প্রেমের ঘাটের মাঝি #পর্ব ১১ #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
150

#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ১১
#লেখনিতে খুশবু আকতার

সন্ধ্যার দিকে খবর এলো মতিউরের মা নাকি ভীষণ অসুস্থ।মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে মতিউর তখনি যাওয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠলো।তবে তার মা বলে পাঠিয়েছেন এই ভর সন্ধ্যেবেলা যেন নতুন বউ কে নিয়ে নদী পার হয়ে না ফেরে সে।তিনি নাকি এখন ভালো আছেন,কাল সকাল সকাল ফিরলেই হবে।
জবা তারপরও যেতে চাইলো কিন্তু মতিউর শেষে রাজি হলো না।যে খবরটা দিতে এসেছিল তার কাছ থেকে ভালো ভাবে নিশ্চিত হলো যে তার মায়ের শরীর ঠিক কতটা খারাপ।সে আশ্বস্ত করলো যে এখন নাকি তিনি একটু ভালো আছে।তাই মতিউরও ভাবল যে কাল সকালে যাওয়া যাবে।কেননা মতিউর খুব ভালো করেই জানে এখন যদি তার মায়ের কথার অবাধ্য হয়ে জবা কে নিয়ে ফেরে তাহলে জবা কে হয়তো কথা শুনতে হতে পারে।মতিউরের সামনে বলার সুযোগ না পেলেও মতিউরের আড়ালে ঠিকই বলবে।আর জবা যা মেয়ে তাতে যদি শাশুড়ি কয়েকটা কটু কথা শোনায়ও তাও কখনো এসে অভিযোগ করবে না।অবশ্য অভিযোগ করার মতন সম্পর্ক ওদের মাঝে নেই।যদি মতিউরের জায়গায় সুজন থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই অভিযোগ করত জবা।
মতিউর জানালো কাল ভোরের আলো ফুটতেই তারা বেরিয়ে পড়বে।সেই মতে জহির কেও বলে রাখা হলো সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে।জবা চুপচাপ মতিউরের কথায় মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।তবে মনটা খচখচ করছে।তার মানে সুজনের সাথে কথা বলা হলো না।মতিউর বলেছিল আগামীকাল কথা বলার একটা ব্যবস্থা করে দেবে কিন্তু সকাল হতে না হতেই তো ওরা বেরিয়ে পড়বে তাহলে কথাটা বলবে কি করে? এখন মতিউরের মন মেজাজ ভালো নেই।এই অবস্থায় সুজনের সাথে কথা বলার ব্যাপারটা বলা উচিত হবে না।জবার বিবেকে বাঁধলো কথাটা বলতে।বরাবর সে যা করে এসেছে আজও তাই করল।অন্যের কথা ভেবে নিজের ইচ্ছেটাকে মাটি চাপা দিল।রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই যে যার মতন ঘুমিয়ে পড়ল।নিয়মমাফিক জবা সুন্দর করে বিছানাটা গুছিয়ে দিয়ে বালিশ গুলো ঠিক করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বলল মতিউর কে।আর সে গিয়ে দাঁড়ালো জানালার পাশটায়।গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকালো নদীর দিকে।বুকটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।কাল সকালে এই ঘর,এই জায়গা,এই নদীর পাড় আর জবার না পাওয়া ভালোবাসা সব কিছুকে ছেড়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য আবার একটা নতুন জায়গায়,নতুন পরিবেশে,নতুন মানুষদের মাঝে যেতে হবে।কে জানে আবার কবে আসতে পারবে! আবার কবে এই নদীর পানির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারবে!কবে আবার সেই প্রিয় মানুষটাকে দেখতে পাবে!সবকিছুই অনিশ্চিত।জবা কে মতিউরের সাথেই যেতে হবে,সেখানেই সারাটা জীবন কাটাতে হবে।মতিউর এক ধ্যানে কিছুক্ষণ জবার দিকে তাকিয়ে থাকলো।জবা সেসব খেয়াল করলো না।তার মনোযোগ অন্য কোথাও।

“আমার সাথে একটু এসো তো জবা।”

হঠাৎ মতিউরের কথায় জবার ধ্যান ভাঙল।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“এত রাতে কোথায় যাব?”

মতিউর কিছু একটা ভেবে ঠাট্টার ছলে বলল,

“চলো আজ একটা বিষয় পরীক্ষা করা যাক যে এই কয়দিনে তোমার আমার উপরে ঠিক কতটা ভরসা তৈরি হয়েছে।গন্তব্য না জেনেই আমার সাথে অজানা পথে নামতে পারবে?”

জবা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,

“মাঝরাতে হলোটা কি আপনার?কি সব আজেবাজে কথা বলছেন?”

“আজেবাজে কথা কোথায় বললাম?এসব তো কাব্যিক কথা।তুমি না প্রেমে পড়েছিলে তো এসব কাব্যিক কথা কি ভালো লাগে না নাকি?”

“লাগতো একসময়।একসময় প্রেমও ভালো লাগতো,কাব্যিক কথাও ভালো লাগতো।এখন না প্রেম ভালো লাগে,না এসব কাব্যিক কথা।সবকিছু অসহ্যকর লাগে।”

“সুজনকেও?”

জবা চমকে তাকালো মতিউরের দিকে।মতিউর সেই দৃষ্টি দেখে হেসে ফেলল।

“বরাবরই তুমি সুজন এর ব্যাপারে আটকে যাও।যাইহোক চলো যাওয়া যাক।সবাই বোধহয় এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে।”

“চুরি করতে যাচ্ছি নাকি যে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে কি পড়েনি সেই হিসাব করতে বসলেন?”

“তুমি তো ডাকাত।ডাকাতকে নিয়ে কেউ চুরি করতে যায় নাকি?ডাকাতকে নিয়ে যায় ডাকাতি করতে।”

“আজব তো!ডাকাত বলছেন কেন আমায়?আমি কি ডাকাতি করেছি?চোর রেখে সোজা ডাকাত বানিয়ে দিলেন আমাকে?”

মতিউর মলিন হেসে বলল,

“যে ছোট ছোট জিনিস চুরি করে তাকে বলে চোর আর যে একেবারেই বড় কিছু চুরি করে তাকে বলা হয় ডাকাত।তুমি তো একেবারে আমার এই বিশাল মনটা চুরি করে নিয়েছো জবা তবে তোমায় চোর কি করে বলি?”

জবা স্বস্তিতে পড়লো।দৃষ্টি নামিয়ে মাথার ঘোমটা টা টেনে বলল,

“চলুন কোথায় নিয়ে যাবেন।”

“তাহলে তো বলতে হচ্ছে বেশ ভালোই ভরসা জমেছে আমার উপরে।গন্তব্য জানতে চাইলে না যে?”

“খুব বেশি হলে কি করবেন মে/রে ফেলবেন?যদি আমি মৃত্যুকে ভয় পেতাম তবে না আপনার সাথে যেতে ভয় পেতাম এই কথা ভেবে যা আপনি যদি আমায় মে/রে ফেলেন?ম/রে তো আমি অনেক আগেই গিয়েছি।আর না মা/রার পরিকল্পনা থাকলে যেহেতু আপনি পুরুষ মানুষ হয়তো আমার সম্মানে আঘাত করতেন।কিন্তু আপনি তো আমার স্বামী।আমার থেকে আমার সম্মান কেড়ে নিয়েছেন সেই অভিযোগটাও করতে পারবোনা।আপনাকে তো আটকানোর ক্ষমতা কিংবা অধিকার কোনটাই আমার নেই।”

“কাছেও তো আসো না কখনো!”

“আপনিও তো কখনো জোর করেননি!”

মতিউর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“আমি জোর করলে বুঝি আসতে?”

“বললাম না আপনাকে আটকানোর ক্ষমতা কিংবা অধিকার কোনটাই আমার নেই।আর আমি আপনাকে কথাটা বললাম তার কারণ এতদিনেও যে আপনি আমার কাছে আসেননি এই বিষয়টা আমায় বেশ অবাক করে।পুরুষ মানুষ নারীর উপর জোর চালাবে না এমনটা আবার হয় নাকি?বলতে পারেন বিস্ময় থেকে কথাটা আপনাকে বললাম।”

“তোমাকে ছুঁয়ে শুধুমাত্র তোমার শরীর পাব কিন্তু মন পাবো না এমনটা কি করে মেনে নেই বলোতো?আমি যে গোটা তুমিটাকেই চাই।”

“সত্যি আমাকে পাওয়ার আশা রাখেন?আমি কি আদৌ কখনো সম্পূর্ণভাবে আপনার হতে পারব?”

“থাক না এখন এসব জটিল সমীকরণ।যে কাজে যাচ্ছিলাম চলো যাই।”

________
কাজ করতে করতে আজ অনেকটা দেরি হয়ে যাওয়ায় সুজন আর নিজের বাড়ি ফেরেনি।জামশেদ কাল সকাল সকালে আসতে বলেছে।এখন বাড়ি ফিরে আবার সেই ভোর হতে না হতেই আসতে দেরি হয়ে যেতে পারে।সেই জন্য সুজন আর গেলই না বাড়ি।রাতে জহিরের সাথে থেকে গেল।দুজনেই তখন গভীর ঘুমে নিমগ্ন।হঠাৎ দরজায় হালকা টোকা দেওয়ার শব্দে দুইজনেই একটু নড়েচড়ে উঠলো।তবে ঘুম এখনো ভাঙ্গেনি।এবারে শব্দটা একটু জোরেই হলো।সুজন উঠলো না জহিরকে ঠেলে উঠিয়ে দিল।জহির চোখ কচলাতে কচলাতে হারিকেনের আলোটা বাড়ালো। দরজার কাছে গিয়ে একবার আগত ব্যক্তি উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল,”কে”।দরজার অপর পাশ থেকে মতিউরের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।জহির কন্ঠটা শুনতেই চিনতে পারলো।তবে এত রাতে মতিউরের এখানে আসার কারণটা ঠিক বুঝতে পারলো না।তাড়াহুড়ো করে দরজাটা খুলে দিল।

“আরে মতিউর সাহেব আপনে এত রাইতে?কোন দরকার ছিল কি?”

“সুজন আছে ভেতরে?”

“হ আছে তো।খাড়ান ডাকতাছি।”

জহিরকে আর কষ্ট করে সুজনকে ডাকতে হলো না। হালকা ঘুমের ঘোরে মতিউরের কন্ঠ কানে যেতেই চোখ থেকে ঘুম ছুটে গেছে।তাড়াহুড়ো করে এসে উৎকণ্ঠিত গলায় মতিউর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি হয়েছে?এত রাতে আপনি এখানে?জবা ঠিক আছে?”

মতিউর হালকা হেসে বলল,

“আমি বাদে সবাই ঠিক আছে।যাই হোক একটু বাইরে এসো সুজন মিয়া।দরকারি কথা আছে তোমার সাথে।”

সুজন প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“এত রাতে কিসের দরকারি কথা?”

“ভয় পেয়ো না।আমি খু/নখারাবি করার মানুষ না যে তোমায় নিয়ে গিয়ে নদীর জলে ডুবিয়ে মে/রে ফেলবো। দরকার আছে।বাইরে এসো তাহলেই বুঝতে পারবে।”

সুজন আর কথা বাড়ালো না,চলে গেল।জহির গেল না ওদের সাথে।সে ঘরেই থাকলো।তবে সুজনের জন্য চিন্তা হচ্ছে।ওদের সাথে যে যাবে সাহস করে সেই কথাটাও বলতে পারল না।

“এবার বলুন কি দরকার?”

সুজনের কন্ঠে উদ্বিগ্নতা।রাতের পরিবেশটা বেশ শীতল তবে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের দেখা পাওয়া গেল।মতিউর বলল,

“বাড়ির পিছন দিকটায় যাও সুজন মিয়া।তোমার জন্য বিশেষ কিছু অপেক্ষা করছে সেখানে।”

সুজনের সন্দেহ তীব্র হলো।সন্দেহি গলায় প্রশ্ন করলো,

“আপনার উদ্দেশ্যটা কি বলুন তো?এত রাতে কি মশকরা করতে এসেছেন আমার সাথে?বাড়ির পেছনে আমার জন্য কি অপেক্ষা করবে?”

“গিয়েই দেখো না কি অপেক্ষা করছে।ভরসা রাখতে পারো নিরাশ হবে না।বরং ফিরে এসে আমাকে তুমি একটা ধন্যবাদও দিতে পারো।”

“কি আছে না বললে আমি যাব না।”

মতিউর বুঝল সুজন নাছোরবান্দা কিংবা হয়তো ভরসা করতে পারছে না ওকে।না পারাটাই স্বাভাবিক।আর হেঁয়ালি না করে বলেই দিল,

“জবা অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।”

সুজন চমকে উঠল।অবিশ্বাস যে করবে মতিউরের কথাটা সেই সময়টুকুও তার হলো না।ওখানে এক মুহূর্ত ব্যয় করল না আর।কোনো প্রশ্নও করল না।তাড়াহুড়ো করে বাড়ির পিছন দিকটাই চলে গেল।

মিনিট কয়েক অতিবাহিত হওয়ার পরে সুজন না ফেরায় জহির চিন্তিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।মতিউর কে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করল,

“মতিউর সাহেব সুজন কই গেল?”

জহিরের কন্ঠ পেতেই মতিউর পিছন ফিরে তাকালো।মুচকি হেসে বলল,

“আমার বউয়ের সাথে প্রেম করতে পাঠিয়েছি।একটু সময় দাও।ওদের আলাপচারিতা শেষ হলে ফিরে আসবে।”

জহির অবাক হল।এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারল না যে মতিউর সত্যি কথা বলল নাকি ঠাট্টা করছে।
জহিরের এসব ভাবনার মাঝেই ওর নাকে একটা উটকো গন্ধ ভেসে এলো।সামনে তাকিয়ে দেখল মতিউর সিগারেট টানছে।এই সিগারেটের গন্ধটা জহির একদম নিতে পারে না।মাঝে মাঝে দু একবার সুজন কেও খেতে দেখেছে।সুজন বলেছিল ওকে খেতে, একবার সাহস করে একটা টানও দিয়েছিল তবে সিগারেটের তীব্র গন্ধটাই জহির ঠিক সহ্য করতে পারেনি।তবে কথা হলো এই কয়দিন হলো মতিউর গ্রামে এসেছে অথচ একটা বারের জন্য বোধহয় কেউ তাকে সিগারেট খেতে দেখেনি।এই প্রথম জহির দেখল। নিজের এই স্বভাবটা বোধহয় মতিউর সবার থেকে আড়াল করতে চেয়েছিল।জহির কে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মতিউর আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কি গো জহির মিয়া অবাক হচ্ছ নাকি আমায় সিগারেট খেতে দেখে?”

জহির দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নম্র কন্ঠে বলল,

“আসলে আপনারে তো দেহি নাই এর আগে কখনো খাইতে।”

“আসলে খুব একটা খাওয়া হয় না।যখন বেশি দুশ্চিন্তার মাঝে থাকি তখন দু একটা টান বসাই।ধোঁয়ার সাথে সাথে এতে মনের দুশ্চিন্তাগুলোও যেন একটু আধটু বেরিয়ে যায়।”

জহির ছোট্ট করে বলল,

”ওও!”

মতিউর কিছুটা সময় চুপ থাকলো তার সাথে জহিরও। বেশ কিছুটা সময় নীরবতা পালনের পর মতিউর জহির কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জুঁই কে তুমি ভীষণ ভালোবাসো তাই না?”

জহির জানে যে মতিউর ওদের ব্যাপারটা জানে তাই ওর থেকে এই প্রশ্নটা শুনে খুব বেশি অবাক হলো না। আলতো হেসে বলল,

“জুঁই ছাড়া আমার আর আপন কেউ না।ওরে না ভালোবাইসা কেমনে থাকি?ওই ছাড়া তো আর কেউ আমার খেয়াল রাখে না,আমার বাড়ি ফিরতে দেরি হইলে কেউ আমার জন্য চিন্তা করে না,আমার কষ্ট হইলে কেউ আমার জন্য কান্দে না,আমার সুখে কেউ আমার লাইগা হাসে না।কিন্তু জুঁই সব করে।তাইলে ওরে ভালো না বাইসা কেমনে থাকি?”

“তবে নিজের ভালোবাসাকে আগলে রেখো জহির।কখনো হারিয়ে যেতে দিও না।যদি জুঁই হারিয়ে যায় তবে মনে রেখো তিনটে জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। তোমার,জুঁইয়ের আর যার জীবনে জুঁই যাবে তার।”

“আমি তো আগলাইয়াই রাখতে চাই ওরে কিন্তু আমি কি পারুম?আমার খুব ভয় করে।জুঁই এত বড় বাড়ির মাইয়া আমি তো ওদের সাথে পারুম না।খালি জামশেদ ভাইজান কেন কেউই মাইনা নিব না।”

মতিউর জহিরকে আশ্বস্ত করে বলল,

“চিন্তা করো না।কেউ তোমাদের পাশে না দাঁড়ালেও আমি দাঁড়াবো।এক বিচ্ছেদের কারণ আমি,দুটো মানুষের মনের মৃত্যু ঘটানোর অপরাধে অপরাধী আমি।অন্তত নিজের অপরাধবোধটুকু কমানোর জন্য হলেও আমি একজোড়া হৃদয়কে মেলানোর চেষ্টা করব। কখনো যদি তোমার সাহায্যের প্রয়োজন হয় তোমাদের আমি সাহায্য করবো।তবু ভালোবাসাকে হারিয়ে যেতে দেব না।”

________
জহিরের ঘরের পেছন দিকটায় গাছপালা দিয়ে ভরা।বেশ অপরিষ্কার,অগোছালো একটা জায়গা বলা চলে।বৃষ্টিতে মাটি কাঁদায় রুপ নিয়েছে।স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে আছে পুরো জায়গাটা।আলোর উৎস বলতে জবার হাতে থাকা হারিকেনের আলো।জবার কানে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আসছে ভেসে।গাছপালার ফাঁকফোকর কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে পারলে চোখে পড়বে বিশাল নদী।এই জায়গাটা জবার ভীষণ পছন্দের।মাঝে মাঝে সুজনের সাথে রাতে কিংবা দিনে লুকিয়ে দেখা করেছে।আজকেও তাই এখানে অপেক্ষা করছে।জবার অপেক্ষার মাঝেই পিছন থেকে সুজনের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো জবার কানে।ডাকটা শুনতেই বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠলো।খিঁচে দুচোখ বন্ধ করে নিল।জবা জানে এই ডাকটা সুজনের সেজন্যই তো পিছন ঘুরে তাকানোর সাহস হচ্ছে না কিন্তু তাকাতে তো তাকে হবেই।চোখ দিয়ে যেন অশ্রু না বের হয় তেমন ভাবে তাকাতে হবে।জবা পিছন ফিরে তাকালো সুজনের দিকে।হারিকেনের হালকা আলোয় জবার মুখটা বেশ স্পষ্টই দেখতে পেল সুজন।জবার পড়নে গাঢ় সবুজ রঙের একটা সুতি শাড়ি।এই সবুজ রংটা সুজনের ভীষণ প্রিয়।যবে থেকে সুজন জানতে পেরেছে যে জবার সবুজ রং প্রিয় ঠিক তবে থেকে সুজনেরও এই সবুজ রংটা প্রিয়।জবার গায়ের রং ধমধবে ফর্সা।কোমল মসৃণ ত্বক,গোলাপি ঠোঁট।নাকের পাটায় ছোট্ট একটা সোনার নাকফুল চকচক করছে।চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া,বেনুনি করা না খোঁপা করা সেটা সুজনের বোঝার সাধ্য হলো না।কেননা জবার লম্বা করে একটা ঘোমটা টেনে রেখেছে।কোন মতে শুধু মুখটুকু দেখা যাচ্ছে।না চাইতেও সুজনের চোখ দুটো ভিজে উঠল। জবাও খুব কষ্ট নিজেকে শক্ত রাখল।আজ সুজনের সামনে তার কাঁদলে চলবে না।আজ তো সে সুজনকে দেখাতে এসেছে যে সে খুব ভালো আছে।সুজনও যেন নিজের জীবনটা গুছিয়ে নেয়,নিজের ভালো থাকার ব্যবস্থা করে।

“কেমন আছো সুজন?”

এই মুহূর্তে জবার থেকে সুজন এই প্রশ্নটা আশা করেনি। জবা কে ছাড়া সুজন ঠিক কেমন থাকতে পারে সেটা কি ও জানে না?তবে কেন এই প্রশ্নটা করলো?

“তোমায় ছাড়া আমি কেমন থাকতে পারি সেটা তুমি জানো না?”

“কিন্তু তোমায় যে এবার থেকে ভালো থাকতে শিখতে হবে সুজন,তাও আমায় ছাড়া।”

“তোমায় ছাড়াই তো থাকছি কিন্তু ভালো থাকতে পারবো কিনা সেটা বলতে পারছি না।”

“তুমি কি এখনও এই আশায় আছো সুজন যে আমরা দুজনে এক হবো,আমাদের দুজনের একটা ছোট্ট সংসার হবে,আমি লাল টুকটুকে বউ হয়ে তোমার বাড়িতে পা রাখবো?”

সুজন তাচ্ছিল্য হেসে বলল,

“সেই আশা কবেই আমি ছেড়ে দিয়েছি।আমি কোন আশাতেই নেই জবা।আমি তোমার স্মৃতি নিয়ে আছি।”

“ভুলে যাও সেসব।আমাদের এক হওয়ার সম্ভাবনা শেষ সুজন।তুমি কখনো আমার ভাগ্যে লেখা ছিলেই না আর না আমি কখনো তোমার ভাগ্যে লেখা ছিলাম।”

“কিন্তু আমাদের দুজনের হৃদয়ে আমরা দুজনে লেখা আছি তাইতো?”

“হৃদয়ের কথা নাহয় বাদ দাও।হৃদয়ের লেখা দেখে কিচ্ছু হয় না,কপালের লিখনটাই সব থেকে দরকারি।আমরা দুজনে কখনো এতো মানুষকে কষ্ট দিয়ে,এত মানুষের চোখের জলের কারণ হয়ে তোমার আমার সুখের কথা ভাবতে পারিনি সুজন আর না কখনো পারবো।আমাকে সারা জীবন এই সংসারটাই করতে হবে।মতিউর সাহেব খুব ভালো মানুষ।এমনিতেই ওনার সাথে যথেষ্ট অন্যায় করেছি আর করতে চাই না।তোমাকেও বলছি নিজের জীবনটা গুছিয়ে নাও।”

সুজন কিঞ্চিত অবাক হল।এই কথাগুলো কি জবা ওকে বলছে সেটা বিশ্বাস করতে বড্ড বেশি কষ্ট হলো।

“এ কথাগুলো তুমি আমায় বলছো জবা?যেখানে তোমার নিজের জীবনটাই অগোছালো সেখানে আবার তুমি আমায় আমার জীবনটা গুছিয়ে নিতে বলছো ব্যাপারটা কেমন হাস্যকর শোনালো না?”

“আমার কাছে তো মোটেও হাস্যকর শোনালো না। আমার জীবন যে অগোছালো এটা ভুল বলোনি তুমি তবে আমি সেটা গোছানোর চেষ্টা করছি।কিন্তু তার জন্য তোমার জীবনে এগোনো দরকার।আমি যদি দেখি যে আমার জন্য এখনো তুমি ঠিক সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছো তাহলে আমিও আমার জীবনটা গোছাতে পারবো না।”

“কি চাইছো তুমি?”

“কাল ভোর বেলা আমি আমার শ্বশুর বাড়ি চলে যাব। জানিনা আবার কবে এই বাড়িতে আসতে পারবো।সত্যি বলতে আমার এই গ্রামে পা রাখার কোন ইচ্ছে নেই।আর তোমার সাথে দেখা করতে পারব কিনা সেটাও জানি না।তুমি জানো সুজন তোমার মুখে হাসি দেখতে আমি কতটা ভালোবাসি।আমায় তো পেলে না এবার নাহয় যে তোমায় ভালোবাসে,যে তোমায় চায় তাকে নিজের জীবনে জায়গা দাও।”

“আমি যদি বলি সেটা সম্ভব না?”

“তবে আমি বলব সম্ভব করে নাও।আমাদের ভাবনা আর বাস্তবতা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয় সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো।তুমি সারাটা জীবন একা কাটাতে পারবে না এই সত্যটা গ্রহণ করতে শেখো।তাই বলছি নিজের জীবনটা আর নষ্ট হয়ে যেতে দিও না আমার জন্য।আর পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও।”

“তুমি কেন ক্ষমা চাইছো?”

“তোমার জীবনটা নষ্ট করে দেওয়ার জন্য।আমি তোমায় আমার ভালোবাসার কথা না বললে তো তুমি হয়তো কখনো নিজের অনুভুতির কথা বলার সাহসই পেতে না।একে অপরকে এতটা ভালোবাসার জন্যই আজ আমাদের এত কষ্ট পেতে হচ্ছে।আমিতো নিজের হাতে তোমার জীবনটা নষ্ট করে দিলাম তাই না?তাহলে তো ক্ষমা চাইতেই হয়।”

“এ কথা বলো না।তোমাকে ভালোবাসতে পারাটা আমার সৌভাগ্য।এই এত এত খারাপ স্মৃতির মধ্যে,এত এত দুঃখ কষ্টের মাঝে যখন মনে হয় যে কিছুটা সময় খা খা করা বুকটা তোমার ছোঁয়া পেয়েছে তখন শান্তি লাগে।তুমি আমার ভালোবাসা জবা।তোমার ভালোবাসাটা আমার জন্য কোন অন্যায় কিংবা অভিশাপ হতে পারে না।”

জবা পারলো না নিজের কান্না আটকাতে।কি করে আটকাবে?এই মানুষটার সামনে তো কখনো নিজের দুঃখ কষ্ট গুলো লুকোতে চায়নি।সব সময় নিজেকে খোলা বইয়ের মত মেলে ধরেছে যেন এই মানুষটা নির্দ্বিধায় পড়তে পারে।এখন যে বুকের ভেতরটা ভীষণ ব্যথা করছে সেই ব্যথাটা এই মানুষটার থেকে কি করে লুকোবে?ডুকরে কেঁদে উঠলো জবা।
সুজন এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে চাইলো তবে কি ভেবে যেন আবার থেমে গেল।সুজনের তো এখন জবার ওপর কোন অধিকার নেই।মানায় না সুজনের জবা কে জড়িয়ে ধরা।ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য মতিউর আছে।সুজন তো কেউ না।

জবা ক্রন্দনরত কন্ঠে বলে উঠলো,

“আমি কেন তোমায় পেলাম না সুজন?কেন আমরা শুধু অন্যদের কথাই ভাবলাম?একটু নিজেদের কথা কেন ভাবলাম না বলোতো?”

“এই পা/গলি কাঁদছো কেন?তুমি না বললে মতিউর সাহেব ভীষণ ভালো মানুষ।তুমি ওনার সাথে ভালো থাকবে।তুমি ওনার সাথে আমার থেকেও ভালো থাকবে।”

“কিন্তু আমার যে তোমাকে দরকার ছিল।তোমার সাথে থাকতে চাই আমি।তোমার সাথে সব থেকে বেশি ভালো থাকতাম আমি সুজন।আমি কি করে এই কথাটা মেনে নেবো যে তুমি আমার না?রাতে পাশ ফিরে যখন দেখি আমার পাশে অন্য কোন পুরুষ ঘুমিয়ে আছে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।আমিও ঘুমোতে পারি না।কেমন অস্থির লাগে।মনে হয় আমার সুজন নিশ্চয় আমার কথা ভেবে ঘুমোতে পারছে না,শুধু এপাশ ওপাশ ফিরছে আর আমি কিনা স্বার্থপরের মতন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছি!কেন আমায় এতটা ভালোবাসলে বলোতো?একটু কম ভালোবাসলে তো আমার এতটা বেশি কষ্ট হতো না।”

“তোমার কাছে একটা নিষিদ্ধ আবদার করবো রাখবে সেটা জবা?”

“কি?”

“আগে তোমাকে ছোঁয়ার জন্য তোমার অনুমতি নিতে হতো না।তোমায় একবার জড়িয়ে ধরতে চাইলেও তোমায় জিজ্ঞেস করতে হতো না।নির্দ্বিধায় ধরতে পারতাম কিন্তু এখন ধরতে পারবো না।একটু আগেও ঠিক সেই একই ভুল করতে গিয়েছিলাম কিন্তু কেন যেন নিজেকে সামলে নিলাম।কিন্তু এখন একবার তোমায় খুব করে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে।একটাবার তোমায় জড়িয়ে ধরতে দেবে?কথা দিচ্ছে আর কখনো চাইবো না।”

জবা আবারো শব্দ করে কেঁদে উঠলো।সে যে নিরুপায়। কি করে সুজনকে অনুমতি দেবে তার বিবেকে যে বাঁধছে।এমনিতেই অনেক এমন কথা বলে ফেলেছে যেগুলো জবার বলা উচিত হয়নি।তার কল্পনায় এমন অনেক কথা চলে এসেছে যেগুলো ভাবাও পাপ।পারবেনা সুজনকে অনুমতি দিতে অথচ একটা সময় ওই বুকটা তে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য জবা নিজে উতলা হয়ে থাকত।মরিয়া হয়ে উঠতে মানুষটার গায়ের গন্ধে।একটু ছোঁয়া পাওয়ার জন্য কেমন পা/গলদের মতন আচরণ করতো।আর আজকে সেই মানুষটা মুখ ফুটে জবাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলো আর জবা তাকে মুখের উপর মানা করে দিল।

“না সুজন এটা হয় না।মতিউর সাহেব অনেক বিশ্বাস নিয়ে আমাকে তোমার সাথে কথা বলতে সুযোগ করে দিয়েছে।এমনকি উনি আমাদের একা সময় কাটাতে দিয়েছেন।ওনার এত ত্যাগের বিনিময়ে কি ওনার সামান্য বিশ্বাস টুকু রাখা আমার কর্তব্য না?আমায় ক্ষমা করে দিও।তোমার এই নিষিদ্ধ আবদারটা আমি রাখতে পারব না।”

সুজন আলতো হাসলো।হয়তো জানত জবা এই উত্তরটাই দেবে,তবুও প্রেমিকের মন।আবদার টুকু না করে থাকতে পারলো না।

“বেশ।এভাবে তোমায় দূর থেকে ভালোবাসবো সারা জীবন।আমি জানিনা কখনো এই জীবনে অন্য কাউকে স্থান দিতে পারব কিনা।সারাটা জীবন বাঁচার জন্য আদৌও সঙ্গী অপরিহার্য কিনা আমি সেটাও জানি না।তবে তোমায় আমি কথা দিতে পারছি না যে আমি জীবনে এগোতে পারবো।যদি কখনো মনে হয় যে হ্যাঁ আমি অন্য কারো দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত কিংবা আমার জীবনে কারো দরকার তবে আমি নিজের জীবনটা গোছানোর কথা ভাববো তার আগে আমি পারবো না।”

“বেশ তুমি তাই করো।তবে একটা কথা আমায় আর ভালোবেসো না।তোমার জবা এখন মতিউরের।ভালো থেকো,আসছি।”

চোখের জল টুকু মুছে সুজনকে পাশ কাটিয়ে জবা চলে যেতে নিলে সুজন পিছন থেকে একবার ওকে ডাকল।জবার পা থেমে গেল তবে কোন উত্তর দিল না কিংবা পিছন ফিরে তাকালো না।সুজন তাকালো।এই প্রশ্নটা করতে সুজনের নিজেরও কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে,বেমানান লাগছে তবে মনটা চাইছে করতে।

“মতিউর সাহেব তোমায় ছুঁয়েছে জবা?”

জবা চমকালে।সত্যিটা বলা উচিত কিনা ঠিক বুঝতে পারছে না।জবা কে চুপ করে থাকতে দেখে সুজন নিজের প্রশ্নের উত্তরটা হ্যাঁ ধরে নিল।তবে তার জবা সত্যিই অন্য কারো হয়ে গিয়েছে।পুনরায় বলল,

“আমিও পা/গল।নিজের স্ত্রী,ভালোবাসার মানুষটাকে কাছে পেয়েও এতদিনে স্পর্শ করবে না এমনটা হতে পারে নাকি?”

“মানুষটা মতিউর সাহেব হলে হতেও পারে।উনি আমায় ভীষণ সম্মান করেন সুজন।বললাম না মানুষটা ভীষণ ভালো।তবে আমার মতন একটা মেয়ে ওনার যোগ্য না। ওনার জীবনটা আমি নষ্ট করে দিলাম।”

কথাগুলো বলে জবা চলে গেল।সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না।সুজন নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে জবার যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল।ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল জবা অন্ধকারের মাঝে।সুজন অন্ধকারের মাঝেই দাঁড়িয়ে রইল।আশেপাশে কেউ নেই।সুজন একা।জবা সুজনকে একা করে দিয়ে চলে গেল।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here