরলো। কিন্তু সেগুলো দেবে বলে না। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে একহাতেই ভেঙে ফেললো ও চুড়িগুলো। মেয়েটা বিস্ফেরিত চোখে একবার তাথৈকে দেখছে, তো একবার ওর হাত থেকে নিচে পরতে থাকা চুড়ির টুকরোগুলোর দিকে। সবগুলো চুড়ি ভেঙে নিচে ফেলে রক্তাক্ত হাতে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে চুড়িওয়ালীকে দিলো তাথৈ। কাচের টুকরোয় ওর হাতের তালু ছিদ্র হয়ে গেছে কয়েকজায়গায়। তাথৈয়ের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। মেয়েটার দিকে একপা এগোলো ও। একদম সামনে দাড়িয়ে, ওর চোখে চোখ রেখে একবার ডানে, একবার নিজেরদিক, একবার মাথা কাৎ করে ঘাড় নাড়ালো। মেয়েটার বুঝতে বাকি রইলো না ও কি বুঝিয়েছে। নিরব সতর্কবাণী মেনে নিয়ে, আশপাশ দেখে দ্রুতপদে স্থানত্যাগ করলো সে। মাথায় কেবল ঘুরপাক খেতে লাগালো তাথৈ আলফেজের ইশারার পুর্ণরুপ, ‘তাশদীদ ওয়াসীর, আমার! বুঝেছো?’

ও চলে গেলে তাথৈ একটা ছোট্ট শ্বাস ফেললো। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে তালুতে ছোপছোপ কাটা দাগ। হাত ঝারা মারলো ও। তারপর কফিশপে ফেরত এসে চেয়ারে বসে গেলো। টেবিলে থাকা টিস্যু নিয়ে হাত মুছলো। এরমাঝে শার্লি কোথথেকে কফি নিয়ে ওর সামনে এসে বসে গেলো। তাথৈয়ের হাত তুলে ধরে বললো,

– তোর কষ্ট হয় না তাথৈ? ব্যথা লাগেনা?

– হচ্ছিলো। এজন্যই চুড়িগুলো ভেঙেছি। যাকগে। এসব ছাড়। আলো কোথায়?

নিজের মতো হাত মুছতে লাগলো তাথৈ। শার্লি জবাব দিলো না। কফি এনে তাথৈকে না পেয়ে আলো জিনিসপত্র রাখতে হোটেলে গেছে৷ আর আশপাশ দেখতেই শার্লির নজরে পরেছে সবটা। ও তেমনি খিচানো স্বরে বললো,

– দোষ ওই মেয়ের। আর তুই চুড়িগুলো ভাঙলি! নিজেকে কষ্ট দিলি!

– পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন, সুস্নিগ্ধ, সুপুরুষটাকে পছন্দ করাটা উন্নত রুচিবোধের প্রমান। এটাকে দোষ কি করে বলি বল? ওর তাশদীদকে পছন্দ, এজন্য চুড়ি ভাঙিনি আমি।

– এজন্যই ভেঙেছিস। আমি দেখেছি কি ঘটেছে ওখানে!

তাথৈ শার্লির দিকে একপলক তাকালো। শার্লি ওর চাওনি দেখে নিজের উত্তেজনা সামলালো। শান্ত উচ্চস্বরে সবাইকে তীরের দিকে এগোতে বললো। কফিশপ থেকে বেরিয়ে আসলো তাথৈ। তীরে শান্তদের ব্যাচের দশ বারোটা ছেলে হাসাহাসি করছে একজায়গায় দাড়িয়ে। তাশদীদও সেখানে। তাথৈয়ের সাথে শার্লিও বেরিয়ে এসেছে। তাথৈ কান্তিহীন হয়ে তাশদীদের হাসিমুখ দেখতে লাগলো। মৃদ্যুস্বরে বললো,

– রোদের মতো হাসতে জানা এই মানুষটাকে কার না পছন্দ হবে শার্লি বলতো? ঢেউয়ের মতো উচ্ছ্বল এই মানুষটাকে কে না পছন্দ করবে বল?

– ওকে শুধু ওই মেয়ে কেনো, পৃথিবীর বাকি সাতশো কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শো নিরানব্বই জন মানুষও পছন্দ করুক। আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। কোনোদিন থাকবে না।

– কিন্তু হ্যাঁ। উদ্দেশ্য যাই হোক, যে তাশদীদের অস্বস্তির কারণ হবে, আমি তাকে মানতে পারবো না। ওর কাছে কেবল তারাই থাকবে, যারা ওর জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত না, যাদের ও নিজের কাছে আসার অধিকার দিয়েছে। নয়তো ওর অনিচ্ছায় কেউ তাশদীদ কেনো, তাশদীদের ঘ্রাণটাও পাবে না। আমি পেতে দেবো না।

একহাত বুকে গুজে আরেকহাতে বুকের লকেটটা আঁকড়ে ধরে তাথৈ৷ তাশদীদরা সবাই সবাই গলাগলি করে সূর্যাস্ত দেখছে। তাদের সর্বডানে তাশদীদ। বা হাত টিটুর কাধে দিয়ে ডানহাত প্যান্টের পকেটে গুজে দাড়ানো ও। ওপারে সূর্যাস্ত হচ্ছে। উজ্জ্বল সূর্য ডুব দিচ্ছে ঢেউয়ের অতলে। পেছনে দাড়ানো তাথৈয়ের কেবল মুগ্ধতা বাড়ে। সুর্যাস্ত দেখতে এসে যেখানে সবার দৃষ্টি সীমা আঁকতে ভুলে যায়, তাথৈয়ের চাওনি স্থির রয় তীরে। তাশদীদ ওয়াসীরে।

হুল্লোড় বাধিয়ে নিজনিজ ব্যাগপত্র নিয়ে স্টেশন পৌছালো সকলে। ট্যুরের সময়সীমা শেষ। ফিরতি ট্রেন রাতের। স্টেশনের নামের সামনে আরেকদফা ছবি তুললো সবাই মিলে। গ্রুপ ছবিটাতে দেখা যায়, কিছু ছেলেমেয়ে অর্ধগোলাকার হয়ে দাড়িয়েছে। বাকিরা সামনে দিয়ে হাটু গেরে বসে গেছে। তাথৈ মেয়েদের পাশটায় শেষের দিকটায় দাড়ানো। তবে ও ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে না। ওর দৃষ্টি বরাবর। আর সেখানে শান্ত-টিটুর সামনে দুহাত ছড়িয়ে গায়ের ভর ছেড়ে বসেছে তাশদীদ।
ছবিপর্ব শেষ করে একেএকে ট্রেনে উঠে বসলো সবাই। বুক করা বগিটাতে সিট সামনাসামনি না। সবগুলো একমুখী। বগির প্রায় একেবারে পেছনে বসেছে তাথৈরা। উইন্ডো সিটটা তাথৈকে দিয়ে বাইরের দিকের সিটটায় বসলো শার্লি। কাধের ব্যাগ ধরে তুল্য ট্রেনে উঠে দেখলো শার্লি তাথৈয়ের পাশে বসেছে। আর সাতপাঁচ ভাবলো না ও৷ ঠিক পাশের সিটটায় গিয়ে বসে পরলো। শার্লির দিকে চেয়ে কাধ থেকে ব্যাগ নামালো তুল্য। তবে শার্লি ওরদিক তাকালো না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে, নাক ডলার ভঙিমা করে হাসি লুকালো ও।
নিজের সিটটার পাশেরসিটেই তুল্যকে দেখে থেমে যায় আলো। ওপাশের জানালার সিটটা ওর। ট্রেন ছাড়ার আগে মায়ের সাথে একদফা ভিডিওকলে কথা বলবে বলে ব্যাগ রেখে নিচে নেমেছিলো ও। তুল্যকে দেখে আলো আমতাআমতা করে বললো,

– ত্ তুমি এখানে?

– কেনো? কোনো সমস্যা তোমার?

তুল্যর সরাসরি প্রশ্নে কি জবাব দেবে ভেবে পায়না আলো। তাথৈ একপলক ভাই-আলোর দিকে তাকিয়ে আবারো মোবাইলে মনোযোগ দিলো। শার্লি হাতলে হাত ঠেকিয়ে, সেহাতে ঠোঁটটুকু ঢেকে রেখে সামনে তাকিয়ে আছে। মুলত হাসি লুকাচ্ছে ও। আলো বললো,

– আব্…উ্ উইন্ডো সিটটা আমার তুল্য।

– তো? আমি কি তোমার সিটে বসেছি?

আলো আবারো আটকায়৷ অস্বস্তি নিয়ে শার্লির দিকে তাকালো ও। কোনোমতে বললো,

– শার্লি, তুমি ওই সিটটায় বসোনা। আমি এখানে তাথৈয়ের সাথে বসি।

– না না! আমি তাথৈয়ের সাথেই বসবো। কোনো সিটফিট চেন্জ করতে পারবো না।

একদম ঝারা গলায় জবাব দিলো শার্লি। এমন একটা ভাব নিলো, যেনো দুনিয়া উল্টালেও ও তুল্যর সাথে বসবে না। তুল্য শান্তমতোন ওর ভাবভঙিমা দেখলো শুধু। আলো পেছন ফিরে পুরো বগিটায় চোখ বুলালো। বাকিসব সিটে যে যার মতো বসে গেছে। সিট পাল্টে বসতে বলার মতো কাউকে খুজতে লাগলো ও। তুল্যর রাগ হলো। সিট থেকে বেরিয়ে আলোকে ধমক লাগিয়ে বললো,

– সমস্যা কি? ঢং কেনো করছো? আমি তোমার গায়ে পরতে যাবো নাকি?

ওর ধমকে চমকে ওঠে আলো। আশপাশ দেখে নিয়ে সিটে ঢুকে চুপচাপ বসে যায় ও। তুল্য শার্লির দিকে তাকালো। সামনে তাকিয়ে সেভাবেই মিটমিটিয়ে হাসছে ও। রাগে তুল্যর কপাল টনটন করতে শুরু করে দেয়। মনেমনে ওর জেদী সত্ত্বাটা তেজ দেখিয়ে বলে ওঠে,
‘দুরে থাকতে চাইছিস তো? থাক! তোকে যদি নিজে থেকে আমার কাছে আসতে বাধ্য না করি, আমিও তুল্য আলফেজ না! মনে রাখিস!’

ট্রেন ছাড়ার হুইসেল দিলো। মোবাইল থেকে চোখ না সরালেও মনোযোগ সরালো তাথৈ। চারপাশের কোলাহল কানে আসছে ওর। এতোগুলো ছেলেমেয়ের আওয়াজ। কিন্তু ও এতোজনের আওয়াজ শুনতে চাইছে না। এবার চোখ তুলে পাশে তাকালো তাথৈ। শার্লি কানে হেডফোন দিয়ে চোখ বন্ধ করে গান শুনছে। ওপাশে তুল্যও ফোন স্ক্রল করছে। তার ওপাশে আলো বই পড়ছে। ফোনটা অফ করলো তাথৈ। ঘাড় ঘুরিয়ে খোলা জানালায় তাকালো। বাইরে রাতের আধার। ট্রেন ছুটছে। পেছনে ফেলে যাচ্ছে কেবল আলোর ছোটছোট উৎসগুলো। এর বাইরে আর কিছুই দেখা যায় না। কিছুসময়ের ব্যবধানে সুরেলি আওয়াজ কানে আসে সবার।

তাথৈয়ের চোখ চকচক করে ওঠে। হাতের আঙুল ফোটানোর শব্দ, স্টিলের চামচ আর কাচের গ্লাসের টুংটাং, ট্রেনের দেয়ালের হস্ত-তবলা, খালিগলার বাদ্যযন্ত্র, হাতেতালি শুনতেই চঞ্চল শশকের মতো উঠে দাড়ালো ও। বগির সামনের দিকটায় চোখ বুলালো ব্যস্তভাবে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে দেখলো না। তাশদীদকে দেখা যাচ্ছে না ওখানে। শান্ত টিটুও নেই। সামনের একঝাঁক ছেলেমেয়ে তখন মিলিতকন্ঠে সুর তুলেছে, ‘তারা রারা রাততারা রাততারা…’
গানে যুক্ত হয় গিটার। তাথৈ বসে গেলো। জানালা দিয়ে মুখ বের করে অনুসরন করলো গিটারের শব্দকে। ট্রেন কিছুটা বাঁক নিয়েছে। ট্রেনের ভেতরের লাইটগুলো দরজা অবদি যায়। যারফলে তাথৈ স্পষ্ট দেখতে পেলো, সামনের দরজায় নিচেই বসে গেছে তাশদীদ। গায়ে একটা নেভি ব্ল শার্ট। সামনের বোতাম সবগুলো খোলা বলে ভেতরের সাদা টিশার্ট দেখা যাচ্ছে ওর। তাশদীদ কোলে গিটার নিয়ে, হেলান দিয়ে বসে। তালেতালে মাথা নাড়াচ্ছে, গিটার বাজাচ্ছে আর উচ্চস্বরে গাইছে,

‘ফিকে হয়ে আসা অন্ধকার,
প্লাটফর্মে ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাঁড় (ii)
জানলার কাঁচটাতে লেগে থাকা শূণ্যতা
সশব্দে ছুটে চলে ট্রেন!
ফেলে আসা মুখগুলো ভোরবেলায়
লুকোচুরি আর চোর চোর খেলায়(ii)
কুয়োতলা মুখোমুখি জড়তার বাধা ঠেলে
আমাকে কি কিছু বলছেন?
বলতে পারিনি তার যেটুকু যা ভাষা ছিল
কেঁপে ওঠা চোখের পাতায়
তারপর ভোরবেলা ডিঙিয়েছি চৌকাঠ
ভয়ানক সতর্কতায়!
এভাবেও ফিরে আসা যায়,
এভাবেও ফিরে আসা যায়! (ii)

জানালায় দুহাত হাত রেখে তাতে মাথা ঠেকালো তাথৈ। অপেক্ষা করতে লাগলো দ্বিতীয় কোনো বাঁকের। আবারো তাশদীদকে দেখবে বলে। গান শেষ করে তাশদীদ। ওর সামনে টিটু শান্ত বসে আছে। ওদের ক্লাসের মেয়েরা, জুনিয়ররাও গান গাইতে লাগলো। তাথৈ আর তাশদীদের গলা শুনতে পেলো না। একটাসময় দেখলো তাশদীদ ট্রেনের দরজায় পা ঝুলিয়ে বসেছে। কি ভেবে খুশি হয়ে যায় তাথৈ। সিট থেকে উঠে পেছনের দরজায় চলে যায় ও। তুল্য দেখলো ওকে চলে যেতে। তবে শার্লি টের পায়নি। বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও বোনকে ফিরতে না দেখে তুল্য কপাল কুচকালো। হাত বাড়িয়ে একটা চড় লাগালো শার্লির মাথায়। চমকে ওঠে চোখ মেলে শার্লি। তুল্য বললো,

– তোর বান্ধবী কোথায় গেলো?

শার্লি কানে না শুনেও ঠোঁট নাড়ানো দেখে বুঝলো তুল্য কি বলেছে। পাশে তাকিয়ে দেখে তাথৈ নেই। কান থেকে হেডফোন নামিয়ে পিছনের দরজায় চলে আসলো ওউ। এসে দেখে তাথৈ একহাতে দরজার হাতল ধরে চলন্ত ট্রেনে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। চোখ বন্ধ করে যেনো গায়ে লাগা বাতাস অনুভব করছে সে। শার্লির চোখ কপালে উঠলো। চেচিয়ে উঠে পা ধরে টান মারে তাথৈয়ের। ওকে পিছিয়ে এনে উচ্চস্বরে বলে,

– কি করছিস টা কি তুই? পাগল হয়ে গ্…

তাথৈ জবাব দিলো না। নিজেনিজেই চুপ করলো শার্লি। তাথৈ আবারো এগিয়ে গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসলো। দরজার হাতল ধরে, পূর্বের মতোই চোখ বন্ধ করে নিয়ে বললো,

– এই বাতাস তাশদীদকে ছুঁয়ে আসছে শার্লি। আমি ওদের উপভোগ করতে চাই, অনুভব করতে চাই। কিছু হবে না আমার। লেট মি বি।

শার্লি বিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইলো তাথৈয়ের দিকে।
এতো প্রেম! এতো ভালোবাসা! হুট করে ভেতরটা চমকে ওঠে শার্লির। অজান্তেই ওর মন বলে ওঠে, ‘যে প্রেম এমন, তার পরিণয়টা যেনো আঘাতের না হয়। তাথৈ ভালোবেসে ভালো থাকুক। যে কোনো মূল্যে!’

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here