আমরন_চেয়েছি_তোমায় #লেখায়_সুরাইয়া_নওশিন ১৪

0
337

#আমরন_চেয়েছি_তোমায়
#লেখায়_সুরাইয়া_নওশিন

১৪
সারার ধরায় যেন প্রান ফিরে আসে। এমনিই তার শ্বাস কষ্টে সমস্যা। তার ভেতর এমন আতংক তার দূর্বল হৃদয় নিতে পারবে না। সারা বিড়বিড় করে বলে,,

” আপনার সময় পেতে হবে না। এই রকম ব্যস্ত থাকুন আপনি। আপনার ব্যস্ততার মাঝে আমি ঠিক আমার সময় বুঝে নিবো। ”

সানি সারার কথা বুঝতে পারলো কি না বুঝা গেলো না। তবে সে ঠোঁট প্রসারিত করে নিশব্দে হাঁসলো।
সারা এবার কথা ঘুরিয়ে বলে উঠে,,

” সাফি ভাই তো বিয়েতে রাজি হয় না। বাংলাদেশের কত জায়গার মেয়ে দেখানো হলো ভাইয়াতো দেখেই না। জার্মানির যদি কোনো সুন্দর মেয়ে আপনার জানা শোনা থাকে তাহলে ভাইয়াকে দেখাতাম তাই আর কি। ”

সারার এমন কথায় সানি চোখ বড় বড় করে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকায় সারার দিকে৷ সানি মনে মনে ভাবে,,

” কি মারাত্মক সাংঘাতিক ভয়ানক মেয়ে ভাবা যায়। কিভাবে কথা ঘুরিয়ে ফেলে৷ ”

সারা দুশ্চিন্তার ভান করে বলে উঠে,,

” ভাইয়াতো আপনার কথা শুনে আপনি যদি বলতেন সাফি ভাইকে।আসলে সাফি ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে সবাই অনেক দুশ্চিন্তা করে। আর করাটাই স্বাভাবিক বলুন,সাফি ভাইয়ের বয়স তো আর কম হলো না। ”

সানি বড়সড় একটা বিষম খেলো সারার কথায়। সানি কাঁশতে কাঁশতে বলে,,

” যাহ পানি নিয়ে আয়। ”

সারা দ্রুত পায়ে গিয়ে সানির জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে। সানি বেলকনিতে রাখা চেয়ারে বসে পানিটুকু খেয়ে বড়সড় একটা শ্বাস নিলো সময় নিয়ে। সানি সারার দিকে দৃষ্টি রেখে মনে মনে ভাবলো,,

” কি মেয়েরে নিজের বিয়ের চক্করে ভাইকে বুড়ো বানিয়ে দিলো। আমার পাগল হতে বেশি দেরি নেই। ”

সারা এগিয়ে গেলো সানির দিকে। শীতল কন্ঠে বলে,,

” সানি ভাই আপনার শরীর খারাপ লাগছে। ”

সানি না সূচক মাথা নাড়িয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে,,

” ঠিক আছি আমি। গলাটা শুকিয়ে এসেছিলো তাই। ”

” এখন ঠিক আছেন তো। ”

” হুম ঠিক আছে ”

সারা এবার অনুনয় স্বরে বলে,,

” সানি ভাই বলবেন তো ভাইয়াকে। ভাইয়ার বিয়ে খাওয়ার অনেক শখ আমার। ”

সানি তার মোটা ভ্রু যুগল বাকিয়ে সারার দিকে দৃষ্টি রেখে বলে,,

” তোর সাফি ভাইয়ের বিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে তুই বল গিয়ে, আমি কেন বলতে যাবো? ”

সারা কপাল কুচকে বলে,,

” কেন আপনার ইচ্ছে করছে না? ”

সানি স্পষ্ট জবাব দিলো,,

” না ”

সারা বেশ বিরক্ত হলো সানির উপর। সানির দিকে বিরক্ত ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,

” নিজেও বিয়ে করবে না, অন্য কারও বিয়ে হোক সেটাও চাইবে না। ”

সানি কিভেবে আবারও বলে উঠে,,

” এটা কোনো জোরজবরদস্তি বিষয় নয়। এটা যার যার একান্তই ব্যাক্তিগত বিষয়, ব্যাক্তিগত সিদ্ধান্ত। সাফি ভাই যখন ভালো মনে করবে তখন তিনি তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিবে। আর জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া এটা একান্তই তার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। তার দৃষ্টিতে যাকে দেখে মনে হবে সে তার সঙ্গে সারাজীবন কাটাতে পারবে তাকেই বিয়ে করবে। এখানে আমার কিছু বলার নেই।”

সারা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সানির দিকে। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো তার কথাগুলো। সারা খুব জানতে ইচ্ছে করছে সানির দৃষ্টিতে কি মনে হয় সারাজীবন তার সঙ্গে কাটাতে পারবে। সে তো পারবে এই মুখটির দিকে তাকিয়ে অনায়েসে জীবন পার করে দিতে। সে তো চেয়েছিলো মানুষটাকে ঘৃণা করতে, অভিমান নিয়ে দূরে থাকতে। কিন্তু ব্যর্থ সে, আবারও আটকা পড়লো একই ভুলের ফাঁদে। ভালোবেসে কিছু মানুষ নির্লজ্জ হয়, সারা ভাবলো সেও নির্লজ্জের দলে৷ নির্লজ্জ না হলে এ দৃষ্টি কেন আটকে যায় বার বার একই মানুষের মুখ পানে। যে মানুষটা তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো নির্লজ্জ না হলে কি আবারও দাঁড়িয়ে থাকে সে মানুষটার সামনে। তার মন নির্লজ্জ না হলে আবারও কি বাজে হৃদয়ে একই সুর। তার সকল রাগ অভিমান কেন হারিয়ে যায়, মন কেন বার বার বলে উঠে #আমরন_চেয়েছি_তোমায়।

সারার স্থির দৃষ্টি দেখে সানি নিশব্দে মুচকি হেঁসে তার মোটা ভ্রু যুগল বাকালো। সারা সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টি সরিয়ে সামনের দিকে তাকায়। দুজনের মাঝে নিরবতা। দুজনের অনেক কিছু বলার থাকলেও মুখ ফুঁটে বলতে পারছে না কেউ। সূর্যের আলোর তাপ একটু কমতে শুরু করছে। সারার মন বেশ উশখুশ করছে একটা প্রশ্ন করতে। ভয়, জড়তা দুটোর কারনে বলতে পারছে না সারা। শুধু রেলিং এর উপর দুই হাত অনবরত নাড়ছে৷ সানি দৃষ্টি রাখলো সারার ফর্সা সরু হাত জোড়ার দিকে।
সানি এবার দৃষ্টি রাখে সারার মুখ পানে। সূর্যের কিরনে লালচে আভা ছড়িয়ে পরছে তার মুখে। পরখ করলো ঘন কালো পাপড়িতে সাজানো চোখ জোড়ার দিকে। এই চোখে বরাবরই দৃষ্টি আটিকে যায় সানির, এ যেন মায়াজাল বুনা জাদুকরী চোখ জোড়া। এ চোখ জোড়া নিয়ে সে হাজারো উপন্যাস লিখতে পারে সানি । সানি শুকনো ঢোক গিলে বলে,,

” চুপ কেন? ”

সারা মনে সাহস জোগালো। দুই হাত শক্ত করে মুঠো করে ধরলো গলায় বাধা ওড়নার ধার। সারা ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে কয়েকবার। কণ্ঠ স্বর আটকে আসছে তার। ভীত গলায় বলে,,

” একটা কথা বলবো সানি ভাই ”

” হুম বল ”

” আপনি কি এমন কাওকে খুঁজে পেয়েছেন। ”

সানি নিশব্দে হাঁসলো। সারা এমন কর্মকান্ড দেখে এটাই আন্দাজ করেছিলো সানি, সারা তাকে এমন কিছু প্রশ্ন করবে। সারা উত্তরের আশায় অধির আগ্রহে তাকিয়ে রইলো সানির মুখ পানে। হৃদয়ের কম্পন বেড়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়। সানি তাকিয়ে আছে দূর আকাশের দিকে, ঠোঁটের কোনে লেগে থাকা স্মিত হাঁসি। সানি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সারার দিকে। সারার অধির আগ্রহের উত্তরের অপেক্ষা দৃষ্টি পরখ করছে সে। কিন্তু এখনও যে উত্তরের অপেক্ষা শেষ হয় নি। জবাব দিবে, যেই দিন লাল বেনারসি পরে প্রিয় মানুষটা অপেক্ষা করবে তার জন্য। তার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ধরা দিবে সে। থাকবে না কোনো বাঁধা, থাকবে না কোনো দূরত্ব। পূর্নতা মিলন ছড়িয়ে পরবে সমস্তটা জুড়ে। তার ভালোবাসা, তার অপেক্ষা, তার ধৈর্য্য বৈধতার খাতায় নাম লিখাবে সে। বাঁধবে পবিত্র বন্ধনে, সকল প্রশ্নের জবাব দিবে সে, সবটা উজাড় ভালোবাসবে তাকে৷ তখন এই পুরো দুনিয়ার সামনে বলতে কোনো বাঁধা থাকবে না #আমরন_চেয়েছি_তোমায়।

সানি আবারও তার দৃষ্টি সরিয়ে নিলো চোখ রাখলো দূর আকাশে। সূর্যটা আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে মেঘের আড়ালে। যেন মেঘ ঢেকে দিচ্ছে সূর্যকে। এখন তার বিশ্রাম এর পালা। সানি আকাশের দিকে দৃষ্টি রেখে বলে,,

” আমি আমার ক্যারিয়ারে সম্পূর্ণ ফোকাস দিচ্ছি। এসব ভাবি নি এখনও। পরে ভেবে দেখা যাবে। ”

সারার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বিষন্নতায় ঢেকে গেলো তার মুখ, হারিয়ে গেলো তার ঠোঁটে লেগে থাকা হাঁসি। সারার মলিন মুখটার দিকে তাকালো সানি। সারা যে তার জবাবে সন্তুষ্ট নয় এটা সানির বুঝতে বাকি রইলো না। সারা ছোট করে জবাব দিলো,,

” ওহ ”

সারা এদিক ওদিক তাকিয়ে আবারও বলে উঠে,,

” আমি আসি তাহলে। ”

সারা চলে আসতে পা বাড়াতে নিলে সানি সারার ডান হাতের সরু কব্জি নিজের ডান হাতের মুঠোতে নেয়। সারা অবাক হয়ে ঘুরে তাকায় সানির দিকে। সানির দৃষ্টি এতো সময় আকাশের দিকে ছিলো। এখন ঘুরে তাকালো সারার মুখের দিকে। সারার অবাক চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়। চোখের ভাষায় বুঝাতে চাচ্ছে অনেক কিছু। চোখেরও ভাষা রয়েছে। চোখের ভাষার ক্ষমতা অসীম। মুখের ভাষা যখন অনেক মনের ভাব প্রকাশে ব্যর্থ হয়, সেই ভাব প্রকাশ করে দৃষ্টি।দৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে থাকে হাজারো অনুভূতির অভিধান। মুখের অভিব্যক্তি কখনো কখনো মিথ্যা হয়ে যায়, কিন্তু চোখের আকাশে জমে থাকা স্বপ্নের ওপার থেকে সত্যের এক জোড়া তারকা সবসময় ঝিলমিল করে।কথার প্রাচীরে মৃদু শব্দেরা বন্দী, কিন্তু চোখের দৃষ্টি মুক্ত। সে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে হৃদয়ের অন্দরের গোপনীয়তা জানিয়ে দেয়। এইভাবে যেন চোখের ভাষা মৃত্যুরও গোপন গল্প যেন বলে যায়। সানি তাই বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছে দৃষ্টির এই অসীম ক্ষমতা দিয়ে। চোখের ভাষায় আশ্বাস দিতে চাচ্ছে তার সুবর্না নয়নের রাণী কে। আমার দৃষ্টিতে তুমি সৃষ্টিকর্তার তৈরি আমার জীবনে অমূল্য রত্ন। যাকে সে পেতে চায় তার জীবনের প্রতিটা নিশ্বাসে। সে তার সাথে আজীবন কাটাতে পারবে কি না এটা কোনো ভাবার বিষয়ই নয় তার কাছে। কারণ প্রিয় মানুষটার ভাবনা তাকে এক মুহুর্তের জন্য ছুটি দেয় না। তাহলে তাকে ছাড়া আজীবন কিভাবে কাটানো সম্ভব। যেখানে তাকে ছাড়া কাটানো সম্ভব নয়, সেখানে এই প্রশ্ন মস্তিষ্কে ধারন করা বোকামি আর হাস্যকর।

সারার চোখ জোড়ায় স্থির দৃষ্টি, ঠোঁটের কোনে স্মিত হাঁসি রেখে বলে,,

” এখন ভাবি না তার মানে এই নয় ভবিষ্যৎ এ ভাববো না। ”

সানির হুট করে এ জবাবে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেলো মেয়েটা। মলিন মুখটা লজ্জায় লাল রক্তিম বর্ন ধারণ করলো মুহুর্তে। চোখ জোড়া নামিয়ে নিলো সারা। লজ্জায় ছুটে পালাতে ইচ্ছে করছে তার। হৃদয়ে অস্বাভাবিক কম্পন, শ্বাস যেন আটকে আসছে। কিন্তু এতো লজ্জা কেন পাচ্ছে সে? সানি তো তাকে উল্লেখ করে কিছু বলে নি। আজ না হয় কাল সে তো বেছে নিবে তার জীবন সঙ্গীকে এটা তো স্বাভাবিক। তাহলে এখানে এতো লজ্জা পাওয়ার কি রয়েছে। নিজের এমন কর্মকান্ডে অসস্তি কর পরিবেশ ছড়িয়ে পরলো চারদিকে। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো সারা।
সানি সারার হাতের কব্জি ছেড়ে দিতে দিতে বলে,,

” সময় হলে ঠিক ভাববো। তখন বেছে নিবো আমার জীবনসঙ্গীকে। ”

সারা নিজের অসস্তি কাটিয়ে অনেকটা কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে,,

” ভালো। আপনার জীবনসঙ্গী কিভাবে বেছে নিবেন। ”

সারা যে তাকে কেমন প্রশ্ন করতে পারে এটা সানি আগেই আন্দাজ করতে পারে তার দৃষ্টি আর কর্মকান্ড দেখে। সানি মনে মনে নিশব্দে হেঁসে বলে,,

” সেভাবে ভেবে দেখি নি। তবে ভাবতে হবে খুব শীঘ্রই। কবে যে কার মুখে আমারও শুনতে হয় বুড়ো হয়ে যাচ্ছে কিন্তু এখনও বিয়ে করে নি। ”

সানির ঠোঁটে রহস্যময় এক হাঁসি। সারা চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলে। সানি যে কথাটা তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে এটা তার বুঝতে বাকি নেই। নিজের বোকামি কথায় নিজেরই ভীষণ লজ্জা লাগছে সারার। এই জন্য ভেবে চিনতে কথা বলতে হয়। নিজের বোকামি কর্মকান্ডে নিজের ভাইকে বুড়ো বানিয়ে ফেলেছে সে। সারা একটু ইতস্ততবোধ নিয়ে বলে,,

” আমি ও ভাবে কিছু বলি নি। আর ভাইকে বুড়ো ও বলি নি। সব কিছুরই তো সময় রয়েছে। ভাইয়ার তো বিয়ের বয়স হয়েছে পাত্রী ঠিক করতে হবে না। বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার বয়স হলে আমরা ভর্তি করিয়ে দেই না বলুন। ”

সানি উল্টো দিকে ঘুরে তার ডান হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নিজের ঠোঁট ঢেকে নেয়। নিজের হাঁসি আটকানোর মোক্ষম চেষ্টা করে সফল হয় সানি। এমন বোকার মতো কথা শুনলে নিজের হাঁসি আটকিয়ে রাখা একটা ভয়াবহ যুদ্ধ। তার শীতলিকাকে একটু লজ্জায় ফেলা যাক। এমনিতেই ইদানীং বেশি পাকনামো করছে সে। এ শাস্তি তার প্রাপ্য অধিকার। সানি নিজেকে স্বাভাবিক করে সারার দিকে তার মোটা ভ্রু যুগল বাকিয়ে বলে,,

” বিয়ের জন্য সঠিক বয়স কত হতে হয়? ”

সারা আবারও তৎক্ষনাৎ নিজের চোখ মুখ কুচকে নেয়। সে আবারও বোকার মতো একটা কথা বলে ফেলেছে।
বরাবরই নিজের কর্মকান্ড বুঝিয়ে দেয় সে সত্যি ভীষণ বোকা, জ্ঞ্যানশূন্য মানুষ। আদৌ সে মনে হয় না বুঝে শুনে কথা বলতে পারবে। কোনো না কোনো ভুল করবেই। নিজের এমন কর্মকান্ডে নিজের বিপদ নিজেই ঘনিয়ে নিয়ে আসে। সানি এবার কি ভাবছে? আর মানুষটাও মোটের সুবিধা নয়। বিষয়টি সে চাইলেই এড়িয়ে যেতে পারতো। মানুষটা সুবিধার থাকলে এই ভাবে বলতো না। তাকে ইচ্ছে করে বেকায়দায় ফেলতে মানুষটা এই ভাবে প্রশ্ন করেছে। মানুষটা ভীষণ অসভ্য লোক তো। সে না হয় একটু বোকামি কথা বলেই ফেলেছে। সে তো আর কোন কিছু বুঝে শুনে বলে নি। মানুষটা শুধু শুধু ভালোর মুখোশ পরে থাকে। ভেতরে ভেতরে আস্ত একটা ব*দ লোক। সানি সারাকে চুপ থাকতে দেখে আবারও বলে,,

” চুপ কেন ”

সারা মাথা নাড়িয়ে বলে,,

” জানি না ”

সানি ঠোঁট চেপে হেঁসে বলে,,

” জানলে আমাকে জানাস। আমি বিয়ে করবো তখন। ”

সারার ভীষণ রাগ হচ্ছে। এই ভাবে মানুষটা তার সঙ্গে এভাবে মজা নিবে। ছিঃ ছিঃ কেমন ব*দ আর অসভ্য লোক ভাবা যায়। এই মানুষটার সামনে ভেবে চিনতে কথা বলতে হবে। সারা মনে মনে ভীষণ বকলো সানিকে। যত উপাধি দেওয়া যায় সকল উপাধি দিলো নিজের মনে সানিকে।

ভেসে আসলো আজানের ধ্বনি। সানি সারার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে,,

” আজান দিচ্ছে নামাযে যাই, তুই ও পড়ে নে। ”

সারা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে বলে,,

” ঠিক আছে। ”

সানি সারার পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে ধীর কন্ঠে বলে,,

” আমি কিন্তু ভালো ছেলে। ”

সারা মনে মনে বিড়বিড় করে বলে,,

” ভালো না ছাই। ”

সারা মুখ বাকিয়ে পা বাড়ায় নিজের ঘরের উদ্দেশ্য। সানি আলমারি থেকে পাঞ্জাবি বের করছিলো, সারার পায়ের আওয়াজ পেয়ে সারা দিকে দৃষ্টি রাখলো সানি। সারা সানির দিকে তাকায়নি। ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো সারা। সারা সানির চোখের আড়াল হতেই ঠোঁট কামড়ে হেঁসে আলমারি থেকে পাঞ্জাবিটা বের করে নিলো সানি।

★★★★★★

দোতালা অতি সাধারণ একটা বাড়ি আরহিদের। মধ্যবিত্ত হলেও আরহি মা রাজেয়া বেগম খুবই গোছালো আর শৌখিন তাই যতটুকু সম্ভব তার সাধ্যের ভেতর সাজিয়ে তুলেছে সাধারণ বাড়িটা। সাজাতে জানলে টিনের বাড়িটাও রাজপ্রাসাদের মতো সুন্দর লাগে, তেমনটাই আরহিদের ছোট দোতালা অতি সাধারণ বাড়িটা।

সন্ধ্যা চারদিকে অন্ধকার আচ্ছন্ন,জানালার সাথে পড়ার টেবিল আরহির। জানালা দিয়ে তাকালে দেখা যায় বাইরের ছোট একটা মাঠ পেরিয়ে ঘনবসতি বাড়ি ঘর।
শহর খোলা জায়গা নেই বললেই চলে। সেখানে এতটুকু ছোট মাঠ অনেক কিছু। কিছু কিছু বাচ্চারা আসে বিকেলে খেলতে। আরহি মাঝে মাঝে এসব দেখে হারিয়ে যায় শৈশবে। তবে আগে মাঠ আরও বড় ছিলো এখন এখানে একটা বাড়ি হয়ে মাঠটা ছোট হয়ে গিয়েছে। সাফিকে মাঝে মাঝে দেখেছে এলাকার ছেলেদের সাথে ক্রিকেট খেলতে। শেষ বারের মতো দেখেছে তখন সে সপ্তম শ্রেণীতে পরে হয়তো। আরহি চোখ পরলো পড়ার টেবিলে বোতলের পানিতে রাখা গোলাপ ফুলটার দিকে। ফিন্যান্স সাবজেক্ট একদম মাথায় ঢুকে না। এই ইয়ার দুইটা কঠিন সাবজেক্ট। ফেইল করবে এই ইয়ার নিশ্চিত। মানে মানে সেকেন্ড ইয়ার এর চূড়ান্ত পরীক্ষায় টেনে টুনে পাশ করলে হয়।
বিরক্ত হয়ে বইটা বন্ধ করতেই ফুলটা চোখে পরে তার।
তাকিয়ে থাকে ফুলটার দিকে এক দৃষ্টিতে। নিজেরই অজান্তে তাকিয়ে রয়েছে ফুলটার দিকে। স্মৃতিচারণ হলো সাফির কথা। মানুষটা কি ভীষণ অদ্ভুত। এই তো মানুষটা ভীষণ বেখেয়ালি, গুরুত্বহীন,গম্ভীর একটা মানুষ। অথচ আবার বুঝিয়ে দেয় তার বেখেয়ালির মাঝে হুশিয়ারি। গুরুত্বহীনতার মাঝে যত্ন। গম্ভীর আচরণের মাঝে ছোট খাটো বিষয় খেয়াল রাখা।
বেখেয়ালি করে তার একটা হিজাব হারিয়ে ধরিয়ে দিয়েছে ১৩ টা হিজাব। জোর করে দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে ঠিকি কিন্তু তার দায়িত্ব পালন করতে যা মিস করেছে ঠিক তা পূর্ন করে দিয়েছে। তখনই তার দৃষ্টি চলে যায় ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুলটার দিকে। আরহি তৎক্ষনাৎ শুকনো ঢোক গিলে হাতটা মুঠো করে নেয়। মাথা ঝাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলে উঠে,,

” কি সব আজে ভাবছিস আরহি। তোর মাথা পাগল হয়ে গিয়েছে।শেষে কিনা তুই প্যাঁচা মুখো কথা ভাবছিস। নিজের সুখের জীবনের দিকে নিজেই নজর দিচ্ছিস। ”

আরহি বিরক্ত হয়ে আবারও তাকালো ফুলটার দিকে।এই ফুলের সৌন্দর্যটা খুব বেশি ভালো লাগছে। ছোট একটা গোলাপ ফুল, গাঢ় লাল রঙ, তার সাথে সবুজ তিনটে পাতা। তার ভাই লাবিব আর সারার পর কেউ তাকে ফুল উপহার দিলো। আরহি তৎক্ষনাৎ ভাবলো এটা উপহার নয়, বাধ্য হয়ে গছিয়ে দেওয়া। নিজ ইচ্ছেই তো দেয় নি, আর নিজ ইচ্ছেই দিতে যাবেই বা কেন? কি সব আজগুবি কথা ভাবছে আরহি। খুবই বিরক্ত হলো নিজের উপর। আরহি কিভেবে অমনোযোগী হয়ে ফুলটা ধরতে নিলে গোলাপ ফুলের তীক্ষ্ণ কাঁটা খুব বাজে ভাবে আঘাত করে তাকে। মুহুর্তে আঙ্গুল থেকে গড়িয়ে পরে লাল রক্ত। ঠিক গোলাপ ফুলটির রঙের মতো। আরহি ব্যাথায় কুকিয়ে উঠে। কাঁটার যন্ত্রণাটা একটু তীব্র হয়। আরহি একবার তার ক্ষত হওয়া আঙ্গুলটার দিকে তাকায় আর একবার ফুলটার দিকে। এই ফুলের এতো সৌন্দর্য, যাকে ভালোবাসার প্রতীক বলা হয় অথচ এই ফুল তো মানুষকে আঘাত করে। তবুও ভালোবাসার প্রতীক কিভাবে হয়। ভালোবাসাকি মানুষকে আঘাত করে। যদি আঘাত করে তাহলে মানুষ ভালোবাসেই বা কেন? কর্মাসের ছাত্রী হয়ে হিসেব মিলাতে ব্যর্থ। যদিও সে কম বুঝা ছাত্রী, তবুও এতোটাও কম বুঝে না। পড়াশুনা ফাঁকি দেয়, তাই কম বুঝে আর কি। আরহি খেয়াল করলো ক্ষত হওয়া আঙ্গুলটা ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুল। আচমকা বুকটা কেঁপে উঠলো তার। তাকিয়ে রইলো নখটার দিকে, রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করলো না। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো, নিজের এমন অদ্ভুত কর্মকান্ডের কারন তার কাছে অজানা।
আরহি বাম হাতটা দিয়ে ফোন হাতে নিয়ে ক্ষত হওয়া আঙ্গুলটা ছবি তুলে নিলো। এরপর ড্রয়ার থেকে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বের করে লাগিয়ে নিলো। ঔষধ কাঁটা জায়গায় স্পর্শ করতে জ্বলে উঠলো ক্ষত স্থানটা। আরহির হাতটা একটু কেঁপে উঠলো। আরহি তাকিয়ে রইলো আঙ্গুলটার দিকে এরপর তাকালো ফুলটার দিকে। এই ফুল তাকে আঘাত করেছে অথচ বিন্দুমাত্র ফুলটার প্রতি রাগ, অভিমান, ঘৃণা কিচ্ছু হচ্ছে না। ঘৃণায়,রাগে ফেলে দেয় নি ফুলটাকে সযত্নে এখনও বোতলের পানিতে ভাসমান।
আরহি মাথায় অদ্ভুত সঙ্গা ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি,,

” সত্যিকারের ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হলে, সেখানে ঘৃণার কোনো স্থান থাকে না। ”

এই জন্য মানুষ হয়তো ফুলকে ঘৃণা করতে পারে না। কাঁটার আঘাত বরন করে আগলে নিয়ে রাখে তাকে।
কিসব অদ্ভুত চিন্তা বাসা বাঁধছে তার মনে। আরহি নিজের চিন্তা ধারা পাল্টে নিতে চাইলো। টেবিলের উপর রাখা ফোনটা আবারও হাতে নিলো সে। খুব সুন্দর করে ফুলের ছবি তুলে নিলো। এরপর তার আঙ্গুলের ক্ষত স্থান থেকে ঝরে পরা রক্তের ছবি আর গোলাপের ছবি এক সাথে যোগ করে স্টোরি দিলো।

” ফুলকে ভালোবেসে স্পর্শ করতে গেলেও কাঁটার আঘাত পেতে হয় মানুষকে। তবুও সে ফুল মানুষ সযত্নে আগলে রাখে কেন? কেন এতো মূল্য তার? তাহলে ফুল কেন ভালোবাসার প্রতীক? শুধুই কি তার সৌন্দর্য আর মিষ্টি সুবাসের জন্য? ”

ছোট একটা ক্যাপশন দিলো আরহি। তারপর দেখে নিলো সারা অনলাইন রয়েছে কি না। সারাকে না দেখে নিউজ ফিড দেখতে শুরু করলো আরহি। কিছু সময়ের মধ্যে পড়াশুনোয় ফাঁকি দিয়ে সারাও অনলাইনে হাজির। অনলাইন এসে আরহির স্টোরি দেখে বড়সড় ধাক্কা খেলো সারা। আরহি বরাবরই পোস্ট করলে রোমান্টিক, না হয় ফানি, না হয় জায়গার ভিডিও শেয়ার করে। কিন্তু এমন পোস্ট আজ প্রথম আরহিকে করতে দেখলো তাহলে বড়সড় ধাক্কা খাওয়া স্বাভাবিক। তার ভেতর এমন একটা ছবি। আরহি কোনো কিছু তার কাছে লুকোয় না, আবার সেও কোনো কিছু লুকোয় না। শুধু একটা জিনিস লুকিয়ে রেখেছে সানির প্রতি তার অনুভূতি কারন আরহি বিষয়টি নিয়ে মজা নিবে খুবই। সে অনেক বড় গলা করে অনেক কিছু বলে ফেলেছিলো মজা নেওয়াটা দোষের কিছু নয়। আরহির এমন পোস্টে যেমন অবাক হলো, তেমনি দুশ্চিন্তা। আরহির কোনো কারনে মন খারাপ নয়তো। সারা সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলো আরহিকে। আরোহিও সাথে সাথে ফোন তুলে বলে,,

” আসসালামু আলাইকুম জানু ”

” ওয়ালাইকুম আসসালাম জানু।”

সারা দ্রুত গতিতে বলে উঠে,,

” কি হয়েছে বলতো তোর? ”

আরহি বুঝতে বাকি নেই সারার এমন উদ্বিগ্ন হওয়ার কারন। আরহি হাল্কা মৃদু স্বরে হেঁসে বলে উঠে,,

” আমার কিছু হয় নি। স্টোরি দেখে বলছিস তো। হুট কেন জানি মনে হলো তাই দিলাম। আমি সত্যি জানি না। ফুলের কাঁটা দিয়ে হাত কাঁটলো তো তাই হয়তো এমন মনে হলো। ফুলের কাঁটাও যে এতো তীক্ষ্ণ ধারালো থাকে আমার জানা ছিলো না। ”

” সত্যি ”

” হ্যাঁ তিন সত্যি ”

সারা কপাল কুচকে বলে,,

” ফুল তোকে কে দিয়েছে?”

আরহি এবার বিপাকে পরে গেলো। সারা এমনিতেই ভীষণ মজা নেয়, সত্যিটা বললে সারা তার কান পাকিয়ে ফেলবে মজা মজা নিতে নিতে। এই প্রথম সারার কাছে কিছু লুকোতে হলো তার। জিহবা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলে,,

” বাবার থেকে নিয়েছি। ”

সারা কপাল কুচকে বলে,

” আংকেল কোথায় পেল? ”

আরহি এবার বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে,,

” তুই কি আমাকে সন্দেহ করছিস সারা। আমি কি তোর কাছে লুকাই কোনো কিছু।”

সারা এবার একটু থামলো। আরহি মিথ্যে কিছু বলে নি। সারা তাই প্রসঙ্গ পালটে বলে,,

” আরে না তোকে না, আংকেল কে করছি? কে ফুল দিলো বল তো। এই বয়সে এসে আন্টি কি সতীনের সংসার করবে। ”

আরহি খানিকটা রাগান্বিত হয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠে,,

” চুপ, একদম উল্টো পালটা কথা বলে আমার বাবার চরিত্রে দাগ দিবি না। আমি আনতে বলেছিলাম। জানিস না আমার গোলাপ ফুল পছন্দের। ”

সারা একটু কেঁপে উঠলো আরহির ঝারিতে। আরহিকে আর খেঁপানো যাবে না। তাই সারা এসব প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে কিছু সময় কথা বললো দুজন।

রাত ৮ টার কাছাকাছি সাফি অফিস থেকে এসে হাতমুখ ধুঁয়ে বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। বিকেল থেকে কাজের চাপে প্রয়োজন কল ছাড়া ফোনটা ধরার সুযোগ পায় নি সে। কর্মজীবনে প্রচুর ব্যস্ততা তার। এছাড়া নিজেকে ব্যস্ত রাখতে ভালোবাসে। কর্মহীন সময় কাটতেই চায় না। সাফি ফোনটা হাতে নিয়ে অনলাইন গেলো। কিছু মেইল, মেসেজ দেখে নিলো আগে। এরপর ফেসবুকে গেলো সাফি। শুরুতে দেখতে গেলো আরহির আইডি। ২৫ মিনিট আগে অনলাইনে ছিলো। সাফি আরহির স্টোরি দেখে হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড। এরপর ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে উঠে বসে। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিয়ে বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে,,

” ওহ শিট ”

তার দেওয়া ফুল তাকে আঘাত করবে এটা যেন তার কল্পনার বাইরে। বিষয়টি সাফি খুব সহজে মেনে নিতেও পারছে না। জানে এটা অসাবধানতার কারনে হয়েছে তবুও বোকার মতো এমন চিন্তা কেন মাথায় আনছে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না সাফি। মেয়েটা এতো অসাবধান কেন? এই হৃদয় এমনি ক্ষত বিক্ষত। ভাঙ্গা হৃদয় খুব শখ করে সাজিয়েছে। আবারও যদি ভেঙে যায় তাহলে হয়তো ভেতর থেকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে যাবে সে। হয়তো পৃথিবীতে শ্বাস নেওয়া একটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াবে তার। সাফি আবারও ফোনটা হাতে নিলো। আবারও দেখলো আরহির ক্ষত হওয়া হাত। তার লেখা কথা গুলো। সাফি ফোনটা তার বক্ষে বা পাশে রেখে মনে মনে বললো,,

” মনের সাথে যুদ্ধ করে যদি হেরে যাই তাহলে এই সমাজে, এই পরিবারের সবার চোখে ভদ্র হয়ে উঠা ছেলেটি দোষী হয়ে যাবে। আমার মনকে হারতে দিও না প্রিয়সিনী। সৌন্দর্য আর সুবাসের জন্য এ কাঁটার আঘাত কেউ বরণ করে না প্রিয়সিনী। এর মাঝে সুপ্ত লুকায়িত সুখের জন্য করে, এই সুখের কাছে এ কাঁটার আঘাত তুচ্ছ। কাঁটার আঘাত বরণ না করতে পারলে সুখ যে ধরা দিবে না প্রিয়সিনী। সুখ তো কাঁটার মাঝে নিজেকে সুরক্ষিত রাখে, কাঁটা যে তার পাহারাদার। সেখান থেকে সুখকে যে আমাদের নিজের করে নিতে হয়। তাই তো কাঁটার আঘাত বরণ করতে হয়। ”

সাফি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা নিজের হাতের মুঠোয় নেয়। ঘরের ভেতর আলো অসহ্য লাগছে। এমনিতেই ক্লান্ত শরীর, এখন মনটাও ক্লান্ত হয়ে গেলো। ভালো লাগছে না কিছু। বালিশের নিচ থেকে বের করলো ভাজ করে রাখা আরহির হিজাব। কিছু সময় স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। হিজাব টা শক্ত করে নিজের হাতে পেঁচিয়ে নেয় সাফি। প্রিয় মানুষটার বাঁধনে বেঁধে নিলো শক্ত করে। ধীর পায়ে হেঁটে যায় বেলকনিতে। হাল্কা বাতাস ছুঁয়ে দিচ্ছে গাঁয়ে। খুব বেশি শীতল বাতাস নেই আজ। সাফি বেলকনিতে থাকা রোলিং চেয়ারে আসন পেতে বসে। ঘরের ভেতর জ্বলতে থাকা বাতির আলো আসছে। আলো ভালো লাগছে না তার। তাই থাই টা একটু এগিয়ে আনলো, এবার আবছা আলো আসছে। কানে ইয়ারফোন ব্লুটুথ দিয়ে চোখ বন্ধ করে রোলিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে গান শুনতে লাগলো সাফি। চোখের পাপড়ি একটু একটু করে কাঁপছে। আনমনে অনেক হিসেব কষতে লাগলো সে। আফসোস কর্মাসের তুখোড় ছাত্র হয়েও নিজের জীবনের হিসেব মিলাতে পারলো না সে। না মিলাতে পারা অংকের খাতা সেভাবেই পরে রইলো। বাড়ির বড় ছেলে, বাড়ির সুপত্র হতে গিয়ে নিজের সব তো হারিয়ে ফেললো। পেয়েছে এ সমাজে সুনাম, সম্মান, নাম ডাক বাবার গর্ব। তবে এতো কিছু এই মুহুর্তে তার একাকিত্ব কেন দূর করতে পারছে না। মনের শূন্যতা কেন পূর্ণ করতে পারছে না। নিজের শূন্যতা পূরণ করতে সবার চোখে দোষী হলে কোনো অপরাধ হবে। নিজের সাথে ভীষণ ভাবে অন্যায় করছে সে। তার মন, তার অনুভূতি তাকে কি কখনও ক্ষমা করবে। তাদের ও শান্তি প্রয়োজন , তাদের ও অধিকার রয়েছে। সে এ পুরো সমাজ, পরিবার সবার দৃষ্টিতে সফল হলেও নিজের দৃষ্টিতে ভয়ানক ব্যর্থ এক মানুষ। তবে এ সমাজ, পরিবার তাকে অপরাধী বলুক, দোষী বলুক, দীর্ঘ ২৮ বছরে তার কষ্ট, তার ত্যাগ শিকার করে গড়া তার ক্যারিয়ার ধুলোয় মিশে যাক তবুও আর এ মন কে ঠকাবে না। যদি তার প্রিয়সিনী হারাতে হয় তাহলে তার মনকে আবারও ঠকাতে হবে। এতো ক্লান্তি, এতো কষ্ট আর নিতে পারবে না সে। সবার ক্ষেত্রে সবটা সহজ হলেও বাস্তবতা কেন নিষ্টুর হয় তার সাথে, তাকে কেন সহজে সব কিছু দেয় না। তবে এ মন আবারও আঘাত পাওয়ার আগে হৃদয়ের কম্পন থেমে যাক, শ্বাস আটকে যাক তার। সাফি নিজের ভাবনার মাঝে ধীর কন্ঠে সুর দিয়ে গেয়ে উঠলো সাফি,,

” ওরে ইচ্ছে করে বুকের ভেতর
লুকিয়ে রাখি তারে
জেন না পারে সে যেতে আমায়
কোন দিনও ছেঁড়ে
আমি এই জগতে তারে ছাড়া
থাকবো না গো থাকবো না ”

চলবে___

https://www.facebook.com/share/1AYhCCqwqL/
https://www.facebook.com/share/g/1AufQdkZf8/

আপনাদের কমেন্টের লাইক দেওয়ার মানে হল এই গল্পের পরবর্তী পর্বটি আসছে ,
তাই প্লিজ আপনাদের মন্তব্য জানান…
Comment…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here