আমরন_চেয়েছি_তোমায় #লেখায়_সুরাইয়া_নওশিন ১১

0
308

#আমরন_চেয়েছি_তোমায়
#লেখায়_সুরাইয়া_নওশিন

১১
সাফি ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের অনেক প্রিয় শিক্ষক। বরাবরই সকল শিক্ষার্থীদের সাথে তার মার্জিত ব্যবহার। ছেলে – মেয়ে সবার সাথে একই রকম সুন্দর ব্যবহার। তাকে সবাই যেমন ভয় করে, শ্রদ্ধা করে ঠিক তেমন ভালোও বাসে। তার উপর কেউ কোনো দোষারোপ করতে পারে নি আজ পর্যন্ত। কোনো শিক্ষার্থী তার কাছে যেকোনো সমস্যার কথা বললে সে চেষ্টা করেছে সে সমস্যার সমাধান করার। অহেতুক কারও সাথে রাগ দেখিয়ে কথা বলে নি সে। তাই তার সম্মানটা যেন শিক্ষার্থীদের কাছে একটু বেশি। আর সাফি চলাফেরা, কথা বলার ধরন, তার সব সময় গুছিয়ে চলা সবার দৃষ্টি কারে বরাবরই।

টুর্নামেন্ট এর জন্য ভার্সিটির ক্লাস হচ্ছে। সারা থাকলে অনেক ভালো হতো। সারার সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে পারতো। আড্ডায় সারা না থাকলে আরহির জমে না। আরহি দোতালায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে মাঠে খেলা দেখছে। পাশে মনিরা, ফাহমিদুল, কাওসারও দাঁড়িয়ে আছে। তারা কথা বলছে, মাঝে মাঝে আরহিও দু-একটা জবাব দিচ্ছে। আরহির মাঠে দাঁড়িয়ে থাকতে চোখ যায় নেভি ব্লু আর কালো রঙের মিলিয়ে জার্সি পরে মাঠের দিকে আসছে সাফি। তারপর ভার্সিটির স্যারদের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আরহি নিজেও জানে না সে কেন তাকিয়ে রয়েছে সেদিকে। আরহির ঘোর কাটে মনিরার কথায়,,

“এ আরহি মাঠে চল, স্যার রাও খেলবে। চল গিয়ে দেখি।”

মনিরা একপ্রকার জোর করে আরহির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো। সকলে অনেক আগ্রহ নিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শিক্ষকদের খেলা দেখার জন্য। আরহিও মাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে এখনও খেলা শুরু হয় নি। আরহি ফোন বের করে ভিডিও করছে সারাকে দেখাবে বলে। এমন সময় সাফি এসে হাজির। আরহি সাফিকে দেখে ভিডিও করা বন্ধ করে দেয়। সাফিকে তার কাছে আসতে দেখে একটু অবাক হলো আরহি। সাফি তার প্যান্টের পকেট থেকে দুটো ফোন আর মানিব্যাগ বের করতে করতে বলে,,

” এটা রাখো তোমার কাছে। ফোন আসলে ডাক দিও আমাকে। ”

আরহি হ্যাঁ না কিছু বলার আগেই আরহির হাতে ধরিয়ে দিয়ে আবারও চলে গেলো মাঠের দিকে। সারা আর আরহির সাথে সাফির সম্পর্ক ভার্সিটির সবাই অবগত তাই এই সব বিষয়ে কেউ নজর দেয় না৷ আর সাফির সম্পর্কে সবারই ভালো ধারণা। তার স্বভাব, চরিত্র, তার ব্যাক্তিত্ব এসব সম্পর্কে সবাই অবগত। আরহি বোকার মতো দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো সাফির যাওয়ায় দিকে। হুট করে কাজ দিয়ে চলে গেলো, একটা মানুষের কাছে শোনা তো প্রয়োজন তার কোনো সমস্যা রয়েছে কি না। কেমন আজব মানুষ, সব সময় তার মর্জি চালায়।
এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে সে কত সময়। আরহি বিরক্ত হয়ে তার হাতে থাকা ব্যাগে সব কিছু ঢুকিয়ে রাখে।
ফাহমিদুল আরহিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,

” স্যার কাজ বাঁধিয়ে দিয়ে গেলো। তুই দাঁড়িয়ে থাক, কিছু সময় পর আমরা ফুসকা খেতে যাবো। তোর যেতে হবে না। ”

আরহি অসহায় কন্ঠে বলে,,

” আমাকে রেখে একা যাবি তোরা। তোদের পেটের অসুখ হবে দেখিস। ”

মনিরা আরহির দিকে তাকিয়ে বলে,,

” আমাদের কি দোষ। এখন তোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকবো। ”

” সারাই আমার প্রকৃত ফ্রেন্ড। তোরা কেউ না, যা এখান থেকে। ”

মনিরা হাঁসতে হাঁসতে বলে,,

” ঠিক আছে সারা তোর প্রকৃত ফ্রেন্ড। আমরা কেউ নই। তাহলে সামলা তোর প্রকৃত ফ্রেন্ডের ভাইয়ের জিনিস। ”

আরহি মুখ বাঁকায় তাদের দিকে তাকিয়ে। খেলাও শুরু হয়েছে এর মাঝে। সাফিও মিশে গিয়েছে ছাত্রদের মাঝে। তাকে দেখে কে বলবে তিনি শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের মাঝে তাকে শিক্ষার্থীদের মতো লাগছে একদম। ফর্সা গাল রোদে ঘেমে লাল হয়ে গিয়েছে। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে দূর থেকে স্পষ্ট দেখতে পারছে আরহি। আরহি কিভেবে আবারও ফোন বের করে ভিডিও করে সাফির খেলা। নিজের এমন কর্মকান্ডের কারন নিজের কাছেও জানা নেই আরহির। তবে তার মন চাইছে সে করছে। কিছু সময় পর ফোন রেখে দিলো সে। আবারও দৃষ্টি রাখলো সেদিকে। খেলা দেখতে একদম বিরক্ত লাগছে না তার। খেলাধুলা তার কাছে বিরক্তিকর বিষয় তবে আজ কেন জানি বিরক্ত লাগছে না। বেশ ভালোই লাগছে দেখতে। প্রথম গোলটা সাফি করলো। পুরো ক্যাম্পাস চেঁচিয়ে উঠে খুশিতে। মাঠে খেলায় থাকা শিক্ষার্থীরা খুশিতে জড়িয়ে ধরে সাফিকে। সাফির ঠোঁটে স্মিত হাঁসি রেখা। আরহির বেশ ভালো লাগছে দেখতে।
কাওসার বলে উঠে,,

” সাফি স্যার দিয়েছে একটা গোল। খেলা জমে উঠেছে। স্যার প্রতিবার অসাধারণ খেলে।”

ফাহমিদুল মাঠের দিকে তাকিয়ে বলে,,

” স্যার অলরাউন্ডার মানতেই হবে। গেটআপ, স্টাইল, পড়াশুনা, খেলাধুলা সব দিকেই পারফেক্ট। ”

মনিরা ফাহমিদুল কাওসারকে উদ্দেশ্য করে বলে,,

” তোরা কিছু শিখে রাখ। নজর দেওয়া বাঁধ দিয়ে। ”

কাওসার মনিরার দিকে তাকিয়ে বলে,,

” নজর আমরা নয়, তোরা মেয়েরা দিশ। ”

মনিরা কাওসার এর মাথায় গাট্টা মেরে বলে,,

” ফালতু কথা বলবি না। আমরা মেয়েরা সাফি স্যারকে নিয়ে কখনও উল্টো পালটা কথা বলি না। স্যারকে সম্মান করি, স্যার যথেষ্ট ভালো। তোদের মতো না, বে*য়াদব একটা। আজ সারা থাকলে তোর যে কি হাল করতো। ”

কাওসার হাঁসতে হাঁসতে বলে,,

” এই জন্য বলেছি। আরহি তুই কিন্তু সারাকে কিছু বলিস না। ”

তাদের কথোপকথন বেশ বিরক্ত লাগছে আরহির কাছে। কাওসার সব সময় উল্টো পালটা কথা বলবে। মন চাচ্ছে মাথা ফাঁটিয়ে দিতে। এসব মন্তব্য করার মানে কি। রাগে গাঁ জ্বলে যাচ্ছে তার। আরহি তাই কোনো জবাব দিলো না। মনিরা আবারও বলে উঠে,,

” চল ফুসকা খেয়ে আসি। খুব খুদা পেয়েছে আমার।”

ফাহমিদুল অনেক উৎসাহ নিয়ে খেলা দেখতে দেখতে বলে,,

” দোস্ত প্লিজ আর একটু দেখি না। খেলা টা জমে উঠেছে। ”

মনিরা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে,,

” এ তুই যাবি নাকি। ”

মনিরা আরহিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,

” মন খারাপ করিস না দোস্ত। তোর জন্য আনছি। ”

কাওসার এর উপর রাগ আরহি খাবার এর উপর খাটালো। বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে,,

” খাবো না আমি। তোরা খা। ”

মনিরা আরহির কাঁধে হাত রেখে বলে,,

” রাগ করিস কেন দোস্ত। আমরা তখন মজা করলাম। আমরা কেউ কাওকে ছাড়া কিছু খেয়েছি বল। ”

আরহি এবার মুখে হাঁসি এনে বলে,,

” আমি রাগ করি নি। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।তোরা যা।”

” সত্যি বলছিস। ”

” তিন সত্যি। ”

মনিরা ফাহমিদুল কাওসার সেখান থেকে চলে গেলো। আরহি একা দাঁড়িয়ে রইলো। আশেপাশে অনেক শিক্ষার্থী কিন্তু সবাই অচেনা। আর সকল সহপাঠীদের সাথে খুব বেশি কথা হয় না সারা আর আরহির। মনিরা ফাহমিদুল আর কাওসার এর সাথে কথা বার্তা হয়। ঘুরাফেরা খুব বেশি হয় না সাফির জন্য। বেশিরভাগ সময় ভার্সিটি সেই নিয়ে আবার নিয়ে যায়। তাই ঘুরাফেরা সুযোগ হয় না। তবে বিষয়টা নিয়ে তেমন আফসোসও হয় না। সারা আর আরহি দুজন অনেক সুন্দর সময় কাটায়। আর মাঝে মাঝে সাফি নিয়ে যায় ফুসকা বা চায়ের স্টলে যেদিন তার ব্যস্ততা কম থাকে। কড়া শাসন করলেও একটু বিনোদনের সুযোগ দেয় তাদের। আরহি ভীড় থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। এখানে খুব বেশি শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে নেই দূরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। আরহি কিভেবে সাফির ফোন হাতে নেয়। এক ফোন হাতে নিয়ে বাটনে চাপ দিতেই ফোনে ভেসে উঠে তার দৈনন্দিন রুটিনের ছবি। আরহি মুখ বাঁকিয়ে বলে,

” বোরিং। ”

আরহি আরেক ফোনের বাটনে চাপ দিলো ভেসে উঠলো সেই ছবি দুটো ছায়া। আরহি কপাল কুচকে দেখতে থাকলো ছবিটা। জায়গা চেনা চেনা লাগছে। আশেপাশে কৃষ্ণচূড়া ফুল ছড়িয়ে আছে। এর মাঝে দুটো ছায়া৷ আরহি জায়গা দেখে মনে হচ্ছে এটা রমনার পার্ক। সারা,সাফি, আয়াদ আর আয়রার সঙ্গে ঘুরতে গেয়েছিলো সে। আরহির মাঝে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সাফি আর তার প্রেমিকা নয়তো। আর থাকলে থাকলো এতে তার কি। সে এসব কেন ভাবছে। নিজের ভাবনা চিন্তার উপর নিজের রাগ হলো আরহির।
আরহির নজর পরলো সাফি তার দিকে দৌড়ে আসছে।আরহি দ্রুত ফোন ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো। ঘেমে জার্সি তার গায়ের সঙ্গে লেপ্টে রয়েছে। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে। কপালে পরে থাকা ছোট ছোট চুল ঘামে লেপ্টে আছে কপালে। সাফি আরহির কাছে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলে,,

” ফোন দিয়েছে কেউ। ”

আরহি এদিক ওদিক মাথা নাড়িয়ে বলে,,

” না ”

সাফি আরহির পাশে দাঁড়িয়ে এক হাত কোমড়ে রেখে আর এক হাতের তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে। মুখটা ভীষণ ক্লান্ত লাগছে তার। আরহি আবারও ভুল করলো, মায়া হলো মানুষটির উপর। আরহি বার বার বলে এই মানুষটার উপর মায়া করবে না। কিন্তু আরহি বার বারই মায়া করে বসে। নিজেই অভিশাপ দেয় আবার নিজেরই মায়া হয়। আজব কান্ড করে বসে মানুষটির ক্ষেত্রে। আরহি ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে সাফির সামনে ধরে। সাফি পানির বোতলের দিকে ভ্রু বাঁকিয়ে তাকিয়ে বলে,,

” বাহ, ভালো বুঝো তুমি। থ্যাংকস। ”

সাফির প্রশংসা খুবই কম শুনতে পায় আরহি। বরাবরই শাসন আর জ্ঞ্যান দুটোই সাফির থেকে পেয়ে থাকে সে। সাফির থেকে প্রশংসা শুনে আরহি খুশিতে আধখানা। প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে। সাফির প্রতি তার বিরক্ত থাকলেও তার মুখে প্রশংসা শুনতে ভীষণ ভালো লাগে তার।
সাফি পানির বোতল নিয়ে বসে কিছু পানি খেয়ে নিলো। এরপর দাঁড়িয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে ধুঁয়ে নিলো। আরহি চুপচাপ দাঁড়িয়ে সাফির কান্ড দেখছে।
চোখে মুখে পানি দিয়ে সাফি পানির বোতল আরহির দিকে বাড়িয়ে বলে,,

” রেখে দাও। ”

আরহি পানির বোতল নিয়ে আবারও ব্যাগে রেখে দিলো। এই সময় রিমন স্যার আর ফরহাদ স্যার ছুটে আসলেন সাফির কাছে। আরহি একটু পিছিয়ে দাঁড়ালো স্যার দের আসতে দেখে। স্যার দের ভীষণ ভয়, পড়াশোনা ভীষণ ফাঁকিবাজি সে৷ এ জন্য সুযোগ পেলেই সাফিকে নালিশ করে। এরপর সাফির শাস্তি সারারাত জেগে এক অধ্যায় শেষ করে তার কাছে পরীক্ষা দিতে হয়। এই জন্য মোটামুটি ভালো নম্বর পায় সে। নয়তো ফেল এর খাতায় নাম নিশ্চিত। তার মতো একই অপরাধে অপরাধী সারা। দু’জনের একই স্বভাবের জন্য সাফি এক সাথে কত বকেছে তাদের বিন্দুমাত্র শুধরায়নি দুজন। কয়দিন ভালোমানুষি দেখিয়েছে আবার যেমন রুপ সে রুপেই ফিরে আসে তারা। সাফি এখন খুব বেশি বকার সুযোগ পায় না কাজের চাপে। নয়তো এতোদিন কত বার রাত জেগে এক অধ্যায় শেষ করে সকালে এসে সাফির কাছে পরীক্ষা দিতে হতো তার হিসেব নেই। এই জন্য বার বার উপরওয়ালা কাছে শুকরিয়া আদায় করে আর দোয়া করে মানুষটা এমন ব্যস্ত থাক। আর কোনো রকম এই অনার্সের গন্ডি পার হলেই হবে। ভালো সিজিপিএ দরকার নেই তার। সে তো আর চাকরি করবে না। ঘর সংসারে মন তার এতো পড়াশুনোয় কাজ নেই তার।
কিন্তু এসব কথা সাফিকে বলার সাহস নেই আবার তার পরিবারকেও। তাকে ঝুলিয়ে বেঁধে রাখবে সবাই।

লিমন স্যার হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,,

” প্রতি বছর আর হারা যাচ্ছে না। নেক্সট ইয়ারে জিততে হবে। সাফি স্যারকে আমাদের দলে আনতেই হবে। ”

সাফির মুখে স্মিত হাঁসি রেখে বলে,,

” দুই বছর হারতেই হবে স্যার। এর আগে সম্ভব নয়। ”

ফরহাদ স্যার হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,,

” এ কি কথা স্যার। আপনার কেরিয়ার এখন সম্পূর্ণ স্ট্যাবল এতো দেরি কেন? বিয়ে সাধি করে নিন স্যার। টাকা খরচ করার তো মানুষ চাই। এতো কাজ আর এতো ব্যস্ততা কত দিন একটু রিলেক্স হোন। ”

সাফি নিশব্দে মুচকি হাঁসে। রিমন স্যার মজার ছলে বলে,,

” বুঝছেন না স্যার। ভাবির ও তো কেরিয়ারে স্ট্যাবল হতে হবে নাকি। প্রফেসর সাফি মেহতাব খান এর সহধর্মিণী বলে কথা। তারও তো স্যারের জন্য যোগ্য হতে হবে। ”

ফরহাদ স্যার হাঁসতে হাঁসতে বলে,,

” আমাদের ভাবির কেমন যোগ্যতা থাকতে হবে শুনি। ”

সাফি আবারও নিশব্দে মুচকি হেঁসে জবাব দেয়,,

” তার মাঝে আমার মানসিক শান্তি খুঁজে পেলেই হবে। ”

রিমন স্যার আর ফরহাদ স্যার এক সাথে ব্যঙ্গ করে বলে উঠে,,

” ওহ। ”

তারা পেছনে এবার আরহিকে দেখে চুপ হয়ে গেলেন। স্যারদের মজা ঠাট্টা বেশ আনন্দের সহিত উপভোগ করছিলো আরহি। স্যাররাও এমন মজা করে আরহির ধারণা ছিলো না। তবে সাফির শেষ উক্তি বিস্মিত করে আরহিকে। এই মানুষটার হুটহাট কিছু আচরণে, কিছু কথায় মাঝে মাঝে অবাকের চরম সীমায় পৌঁছে যায় আরহি। আরহির ধারণার বাইরে থাকে সাফির কিছু আচরণ আর তার কথা গুলো। আরহিক এবার ভীত গলায় স্যারদের উদ্দেশ্যে সালাম দেয়,,

” আসসালামু আলাইকুম স্যার ”

আরহির মনে ভয় এই তো নালিশ দিলো। এই সপ্তাহে ক্লাস টেস্ট পিছিয়ে পরের সপ্তাহে দিয়েছে। কিন্তু তার প্রস্তুতি হাত দিয়েও স্পর্শ করে নি। ফিন্যান্স ভীষণ কঠিন সাবজেক্ট আরহির সহজ সরল মাথায় প্রবেশ করে না। বইটা ঘুমের ঔষধ এর মতো কাজ করে,আরহি আর খুলে দেখে না। আর দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস ঠিক ভাবে শুরু হয় নি। তার আগেই রিমন স্যার ক্লাস টেস্ট দিয়ে রেখেছে। এই স্যার ক্লাস টেস্ট ছাড়া কিছু বুঝে না। এর আগের সপ্তাহে ক্লাস টেস্ট নিয়েছে নম্বর কম পাওয়ায় চা বিক্রেতার সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে সাফি। আবারও যদি সে প্রসঙ্গ তুলে নিশ্চিত বাসায় বলে দিবে, নয়তো বকবে সাফি। আজ তো সারাও নেই দুজন ভাগাভাগি করে কথা শুনবে। একাই হজম করতে হবে তার। ভাবতেই গলাটা শুকিয়ে আসছে আরহির। রিমন স্যার মুচকি হেঁসে বলেন,,

” ওয়ালাইকুম আসসালাম ”

আরহিকে আর কিছু বললেন না। তিনজন স্যার কিছু সময় গল্প করে রিমন স্যার,ফরহাদ স্যার চলে গেলেন। আরহি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো তাদের যাওয়া দেখে।
সাফি আরহির দিকে হাত বাড়ায়। আরহি সাফির হাতের দিকে একবার তাকায় এরপর অবাক হয়ে সাফির দিকে তাকিয়ে বলে,,

” কি স্যার ”

” দাও ”

আরহি অবাক হয়ে বলে,,

” কি দিবো?”

সাফি দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,

” আমার ফোন আর মানিব্যাগ ”

আরহির তৎক্ষনাৎ মনে পরে যায়। মাঝে মাঝে কি যে বোকার মতো কান্ড করে বসে। আরহি ব্যাগ থেকে দুটো ফোন আর মানিব্যাগ বের করে সাফির হাতে দিলো। সাফি কপাল কুচকে বলে,,

” এতো মন ভুলো তুমি। তোমাকে দিয়ে যে কি হবে। যাও ক্লাসে যাও, আধঘন্টার ভেতর আমি আসছি। আজ আর ক্লাস হবে না। আমি বাসায় নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে।

সাফি আর না দাঁড়িয়ে থেকে সামনের দিকে পা বাড়ায়। সাফি ঠোঁট চেপে নিশব্দে হাঁসছে। মেয়েটাকে ইচ্ছে করে বিভ্রান্তিতে ফেলে সে। ভালো লাগে তার মেয়েটার এমন বোকা বোকা স্বভাব। তার সাথে এমন মজা নেওয়ার লোভ সামলাতে পারে না সাফি।

আরহি সেখানে দাঁড়িয়ে রাগে ফুসছে। কয়েক মুহুর্তে গাল আর নাক লাল হয়ে গিয়েছে রাগে তার। মানুষটার মাঝে নুন্যতম কৃতজ্ঞতা বোধ নেই। এতোক্ষণ যাবৎ তার ফোন আর মানিব্যাগ সামলে রেখেছে একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিলো না। আর দায়িত্ব তো আগ বাড়িয়ে দিয়েছে সে। ভালো মন্দ কিছু শোনার প্রয়োজন টুকু মনে করে নি। হুকুম করে চলে যায় মানুষটা। কিভাবে কি নিজেকে। এই মানুষটার উপর মায়া করে তার পানি দেওয়া উচিত হয় নি। এই মানুষকে সারাদিন পানি তৃষ্ণায় রাখা উচিত। আর মায়া করবে না সে। এইসব ভাবতে ভাবতে আরহি রাগে গজগজ করতে করতে ক্লাস রুমের দিকে চলে যায়।

__~~~~~__~~~~~___~~~~~___

সকালে হসপিটালে ফোন দিয়ে সাইফ রেজওয়ান শিকদার যখন জানতে পারে সানি অসুস্থ থাকায় আজ হসপিটালে আসে নি তৎক্ষনাৎ সকল পরিবারের সদস্য বেরিয়ে পরে খান বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাইফ রেজওয়ান শিকদার বিগত ১৫ বছরে খান বাড়িতে প্রবেশ করেনি।
শিকদার বাড়ির স্নেহের সন্তান সানি মেহরাজ শিকদার। কারন শিকদার বাড়ির প্রথম পুত্র সন্তান সানি মেহরাজ শিকদার। এরপর দীর্ঘ ২২ বছর পর সাইফ রেজওয়ান শিকদার এর ছোট ভাই শিপন তাজওয়ার শিকদার এর ঘরে জন্ম নেয় রেজা সাজিদ শিকদার। তার বয়স এখন ৪ বছর। সাইফ রেজওয়ান শিকদার এর দুটো কন্যা সন্তান। বড়মেয়ের নাম তুলি শিকদার সে সানির থেকে চার বছরের বড়। লন্ডনে খুব সুন্দর ঘর সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। আর ছোট মেয়ে #তোহা_শিকদার সানির থেকে দুই বছরের ছোট। মেয়ে হয়ে শিকদার বাড়ির এতো বড় ব্যবসা সামলাচ্ছে। কথায় এবং কাজে তূখর সে। বড় মেয়ে যতটা শান্ত ছোট মেয়ে ততটা চঞ্চল এবং সাহসী। সম্পূর্ণ স্বভাব নিয়েছে সাইফ রেজওয়ান শিকদার এর। মেয়ে হলেও কর্মকান্ড সম্পূর্ণ ছেলেদের মতো। তবে সে আসে নি কারন সানির উপর ক্ষিপ্ত সে। সানিকে নিয়ে সবার এতো মাতামাতি একদম পছন্দ নয় তার । শিপন তাজওয়ার শিকদার এর আর এক কন্যা নাদিয়া শিকদার৷ এবার সপ্তম শ্রেণীতে পা রাখলো সে। সাইফ রেজওয়ান শিকদার এর খান বাড়িতে আসার কারন তার চোখের মনির অসুস্থতার কথা শুনে। বরাবরই সানি শিকদার বাড়িতে গিয়েছে কিন্তু কখনও থাকে নি তার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে। কিন্তু এবার দেশে ফিরে আর যায় নি শিকদার বাড়িতে। প্রোগ্রামে কয়েক মিনিট দেখা হয়েছিলো ব্যস্ততার জন্য থাকতে পারে নি সে। আর খান বাড়ির কারও সম্মুখীন হতে চায় না সে। বাধ্য হয়ে খান বাড়িতে পা রাখছে সে। ১৫ বছর আগে এসেছিলো এর কারনও ছিলো সানির অসুস্থতা। আজ ১৫ বছর পর পা রাখছে এর কারনও সানির অসুস্থতা। এ নিয়ে তিন বার খান বাড়িতে প্রবেশ করছে সে। পর পর পাঁচটা কালো রঙের গাড়ি প্রবেশ করে খান বাড়িতে। সারা বেলকনিতে বসে ছিলো। এতো গাড়ি খান বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে চমকে গিয়ে দৌড়ে নিচে যায় সারা। শায়লা বেগম, শাহানা বেগম আর নূর জাহান বেগম এক সঙ্গে দুপুরের খাবার তৈরি করছে। কাজের লোকজন সব কাজ করলেও রান্নার কাজটা তারা ইচ্ছে করেই করে। নিজেদের রান্না নিজেদের মতো করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তারা। আর বাড়ির পুরুষদেরও এ অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছে।
সারা চেচিয়ে বলে,,

_ আম্মু, মামুনি, ছোট আম্মু দেখো কারা আসছে। পাঁচটা পাঁচটা কালো রঙের গাড়ি ঢুকতে দেখলাম আমাদের বাড়িতে।

বাড়ির মহিলা সদস্য দের বুঝতে বাকি রইলো না কারা এসেছে। সানি অসুস্থ আর এভাবে শিকদার বাড়ির লোক জনেরাই আসবে। আবার কি কান্ড হয় কে জানে। বাড়ির মহিলা সদস্যরা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে আসে। সাইফ রেজওয়ান শিকদার হনহন করে খান বাড়িতে প্রবেশ করে। শায়লা বেগম সালাম দিলেন,,

” আসসালামু আলাইকুম বড় ভাই। ”

সাইফ রেজওয়ান শিকদার সালামের জবাব নিলেন না। বরং সিড়ি বেয়ে হনহন করে উপরে উঠলেন উদ্দেশ্য সানির কক্ষ। তার পেছন পেছন গেলেন শিপন তাজওয়ার শিকদার।
তবে সাইফ রেজওয়ান শিকদার এর সহধর্মিণী রেহেনা বেগম আর শিপন তাজওয়ার শিকদার এর সহধর্মিণী
শেফালী বেগম হাঁসি মুখে কথা বলে তারাও পা বাড়ালেন গেলেন সানির কক্ষের দিকে। পেছন পেছন আসে খান বাড়ির মহিলা সদস্যরা। সারার বুঝতে বাকি রইলো না এরা কারা। সারা তো খান বাড়ির পুরুষদের খলনায়ক উপাধি দেয় এদিকে শিকদার বাড়ির পুরুষরা তো মহা খলনায়ক। কি ভয়ানক গম্ভীর মুখ ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসছে সারার। সারা ভীতু মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো দরজার কোনে। সানির জ্বর কমে যাওয়ায় ঘুমিয়ে ছিলো সে। সারারাত তো দুচোখের পাতা এক করতে পারে নি সে। সাইফ রেজওয়ান শিকদার সানির মাথার কাছে বসে। সানি উপর হয়ে শুয়ে আছে। শিপন তাজওয়ার শিকদার সানির পাশে বসে পরে। সাইফ রেজওয়ান শিকদার সানির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম কন্ঠে বলে,,

” সানি আব্বু ”

সানি আড়মোড়া দিয়ে উঠে। ঘুম ঘুম চোখে পিট পিট করে তাকায় সে। সাইফ রেজওয়ান শিকদারকে দেখে মুহুর্তে ঘুমের রেশ কেটে যায় তার। ধরফরিয়ে উঠে বসে সে,,

” বড় আব্বু আপনি।”

সাইফ রেজওয়ান শিকদার সানির পিঠে হাত রেখে বলে,,

” এই ভাবে ঘুম থেকে উঠতে হয় না। তোমার শরীর কেমন এখন? কিছু তো বলার প্রয়োজন বোধ করো না। ”

” না না বড় আব্বু তেমন কিছু নয়। একটু ঠান্ডা জ্বর লেগেছিলো এখন জ্বর কমে গিয়েছে। ”

সাইফ রেজওয়ান শিকদার সানির কপালে, গলায়, বুকে হাত রেখে দেখলেন। তাপমাত্রা এখন স্বাভাবিক। শিপন তাজওয়ার শিকদার চিন্তিত কন্ঠে বলেন,,

” সাবধানে চলবে না তুমি। নিজের খেয়াল রাখবে তো তুমি। ”

সানি হাঁসি মুখে জবাব দেয়,,

” অসুস্থতা, হায়াত এসব কি আমাদের হাতে। সবটাই উপরওয়ালার হাতে তিনি রাখেন, তিনি মারেন।”

সাইফ রেজওয়ান শিকদার গম্ভীর কন্ঠে বলে,,

” এসব কোন ধরনের কথা সানি। তোমার কিছু হলে শিকদার বাড়ির কি হবে। শিকদার বাড়ির সম্ভল, অলংকার, শক্তি তুমি। দীর্ঘ বছর বেঁচে থাকো তুমি। ”

সানি নিশব্দে মুচকি হাঁসে। সাইফ রেজওয়ান শিকদার আর শিপন তাজওয়ার শিকদার সানিকে জড়িয়ে ধরে। সানির কপালে চুমু এঁকে বেরিয়ে পরে সেখান থেকে। আর শিকদার বাড়ির মহিলাদের উদ্দেশ্য করে বলে ৫ মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে আসতে। রেহেনা বেগম আর শেফালী বেগম সানিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে কিছু সময়। সানি তাদের যতটুকু পারে শান্তনা দেয়। এরপর তার ছোট ভাই বোন নাদিয়া আর রেজাকে নিজের কোলে নিয়ে কিছু সময় আদর করে। এরপর তারাও বেরিয়ে যায়। সব মিলিয়ে ২০ মিনিটের জন্য এসেছিলো তারা। সারা দরজার কোনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিলো সকল কান্ড। এতো আদরের, এতো স্নেহের সানি শিকদার বাড়ির। শিকদার বাড়ির সবাই চলে গেলো এক এক করে।

চলবে_____
প্লিজ আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক অথবা ফলো দিয়ে আমাদের সাহায্য করুন।
https://www.facebook.com/share/1AYhCCqwqL/
https://www.facebook.com/share/g/1AufQdkZf8/
Follow ✓
আপনাদের কমেন্টের লাইক দেওয়ার মানে হল এই গল্পের পরবর্তী পর্বটি আসছে ,
তাই প্লিজ আপনাদের মন্তব্য জানান…
Comment…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here