প্রেমের ঘাটের মাঝি #পর্ব ৮ #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
136

#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ৮
#লেখনিতে খুশবু আকতার

“আপনি কিন্তু সবার থেকে আলাদা বুড়ি দাদি।”
জুঁই আবারো শব্দ করে হেসে উঠলো।এবারে ওর সাথে মতিউরও যোগ দিল।ওদের দুজনকে এভাবে হাসতে দেখে জবা বিরক্ত হয়ে বলল,
“এখানে হাসার কি আছে?”
মতিউর বলল,
“এখানে হাসার অনেক কিছুই আছে জবা।কিন্তু আফসোস তুমি সেটা বুঝতে পারছ না।”
মতিউরের কথায় তাল মিলিয়ে জুঁইও বলে উঠলো,
“দুলাভাই একদম ঠিক বলেছে আপা।তুমি কেমন যেন বেরসিক হয়ে যাচ্ছো দিন দিন।আর দুলাভাই বলতেই হচ্ছে আপনার কোনো তুলনা হবে না।আপনি পৃথিবীর সব থেকে ভালো দুলাভাই।”
মতিউর আড় চোখে একবার জবা কে দেখে নিয়ে হাস্যজ্জল কণ্ঠে জুঁই কে বললো,
“যাক শালীর থেকে যখন ভালো হওয়ার সার্টিফিকেট পেয়ে গিয়েছি তাহলে কিছুদিনের মাঝে আশা করা যায় যে বউয়ের থেকেও সার্টিফিকেট পেয়ে যাব। কি বলো জুঁই?”
“আরে এটা আবার প্রশ্ন করার কোন বিষয় হলো নাকি? আপনি অবশ্যই তাড়াতাড়ি আপার থেকে ভালো বর হওয়ার সার্টিফিকেট পেয়ে যাবেন।”
ওদের কথাবার্তার মাঝেই কিছুক্ষণ আগে দরজায় সুজন এসে দাঁড়িয়েছে।ওদের হাসি ঠাট্টা দেখে কিছু বলতে পারছিলো না।তবে তার তো আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার কোন উপায় নেই।
“মতিউর সাহেব!”
কন্ঠটা কানে যেতেই তিনজনে এক যোগে দরজার দিকে তাকালো।চোখাচোখি হলো জবা আর সুজনের।নিয়মিত চোখে সুরমা ব্যবহার করার অভ্যাস সুজনের বহু পুরোনো।তবে সেই অভ্যাসটা স্থায়ী হয়েছে জবার কারণে।সুজনের সুরমা দেওয়া চোখ দুটো জবার ভীষন পছন্দের সেই জন্য চোখে সুরমা লাগাতে সুজন কখনো ভুলতো না।ধীরে ধীরে সেটা এখন নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।আজ অনেকগুলো দিন পর জবা আবারও সুরমা দেওয়া মায়াবী চোখ দুটোর দিকে তাকালো।কি মায়া ওই চোখ দুটোতে!যেন কত কিছু বলতে চাইছে চোখ দুইটা জবাকে কিন্তু বলতে পারছে না।যেন কত হাহাকার লিখে রেখেছে এই দু চোখের মাঝে।এই চোখে চোখ রেখে জবা যে কতবার নিজের অনুভূতির স্বীকারোক্তি দিয়েছে তার হিসাব নেই।একবার ওই চোখে চোখ পরলে জবার আর সাধ্য থাকতো না নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নেওয়ার।কি যে ছিল ওই চোখের মাঝে তা জবা জানে না।তবে ইচ্ছে করতো শুধু তাকিয়েই থাকতে।খুব গভীরভাবে টানতো সুজনের চোখ দুটো জবাকে।
জবার হাতের উপর জুঁই হাত রাখতেই জবা হালকা কেঁপে উঠলো।তৎক্ষণাত নিজের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।তবে এতটা সময় ধরে ওদের দুজনের একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকার দৃশ্যটা জুঁই কিংবা মতিউর কারোরই চোখ এড়াতে পারেনি।
জবা কে নিজের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে দেখে সুজন ও নিজের সম্বিৎ ফিরে পেল।পুনরায় মতিউরের উপর দৃষ্টিপাত করে বলল,
“পুকুর থেকে আজ মাছ তোলা হবে।মাতব্বর সাহেব আমায় বলেছিলেন যাওয়ার সময় যেন আপনাকে নিয়ে যাই।”
মতিউর উঠে গিয়ে সুজনের কাঁধের পিছন দিয়ে হাত রাখল।তারপর ওকে এক প্রকার জোড় করেই ঘরের ভেতরে নিয়ে এসে একটা চেয়ার টেনে বসালো।নিজে চেয়ারে বসতে বসতে বলল,
“আরে সুজন মিয়া সারাদিন এতো কাজ কাজ করলে হবে নাকি?একটু তো আমাদের সাথে গল্প গুজব করা যায় তাই না?”
জবা আর সুজন দুজনেই ভীষণ অস্বস্তিতে পড়েছে। সুজনের ঠিক মুখোমুখি বিছানার উপরে জবা বসে আছে।মতিউর হয়ত ইচ্ছে করেই চেয়ার ওখানে দিয়েছে।ওদের দুজনের অস্বস্তি জুঁই ঠিকই বুঝতে পারল। জোর করে মুখে একটু হাসি এনে মতিউর কে বলল,
“আপনি সুজন ভাইয়ের সাথে চলে যান দুলাভাই।নাহলে যেতে দেরি হয়ে যাবে।”
“আরে দাড়াও যাচ্ছি।তা সুজন মিয়া বলো তোমার খবর কি?দিনকাল কেমন কাটছে?”
“ভালোই কাটছে দিনকাল।বলছিলাম যে তাড়াতাড়ি চলুন না হলে ওই দিকে দেরি হয়ে গেলে মাতব্বর সাহেব আবার আমায় বকাবকি করবেন।”
মতিউর আশ্বস্ত করে বলল,
“তুমি এসব ভেবোনা। আমি ওসব সামলে নেব।কিন্তু একটা কথা তুমি যে মিথ্যে বলো এইটা তো আমি জানতাম না?”
তিন জোড়া বিস্মিত দৃষ্টি একসাথে মতিউরের উপর পতিত হলো।কি ভেবে যেন জবা বলে উঠলো,
“সুজন মিথ্যে বলে না।আপনি চেনেন ওকে কতদিন হলো যে এই কথা বলছেন?”
জবার কথা বলাটা সবার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল।
বিশেষ করে সুজনের জন্য।মতিউর আলতো হেসে বলল,
“আমি অল্প দিন চিনে ধরে ফেললাম যে তোমার সুজন মিয়া মিথ্যা কথা বলে আর তুমি এতদিনের পরিচয়েও ধরতে পারলে না জবা?”
জবা চোখ মুখে কাঠিন্যতা ফুটিয়ে তুলে প্রশ্ন করল,
“কি বলতে চাইছেন পরিষ্কার করে বলুন?”
মতিউর হো হো করে হেসে উঠে বলল,
“তুমি না জবা একটুতেই গুরুতর কিছু ঘটে যাওয়ার মতন করো।আরে সুজন মিয়া যে বলল দিনকাল ভালোই কাটছে এটা কি সত্যি তুমি আমায় বলো?আর যদি এটা সত্যি হয় তাহলে তো ভালোবাসা মিথ্যা হয়ে যাবে।কিন্তু ভালোবাসাটা তো সত্যি ছিল তাহলে কি এটা মিথ্যা নয়?”
আরো একবার সুজন আর জবার চোখাচোখি হলো।জুঁই বুঝতে পারছে না মতিউর এই কথা গুলো কেন বলছে,তার উদ্দেশ্যই বা কি।বারবার যে কেন মতিউর সুজন আর জবার সম্পর্কের কথা তোলে এই কথাটা জুঁই কিছুতেই বুঝতে পারে না।মতিউর তো জবার অতীত মেনে নিয়েই ওকে ভালোবেসেছে তাহলে বারবার এই কথাগুলো তুলে জবাকে কষ্ট দেয়ার মানেটা কি?সুজনকেই বা এর মাঝে কেন টানছে?মতিউরকে জুঁইয়ের সব সময় বিচক্ষণ একজন মানুষ মনে হয়। কোন কারণ ছাড়া মতিউর কিছু বলে না এতোটুকু বিশ্বাস মতিউরের ওপর তৈরি হয়েছে। আর ঠিক সেই কারণেই কিছু বলতেও পারছে না। হয়তো ভাবছে নিশ্চয়ই এর পেছনে কোন কারণ আছে। এদিকে সুজন আর জবার থেকে কোন উত্তর না পেয়ে মতিউর আলতো হাসলা।আনমনে কিছু একটা ভাবলো।চোখ মুখে ফুটিয়ে তুলল গুরুতর ভাব।সুজন আর জবা দুজনকে একসাথে জিজ্ঞেস করল,
“পালাবে তোমরা দুজন?সুজন মিয়া বলো পালাবে?জবা কে কি এখনো গ্রহণ করবে?পালানোর ব্যবস্থা আমি করে দেবো।”
উপস্থিত তিনটা মানুষই মতিউরের এমন কথায় আঁৎকে উঠলো।জুঁই তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে একবার মতিউর কে ভালোভাবে পরখ করে নিল।জুঁই জানে মতিউর বেশ বিচক্ষণ মানুষ।বুদ্ধি ও প্রবল। তার মুখে এমন একটা কথা যেন ঠিক মানানসই লাগলো না জুঁইয়ের কাছে।তবে মতিউরকে পর্যবেক্ষণ শেষে সে যেন অন্য কিছুই বুঝতে পারলো।বক্র হাসল।তার আপা আর সুজন ভাই বোকা জন্য মতিউরের এই কথার আসল মানেটাই বুঝতে পারল না।কিন্তু জুঁই তো ধরে ফেলেছে।
জবা তৎক্ষনাত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।ওর পিছু পিছু সুজন ও চলে যেতে নিলে মতিউর পিছন থেকে বলে উঠলো,
“কি হলো সুজন মিয়া বললে না তো বিবাহিত জবাকে গ্রহণ করবে কি করবে না?”
সুজন থামলো।পিছন ফিরে শান্ত বৃষ্টিতে মতিউরের দিকে তাকাল।মতিউর তিক্ষ্ম চোখে একবার সুজনের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করলো তবে বিশেষ কিছুই লক্ষ্য করতে পারলো না। ভীষণ স্বাভাবিক।
“দেখুন মতিউর সাহেব আপনার আর আমার মাঝে পার্থক্য আকাশ আর জমিনের সমান কিংবা হয়তো তার থেকেও বেশি।আপনার সাথে কোন প্রতিযোগিতায় নামার যোগ্যতাও হয়তো আমার নেই।জীবনের সব ক্ষেত্রে হয়তো আপনি আমাকে হারিয়ে দিয়েছেন তবে আমি একটা কথা জোর গলায় বলতে পারি জবা কে ভালোবাসার ক্ষেত্রে আপনি আমায় হারাতে পারবেন না।জবা আমাকে কতটা ভালোবাসতো বা এখনো বাসে সেটা নিশ্চয়ই এতদিনে বুঝতে পেরেছেন?আমি ওকে তার থেকেও বেশি ভালোবাসি।আপনি কি ভেবেছেন ওর বিয়ে হয়ে গেছে জন্য যদি ও কখনো আমার কাছে ফিরে আসার সুযোগ পেয়ে আসা আমি ওকে ফিরিয়ে দেবো?”
“কেন দেবে না?”
সুজন আলতো হেসে বলল,
“সুযোগ পেলে তো আমার জবার মৃ/ত্যুর পরে ওর লা/শটাকেও সারা জীবন বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে থাকবো।কিন্তু আমার সেই ক্ষমতা নেই।যদিও আমি আমার জীবিত কালে জবার মৃ/ত্যু দেখতে চাই না তাও আমার ভালোবাসাটা আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম।ওকে ছোঁয়ার অধিকার আমার নেই।ওই লা/শটার উপরেও আপনার অধিকারই থাকবে।ওকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ আমি কখনো পাবোই না কেননা ও আর আমার কাছে কখনোই আসবেই না।”
“ভালোবাসা তবে বেশ পাকাপোক্ত তাই না?”
“আমার ভালবাসা কতটা মজবুত সেটা আপনার কাছে প্রমাণ করার আমার কোন দায় নেই।আমি জানিনা আপনার উদ্দেশ্য কি, আপনি কেন বারবার আমার আর জবার সম্পর্কটা টেনে টেনে তুলছেন।এই ব্যাপারটাকে এত স্বাভাবিকভাবে কি করে নিচ্ছেন সেই সম্পর্কেও আমি জানিনা।তবে একটা কথা বলি আপনি আজ আমায় এই কথাটা কেন বললেন জানেন?”
“কেন?”
“ তার কারণ আপনি জানেন যে জবা কখনোই আমার কাছে ফিরবেন না।পুরো পৃথিবী আমাদের দুজনের এক হওয়ার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নেমেছিল মতিউর সাহেব।এত এত মানুষের ষড়যন্ত্রের সামনে আমাদের দুজনের ভালোবাসা হেরে গেছে।অনুরোধ রইল দয়া করে আমাদের হেরে যাওয়া ভালোবাসার কথা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তুলে আমাদের র/ক্তাক্ত হৃদয়টাতে আর আঘাত করবেন না।আপনি তো ভালোবেসে জিতে গিয়েছেন তাই হারানোর যন্ত্রণা বুঝবেন না।”
সুজন বেরিয়ে গেল। মতিউর কিছুক্ষণ ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল।ওর ধ্যান ভাঙলো জুঁইয়ের প্রশ্ন শুনে।
“অযথা ওদের মনে আশা কেন জাগাচ্ছেন?”
“পূরণ করব বলে।”
জুঁই সন্দেহি গলায় প্রশ্ন করল,
“আপনি আসলে চাইছেনটা কি বলুন তো?আপনার প্রশ্নের মানেটা কিন্তু আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছি।”
মতিউর আগ্রহ ভরা দৃষ্টিতে জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি বুঝেছো শুনি?”
“এই নাটকটা করার কি খুব দরকার ছিল?আপনি যেতে দিতেন না আপাকে।তাহলে কেন এই কথাগুলো বললেন?”
“ওরা চাইলেই যেতে দিতাম।”
“আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করবেন না দুলাভাই।আমার বুদ্ধির তিক্ষ্মতা হয়তো আপনার তীক্ষ্ণতার সমপর্যায়ে যেতে পারবে না তবে তার কাছাকাছি ঠিকই পৌঁছাতে পারবে।আপনি শুধুমাত্র এটা বুঝতে চাইলেন যে ওদের দুজনের মাঝে এমন কোন পরিকল্পনা আছে কিনা তাই না?”
“পরিকল্পনা থাকলেও আমি না চাইলে ওরা সেটা বাস্তবায়ন করতে পারবে না জুঁই।”
“সেই ক্ষমতার সুযোগ নিচ্ছেন?”
“সুযোগ কি করে নেয় আমার তা জানা নেই।”
“শুরুতে আপনার প্রতি যে সন্দেহটা আমার ছিল সেটা কিন্তু আবার নতুন করে জাগলো।আপনাকে বিশ্বাস করেও কেন যেন আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।আপনি মানুষটা বড্ড বেশি গোলমেলে।শুনুন দুলাভাই আপনাকে একটা কথা বলি আমার আপা আমার মতন এত চালাক না।আর না সুজন ভাই আপনার মত এত তীক্ষ্ম বুদ্ধি সম্পন্ন।খুব সরল মনে ওরা দুজন দুজনকে ভালোবেসেছিলো।ওদের সাথে কোন নোংরা খেলা খেলবেন না।”
মতিউর একবার দৃষ্টি তুলে জুঁইয়ের দিকে তাকালো।কি যেন একটা বলতে চাইলো জুঁই কে।ভেতরে কিছুক্ষণ দ্বিধা দ্বন্দ্ব চললো যে বলবে কি বলবে না।অবশেষে দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে বলেই ফেলল,
“নিজের মানুষের ব্যাপারই আলাদা, তাইনা জুঁই?তুমি তোমার আপার সরল মনের ভালোবাসা দেখলে, তোমার সুজন ভাইয়ের সরল মনের ভালোবাসা দেখলে আর আমার ভালবাসা জটিল মনে হলো?আমার সরলতা গুলো তোমার কাছে নোংরা খেলা মনে হলো?একটু ভেবে দেখো সুখি কিন্তু ওরা দুজনেই।অন্তত ওদের কাছে একটা বিষয়ের নিশ্চয়তা আছে যে ওরা একে অপরকে ভালোবাসে।আর আমায় দেখো না, জবা কে পেয়ে তো গিয়েছি ঠিকই তবে আমি জানি ওর মনটা আজীবন অন্য কারোরই থাকবে।”
জুঁইয়ের একটু মায়া হলো।তবে কেন যেন এই মানুষটার উপরে মাঝে মাঝে সন্দেহ জাগে ।এমন একেকটা কান্ড ঘটায় যে সন্দেহ না করে থাকতেই পারে না।
“দেখুন দুলাভাই আমি সেভাবে বলতে চাইনি। আমার কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি ক্ষমা চাইছি।তবে আপনাকে সন্দেহ করার সব থেকে বড় কারণ আপনি নিজেই।সত্যি করে বলুন তো আপা যদি আজকে বলতো যে সুজন ভাইয়ের কাছে চলে যেতে চায় আপনি যেতে দিতেন।”
মতিউর চেয়ারের সাথে হেলান দিয়ে বসে হাত দুটো ঘাড়ের পেছনে রেখে চোখ বন্ধ করে বলল,
“মৃত্যুকে আমরা কেই বা আপন করতে চাই।তবে মৃত্যু কি আর আমাদের কথা শোনে?এই প্রাণ পাখিটা কে তুমি যতই বেঁধে রাখতে চাও না কেন জুঁই তার যখন বেরিয়ে যাওয়ার সে ঠিক যাবেই।”
জুঁই প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“দুটো বিষয়ের মাঝে সম্পর্ক কি?”
“জবার চলে যাওয়া আমার কাছে এখন মৃত্যুসম।মৃত্যু কে আটকে রাখার ক্ষমতা কারই বা আছে?সে যদি খাঁচা থেকে বেরিয়ে মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করতে চায় আমি বাধা দেব না।তাতে যদি আমার মৃত্যু হয় তবে তাই হোক।তবুও সে তার জীবনে সুখি হোক।”
দরজায় দাঁড়িয়ে জবা কথাগুলো শুনলো।কিছুক্ষণ থ মে/রে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকলো।কে জানে কি বুঝলো?
_____
“কি ব্যাপার বড় ভাবি আজ এত তাড়াতাড়ি রাতের রান্না বসিয়ে দিয়েছো যে?”
মুক্তা তরকারি কা/টতে কা/টতে ব্যস্ত কন্ঠে জুঁইকে বলল,
“আর বইলো না সুজন সকাল থেইকা না খাইয়া আছে।আম্মা অসুস্থ হের লাইগা সকালে রানতে পারে নাই, দুপুরেও কিছু খায় নাই।দুপুরের খাবার কিছু বাকি নাই তাই রানতেছি।”
জাকিরেরও দুপুরে খাওয়া হয়নি।দোকানের কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে শহরে গিয়েছিলো।রান্নাঘরের এক পাশে মুক্তা পাটি বিছিয়ে দিয়ে তাকে খেতে দিয়েছে।এই বাড়ির অন্য পুরুষদের তুলনায় জাকিরকে একটু সহৃদয়বান বলা যায়।একটু বললে অবশ্য ভুল হবে বেশ অনেকটাই সহৃদয়বান সে।অন্তত মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে।খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে তার ঝামেলা বেশ কম।মুক্তার কাছ থেকে সুজনের না খাওয়ার কথা শুনে তার খাওয়ার হাতটা থেমে গেল।মুক্তা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সুজন খায়নি সেটা আমায় আগে বলবেন না ভাবি?এই খাবারটা কি দুজন মিলে ভাগ করে খাওয়া যেত না?”
জাকিরের কথায় সায় জানিয়ে জুঁই বললো,
“তাইতো ভাবি।এটা তো বড় কিংবা মেজ ভাইজান ছিল না যে তোমার বলতে ভয় করবে।আজকে সকাল থেকে না খাওয়া মানে বোঝো?এখন তুমি সেই কখন রান্না করবে কখন খাবে এসবের কোন মানে হয়?”
মুক্তা মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,
“তরকারি নামাইছি জুঁই।ভাতও হইয়া গেছে।এই তরকারি খানা তুইলা দিয়াই ওরে খাইতে দিমু।আর জাকির ও তো সকাল থেইকা কিছু খায় নাই এর মাঝে আবার তোমারে কেমনে কই।”
জাকির আর কোন কথা বাড়ালো না।চুপচাপ নিজের খাবারে মনোযোগ দিল।জুঁই তাড়া দিয়ে বলল,
“তুমি যাও খাবার বেড়ে সুজন ভাইকে গিয়ে দিয়ে এসো।আমি তরকারি তুলে দিচ্ছি।”
জুঁইকে জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে মুক্তা একটা প্লেট এনে ভাত বাড়ল।আজ বোয়াল মাছ রান্না করেছে।মুক্তা জানে সুজনের এই মাছটা ভীষণ পছন্দ।এই বাড়িতে বেশ কয়েকবার খাওয়া হয়েছে।বাপের বাড়িতে তো কিনতে পারত না আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায়।মুক্তা বেছে বেছে একটা বড় পিছ প্লেটে তুললো।সুজন তখন জহিরের ঘরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে।এই গ্রামে থাকাকালীন যখন একটু কাজের ফাঁক পায় তখন তার পুরো সময়টা জহিরের সাথে কাটে।দুজনে সমবয়সী সেই সাথে বেশ ভালো বন্ধু।মুক্তা খাবার বেড়ে নিয়ে উঠানে পাঁ রাখার সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে যেন জামশেদ এলো।জামশেদ কে দেখতে পেয়ে মুক্তা যেন কেঁপে উঠলো।তাড়াহুড়ো করে মাথার ঘোমটা টা টেনে নিল।না কিছু বলার সাহস পেল, না জামশেদকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সাহস পেল। খাবারের থালাটা হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।জামশেদ ভ্রুঁ কুঁচকে একবার মুক্তার হাতের খাবারের থালাটার দিকে তাকালো।পর্যবেক্ষণ শেষে প্রশ্ন করল,
“এখন আবার কিসের খাবার সময়?কে খাবে এটা?”
জামশেদকে এতক্ষন জুঁই খেয়াল করেনি। ওর কন্ঠ শুনে মাথা তুলে তাকালো।এদিকে মুক্তার আর সাহস হচ্ছে না বলার যে খাবারটা সুজনকে দিতে যাচ্ছে।মুক্তা কে চুপ করে থাকতে দেখে জুঁইয়ের একটু রাগ হলো।হালকা রাগী কন্ঠে বলল,
“বলতে পারছো না বড় ভাবি কাকে খাবারটা দিতে যাচ্ছো?একটা স্বাভাবিক প্রশ্নে এত ভয় পাওয়ার কি আছে?”
“তুই যখন ভয় পাচ্ছিস না তাহলে তুই বল খাবারটা কাকে দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?”
জামশেদের প্রশ্নে জুঁইকে একটুও বিচলিত হতে দেখা গেল না।স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,
“এমনভাবে প্রশ্ন করছেন যেন আপনি বুঝতে পারেননি।কার জন্য খাবারটা নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেটা জানেন জন্যই তো এগিয়ে এসে আলাদা করে জিজ্ঞেস করছেন।”
“মুখে মুখে তর্ক না করে প্রশ্নের উত্তর দে জুঁই।”
জাকির বুঝলো পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে পারে জুঁইয়ের আগে তাই সে উত্তর দিয়ে উঠলো,
“সুজনের জন্য নিয়ে যাচ্ছে ভাইজান। আসলে ছেলেটা সকাল থেকে কিছু খায়নি।”
জামশেদ কেমন করে যেন হেসে উঠলো।ওর সে হাসি জানান দিল যে পরবর্তীতে খুব ভালো কিছু ঘটবে না।জামশেদ মুক্তাকে উদ্দেশ্য করে ঠান্ডা স্বরে বলল,
“ভাইকে খাওয়ানোর জন্য এত বড় মাছের পিছ নিয়ে যাচ্ছো?তা বাপ জন্মে এত বড় মাছের পিকছ দেখেছে যে এখন দিচ্ছো?মাস শেষে তোমার ভাইকে বেতন দেব,আবার তিন বেলা বিনামূল্যে খাওয়াবো মগের মুল্লুক পেয়েছো?”
শেষের কথাটা জামশেদ ধমক দিয়ে বলে উঠলো।আরো একবার মুক্তা কেঁপে উঠল। কম্পিত গলায় বলল,
“কোনদিন তো খাবার দেই নাই।আসলে সকাল থেইকা কিছু খায় নাই। এহনো নাকি কাজ বাকি আছে হের লাইগা বাড়িত যায়নি।তাই একটুখানি ভাত দিতেছিলাম। কাম করতে করতে মুখখান শুকাইয়া গেছে।আর দিমু না কোনদিন।”
“এর আগেও যে দাওনি সেটা তো আর আমি দেখতে যাইনি।তোমার সাহস বড্ড বেড়ে গিয়েছে মুক্তা।আজকাল বোধহয় আমায় দেখে ভয় করছ না।আমাদের টাকা-পয়সা এত বেশি হয়নি যে তিন বেলা ভিখারিদের বিনামূল্যে খাবার দেব।কোন খাবার দেবো না।আর বেশি কথা বললে তোমার খাবারও বন্ধ করে দেব।”
না আর চুপ থাকা গেল না।জুঁই যতই ভাবে জামশেদের সাথে তর্কে জড়াবে না ততই যেন পরিস্থিতি তার বিপক্ষে চলে যায়।এমন কথাবার্তা শোনার পরে কি জুঁই করে চুপ থাকতে পারে?
পাতিলের পরিষ্কার পানিতে হাতটা ধুয়ে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে জামশেদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“কি সমস্যা আপনার ভাইজান?এক বেলা সুজন ভাইকে খাবার দিলে কি এই পরিবারে দুর্ভিক্ষ নেমে আসবে?”
জামশেদ দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“তোর যদি দরদ উতলে পড়ে তাহলে নিজে কামাই করে এনে খাওয়াস।নিজেই তো বসে বসে বাপ-ভাইয়ের টাকায় গিলিস আবার অন্যের হয়ো ওকালতি করতে এসেছিস?”
“হ্যাঁ এসেছি।আমার আব্বা এখনো জীবিত আছে।তার টাকাতেই খাচ্ছি আমি।আর এমন ভাব ধরছো যেন তুমি আলাদা করে উপার্জন করো।নিজেও তা আব্বার টাকাতেই খাচ্ছো।”
“জুই!”
“থাক ভাইজান আপনার সাথে কথা বাড়াতে চাই না।ভাবি তুমি সুজন ভাইকে গিয়ে খাবারটা দিয়ে এসো।আর ভাইজান আপনাকে বলে রাখি আমি আমার অংশের রাতের খাবারটুকু সুজন ভাইকে দিলাম। আশা করছি এরপর আর আপনার কিছু বলার থাকবে না।রাতে আমি খাব না তাহলেই তো হয়ে গেল?”
“কয় বেলা না খেয়ে অন্যকে দান করবি? নিজের পেটে কি টান পড়বে না?”
“পেটটা তো আমার টান পড়লে না হয় আমি বুঝে নেব।”
জুঁইয়ের এবার রাগ হলো মুক্তার উপর।একেই তো সারা জীবন চুপচাপ মুখ বুঝে জামশেদের অন্যায় আবদার গুলো মেনে এসেছে যার ফলে জামশেদ আজ সবার মাথায় চড়ে বসেছে। নিজের ভাইকে খাবার দিতে যাবে তাতে এত ভয়ের কি আছে জুঁই ভেবে পাইনা?সংসারটা তো মুক্তার ও।এখন আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।জুঁই বুঝলো মুক্তাকে দিয়ে কিছু হবে না।এগিয়ে গিয়ে ওর হাত থেকে থালাটা নিয়ে গটগট পায়ে হেঁটে জহিরের ঘরের দিকে চলে গেল।জামশেদ চোখ গরম করে মুক্তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার টাকায় তোর বাপের বাড়ির সেবা করা থামা।না হলে একদিন দেখবি তোর দিন এই বাড়িতে ফুরিয়ে এসেছে।”
জামশেদের এমন কথায় জাকির রুষ্ঠ কন্ঠে বলল,
“এভাবে কেন বলছেন ভাইজান?ঘরে ভাবির সাথে যেমন আচরণই করুন না কেন অন্তত বাইরে এসে তো তাকে একটু সম্মান দেবেন?আর তাছাড়া এক বেলারই তো ব্যাপার।আমাদের বাড়িতে কি খাবারের অভাব পড়েছে যে সুজনকে এক বেলা খাবার দিলে কম পড়ে যাবে?”
জামশেদ অগ্নি দৃষ্টিতে জাকিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বউয়ের সাথে কেমন আচরণ করতে হয় সেটা আমায় তোর থেকে শিখতে হবে?জুই এর মতন বাড়াবাড়ি করিস না জাকির।আর ওর বাড়াবাড়ি আমি খুব তাড়াতাড়ি কমাবো।”
জামশেদ চলে গেল। জাকির একটা হতাশার শ্বাস ফেলল।হাত ধুয়ে এসে সেও চলে গেল।মুক্তা চুপচাপ এসে আবার পূর্বের জায়গায় বসে তরকারি কাটায় মনোযোগ দিল।কিছু সময়ের ব্যবধানে তার হাতটা থেমে গেল।হুট করে আঁচলে মুখ গুঁজে কেঁদে উঠলো।এসব তো আজ নতুন না তবু সহ্য করতে এখনো খুব কষ্ট হয়।মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনে বোধহয় খুব বড় কোন পাপ করে ফেলেছিল যার জন্য জামশেদের মতন স্বামী পেয়েছে মুক্তা।যে না জানে ভালোবাসতে, না জানে একটু সম্মান করতে।খুব বেশি বয়সতো না মুক্তার।এই বয়সে জীবনের শখ আহ্লাদ সব বিসর্জন দিয়ে মনোযোগ দিয়েছে সংসারে।সারাদিন বাড়ির কাজ করা,উঠতে বসতে জামশেদের কথা শোনানো, গায়ে হাত তোলা।এটাকে কি জীবন বলে?তবে এমন জীবন তো চাইনি মুক্তা।

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here