কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ৩১.

0
419

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

৩১.

মোবাইলে থাকা তাথৈয়ের তিনটি ছবি কয়েকবার ঘুরেফিরে দেখলো তাশদীদ। এই ছবি নিয়ে তামজীদ কতো আকাশকুসুম ভেবে নিচ্ছিলো ভেবে মুচকি হাসলো ও। তামজীদ ছবিগুলো মিসেস ওয়াসীরকেও দেখাতে যাচ্ছিলো। কিন্তু মিসেস ওয়াসীর আগে তাশদীদের চেহারা পরখ করলেন। ছবিটা যে রাতের আধারে সমুদ্রের পানিতে থাকা তাথৈয়ের ছিলো, তা বুঝতে তাশদীদের সময় লাগেনি। তবুও বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া না করে খাওয়ায় মনোযোগী হলো ও। জবাব দিলো,

– ফোনে অনেকেই ছবি উঠেছে। তোমার ছোটছেলের বোধহয় কাউকে মনে ধরেছে দেখো।

– খেয়ে রেস্ট নে।

মিসেস ওয়াসীর মুচকি হেসে বেরিয়ে যান। তামজীদ ওনাকে আবারো ডাক লাগাতে যাচ্ছিলো। তাশদীদ খাওয়া ছেড়ে চেয়ারের পেছনের দিকটায় হাত ঠেকালো। ওকে ওভাবে তাকাতে দেখেই ফোকলা হাসি দিলো তামজীদ। ও জানে, তাশদীদের এই চাওনির মানে, ‘এদিকওদিক কিছু বলবি, তো আমার দুইমিনিট লাগবে না তোকে পুকুরে ছুড়তে।’ ঠোঁটের জোরালে হাসিটা বাড়ালো তামজীদ। বিরবিরিয়ে উঠে এসে ফোনটা তাশদীদকে ফেরত দিয়ে দিলো ও। আমতা আমতা করে বললো,

– ইয়ে, আপুটার নাম কিরে ভাইয়া? তোর ফোনে এই আপুর ছবি কি করে?

– ওর ফোনের ক্যামেরা খারাপ তাই আমারটায় ছবি তুলে দিতে বলেছিলো। ছবি তুলে দিয়ে আর ডিলিট করার সময় পাইনি। আরকিছু?

এমন স্পষ্টভাবে মিথ্যেটা বলে নিজেই অবাক হলো তাশদীদ। তবে সেটা প্রকাশ করলো না। তামজীদ ভাইয়ের বলা প্রতিটা বর্ণ সত্যি মেনে নিলো। এবার ওর ঠোঁটে সত্যিকারের হাসি ফুটলো। তবুও ভাইয়ের সামনে কিছুটা জড়তা দেখিয়ে বললো,

– ইয়ে ভাইয়া? একটা আবদার করি?

– কি?

– ছবিটা ডিলিট করিস না। আপুটাকে আমার সত্যিই পছ্…

তামজীদ কথা শেষ করতে পারেনা। ওর চোখে পরে তাশদীদ টেবিলের স্কেলটার দিকে বা হাত বাড়িয়েছে। তামজীদ আর একমুহূর্ত দাড়ায় না রুমে। একছুটে বেরিয়ে যায়। তাশদীদ আরেকদফা ফোনের ছবিগুলো দেখে মুচকি হাসলো। তিনটে ছবি খুব আহামরি ক্ষতি করবে না ওর ফোনের। কিন্তু তাথৈ এগুলো দেখলে খুশি হয়ে যাবে নিশ্চিত। সময় সুযোগ করে তাথৈকে দিয়ে দেওয়া যাবে, এমনটা ভেবে ফোন সরিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো ও।
একটাদিন বিশ্রাম নিয়ে তাশদীদ রিংকিকে পড়াতে ওর বাসায় গেলো। রোজি মেয়েকে কোলে নিয়ে গেইট খুলে দেয়। ওদের দেখে তাশদীদের হাসিটা আরো বেড়ে যায়। আর রোজীর মনে আরো একবার দীর্ঘশ্বাসেরা উকি দেয়, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসতে জানা মানুষটা আমার না।’ নিজেকে সামলায় রোজি। তাশদীদ ভেতরে ঢুকে ওর মেয়ের গাল আলতোকরে ছুইয়ে দিলো। আদুরে গলায় বললো,

– কেমন আছেন ম্যাডাম? দিনকাল কেমন যাচ্ছে আপনার?

রোজির মেয়েটা ঝকঝকে চোখে চায়, নড়েচড়ে ওড়ে, হাত নাড়ায়। রোজি ওকে ঠিকঠাক কোলে নিয়ে বললো,

– ওর দিনকাল কেমন যাচ্ছে? বলো আমাদের দিনকাল কেমন যাচ্ছে! এইটুকুন মেয়ে! কি পরিমানে যে জেদী হয়েছে তাশদীদ, কি বলবো তোমাকে! তার কান্না উঠলে পুরো বাসা ঝমঝম করে। কিছুতেই থামানো যায় না! এংরিবার্ড একটা!

– নামটা রাখার সময় একটু ভেবেচিন্তে রাখলে মনেহয় এমনটা হতো না।

কপালটা ডলে বিরবিরিয়ে বললো তাশদীদ। রোজির কানে গেলোনা কথাটা। না বুঝে ও প্রশ্নসূচক চেয়ে রইলো তাশদীদের দিকে। তাশদীদ পরমুহূর্তেই হাতে থাকা শপিং ব্যাগটা থেকে কক্সবাজার থেকে আনা শঙ্খটা বের করলো। রোজির মেয়েকে দেখিয়ে বললো,

– এই দেখো ম্যাডাম! কি এনেছি তোমার জন্য!

– আমার জন্য কিছু আনেননি তাশদীদ ভাই?

পাশেরঘর থেকে রিংকি বেরিয়ে আসে। বোনের হেয়ালীতে রোজি নিজেই বিরক্ত হয়। তাশদীদ রিংকিকে হাতের ব্যাগদুটো বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

– সবার জন্যই আছে এতে।

রিংকি শুধু ছোট ব্যাগটা নেয়। ও জানে, ওর জিনিস বড়ব্যাগে নেই। সত্যিই তাই। ব্যাগে দুটো ঝিনুকের মালা। রিংকির মা এসে অন্য বাগটা হাতে নিলো। সেখানে কিছু শুটকি আর শুকনো খাবার। রিংকি মালাদুটো দেখে নিয়ে বললো,

– একই মালা দুইটা এনেছেন যে?

– এ বাসায় আমার বোনও তো দুইটা।

স্পষ্টভাবে জবাব দিলো তাশদীদ। রোজির দিকে তাকিয়ে হেসে বুঝালো, একটা ওর। রিংকি মালা মুঠো করে নেয়। রাগটা পুরোটা ওর গিয়ে পরে রোজির ওপর। ওর জন্যই এই বোন শব্দটা শুনতে হলো ওকে। তাশদীদ কথা শেষ করে রিংকিকে পড়াতে বসলো। পড়তে বসার আগে রিংকি ওকে মালাটা দেখিয়ে বললো,

– পরিয়ে দেবেন?

– না।

এবারেও স্পষ্ট জবাব দেয় তাশদীদ। রিংকি নিজেনিজেই মালাটা গলায় পরে নেয়। ছুটির পড়াগুলো দিয়ে একসময় তাশদীদকে প্রশ্ন করে,

– পরশু সূর্যোদয়টা আপনি কোন জুনিয়রের সাথে দেখেছেন তাশদীদ ভাই?

তাশদীদ ওর খাতা দেখছিলো। চোখ তুলে রিংকির দিকে তাকালো ও। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বুকে হাত গুজে বললো,

– কেনো? সে বিষয়ে তোমার এতো আগ্রহ কেনো?

রিংকি জবাব দেয় না। তাশদীদ একটা ছোট শ্বাস ফেললো। সোজা হয়ে বসে টেবিলে হাত রেখে বললো,

– লিসেন রিংকি, আমি তোমাকে শেষবারের মতো বলছি। আঙ্কেলের রিকুয়েষ্টে আমি তোমাকে পড়াতে আসছি। তাছাড়া তুমিও বলেছিলে তুমি আর এমন কিছু বলবে বা করবে না যাতে আমি এ বাসায় আসা বাদ দেই। এ সপ্তাহে তোমার এডমিশন। সেদিকে ফোকাস করো। বুঝেছো আমি কি মিন করেছি?

রিংকি রোবোটের মতো মাথাওপরনিচ দুলালো। তাশদীদ ওকে পড়ানোতে মনোযোগ দিলো। কিন্তু দৃষ্টিটা খাতার দিকে থাকলেও রিংকির মনটা খাতায় ছিলো না। ওর বিক্ষিপ্ত মনে কেবল এটুকোই, ‘এডমিশন পর আপনার ভার্সিটি আমার হবে কিনা জানিনা, কিন্তু আপনি আমার হবেন তাশদীদ ভাই। ওই একটা সূর্যোদয় আপনি যাকেই দিয়ে থাকেন না কেনো, আপনার জীবনের প্রতিটা সূর্যোদয় আপনার আমাকে দিতে হবে। আমার চাই আপনাকে! ব্যস!’

তুল্য ভার্সিটির সামনের এক টংয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। ওর চোখমুখ বিরক্তিতে কুঁচকানো। সেমিস্টার ফাইনালের পর ছুটি না দিয়ে প্রজেক্টে ঢুকিয়ে দেওয়া কোর্সটিচারকে পারলে এইমুহুর্তে কুচিকুচি করে কাটে ও। ওদের প্রজেক্টটা ডেডলাইনের আগে শেষ হয়নি। এর পুরোটা দায় টিচারের। হেয়ালী করে সে শুরুই করেছে দেরিতে। সেটাও নিজে করছে না। অন্যএক সিনিয়র স্টুডেন্টকে রেখেছে ইনচার্জে। যেখানে সময় লাগবে আরো চারদিন! ছুটির পরিবর্তে চারদিন ক্যাম্পাসে আসতে হবে ভেবে রাগে তুল্যর শরীর জ্বলছে। সিগারেট কয়েকটান দিতেই শেষ হয়ে যায় ওর। সিগারেটের শেষটুকো মাটিতে ফেলে আরেকটা সিগারেট চাইতে যাচ্ছিলো তুল্য। তখনই কানে আসে,

– সেমিস্টার ব্রেক না পাওয়ার রাগ ফুসফুটার ওপর দেখাতে হবে?

তুল্য পেছন ফিরলো। খয়েরীরঙা লং টিশার্ট, জিন্স পরিহিত শার্লি বুকে হাত গুজে ওর পেছনেই দাড়ানো। ছোটছোট চোখ করে ওরদিক চেয়ে আছে। তুল্য গায়ে লাগালো না। সিগারেট হাতে নিয়ে আগুন ধরালো। ধোঁয়া ছেড়ে বললো,

– ফুসফুস ছাড়া আমার আর রাগ দেখানোর জায়গা নেই। হৃদপিণ্ডটা একজন নিয়ে নিয়েছে।

শার্লি আজ লজ্জা পেলোনা। তাথৈ এখনো ক্যাম্পাসে আসেনি। তাই ও তুল্যকে খুজতে টংয়ে চলে এসেছে৷ ধারনা ঠিক ছিলো ওর। তুল্য এখানেই। আপনমনে সিগারেট ফুঁকছে। শার্লি দুইপা এগিয়ে দাড়ালে এবারে। বললো,

– যাকে হৃদপিণ্ড দিয়ে দিলি, তার জন্য সিগারেটটা ছাড়তে পারবি না তুল্য?

– আমি দেইনি। সে নিয়েছে।

– ওই একই হলো। তোর হৃদপিণ্ডটা তার কাছে হলে, তার হৃদপিণ্ডটাও তো তোর কাছে বল? সেটার খেয়াল রাখবি না? সিগারেট ছেড়ে দিতে পারবি না?

‘যে আমার জন্য সামান্য ট্রেনের সিট ছাড়েনি, তার জন্য আমি সিগারেট ছাড়বো?’
ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও জবাবটা এভাবে দিলো না তুল্য। মুখে বললো,

– না!

শার্লি হাল ছেড়ে দেয়। এমন স্পষ্ট জবাবে হয়তো কিছুটা অপমানিতও হয়। এই ছেলের কাছে ঠিকঠাক জবাব আশা করাটা ওর উচিত হয়নি। আশপাশ দেখে ও বেরিয়ে আসে টং থেকে। শার্লি কিছুটা দুর যেতেই সদ্য ধরানো সিগারেটটা ফেলে দিয়ে পায়ে পিষলো তুল্য। কিন্তু ওর সে মনোভাব দশ সেকেন্ডের জন্যও স্থায়ী হলোনা। আবারো তেজ নিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরালো ও। অস্থিরচিত্ত্বে পেছন ফিরে দৃষ্টি সরালো। ঠিক শার্লি বেরিয়ে যাওয়ার সময়ই শান্ত আর টিটু টংয়ে ঢুকছিলো। আর তুল্য স্পষ্ট দেখেছে, শান্ত শার্লির দিকে তাকিয়েছে। ওদের দুজনের চোখাচোখি হয়েছে।

তাথৈ পার্কিং এরিয়ায় গাড়ি থামিয়ে গাড়ি থেকে নামলো। গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে চোখের সানগ্লাসটা খুললো ও। তারপর হাটু অবদি টপসটার পকেটে দুহাত গুজে, চুইংগাম চিবোতে চিবোতে বাস্কেটবল কোর্টের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। গাড়ির ভেতর থেকে বুজো ডেকে ওঠে। দরজা খোলা রেখে তাথৈ এগোয় ফাঁকা কোর্টের দিকে৷ বুজো ওর পেছনপেছন নেমে আসে। বেলা বারোটার রোদে দাড়িয়ে তাথৈ ওপরের বাস্কেটটা দেখতে থাকে। তারপর একপাশে রাখা বলগুলো থেকে একটা হাতে নেয়। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে থাকে বলটা। আফিফ ওখান দিয়েই পাশ কাটাচ্ছিলো। তাথৈকে বল হাতে নিতে দেখে কোর্টে ঢোকে ও। টিপ্পনী কেটে বলে,

– বাস্কেটবল মেয়েদের জন্য না। দে বল দে!

তাথৈ জবাব না দিয়ে আঙুলে বল ঘোরালো। পরমুহূর্তেই আফিফের মাথা বরাবর বলটা মারলো। বলটা আফিফের মাথায় ড্রপ দিয়ে সোজা গিয়ে বাস্কেটে পরে। তখনই ওখানে আসে শার্লি। ঘটনা দেখে শব্দ করে হেসে দেয় ও। হচকিয়ে যায় আফিফ। বুজো তাথৈয়ের বসে ছিলো। বল বাস্কেট হতে দুবার আওয়াজ করে ও। আফিফ মাথায় হাত দিয়ে পেছন ফেরে। টের পায় কি ঘটেছে। তাথৈ দুইপা এগোলো ওর দিকে৷ চোখমুখে তীব্র অহম নিয়ে বললো,

– তুই এখনো চিনিস নি আমাকে আফিফ। তাথৈ আলফেজের যাতে ইন্টারেস্ট জুড়ে যায়, তার জন্য ও সব পারে!

আফিফ চোখমুখ শক্ত করে দাড়িয়ে রইলো। শার্লি এগিয়ে আসলো ওদের দিকে। তাথৈকে বললো,

– সিআর সবাইকে ল্যাবে ডাকছে। চল।

তাথৈ একটা চাওনি রেখে চলে যায়। ও চলে গেলে রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে আফিফের। রাগের বশে মনেমনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে বসে ও, ‘তাহলে একদিন তোর ওই ইন্টারেস্টের জিনিসটাতেই আমি কালি লেপে দেবো তাথৈ আলফেজ। তৈরী থাকিস!’
শার্লি-তাথৈ ল্যাবে ঢুকলো। তাথৈ ভেতরে চোখ বুলিয়ে বুঝলো, তাশদীদ এখনো আসেনি। আলো এগিয়ে এসে ওকে একটা খাতা দেখিয়ে বললো,

– দেখোতো তাথৈ, এখানকার কোনো রিয়্যাকটেন্ট ভুল আছে কিনা? আমার কিছুতেই মডিফিকেশন হচ্ছে না।

শার্লি চোখ উল্টে গিয়ে ওদের গ্রুপের টেবিলের সামনে দাড়ালো। এই পড়াশোনা ওর কর্ম না। তাথৈ মনোযোগ দিয়ে দেখলো আলোর খাতাটা। তুল্য সেসময়েই ভেতরে ঢোকে। আলো-তাথৈকে পাশ কাটানোর সময় আলোর খাতায় চোখ যায় ওর। সোজা চোখ পরে ভুলটায়। তুল্য ওদের পাশ কাটাতে কাটাতে বললো,

– লাস্ট রিয়্যাকশনে ইনচার্জ পটাশিয়াম ইউজ করতে বলেছিলো। বইয়ে সোডিয়াম দিয়ে করা। আপনিও ম্যাডাম সোডিয়াম লিখেছেন।

জবাব শুনে আলোকে খাতাটা ফেরত দেয় তাথৈ। আলো খাতা নিয়ে নিজের টেবিলে চলে আসে। তুল্যর এই ছোটছোট জবাব, ডাক, আশেপাশে থাকাতে ওর মন যেনো প্রজাপতির মতো ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। ও অনেক চেষ্টা করেছে নিজেকে স্বাভাবিক করার। পারেনি। পারছে না। শার্লি দাঁতে নখ কাটতে কাটতে তাথৈকে বললো,

– তোরা তিনটা কোন ভাষায় পড়াশোনা করিস রে তাথৈ? আমার কিছুই বুঝে আসেনা কেনো বলতো?

তাথৈ জবাব দিলো না। নিজের খাতা বের করতে ব্যস্ত ছিলো। শার্লি বললো,

– এবারও আলোর পরীক্ষা বেশ ভালো গেছে। পারবি ওকে টপকাতে?

– আলো কোনোকালেই আমার কম্পিটিটর ছিলো না। বরং ওই সেই একমাত্র মেয়ে, যারজন্য আমি কম্প্রোমাইজ করতে পারি।

তাথৈ তেমনি ব্যস্ত থেকে জবাব দিলো। টেবিলে থাকা যন্ত্রটায় হাত দিয়েছে ও। শার্লির আগ্রহ বাড়লো। উচু টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে দাড়ালো ও৷ বললো,

– ও আচ্ছা! তারমানে তোর কাছে ওর পাত্তা আমার চেয়ে বেশি! তাইতো?

– সেটা বলিনি। তবে আমার কাছে ওর পাত্তা আমার চেয়ে বেশি।

শার্লি কথা বাড়ায় না। এরমাঝেই তাশদীদ ল্যাবে ঢোকে। ছয়দিনের ল্যাব চারদিনে শেষ করাতে ম্যাডাম বেশ তাড়া দিয়েছে ওকে। নিজের দোষে ম্যাডাম নিজেও বিপাকে পরেছেন, পুরো একটা ব্যাচকেও টানাপোড়েনে ফেলেছেন। বেচারারা ছুটিটাও শান্তিতে উপভোগ করতে পারছে না। তাশদীদ উচ্চস্বরে বললো,

– এক্সকিউজ মি এভরিওয়ান। যেহেতু এখন আপনাদের ছুটির সময়, আমি প্রজেক্টটাকে দ্রুত শেষ করতে চাইছি। এখানকার রিয়্যাকশন সবগুলো ট্রায়াল দেওয়ার সময় পাইনি আমি। যেহেতু আমাদের মডিফিকেশন দরকার, সো সবাই একটু কো অপারেট করুন। নেক্সট দুদিন আপনাদের টাস্ক একটু বেশি থাকবে। আমরা তিনদিনে প্রজেক্টটা শেষ করবো ইনশাআল্লাহ।

এতোক্ষণে তুল্যের রাগ কিছুটা কমে আসে। সবাই কাজে লেগে পরে নিজেদের মতো। তাথৈ কিছুটা সময় নিয়ে তাশদীদকে দেখলো। মাস্ক পরিহিত মানবের আজ প্রচুর ব্যস্ততা। হাতেহাতে সবাইকে এটাওটা দেখিয়ে দিচ্ছে তাশদীদ। এ টেবিল ও টেবিল ছুটছে সে। ইনডেক্স চেক করলো তাথৈ। সেখানে কিছু অতিরিক্ত সংযোজন আছে। তাথৈ বুঝলো, এই অতিরিক্ত সংযোজন আর কম সময় নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে পরেছে তাশদীদ। মুচকি হেসে নিজের মতো করে পরীক্ষণ-বিক্রিয়া শুরু করে দিলো তাথৈ। যে তাথৈ কখনো সিলেবাসের বাইরে কিছু পড়েনি, সেই তাথৈ ইনডেক্সের অতিরিক্ত সংযোজন সমাধাতে লেগে পরে। সবার মতো একটানা পরীক্ষণ না করে, হিসেব করে, বেছেবেছে বিক্রিয়া করতে থাকে ও। বাকি তিনটে দল যখন একটা-দুইটা পরীক্ষণ করতে ব্যস্ত, তাথৈ সে সময়ে চারটে শেষ করে। শার্লি কেবল লেখার দায়িত্বে ছিলো। চতুর্থ পরীক্ষণে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেয়ে তাথৈ শার্লির থেকে কাগজটা হাতে নেয়। তাশদীদ তখন অন্য আরেকটা দলের টেবিলে ছিলো। তাথৈ কাগজটা সে টেবিলে রেখে বললো,

– এই প্রসিডিওরে করলে ইজি হবে। নতুনকরে সিকুয়েন্স খুজতে আকাশপাতাল এক করতে হবে না।

তাশদীদ অবাক হলো। মনোযোগ দিয়ে কাগজটা পড়লো ও। লেখায় কোনোরকম ভুল খুজে পেলো না। তাথৈয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে ও নিজের টেবিলে গিয়ে আবারো নিজের কাজে মনোযোগ দিয়েছে। তাশদীদ হাতের কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলো একদৃষ্টিতে। তাথৈয়ের এই সিকোয়েন্সিং যদি ব্যবহারিকভাবেও ঠিক হয়, তবে ওর এই ল্যাবে ইনচার্জ হিসেবে আসা স্বার্থক। তাথৈয়ের সিকোয়েন্সিং এখানকার কাজের সাথে ওর কাজটাও হয়তো অনেক সহজভাবে মিলাতে চলেছে। ওর প্রচেষ্টা হয়তো আরেকধাপ এগোতে চলেছে। সর্বোপরি, প্রাণরসায়ন হয়তো পৃথিবীকে আরো চমৎকার কিছু উপহার দিতে চলেছে।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here