#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৩০.
ঠিক দুপুর বারোটায় অম্বুনীড়ে ঢুকলো তাথৈ। বাসায় ঢুকেই ড্রয়িংরুমের সোফায় মাকে বসে থাকতে দেখে দাড়িয়ে গেলো ও। ভদ্রমহিলার পরনে পাতলা মেরুন শাড়ি, হাতাকাটা ব্লাউজ। কিছুটা দুরেই তৈয়ব আলফেজ পায়চারি করছেন। একহাতে সিগারেট ধরে আরেকহাতে মোবাইল স্ক্রল করছেন তিনি। তাথৈকে দেখে ওর মা দাঁড়িয়ে গেলো। হাসিমুখে এগিয়ে এসে, তাথৈয়ের মুখের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো,
– এসে গেছো তুমি? কেমন আছো বেইবি? ট্যুর কেমন…
– দুরে থাকুন।
একপা পিছিয়ে বললো তাথৈ। ওর এমন শক্ত ব্যবহারে মহিলার হাসি কমে আসছিলো। তবুও জোরপুর্বক হাসলো সে৷ তৈয়ব আলফেজ মেয়ের গলা শুনে তাকিয়ে দেখলেন তাথৈ ফিরেছে। ফোন নামিয়ে সিগারেটে টান দিলেন উনি একটা। তাথৈ একপলক বাবার দিকে তাকিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াচ্ছিলো। তৈয়ব আলফেজ বললেন,
– দাড়াও তাথৈ।
– টায়ার্ড আমি। মেলোড্রামা চাইছি না।
সিড়িতে দাড়িয়ে, কিঞ্চিৎ ঘাড় ঘুরিয়ে জবাব দেয় তাথৈ। তৈয়ব আলফেজ সিগারেট শেষ করলেন। এ্যাশট্রেতে সিগারেটের শেষটুকো রেখে এগিয়ে এসে বললেন,
– আমিও চাইছি না। তোমার জন্মদাত্রী তোমাকে কিছু বলতে চায়। তার কথা শুনে, তাকে বিদায় দিয়ে, দেন গো হোয়ারএভার ইউ ওয়ান্ট।
বাবার গম্ভীর কথাগুলো তাথৈ ফেলনা করে দিতে পারলো না। পেছন ফিরে মাকে বললো,
– কি চাই?
মহিলা আবারো হেয়ালী হাসি ফুটালেন ঠোঁটে। তার ধূর্ত মুখ দেখে হাত মুঠো করে নিলেন তৈয়ব আলফেজ। ঘুম থেকে উঠে প্রাক্তন স্ত্রীকে দেখে পায়ের তলা রি-রি করে উঠেছিলো তার। যে স্ত্রী কিনা টাকার লোভে ডিভোর্সপেপারে সই করে তাকে ছেড়ে গিয়েছিলো, এতোগুলো বছর পর তাকে দেখে অতিকষ্টে নিজেকে সামলেছেন তিনি। শুধুমাত্র তর্কে যাবেন না বলে ওই মহিলাকে অম্বুনীড়ে ঢুকতেও দিয়েছেন। মা হিসেবে তার অধিকার আছে নিজের সন্তানদের সাথে দেখা করার। তাথৈয়ের ফেরা অবদি ধৈর্য্যও রেখেছেন। তিনি জানেন, তাথৈ কখনোই ওর মায়ের কথাকে গুরুত্ব দেবে না। বরং এতোদিন পর ফিরে আসা মাকে নিসন্দেহে অপমান করবে। আর সেটাই হবে ওই মহিলার মুক্ষম প্রতিত্তোর। ভদ্রমহিলা তাথৈয়ের দিকে এগোলেন। তাথৈয়ের ‘কি চাই’ প্রশ্নের জবাবে একটা গা-জ্বালানো হাসি দিয়ে বললেন,
– তোমাকে।
তাথৈয়ের কপাল কুঁচকে আসলো। কথাটা শুনে বাবার দিকে তাকালো ও। তৈয়ব আলফেজ নিজেও অবাক। তিনি ভেবেছিলেন তার প্রাক্তন স্ত্রী কেবল ছেলেমেয়ের সাথে দেখা করার জন্যই এসেছে। কিন্তু সে যে তাথৈকে দাবী করে বসবে, এমনটা ধারনা করেননি তিনি। নিজের বিস্ময় সামলে তৈয়ব আলফেজ গম্ভীর স্বরে বললেন,
– মানে কি?
– আমি তাথৈকে আমার সাথে নিয়ে যেতে চাই তৈয়ব। আজ থেকে ও আমার সাথেই থাকবে।
– কি বলছো টা কি তুমি?
হুংকার ছাড়লেন তৈয়ব আলফেজ। তবে তার ধমক ভদ্রমহিলা গায়ে মাখলেন না। গায়ে মাখালে চলবে না তার। কেননা তাথৈকে তার প্রয়োজন। কোনোরুপ ভনিতা না করে ভদ্রমহিলা বেশ স্বাভাবিক স্বরে বললেন,
– দেখো তৈয়ব, তুল্য-তাথৈ আমার গর্ভজাত। এতোগুলো বছর আমি দেশে ছিলাম না, তুমি ওদের দেখাশোনা করেছো। কিন্তু এখন যেহেতু আমি দেশে, আমি চাইছি ওদের একজনের দায়িত্ব নিতে। ভেবে দেখলাম তোমার নিজের ব্যবসা আছে, উত্তরাধিকার হিসেবে তুল্যকে তোমার প্রয়োজন। তাই ওকে নিয়ে কিছু বলছি না। কিন্তু তাথৈয়ের কাস্টাডি আমি নেবো। তাথৈ এখন থেকে আমার কাছেই থাকবে। ইভেন আজ থেকেই ও আমার কাছে থাকবে। আমি ওকে নিতে এসেছি।
তৈয়ব আলফেজ নিজের কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কতোটা নির্লজ্জ হলে কোনো মা তার সন্তানদের ছেড়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে এমন দাবী করতে পারে তার জানা নেই। বাসায় ঢুকে এমন কথা শুনে পায়ের গতি কমে আসে তুল্যর। চোখ বুলিয়ে বাবা-বোনের প্রতিক্রিয়া পরখ করলো ও। স্টেশন থেকেই ও সরাসরি বুজোকে আনতে গিয়েছিলো। বাসায় ঢুকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শুরু বোঝার চেষ্টা করতে লাগলো তুল্য। বুজো ওর কোল থেকে নেমে ছুট লাগালো৷ সোজা কয়েকসিড়ি বেয়ে উঠে তাথৈয়ের পা শুকতে লাগলো ও। বুজোকে দেখে ভদ্রমহিলা উৎসাহে বললো,
– আরে বুজো! ও তোমার কাছে ছিলো তাথৈ?
তাথৈ জবাব দিলো না। দাঁতে দাঁত চেপে, শক্তমুঠো করে সিড়ির হাতল আঁকড়ে ধরে আছে ও। মহিলা বুজোকে কোলে তুলে নিলেন। আদুরে গলায় বললেন,
– ও মাই বেটা! কোথায় ছিলে তুমি? কতো খুজেছি তোমাকে! চলো বাসায় যাবো আমরা।
বুজো শরীর মোচড়াচ্ছে। থাকতে চাইছে না তার কোলে। ভদ্রমহিলা ছেড়ে দিলো বুজোকে। ও আবারো গেলো তাথৈয়ের পায়ের নিচে। মহিলা হেসে বললো,
– আচ্ছা বাবু, তাথৈয়ের কাছেই থেকো তুমি। আমরা একসাথে থাকবো সবাই ওকে?
বুজো তাথৈয়ের পায়ের আশপাশে ঘুরতে থাকে। ভদ্রমহিলার কথা-তামাশা সহ্য হলো না তুল্যর। সোজা বাবার দিকে এগোলো ও। হাত বাড়িয়ে মাকে দেখিয়ে বললো,
– এই মহিলা অম্বুনীড়ে কেনো? আপনার কি আবার নতুন করে সংসার গড়ার শখ হয়েছে মিস্টার আলফেজ? ইনি…
তৈয়ব আলফেজ এমনিতেও রেগে ছিলেন৷ ছেলের কথায় তিনি জ্বলে উঠলেন আরো। তুল্যর দিকে ভয়ানক চাওনি রেখে, ওর নাম ধরে গর্জন তুললেন অম্বুনীড়ে। একপ্রকার কেপে ওঠে অম্বুনীড়। তুল্যও এই প্রথমবার বাবার ধমকে ভয় পেয়ে যায়। বিচলিত হয়ে পরে কিছুটা। তৈয়ব আলফেজ ওর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাথৈয়ের দিকে তাকালেন। স্পষ্ট গলায় বললেন,
– আর তুমি! তুমি চাইলেই ওর সাথে চলে যেতে পারো। কিন্তু একটা কথা মাথায় রেখো তাথৈ! ওর সাথে গেলে তুমি আলফেজ গ্রুপের কিছুই পাবে না! এই সম্পত্তির এক কানাকড়িও তোমাকে দেবো না আমি!
– তার প্রয়োজনও হবে না তৈয়ব। তাথৈয়ের মায়ের তোমার চেয়ে কোনোঅংশে কম নেই যে ওকে তোমার সম্পত্তির আশা করতে হবে।
স্ত্রীর উচ্চস্বরের জবাবে আরো ক্ষেপে যান তৈয়ব আলফেজ। জবাব দিতেই শুরু হয় তাদের কথা কাটাকাটি। তুল্য মা-বাবার ঝগড়া ছাপিয়ে বোনের দিকে তাকালো। এতোক্ষণ অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাবার কথার যেনো গায়ের জোর কমে এসেছে তাথৈয়ের। দুনিয়ার সবচেয়ে অসহায় মেয়ের মতো দেখাচ্ছে ওকে। যার মা নিজের উদ্দেশ্যের জন্য ওকে নিয়ে যেতে চাইছে, আর বাবা সম্পর্কের পরোয়া না করে সম্পত্তির দোহাই দিচ্ছে। শক্ত চোখমুখ নেতিয়ে পরেছে তাথৈয়ের। বাবার দিকে অসহায়ের মতো করে তাকিয়ে আছে ও। তুল্য স্পষ্ট দেখলো, তাথৈয়ের চোখ জলে ভরা। সে চোখজোড়া চেচিয়ে বলছে, ‘আমাকে কি কেবল সবার উত্তরাধিকার বানাতেই দরকার? আমার প্রয়োজনীয়তা এটুকোই?’ চোখ বেয়ে টুপ করে একফোঁটা জল গরায় তাথৈয়ের। তৎক্ষনাৎ হুশে ফেরে ও। একটা দম নিয়ে আবারো নিজেকে শক্ত করে সিড়ি থেকে নেমে আসলো। তারপর সিড়ির পান্তে থাকা ফুলদানীটা তুলে আছাড় মারলো।
ভাঙার আওয়াজ শুনে থেমে যান তৈয়ব আলফেজ আর তার মিসেস। তাদের থামতে দেখে তাথৈ মায়ের দিকে এগোলো। অতি শান্তশিষ্টভাবে বললো,
– আমি আপনার সাথে যাচ্ছি না।
– তাথৈ…! এ্ এ কি বলছো তুমি বেইবি? মমির সাথে চলো? আমি অনেক আদর করবো তোমাকে। তুমি *** ইন্ডাস্ট্রিজের নাম শুনেছো তো। ওটার ফিফটি পার্সেন্ট হোল্ডার আমি তাথৈ! আই হ্যাভ মাচ মোর দ্যান ইউর ড্যাড বেইবি। আর আমার সবই তো তোমার। চলো তুমি? আমার…
– গেট আউট।
তাথৈয়ের বলা এই দুইশব্দে অনর্গল বলতে গিয়ে থেমে যায় ভদ্রমহিলা। অবিশ্বাসে চেয়ে রয় তাথৈয়ের দিকে। তাথৈ তেমনি শান্ত ভঙ্গিতে বললো,
– আপনি ভদ্রভাবে না বেরিয়ে গেলে আমি অভদ্রতা দেখাতে বাধ্য হবো। এন্ড ট্রাস্ট মি, তৈয়ব আলফেজের সংবরনশক্তির চেয়ে তাথৈ আলফেজের ক্ষোভ কয়েকসহস্র গুন বেশি। দেখাতে শুরু করলে আপনি টলারেট করতে পারবেন না।
ভদ্রমহিলা চুপ করলেন। সাথে রাগও করলেন। মেয়ের অবাধ্যতা আগেও দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু আজ সেই মেয়ে তাকে ধমকিও দিচ্ছে, অপমানও করছে। তুল্য বিশ্বজয়ের হাসি দিলো একটা। ওর মা যে ওর বিষয়ে কিছু ভাবেনি এ নিয়ে ওর আফসোস নেই। বরং কিছু বললেই আজ ও কান্ড ঘটিয়ে দিতো। ডাইনিং টেবিল থেকে একগ্লাস পানি খেলো তুল্য। তারপর চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আঙুর চিবোতে লাগলো। তাথৈ বাবার সামনে গিয়ে বললো,
– আলফেজ গ্রুপের কানাকড়ির লোভে আমি আমার গর্ভধারীনী মা কে ত্যাগ করলাম ড্যাড। ধন্য তোমার শিক্ষা। টাকার লোভে আমি সব ছাড়তে পারি।
তাথৈ নিজের ঘরে চলে আসছিলো। কিন্তু বুজো আবারো ওর পা আগলে দাড়ায়৷ প্রথমবারের মতো তাথৈ বুজোর দিকে নমনীয়ভাবে তাকালো। মাকে বললো,
– আর হ্যাঁ! বুজোও আর আপনার কাছে ফিরছে না! তাথৈ, বুজো কেউই আপনার খেয়ালী ইচ্ছার দাস দাসী না যে যখন আপনার খুশি তখন আপনার কাছে থাকবে, যখন আপনার ভাল্লাগবে না তখন অন্য কোথাও। কাম বুজো।
সিড়ি বেয়ে ওপরে চলে যায় তাথৈ। বুজোও ওর সাথে দৌড়াতে দৌড়াতে চলে গেলো৷ তৈয়ব আলফেজ ক্লান্ত পায়ে সোফায় এসে আয়েশে বসলেন। পুনরায় সিগারেট ধরিয়ে তাতে কয়েকটান দিলেন। ধোয়া ছেড়ে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
– তোমার মাতৃত্ববোধ তো কাজে লাগেনি। এখন কি করবে?
ভদ্রমহিলা এমনিতেও রাগে, দুঃখে, অপমানে ফুসছিলেন। স্বামীর কথায় তারদিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুড়লেন তিনি। বললেন,
– যেকরেই হোক, তাথৈকে আমি নিয়ে যাবো তৈয়ব। ওর জন্য এরচেয়ে বেশি লাক্সারিয়াস একটা ভবিষ্যৎ ভেবেছি আমি। আর তার জন্য যা করার, আমি সেই ব্যবস্থাই করবো।
মহিলা হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো। কিন্তু তার বলা ‘বেশি লাক্সারিয়াস ভবিষ্যৎ’ কথাটা তৈয়ব আলফেজের কানে বাজছে। টাকাপয়সায় কোনোদিকে কমতি নেই তাথৈয়ের। তাহলে ওই মহিলা ভবিষ্যৎ বলতে কি বুঝালো? তুল্য আঙুল দিয়ে দাঁত খোচাতে খোচাতে বাবাকে বললো,
– সম্পত্তির কথা তাথৈকে না বললে চলছিলো না?
– তোমাদের ও ছাড়া আর কোনো পিছুটান আছে?
একপলক চোখ তুলে বাবার দিকে তাকালো তুল্য। সে চোখে যেনো বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে না পারার কষ্ট, ভালোবাসা প্রকাশ না করার পিছুটান। তৈয়ব আলফেজ বুঝলেন, সে দৃষ্টিতে আবেগ লেখা ছিলো। তবুও মানলেন না। সোফায় রাখা কোটটা তুলে অম্বুনীড় থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনিও।
•
বাসায় আসতেই তাশদীদের ব্যাগ খুলে বিছানায় ছড়িয়ে বসেছে তামজীদ। কক্সবাজার থেকে ভাই কি কি এনেছে সব বের করে দেখছে ও। মিসেস ওয়াসীর খাবারের ট্রে হাতে করে রুমে ঢুকে দেখলেন তাশদীদ রুমে নেই। তবে ওয়াশরুম থেকে কল ছাড়ার আওয়াজ আসছে। মিসেস ওয়াসীর টেবিলে খাবার ট্রে টা রাখলেন। ছোটছেলেকে শাষনের স্বরে বললেন,
– এসব কি তামজীদ? তোর এখনই এসব বের করা লাগবে? ছেলেটা আমার ফ্রেশ হয়ে এসে যে বসবে, সে জায়গাটাও রাখিস নি!
তামজীদ চকলেট একটা ছিড়ে খেতে লাগলো। আরেকহাতে আরেকটা পাপড়ির প্যাকেট ছিড়তে ছিড়তে বললো,
– তোমার ছেলের চয়েজ ভালো। ভালোভালো জিনিসই এনেছে।
– সেটা আপনাকে বলতে হবে না। এইযে যে কয়েকটা মুখে পুরেছেন, এক্ষুণি এসব নিয়ে বিদেয় হন। ছেলেটা আমার ক্লান্ত! ও এসে একটু রেস্ট…
মিসেস ওয়াসীর বিছানা গোছাতে লাগলেন। তাশদীদ গোসল শেষে শুধু ট্রাউজার পরে খালি গায়ে রুমে ঢুকলো। মাথায় তোয়ালে চালিয়ে বসে গেলো টেবিলে। মায়ের আনা খাবার খেতে খেতে বললো,
– বাবা কোথায় মা? কলেজে?
– হুম।
– তোমার শুটকির ব্যাগটা পেয়েছো? ওটা আমি আলাদা এনেছিলাম।
মিসেস ওয়াসীর বিছানা গুছিয়ে ছেলের কাছে আসলেন। তাশদীদের মাথা ঠিকঠাক মুছতে মুছতে বললেন,
– হ্যাঁ পেয়েছি। তুই বল, কেমন কাটলো তিনদিন?
– ভালোই কেটেছে। বাট মিসড ইউ।
মিসেস ওয়াসীরকে যাত্রাবর্ণন শুনাতে লাগলো তাশদীদ। তামজীদ মা ভাইয়ের কথোপকথনে মনোযোগী হলো না। ব্যাগের বোতল রাখার জায়গাটায় হাত ঢুকিয়ে একটা বোতল খুজে পেলো ও। ভেতরে শেওলা সদৃশ কিছু দেখা যায়। তামজীদ বোতল পরখ করে বললো,
– কিরে ভাইয়া? শুনেছি তুই নাকি নিজেই ব্রিলিয়ান্ট। এখন তোরও কারো পা ধোঁয়া পানি লাগে নাকি?
খাওয়া থামিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালো তাশদীদ। হিসেব করে দেখলো, সত্যিই বোতলের পানিটা কারো পা ধোঁয়া পানি। কথা না বাড়িয়ে বললো,
– তুই ঠিক কি খুজছিস আমার ব্যাগে?
– তোর ফোন। ছবি দেখা!
তাশদীদ টেবিল থেকে ফোনটা ছুড়ে মারে তামজীদের দিকে। তারপর খাওয়ায় মনোযোগী হয়। মিসেস ওয়াসীর ভেজা তোয়ালে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। এরমাঝেই তামজীদ ফোনের দিকে তাকিয়ে চেচিয়ে বলে ওঠে,
– ও মা! দেখো তোমার বউমা!
•
বেলা এগারোটার ঝলমলো রোদ সুইমিংপুলের নীল পানিতে পরে ওর চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে। টাইলসকৃত কিনারায় ডানহাতে মাথা ঠেকিয়ে উপুর হয়ে শুয়ে আছে তাথৈ। পলকহীন চোখে সেই রোদ দেখছে আর বা হাতের আঙুলে পানির ওপরিভাগে আঁকিবুকি করছে ও। মাঝেমাঝে ঘাসের মাঝখান থেকে ছোটছোট বুনোফুল পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। দুদিন অম্বুনীড় থেকে বেরোয়নি ও। বাবা-ভাইকে এড়িয়ে বুজোকে নিয়ে আনমনে বসে থেকেছে কেবল। কল্পনায় বেচে থাকাকে প্রাধান্য দিয়েছে। তাথৈয়ের মনে হলো এই নীল পানির উচিত ওকে সমুদ্রকে মনে করানো, এই রোদের উচিত দুদিন আগের সেই সূর্যোদয়কে মনে করানো, এই ভাসমান ফুলগুলোর উচিত সেই সোনালু ফুলের কথা মনে করানো, এই প্রতিফলনের উচিত সেই ঝুলতে থাকা আয়নাগুলোকে মনে করানো। কিন্তু তার কোনোটাই হচ্ছে না। সমুদ্রের পরিবর্তে তাশদীদের উচ্ছলতা ওর চোখে ভাসছে। ঝলমলো সূর্যোদয়ের পরিবর্তে তাশদীদের অবয়ব ওর সামনে ফুটে উঠছে। ওই সোনালু ফুল, আয়না, বায়োলুমিনেসেন্স সবকিছু ভুলিয়ে দিয়ে ওর চারপাশে কেবল তাশদীদ আর তাশদীদ। বুজো পানি থেকে দুরে, তবে ওর আশেপাশেই ঘুরঘুর করছিলো। তাথৈ পানিতে আঙুল চালিয়ে বললো,
– হোয়াট ডু ইউ থিংক বুজো? আমার রুক্ষ জীবনে এই শীতলতা ঠিক কেনো এসেছে? আমাকে ডুবাতে নাকি ভাসাতে?
বুজো জবাব দেয়না। ও ঘাস শুকছে আর ছোটাছুটি করছে। তাথৈ এবার ঘাসের মাঝে চিৎ হয়ে শুয়ে পরলো। প্রকট রোদের দিকে তাকিয়ে হাতে আড়াল করলো রোদ। আঙুলের ফাঁকফোকরে রোদ মুখে মেখে বললো,
– আচ্ছা বুজো? এই রোদ এতো সুন্দর কেনো? এই সুন্দর রোদ কি আমাকে ঝলমলে করে তুলতে এসেছে? নাকি ঝলসাতে এসেছে?
বুজো এবারেও জবাব দেয়না। তাথৈ পাশ ফিরলো। কানে,মুখে ঘাসের ডগা লেগে শিরশির করে ওঠে ওর। দুহাত কানের নিচে নিয়ে কাৎ হয়ে শুয়ে পরলো তাথৈ। বললো,
– এইযে ঘাসেরা আমার শিহরনের কারন, ওরা কি৷ কখনো আমাকে আঘাত করবে বুজো?
বুজো এবারে এগিয়ে আসলো তাথৈয়ের কাছে। তারপর নিজেও ঘাসের মধ্যে গরাগরি দিতে লাগলো। তাথৈ মৃদ্যু হাসলো। এরমাঝেই আওয়াজ আসলো,
– কি হইছে তোমার মনি? এইহানে ক্যান তুমি?
তাথৈ ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকালো। দাড়োয়ান দেলোয়ার হোসেন একটা গাছসহ টব আর শাবল হাতে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছেন ওর দিকে। তাথৈ উঠে হাটু জরিয়ে বসলো। সুইমিংপুলের পানির দিকে তাকিয়ে একদন্ড চুপ থেকে বললো,
– কখনো প্রেমে পরেছো চাচা?
দেলোয়ার হোসেন শব্দ করে হেসে ফেললেন। হাতের টবটা নিয়ে রাস্তার একপাশে রেখে বললেন,
– আমাগো সময়ে কি প্রেম করার চল ছিলো নাকি মনি? বাপু বগলে কইরা নিয়া গেলো বিয়া করাইতে, ব্যস! বিয়া কইরা ফেললাম তোমার চাচীরে। প্রেম করিনাই। তয় হ, বিয়ার পর অনেক ভালোবাসছি তোমার চাচীরে। এহনো বাসি।
– কি করে বুঝলে ভালোবাসো?
তাথৈ পুতুলের মতো পাশ ফিরে শুধায়। দেলোয়ার হোসেন শাবল দিয়ে মাটি খুড়তে খুড়তে বললেন,
– তোমার চাচী তো ছোটমানুষ আছিলো। বুঝতোসুজতো কম। আমার মা-বাপুর লগে থাকতো গেরামে। আর আমি শহরে। একবার গেরামে ফেরার সম তোমার চাচীর লাগি একমুঠো চুড়ি আর চুলের ফিতা কিনছিলাম। ওয়ে সেকি খুশি! জানো মনি? ওর খুশি দেইখা আমার তহন মনে হইলো, ওরে খুশী দেখলে আমার খুব শান্তি লাগে৷ তারপর থাইকা আমি সবসময় চেষ্টা করি ওরে একটু খুশী রাখার। তোমার চাচী খুব অল্প জিনিসেই খুশি হইয়া যায়। এইযে ওরে খুশি দেখলে আমার শান্তি লাগে, আমার কাছে এইডাই ভালোবাসা। ভালো না বাসলে অন্য আরেকটা আত্মার খুশিতে আমার আত্মায় এতে শান্তি কেমনে আসে কওতো! এইডা ভালোবাসা না তো কি?
দেলোয়ার হোসেন নিজের কাজে ব্যস্ত রইলেন। তাথৈ আস্তেধীরে উঠে দাড়ায়। মৃদ্যুমন্দ পায়ে নিজের ঘরে চলে আসে। আজোবদি ওর জীবনের একমাত্র প্রাধান্য ছিলো পড়াশোনা। সেই পড়াশোনাতেও ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু ভাবেনি। অথচ আজ ওর ভাবনাজুড়ে তাশদীদ। আর সে ভাবনাদের একটাই মন্তব্য, ‘তাশদীদ ওর শান্তি। তাশদীদ ওর ভালোবাসা।’
বুজো করিডোর দিয়ে হেলতেদুলতে তাথৈয়ের রুমের দিকে এগোচ্ছিলো। তুল্য কোত্থেকে এসে ওর সামনে কোমড়ে হাত দিয়ে দাড়িয়ে গেলো। কপাল কুচকে বললো,
– কি জনাব? ব্যস্ত আপনি? দুদিন হলো দেখছি শুধু তাথৈয়ের কোলে চড়ে বেড়াচ্ছেন, আমাকে চিনছেনই না! কাহিনী কি?
বুজো লেজ নাড়তে নাড়তে ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তুল্য বোধহয় জবাব পেয়ে গেলো। কিছু না বলেও বুজো যেনো ওকে শেষলাইনটাই বলে গেলো। ‘কে তুমি? তোমাকে তো আমি চিনি না।’
#চলবে…

