#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৩২.
ক্যাম্পাসে বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে। ফুল-রঙে মেতে উঠেছে যুবক-যুবতীরা। বাসন্তী শাড়ী-পান্জাবী পরুয়া জুটি আর পলাশ আজ ক্যাম্পাসের শোভাবর্ধক। নিউজফিড ভর্তি এইসব পোস্ট দেখে ফোনটা পাশে ছুড়ে মারলো তুল্য। খালি গায়ে বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে ছিলো ও। এরমাঝে দুবার বুজোর আওয়াজ কানে আসে তুল্যর। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বুজো এতিমের মতো ওর দরজায় বসে। তুল্য উঠে বসলো। টিশার্ট গায়ে দিতে দিতে বললো,
– আজ সূর্য কোনদিকে উঠেছে? তাথৈ আলফেজের পেট স্বয়ং বুজো এসে আমার দোরগোড়ায় পদধূলি দিচ্ছে যে!
বুজো আরো দুবার আওয়াজ করলো। তুল্য বিছানা থেকে নেমে এসে টেবিল থেকে জুসের বোতল হাতে নিলো। দুইচুমুক দিয়ে, বুজোর সামনে হাটুগেড়ে বসে বললো,
– হোয়াট? তোর উৎলানো ভালোবাসা-সিক্ত সৎবোন তোকে খেতে দেয়নি?
বুজো জিভ দিয়ে নিজের সামনের পা ভেজাতে লাগলো। দরজা খোলার আওয়াজ শুনে তুল্য রুমের বাইরে উকি দিলো। তাতে যা দেখলো মুখ আপনাআপনি হা হয়ে গেলো ওর। পাশেররুমের দরজা থেকে বুজোকে ডেকেছে তাথৈ। বুজো তখনতখন ছুটে গেলো। তাথৈ ওকে ঘরে নিয়ে গিয়ে খেতে দিলো। তুল্য বিস্ময়ে বোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। এরমাঝে পাশ থেকে কেউ একজন বলে ওঠে,
– তোর বোন প্রেমে পরেছে তুল্য।
‘সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে?’
তুল্যর সচেতন মন নিজেনিজেই বললো। দরজার পাশে তাকালো ও। শার্লি বুকে হাত গুজে করিডোরে দাড়ানো। হলুদ কামিজ আর সাদা ধুতি ওর পরনে। তুল্য বুঝলো, শার্লি তাথৈকে নিতে এসেছে। ওকে চুপ দেখে শার্লি আবারো বললো,
– ক্যাম্পাসে যাবিনা?
– না! এসব রঙঢঙ আমার ভালো লাগে না।
শার্লি আজও হতাশ। প্রেমে পরে তাথৈয়ের মতো মেয়েও আজ ক্যাম্পাসে যেতে রাজি হয়েছে। ওকে শার্লি শুধু এটুকো বলেছে, বসন্ত উৎসবের আয়োজনে তাশদীদকে দেখেছে ও। ব্যস! এটুকোতেই তাথৈ মেনে নিয়েছে, আজ ক্যাম্পাসে গেলে তাশদীদের সাথে দেখা হবে ওর। দুজনে মিলে একসাথে ভার্সিটি যাবে এজন্য অম্বুনীড়ে আসতে বলেছে ওকে। অথচ তুল্য? ওকে দেখেও তার কোনো ভাবান্তর নেই। তাহলে কি তুল্যর মনে ওরজন্য কিছুই নেই? পাশ কাটাচ্ছিলো শার্লি। কিন্তু তুল্য পেছন থেকে ওর কবজি চেপে ধরলো। শার্লি কিছু বলার আগেই বললো,
– তোর রঙঢঙ-ও আমার ভালো লাগছে না শার্লি।
– তোর ভালোলাগাকে আমি কেনো পাত্তা দেবো?
হাত মুচড়িয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো শার্লি। তুল্য ওর হাত ছেড়ে দিলো। শার্লি বেশ কড়া গলায় বললো,
– বল! আমি কেনো তোর ভালো লাগা, না লাগাকে পাত্তা দেবো? তুই আমার কে?
– আমি তোর কি হলে আমার ভালো লাগা না লাগা তোর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে?
– তোদের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ টপিকের ওপর আলোচনা শেষ হলে নিচে আয় শার্লি। আমি গাড়ি বের করছি।
এটুকো বলে দিয়ে তাথৈ নিচে চলে গেলো। শার্লি চমকে ওঠে ওর গলা শুনে। একপলক ডুল্যর দিকে তাকিয়ে দেকে ওউ আটকে আছে। শার্লি দৌড় লাগায় তাথৈয়ের পিছুপিছু। অম্বুনীড়ের বাইরে এসে দেখে তাথৈ গাড়ি বের করেছে। ড্রাইভিং সিটে বসে। চোরের মতো আঁকুপাঁকু করতে লাগলো শার্লি। তাথৈয়ের বলে আসা কথাটার মানে স্পষ্ট, ওর আর তুল্যর বিষয়ে কিছু আন্দাজ করেছে ও। কিন্তু আদৌও কি কিছু আছে ওদের? দরজা খুলে ফ্রন্টসিটে বসে গেলো শার্লি। তাথৈ বেশ স্বাভাবিক গলায় বললো,
– দুজন দুজনকে পছন্দ করিস, তাহলে কথাটা বলে দিচ্ছিস না কেনো? সমস্যা কোথায়?
শার্লি আবারো চমকায়। তাথৈ নিমীলিত চোখে চাইলো ওর দিকে। এ কদিনে ঘটে যাওয়া তুল্য-শার্লির মুহুর্তগুলো ওর চোখ এড়ায়নি। শার্লির কপালের টিপ থেকে শুরু করে, ট্যুরের সময় স্টেশনে দুজনের ইশারার আলাপ, ঘোরাঘুরির সময়ের একে ওপরের আড় চাওনি, ট্রেনের সিটে বসা নিয়ে কাহিনী, সবই খেয়াল করেছে তাথৈ। ওরা যে পরস্পর দুর্বল হয়ে পরেছে, সেটাও ও ধরতে পরেছে। ভাইয়ের স্বভাব ভালোমতোই জানে তাথৈ। তাই শার্লিকেই বলেছে অম্বুনীড়ে আসতে। তাথৈ নমনীয় স্বরে বললো,
– এমন মাথামোটাকে চুজ করেছিস, জীবনেও স্বীকার করবে না ওর তোকে পছন্দ।
শার্লি তখনো নিশ্চুপ। বিস্ময়, ঘোর দুটোই ওর মুখকে তালাবন্ধ করে দিয়েছে যেনো। তাথৈ মুচকি হেসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ রেখে বললো,
– ওকে ফাইন! যতোদিন তোরা নিজেরা নিজেদের ভালোলাগার কথা বলতে না পারছিস, ততোদিন আমি তোদের বিষয়ে কিছু জানিনা। স্বাভাবিক হ!
শার্লি চেষ্টা করলো স্বাভাবিক হওয়ার পারলো না। লজ্জায়, অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যাচ্ছে আরো। তাথৈ একপলক ওকে দেখে নিয়ে বললো,
– তুল্য তোকে পছন্দ করে, এট জেনেও তুই নিজের মনের কথা ওকে বলতে পারছিস না। আমার পরিস্থিতিটা ভাব তাহলে? কোন অকুল পাথারে ডুব দিলাম, কে জানে!
তাথৈ আনমনা হয়ে যায়৷ শার্লির মুখ থেকে আর একবর্ণ বেরোলো না। নিরবতাতেই দুজনে মিলে ক্যাম্পাস পৌছালো। হাজারো রঙিন চেহারার ভীড়ে তাথৈ খুজতে শুরু করে দিলো সে কাঙ্ক্ষিত হাসিমুখ। প্রাণরসায়নের দেয়ালে দেয়ালে বসন্তের সজ্জা। তাশদীদ বা কাধের রঙ ঝারতে ঝারতে তিনতলার ওয়াশরুম থেকে বেরোচ্ছিলো। ক্লাসের সবগুলো ছেলে মিলে রঙ মাখিয়েছে ওকে আজ। চোখেমুখে কোনোঅংশে বাদ নেই আবির লাগানো। একটু সুযোগ পেয়ে ও চলে এসেছে তিনতলায়৷ আপাতত এখানে নেই কেউই। সবাই নিচে আবির খেলছে আর স্টেজ শো এর মজা নিচ্ছে। বিভাগীয় ভবনের সামনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য স্টেজ করা হয়েছে। সেখান থেকে গান ভেসে আসছে, ‘চাতক প্রায় অহর্নিশি…’
ওয়াশরুমের বাইরে এসে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই পা থেমে যায় তাশদীদের। করিডোরের শেষ প্রান্তে তাথৈ দাড়ানো। পরনে হলুদ রঙের আনারকলি, সাদা চুড়িদার, বা কাধের ওপর পাতলা সাদা ওড়না, পায়ে উচু হিল। চেহারায় একবিন্দু সাজসজ্জা নেই। এমনকি কোমড় অবদি ছাড়া চুলগুলোতেও আলাদা কোনো স্টাইল করা নেই। আধভেজা চুলগুলো কিছুটা বা দিকে সিঁথি করে অনর্থকভাবে ছেড়ে দেওয়া। তাথৈও একদৃষ্টিতে তাশদীদকে দেখছিলো। হলুদ পান্জাবী, সাদা পায়জামা পরা মানবের চেহারাজুড়ে কয়েকরঙের আবির। পান্জাবীর হাতা কনুই অবদি গুটানো, এলোমেলো চুল। তাশদীদ মৃদ্যু হাসলো। একপা দুপা করে ও এগোতে থাকে তাথৈয়ের দিকে। কিন্তু তাথৈ স্থির রয়। ওর অনুভব হয়, তাশদীদের গায়ে লেগে থাকা এই সব রঙ ওকেও রাঙিয়েছে, ওকেও ছুঁয়েছে। কানে বাজতে থাকা লাইনটার সাথে ওর মনও বলে ওঠে,
‘আমি হবো বলে চরণ দা-সী…’
তাশদীদ এগোতে এগোতে করিডোরের টেবিলে থাকা প্লেট থেকে ডানহাতের মুঠো ভরে আবির নেয়। ওকে আবির নিতে দেখে গানের বাকি লাইনগুলো ভুলে যায় তাথৈ। তাশদীদ এসে ওর সামনে দাড়ায়। পশ্চিমমুখী ভবনের তিনতলার বারান্দায় তীর্যক রোদ পরেছে। অবশ্য সম্পুর্ন রোদ পরেছে বললে ভুল হবে। দেয়ালের ষড়ভুজাকৃতির ফোঁকর দিয়ে রোদ পরেছে বারান্দায়। সে রোদ করিডোরে দাড়ানো দুই মানব-মানবীকে ছুঁয়ে দিচ্ছে তীব্রভাবে। অথচ গানের কথা এগোয়,
‘মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন,
লুকালে না পায় অন্বেষণ…’
আবিরভরা হাত তাথৈয়ের সামনে তুলে ধরলো তাশদীদ। মাথা নেড়ে ইশারায় অনুমতি চাইলো আবির লাগানোর জন্য। তাথৈ মুখে জবাব দিলো না। ওর আর তাশদীদের মাঝে হাতদুইয়ের দুরুত্ব ছিলো। গানের কথা আবারো মস্তিষ্কে আঘাত করে ওর। ‘আমি কালারে হারায়ে তেমন…’
তাথৈ সময় নেয় না। একপা এগিয়ে তাশদীদ আর নিজের মাঝের দুরুত্ব ঘোচায়। সাহসী চোখে চেয়ে রয় তাশদীদের দিকে। ওর জবাব বুঝে যায় তাশদীদ। হাত তুলে তাথৈয়ের কপাল থেকে পুরোমুখে আবির মাখায় ও। পাশের দেয়ালজুড়ে রঙবেরঙের কাগজের শিল্প। আর শেষ কোনাটায় আড়াআড়িভাবে একটা আয়না রাখা। কারুকাজকরা আয়নায় প্রতিফলিত হয়, তাথৈ চোখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে, আর তাশদীদ ওর চেহারাজুড়ে আবির মাখাচ্ছে। নিচ থেকে তখন গায়েন গেয়ে উঠলো,
‘ওইরুপ হেরিয়ে দর্পণে…
আমার মনের মানুষেরও সণে…’
তাথৈ চোখ মেললো। হাসিমুখে ‘ফাগুনের শুভেচ্ছা ম্যাডাম!’ বলে ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় তাশদীদ। মৃদ্যুবেগে দৌড়ে নিচে নেমে আসে। আবারো হুল্লোড় বাধিয়ে দেয় শান্ত-টিটুদের সাথে। তাথৈ নিজের গালে হাত দিয়ে থমকে রইলো দু দন্ড।
‘যখন ওই রুপ স্মরণ হয়
থাকে না লোক লজ্জার ভয়…’
অকস্মাৎ কি হলো তাথৈয়ের, পাশের আবিরের প্লেট থেকে হাত ভর্তি করে আবির নিলো ও। উচ্ছ্বলতা নিয়ে তা সর্বশক্তিতে ছুড়ে মারলো বাতাসে। কাধ থেকে ওড়না খুলে দুহাতে ধরে তাথৈ। ওড়নার দুপ্রান্ত আবিরের প্লেটে ডুবিয়ে ওড়নাও বাতাসে ওড়াতে থাকে ও। হলুদ আবিরে ছেয়ে যায় ওর চারপাশ। একাকী করিডোরে প্রজাপতির মতো হাসতে থাকে, নাচতে থাকে তাথৈ। তিনতলার শূণশান করিডোরে ওড়না নাড়িয়ে, রঙ উড়িয়ে ঘুরেফিরে এক ছায়াময়ী নাচছে। নিচে তখনো গানের উৎসব। একদল তরুনতরুনী, গায়কের সাথে তখন একসাথে গলা ছেড়ে গাইছে,
‘লালন ফকির ভেবে বলে স-দাই(ii)
ওই প্রেম যেই করে সেই জানে…’
•
শুক্রবারের সকালটাতে উচ্চমাত্রার ব্যস্ততা পরে গেছে প্রীতিকার্নিশে। তাশদীদ শার্টের হাতা গুটাচ্ছে আর মিসেস ওয়াসীর ওর মুখে ভাজি-পরোটা তুলে দিচ্ছে। তাশদীদ মুলত তৈরী হচ্ছে ক্যাম্পাস যাবে বলে। গত তিনদিনে তাথৈদের প্রজেক্ট শেষ করে দিয়েছে ও। আজ ক্লাস নেই। তবে রিংকির ভর্তি পরীক্ষা। যেহেতু তাশদীদের ভার্সিটিতে পরীক্ষা, রিংকিকে সাথে করে নিয়ে যাওয়ার দায়টা ওর ওপরেই পরেছে। তাশদীদ মানা করার কোনো কারন পায়নি। হাতঘড়ি পরতে পরতে তাশদীদ মাকে বললো,
– আঙ্কেল সাথে গেলেও পারতো।
– আমিও সেটা বলেছিলাম। কিন্তু ভাই বললেন তার নাকি অন্যকোথায় জরুরী কাজ আছে। আর ভাবীতো জার্নি করতেই পারে না।
মায়ের দিকে একপলক তাকালো তাশদীদ। মানিব্যাগ আর ফোনটা নিয়ে পকেটে পুরতে পুরতে বললো,
– আচ্ছা যা হয়েছে হয়েছে। ব্যস আজকের দিনটাই! এরপর আমি দায়মুক্ত!
নিজেনিজেই বলে তাশদীদ ঘর থেকে বেরোলো। বারান্দার সোফায় ওয়াসীর সাহেবের সাথে রিংকি বসা। রিংকিদের বাসার থেকে প্রীতিকার্নিশ বেশি সম্মুখে। তাই ও চলে এসেছে আগেই। তাশদীদকে দেখে রিংকি দাঁড়িয়ে গেলো। কালো শার্টে কোনো পুরুষকে এতো বেশি সতেজ দেখায়? হয়তো সেটা তাশদীদ বলেই সম্ভব! তাশদীদ হাত বাড়িয়ে ইশারায় বুঝালো, ‘এগোও’। তারপর ডাইনিংয়ে বসে পানি খেলো। ওয়াসীর সাহেব আর তার মিসেসকে ‘আসছি’ বলে এগোয় রিংকি। মেইনরোডে এসে লোকাল বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলো দুজনে। তাশদীদ বললো,
– আঙ্কেলের কি এমন কাজ পরে গেলো যে আজ তোমার সাথে যেতে পারলো না?
– সে আমার জন্য ইমারজেন্সি না তাশদীদ ভাই।
রিংকির জবাবে বরাবরের মতো বিরক্ত হলো তাশদীদ। অন্যদিক ফিরে নিজেকে সামাল দিলো ও। বাস আসলে রিংকিকে ড্রাইভারের সামনেরদিকের সিটটায় বসিয়ে নিজে গিয়ে পিছনে বসে পরলো। রিংকি বুঝলো, ইচ্ছে করেই দরজার কাছের ফাঁকা দুইসিটগুলোতে বসেনি তাশদীদ। কেননা দুইসিটে বসলে ওদের পাশাপাশি বসতে হতো। মনেমনে হাসলো রিংকি। ভেবেও নিলো, কদিন পর ও তাশদীদের ঠিক কতোটা কাছে থাকবে।
ফোনের কর্কশ রিংটোনে ঘুম ছুটে যায় তাথৈয়ের। শোয়া থেকে উঠে বসে ও। গত কদিনে প্রজেক্ট নিয়ে অনেকবেশি খাটাখাটুনি গেছে। শুক্রবার আরামসে ঘুমানোর কথা ওর। ব্যালকনিতে তাকিয়ে দেখে সেখানে উজ্জল আলো। মানে বেলা হয়েছে অনেকটাই। তালুর উল্টোপিঠ গলায় ঠেকালো তাথৈ। টের পেলো, ও ঘেমে উঠেছে। পাশে বাজতে থাকা ফোনটার দিকে তাকালো তাথৈ। কলে রুমনের নাম দেখে কল রিসিভ করে হ্যালো বললো ও৷ ওপাশ থেকে রুমন বললো,
– কইরে তুই?
– স্পেসে। কেনো?
– ও। পৃথিবীর বাইরে? তাহলে থাক। আমি ভাবলাম শুক্রবার আজ, তুই বোধহয় অম্বুনীড়ে। থাকলে পরে বলতাম, ক্যাম্পাস চলে আয়, দেখা করি। ঢাকা ফিরছি।
তাথৈ খুশি হয়ে গেলো। শব্দহীন হেসে বললো,
– জলদি আয়। আমি শার্লিকে নিয়ে পৌছাচ্ছি!
কল কেটে শার্লিকে ম্যাসেজ করে দিলো তাথৈ।
শার্লি ক্যাম্পাসেই ছিলো। শানবাধানো সিটে বসে হেডফোনে গান শুনছিলো ও। হলে থাকে বলে ওর বেশিরভাগ সময় ক্যাম্পাসেই কাটে। তাথৈয়ের ম্যাসেজ পড়ে খুশি হয়ে যায় ওউ। কান থেকে হেডফোন নামালো শার্লি। তখনই ওর কানে আসে,
– ওই পিচ্চি মেয়ে তোর ভালোমানুষির সুযোগ নিচ্ছে তাশদীদ! ওকে কিন্তু তুই একটু বেশিই ছাড় দিয়ে ফেলছিস!
তাশদীদের নাম শুনে শার্লি কপাল কুঁচকালো। গলার আওয়াজটা যে শান্তর, তা ও শতভাগ নিশ্চিত। শার্লি বুঝলো, তাশদীদ-শান্ত ওর বসার জায়গার উল্টোপাশেই বসে। তাশদীদ ক্যাম্পাসে জেনে শার্লি খুশি হলো। অন্যকোনো সময় হলে তাথৈ কোনোমতেই শুক্রবারে ক্যাম্পাসে আসতো না। আজ যখন ও ক্যাম্পাসে আসছে, আজই তাশদীদও ক্যাম্পাসে এসেছে। পরিস্থিতি কতোটা মোহনীয়তার সাথে বারবার ওদের কাছাকাছি নিয়ে আসছে ভেবে হাসলো শার্লি।কিন্তু তাশদীদের কথায় কৌতুহল বাড়ে ওর। পেছনে বসা তাশদীদ বলছে,
– আই হ্যাড নো চয়েজ। রিংকি আমাকে এমন কোনো পরিস্থিতিতে ফেলেনি যেখানে আমি রিয়্যাক্ট করতে পারতাম।
শার্লির বিস্ময় বাড়ে। তাশদীদ ওয়াসীর, যার কাছে কিনা সবরকমের সমাধা থাকে, সেই তাশদীদ বলছে সে নিরুপায়! কৌতুহল নিয়ে ওদের দুজনের আরোকিছু কথাবার্তা শুনলো ও। তাতে স্পষ্ট বুঝলো, রিংকি নামের আপদটা বেশ ভালোমতোই জ্বালাচ্ছে তাশদীদকে। শার্লি মাথা নেড়ে তাচ্ছিল্যে হাসলো। রিংকি নামক মেয়েটার জন্য করুনা হলো ওর। মনেমনে আন্দাজ করতে লাগলো, তাশদীদ ওয়াসীরের অস্বস্তির কারন, এই রিংকির সাথে তাথৈ আলফেজ ঠিক কি কি করতে পারে। হিসাব করে শার্লি ফলাফলে যা পেলো, ‘সব!’
রিংকি পরীক্ষা শেষ করে বেরিয়ে তাশদীদকে খুজতে শুরু করে। একটুপর তাশদীদই ওকে ডাক লাগায়। রিংকি এগোলো। তাশদীদের সাথে শান্ত টিটুও এসেছে। তাশদীদ ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো রিংকিকে। রিংকি বললো,
– পরীক্ষা কেমন হলো জানতে চাইবেন না তাশদীদ ভাই?
– যা গেছে, গেছে। রেজাল্টে দেখা যাবে।
স্বতঃস্ফূর্ত জবাব দিলো তাশদীদ। টিটু উৎসাহভরে বললো,
– তুই পড়িয়েছিস না ওকে? ও ঠিক চান্স পাবে!
– তাশদীদ কি পড়িয়েছে সেটা ম্যাটার করে না। ও কি পড়েছে, সেটা ম্যাটার করে। তা রিংকি মামুনী? এক্সাম কেমন গেলো তোমার? লিখেছো সব?
শান্তর সম্বোধনে কপাল কুচকে আসলো রিংকির। ঠোঁট চেপে ধরে, অন্যদিক ফিরে, তীব্র কষ্টে হাসি লুকালো তাশদীদ। রিংকি বললো,
– জ্ জ্বী ভাইয়া। সব লিখেছি।
– সব লিখেছো? তা মামুনী, এইযে যারা হল থেকে বেরিয়েই বলে সব লিখেছি, একশোই দাগিয়েছি, চান্সটা কিন্তু তাদের কপাল থেকেই আগে ফসকে যায়। এটা জানোতো?
রিংকি এবার জবাব দিলো না। তেমনি কপাল কুচকে চেয়ে রইলো। তাশদীদ শান্তর কাধে হাত রেখে ওকে থামালো। গলা ঝেরে বললো,
– আব্, তুমি কিছু খাবে রিংকি? বেলা অনেক হয়েছে।
– উহুম। খাবো না কিছু। কিন্তু আপনার ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখতে চাই।
রিংকি তৎক্ষনাৎ স্বাভাবিক হয়। ওর আবদারে তাশদীদ বারন করলো না। বারনের সুযোগ নেই। ইশারায় শান্ত-টিটুকে বললো, চল যাই। টিটু রাজি হলো। কিন্তু বাধ সাধলো শান্ত। ও গেলো না। তাশদীদ টিটু আর রিংকিকে নিয়ে এগোলো।
ক্যাম্পাসে ঢুকেই তাথৈয়ের চোখে পরলো তাশদীদকে। শুক্রবারের ক্যাম্পাস এমনিতেও ভরাট থাকে। তারওপর ভর্তি পরীক্ষা ছিলো। এতো মানুষের ভীড়েও কালো শার্ট পরিহিত মানুষটাকে দেখাটাকে সৌভাগ্য নাম দেওয়ার ইচ্ছে হলো তাথৈয়ের। সুঠামদেহী সে পুরুষের ডানহাতে কালো সানগ্লাস। দুপুরের রোদেও সেটা চোখে আটেনি তাশদীদ। পাশের মেয়েটাকে আঙুল দিয়ে এটাওটা দেখাচ্ছে ও। তাথৈ বাকিসব ভুলে গেলো। শার্লি কোত্থেকে ওর পাশে এসে দাড়ালো। চুইংগাম চিবাতে চিবাতে গরগরিয়ে বলতে লাগলো,
– মেয়েটা রিংকি। তাশদীদ ভাইয়ের এলাকাততো বোন। এডমিশনের জন্য বোনকে কয়েকমাস পড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু ম্যাডাম রিংকি তাকে ব্রোর পরিবর্তে বরের নজরে দেখছে। আর এ নিয়ে তাশদীদ ভাই বহুত ডিসটার্বড।
#চলবে…

