#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ১৮(প্রথম অংশ)
#লেখনিতে খুশবু আকতার
বিছানার উপর বসে আছে জাকির।ওর ঠিক সামনেই ভয়ে চুপসে যাওয়া মুখ নিয়ে গুটিসুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জুঁই।দৃষ্টি তার মেঝের দিকে তাক করা।জাকির দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আসতে বললে জুঁই চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মতন দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এসে আবার পূর্বের জায়গায় একই ভঙ্গিতে দাঁড়ালো।ওর চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ভয় পাচ্ছে।জাকির গম্ভীর গলায় বলল,
“কবে থেকে চলছে এসব?”
জুঁই কম্পিত গলায় বলল,
“অনেকদিন থেকে।”
“কোন সাহসে তুই এমনটা করলি?জহিরের সম্বন্ধে কি তোর কোন কিছু অজানা?ওর নিজের কোন পরিবার নেই,বাড়িঘর নেই,নিজের কোন ঠিক ঠিকানা নেই সেখানে তোর দায়িত্ব কি নেবে?”
জুঁই অনুনয়ের কন্ঠে বলল,
“তুমি তো অন্তত এমন কথা বলো না ছোট ভাইজান।তুমিও যদি এমন অবুঝের মতন কথা বলো তাহলে কিভাবে কি হবে বলোতো?”
“অবুঝের মতন আমি কথা বলছি না তুই অবুঝের মতন কাজ করেছিস।তোর ভাগ্য ভালো যে তোর আর জহিরের কথাবার্তা গুলো আমি শুনে নিয়েছি।যদি বড় কিংবা মেজ ভাইজান শুনতো তাহলে কি হতো একবার ভেবে দেখেছিস?তোর কথা না হয় বাদ দিলাম জহিরের কি হাল হতো সেটা ভাবতে পারছিস?”
জুঁই আঁৎকে উঠে বলল,
“এমনটা বলো না।ভয় কেন দেখাচ্ছো?”
“আমি ভয় দেখাচ্ছি না তোকে বাস্তবতা বলছি।তুই কি করে জহিরের সাথে সম্পর্কে জড়াতে পারিস জুঁই?তুই তোর নিজের অবস্থান,তোর পরিবারের অবস্থান ভুলে গেলি?”
“এত কিছু ভেবে তো ভালোবাসি নি।আর তাছাড়া জহিরের সাথে আমি সংসার করবো।আমার যদি কোন আপত্তি না থাকে তোমরা কেন আপত্তি করছো?”
“অবশ্যই আপত্তি করবো।তুই আমাদের বাড়ির মেয়ে।তুই যার তার সাথে বিয়ে করতে চাইলেই তো আর আমরা তোকে করতে দেবো না।।জহিরের ভবিষ্যৎ টা কি?তোর সাথে ওকে কোন দিক দিয়ে মানায় তুই বোঝা আমায়?”
“এত কিছু আমি জানিনা।আমি শুধু জানি আমি ওকে ভালোবাসি,ওকে বিয়ে করবো।তুমি তো চাইলেই আমায় একটু সাহায্য করতে পারো।”
“তোর কি মনে হয় তুই ভালো কোন কাজ করেছিস যার জন্য আমি তোকে সাহায্য করবো?বরাবরই আমি তোর সাহায্য করেছি,বড় ভাইজানের বিরুদ্ধে গিয়েও আমি তোর হয়ে কথা বলেছি কিন্তু এবার তুই আমার কথা বলার মতন কোন মুখই রাখিসনি।জহির কে মেনে নেওয়া যায় না জুঁই।”
জুঁই জাকিরের পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে বসে পড়লো।জাকিরের হাত দুটো ধরে অনুনয়ের কন্ঠে বলল,
“দয়া করো আমার উপরে ভাইজান।আপাকে যে কষ্ট তোমার সবাই মিলে দিয়েছো আমায় আর সেই কষ্টটা দিও না।”
“মতিউর সাহেব ভালো ছেলে।”
“ভালো ছেলে সেটা আমিও জানি কিন্তু সুজন ভাই তো না।আপা যাকে চেয়েছিল সে তো না।আমার সাথে আবার সেই একই অন্যায়টা করোনা ভাইজান।মনে একজনকে রেখে অন্য জনের সাথে সংসার করা যায় না।আপা হয়তো বাধ্য হয়ে তবুও সংসার করছে, আমাকে দিয়ে কিন্তু করাতে পারবেনা।আমি জুঁই,জবা না।”
জুঁইয়ের কথায় জাকির যুক্তি খুঁজে পেল।সত্যিই তো মনে একজনকে রেখে আর একজনের সাথে শান্তিতে সংসার করা যায়না।আর এই কথাটা জাকিরের থেকে বেশি ভালো আর কেই বা জানবে?
জাকির কে চুপ করে থাকতে দেখে জুঁই পুনরায় বলে উঠলো,
“কেন বুঝতে পারছ না জহির যেই হোক,যেমনই হোক,কিছু থাকুক বা না থাকুক আমার ওকেই চাই।”
“কিন্তু তুই যেটা চাইছিস সেটা সম্ভব নয়।আব্বা, ভাইজানেরা কেউ মেনে নেবে না।সবার বিরুদ্ধে গিয়ে আমি একা তোর সঙ্গ দিয়ে কি করব?”
“চিন্তা করোনা।আব্বাকে আমি রাজি করিয়ে নেব।আর আব্বা রাজি হলে আমি বাকি কারোরই পরোয়া করি না।বড় ভাইজান,মেজো ভাইজান মানলে মানবে,না মানলে না মানবে আমার তাতে কিছু যায় আসে না।তুমি শুধু আব্বাকে রাজি করাতে আমায় একটু সাহায্য করো তাহলেই হবে।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও জুঁইয়ের জোরাজোরির কাছে জাকিরকে হার মানতে হলো।মতিউরের সাথে জবার বিয়ে দেওয়ার সময় তার নিজেরই ভীষণ অপরাধবোধ হচ্ছিল কিন্তু মতিউর ভালো ছেলে জন্য,পরিবার ভালো জন্য,জবা ভালো থাকবে ভেবে আর কিছু বলতে পারেনি।কিন্তু জহিরের উপর সেই ভরসাটা ঠিক করতে পারছে না।জহির নিঃসন্দেহে ভালো ছেলে এ ব্যাপারে জাকির নিশ্চিত।তবে জুঁই কে কতটা ভালো রাখতে পারবে এই ব্যাপারে বেশ সন্দেহ আছে।
ওদের দুজনের কথাবার্তার মাঝে আনোয়ারার চিৎকারের শব্দ পাওয়া গেল।আনোয়ারার কন্ঠের তীব্র ভয় জুঁই আর জাকিরের মনেও ভয়ের সৃষ্টি করলো।কোনরূপ কোন কথা না বলে তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে সোজা তাদের ঘরে গেল।গিয়ে দেখল জলিল তালুকদার কেমন যেন করছে।বোধহয় তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।আর তার পাশে বসে আনোয়ারা চেঁচামেচি করছেন।একে একে বাড়ির সবাই সেখানে এলো।
জুঁই আতঙ্কিত গলায় বলল,
“কি হয়েছে আব্বা?আম্মা কি হয়েছে আব্বার?”
আনোয়ারা ক্রন্দনরত কন্ঠে বলল,
“বুঝতাছি না।ঠিকই তো ছিল হঠাৎ কইরা কেমন যেন করতেছে।মনে হইতেছে নিশ্বাস নিতে পারতেছে না।দেখ না তোরা।”
জুঁই জলিল তালুকদারে এক পাশে বসে মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিল।বেশ অনেকক্ষণের প্রচেষ্টার পর তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি একটু স্বাভাবিক হলো।একটু স্বাভাবিক হতেই তিনি জামশেদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“জামশেদ আজকে জবা আর মতিউর কে একবার আসতে বলো এখানে।”
“আজকে আসতে বলবো?কি এমন দরকারি কাজ আছে আব্বা?”
“আমি যা বলছি তাই শোনো।আজকেই আসতে বলবে ওদেরকে।আমার অসুস্থতার কথা জানাবে এবং বলবে আমি আজকে আসতে বলেছি।দেরি যেন না হয় জামশেদ।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও জামশেদ রাজি হলো।মতিউরের নাম শুনলেও এখন তার ভীষণ রাগ হয়।সেই মতিউর আবার এই বাড়ি তে আসবে কথাটা মনে হতেই সারা শরীরে বিরক্তি ছেয়ে গেল।জলিল তালুকদার এবারে জুঁই কে উদ্দেশ্য করে অনুরোধের গলায় বলল,
“আমার শরীরের অবস্থা তো দেখতেই পারছো আম্মা।বিয়েতে রাজি হয়ে যাও।”
“এই সময় আবার বিয়ের কথা কোথা থেকে এলো আব্বা?তুমি আগে সুস্থ হও তারপর আমার বিয়ের ব্যাপারে দেখা যাবে।”
“আমি আর সুস্থ নাও হতে পারি বুঝতে পারছ না কেন তুমি?তোমায় আমি তোমার ভাইদের দায়িত্বে রেখে যেতে পারবো না।”
“আচ্ছা ঠিক আছে রাখতে হবে না।আমি নিজেই নিজের নিজের দায়িত্ব নেব।খুব দরকার পড়লে দুলাভাই আছে।”
জলিল তালুকদার কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর গলায় বললেন,
“এর আগেও তোমায় বলেছি,আমি আজও তোমায় বলছি যেখানে নিজের ছেলেদেরকে আমি ভরসা করতে পারছি না সেখানে অন্যের ছেলেকে কি করে করব?তুমি ভরসা করলেও আমি করতে পারছি না।এই মাসের মধ্যে নাদিমের সাথে তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করবো আমি।”
জুঁই আর কোন কথা বাড়ালো না।সে নিশ্চিত এই ব্যাপারে যে নাদিম এই বিয়েটা ভেঙে দেবে তাহলে অযথা এখন আর তর্ক করে কোন লাভ নেই।
_______
“তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও জবা,শ্যামলডাঙ্গা যেতে হবে।”
জবা প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কেন?সেদিনই তো এলাম এত তাড়াতাড়ি আবার যাব কেন?”
জলিল তালুকদারের অসুস্থতার খবরটা মতিউর এখনই জবা কে দিতে চাইছে না।খবরটা শুনে মনে হলো জলিল তালুকদারের শারীরিক অবস্থার বেশ ভালোই অবনতি হয়েছে।তাই আর সেই কথা জানালো না।
“এমনি দরকার আছে চলো।”
“না।আমার তো কোন দরকার নেই আপনি যান।আমি যেতে পারব না।”
মতিউর ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
“কেন?”
“আজকে কে যেন আসছে বাড়িতে।আম্মা বলেছে দুপুরে আমায় সবার জন্য রান্না করতে।আমি কি করে যাব এখন?আম্মা বারবার করে বলে দিয়েছে আমাকে আজকে থাকতেই হবে।”
“যারা আসছে তারা পরেও আসতে পারবে।উড়ে যাবে না।ওরা দুদিন পর পরই আমাদের বাড়িতে আসে।ওদের জন্য এত তাড়া দেখানোর কোন দরকার নেই।আর ওদের জন্য তুমি কেন রান্না করতে যাবে?অনেক মানুষ আছে।আমাদের বাড়ির মানুষের জন্য দু এক বেলা রান্না করো সেসব আমি সহ্য করি কিন্তু দুদিন পরপর এত মানুষের জন্য রান্না করবে সেসব আমি সহ্য করব না।”
জবা আতঙ্কিত গলায় বলল,
“আস্তে কথা বলুন।কেউ শুনে ফেললে আবার অশান্তি হবে।”
“হলে হবে।আমি কি ভয় করি নাকি কাউকে?”
“সে জানি আপনি কাউকে ভয় করেন না কিন্তু আমি অশান্তি কে ভয় করি।”
“তুমিও করবে না।আমার বউ কোন কিছু কে ভয় করবে না।আমি আছি না!তোমায় তৈরি হতে বলেছি তৈরি হও।আম্মার সাথে যা কথা বলার আমি বলে নেব তোমার কিছু ভাবতে হবে না।”
“আপনি বুঝতে পারছেন না সমস্যা হবে।আপনি এখন আম্মা কে কিছু বলতে গেলে আম্মা ভাববে যে আমি আপনাকে পাঠিয়েছি।বড় ভাবিরাও এই নিয়ে নানান কথা বলবে।কি দরকার বলুন তা তো অশান্তি করার?আমি যাব না।”
“আব্বা অসুস্থ।”
“কার আব্বা?”
“আমার আব্বা তো অনেক আগেই মা/রা গিয়েছেন বাকি আছে তোমার আব্বা।উনিই অসুস্থ।গ্রাম থেকে খবর এসেছে তোমায় দেখতে চেয়েছে।আজ বিকেলের মধ্যে আমাদেরকে যেতে বলেছে সেজন্য এত তাড়া দিচ্ছি।তাছাড়া তোমার কি মনে হয় ও বাড়ি গিয়ে জামশেদের সাথে আবার ঝগড়া করার আমার খুব ইচ্ছে?এমনিতেও আমার মনে হয় এবার গেলে আমাদের দুজনের মাঝে মারামারি লেগেই যাবে।তাই এবার যাওয়ার সময় কয়েকজন লোক নিয়ে যেতে হবে।”
জলিল তালুকদার অসুস্থ খবরটা শোনার পর জবার প্রতিক্রিয়া মতিউর এর কাছে যেন স্পষ্ট হলো না।মতিউর যেমনটা ভেবেছিল তেমন কিছুই হলো না।জবা কে বেশ নির্লিপ্ত দেখালো।জবার সেই নির্লিপ্ততার কারণ হয়তো বুঝল মতিউর।
“এতই অভিমান যে অসুস্থতার খবর শুনেও তোমার মাঝে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না?”
“শুধু অভিমান কেন বলছেন?রাগ ও আছে,একটু একটু ঘৃণাও আছে।”
“আমি তাই বলে এতটাও খারাপ ছেলে না যে আমার সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য ঘৃণা করতে হবে।”
জবা আলতো হেসে বলল,
“সেজন্য না।আমার আম্মার সাথে করা কিছু কাজের জন্য ওনার প্রতি একটু ঘৃণা জমেছে আমার মনে।”
“কেন কি করেছেন?’
“সেসব না হয় অন্য কোনদিন বলব।আমার যাওয়াটা কি খুব দরকার?”
“এত অভিমান রাখতে নেই জবা।যতই হোক তিনি তোমার বাবা।হয়তো তোমার ভালোর জন্যই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন।আজ অভিমান করে তার সাথে দেখা করতে চাইছো এমন একটা সময় হয়তো এলো তুমি দেখা করতে চাইলে কিন্তু সেই মানুষটাকে আর পেলে না।তখন কিন্তু আফসোস করা ছাড়া কিছু থাকবে না হাতে।”
“আম্মা কে কি বলবো তাহলে?”
“তুমি তৈরি হও বাকি সব আমি দেখে নিচ্ছি।”
কথাটা বলে মতিউর ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা নিজের মায়ের ঘরে গেল।
“আম্মা আসবো?”
মতিউর কে দেখতেই মমি খাতুন এর চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
“হ আব্বা আয়।”
মতিউর ভিতরে গিয়ে বিছানার উপর মমি খাতুন এর পাশে বসলো।মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“শরীর কেমন আছে আম্মা?”
“এইতো ভালোই আছে আব্বা।তা তুই এই অসময়ে কিছু কইবি?”
“হ্যাঁ।আসলে জবার বাবা খুব অসুস্থ।দেখতে চেয়েছেন জবা কে।তাই ওকে নিয়ে শ্যামলডাঙ্গা যাচ্ছি।হয়তো ১-২ দিন থাকবো।”
মমি খাতুনের মুখে একটু কঠোরতা ফুটে উঠলো।গম্ভীর গলায় বলল,
“এখন দুইদিন পর পর যদি কোন মানুষ অসুস্থ হয় তাইলে তারে প্রতিদিনই দেখতে যাওয়া লাগবো?আর তাছাড়া জবা রে আমি কইয়াই দিছি নতুন বউ দেখার লাইগা কিছু মেহমান আইতাছে।ওর যাওয়া হইব না। খুব দরকার হলে তুই ফল মিষ্টি লইয়া গিয়া দেইখা আয়।”
“উনি আমার শ্বশুর,আমার আব্বা না যে আমি গেলেই হয়ে যাবে আম্মা।আমাকে দেখাটা মুখ্য উদ্দেশ্য না, ওনার মেয়েকে দেখাটা আসল উদ্দেশ্য।”
“তো তুই কি কইতাছোস আমার আদেশ ফালাইয়া তুই এখন জবারে নিয়ে ওই গেরামে যাইবি?”
“তোমার আদেশ সামান্য করে কেন যাব?তোমাকে রাজি করিয়েই যাবো।”
“আর আমি যদি অনুমতি না দেই?”
“দেখো আম্মা তুমি আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা তুমি নিজেও খুব ভালো করেই জানো।তোমার অসুস্থতার খবর পেয়ে আমি কতটা চিন্তিত হয়ে গিয়েছিলাম জানো?সেই রাতেই ফিরতে চেয়েছিলাম শুধুমাত্র তোমার আদেশের জন্য ফিরতে পারিনি।বাবা-মা সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।জবা ওর বাবা মায়ের ভীষণ আদরের বড় মেয়ে।আমার মায়ের অসুস্থতার খবরে যদি আমি চলে আসার অধিকার রাখি তাহলে জবারও নিশ্চয় অধিকার আছে?”
“বাড়ির বউরে এত অধিকার শেখাস না।পরে মাথায় উইঠা নাচবো।”
“নাচুক না সমস্যা কি?আমার বউ আমার মাথায় উঠে নাচলে যদি আমি সহ্য করতে পারি তাহলে তো কোন সমস্যা নেই।বিয়ে করেছি বউকে পায়ের নিচে রাখার জন্য না আম্মা।তাকে সম্মান দিয়ে ঘরে তুলেছি,সম্মান দিয়েই রাখবো।”
“কান্তা আর শিল্পী তাইলে আমারে ভুল কিছু কয় নাই। আমার ছোট আব্বা দেখতাছি আমার হাত থেইকা বাইর হইয়া যাইতেছে।এক মাসও হয়নাই বিয়ার এর মধ্যেই বউয়ের জন্যে ওকালতি করতাছোস?আমার লগে তর্ক করতাছোস?এত প্রশ্রয় দেস না বউরে পরে আর সামলাইতে পারবি না।”
“বড় ভাবীরা যে সব কথা একটু অতিরিক্ত বানিয়ে বলে সেটা তুমি নিশ্চয়ই জানো?আর আমি তোমার হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি এই কথাটার মানে কি আম্মা?তোমার গুরুত্ব আমার কাছে আগে যেমন ছিল,এখনো তেমন আছে,ভবিষ্যতেও তেমনই থাকবে।কেউ বদলাতে পারবে না।ঠিক তেমনি জবার গুরুত্ব আলাদা আছে।এখন তাড়াতাড়ি অনুমতি দিয়ে দাও নাহলে যেতে দেরি হয়ে যাবে।নৌকা পাবো না আর।”
“তুই এহনো আশা রাখতাছোস আমি অনুমতি দিমু?”
“অবশ্যই রাখছি।তোমার ছোট আব্বা তোমার থেকে কিছু চেয়েছে তুমি দেবে না আম্মা?”
মমি খাতুন তাও গললেন না।পূর্বের ন্যয় গম্ভীর গলাতেই বললেন,
“সব ব্যাপারে তোরে অনুমতি দেওয়া যায় না।আর আমি তো তোরে কইলাম তুই চাইলে যাইতে পারোস কিন্তু জবারে আমি যাইতে দিমু না।”
মতিউরে এবারে হাল ছেড়ে দিল।এখানে সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না।মমি খাতুন সত্যিই আজ অনুমতি দেবেন না সে বিষয়ে মতিউর খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে।উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“বেশ।পেয়ে গেছি অনুমতি।জবা আমার দায়িত্ব।আমি ওকে যা বলবো সেটা পালন করা ওর প্রথম কর্তব্য।আর তুমি যেহেতু আমায় অনুমতি দিয়ে দিয়েছো আমি জবা কে যেখানে ইচ্ছে সেখানে নিয়ে যেতে পারি।আসছি আম্মা।নিজের খেয়াল রেখো।”
কথাটা বলে মতিউর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।মমি খাতুন বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে হা করে মতিউরের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলেন।ছেলে কি তবে তার সত্যি পর হয়ে গেল নাকি?
_____
মতিউর আবার নিজের ঘরে ফিরে এসে জবা কে তাড়া দিয়ে বলল,
“তৈরি হয়েছো?”
জবা সে কথার উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো,
“আপনি আগে বলুন আম্মা অনুমতি দিয়েছে?”
“না দেওয়ার কি আছে?আমি তো একবার বলাতেই অনুমতি দিয়ে দিল।বরং যেতে দেরি করছি জন্য আমাকে বকা দিল।সাথে এটাও বলল যে যতদিন না আব্বা সুস্থ হয় তুমি চাইলে থাকতে পারো ওই বাড়িতে।”
জবার যেন মতিউরের কথাটা ঠিক বিশ্বাস হলো না।মমি খাতুন এত সহজে অনুমতি দিতেই পারেন না।সন্দেহী গলায় বলল,
“আপনি আমায় মিথ্যে বলছেন তাই না?আপনি নিশ্চয়ই কোন একটা ঝামেলা করে এসেছেন?”
“তুমি সব সময় শুধু আমায় ভুলই বুঝলে জবা।আমায় দেখে কি তোমার এমন মানুষ মনে হয় যে সারাক্ষণ শুধু ঝামেলাই করবো?আম্মা সত্যি অনুমতি দিয়েছে।চলো এবার আর কথা বাড়িও না,দেরি না হয়ে যায়।”
জবা আর কোন কথা বাড়ালো না।কি ভেবে যেন মতিউরের কথাটা এবারে বিশ্বাস করে নিল।যাওয়ার আগে জবা একবার মমি খাতুনের সাথে দেখা করতে চাইল তবে মতিউর দেরি হওয়ার বাহানা দিয়ে আর দেখা করতেই দিল না।
_________
উঠোন জুড়ে বিরতিহীন ভাবে পায়চারি করছে জুঁই।অপেক্ষা করছে কখন জবারা আসবে।মতিউরকে জুঁইয়ের ভীষণ প্রয়োজন।জামশেদকে যদি কেউ সামলাতে পারে তবে সেটা মতিউরই পারবে।জলিল তালুকদার আজ জবাদের কে আসতে বলায় সব থেকে বেশি সুবিধাটা যেন জুঁইয়েরই হয়েছে।ভেবেছিল যখন একেবারে সে পরিস্থিতি সামলাতে পারবে না তখনই মতিউরের থেকে সাহায্য নেবে।আর এখন যেন ঠিক সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।জুঁই কি করে কি সামলাবে কিছুই বুঝতে পারছে না।একেই তো তার আব্বার শরীর খারাপ।এই অবস্থায় জহিরের কথাটা বলতেও কেমন যেন সংকোচ হচ্ছে।কিন্তু পরিস্থিতি ওকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করেছে যে না বলেও কোন উপায় নেই।
সারাদিনের কাজ শেষে ক্লান্ত আর ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে সুজন তালুকদার বাড়িতে ফিরলো।জুঁই কে এভাবে বিরতিহীন ভাবে পায়চারি করতে দেখে ভ্রুঁ কোঁচকালো। বিশ্রাম নিতে জহিরের ঘরে আগেই গেল না,আগে জুঁইয়ের কাছে এলো।
“কি হয়েছে জুঁই?এত অস্থির লাগছে কেন তোমায়?”
সুজনকে দেখতেই জুঁই যেন একটু হলেও স্বস্তি পেল। অন্তত একটা মানুষকে তো পাওয়া গেল যাকে নির্দ্বিধার যে কোন কিছু বলা যাবে।
“আরে সুজন ভাই তুমি সারাদিন কোথায় ছিলে বলোতো?জানো এদিকে কি হয়ে গেছে?”
“কি হয়েছে?”
“আব্বা খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।এখন আমার বিয়ের জন্য খুবই তাড়া দিচ্ছে।”
“তুমি যে বলেছিলে নাদিম এই বিয়েটা নাকি ভেঙ্গে দেবে?”
“দিয়েছে তো।দুপুরে খবর এসেছিল।নাদিম জানিয়েছে এখন নাকি ও বিয়ে করতে চায় না।এতে আব্বা ভীষণ রাগারাগি করেছে যে আগে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে এখন অপমান করছে।তারপরে শরীরটা আরো খারাপ করেছিলো।এখন আব্বা বলছে এক সপ্তাহের মধ্যে নাকি আমার বিয়ের ব্যবস্থা করবে।”
জুঁইয়ের এমন পরিস্থিতিতে সুজন হাসবে না কাঁদবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।তবে তার বোধহয় হাসি পেল।সত্যিকারের ভালোবাসা গুলোর শেষ পরিণতি যে বিচ্ছেদ হয় সেটাই তো প্রকৃতির নিয়ম।তাই এখন আর এসবে সুজনের খারাপ লাগে না বরং হাসি পায় প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায়।
সুজনকে হাসতে দেখে জুঁই ভরকালো।
“তোমার আবার কি হলো সুজন ভাই?হাসছো কেন?”
“একটা সত্যি কথা বলি জুঁই?”
“বলো।”
“কেন যেন মনে হচ্ছে আবারো দুটো হৃদয় ভাঙার সময় এসে গেছে।আবারো বেশ কিছু জীবন নষ্ট হতে চলেছে।”
“এমন করে বলো না সুজন ভাই।বাঁচতে পারবো না এমন কিছু হলে।”
“মতিউর সাহেবকে খবর দেই?”
“আপারা আসছে।আব্বা বড় ভাইজানকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিল।ওদের অপেক্ষাই তো করছি।দুলাভাই এলে অনেকটা শান্তি পাবো।আর আমি আজ ভেবেছি আব্বাকে জহিরের কথা বলে দেব।”
সুজন আলতো হেসে বলল,
“আমারো যদি একটু মতিউর সাহেবের মতন ক্ষমতা থাকতো তবে তোমায় সাহায্য করতাম।তবে চিন্তা করোনা আমার সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব তোমার সাহায্য করবো।আর যা করবে ভেবেচিন্তা করো।দুলাভাইকে সামলানো কিন্তু বেশ মুশকিল হবে।”
“বড় ভাইজানের জন্যই তো দুলাভাইকে দরকার।আচ্ছা তুমি যাও হাত মুখ ধুঁয়ে একটু আরাম করো।আমি বড় ভাবিকে দিয়ে খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
সুজন সায় জানিয়ে চলে যেতে নিলে হঠাৎ ওর কানে পরিচিত একটা কন্ঠস্বর ভেসে এলো।
“সুজন মিয়া!ও সুজন মিয়া!”
কণ্ঠস্বরটা যে মতিউরের সেটা চিনতে সুজনের এক মুহূর্ত দেরি হলো না।বাধ্য হলো থামতে।এতক্ষণে মতিউর আর জবা উঠানো পা রেখেছে।তবে সুজনের চোখ আগে মতিউরের উপর পড়লো না।তার পাশে দাঁড়ানো অস্বস্তি তে মোড়া জবার মুখটা চোখে পড়ল।সুজন বেশিক্ষণ তাকালো না।নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে এনে মতিউরের উপরে নিবদ্ধ করল।মতিউর ততক্ষণে আবারো বলল,
“আমাকে দেখলে তুমি এমন পালাও কেন সুজন মিয়া?”
“ভুল বললেন।আমি আপনাদের দেখিনি।আর আমি পালাচ্ছিলাম না।কাজ শেষে এখনই ফিরলাম।হাতমুখ ধুঁয়ে বিশ্রাম নিতে যাচ্ছিলাম।আপনাদেরকে দেখলে কথা বলেই যেতাম।”
“ওহ্।তা কি খবর বলো?”
“এইতো চলছে।আপনাদের কি খবর?”
“শেষ আমাদের মাঝে যেমন কথা হয়েছিল।তুমি ভালো আছো তাই আমরাও ভালো আছি।”
ওদের এত আলাপচারিতা জুঁইয়ের একদমই পছন্দ হলো না।এখন সবকিছুই তার সময় নষ্ট মনে হচ্ছে।মতিউর কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এসব কথা ছাড়ুন দুলাভাই।আপনি আমার সাথে চলুন দরকারি কথা আছে।”
“আরে বাহ্ জুঁই তোমাকে না দেখলে তো বুঝতামই না যে আমারও কারো জীবনে দরকার আছে।তা কি হয়েছে?জামশেদ আবার কিছু করলো নাকি?”
“করেনি তবে করবে আর সেজন্যেই আপনাকে দরকার।ভাইজানকে আটকাতে হবে আজকে।আপনার কত ক্ষমতা আছে সে সব দেখাতে হবে।”
“আরে আমার সব ক্ষমতা এই এলাকায় দেখাবো কি করে?এখানে অর্ধেক দেখাতে পারবো বাকি অর্ধেক ক্ষমতা আমার এলাকায় নিয়ে গিয়ে দেখাতে হবে।”
“আচ্ছা অর্ধেক দেখালেই হবে।আগে আপনি আমার সাথে চলুন গোপন বৈঠক আছে আপনার সাথে।”
পাশে দাঁড়ানো জবা মৃদু রাগী গলায় বলল,
“পাশে যে তোর আপাও দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে নজর নেই?আমার থেকে ওনার সাথে তোর বেশি মিল তাইনা?”
“তোমার সাথে পরে কথা বলব আপা আগে দুলাভাইয়ের সাথে জরুরী কথাটা সেরে নেই।দুলাভাই চলুন।”
জুঁই আর সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না।এক প্রকার টেনে নিয়ে গেল মতিউর কে।
আবারো সুজন আর জবা একাই থেকে গেল সেখানে।সুজনও জবার সাথে কথা বলতে চাইলে না।চুপচাপ সেখান থেকে চলে যেতে নিলে জবা পেছন থেকে বলে উঠলো,
“কেমন আছো সুজন?”
সুজন থামলো।জবা নিজ থেকে কথা বলায় তার বেশ ভালোই লাগলো তবে নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
“ভালো আছি।তুমি ভালো আছো তো?”
“হ্যাঁ ভালো আছি।”
এর পরে আর বলার মতন কেউ কোনো কথা খুঁজে পেল না।দুজনেই অপেক্ষা করছে যে অপর প্রান্তের মানুষটা হয়তো কিছু জিজ্ঞেস করবে তবে সেটার উত্তর দেবে।তবে নিজ থেকে আগ বাড়িয়ে কেউ কিছু বলার মতন খুঁজে পেল না।বেশ কিছুটা সময় দুজনেই সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।যখন সুজন বুঝতে পারল যে ওদের মাঝে আর বলার মতন কিছু বাকি নেই তখন আর সেখানে অপেক্ষা করলো না,চলে গেল।জবাও কিছুক্ষণ সুজনের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থেকে সেও চলে গেল।
চলবে।

