শুনলাম_বসন্ত_নাকি_আবার_এসেছে #লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান #পর্বঃ২৫

0
831

#শুনলাম_বসন্ত_নাকি_আবার_এসেছে
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ২৫

হাসান ভিলার পরিবেশটা গমগম হয়ে আছে ৷ পরিস্থিতি বেশ গরম ৷ সকলেই থমথম মুখে যে যার অবস্থানে বসে আছে ৷ ক্ষণকাল বাদে সাজিদ গম্ভীর গলায় বলে উঠল,,,

এসবের মানে কি সাভাশ?

সেটা তো আমার জিজ্ঞাসা করা উচিত বাবা ৷ এসবের মানে কি? ওই ছেলের সাথে তুমি আয়েশার বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবলে কিভাবে?

বারিশের মধ্যে কি সমস্যা বুঝলাম না আমি ৷

কি সমস্যা নেই সেটা বলো ৷ সকলের সাথে সবসময় ক*র্কশ ভাষায় কথা বলে ওই ছেলে ৷ অল্প একটুতেই শা*স্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করে ৷ গ্যারান্টি কি বিয়ের পর আমার বোনকে অ*ত্যাচার করবে না ওই ছেলে?

তো স্টুডেন্টরা ফাঁকিবাজি করলে ,বে*য়াদবী করলে তাদের শা*স্তি না দিয়ে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে এই আশা করছো বারিশের থেকে? একজন শিক্ষকের এমন স্ট্রিটই হওয়া উচিত বিগড়ে যাওয়া বাচ্চাদের সোজা করার জন্য ৷

মেহমেত হঠাৎ হেসে উঠল সাজিদের কথায় ৷ তানিয়া চোখ পাকিয়ে তাকাতেই অবশ্য হাসি বন্ধ করে দিয়েছিল ও ৷ সাভাশ চুপ হলেও দমে গেল না ৷ পুনরায় বলে উঠল,,,

সে আমি জানি না বাবা ৷ আমি ওই কাঠখোট্টা লোকের সাথে আমার বোনের বিয়ে দিব না ৷ আয়েশা যে স্বভাবের তাতে দেখা যাবে রেগে গিয়ে ওকে বস্তায় ভরে নদীতে গিয়ে ফেলে দিয়ে এসেছে ৷

সাজিদের মুখ অত্যন্ত গম্ভীর ৷ ছেলের এসব কথায় ওর রাগ তরতর করে বেড়ে চলেছে ৷ যথাসম্ভব নিজেকে সামলে নিয়ে বলে উঠল,,,,

তুমি বারিশকে ব্যক্তিগতভাবে চেনো? শুধু ভার্সিটিতে কয়েকটা ক্লাস করেই ওকে চিনে গেলে? তোমার হয়তো জানা নেই নাভিনের সবচেয়ে ফেভারেট স্টুডেন্ট ছিল বারিশ ৷ এখন নাভিনের পছন্দের উপর নিশ্চয়ই প্রশ্ন তুলবে না রাইট? তাছাড়াও আয়েশা আমার মেয়ে ৷ ওর জন্য যা পারফেক্ট সেটাই আমি ওর জন্য সিলেক্ট করব সেটা নিশ্চয়ই অবগত আছে তোমার?

সাভাশ নিজের যুক্তি দাঁড় করাতে যাবে তার আগেই সিনু বলে উঠল,,,, অনেক হয়েছে সাভাশ ৷ নিজের বাবার সাথে এমন ব্যবহার কিন্তু আমি বরদাস্ত করব না ৷ তোমার বাবা, চাচ্চু আর নাভিন মামা নিশ্চয়ই অনেক ভেবে চিন্তেই এই সিদ্ধান্ত টা নিয়েছে ৷ তুমি আর আপত্তি করো না ৷ ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো ৷ এখন নিজের রুমে যাও তুমি ৷

সাভাশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে গটগট পায়ে নিজের রুমে চলে গেল ৷ সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সবাই সোফায় বসে নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

আয়েশা গালে হাত দিয়ে আহাম্মক হয়ে মাথার উপরের সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে আছে ৷ ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তিন জোড়া চোখ ৷ নীর আর শেহনাজ একপাশে বসে আছে আর তুবা অন্যপাশে বসে আছে ৷ প্রায় একঘন্টা থেকে আয়েশা একইভাবে গালে হাত দিয়ে উপরে তাকিয়ে আছে ৷

তুবা আলতো করে আয়েশার কাঁধে হাত রেখে বলল,,, বেঁচে আছিস? সিগন্যাল পাচ্ছিস?

আয়েশা অবশেষে ঠোঁট উল্টে অসহায়ের মতো বলতে লাগল,,, আমি মানি না ৷ আমি মানি না ৷ ওই ওইই অ্যানাকন্ডা সা*পের সাথে বিয়ে করলে আমি ফিনিচ হয়ে যাব! কি হোক আর না হোক আমাকে সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকতে বলবে!

তুবা বুকে হাত দিয়ে স্বস্থির নিশ্বাস ফেলে বলল,,, যাক বেঁচে আছিস ৷ আমি তো ভেবেছিলাম ম*রে টরে গেছিস!

আয়েশা কপট রা*গ দেখিয়ে বলল,,, একদম ফাইজলামো করবি না ৷

নীর মুচকি হেসে বলে উঠল,,, আপু ওতোটাও খারাপ না কিন্তু ৷ দেখতে তো বেশ সুদর্শন ৷ তোমার সাথে দারুন মানাবে ৷ রাজি হয়ে যাও ৷

এতো পছন্দ হলে তুই বিয়ে করে নে ৷ আমার লাগবে না এমন স্যার ৷ আমি তো এমন ছেলেকে বিয়ে করতে চাই যে আমাকে জীবনেও পড়াশোনা করতে বলবে না বরং আমি পড়াশোনা করতে ধরলে সে আঁ*তকে উঠে বলবে, ‘প্রিয়তমা একি স*র্বনাশ করছো? এসব বা*জে কাজ করো না’ ৷

আয়েশার নাটকীয়ভাবে বলার ভঙ্গি দেখে সকলে হাসতে লাগল ৷ এমন সময় সাভাশ দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল ৷ ওর মুখভঙ্গি এখন স্বাভাবিক লাগছে ৷ বিছানার দিকে না গিয়ে ও দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বুকে দু হাত গুজে বলল,,,

অনেক ভেবে দেখলাম বারিশ স্যার আসলে খারাপ না তোর জন্য বরং তোর মতো পড়াচো*রের ভাগ্যে এমন একটা বারিশ স্যার ই দরকার ৷ তাছাড়াও আর একটা কারন আছে অবশ্য ৷

আয়েশা ভ্রু কুঁচকে বলল,,, আর কি কারন থাকতে পারে?

বলেছিলাম না তোকে আমার মতো একটা কালাচাঁদ এনে দিব? তাহলে বলছি শোন বারিশ স্যার আমার মতোই চকলেট কালারের ৷

আয়েশা চোখমুখ কুঁচকে বসে থাকল ৷ নীর সাভাশকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,, যাই বলুন ভাইয়া হবু দুলাভাই কিন্তু সুদর্শন অনেক ৷ আমার তো বেশ পছন্দ হয়েছে ৷

সাভাশ বিরবির করে বলল,,, আমাকে হয় না নিক্কি?

নীর শুনতে না পেরে বলল,,, কি ভাইয়া?

সাভাশ সামান্য হেসে বলল,,, কিছু না ৷

ভালো কথা আপনি একা আসলেন কেন? তুষার ভাইয়া কোথায়?

তুষার? সে আছে হয়তো চারতলায় নিজের বাসরঘরে আই মিন লাইব্রেরিতে ৷

ওর কথা শুনে সবাই হেসে উঠল ৷ চিন্তাতে ফেটে পড়া আয়েশাও হাসি আটকাতে পারল না কিন্তু শেহনাজের মুখটা শুকনো ৷ একপলক নীরের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল ও ৷ অতঃপর অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,,,

আমি একটু আসি ৷ আমার ক্ষুধা লেগেছে ৷

বলে শেহনাজ তাড়াহুড়ো করে যেতে ধরলে তাল হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে সাভাশ ওকে ধরে ফেলে বলল,,,,

কি বোনু? মনোযোগ কোথায়? আয় আমি তোকে নিয়ে যাই নয়তো দেখা যাবে মেঝের সাথে আবারও গড়াগড়ি খেতে শুরু করেছিস ৷

শেহনাজ মলিন হেসে সম্মতি জানাল ৷ সাভাশ ওকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল ৷ অন্যদিকে নীর আর তুবা মিলে আয়েশার মাথা আউলিয়ে দিতে লাগল বারিশের কথা বলে বলে ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

বারিশ তার পরিবারকে নিয়ে আজ হাসান ভিলায় এসেছে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে ৷ বর্ষা, বীর, বারিশের মা আর বারিশের এক ফুফু এসেছে সাথে ৷ আজ নীরের বাবা মা অর্থাৎ রাইমা আর নাভিনও হাসান ভিলায় উপস্থিত আছে সাথে রাইশা আর তানজিদও ৷ ওরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তুবা আর আয়েশার বিয়ে একই দিনে হবে ৷ একসাথে ডাবল আনন্দ যাকে বলে ৷

কিছুক্ষণ পর আয়েশাকে একটা কাচা হলুদ রঙের শাড়ি আর হিজাব পড়িয়ে নিচে নিয়ে আসল তুবা, নীর আর শেহনাজ ৷ বারিশ চকিতে সেদিকে একপলক তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল ৷ ওকে আসতে দেখে বর্ষা এগিয়ে এসে আয়েশাকে নিয়ে গিয়ে বারিশের সম্মুখে বসাল ৷

আয়েশা নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে মাথা নিচু করে বসে থাকল ৷ একবারের জন্যেও বারিশের দিকে তাকাল না ৷ তাই তো বুঝল না কেউ একজন ওকে ঠিক কতটা মায়াভরে দেখছিল ৷ কিছুক্ষণ পর বীর এসে আয়েশার কোলে বসে পড়ল ৷ আয়েশা ওকে দেখে হাসার চেষ্টা করল ৷ বীর দাঁত বের করে হেসে বলল,,,,

তুমি আমার মামুকে বিয়ে করলে ফ্রিতে তোমার কাছে পড়তে পারব তাই আমি তোমাকে মামীমনি হিসেবে মেনে নিতে রাজি হয়েছি নয়তো হতাম না ৷

আয়েশা আহাম্মক হয়ে গেল বীরের লজিক শুনে ৷ আচমকা চোখ তুলে বারিশের দিকে তাকাতেই ওদের চোখাচোখি হয়ে গেল ৷ আয়েশা তৎক্ষণাৎ থতমত খেয়ে চোখ সরিয়ে নিল ৷ ওর ভীষণ ছটফট লাগতেছে ৷ ওর অবস্থা দেখে বারিশ বাকা হেসে বলল,,,,

মাই এডরিং স্নো হোয়াইট ৷

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

রাইমা তানিয়ার সাথে খাবারের দিকটা সামাল দিয়ে ড্রয়িংরুমে আসতেই রে*গে ফায়ার হয়ে গেল ৷ নাভিন হেসে হেসে বারিশের ফুফুর সাথে কথা বলছে ৷ রাইমা দ্রুতপদে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে মুখে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে বলল,,,

এক্সকিউজ মি ৷

ও নাভিনকে টানতে টানতে একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে আসল ৷ নাভিন ভ্রু কুঁচকে বলল,,,,

কি ব্যাপার মায়াবিনী? কি হয়েছে?

রাইমা দাঁত কড়মড় করে বলল,,, কি হয়েছে? বয়স হয়ে গেলেও আপনার ভীমরতী কমল না তাই না?

নাভিনের চোখে মুখে দ্বিধা ৷ ও বুঝতে পারছে না কিছু ৷ রাইমা নাভিনের কলার ধরে বলল,,,

ভুলে যাবেন না আমি ক্যারাটে ভুলে যাইনি ৷ ওই মহিলার সাথে কি কথা বলছিলেন শুনি? তাও আবার এতো হেসে হেসে?

নাভিন হেসে উঠল ৷ পরপর ভ্রু নাচিয়ে বলল,,,, আমার বউ এখনও আমাকে নিয়ে জেলাস হয় ইন্টারেস্টিং ৷ আই লাইক ইট ৷

রাইমা মুখ ভেংচি কেটে বলল,,,, ইংল্যান্ডের ভুল করে ফেলে যাওয়া বংশধর!

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

বীর ভুলবশত বারিশের গায়ে জুস ফেলে দিয়েছিল তাই বারিশ ড্রয়িংরুমের বেসিনের দিকে চলে গেল ৷ নিজের পড়নের সাদা পাঞ্জাবী টা পরিষ্কার করে পিছু ঘুরতেই ওর চোখ বন্ধ হয়ে গেল কারন কেউ একজন ওর মুখে পানি ছুড়ে মে*রেছে ৷ বারিশ চোখ মেলে দেখল সাভাশ পানির পট হাতে ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে ৷ মুখভঙ্গি একদম স্বাভাবিক রেখে সাভাশ বলে উঠল,,,

আফওয়ান দেখিনি ৷ আসুন মুছে দিই ৷

বলে সাভাশ নিজের রুমাল বের করে ওর মুখ মুছে দিতে লাগল ৷ কিন্তু কিছুক্ষণ পর সাভাশ মিথ্যা মিথ্যা আঁ*তকে ওঠার ভান করে বলল,,,

উপসসস আমার তো মনেই ছিল না আমার রুমালে কালি লেগে গিয়েছিল ৷ আবারও আফওয়ান ৷

বারিশ জানে সাভাশ এসব ইচ্ছা করেই করেছে ৷ ও শান্ত দৃষ্টিতে সাভাশের দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ তা দেখে সাভাশ বলল,,,

লেকচার দেওয়ার কথা ভুলেও ভাববেন না ৷ আমি লেকচার শোনার মুডে নেই ৷ স্যার হবেন আপনি ভার্সিটিতে, এখানে না ৷ এখানে আমি আপনার হবু শালা ৷ তাই বুঝে শুনে কথা বলুন কারন বেশি টেরিবেরি করলে বোন দিব না আমি ৷

বারিশ বাকা হেসে বলল,,,, আই থিংক সেইম ডায়ালগ টা আমি তোমাকে কাল ভার্সিটিতে শোনাব ৷

তাহলে আমার বোনের কথা ভুলে যান ৷ দিব না আপনাকে ৷

বেশ তোমাকে দিতে হবে না ৷ আমি এসে নিয়ে যাব ৷

সাভাশ আচমকা একটা টিকটিকি আর তেলাপোকা বারিশের হাতে দিয়ে বলল,,,, এই যে আমার বোন ৷ নিয়ে যান ৷ টিকটিকি টা আমার বোন ,তেলাপোকা টা বোনাস ৷

চলবে,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here