#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ৭
#লেখনিতে খুশবু আকতার
ভর দুপুরবেলায় আজ উঠোন ঝাড় দিতে নেমেছে জুঁই।বাড়ির মধ্যে অনেকটুকু জায়গা উঠোন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।এখনো বোধহয় তার অর্ধেকটাও ঝাড়ু দেওয়া হয়নি আর এর মধ্যেই জুঁইয়ের কোমর লেগে এসেছে।উঠোনের চারিপাশে বিভিন্ন ফলের গাছ।গাছগুলোর মরা পাতা পুরো উঠোন জুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।এই শুকনো পাতাগুলো রান্নার সময় আ/গুন জ্বালানোতে বেশ কাজে লাগে।
আকাশের অবস্থা তেমন একটা ভালো না। বৃষ্টি এলে সব শুকনো পাতা আবার ভিজে যাবে সেই আশঙ্কাতে জুঁই এখনই কাজে লেগে পড়েছে।মেয়েটা ভীষণ কর্মঠ।সারাদিনই ঘরের টুকটাক কাজ করতেই থাকে। একটা মুহূর্ত নিজেকে বিশ্রাম নিতে নেওয়ার জন্য দেয় না।হাঁপিয়ে গিয়ে মাটির উপরে বসে পড়ল।গলা উঁচিয়ে একবার আনোয়ারা কে ডাকলো।
“আম্মা এক গ্লাস একটু ঠান্ডা পানি এনে দাও তো।গলাটা শুকিয়ে উঠেছে।”
মেয়ের ডাক শুনে আনোয়ারা তাড়াহুড়া করে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে এলেন।পানিটা খেয়ে যেন বুকটা জুড়িয়ে গেল জুঁইয়ের।আনোয়ারা মৃদু ধমক দিয়ে বললেন,
“এত কাজ করতে তোরে কে কইছে।?বাড়িত আমি আছি,বউয়েরা আছে, তো তোরে একল ক্যান করতে হইবো সব?”
“আমি একা কোথায় সব করি?দুপুরে রান্নাটা তো তুমি আর মেজ ভাবি মিলেই করলে।এখন তো শুধু উঠোনটা ঝাড় দিচ্ছি।”
“এত বড় উঠান একলা ছাফ করা কি চাট্টিখানি কথা?আর তুই হইলি যুবতী মাইয়া। সারাদিন এত বাইরে ঘুরাঘুরি করোস ক্যান মা?রাস্তা দিয়ে কত ব্যাটা মানুষ যাওয়া আসা করে তাগরে তো খারাপ নজর পড়বো তোর উপর।”
“এ আবার কেমন কথা আম্মা?আমি কি অশ্লীলভাবে চলাফেরা করি নাকি?আর কোন পুরুষ যদি আমার উপরে কু অজর দেয় তাহলে তো সেটা তার দোষ তাহলে আমি কেন নিজেকে ঘর বন্দী করে রাখবো?তার উচিত না নিজের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা?”
আনোয়ারা বিরক্তি মাখা কন্ঠে বললেন,
“তরে আমি এত পড়াশোনা করাইয়া খুব ভুল করছি জুঁই।মাঝেমধ্যে আমি ভাবি গেরামের মাইনষে যে কয় আমার মাইয়া আমার হাত থেইকা বাইর হইয়া গেছে হেইডা সত্যি কতা।”
“তুমি কিন্তু অযথাই আমাকে দোষারোপ করছো আম্মা।আর তাছাড়া আমি হলাম মাতব্বরের মেয়ে।কারো সাহসই নেই আমার দিকে চোখ তুলে তাকানোর।”
“হ হইছে।এহন থাম।”
কথা বলতে বলতেই আনোয়ারার অভিব্যক্তি হুট করে কেমন বদলে গেল।তাড়াহুড়ো করে মাথায় দেওয়া ঘোমটাটা আরেকটু টেনে নিলেন। শাড়ির আঁচলটা ঠিকঠাক করে নিজের সম্পূর্ণ শরীর আরো সতর্কতার সাথে শাড়ির আবরণে ঢেকে ফেললেন।চোখে মুখে তার মৃদু ভয়ের ছাপ ফুটে উঠলো।ওনার হঠাৎ এমন আচরণের কারণ জুঁই ঠিক বুঝতে পারল না।আনোয়ারার দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই দেখলো লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক প্রৌঢ়া ওদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে।তাকে দেখতেই জুঁইয়ের সারা শরীর বিরক্তিতে ছেয়ে গেল।উঠোন থেকে চলে যেতে নিলে আনোয়ারা ওর হাত টেনে ধরে আতঙ্কিত গলায় বলল,
“বড় আম্মা আইতাছে দেখতাছোস না?হের লগে কথা না কইয়া কই যাইতেছিস তুই জুঁই?”
“তোমার বড় আম্মার সাথে তুমি কথা বলো আম্মা।ওই বুড়ির সাথে কথা বলার আমার কোন ইচ্ছে নেই।”
আনোয়ারা চোখ রাঙিয়ে বললেন,
“এইবার কিন্তু আমার হাতের মা/ইর খাবি তুই জুঁই।আমি তোরে কইছি না সবাইরে সম্মান দিবি।আর বুড়ি কি?বড় দাদি কইয়া ডাকতে পারোস না?”
“তুমি জানো আম্মা আমার যাত্রাপালা অপছন্দ।আর তাই যাত্রাপালার মতন নাটক আমার বাস্তব জীবনে করতে পারবোনা।ওনাকে যে আমি সহ্য করতে পারি না সেটা উনি নিজেও খুব ভালোভাবেই জানেন।আর আমার মনে হয় না এতে ওনার খুব একটা বেশি আফসোস আছে। তুমি এত হা হুতাস করছ কেন?”
ওদের কথাবার্তার মাঝেই লাঠির ঠকঠক আওয়াজ তুলতে তুলতে গোলাপি বানু সেখানে এসে উপস্থিত হলেন।এসেই আগে ব্যাঙ্গাত্মক গলায় জুঁই কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“কি লো ছেমড়ি,আমারে দেইখা পলাইতেছস ক্যান?”
জুঁই বিরক্তি মাখা দৃষ্টিতে গোলাপি বানুর দিকে তাকালো।পড়নে তার হালকা বাদামী রঙের সুতি শাড়ি যার জায়গায় জায়গায় পানের পিকের দাগে ভরা।মাথায় চুল নেই বললেই চলে।সাদা চুল গুলো হয়তো এখন হাতে গোনা যাবে।বয়স ৬৫ পেরিয়েছে।তবে এখনো তার তেজ কিংবা কুটনামি কোনটাই কমেনি।ঠোঁট জুরে তার লেপ্টে আছে ক্রুর হাসি। পান খাওয়ার নেশা তার প্রবল।সেই পানে জর্দার পরিমাণটা সর্বাধিক থাকে।তার আবার যে সে জর্দা হলে চলে না।হাকিমপুরি জর্দা ছাড়া তিনি পান খেতে পারেন না।মুখের চামড়া কুঁচকে এসেছে।চোয়াল দুটো দাবানো।চোখের নিচে কালি জমতে জমতে এমন অবস্থা হয়েছে যেন সেখানটায় পুড়ে গেছে।স্বামী মারা গেছে আজ পঁচিশ বছরের অধিক সময় হলো।তবে এখনো তিনি তার সংসারে কর্তৃত্ব হারাননি।ছেলে, ছেলের বউরা আজও তার সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলার সাহস পায় না।জুঁই কে এক দৃষ্টিতে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কি লো এমন চাইয়া আছোস ক্যান?”
জুঁই এবারে মুখে মেকি হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“তোমারে দেখতেছি খুব সুন্দর লাগতাছে বুড়ি দাদি।দিন দিন তো দেখতেছি তোমার রুপ আরো খুলতাছে।মুখখানা চকচক করতাছে।আর এই হাসির কারণ খানা কি?নতুন দাদা পাইলা নাকি?”
জুঁইয়ের মুখ থেকে এমন বেখাপ্পা কথা শুনে আনোয়ারা আঁৎকে উঠলেন।গোলাপি বানু না জানি কখন আবার কি সব গালাগালি শুরু করেন।গোলাপি বানু পানের পিকটুকু উঠোনের একপাশে ফেলে দিয়ে মৃদু রাগী কন্ঠে জুঁই কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“যৌবনকালে তো তুই আমারে দেখস নাই হের লাইগা তুই জানোস না যে গোলাপি বানু কি ছিল।এই রূপ দেইখাই তোর দাদা আমারে বিয়া কইরা আনছিল।সেই রূপ কি যাওন এতই সোজা নাকি।”
“তাও ঠিক কইছো।তা এখন কইয়া ফালাও দেখি কার পিছনে বাঁশ দেওনের লাইগা আমার বাড়ি আইছো?”
“ওই ছেমরি এইডা তোর বাড়ি কেন হইতে যাইবো লো?এইডা আমার বড় ব্যাটার বাড়ি।আর আমি ক্যান এই বাড়িত আইছি হের কৈফিয়ত তোরে দেওন লাগবো?”
“দিলে ভালোই হইতো।যাইহোক তোমার ব্যাটার থেইকা শুইনা নিয়ো যে এই বাড়ি খান জুঁইয়েরও।”
গোলাপি বানু আর জুঁইয়ের সাথে কোন কথা বাড়ালেন না।আনোয়ারা কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“তা বউ শুনলাম নাকি তোমার বেটি জামাই আইছে?আমার লগে তো দেখা কইরবের আইলো না কেউ?”
আনোয়ারা অপরাধী কণ্ঠে বললো,
“আসলে বড় আম্মা ওগো কোন দোষ নাই,আমারই ভুল হইছে।আমারই উচিত ছিল ওগোরে আপনার কাছে পাঠান।”
“এই বাড়ি আইছো কম তো বছর হইলো না।এহনো তোমার ভুল যায় না?এক ঠ্যাং তো কবরের মইধ্যে গেছে গা আর কোন দিন তুমি ভুল করন ছাড়বা?”
আনোয়ারা কোন উত্তর দিলেন না অপরাধীর ন্যয় চুপচাপ মাথা নিচু করে রইলেন।তবে জুঁইয়ের এই কথাটা একদমই সহ্য হলো না।হাসতে হাসতে গোলাপি বানুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তা বুড়ি দাদি আমার মায়ের যদি এক ঠ্যাং কবরের মধ্যে যাইয়া থাকে তাইলে তো তুমি গোটাডাই কবরের মধ্যে যাওনের কথা।তাও তোমার এখনো ভুল হয় ক্যান?”
গোলাপি বানু প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আমার কি ভুল হইছে?”
“এই দেহোনা তুমিতো শাড়িখান উল্টা কইরা পড়ছো।শাড়ি তো তুমি পড়ো অনেক আগে থেইকা।এই ধরো তোমার ১২-১৩ বছর থেইকা।তাইলে তুমি যহন তোমার প্রায় ৫০-৫২ বছরের ভুল এহনো শোধরাইতে পারো নাই তাইলে আমার আম্মার তো সংসারের ৩০ বছর হইলো।”
“শোন ছেমরি আমারে বেশি জ্ঞান দিতে আইবি না।বেয়াদবি আর মুরুব্বির মুখে মুখে তর্ক করা তোর গেল না।নামাজ কালাম তো কিছু পড়স না।মাথার মধ্যে সারাদিন খালি শয়/তানি ঘুরতে থাহে।হাদিস কুরআান তো পড়শ না ভালো হইবি কেমনে?”
জুঁইকে বলা শেষে এবার আনোয়ারা কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আর বউ তোমারেও কই মাইয়া বড় হইছে এহন কি একটু আক্কেল শেখানো দরকার না?বড় ছেমরিডারে ছাইড়া দিয়া থুইয়া পেম ভালোবাসা কইরা ফালাই ছিল।এইডা তো আরো বেশি খাপছাড়া।দেহো এরে ছাইড়া দিয়া যেন আবার বড়ডারে পার কইরা পোয়াতি হইয়া না আসে।বানাইছো তো একখান নির্লজ্জ।আমারে দেইখা না সালাম দিল না মাথাত কাপড় দিল।সারাদিন লোকজন কিছু মানে না ড্যাং ড্যাং কইরা ঘুইরা বেড়ায় সারা গেরামে।”
কারো কথার উচিত জবাব না দিয়ে জুঁই কোন মতেই নিজের মুখটাকে বন্ধ রাখতে পারে না।তাও যদি অপর পাশের মানুষটা তার চরম অপছন্দের হয় তাহলে তো মুখ বন্ধ রাখার কোন প্রশ্নই আসে না।গোলাপি বানু কি ভেবেছে জুঁইয়ের কাছে ওনাকে খোঁচা মা/রার মতন কোন কথা নেই?শুধু আনোয়ারার জন্য কিছু বলতে পারেনা।তবে এখন মনে হচ্ছে ওনাকে এতোটুকু সম্মান দেওয়াই জুঁইয়ের ভুল হয়েছে। যা নাই তাই বলে,বারবার চরিত্রের উপর আঙুল তোলে।জুঁই ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,
“আমি না হয় নির্লজ্জ বড় দাদি তা তুমি যদি এত ভালো হও তাইলে এই বয়সে এসব ব্লাউজ ছাড়া শাড়ি পরো কেন?তোমারে বুঝি বেগানা পুরুষ মানুষ দেখে না নাকি দেখাইয়াই মজা পাও?আর আমি পোয়াতি হই না বিয়া করি সেইডা আমার বাপের ব্যাপার তোমার এত ভাবনা ক্যান? তোমার ব/ল/দ মা/র্কা নাতিরে বিয়া করি নাই জন্যে তোমার শরীরে খুব জ্বা/লা ধরছে তাই না?”
“মা***** মাইনষের এত চোপা ভালো না লো ছেমড়ি।সোয়ামির ঘরে যাইয়া দুই দিনও টিকবের পাইবি না।আর শোনো বউ তোমার এই ধামরি মাইয়াডারে টাইট দেওনের ব্যবস্থা করা।তসবি-টসবি পড়াও।দেখবা ঘাড় থেইকা শয়/তান নাইমা গেছে।”
জুঁই আবার শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“তুমি তাইলে যে সারাদিন তসবি গলায় ঝুইলা রাখো তোমার ঘাড় থেইক শয়/তান নামে না কেন বড় দাদি?নিশ্চয়ই খালি ঝুইলাই রাখো,কুটনামি করতে যাইয়া আর পড়া হয় না।আমারে শয়/তান ধরেনি আর তোমারে শয়/তান কোনোদিন ছাড়েইনি।আমি তসবি না পইড়াও আল্লাহর রহমতে শয়/তান ঘাড়ে চাপে নাই।শোনো যারা আল্লারে ভয় করে না তারা তার বান্দার লগে শয়/তানি করে না।আর যাই করি অন্তত কুরআন পড়তে পড়তে মানুষের দুর্ণাম করি না।পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শেষে কার বাড়িত কি ঘটতাছে এইডা কান পাইতা শুনি না।তুমি এক কাম করো নিজের চরকায় তেল দাও।বয়স তো আর কম হইলো না।এহন একটু শয়/তানি কমাও।দেহো শেষ বয়সের ইবাদত দিয়া যদি মালিকের একটু দয়া হয়।”
কথাটা বলে দুই হাতের ঝাঁটা অমনি ফেলে রেখে ঘরে চলে গেল।আনোয়ারা যে মেয়েকে শাসন করবেন সেই সুযোগও পেলেন না।এদিকে গোলাপি বানু আনোয়ারা কে কথা শোনানোর সুযোগ পেয়ে গেলেন।
“আরো পড়াও মাইয়ারে।কইছিলাম আমার নাতির লগে বিয়া দিয়া দাও অন্তত সংসার হইত ।আমার ব্যাটারে কইলে ওরে ঠিক ঘরে তুলতো।নাইলে তোমার মাইয়ার যা চালচলন বউ ওর সংসার হওয়া মুশকিল আছে।”
“এইসব কইবেন না বড় আম্মা।মাইয়াডা আমার ভালো খালি একটু কথা কয় বেশি।”
“একটু না মেলা বেশি কয়।আর ওর এই কথাই ওর সংসার হইবার দিব না।যাইহোক চলো জামাইয়ের কাছে নিয়া যাও।”
জবার ঘরে গিয়ে আনোয়ারা জবা কিংবা মতিউর কাউকেই পেলেন না।শেষে বাধ্য হয়ে আবার তাদেরকে ঘুরে ফিরে জুঁইয়ের ঘরে আসতে হলো।জবা সেখানেই ছিল।গোলাপি বানু কে আবার নিজের ঘরে দেখে জুঁই নিজের আম্মার উপরে প্রচন্ড বিরক্ত হলো।বুঝতে পারছে জবার খোঁজ নিতে এসেছে কিন্তু গোলাপি বানুকে তো জবার ঘরে বসিয়ে রেখেও খোঁজ নিতে আসতে পারতো তাই না?অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে রইলো।আনোয়ারা জবা কে মতিউরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল।জবা একটু ভেবে বলল,
“আমি তো ওনাকে ঘরে দেখে এসেছিলাম।জুঁইয়ের ঘরে আসার পর উনি কোথায় গেলেন আমি তো ঠিক বলতে পারছি না আম্মা।”
গোলাপি ঝাঁঝালো কন্ঠে জবা কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“নিজের সোয়ামি কই থাহে সেই খোঁজ তোর থাহে না কেন লো ছেমড়ি?এহনো কি অন্য ব্যাটার পেমে পইড়া আছস নাকি?তোমার দুই মাইয়ার চরিত্তোরো বড্ড খারাপ বউ।”
জুঁই তেড়ে উঠে কিছু বলতে নিলে জবা হাত ধরে ঠান্ডা হতে বলল।না হলে আবার ঝামেলা শুরু হবে।জবা মতিউরকে খুঁজতে যেতে ধরলে জুঁই ওকে বাঁধা দিয়ে নিজেই গেল খুঁজতে।কেননা গোলাপি বানু ততক্ষণে ঘরে একটা কাঠের চেয়ারে বসে পড়েছেন।আর এখন গোলাপি বানুর আজেবাজে কথা শোনার থেকে মতিউরকে খুঁজে আনা সহজ।যাওয়ার আগে গোলাপি বানুর দিকে ঝুকে পড়ে ফিসফিস করে বলল,
“ওই বুড়ি নাত জামাইয়ের লগে দেখা করতে আইছো ব্লাউজ ছাড়াই?লজ্জা নাই তোমার?”
কথাটা বলে বেড়িয়ে গেল হাসতে হাসতে।
______
মতিউরকে খুঁজতে খুঁজতে শেষে জহিরের ছোট্ট বাড়িটাতে পেল।মৃদু রাগী কন্ঠে মতিউরকে বলল,
“এই ভর দুপুর বেলায় এখানে কি করছেন দুলাভাই?আপনার জন্য আপাকে কত কথা শুনতে হলো।”
হঠাৎ জুঁইয়ের এমন কথার আক্রমণে মতিউর একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেল।রাগের কারণটা জানার জন্য বলল,
“আমি আবার কি করলাম? তুমি দেখছি আজ সকাল থেকে শুধু আমার উপর রাগ দেখিয়েই যাচ্ছো জুঁই।আর তোমার আপাকে আবার কে কি বলল?”
“আপনার দাদি শাশুড়ি মানে বুড়ি দাদি।তাড়াতাড়ি চলুন জামাইকে না দেখতে পেয়ে ওনার দম বেরিয়ে যাচ্ছে।যেকোনো সময় ম/রতে পারে। ম/রার আগে একবার ওনাকে নিজের বদনখানা দেখিয়ে ওনার জীবনটা সার্থক করে দিন।”
“যদিও তোমার কথার মানে আমি ঠিকঠাক বুঝিনি তবুও যাচ্ছি ।তা তুমি কি আমার সাথে যাবে না জহিরের সাথে কথাবার্তা বলবে?”
“কালাকে তো আমি রাতে দেখে নেব।এখন এমনিতেই মাথা গরম আছে ওর সাথে কথা বলতে গেলে মা/রামা/রি লেগে যাবে।ওর সাহস খুব বেড়েছে। রাতে ওকে দেখে নেব।এখন আপনি আসুন।”
কথাটা বলে জুঁই আগে আগে গটগট পায়ে হেঁটে চলে এলো।ওর পিছন পিছন মতিউরও এলো।ঘরে ঢোকার আগেই গোলাপি বানুর কিছু কথা জুঁইয়ের কানে গেল।একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে তার বলা কথাগুলো ভালো করে শোনার চেষ্টা করল।মতিউর সেদিকে না দেখে সোজা ঘরে ঢুকে যেতে ধরলে জুঁই ওর হাত টেনে ধরে নিজের পাশে দাঁড় করালো।মতিউর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল,
“আবার কি হলো?”
“চুপচাপ এখানে দাঁড়িয়ে থাকুন।আগে শুনি বুড়ি কি কথা বলছে।তারপর বুড়ির মাথায় যে কয়টা চুল অবশিষ্ট আছে সেই কয়টাও আমি টেনে তুলব আজ।”
জুঁইয়ের কথা শুনে মতিউর চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকালো। এই মেয়ে তো সাংঘাতিক।জুঁই দরজায় কান পেতে গোলাপি বানুর বলা কথাগুলো শোনার চেষ্টা করলো।তিনি জবাকে সাবধান করে দিয়ে বলছেন,
“শোন জবা ব্যাটা মাইনষের কোন বিশ্বাস নাই।মাইয়া দেখলেই হোগোরে দিল কাঁইপা ওঠে।সব সময় চেষ্টা করবি জামাইরে আঁচলে বাইন্দা রাহোনের।হের আশেপাশে কোন মাইয়া মানুষ যেন বেশি ঘুরাঘুরি না করে।আর জুঁই এর লগে জামাই এর এতো কি ভাব?শোন ওই মাইয়া যতই তোর নিজের মায়ের পেটের বোন হউক না ক্যান তারপরও হের কোন বিশ্বাস নাই।হেরে জামাই থেইকা দূরে রাখবি।”
জবা মৃদু বিরক্তির কণ্ঠে বলল,
“এসব কি বলছো বড় দাদি?আমার বোনকে আমি খুব ভালো করে চিনি।অযথা ওর নামে এসব কথা বলো না।আর তাছাড়া মতিউরও এমন মানুষ না।”
জবার মুখে মতিউরের নাম শুনে গোলাপি বানু হায় হায় করে উঠে বললেন,
“হায় হায় কি কয় লো এই ছেমরি?ওই মাইয়া নিজের সোয়ামির নাম মুখে নিতে নাই জানোস না?ওই ছেমরি জামাই তোর বড় না ছোট যে তুই হেরে নাম ধরে ডাকতাছস?”
“তো কি করে বলবো তাহলে ওনাকে?”
“যা মন চায় তাই কইয়া ডাকিস কিন্তু ভুলেও যেন জামাইয়ের নাম মুখে না নিতে দেহি।আর শোন যতই জুঁই ভালো হোক না ক্যান যহন নিজের স্বার্থের কথা হইবো তহন কিন্তু ওই আর তোরে চিনবো না।ওই মাইয়ারে আমি খুব ভালো কইরা চিনি।আমার তো মনে হইতাছে যে ও তোর জামাইয়ের পিছে পড়ছে।যদি সংসারটা বাঁচাইতে চাস তাইলে এখনই জামাইয়ের থেইকা দূরে রাখ।ওই হইলো গিয়া বেলজ্জা বেটি।”
জুঁই লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে ভিতরে গিয়ে গোলাপি বানুকে আচ্ছা মত কথা শোনানোর জন্য।আজ প্রথম না যখন গোলাপি বানু জুঁই কে অপমান করছে কিংবা ওর চরিত্রের উপর প্রশ্ন তুলেছে। এর আগেও একাধিকবার এমনটা ঘটেছে কিন্তু প্রতিবারই আনোয়ারার কথায় জুঁই কিছু বলতে পারেনি।তবে সবকিছুর একটা সীমা থাকা দরকার।মতিউর জুঁইয়ের আবভাব দেখে সেটা বুঝতে পারল।গোলাপি বানুর কথা তার কানেও এসেছে এবং তারও যে সেগুলো খুব একটা পছন্দ হয়নি সেটা তার অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট প্রতিয়মান হলো।জুঁই ভেতরে যেতে নিলে মতিউর ওর হাত টেনে ধরল।জুঁই বিরক্ত হলো কিনা তা বোঝা গেল না।মতিউরের দিকে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“আটকাচ্ছেন কেন আমায়?”
“ভেতরে যাবে ভালো কথা, নিজের অপমানের উত্তর দেবে সেটাও ভালো কথা কিন্তু এখন এসব কথা তুলনা।”
“কেন?”
“এমনিতেই উনি তোমার নামে আজেবাজে কথা বলতে ছাড়ছেন না।এর মাঝে আবার আড়ি পেতে কথা শোনার বদনাম ঘাড়ে নেবে কেন?”
“এমনিতেই আমার কম বদনাম নেই দুলাভাই।আরেকটু বদনাম হলে খুব বেশি ক্ষতি হবে না আমার।”
মতিউর বিরক্তিতে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করে বলল,
“তোমায় বোঝানো ভারি মুশকিল জুঁই।একদম নিজের আপার মতন হয়েছো একরোখা স্বভাবের।মাঝেমধ্যে তো একটু আমার কথা শুনতে পারো নাকি?”
“আচ্ছা ঠিক আছে শুনলাম আপনার কথা।”
ঘরে ঢুকতেই মতিউর গোলাপি বানু কে লম্বা করে একটা সালাম দিল।গোলাপি বানু আগে ভালো করে মতিউরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে নিলেন তারপর সালামের জবাব দিলেন।আনোয়ারা পরিচয় করিয়ে দিতে উদ্দ্যত হলে মতিউর যেন তা বুঝতে পারলো।আনোয়ারা কে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না আম্মা।আমি জানি ইনি আমার দাদি শ্বাশুড়ি।”
গোলাপি বানু সন্তুষ্ট হলেন।কিন্তু তার সেই সন্তুষ্টি মতিউর বেশিক্ষণ টিকতে দিল না।গোলাপি বানুর মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে বসে গাল ভরে হেসে তাকে জিজ্ঞেস করলো,
“কেমন আছেন বুড়ি দাদি?”
মতিউরের এমন সম্মোধন এক সাথে চার জোড়া বিস্ফোরিত দৃষ্টি ওর উপরে নিবদ্ধ হলো।মতিউর সেটা বুঝলো ঠিকই তবে এতে তাকে বিচলিত হতে দেখা গেল না।জবা এবাট চোখ গরম করে জুঁই এর তাকিয়ে বলল,
“ওনাকে তুই এই নামটা শিখিয়েছিস তাই না জুঁই?”
জুঁই ফিক করে হেসে দিয়ে বলল,
“না আপা আমি শেখাইনি।দুলাভাই নিজে থেকেই শিখে গেছে।”
এদিকে গোলাপি বানু তখনই একইরকম দৃষ্টিতে মতিউরের দিকে তাকিয়ে আছে।মতিউর ওনার থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে জবাকে উদ্দেশ্য করে গুরুতর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো,
“জবা বুড়ি দাদি কি কথা বলতে পারেন না?আরে সেটা আমায় আগে বলবে তো?”
জুঁই এবারে শব্দ করে হেসে উঠলো।হাসতে হাসতে জবার গায়ের ওপর পড়ে গেল।এদিকে জবা আর আনোয়ারা পড়েছেন মহা বিপাকে।গোলাপি বানু জুঁই কে একটা ধমক দিয়ে বললেন,
“ওই ছেমড়ি চুপ কর।মা**** মাইনষের হাসির শব্দ এত জোরে হইবো ক্যান?আর নাত জামাই তোমারেও কই আমি যহন সালামের উত্তর দেলাম তহন বোঝো নাই যে আমি কথা কইতে পারি না পারিনে?”
মতিউর অপরাধী কন্ঠে বলল,
“ক্ষমা করবেন বুড়ি দাদি।আসলে কথা বলছিলেন না তো তাই আগে কিছু বলেছিলেন কিনা ভুলে গেছিলাম।”
গোলাপি বানু পুনরায় চটে গিয়ে বললেন,
“বুড়ি দাদি কি হা?এইডা ওই শয়তান ছেমড়ি তোমায় শিখাইছে তাই না।ওই জবা তোর সোয়ামিরে কস নাই তুই আমারে কি কইরা ডাকোস?”
জবা তাড়াহুড়ো কন্ঠে মতিউর কে বলল,
“উনি আমার দাদার বড় ভাইয়ের বউ।আমাদের দাদি।ওনাকে বড় দাদি বলে ডাকুন।”
মতিউর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে।আগে জানলে এই ভুলটা হতো না।তো বুড়ি দাদি…ধুর বড় দাদি কেমন আছেন বলুন।”
জুঁই আবারো শব্দ করে হেসে উঠলো।তবে এবারে আর জবা তাকে নিজের গায়ের উপরে আশ্রয় দেয়নি।তাই বাধ্য হয়ে বিছানার উপরেই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।গোলাপি বানু অগ্নি দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ জুঁই এর দিকে তাকিয়ে থাকলেন।জুঁইয়ের হাসির আওয়াজ তার গায়ে যেন সুচের মতন বিঁধছে।মতিউরেরও কেন জানি ভীষণ ভালো লাগছে এই মানুষটাকে বিরক্ত করতে।তবে তার আনন্দ বুঝতে দিলে হবে না।
গোলাপি বানুর মনোযোগ ফেরানোর উদ্দেশ্য বলল,
“বড় দাদি আপনি জুঁইয়ের দিকে মনোযোগ দেবেন না।ওর ওপর মনে হয় জ্বীনের আছড় পরেছে।আপনি আমার সাথে কথা বলুন।”
গোলাপি বানু নিজের মনোযোগ আর দৃষ্টি দুটোই মতিউরের উপর নিবদ্ধ করলেন।আরো একবার তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে মতিউর কে পর্যবেক্ষণ শেষে সন্দেহি গলায় প্রশ্ন করলেন,
“ওই ছেমড়ির লগে তোমার এত পিরীত কিসের লো?ঘরে বউ রাইখা বউয়ের বোনের লগে এত সোহাগ আর মানুষ কইলাম গিয়া ভালো নজরে দেখবো না।”
মতিউর নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“কোনো ব্যাপার না।যারা অদ্ভুত কিছু দেখতে পাবে ঠিকটা দেখার জন্য তাদের সবার চোখে একটা করে চশমা লাগিয়ে দেব।আপনিও তো মনে হয় ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছেন না।তা শহর থেকে কি একটা চশমা আনানোর ব্যবস্থা করবো?”
গোলাপি বানু মুখ ঝামটি মেরে বললেন,
“না বাপু আমার চশমা লাগবো না।তা কাজ-বাজ কি করা হয়?”
“আপাতত বেকার বসে শ্বশুরের অন্ন ধ্বংস করছি।বাড়ি ফিরে আবার বাপের অন্ন ধ্বংস করবো কিছুদওন।তারপর ব্যবসায় লেগে পড়বো।”
“তাইলে তো বড়লোকের পোলাই লাগো তুমি।”
“তা ঠিক বলেছেন।একশো বিঘা সম্পত্তির মালিক তো একটু আকটু বড়লোক হবেই।”
গোলাপি বানুর চোখদুটো চিকচিক করে উঠলো এত সম্পত্তির কথা শুনে।সাথে এটা ভেবেও ভীষণ আফসোস হলো যে এই ছেলেকে যদি তার নাতনীর সাথে বিয়েটা দিতে পারতেন তাহলে একটু শান্তি পেতেন।কিন্তু যখন হাতছাড়া হয়েই গেছে তখন কি আর করার?
খেঁকখেঁক করে তিনি কেশে উঠলেন।ইশারায় আনেয়ারা কে পানি দিতে বললেন।দরজার কাছেই একটা মাটির কলসিতে করে কলের ঠান্ডা পানি রাখাই ছিল।আনোয়ারা স্টিলের গ্লাসটা নিয়ে কলসি থেকে পানি ঢেলে গোলাপি বানুর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।মুখের মধ্যে পানি নিয়ে কিছুক্ষণ গড়গড় করা শেষে ওখানেই সেই পানিটা ফেলে দিলেন।ইচ্ছে করেই জুঁইয়ের পায়ের কাছে পানিটা ফেললেন।জর্দার গন্ধে জুঁইয়ের গা গুলিয়ে উঠলো।পাশে বসা জবার চোখ রাঙানিতে তাও কিছু বলল না।কুলকুচি শেষে শাড়ির আঁচলে বেধে রাখা একটা পান মুখে পুরে মতিউর কে বললেন,
“তা এত বড় বাড়ির পোলা,বাপের এত সম্পত্তি,চেহারা সুরুতও আল্লাহ ভালোই দিছে।তাইলে খুঁত ওয়ালা ছেমড়িরে ক্যান বিয়া করলা?”
জবা মাথা নিচু করে ফেলল।আনোয়ারা কিছু বলতে চাইলেন তবে গোলাপি বানু তাকে পাত্তাই দিলো না।তবে জুঁই কে এবারে বেশ শান্ত দেখাল।তার দৃষ্টি মতিউরের উপরে নিবদ্ধ।যদি মতিউট এখানে উপস্থিত না থাকতো তবে জুঁইকেই প্রতিবাদ করতে হতো। তবে জুঁই জানে যেহেতু গোলাপি বানু জবার নামে এই কথাটা বলেছে তাহলে মতিউর চুপ থাকবেনা।আর মতিউর কি বলে সেটাই শোনার জন্য জুঁই অপেক্ষায় আছে।মতিউর আড় চোখে একবার জবার অস্বস্তি মাখানো মুখটার দিকে তাকালো।তারপরে গোলাপি বানুর দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বলল,
“খুঁতওয়ালা কাউকে তো আমি বিয়ে করিনি।”
গোলাপি বানুর ভ্রুঁ দ্বয়ের মাঝে গাঢ় ভাজ সৃষ্টি হলো।ঠেশ মে/রে বলল,
“এমন ভাব করতাছো লো যেন আমি কিছু জানি না।শোনো নাতজামাই জবা তোমার বউ হওয়ার আগে আমার নাতনি।আর এই গেরামের এমন কোন খবর নাই যেইডা গোলাপি বানুর কান অব্দি পৌঁছায় না।বিয়ের আগে যে তোমার বউয়ের অন্য ব্যাটার লগে লটর পটর ছিল হেইডা কি তুমি জানো না?”
“আহা ওইসব তো বিয়ের আগের কথা।আর ওটা খুঁৎ হতে যাবে কেন?আর এমন ভালোবাসা দু একটা বিয়ের আগে সবারই থাকে।আরে আমাকে দেখুন না আমিও তো শহরের একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম কিন্তু তার সাথে আর বিয়েটা হলো না।তাহলে সে দিক দিয়ে ধরতে গেলে তো খুঁত আমারও আছে।আর সম্পর্কে এমন দু-একটা খুঁত রাখাই যায়।এখন দেখুন না বড় দাদি আপনি যা সুন্দর মানুষ দাদার সাথে বিয়ে হওয়ার আগে আপনিও নিশ্চয়ই অনেকের হৃদয়ের রানী ছিলেন।এখন সেই জন্য কি আর দাদা আপনাকে ফেলে দিয়েছে?”
“ভালোই কথা কও তুমি।তা দেইখো বউ যেন আবার দুইদিন পর অন্য ব্যাটার হাত ধইরা পলাইয়া না যায়।এমন মাইয়া নিয়া কিন্তু সংসার করা মেলা প্যারা?”
জুঁই ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,
“যদি তোমারে নিয়া বড় দাদা সংসার করতে পারে তাইলে এই পৃথিবীর সব মাইয়ারে নিয়াই সংসার করা যাইবো বুড়ি দাদি।আর আমার বোনের খুঁত না দেইখা একটুখানি নিজের আর নিজের পরিবারের দিকে নজর দাও।তুমি যখন তোমার এই চোপা নিয়াও সংসার করতে পারছো তাইলে আমার শান্ত আপাও পারবো।তুমি এত চিন্তা কইরো না।আমার দুলাভাই আমার আপারে মাথায় তুইলা রাখবো।”
গোলাপি বানু অগ্নি দৃষ্টিতে জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই নিজের সংসারের কথা চিন্তা কর লো ছেমরি।দেখ ভা*****র জুটাইতে পারোস কিনা।আইজ যদি বাপের কিছু হয় না ভাইরা পা/ছা/য় লা/ত্তি মা/ইরা বাইর কইরা দিব।অবশ্য তোর লাহান বেটির চিন্তা নাই।ব্যাটা নাচাইতে পারোস তোরা।”
এবারে মতিউরের মুখ ফসকে একটা কথা বেরিয়ে গেল।তবে সন্দেহ একটা থেকেই যায় যে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে না ইচ্ছাকৃত ভাবে বলেছে।
“আপনাকেও তো দেখে মনে হচ্ছে যৌবনকাল অনেক সুন্দর ছিলেন।নিশ্চয়ই জুঁই আপনার থেকে এই গুণ পেয়েছে তাই না বড় দাদি?তবে যাই বলুন এই গুনটা কিন্তু সবার মাঝে থাকে না।তাইতো বলি আপনাকে আলাদা আলাদা লাগছে কেন সবার থেকে।”
কি মনে করে যেন গোলাপি বানু আর কোন কথা বাড়ালেন না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে জুঁই তব্দা খেলা।উঠে দাঁড়িয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘর থেকে পেরিয়ে গেলেন তিনি।ওনার পিছন পিছন আনোয়ারাও চলে গেল।মতিউর দরজার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় আবার বলে উঠলো,
“আপনি কিন্তু সবার থেকে আলাদা বুড়ি দাদি।”
চলবে?

