আমরন_চেয়েছি_তোমায় #লেখায়_সুরাইয়া_নওশিন ১২

0
296

#আমরন_চেয়েছি_তোমায়
#লেখায়_সুরাইয়া_নওশিন
১২
সানিকে এক নজর দেখতে এসেছিলো সেই এক নজর দেখে বেরিয়ে গেলো খান বাড়ি থেকে। খান বাড়ির কোনো পুরুষ সদস্যরা না থাকায় কোনো ঝামেলা হলো না। এই জন্য হাফ ছেড়ে বাঁচলেন খান বাড়ির মহিলা সদস্যরা। শায়লা বেগম তার শাড়ির আঁচলে চোখ মুছলেন। হয়তো সবার সামনে নিজের চোখের পানি আড়াল করতে চাইলেন। চুপচাপ আবারও নিচে গিয়ে রান্নার কাজে মনোযোগ দিলেন। তবে শাহানা বেগম আর নূর জাহান বেগম তাদের একমাত্র ননদকে ভীষণ ভালোবাসে। তাদের বুঝতে বাকি নেই তাদের একমাত্র ননদিনী মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। খারাপ হওয়া স্বাভাবিক এতো বড় নিজের সংসার থাকতে পরে থাকতে হচ্ছে ভাইয়ের সংসারে। শাহানা বেগম আর নূর জাহান বেগম জড়িয়ে ধরলেন শায়লা বেগমকে। হাঁসানোর চেষ্টা করলেন একমাত্র ননদিনীকে। ভাবিদের ভালোবাসার জন্য আর মন খারাপ করে থাকতে পারলেন না শায়লা বেগম, হেঁসে ফেললেন তিনি।

সারা চুপচাপ দরজার কোনে দাঁড়িয়ে সানির মতিভ্রম বুঝার চেষ্টা করছে। সানি তখন থেকে চুপচাপ বসে রয়েছে তার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। একমনে চুপচাপ বসেই রয়েছে সে। সারা মনে আওড়ালো,,

” সানি ভাইয়ের কি মন খারাপ। ”

সারা সানির ঘরে প্রবেশ করবে কি করবে না এ নিয়ে দ্বিধা দন্দ।সারা জানে শিকদার বাড়ির সাথে খান বাড়ির সম্পর্ক আগে থেকে ভালো না। কারন শিকদার বাড়ির অহংকার, দাম্ভিকতা, রাজনীতির জন্য। সারা ছোট ছিলো কিছু মনে নেই তার। শিকদার বাড়ির সম্পর্কে কেউ কিছু বলতেও চায় না। সবাই এড়িয়ে চলে বরাবর। তবুও হাল্কা পাতলা এতোটুকুই শুনেছে সে। আর খুব বেশি কারন জানে না সারা। কেন শায়লা বেগম এর সাথে শিকদার বাড়ির মেঝো ছেলে সাগর মাইন শিকদার এর সাথে বিয়ে হলো। আর বিয়ে হলেও এতো মান অভিমান কীসের। শায়লা বেগম আর সানি কেন যায় না শিকদার বাড়িতে। সানিকে এতো আদর স্নেহ করে তবুও কেন যায় না সে। সারার অনেক জানার কৌতূহল কিন্তু সারা যতবার শাহানা বেগম আর নূর জাহান বেগমকে প্রশ্ন করেছে তারা বরাবরই বলেছে তুই ছোট মানুষ তোর এতো জানার প্রয়োজন নেই। সারার আর এর প্রশ্নের উত্তর মিলে আজ অবধি।

সানি সেভাবে বসে থেকে গম্ভীর কন্ঠে বলে,,

” ভেতরে আয় ”

সারা অন্যমনস্ক থাকায় সানির কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠে সে। পুরো শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠেলো সারা। ভাবনার জগৎ এর সাথে বিচ্ছেদ ঘটলো সারার। সারা ধীর গতিতে প্রবেশ করে সানির ঘরে। সানি এবার ঘুরে থাকায় সারার দিকে। চোখ জোড়া লাল হয়ে আছে, রোগা মুখ, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে তার।সানি একটু আড়মোড়া দিয়ে বলে,,

” বস আয় ”

সারা ধীর কন্ঠে বলে,,

” না থাক আপনি ঘুমান। ”

” আর ঘুম হবে না, ঘুম ভেঙে গিয়েছে। তুই একটা কাজ কর বেলকনির পর্দাটা সরিয়ে দে তো। ”

সারা সানির কথা মতো বেলকনির পর্দা সরিয়ে দিলো। পুরো ঘর সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে গেলো। সারা এরপর ঘরের ভেতর জ্বলতে থাকা লাইট অফ করে দিলো। সানি জানালার পর্দা সরিয়ে দিলো এক হাতে। সারা আবারও বিছানা ঘেষে দাঁড়ালো। এরপর কি ভেবে বসে পরলো বিছানায়। সানির দিকে তাকিয়ে বলে,,

” আপনার শরীর কেমন এখন? ”

” এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। জ্বর নেই, তবে ঠান্ডা তো আর এতো তাড়াতাড়ি ভালো হবে না। ভার্সিটি যাস নি তুই। ”

সারা না সূচক মাথা নাড়িয়ে বলে,,

” না যাই। ভালো লাগছিলো না তাই। ”

সানি কিছুটা আতংকিত হয়ে সারার কপালে হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখে জ্বর এসেছে কি না। তাপমাত্রা তো স্বাভাবিক। সারা বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে সানির কান্ড দেখছে। সানি চিন্তিত কন্ঠে বলে,,

” জ্বর তো নেই। মাথা ব্যাথা করছে কোনো সমস্যা। ”

সারা বিরক্ত হলো। ডাক্তার মানুষ সব সময় তাই অসুখ বিসুখ নিয়ে কথা বার্তা। অসুখ হলেই কি ভালো লাগবে না। ভালো না লাগার আর কি কোনো কারন থাকতে পারে না নাকি। এই মানুষটা মাঝে মাঝে সত্যি বিরক্তিকর। সারা বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে,,

” প্রতিদিন কি ভার্সিটি যেতে হবে নাকি। একদিন মিস দিলে কিছু হবে না। কিছু হয় নি আমার এমনি যেতে ইচ্ছে করছিলো না তাই যাই নি আমি। ”

সানি সারার জবাবে সারার দিকে ভ্রু কুচকে তাকায়। তবে এ প্রসঙ্গে আর কথা বললো না।সানির গাঁয়ে জড়িয়ে থেকে কমফোর্ট সরিয়ে দিলো নিজের গাঁ থেকে। সারা চুপচাপ বসে দুই হাত অনবরত কচলাচ্ছে। সানির বুঝতে বাকি রইলো না সারা তাকে কিছু বলতে চাইছে। সানি সারার দিকে দৃষ্টি রেখে বলে,,

” কিছু বলবি ”

ছাড়া কিছুটা চমকে উঠে সানির দিকে তাকায়। প্রশ্ন করবে কি করবে না এ নিয়ে দ্বিধায় আছে সে৷ প্রশ্ন করা ঠিক হবে কি হবে না এ নিয়ে দ্বিধা দন্দে আছে সে। সারা একটু জড়তা নিয়ে বলে,,

” আপনাকে সবাই অনেক ভালোবাসে। আপনার অসুস্থতার কথা শুনে ছুটে এসেছে কেমন সবাই। ”

সানি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে,,

” হুম বাসে। ”

সারা শুকনো ঢোক গিলে ভয়ার্ত কন্ঠে বলে,,

” আপনি তাহলে শিকদার বাড়িতে জান না কেন? ”

সারার প্রশ্নে সানি ঘুরে সারার দিকে তাকায়। সারা ভয়ে শুকনো ঢোক মুখে হাঁসার আনা চেষ্টা করে। জোর পূর্বক মুখে হাঁসি এনে বলে,,

” মানে আমি বলছিলাম, সবাই যেহেতু আপনাকে এতো ভালোবাসে তাই আর কি? ”

সানি গম্ভীর কন্ঠে বলে,,

” খান বাড়িতে আছি তোর ভালো লাগছে না। ”

সানির এমন জবাবে মনটা বিষন্নতায় কালো মেঘে ঢেকে গেলো তার। সে তো এমনটা বলে নি। যে মানুষটার সন্ধিক্ষণে থাকতে বার বার বাহানা খুঁজে বেরায় সে, সেই মানুষটা তার চোখের আড়াল হোক কেন চাইবে সে। এই মানুষটা একদম তাকে বুঝে না। সারা মাথা নিচু করে মিনমিনে গলায় বলে,,

” আমি কি সেটা বলেছি। ”

সানি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। তার মানসিক চাপ অযাথা এই মেয়েটার উপর চাপাচ্ছে সে। কিন্তু এই মেয়েতো তাকে কম মানসিক চাপে রাখে না। সব সময় তার বেশি বুঝা স্বভাবের কারনে প্রতি নিয়ত দুশ্চিন্তা ভুক্তে হয় তাকে। কিন্তু তবুও ধৈর্য্য যে তাকেই ধরতে হবে। এই মেয়েটার বিষন্ন মুখ যে তার হৃদয় ক্ষত বিক্ষত করে দেয়। তাকে যে ভীষণ ভাবে দূর্বল করে দেয়। আর সে দূর্বল হয়ে পরলে এই যুদ্ধে হেরে যাবে আর চিরতরে হারাবে তার সূবর্ণা নয়নের রাণীকে। সানি সারার কালো মেঘে ঢাকা বিষন্ন মুখটার দিকে তাকিয়ে বলে,,

” বেশি ভালোবাসা আমার হজম হয় না। রায়হান খান এর মতো তেতো কথা, আর কড়া শাসনের প্রয়োজন ছিলো তাই রয়ে গিয়েছে খান বাড়িতে। আমার ভালোবাসা আর শাসন দুটোই প্রয়োজন। তেতো না খেলে মিষ্টির স্বাদের গুন বুঝা যায় না।”

সারা সানির এমন জবাবে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। এ কেমন কথা। তার তো শাসন একদম ভালো লাগে না। এই মানুষটা সত্যি বিচিত্র আর সাথে তার কথাও।

” এমন অদ্ভুত কথা কোথায় পান আপনি। ”

সানি নিশব্দে মুচকি হেঁসে বলে,,

” মনের কথা মুখের ভাষায় ব্যাক্ত করি মেডাম । কি যে বলি আমি মানুষ টাই যে অদ্ভুত মেডাম। ”

সানির স্থির দৃষ্টি সারার মুখ পানে। এক গভীর চাহনিতে চেয়ে রয়েছে সারার মুখ পানে। সানির এ গভীর চাহনি তে এক বার দৃষ্টি রেখে চোখ সরিয়ে নিলো সারা৷ এ চাহনিতে কেন জানি লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। অস্থির করে তুলেছে মুহুর্তে তার মনটা, হৃদয়ের ভয়াবহ কম্পন সৃষ্টির জন্য এ চাহনি যেন যথেষ্ট। এ চাহনি যেন সারার সর্বনাশের জন্য যথেষ্ট। সারা ঠোঁট কামড়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে রইলো, আর তা বিছানায় ঝুলিয়ে বসে থাকা পা দু’খানা দোলাতে লাগলো অনবরত। সানি মুচকি হেঁসে চেয়ে রইলো কিছু সময়। প্রিয়তমা লজ্জা রাঙানো মুখ দেখতে ভালোই লাগছে তার। সানি সারার মুখ পানের দিকে তাকিয়ে বললো,,

” এক গ্লাস পানি দিতে পারবেন। ”

গলা টা শুকিয়ে আসছে ভীষণ সানির। একটু পানির তৃষ্ণা নিবারণের সত্যি খুব প্রয়োজন। যদি সেটা প্রিয়জনের হাতে হয় মন্দ কীসের। এটা তো তাহলে সোনায় সোহাগা হয়ে যাওয়ার মতন।
সারা বিছানা থেকে নেমে বিছানার পাশে টি টেবিলের উপর রাখা কাঁচের জগে থাকা পানি কাঁচের গ্লাসে ঢেলে নিলো। সানি অনুরুপ তাকিয়ে রয়েছে তার সূবর্ণা নয়নের রাণীর দিকে। খোঁপা করা চুল, কপালে পরে থাকা ছোট ছোট চুল একটু পর পর বাতাসে দোল খাচ্ছে৷ সানির এই মুহুর্তে ইচ্ছে করছে সারাকে খোলা চুলে দেখতে। কিন্তু এমন আবদার করা ঠিক হবে না। তবে মনে মনে ঠিক করে রাখলো যেদিন এমন আবদার করতে কোনো বাঁধা থাকবে না সেদিন তার প্রিয়তমা সূবর্ণা নয়নের রাণীকে বলবে সব সময় তার সামনে খোলা চুলে থাকতে, আর তার ভয়ংকর মায়াবী চোখ জোড়া যেই চোখ জোড়ায় ডুবে নিজেকে অতল সাগরে হারিয়েছে সে চোখ জোড়ায় সব সময় কাজল দিয়ে রাখতে। তার মায়াবী চোখ জোড়ার সৌন্দর্যের জাদুদে সে যদি ধ্বংস হয়ে যায় তবে তার কোন আফসোস নেই। তবুও ডুবে যাবে এই মায়াবী চোখ জোড়ায়।
সারা সানির দিকে পানির গ্লাসটা বাড়িয়ে দেয়, সারা ধারনা করেছিলো সানি হয়তো পানির গ্লাসটা তার হাতে নিবে। কিন্তু সারাকে অবাকের চরম সীমায় পৌঁছে দিয়ে সারার হাতে হাত রেখে নিজের তৃষ্ণা নিবারণ করলো সানি৷ সারার চোখ জোড়া বিশাল বড় গোল আকৃতি ধারন করেছে। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে সানির দিকে। হতভম্ব হয়ে আছে সারা, এই মুহুর্তে কি হলো ভাবতে পারছে না সারা।এমন কান্ড সানি তার সাথে করলো, কিন্তু কেন? শরীরের অসুখ মাথায় ভর করেছে তার। কিন্তু সানির এমন অবাক করা কান্ডে সারার হৃদয় অস্বাভাবিক ভাবে কম্পিত হচ্ছে। এখনি হয়তো তার হৃদয় তার শরীর ত্যাগ করে বেরিয়ে আসবে। সানি দুই হাত বিছানায় ভর দিয়ে আধশোয়ার মতো বসে পরলো কিন্তু তার দৃষ্টি সারার এমন হতভম্ব হয়ে থাকা মুখটির পানি। ঠোঁট চেপে আসছে সানি, সারা দাঁড়িয়ে রয়েছে মূর্তির ন্যায়। সানি শুকনো কাঁশি দিয়ে সারা দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো কয়েকবার। সারার এবার ঘোর কাটে, হাল্কা নড়ে চড়ে উঠে সারা। সারা তড়িৎ গতিতে কাঁচের গ্লাস রেখে দিলো যথাস্থানে। লজ্জায় যেন লজ্জাপতি গাছের পাতার মতো নুয়ে পরছে মেয়েটা। হাত, পা অনবরত কাঁপছে তার। সানির দিকে দৃষ্টি রাখতে পারছে সারা। সারা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,,

” আমি এখন আসি। ”

সানি ঠোঁট চেপে নিজের হাঁসি আটকিয়ে শীতল কন্ঠে বলে,,

” যাবি ”

তার মনে লুকিয়ে রাখা সকল কথা যেন সানি আবেগ প্রবন কন্ঠের একটা শব্দের মাধ্যমে ব্যক্ত করতে চাইলো। আর সকল অনুভূতি, চাওয়া, ব্যকুলতা, অস্থিরতা যেন এই একটা শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করতে চাইলো। আমারন আমার হয়ে থেকে যাও। আমি আমার পুরো জীবন তোমার হাতে তুলে দিবো। সারা যদি সানির এই গভীর চাহনি দৃষ্টি পরখ করতো হয়তো বুঝতে পারতো সানির এই একটা শব্দের গভীরতা। সারা লজ্জা রাঙানো মুখ তাহলে আরও লজ্জায় রক্তিম লাল বর্ণ ধারণ করতো। খুশিতে প্রান হারাতো অকালে। ইতিহাসে সেই হয়তো প্রথম নাম লেখাতো প্রিয়জনকে পাওয়ার খুশিতে প্রান হারিয়েছে একজন নারী।
কিন্তু এমনটা হলো না সারা তার দৃষ্টি নিচু করে বলে,,

” হুম যাবো ”

সানি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,

” ঠিক আছে যা তাহলে ”

সারা মুক্তি পেলো এই ভভয়ংকর অস্থিরতা থেকে। এই মানুষটার সামনে আর কিছু সময় থাকলে তার হৃদপিণ্ড হয়তো বেরিয়ে আসতো। এই মানুষটার গভীর চাহনি কেন নিতে পারে না, এই মানুষটার সামনে এতো কেন অস্থিরতা। নিজেই যেন নিজের শত্রু তাই চেয়েও নিজের প্রিয়জনের সাথে সময় কাটাতে পারে না। আবার দূরে সরেও থাকতে পারে না।
সানির সারার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে প্রসারিত এক শান্তির হাঁসি নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পরলো, তার মন মন গুন গুন করে গেঁয়ে উঠলো,,

” ওই তোর মায়াবী চোখ
কাজল হয়ে যাবো
আর উড়লে হাওয়ায় তোর
আঁচল হয়ে যাবো
আমার হয়ে যা তুই
আমি তোর হয়ে যাবো ”

প্রিয় মানুষটার কিছু সময়ের সন্ধিক্ষণ মুহুর্তে ভুলিয়ে দিলো তার সকল দুশ্চিন্তা, তারে মনে বয়ে গেলো এক শান্তির বাতাস। কি অলৌকিক ক্ষমতা প্রিয় মানুষটার সন্ধিক্ষণ সকল দুশ্চিন্তা এক মুহুর্তে ভুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আবার প্রিয় মানুষটার শূন্যতা সুন্দর মুহুর্ত বিষাদের কালো ছায়ায় ঢেকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

★★★★★★

সাফির আসতে আসতে আধঘন্টার একটু বেশি সময় লেগে গেলো। আরহি গাল ফুলিয়ে একা একা বসে রয়েছে। সে তো একাই যেতে পারতো শুধু শুধু তাকে বসিয়ে রাখার মানেটা কি। মানুষটা ভীষণ যন্ত্রনা দায়ক। এই ভার্সিটি থেকে বিদায় নিতে পারলে তার যেন মুক্তি। মুক্তি কিভাবে মিলে তার পরিবার তো সব সময় সাফির কথা শুনে। একদম দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছে তার উপর। একমাত্র বিয়েতেই মুক্তি মিলবে তার। কিন্তু এটাও সম্ভব নয়। ভীষণ বিরক্ত হয়ে বসে রয়েছে শ্রেনী কক্ষে। ফোনটাও দেখতে বিরক্ত লাগছে তাই ব্যাগে রেখে দিয়েছে। আরহি তাকিয়ে রয়েছে জানালার দিকে। তার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে হাত ইশারায় ডাকলো সাফি।
আরহি সাফিকে দেখে আর তার হাতের ইশারা দেখে মুখ কালো অন্ধকার করে বেড়িয়ে এলো শ্রেনী কক্ষ থেকে।
সাফি আরহিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,

” অনেকক্ষন অপেক্ষা করতে হলো তোমার, আসলে হুট করে কাজ বেঁধে গিয়েছিলো তাই দেরি হয়ে গিয়েছে। সরি ”

আরহি ভূত দেখার মতো তাকিয়ে রইলো সাফির দিকে। এই মানুষটা তাকে সরি বলছে। যাক একটু হলেও বিবেকবোধ রয়েছে ভালো লাগলো আরহি৷ তবে সাফির উপর রাগ তার কমে নি। সব মিলিয়ে ভীষণ রেগে আছি আরহি। একে তার হিজাব হারিয়েছে অবহেলায় দ্বিতীয় সব সময় সুযোগ পেলেই কথা শুনায় তাকে। আরহি তবুও সৌজন্যতাবোধ বজায় রাখতে বলে,,

” ঠিক আছে ”

সাফি আশেপাশে তাকিয়ে বলে,,

” একা এই রুমে কেন বসে রয়েছো। তোমার আর পার্টনার গুলো কোথায়? তখন কাউকে দেখলাম না একা দাঁড়িয়ে ছিলে আবার এখনও একা। কোনো ঝামেলা হয়েছে কি? সবকিছু ঠিক ঠাক। ”

” ওরা ফুসকা খেতে গিয়েছিলো, ক্লাস হবে না তাই সেখান থেকে চলে গিয়েছে। ”

” তুমি যাও নি ফুসকা খেতে ওদের সাথে। ”

আরহি মাথা নিচু করে মিনমিনে গলায় বলে,,

” কীভাবে যেতাম, আপনার ফোন ছিলো আমার কাছে। যদি ফোন আসে তাই যাই নি। ”

” ওহ আচ্ছা ”

দুজনের মাঝে কথা হলো না আর। সাফির পিছু পিছু হাঁটলো আরহি। সাফি ভার্সিটির প্রবেশ গেটের একটু দূর এগিয়ে ফুসকার দোকানটার গাড়ি থামালো। এখানে গাড়ি থামাতে দেখে আরহি কিছুটা অবাক হলো কিন্তু সাফিকে প্রশ্ন করলো না। সাফি গাড়ি থেকে নেমে বেরিয়ে গেলো। আরহি বিরক্ত হয়ে বলে,,

” একে তো শুধু শুধু আমাকে এক ঘন্টা বসিয়ে রেখেছে এখন আবার কোথায় গেলো। মানুষটা সত্যি অসহ্যকর। ”

আরহি মুখ ফুলিয়ে বসে রইলো গাড়িতে। আরহির দৃষ্টি বাইরে পরতেই হা হয়ে তাকিয়ে রইলো। ফুসকা নিয়ে হেঁটে আসছে সাফি। সাফি গাড়িতে বসে আরহির দিকে ফুসকার প্লেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে,,

” আমার কাজ করতে গিয়ে ফুসকা মিস করেছো, আমারও তো দায়িত্ব আছে। নাও খেয়ে নাও। ”

আরহির ফুসকা,আইসক্রিম, চিপস আর সিঙাড়া তার পছন্দের খাবার। তার জন্য সে পছন্দের খাবার মিস করবে এমনটা কখনও হতেই পারে না। সে থাকতে তার প্রিয়সিনী কোনো কিছুর জন্য আফসোস করবে এমনটা হতেই পারে না। তার শখের নারী, সযত্নে আগলে রাখে সকলের আড়ালে, অগোচরে।
আরহিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাফি আবারও বলে উঠে,,

” কি হলো নাও। ”

আরহির ঘোর কাটে। অবাক হয়ে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে নেয় ফুসকার প্লেটটা। মানুষটাকে যতটা খারাপ ভাবে মাঝে মাঝে কিছু আচরণে মানুষটি বুঝিয়ে দেয় সে ততটা খারাপ নয়। একটু গম্ভীর, রসকষহীন কাঠখোট্টা মানুষ হলেও বিবেক রয়েছে বলতে হবে।
আরহি তার পছন্দের খাবারের লোভ সামলাতে পেলো না। খুবই আনন্দের সাথে স্বাদ করে খেতে লাগলো ফুসকা। ভার্সিটির সামনে এই ফুসকা বিক্রেতার মামার ফুসকার স্বাদ অসাধারণ। একবার এর স্বাদ নিলে লোভ হয়ে যাবে। আরহি চোখ বন্ধ করে স্বাদ করে খেতে লাগলো ফুসকা। সাফি আড়চোখে আরহিকে দেখছে আর মিটিমিটি হাঁসছে আর গাড়ি চালাচ্ছে। আরহির সকল স্বভাব মন জয় করে নিয়েছে সাফির। সাফি তো হাঁসতে ভুলে গিয়েছিলো, এক ভয়ংকর অতীতের টানাপোড়ায় হৃদয় ক্ষত বিক্ষত হয়ে গিয়েছিলো তার। সেই ক্ষত বিক্ষত হৃদয়ে আশার আলো হয়ে তার জীবনে আগমন ঘটিয়েছে আরহি। তাই সে অধিক মূল্যবান, অনেক যত্নের সাফির কাছে।
অবশিষ্ট আর তিনটে ফুসকা বাকি পরে আছে। আরহির হুট করে মনে হলো তার পাশে বসে থাকা সাফির কথা। সে তো ফুসকার স্বাদে সব কিছু ভুলেই গিয়েছিলো ভাগ্যিস মনে পরেছে। একটু সংকোচও লাগছে এখন। সাফি তাকে নিয়ে কি ভাবলো, কেমন খাদকের মতো খেতে শুরু করেছে তাকে একটুও বলেনি খাওয়ার কথা। এটা তো ছোট বাচ্চারাও বুঝবে। মাঝে মাঝে কি যে বোকামি করে বসে, নিজের বোকামির কান্ডের প্রতি মাঝে মাঝে নিজেই ক্ষিপ্ত হয়ে যায় সে।
আরহি এবার একটু সংকোচ নিয়ে মিনমিনে গলায় বলে,,

” স্যার আপনি একটা নিন। ”

সাফি মনে মনে আওড়ালো,,

” যাক তাহলে মনে পরেছে পাশে বসে থাকা অসহায়ব্যাক্তি টার কথা। ”

সাফি ড্রাইভ করতে করতে গম্ভীর কন্ঠে বলে,,

” না তুমি খাও। ”

আরহি এবার একটু সাহস নিয়ে বলে,,

” নিন একটা স্যার ”

সাফি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে কিছু ভেবে জবাব দিলো,,

” আমি ড্রাইভ করছি এখানে গাড়ি থামানো যাবে না। তুমি খেয়ে নাও। ”

আরহি কিছু সময় ফুসকার দিকে তাকিয়ে রইলো। মানুষটা মানবতা দেখিয়ে তার জন্য ফুসকা এনেছে। তাকে রেখে কি ফুসকা খাওয়া ঠিক হবে। না বিষয়টি একদম ঠিক হবে না। মানুষটাকে দেওয়া উচিত। সেও মানবতার খাতিরে খাইয়ে দিতেই পারে। কিন্তু বড় বিষয় হলো সাফি। সে যে কি মনে করে মানুষটাকে ভীষণ পায় সে। আর নিজেও আগ বাড়িয়ে বলা বিষয়টা কেমন দেখায়। কিন্তু সেও তো আগ বাড়িয়ে তার জন্য ফুসকা এনেছে।
আরহি নিজের দ্বিধা দন্দ কাটিয়ে মনে সাহস নিয়ে বলে,,

” আমি খাইয়ে দেই ”

সাফি তার পরিকল্পনায় সম্পূর্ণ সফল হলো। সে তো এটাই চেয়েছিলো, গাড়ি চালানো এটা তো শুধু বাহানা মাত্র। আরহি যা নিয়ে দ্বিধা দন্দে আছে, সেই মানুষটা যে তারই অপেক্ষায় বিষয়টি আরহির শুধু অজানা নয় এ যেন তার ভাবনার দূর দূরেরও বাইরে। সাফি গাড়ি চালাতে চালাতে বলে,,

” হুম দিতে পারো ”

মানবতার খাতিরে সে তো বলে ফেললো কিন্তু এখন তো তার অসম্ভব হাত কাপছে। মানুষটার প্রতি যতবার মায়া আর মানবতা দেখাতে গিয়েছে ততবারই বিপদে পরেছে সে। তবুও একই ভুল বার বার করে বসে সে।
কিন্তু এখন তো সে ভুল আবার করেই ফেলেছে সে, আর তো কোনো উপায়ও নেই। আরহি বাধ্য হয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে সাফির মুখের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলো ফুসকা। আরহির কাঁপা কাঁপা হাত দেখে নিশব্দে হেঁসে খেয়ে নিলো ফুসকাটা সাফি। আরহি তড়িৎ গতিতে সরিয়ে নিলো তার হাত। আজ ফুসকার স্বাদ অন্য রকম লাগলো সাফির কাছে। আর লাগাটাও স্বাভাবিক অন্য দিন তো আর প্রিয়জনের হাতে ফুসকা খাওয়ার সৌভাগ্য হয় না তার।
আরহি আর একটা ফুসকা সাফির দিকে বাড়াতেই সাফি বলে উঠে,,

” না না তুমি খেয়ে নাও। ”

আরহি ভ্রু কুচকে দৃষ্টি রাখলো সাফির দিকে। একটা মাত্র ফুসকা খাবে এ কেমন কথা। তাকে অন্তত আর একটা খেতে হবে। আর এমনিতেও সে ছোট থেকে শুনে আসছে এক লোকমা কখনও খেতে হয় না।
আরহি সহজ সরল মন নিয়ে বলে,,,

” এক লোকমা কখনও খেতে হয় না ”

সাফি ঠোঁট চেপে হাঁসছে নিশব্দে। আরহির সাথে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত তার সুন্দর যায়। এক মুহুর্তের জন্য তার মনটা খারাপ হয় না।
ছোট বেলায় বড়দের মুখে এ কথা অনেক শুনেছে। তবে এখন এতো বড় হয়েছে এসব কথা বিশ্বাস করে কে। ছোট বেলায় না বুঝে বিশ্বাস করেছে, আর তাদের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে বড়রা তাদের খাবার খাইয়েছে।
আজ বহুবছর পর এ কথা শুনলো সাফি। তাও আবার ছোট বেলার মতো খাবার খেতে না চাইলে বড়রা যেভাবে হুমকি দিতো। সাফি একটু না জানার ভনিতা করে গাড়ি চালাতে চালাতে বলে,,

” কেন? কি হয় তাহলে? ”

আরহি আবারও বোকা হয়ে গেলো সাফির চতুরতায়। সহজ সরল মন নিয়ে কথার ফেলে বলে উঠে,,

” কেন আপনি জানেন না, এক লোকমা খাবার খেলে তার বউ বা স্বামী এক ঘুষিতে তাকে মেরে ফেলে। ”

সাফির হাঁসি চেপে রাখতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। বাইরে দিকে বার বার তাকাচ্ছে আর জিহবা দিয়ে তার ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছে। মেয়েটার এই সরলতাই ভীষণ ভাবে ভালো লাগে তার। সাফি অনেক কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক করে গাড়ি চালাতে চালাতে বলে,,

” তুমি এসব বিশ্বাস করো ”

আরহি কোনো ভাবনা চিন্তা না করেই জবাব দেয়,,

” না বিশ্বাস করার কি রয়েছে। বড়রা বলে আপনি শুনেন নি। ”

সাফি শুকনো কাঁশি দিয়ে বলে,,

” আচ্ছা আরহি একটা কথা বলোতো ”

” হুম বলুন ”

” কাউকে এক ঘুষি দিয়ে মারার শক্তি তোমার রয়েছে। ”

আরহি বোকার মতো সাফির কথার মারপ্যাঁচ ধরতে পারলো না। আর ধরবেই বা কি করে আরহির চিন্তাধারা ওদিকে যাই নি। আরহি মারামারি, খুনখারাবি, ঝগড়া ভীষণ ভয় পায় সে। সে অতি সাদা মাটা স্বভাবের মেয়ে। এসবে নেই সে, বরাবরই ঝামেলা থেকে দূরে সরে থেকেছে সে। আরহি ভয়ার্ত কন্ঠে বলে,,

” আমি মারবো মানুষকে। না না আমার এতো সাহস নেই। আমি এসবে ঝগড়া, ঝামেলা, খুনখারাবিতে নেই আমার ভীষণ ভয় করে। ”

আরহি যে তার কথার মারপ্যাঁচ ধরতে পারবে না তা খুব ভালো করে জানা সাফির। আরহিকে সে খুব ভালো করে চিনে। সাফি নিশব্দে মনে মনে হেঁসে আরহিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,

” দাও খাইয়ে দাও। বউয়ের হাতে মার খেয়ে মরতে চাই না আমি।”

আরহি নিশব্দে মুচকি হাঁসলো এই ভেবে সাফি স্যার বিয়ে না করতেই বউয়ের ভয় পায়। স্যারকে জব্দ করতে পারবে এমন মেয়ে তার বউ হলে মন্দ হয় না। তার বদলা নিবে, ভাবতেই ভালো লাগছে আরহির।
আরহি খুশি মনে এগিয়ে দিলো সাফির দিকে ফুসকা। এই বার আরহির আর হাত কাঁপলো না। তবে পুরো শরীর কেঁপে উঠলো তার। প্রথম বার সাফি আরহির আঙ্গুলে নিজের ঠোঁট না স্পর্শ করালেও এবার নিজ ইচ্ছায় আরহির আঙ্গুলে তার ঠোঁট স্পর্শ করেছে সাফি। আরহি ঝড়ের গতিতে সরিয়ে নিয়ে আসে তার হাত।
পুরো শরীর কেঁপে উঠেছে তার। যেন বিদ্যুৎ এর ঝংকার বয়ে গেলো তার মধ্যে দিয়ে।
সাফি বাইরে তাকিয়ে ডান হাতের বৃদ্ধা আঙ্গুল একবার কয়েক সেকেন্ড এর জন্য তার ঠোঁটে স্পর্শে করে সরিয়ে নিয়ে মনে মনে আওড়ালো,,

” তোমার ভালোবাসায় মরতে চাই আমি। যদি তোমার ভালোবাসায় আমায় মারতে চাও তবে আমি হাঁসি মুখে এ মরন বরন করতে রাজি। ”

সাফি ড্রাইভ করতে করতে আরহিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,

” ড্রয়ারে পানির বোতল রয়েছে ফুসকা খাওয়া শেষ হলে খেয়ে নিও। ”

আরহি আর অপেক্ষা করলো না। তড়িৎ গতিতে ড্রয়ার থেকে পানি বের করে এক নিশ্বাসে অর্ধেক পানি খেয়ে নিলো সে। সাফি মিটিমিটি হাঁসছে আরহির কর্মকান্ডে। এই মেয়ে তাকে পাগলের খাতায় নাম লিখিয়ে ছাড়বে৷ তবে পাগল হতে তার আপত্তি নেই যদি এই পাগলটিকে তার প্রিয়সিনী সামলে নেয়।

চলবে কি????????

আপনাদের সাপোর্ট পেলে কন্টিনিউ করবো। 🙂🙂

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here