প্রেমের ঘাটের gমাঝি #পর্ব ১৮(শেষাংশ) #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
128

#প্রেমের ঘাটের gমাঝি
#পর্ব ১৮(শেষাংশ)
#লেখনিতে খুশবু আকতার

“আব্বা!”

কন্ঠটা কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জলিল তালুকদার বুঝতে পারলেন যে এটা তার বড় মেয়ের ডাক।সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে তাকালেন।তবে চোখ খুলে তাকাতেও তার যেন ভীষণ কষ্ট হলো।চোখের পাতা দুটো খুব ভার ভার লাগছে।তার পাশে বসা মেয়ের মুখটা দেখতেই কেন যেন তার চোখ দুটো ভিজে উঠলো।দু চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়লো।সে চোখের জলের কারণ জবার অজানা না।মুখ ফুটে কিছু বললো না ঠিকই তবে জবা বুঝা গেল তার আব্বার চোখের জলের কারণ।কেন যেন জবার কষ্ট হলো না।এই প্রথম জবার মনে হলো তার হৃদয়টা বোধহয় সত্যি পাথর হয়ে গেছে সুজন কে হারিয়ে।না হলে নিজের বাবার চোখে জল দেখেও খারাপ লাগলো না কেন?কিংবা হয়তো অভিমান,অভিযোগগুলো একটু বেশিই বেড়ে গেছে।

“কাঁদছো কেন আব্বা?এই চোখের জলের কি এখন আদৌও আর কোন মূল্য আছে?”

জলিল তালুকদার অপরাধী গলায় বললেন,

“তুমি আমার মেয়ে।আমার বড় মেয়ে।আমি তোমার খারাপ চাইতে পারিনা।আমি যা করেছি তোমার ভালোর জন্য করেছি।”

“হ্যাঁ।এমন ভালো করেছো যে ভালো আমি কখনো চাইনি।আমার ভালোটা বোধহয় আমাকে বুঝতে দিলে খুব বেশি ক্ষতি হতো না তাই না আব্বা?তাহলে আজ আমরা সবাই সুখে থাকতাম,তোমার ও এই অপরাধবোধটা হতো না।”

“আর অভিযোগ করো না মা।এমনিতেও আমার হাতে হয়ত আর বেশি সময় নেই।তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য আসতে বলেছি আজ।ছোটবেলা থেকে তো আমিও তোমার অনেক অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছি। তুমি তোমার আব্বার একটা অপরাধ ক্ষমা করতে পারবে না?”

জবা কিছুক্ষণ নীরব থাকল।জলিল তালুকদারের কথার প্রেক্ষিতে তার ঠিক কি বলা উচিত সেসবই ভাবছে।জবা কে চুপ করে থাকতে দেখে জলিল তালুকদার এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।মেয়ের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বললেন,

“আমায় আর অপরাধী বানিও না মা।মানছি তুমি যাকে চেয়েছো তার সাথে তোমার বিয়ে দেই নি কিন্তু তুমি এটা বলতে পারো না আমায় যে আমি তোমায় খারাপ কারো হাতে তুলে দিয়েছি।এই অজুহাতে হলেও না হয় আমায় ক্ষমা করে দাও।ক্ষমা চাইলে তো খোদাও আমাদের ক্ষমা করে সেখানে তো তুমি একটা মানুষ,আমার মেয়ে।নিজের আব্বাকে ক্ষমা করতে পারবেনা?”

“ঠিক আছে আব্বা ক্ষমা করবো তোমায়।তবে বিনিময়ে আমারও কিছু চাই।”

“কি চাই বলো?তুমি যা চাইবে আমি তোমায় তাই দেবো।”

“এখন না।সময় হলে আমি তোমার কাছে চেয়ে নেব।মনে রেখো তখন কিন্তু আমায় দিতে হবে।ছোট থেকে শুনে এসেছি জলিল তালুকদার যা বলেন তাই নাকি করেন।আজ কিন্তু তুমি আমায় বললে আমি যা চাইবো তাই দেবে।মনে থাকে যেন কথাটা।”

জলিল তালুকদার মেয়েকে আশ্বস্ত করে বললেন,

“তাই হবে।আমার ক্ষমার বিনিময়ে তুমি যা চাইবে আমি তোমায় তাই দেব।আমার শুধু তোমার থেকে ক্ষমার প্রয়োজন।”

_______
রাতে খাওয়া-দাওয়া পর জলিল তালুকদার মতিউরকে নিজের ঘরে ডাকলেন।সেই সাথে নিজের তিন ছেলে সহ পুরো পরিবারকেও।
তবে বৈঠকে সবথেকে বেশি প্রাধান্য তিনি মতিউরকেই দিলেন।একেই তো মতিউর তার বাড়ির বড় জামাই তার ওপরে তিনি যেন নিজের ছেলেদের থেকে একটু হলেও বেশি মতিউরকে ভরসা করতে পারেন।অন্তত নিজের বড় দুই ছেলের থেকে।আর তাছাড়া এখন তিনি যে বিষয়ে কথা বলবেন সেখানে মতিউরের থাকাটা দরকার।

“এসব আলোচনা তো সকালে করলেও হতো আব্বা।এখন আপনার শরীর ভালো না।”

মতিউরের কথায় জলিল তালুকদার আলতো হেসে বললেন,

“কাল সকাল অব্দি অপেক্ষা করলে যদি দেরি হয়ে যায়।সেজন্যই তোমায় ডাকা এত তাড়া দিয়ে।”

মতিউর কিঞ্চিৎ বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,

“এসব কি কথা?আচ্ছা বলুন দেখি আগে আপনার দরকারি কথাই শুনি।”

জলিল তালুকদার তার স্ত্রীয়ের দিকে তাকালেন।ইশারা বুঝতে পেরে আনোয়ারা কিছু কাগজপত্র তার হাতে তুলে দিলেন।জলিল তালুকদার সেগুলো মতিউরকে দিয়ে বললেন,

“এগুলা আমার সব সম্পত্তির কাগজপত্র।”

মতিউর সহ উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষই অবাক হল।সচরাচর মৃত্যুর আগে পিতা তার সম্পত্তির কাগজপত্র নিজের সন্তানদের হাতে অর্পণ করে যান কিন্তু আজ তার বিপরীত ঘটলো।জামশেদ এর ভীষণ রাগ হলো।তবে ভরা সভার মাঝে নিজের অসুস্থ বাবার ওপরে চিৎকার চেঁচামেচি করাটা ঠিক শোভনীয় দেখায় না।যথাসম্ভব নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে বলল,

“জমি জমার কাগজপত্র নিয়ে কোন কিছু করার থাকলে আমাকে বললেই তো পারতেন আব্বা।”

জামশেদের কথা কে জলিল তালুকদার খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না।কোন উত্তর দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করলেন না।মতিউরকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আমি আমার ছেলে মেয়েদের মাঝে সম্পত্তিগুলো ভাগ করে দেওয়ার সময় পেলাম না।আমি জানি আমার ছেলেরা এসব হিসেবে খুবই পটু।নিজেদের অংশের এক আনাও ছাড় দেবে না।জবা কে নিয়ে আমার চিন্তা নেই কিন্তু আমার এখন সব চিন্তা আমার ছোট মেয়েকে নিয়ে।”

মতিউর আশ্বস্ত করে বলল,

“জুঁইকে নিয়েও অযথা আপনার চিন্তা করার দরকার নেই আব্বা।আপনার অবর্তমানে যদি জবার খেয়াল রাখতে পারি জুঁইয়ের খেয়ালও রাখতে খুব একটা অসুবিধা হবে না আমার।ওকে আমি নিজের ছোট বোনের নজর এই দেখি।জবা,জুঁই কিংবা আম্মা কাউকে নিয়েই আপনায় ভাবতে হবে না।”

জলিল তালুকদার একটু শান্তি পেলেন।সেই সাথে আবার অবাকও হলেন।তিনি বুঝতে পারছেন জুঁইয়ের মতিউরের প্রতি ভরসা দেখতে দেখতে তিনি নিজেও যেন মতিউরের উপর ভরসা করতে পারছেন এখন।

“হিসাব মত আমার দুই মেয়ের ভাগে ২৫ বিঘা করে সম্পত্তি পড়বে।তুমি শুধু দেখো ওরা যেন এতোটুকু পেয়ে যায়।”

জবা তৎক্ষণাৎ আপত্তি জানিয়ে বলল,

“আমি কিছু নেব না আব্বা।এ বাড়ি থেকে যখন আমি শূন্য হাতে বেরিয়ে গিয়েছি একটা কানা কড়িও আমি নেব না।”

মতিউর একবার চোখ তুলে জবার দিকে তাকালো।জলিল তালুকদার মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“এটা তোমার অধিকার মা ছাড়বে কেন তুমি?”

“কোন অধিকারের প্রয়োজন নেই আমার আব্বা।তুমি আমার ভাগের সম্পত্তিটুকু জুঁইকে দিয়ে দাও।না হলে ছোট ভাইজানকে দিয়ে দাও।আর যদি ওরা দুইজনের কেউই না নিতে চায় তবে দান করে দিও।এই ব্যতীত আর কাউকে আমি দেবো না।আর মতিউর আপনাকেও বলছি বলেছিলেন না আমায় নিজের স্ত্রীকে রানী করে রাখার ক্ষমতা আপনার আছে।তবে এই সম্পত্তি থেকে একটা অংশও আমি নেব না।”

জাফর আর জামশেদ দুজনেই অগ্নিকৃষ্ট নিক্ষেপ করলো জবার ওপর।ওদের সেই দৃষ্টি মতিউরের চোখ এড়ালো না।নিজের প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর প্রতি এমন অগ্নিদৃষ্টি সে কোনমতেই সহ্য করবে না।সাবধানী গলায় দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এই যে দুই সম্বন্ধি,ভুলে যেও না জবা এখন আমার স্ত্রী।ভুলেও ওর দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকানোর সাহস করবে না।আমার একদম পছন্দ না।”

এই গুরুতর আলোচনার মাঝে মতিউরের এমন কথায় জবা নিজেই একটু লজ্জা পেল।মানুষটা লোকজন কিছু মানে না সবার সামনে নিজের বউয়ের প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ দিতেই হবে যেন ওনাকে।মৃদু রাগী গলায় বলল,

“আজেবাজে কথায় মনোযোগ না নিয়ে কাজের কথায় মনোযোগ দিন।আব্বা যা বলছে তাই করুন।”

জবার কথা মতো মতিউর আবারো জলিল তালুকদারের কথায় মনোযোগ দিল।

“দেখো বাবা আমার দেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমি দিতে চেয়েছি।আমার মেয়ে যদি না নেয় তাহলে আমার কিছু করার নেই।তুমি বরং তবে সেই অংশ জুঁইয়ের নামে করে দেয়ার ব্যবস্থা করো।”

পিছন থেকে জামশেদ বলে উঠলো,

“ও মেয়ে মানুষ এত সম্পত্তি দিয়ে কি করবে?দুদিন পর তো অন্যের ঘাড়ে গিয়ে বসে খাবে।”

“অন্যের ঘাড়ে বসে যেন খেতে না হয় সেজন্য এত সম্পত্তি ওর দরকার।তুমি চুপ থাকো।তুমিও তো পাচ্ছো।”

“তোমার মনে হয় না মতিউর তুমি বাড়াবাড়ি করছো?”

“অধিকার পেয়েছি তাই বাড়াবাড়ি করছি।একবার ভেবে দেখো তো যা তোমার করার কথা ছিল সেটা আমি করার সুযোগ পেলাম কি করে?তোমার আব্বা তোমায় ভরসা না করে আমায় এসব দায়িত্ব দিচ্ছেন কেন?নিজের মর্যাদাটা একবার দেখেছো এই বাড়িতে?কি করলে এত বছর যে নিজের আব্বার ভরসা অর্জন করতে পারলে না?

লজ্জায় অপমানে জামশেদের মুখ বন্ধ হয়ে গে।ইচ্ছে তো করলো এখান থেকে চলে যেতে কিন্তু উপায় নেই এখানে থাকতেই হবে এত সম্পত্তির ব্যাপার সবকিছু ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে তো।তার থেকেও বড় কথা কি করে জুঁই কে জবার এই সম্পত্তি থেকে সরানো যায় সে সবই ভাবতে হবে।
এদিকে এই মুহূর্তে এসব সম্পত্তির আলোচনা জুঁইয়ের একদমই ভালো লাগছে না।তার তো এসব সম্পত্তির দরকার নেই শুধু জহিরকে পেলেই হবে।

“আব্বা আমি তোমায় কিছু বলতে চাই।আমার এসব সম্পত্তি….”

জুঁই কে নিজের কথা সম্পন্ন করতে দিলো না মতিউর।ওকে থামিয়ে দিয়ে নিজেই বলল,

“তোমার যা কথা বলার তুমি পরে বলো জুঁই।আমার এখন আব্বার সাথে কিছু দরকারি কথা আছে।যাও তুমি ঘরে গিয়ে ঘুমোও,অনেক রাত হয়েছে।”

“আপনার মনে হয় দুলাভাই এই মুহূর্তে ঘুমোনো সম্ভব?বলতে দিন আমায় দেরি হয়ে যাবে এখন না বললে।”

“আমি বলছি তো তোমায় আমার দরকারি কথা আছে আব্বার সাথে।আমি আগে সেসব বলি তারপর তোমার যা বলার বলবে এখন যাও।অবাধ্যতা না করে কথা শোনো আমার।তোমার ভালোর জন্যই বলছি।”

জুঁই বুঝতে পারলো যে মতিউর জহিরের কথাটাই বলবে।মতিউরের সাথে তেমনই কথাটা হয়েছিল।আপত্তি না করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।দরজার কাছে দাঁড়ানো জামশেদ আর জাফর কে উদ্দেশ্য করে মতিউর বলল,

“আব্বার সাথে আমার একটু আলাদা করে কথা আছে তোমরা দুজনে এখন আসতে পারো।”

জামশেদ রাগান্বিত গলায় বলল,

“এটা আমার আব্বার ঘর মতিউর।তুমি আমায় বের করে দেওয়ার কে?”

“ও আগে বলবে তো যে আমি বের করলে যাবে না আব্বা বের করলে যাবে।দাঁড়াও।আব্বা আমার আপনার সাথে কিছু দরকারি কথা আছে ওরা থাকলে সমস্যা হবে ওদেরকে একটু ঘুমোতে যেতে বলুন তো।”

মতিউর এর কথা মতো জলিল তালুকদার ওদেরকে নিজেদের ঘরে চলে যেতে বললেন।এ বারে আর এক মুহূর্ত এখানে দাঁড়ানো গেল না।জামশেদের পিছন পিছন বাধ্য ভাইয়ের মতন জাফরও চলে গেল।
মতিউর জবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জবা তুমি যাবে,না থাকবে?”

“আমি থাকলে কি আপনার বলতে কোন অসুবিধা হবে?”

“আরে না।আমার বলতে অসুবিধা হবে কেন?অনেক রাত হয়ে গেছে আমি ভাবলাম হয়তো তোমার ঘুম পেয়েছে সেজন্য বললাম।”

“না ঘুম পায়নি,আমি থাকি।আমার থাকাটা দরকার। সাহায্য করতে পারবো আপনাকে।”

মতিউর সায় জানালো।জবা যা চায় তাই হবে।

_______
জলিল তালুকদারের ঘর থেকে বেরিয়ে জুঁই সোজা জহিরের ঘরে এলো।দরজার বাহির থেকে জহিরের নাম ধরে কয়েকবার ডাকতেই ভিতর থেকে সুজন এসে দরজা খুলে দিল।

“এত রাতে তুমি এখানে এসেছ কেন জুঁই?”

“জহির কেমন আছে সুজন ভাই?”

“জ্বরটা বেড়েছে।”

“জলপট্টি দিয়েছো?”

“হ্যাঁ দিয়ে দিয়েছি চিন্তা করো না।আর এত রাতে তোমার আশা ঠিক হয়নি।ঘরে যাও।”

“আচ্ছা একবার ওকে দেখেই চলে যাব।”

সুজন আর আটকালো না।এতোটুকুতে যদি একটু শান্তি পায় তবে পাক।জুঁই ঘরের ভেতরে গেল,সুজন বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।এখান থেকে তালুকদার বাড়ির সবগুলো ঘরই খুব ভালোভাবে দেখা যায়।সুজনের চোখ পড়লো জবার ঘরটার দিকে।অন্যান্য ঘরে আলো জ্বললেও জবার ঘরটাতে আলো জ্বলছে না।নিশ্চয়ই জবা আর মতিউর ঘুমিয়ে পড়েছে সেটাই ভাবলো।বুকের ভেতর তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করল সুজন।ভাবতেই অবাক লাগছে ওর জবার ঘরে,জবার সাথে অন্য কেউ আছে।অথচ একদিন স্বপ্ন দেখেছিল ওখানে সুজন থাকবে।জবার পাশে সুজন থাকবে।আর আজ সবটাই কেবল দুঃস্বপ্ন।

জুঁই বাইরে এসে সুজনকে এভাবে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুজনের দৃষ্টি অনুসরণ করে সেও সে দিকে তাকালো।জবার ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেই হয়তো সুজনের মনের কথাটা হালকা একটু আন্দাজ করতে পারল।

“আপা আর দুলাভাই আব্বার ঘরে আছে।”

সুজনের ধ্যান ভাঙ্গলো।হালকা একটু নড়েচেড়ে উঠে বলল,

“আমি সেসব ভাবছিলাম না।”

“অজুহাত না দিলেও চলবে।”

“জহিরের কথাটা বলেছ?”

“দুলাভাই বলতে দেয়নি আমায়,উনি নিজেই বলবে।”

“আর আমার দুলাভাইকে কি করে আটকাবে?”

“তোমার দুলাভাইকে আমার দুলাভাই ভয় করে না, মানেও না।আমায় আশ্বস্ত করে বলেছে আব্বা মেনে নিলেই আমার আর জহিরের বিয়ের ব্যবস্থা করবে।আব্বা না মেনে নিলেও বিয়ের ব্যবস্থা করে দেবে।”

“বাহ্।আমার সাথে জবার বিয়ে না হয়ে ভালোই হয়েছে বলো?আমি তো তোমায় এসব সাহায্য করতে পারতাম না।”

জুঁই একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,

“না পারলে সাহায্য করতে তবুও যদি হতো ভালোই হতো।আমার আপা ভালো থাকতো।”

কথাটা বলে জুঁই চলে গেল।সুজন হাসলো।জবা এখনো নিশ্চয়ই ভালোই আছে।মতিউরের মতন মানুষের সাথে কেউ খারাপ থাকতেই পারে না।আর যদি জবা সত্যিই খারাপ থাকতো ওর চোখ মুখের অবস্থা দেখলে সেটা এখন একটু হলেও আন্দাজ করা যেত।এতদিনে হয়তো সংসার করার ইচ্ছেটুকুও থাকতো না।একবার হলেও সুজনকে বলতো যেন ওকে নিয়ে পালিয়ে দূরে কোথাও চলে যায় কিন্তু তেমন কিছু হয়নি।জবা সেখানে ভালোবাসার দেখা পেয়েছে জন্যই এখন হয়তো সুজনের ভালোবাসা কে মনে পড়ে না।

_______
“আরে আব্বা রাগ করছেন কেন?আমি জানি জহিরের সাথে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে রাজি হওয়া যায় না কিন্তু তবুও রাজি হতে হবে আপনাকে?”

জলিল তালুকদার রাগান্বিত কন্ঠে বললেন,

“ওকে ছোটবেলা থেকে মানুষ করলাম।থাকা, খাওয়া,চাকরির ব্যবস্থা অব্দি করে দিলাম আর ও আজ আমার মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়েছে?কাল সকাল হতেই ওকে আমি গ্রাম ছাড়া করব।ওর সাহস হয় কি করে যে আমার মেয়েকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখে?আমার জুঁইয়ের মতন শিক্ষিত,সুন্দরী মেয়ের পাশে ওকে কোন দিক দিয়ে মানায়?আমার মেয়েকে বিয়ে করে রাখবে কোথায়,নিয়ে যাবে কোথায়,খাওয়াবে কি যেখানে তিন বেলা আমার খায়?”

অযৌক্তিক কথার পিছে তর্ক করা যায়,বোঝানোর চেষ্টা করা যায় কিন্তু জলিল তালুকদারের প্রত্যেকটা কথাতেই যুক্তি আছে।যার ফলে মতিউরের মতন মানুষও কিছু বলতে পারছে না।জবা এখন অব্দি কিছু বলেনি।মতিউরের উপর ভরসা করে বসে ছিল।কিন্তু এখন মতিউর কে চুপ করে যেতে দেখে বুঝতে পারলো ওরও কথা বলতে হবে।

“তোমরা সব সময় এত যোগ্যতা কেন খোঁজো আব্বা?যে যাকে ভালোবাসে তার সাথে বিয়ে দিতে তোমাদের এত আপত্তি কিসের?তোমার কি মনে হয় জুঁইয়ের মতন বুদ্ধিমতি,বিচক্ষণ মেয়ে এসব না ভেবেই একটা ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়েছে?ওর এত কিছুর দরকার নেই,ওর শুধু জহির ভাইকে দরকার।”

“তাই বলে আমার মেয়েকে আমি জহিরের সাথে বিয়ে দেবো?”

“তোমার মেয়ে জন্য দেওয়া যাবে না?যদি বল রাখবে কোথায়,খাওয়াবে কি তাহলে বলবো তোমার তো কম নেই তুমি ব্যবস্থা করে দাও।মেয়ের নামে যে সম্পত্তি দিতে চাইছো সেখান থেকে ওদেরকে কিছু একটা ব্যবস্থা করে দাও তাহলেই তো পারো।জহির ভাই শিক্ষিত না চাকরি করতে পারবেনা,আমি ধরলাম ব্যবসা ও করতে পারবেনা তো জমি দাও।চাষবাস করুক।ওদের সমস্যা না থাকলে তোমাদের কিসের এত সমস্যা?”

জবা কে হঠাৎ এত রেগে যেতে দেখে মতিউর একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেল।শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলল,

“আস্তে কথা বলো জবা।জামশেদের কানে চলে গেলে সমস্যা হবে।”

জবা চোখ গরম করে মতিউরের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি চুপ করুন।দেখছেন না আমি কথা বলছি?বলতে দিন আমায়।সারা জীবন চুপ থেকেই এসেছি।আর আব্বা তোমায় বলছি ধরো তুমি জুঁইয়ের অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দিলে সেই ছেলে যে ভালো হবে তার নিশ্চয়তা তুমি আমায় দিতে পারো?সবাই মতিউর সাহেব হয় না।উনি ভালো হয়েছেন জন্য পরবর্তীতে যে অন্য কেউ ভালো হবে তেমনটা কিন্তু না।সে দিক দিয়ে ধরতে গেলে জহির ভাইয়ের ব্যাপারে আমরা সবাই নিশ্চিত।আর একটা সংসারে স্বামী স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা না থাকলে যে কতটা অশান্তি হয় সেটা কি আমায় তোমায় আলাদা করে বোঝাতে হবে?এই নিয়ে তো আমার আম্মা কম অশান্তিতে ভোগেনি।আমিও অশান্তিতে পড়ছি দয়া করে আর আমার বোনটাকে অশান্তির মাঝে ফেল না।এই বংশ গৌরব ছাড়ো,এই টাকা পয়সার ভেদাভেদ ছাড়ো,এই যোগ্যতা নিয়ে আর ভেবো না।ভালোবাসায় কোনো যোগ্যতা লাগে না। যোগ্যতা সুজনেরও ছিল আমার পাশে দাঁড়ানোর কিন্তু তোমরা হতে দাও নি।মতিউর সাহেবের পাশে দাঁড়ানোর হয়তো আমার তেমন একটা যোগ্যতা নেই কিন্তু তাও আমি আছি।তাই বলছি সব সময় এত যোগ্যতা নিয়ে ভেবোনা।”

জলিল তালুকদার চুপ করে গেলেন।মতিউর কিঞ্চিৎ রাগ দেখিয়ে বলল,

“আমার পাশে তোমার দাঁড়ানোর যোগ্যতা নেই মানে কি?কে বলেছে এসব?”

“আপনাকে চুপ করতে বলেছি তো আমি।আমি যতক্ষণ কথা বলবো একটা কথাও বলবে না।আমার বলা শেষ হলে আপনি বলবেন।”

মতিউর বাধ্য ছেলের মত থামল।অবশ্য জবার রাগী মুখটা দেখতেও তার বেশ ভালোই লাগছে।ওই যে আজকাল জবা কে রাগ করতে দেখলে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।
জবা এবার একটু শান্ত হওয়ার চেষ্টা করলো।নিজের রাগটাকে কমিয়ে জলিল তালুকদারকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার থেকে তো তুমি ক্ষমা চাইলে আব্বা।আমি হয়তো তোমায় ক্ষমা করে দেবো তবে একটা কথা মনে রেখো জুঁই কিন্তু আমার সম্পূর্ণ বিপরীত।ওর কাছে যতই কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাও না কেন কক্ষনো তোমায় ক্ষমা করবে না।এই অপরাধের বোঝা নিয়ে বাকি জীবন বাঁচতে পারবে তো?”

“জহিরের সাথে বিয়ে দিলে এর থেকেও খারাপ হবে।গ্রামে মুখ দেখাবো কি করে আমি?সবাই বলবে মাতব্বরের মেয়ের একটা ভিখিরির সাথে বিয়ে হয়েছে।”

“তো?কতদিন বলবে?একসময় এমনিতেই থেমে যাবে।তোমার মেয়ে তুমি যার সাথে ইচ্ছে তার সাথে বিয়ে দেবে।দয়া করো আব্বা জুঁইয়ের জীবনটা নষ্ট করো না।তুমি আমায় বলেছিলে না,আমি যা চাইবো তাই দেবে। বেশ তোমার থেকে আমি এটাই চাইলাম।যদি আমার থেকে ক্ষমা পেতে চাও তবে ওদের বিয়েটা মেনে নাও।”

জলিল তালুকদার এবারে পড়লেন মহা বিপাকে।মেয়ের কথাতেও যে যুক্তি আছে সেসব তিনি জানেন তবে জহিরের সাথে তিনি তার এমন রূপবতী,গুণবতী মেয়েকে বিয়ে দিতে কোনমতেই নিজের মনকে রাজি করাতে পারছেন না।এটা হয় না।জবা ইশারায় এবার মতিউরকে কিছু বলতে বলল।মতিউর ভদ্রতা বজায় রেখে যথাসম্ভব শান্ত গলায় বলল,

“আপনি এসব নিয়ে ভাবছেন তো আব্বা যে বিয়ের পর ওরা কোথায় যাবে,কি খাবে?আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি জহিরের একটা কাজের ব্যবস্থা আমি করে দেব।আমার নিজের ব্যবসায় আমি ওকে একটা কাজ দেব।ওদের থাকার ব্যবস্থা আমি শহরে করে দেব।আর মানুষের কাজই বল।ওদের কথা ভেবে নিজের মেয়েকে কষ্ট দেবেন না।”

জলিল তালুকদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“আমাকে একটু ভাবার সময় দাও।কাল সকালে এই নিয়ে কথা বলি আমরা।”

________
সকাল সকাল খবর এলো মতিউরের গোডাউন থেকে নাকি জিনিসপত্র চুরি হয়েছে।শহরে যেতেই হবে।এদিকে তালুকদার বাড়িতে যে পরিস্থিতি এই অবস্থায় মতিউর যেতেও পারছে না।কেননা এখানে মতিউর ছাড়া পুরো পরিস্থিতিটা আর কেউ সামাল দিতে পারবে না।যদি জলিল তালুকদারের আগের মতন সেই প্রভাবটা বজায় থাকতো তবে আর চিন্তা ছিল না।তবে মতিউরের ভয়ই জামশেদকে নিয়ে,যাকে জলিল তালুকদারও এখন সামলাতে পারেন না।সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে ভুগতে অবশেষে জবাকে বলল,

“আমি কি যাব না যাব না জবা তুমি বলো?তুমি যা বলবে তাই করব।”

“আমার সিদ্ধান্ত মত চলবেন নাকি আপনি?”

“পরামর্শ চাইছি তোমার থেকে।পরামর্শ তো দিতেই পারো?”

“যান।সন্ধ্যের মধ্যে আবার ফিরে আসবেন কেমন।”

“এদিকে যদি জুঁইয়ের প্রয়োজন হয় আমাকে?”

“আমি সামলানোর চেষ্টা করব।”

“যদি জামশেদ তোমার সাথে কিছু করে?”

“ভাইজানের শরীরে ভয় আছে।আমার গায়ে হাত তুললে পরিণতি কি হতে পারে সেটা উনি খুব ভালো করেই জানেন।দরকার পড়লে যাওয়ার আগে একটু ভয় দেখিয়ে যান।”

মতিউর বিস্ফোরিত নয়নে জবার দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি আমায় এসব বলছো?শান্ত জবা দেখছি দিন দিন অশান্ত হয়ে যাচ্ছে।এসব কি তবে আমার প্রভাব?”

“জানিনা।”

“তা কেন জানবে।এখনই যদি বলতাম যে সুজন মিয়ার প্রভাব নাকি ঠিকই জানতো।তুমি আমার সাথে বড্ড অন্যায় করো জবা।”

জবার অভিব্যক্তি বদলালো।চোখে মুখে অপরাধী ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,

“সত্যি আমি আপনার সাথে অনেক অন্যায় করি তাই না?”

মতিউর কিঞ্চিৎ বিরক্তি মাখা গলায় বলল,

“যে কথাটা ধরার দরকার সেটা ধরবে না,আর যে কথাটা ধরা যাবে না সেটাই তুমি ধরে বসে থাকবে।ধুর বাদ দাও এসব।যাই জামশেদকে একটু ভয় দেখিয়ে চলে যাই।”

কথাটা বলে মতিউর ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিয়ে আবার থেমে গেল।পিছন ফিরে তাকিয়ে জবাকে একবার নাম ধরে ডাকলো।

জবা মাথা তুলে দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,

“কিছু বলবেন?”

“ভালোবাসি তোমায়।নিজের খেয়াল রেখো কেমন।আমি দুজন লোক রেখে যাচ্ছি।যেকোনো দরকার হলে ওদেরকে শুধু একবার বলবে জামশেদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়বে।আর বেশি তেরিবেরি করলে বলবে তুলে যেন নদীতে আছাড় মারে।যা হয় আমি এসে দেখে নেব।”

কথাটা বলে মতিউর চলে গেল।আজকাল জবা খেয়াল করছে কাউকে দেখেই কেন যেন ওর আর ভয় হয় না।এই যে আজ বললো জামশেদ কিছু করলেও সামলে নেবে।গতকাল আবার নিজের আব্বাকে জোর গলায় কত কিছু বলল।সবটাই বোধহয় মতিউরের জন্য।জবা যানে মতিউর ওর কিচ্ছু হতে দেবে না।যদি কেউ জবাকে কিছু বলতে আসে তবে আগে মতিউরের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে।জবা হাসলো।মানুষটা সত্যি পাগল,জবার ভালোবাসায় পাগল।

চলবে ইনশাআল্লাহ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here