#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ২
#লেখনিতে খুশবু আকতার
আজকের দিনের মত সব দায়িত্ব শেষ করে সবে মাত্র নিজের ছোট্ট ঘরে ফিরল জহির।একটা এক রুমের ছোট খড়ের ঘর তার।একটা ছোট্ট কল ঘর আছে বাইরে।বৃষ্টি এলেই বিভিন্ন স্থান দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে ঘরের মাঝে।হারিকেন জ্বা/লাতে গিয়ে দেখল তেল নেই।এদিকে সময়ও অনেক হয়েছে।তবে এখন ঠিক রাত কয়টা বাজে তা জহিরের জানা নেই।ঘর থেকে বেরিয়ে একবার তালুকদার বাড়ির বড় উঠোনটার দিকে চোখ রাখল।হারিকেনের আলো জ্বলজ্বল করছে পুড়ো উঠোন জুড়ে।তালুকদার বাড়ির ঠিক পেছনের দিকটাতে জহিরের ছোট্ট ঘর।এই ঘরটা অবশ্য জলিল তালুকদারই তাকে তৈরি করে দিয়েছেন।জলিলের বাবাও পেশায় মাঝি ছিলেন।তালুকদার বাড়ির হয়ে তিনি কাজ করতেন।এক বন্যায় তাদের ঘরবাড়ি সব ভেসে গেল।মা/রা গেলেন জহিরের বাবা-মা।তখন জহিরের বয়স কতই বা হবে ছয় কিংবা সাত।তখন থেকেই সে তালুকদার বাড়ির জন্য টুকটাক কাজ করে।একটু বয়স হওয়ার পর সেও তার বাবার পেশাই গ্রহণ করল।তালুকদার বাড়ি থেকে দৈনিক সে দুই টাকা করে পায়।খাবারও তালুকদার বাড়ি থেকেই আসে।থাকার ব্যবস্থাও জলিল তালুকদারই করে দিয়েছেন এবং জায়গাটাও তাদেরই।বলতে গেলে জহির অনেক ঋণী তালুকদার পরিবারের প্রতি।জহির মাঝে মাঝে ভাবে সামান্য মাঝি হয়ে কি তার এই বড় পরিবারের মেয়ের সাথে সংসার করার স্বপ্ন দেখাটা উচিত হয়েছে?যদি ওনারা বিয়ে দিতে না চান তাহলে তো সেটা অন্যায় না।কি আছে জহিরের?কিচ্ছু নেই।না সে দেখতে সুন্দর,না আছে তার পরিবার,না আছে একটা ভালো উপার্জনের জায়গা।সেখানে জুঁই তার থেকে সব দিক দিয়ে এগিয়ে।সে পড়াশোনা জানে, দেখতে সুন্দর,বড় বাড়ির মেয়ে, কথাবার্তা চালচলন সবকিছুতেই একটা আভিজাত্য আছে।মোটকথা জুঁই লাখে একটা।জহিরের এসব ভাবনার মাঝেই দেখল উঠোন পেড়িয়ে হাতে হারিকেন সমেত কেউ একজন এগিয়ে আসছে ওর ঘরের দিকে।জহির বুঝলো এটা জুঁই ছাড়া আর কেউ না।কেননা তিন বেলা ওকে খাবার জুঁই দিয়ে যায়।আরো একটু কাছাকাছি আসতেই হারিকেনের আ/গুনের আলোয় জুঁইয়ের মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠলো জহিরের কাছে।অপরাধী কণ্ঠে বলল,
“আমি জানি তোর অনেক খিদে পেয়েছে।আসলে সব রান্নাই হয়ে গেছিল শুধু মুরগির মাংসটা আমার রান্না করার কথা ছিল।তুইতো মাংস খেতে ভালোবাসিস অনেক। সেজন্য ভাবলাম এটা রান্না করে নিয়ে যাই।তাই একটু দেরি হলো।”
জহির আলতো হেসে বলল,
“লাগে নাই খিদা।তুই আমার জন্য এত কষ্ট করছস এইডা শুইনাই আমার মন ভইরা গেছে।”
“মন ভরলে চলবে,পেট ভরতে হবে তো।দেখি সর আমি ভাতটা বেড়ে দিয়ে যাই।”
“না তুই যা।আমি বাইরা খাইয়া নিমুনে।”
জুঁই চোখ রাঙিয়ে বলল,
“আমি সরতে বলেছি তোকে।আর তুই আবার অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলছিস কিন্তু জহির।”
জুঁই এর কথা শুনে জহির হেসে ফেলল।জহিরের সে হাসির মাঝে মুগ্ধ করার মতন আদৌও কোন বিষয় ছিল কিনা তা জুঁইয়ের জানা নেই তবে সে মুগ্ধ হলো।কি সাদামাটা একটা ছেলে।বরাবরের ন্যয় এখনো পড়নে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি।পাতলা ফিনফিনে দেহ,কোকরা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে।না জানি আরো কত খুঁত আছে জহিরের মাঝে।কিন্তু সে সব খুঁত গুলোকে একপাশে সরিয়ে জহিরের একজোড়া মায়াবী চোখ বরাবরই জুঁইকে ঘায়েল করে।কি যে আছে জহিরের ঐ চোখ জোড়ার মাঝে জুঁই তা ভেবে পায় না।এক রাশ মায়া লুকিয়ে আছে যেন।ওই দু চোখের নিষ্পাপ চাহনি দেখেই বোঝা যায় যে ছেলেটা কতটা বোকা, সহজ সরল।এই ছেলেটা বোধহয় জুঁইকে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই পারে না।
জহির হাসতে হাসতে বলল,
“আমার জন্ম এই গায়ে রে জুঁই।এই গায়ের মাটি,মানুষ,আকাশ,বাতাস সবকিছু গায়ে মাইখা আমি বড় হইছি।এই অশুদ্ধ ভাষাই আমি শিখছি।এই ভাষা আমার মনের মধ্যে গাইরা আছে।এত সহজে কি এই ভাষা ভুইলা যাওন যায়?”
“আচ্ছা বেশ তোকে আর জোর করব না।তুই যেমন, তেমন ভাবেই তোকে আমি ভালোবাসি।দেখি সর ভেতরে যেতে দে।”
জহিরকে পাশ কাটিয়ে জুঁই ভিতরে গেল।ম্যালামাইনের প্লেটটা নিয়ে তাতে ভাত তরকারি বেড়ে দিল।দেখলো জহিরের ঘরে আলো নেই তাই আর গেল না।খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত হারিকেনটা নিয়ে বসে রইল।এই গরমের দিনে যেন খেতে কোন অসুবিধা না হয় তাই পাশে বসে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করল পুরোটা সময়।খাওয়া শেষ হওয়ার পর আর বেশিক্ষণ সেখানে থাকলো না।দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়তে বলে সে বেরিয়ে গেল।
_______
ফজরের আজান কানে যেতেই ঘুম থেকে উঠে পড়ল জুঁই।হাতমুখ ধুঁয়ে নামাজ পড়ে রান্নাঘরে গেল।তার বড় ভাবি ভীষণ অসুস্থ।মেজ ভাবির এক আত্মীয় মা/রা যাওয়ায় সে বাপের বাড়ি গিয়েছে।আর ছোট ভাবি অন্তঃসত্ত্বা জন্য এখন তাকে রান্নাঘরের ধারে কাছেও ঘেষতে দেওয়া হচ্ছে না।তাই আজকে সকালের রান্নার দায়িত্বটা জুঁইই নিয়েছে।তার মাকে একা এত কাজ করতে দিতে সে নারাজ।ভাবিদেরকে চাপ দিতে চায় না জুঁই তাই ভাবলো আজকে না হয় রান্না নিজেই করা যাক।রাতের বেশ কিছু তরকারি অমনি থাকলেও সকালে আবার নতুন করে রান্না চাপাতে হলো জুঁইকে।কেননা এ বাড়ির পুরুষদের একটা বাজে স্বভাব হচ্ছে এক বেলার তরকারি দ্বিতীয় বেলা তারা স্পর্শ করে না।রান্নার ব্যাপারে সবাই বড্ড বেশি খুঁতখুঁতে।তরকারিতে সামান্য একটু নুন ঝাল এদিক ওদিক হলে বাড়ি মাথায় তোলে।ভাতের পানি একটু কম বেশি হলে তারা থালা ঠেলে ফেলে দিয়ে চলে যায় খাবার ছেড়ে।আর যদি সময় মত খাবার না পায় তাহলে যে বাড়িতে কি কুরুক্ষেত্রটা চলে তার কথা নাহয় বাদই রাখা গেল।এদিকে আজ একটা জরুরী কাজে জুঁইকে যেতে হবে।শ্যামলডাঙ্গা গ্রামে প্রাইমারি স্কুল,হাইস্কুল,কলেজ সবই আছে তবে সংস্কারের অভাবে তা বন্ধ আছে বহু বছর যাবত।প্রাইমারি আর হাই স্কুল তাও গত দুই বছর হলো চালু হলেও কলেজ এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।যুদ্ধের সময় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে যা এখনও মেরামত করা সম্ভব হয়নি।সরকার থেকে কোনরকম কোন অনুদানও পাওয়া হয়নি ফলে গ্রামের যাদের অর্থ সম্পত্তি একটু বেশি তারা সকলে মিলেই কলেজটা মেরামতের কাজ শুরু করছে।তার মূলে রয়েছেন জলিল তালুকদার নিজে।তার ছোট মেয়ে তার বড্ড আদরের।তার মেয়ের অনেক ইচ্ছে সে পড়াশোনা করবে।মেয়ে আবার একটু অনুরোধ করলে তিনি তা ফেলতে পারেন না।বড় দুই ছেলের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েও তিনি মেয়েকে এখনো পড়াচ্ছেন।প্রাইমারি স্কুলে পড়া শেষ করে অবশ্য হাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য জুঁইকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।হাইস্কুলে পড়তে যেতে দুই গ্রাম পার হয়ে যেতে হতো।সে সময় বাড়ির মেয়েকে এতদূর একা একা পড়তে পাঠাতে কেউ রাজি ছিলেন না।সেজন্য দুই বছর জোর করে পড়াশোনা বন্ধ করে রেখে ছিল।অবশেষে দুই বছর পরে পাশের গ্রামে হাই স্কুল চালু হওয়াতে সেখানে অনেক কষ্টে ভর্তি হতে পেরেছিল।
শ্যামলডাঙ্গা গ্রামের কলেজ মেরামতের পুরো কাজের তদারকির দায়িত্বে আছে সুজন।জুঁইয়ের খুব ইচ্ছে সে সুজনের সাথে থেকে পুরো কাজের তদারকি নিজেও করবে।জলিল তালুকদারও আর তাই মেয়েকে না করেনি।এই নিয়ে গ্রামে কানাঘুষোর শেষ নেই।সবার মুখে একই কথা গ্রামের মাতব্বরের ছোট মেয়ে হাত থেকে বেরিয়ে যাবে যেকোনদিন।মেয়ে মানুষকে এত বেশি পড়ালে তো তাই হবে।সে নাকি আবার কলেজ মেরামতের কাজ তদারকি করবে ভাবা যায়?তবে সে সবে জুঁই কান দেয়নি।বরাবরই তার এসব কাজ পছন্দ,তার মধ্যে তার আব্বা সায় জানিয়েছেন।জবা যে জলিল তালুকদারের আদরের ছিল না সেটাও বলা যায় না।দুই মেয়েই তার ভীষণ আদরের ছিলো।তবে যখনই জবা আর সুজনের সম্পর্কটা সামনে আসে তখনই বাঁধে বিপত্তি।মেয়েকে ভালোবাসলেও তিনি তার সম্মানের সাথে আপোষ করতে কোনমতেই রাজি ছিলেন না।
রান্নাবান্না শেষ করে জুঁই গেল নিজের ঘরে তৈরি হতে।সে শাড়ি পড়তে অভ্যস্ত।আজকেও তার ব্যতিক্রম হলো না।কাঠের আলমারি থেকে একটা সুন্দর গোলাপি রঙের তাঁতের শাড়ি বের করল।শাড়িটা বের করে কিছুক্ষণ বুকের সাথে জড়িয়ে রাখল।এই শাড়িটা জহির উপহার দিয়েছিল।বাড়িতে কত বাহানা করেছিলে শাড়িটা নিয়ে।বলেছিলো নিজে টাকা জমিয়ে কিনেছে।সবাই তেমন সন্দেহও করেনি বিশ্বাস করে নিয়েছিল।শাড়িটা পড়ে চুলটা বেনি করে নিল।তেমন একটা সাজগোজ করেনা জুঁই।তৈরি হওয়া শেষে ঘর থেকে বের হতেই দেখলো উঠোনে মতিউর হাঁটাহাঁটি করছে।জুঁইকে দেখে ওর মুখে হাসি ফুটে উঠলো।জুঁইও হাস্যজ্জ্বল মুখে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আপা ঘুম থেকে ওঠে নি?”
“হ্যাঁ উঠেছে।তা তুমি কোথায় যাচ্ছো?”
“কলেজের মেরামতের কাজ তদারকি করতে যাচ্ছি।গ্রামের মাতব্বরের মেয়ে,এটুকু তো করতেই হয়।”
“তা ঠিক বলেছো।তা চলো আমিও যাই।”
“নাস্তা করেছেন আপনি?”
“আমি সকালে তেমন কিছু খাইনা।চা খেয়েছি অতটুকুই যথেষ্ট।”
“তা বললে কি করে হয় বলুন তো?আব্বা কিংবা ভাইজানদের কানে যদি খবরটা যায় যে আমি আপনাকে সকালের নাস্তা না করিয়ে নিজের সাথে নিয়ে গিয়েছি তাহলে আমার খবর আছে।”
“তাহলে যে তোমার সাথে যেতে পারবো না।”
“আমি অপেক্ষা করছি।আপনি নাস্তা করে আসুন ততক্ষণে আমি আমার ছোট্ট একটা কাজ সেরে ফেলি।”
“আমি বোধহয় জানি তোমার সেই ছোট্ট কাজটা কি?”
জুঁই প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কি বলুন তো?”
“কোন রমণী যখন সুন্দর করে সেজেছে এবং যখন তার প্রেমিক পুরুষ আছে তবে সে নিশ্চয়ই তার থেকে প্রশংসা কুঁড়োতে যাচ্ছে।কি ঠিক বলেছি না আমি?”
জুঁই যেন একটু লজ্জা পেল।একটু আতঙ্কিতও হলো।আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো কেউ ওদের কথা শুনে ফেলল কিনা।তবে কাউকে দেখতে না পেয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।কিন্তু মতিউর কি করে বুঝলো?তার থেকেও বড় কথা এই মানুষটা যেন একটু বেশিই ভালো।সব পরিস্থিতিই কেমন যেন স্বাভাবিকভাবে নিয়ে নেয়।আদৌ কি মানুষটা যেমন দেখাচ্ছে তেমনি?নাকি সবটাই বাইরের ব্যবহার,ভেতরে তার অন্য কিছু চলছে?জুঁই কে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তার মনের প্রশ্নগুলো হয়তো পড়ে ফেলতে পারল মতিউর।আশ্বস্ত করে বলল,
“ভয় পেয়ো না।আমি মানুষটা যেমন দেখাচ্ছি তেমনই।তোমার সাথে ছলনা করে আমার কোনো লাভ নেই।তোমার কোন ক্ষতি করেও আমার কোনো লাভ নেই।না তোমার থেকে আমার কিছু পাওনা আছে না আমার তোমাকে কিছু দেওয়ার আছে।আমাদের দুজনের মাঝে হিসাবটা খুবই সহজ।অযথা একে জটিল বানিও না।”
“আপনাকে সত্যি বিশ্বাস করতে পারি আমি?”
“জোর করব না।সবে তো পরিচয় হলো কয়েকদিন কথা-বার্তা বলো আমার সাথে তারপর যদি বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় তবে করবে না হলে করবে না।কেউ তো আর তোমায় শর্ত দেয়নি যে তোমাকে বেঁচে থাকতে হলে আমাকে বিশ্বাস করতেই হবে,তাই না?আমাকে বিশ্বাস না করলে তুমি ম/রবে না।”
জুঁই হেসে ফেলল।অতঃপর দুজন দুজনের রাস্তায় গেল।
চলবে?

