প্রেমের ঘাটের মাঝি #পর্ব ১৯ #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
122

#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ১৯
#লেখনিতে খুশবু আকতার

মতিউর কে সকালে খুঁজে জলিল তালুকদার পেলেন না।নিজের তিন ছেলেকে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবেন বলে ঘরে ডাকলেন।জামশেদের মাঝে একটু রাগী রাগী ভাব দেখা গেল।গতকাল রাতে তার আব্বার মতিউরকে এতটা গুরুত্ব দেওয়া মোটেও পছন্দ হয়নি।জামাইয়ের সামনে নিজের ছেলেদেরকে এভাবে অপমান করাটা সে মেনে নিতে পারেনি ঠিক।গম্ভীর গলায় তাড়া দিয়ে বলল,

“যা বলবেন তাড়াতাড়ি বলুন আব্বা।”

“জুঁইয়ের বিয়ে ঠিক করেছি আমি।”

কথাটা জামশেদের একদমই পছন্দ হলো না।জবার বিয়েতে অনেক টাকা খরচ করেছে জলিল তালুকদার সেখানে আবার জুঁইয়ের বিয়েতে নিশ্চয় অনেক টাকা খরচ করবে,হয়ত বেশিই করবে।আর যদি এখনই বিয়ে হয়ে যায় তাহলে সম্পত্তিগুলো আর হাতানোর কোন সুযোগই থাকবে না।আপত্তি জানিয়ে বলল,

“ওর তো পড়াশোনা করার খুব শখ।এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার কি আছে?”

জাকির ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“তোমার আবার জুঁইয়েট পড়াশোনা নিয়ে এত মাথা ব্যথা কবে থেকে হলো ভাইজান?তুমি তো ওর বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল।পড়াশোনার কথা সহ্যই করতে পারতে না।”

“পারতাম না এখন পারছি।তোর কোন সমস্যা?”

জাকির আর কথা বাড়ালো না।জলিল তালুকদার ফের বললেন,

“পড়াশোনা বিয়ের পরেও সম্পন্ন করা যাবে।আমি বেঁচে থাকতে আমার মেয়ের বিয়ে দিতে চাই।আমি ওর বিয়ে ঠিকও করে ফেলেছি আশা করছি তোমরা কোন অমত করবে না।”

“আমরা অমত করলেও আপনি আর আজকাল শোনেন কোথায়?আপনি তো আপনার বড় জামাইয়ের কথায় উঠছেন বসছেন।আজকাল নিজের ছেলেদের দায়িত্ব তাকে দিয়ে পালন করাচ্ছেন,ছেলেদের অধিকার তাকে দিচ্ছেন আমাদের মতের আর কি দরকার?”

“তাহলে ভাবো তোমরা আমার কতটুকু ভরসার জায়গা অর্জন করতে পেরেছো যে আমার নিজের ছেলেদেরকে রেখে জামাইকে ভরসা করতে হচ্ছে।”

“থাক আব্বা আর অপমান করতে হবে না।কাল থেকে যথেষ্ট অপমানিত হয়েছি।তা কার সাথে ঠিক করলেন বিয়ে?কত পণ চাইলো তারা?”

“জহিরের সাথে ঠিক করেছি।”

কথাটা জামশেদ আর জাফরের ঠিক বিশ্বাস হলো না।জাকির অবশ্য বুঝতে পারল।জামশেদ নিশ্চিত হওয়ার জন্য পুনরায় বলল,

“কার সাথে বিয়ে ঠিক করেছেন?”

“আমাদের জহির।”

“মাথা ঠিক আছে আপনার?ঐ ফকিন্নির বাচ্চা মাঝির সাথে আপনি তালুকদার বাড়ির মেয়ের বিয়ে দেবেন যার কাছে এই বাড়ি থেকে খাবার না গেলে না খেয়ে মরবে?রুচি মরে গেল নাকি আপনার?”

“জবার সাথে যে অন্যায়টা করেছি জুঁইয়ের সাথে আর সে অন্যায়টা করা সম্ভব না।এক মেয়ের থেকে এখনো ক্ষমা পাইনি সেখানে দুই মেয়ের চোখে অপরাধী হতে পারব না।”

“ মানে?”

“মানেটা হলো জুঁই জহিরকে পছন্দ করে।আর ও যাকে পছন্দ করে তার সাথেই বিয়েটা দেব।”

রাগে জামশেদ এর চোখ দুটো লাল বর্ণ ধারণ করল। চোয়াল তার শক্ত হয়ে এলো।

“আমি আগেই আপনাকে বলেছিলাম ঐ মেয়ের এত ওড়াউড়ি থামান।ওকে এত প্রশ্রয় দিয়ে আপনি এমন ভাবে মাথায় তুলেছেন যে আজ একটা নিচু জাতের, ভিখিরির সাথে নোংরামি করছে।আজ তো আমি ওকে ছাড়বো না।ওর মাথা থেকে ওই ছোটলোকের বাচ্চার ভূত নামিয়ে ছাড়বো।”

কথাটা বলে জামশেদ উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।পিছন থেকে জলিল তালুকদার অনেকবার করে ছেলের নাম ধরে ডাকলেন কিন্তু কোন সাড়া পেলেন না। জাকির তাকে আশ্বস্ত করে বাইরে গেল জামশেদ কি করছে সে সব দেখার জন্য।জুঁই এখনো ঘর থেকে বের হয়নি।কাল রাতে ঘুমোতে বেশ অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল যার ফলে আজ সকালে ঘুম থেকে উঠতেও দেরি হচ্ছে।জামশেদ সোজা গিয়ে আগে জুঁইয়ের ঘরের দরজায় তালা লাগালো।
জুঁই সেসবের কিছুই টেরই পেল না।জাকির হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে জামশেদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কি করছেন ভাইজান?ওর ঘরে তালা লাগাচ্ছেন কেন?”

“ওর ভাগ্য ভালো যে আমি ওর ঠ্যাং ভাঙ্গিনি।আজ আর আমাকে আটকানোর চেষ্টা করবি না জাকির।আমি কিন্তু ভুলে যাবো যে তুই আমার ছোট ভাই।”

“অযথা পাগলামো করবেন না।আব্বা যেখানে মেনে নিয়েছে সেখানে আপনি কেন এত কথা বলছেন?আপনার আপত্তি করার তো কোনো কারণ দেখছি না আমি।”

“ঠিক তেমনি ভাবে তোকে এত জবাবদিহি করারও প্রয়োজন মনে করছি না আমি।সর সামনে থেকে।”

কথাটা বলে জাকিরকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে জামশেদ চলে গেল।ও যে জুঁইয়ের দরজাটা খুলে দেবে তার উপায়ও নেই কেননা চাবি জামশেদ নিজের সাথে করে নিয়ে গেছে।জামশেদ সোজা গেল এবার জহিরের ঘরের দিকে।দরজাটা খোলাই ছিল।গতকাল থেকে জহির ভীষণ অসুস্থ।জ্বরের ঘোরে কথাও ঠিক ভাবে বলতে পারছে না।অচেতন অবস্থায়ও হয়তো পড়েছিল।
জামশেদ জহিরের অসুস্থ দুর্বল দেহটাকে টেনে হিচড়ে বিছানা থেকে তুলল।কলার ধরে টেনে ঘর থেকে বের করে আনলো।জহির চোখটাও ঠিকভাবে খুলতে পারছে না।জামশেদ টেনে না আনলে হয়তো তার নিজের হাঁটার শক্তিটাও ছিল না।হঠাৎ জামশেদের এমন অতর্কিত আক্রমণের কারণ সে বুঝতে পারছে না।ঠিকভাবে ঘটনাটা আদৌ ধারণ করতে পারছে কিনা তার মস্তিষ্ক সেটাই সন্দেহ।দুহাতে জহিরের শার্টের কলার খামচে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

“শু/য়ো/রের বা/চ্চা তোর এত বড় কলিজা হয়ে গেছে যে তুই তালুকদার বাড়ির মেয়ের দিকে হাত বাড়াস?শালা ফ/কিন্নি তিন বেলা কপালে খাবার জোটে না আর তালুকদার বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখছিস?”

জহির কোন উত্তর দিলে না।কথাগুলো হয়তো তার কান অব্দি ঠিকঠাক পৌঁছাতেই পারল না।চোখ দুটো তার বন্ধ হয়ে আসছে।চোখের সামনে ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে সবটা।জামশেদ জহিরের নাক বরাবর একটা ঘু/ষি মা/রতেই জহির মাটির উপরে মুখ থুবড়ে পড়লো।জামশেদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা জহিরের নেই।পালটা ঘুরে যে কিছু বলবে বা উঠে বসার চেষ্টা করবে সেই ক্ষমতাও আজ তার অসুস্থতার জন্য নেই।জাকির তাড়াহুড়ো করে এসে জামশেদকে আটকানোর চেষ্টা করলো।তবে জামশেদ ঠিক করেই নিয়েছে যে জাহিরকে মে/রেই ছাড়বো।

এদিকে এত গন্ডগোলের আওয়াজ পেয়ে জবা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।জামশেদকে জহিরের ঘরের দিকে আসতে দেখে নিজেও পিছন পিছনে এলো।এভাবে অতর্কিত আক্রমণে সে নিজেও বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।মতিউর যে লোক দুটোকে রেখে গিয়েছিল তাদেরকেও পেল না।একটু আগে জবার থেকে অনুমতি নিয়েই তারা কোথায় যেন গিয়েছে।জবা বুঝলো ওকেই এখন কিছু করতে হবে।রাগান্বিত গলায় জামশেদ কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“এসব কোন ধরনের অমানুষের মতন আচরণ ভাইজান?মা/রছেন কেন জহির ভাই কে?”

জামশেদ সাবধানী গলায় বলল,

“একদম এসবের মাঝে নাক গলাবি না তুই জবা।বিয়ে হয়ে গেছে তোর সংসারে গিয়ে এসব মাতব্বরি করিস। মেয়ে মানুষের এত বাড়াবাড়ি আমার সহ্য হয় না।”

“একদম আমার সাথে গলা উঁচু করে কথা বলবেন না।আমিও কিন্তু আপনার এসব বাড়াবাড়ি আর সহ্য করব না।খবরদার আপনি জহির ভাইয়ের গায়ে হাত তুলবেন না।”

“ওকে আজ আমার হাত থেকে কে বাঁচায় আমিও সেটাই দেখব।দেখি তুই আর তোর স্বামী কি করতে পারিস আমার।”

এক পাশে বেশ কিছু গাছের ডাল বোঝাই করে রাখা আছে।কয়েকদিন আগে উঠোনের একটা গাছ কাটা হয়েছিল।সেখান থেকেই একটা মোটা ডাল হাতে তুলল জামশেদ।জবা আঁৎকে উঠলো।এদিকে জামশেদ এমনভাবে জাকিরকে ধাক্কা মে/রেছে ও নিজেও হাতে আঘাত পেয়েছে।মচকে গেছে বোধহয়।এগিয়ে গিয়ে জামশেদ কে আটকাবে সেই সামর্থ্য এখন সেও হারিয়েছে।জাফর এক পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ মজা দেখছে।সে কখনো প্রত্যক্ষভাবে এসব ঝামেলার মাঝে জড়ায় না।সব সময় জামশেদ কে উসকে দেয়।জামশেদ এগিয়ে গেল জহির কে মা/রার উদ্দেশ্যে।মা/রার জন্য উদ্যত হলোও তবে তৎক্ষণাৎ সুজন এসে ওকে থামালো।রাতে জহিরের সাথে ছিল।সকালে নদীর পারে হাটতে বেরিয়ে চেঁচামেচি শুনে এসে দেখে এই অবস্থা।

জামশেদ সুজনের পানে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,

“ছাড় আমায় সুজন।নিজের চাকরি বাঁচাতে চাইলে আমায় বাঁধা দিবি না।”

“মারছেন কেন?ওর অপরাধ কি আগে সেটা বলুন?কি ভেবেছেন সব সময় নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে পার পেয়ে যাবেন?দুর্বল পেয়েছেন জন্য অত্যাচার চালাচ্ছেন?কই মতিউর সাহেবের সামনে তো আপনার এই কথাগুলো খাটে না।ওনার সামনে তো ক্ষমতা দেখাতে আসেন না।”

জামশেদ ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“এক ফকিন্নির বাচ্চা এসেছে আরেক ফকিন্নির বাচ্চার হয়ে ওকালতি করতে।আবারো বলছি সুজন সামনে থেকে সর,আমাকে বাঁধা দেস না।তোর কপালেও কিন্তু দুঃখ আছে।”

সুজন আজকে থামলোনা,ভয়ও করলো না।সময় বদলে গেছে,এখন আর ওর হারানোর কিছু নেই।আগে জামশেদের কথা,অপমানের কোন উত্তর দিতো না কেননা জবা কে হারানোর ভয় করত।কিন্তু এখন তো সব হারিয়েই ফেলেছে।নতুন করে হারানোর কিছু নেই তাই ভয় করারও কোন কারণ নেই।সুজন নির্ভয়ে বলল,

“আমিও দেখতে চাই আপনি কি করতে পারেন আজকে।জুঁই কে কথা দিয়েছি আমি যতটুকু পারি ওকে সাহায্য করবো।ওর অবর্তমানে জহিরকে কি করে আপনি আঘাত করতে পারেন আমিও সেটা দেখতে চাই।”

“তাহলে তো মনে হচ্ছে আগে তোকেই সরাতে হবে।খুব সাহায্যর ইচ্ছে না।আহ্।”

তীব্র ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো জামশেদ।সম্মুখে তাকিয়ে দেখল সুজন বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে জামশেদের ঠিক পিছনে তাকিয়ে আছে।সুজনের সেই দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছনে তাকিয়ে দেখলো জবার হাতেও একটা বেশ শক্ত মোটা ডাল যেটা দিয়েই জামশেদের ঠিক পিঠ বরাবর নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে মে/রেছে।জামশেদের র/ক্তচক্ষু দেখতেই জবার হাত থেকে সেটা পড়ে গেল।সে নিজেও জানে না কি করে এই কাজটা করলো।জবা তো এত সাহসী কখনো ছিল না,তাও আবার নিজের বড় ভাইয়ের গায়ে এভাবে হাত তুলল।তবে জামশেদ এবারে আর নিজের বোন মানলো না। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।নিজের সম্মুখে সবাইকে ঘোর শত্রু মনে হচ্ছে।জবার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে মার খাওয়ার পরেও জামশেদের মাঝে তেমন কোন প্রভাব পড়েনি।

“খুব সাহস বেড়েছে তোর তাই না?কার এত গরম দেখাস?মতিউরের?কই এখন তো নেই।এখন তোকে কে বাঁচাবে?তোদের একটাকেও সহ্য হয় না।অনেক দিন থেকে সবকটাকে শেষ করার ইচ্ছে।তোদের সবগুলোর খুব বার বেরেছে।বিশ্বাস কর আজ তোরা আমার মাথা প্রচন্ড গরম করলি।আমার গায়ে হাত তোলার সাহস হয় কি করে তোর?”

জবা সত্যিই ভয় পেল।ভয় হয়তো পেতো না যদি মতিউর থাকতো।কিন্তু মতিউর এখন নেই,আসার কোন সম্ভাবনাও নেই।

এদিকে ছেলেমেয়েদের মাঝে এমন তুমুল বাকবিতণ্ডা দেখে আনোয়ারা ঘাবড়ে গেলেন।ছুটে ঘরে গেলেন নিজের স্বামীকে সবটা জানাতে।সেখানে গিয়ে তিনি আর এক বিপদে পড়লেন।জলিল তালুকদারের শরীর আবারও খারাপ করছে।গতকালের মতো আবারও সেই নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে।হাক ছেড়ে তিনি নিজের ছেলেমেয়েদেরকে ডাকলেন তবে কারো কানে তার কথা গেল না।এখন তিনি না পাচ্ছেন ছেলেমেয়েদের কাছে যেতে না পারছেন এখানে জলিল তালুকদারকে সামলাতে।

এদিকে জবার এখন কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে।এভাবে হয়তো নিজের বড় ভাইয়ের গায়ে হাত তোলাটা উচিত হয়নি।তবে কি করতো?ভয় পেয়ে গিয়েছিল ভেবেছিল যদি সুজন কে আঘাত করে।অপরাধী গলায় জামশেদকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই জামশেদ নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে জবার গালে সজোরে একটা চ/ড় বসালো।তাল সামলাতে না পেরে না পেরে জবা ছিটকে মাটির উপরে পড়ে গেল।সুজন জবা বলা আর্তনাদ করে উঠলো।জামশেদ এভাবে জবার উপরে সত্যিই আঘাত করবে সেটা ভাবতে পারেনি।আশেপাশে অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কেউ কিছু করছে না।মুক্তা বরাবরই চুপ থেকে এসেছে।নিজের স্বামীর অন্যায় দেখেও চুপ থেকে এসেছে শুধুমাত্র নিজের সংসার টা বাঁচানোর খাতিরে।আজকেও তাই করল।জাকিরের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা।তাও এসে জাকিরকে কোনমতে সামলানোর চেষ্টা করছে। জাকিরের হাতটাও ভীষণ ব্যথা করছে।আর জাফরের স্ত্রী জাফরের মতনই নিরব।এসব ঝামেলায় থাকতে সে কখনোই পছন্দ করে না।জামশেদের চ/ড়ের আঘাতে জবার ফর্সা গালটা লাল বর্ণ ধারণ করল।ব্যাপারটার ঘোর সুজনের এখনো কাটেনি।জামশেদ নিজের মাঝে নেই।একদম অমানুষে পরিণত হয়েছে যেন।হাতে থাকা লাঠিটা দিয়ে এবার জবা কে মা/রার জন্য উদ্যত হতেই জবা দুই হাতে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করে খিঁচে চোখ মুখ বন্ধ করে নিল।জবা খেয়াল করলো দুটো হাত ওকে জড়িয়ে নিয়েছে।একটু আঘাতও জবার গায়ে লাগলো না।এই ছোঁয়াটা জবা চেনে।এই গায়ের গন্ধটাও জবা চেনে।জবার কানে সুজনের আর্তনাদের শব্দ ভেসে এলো।চোখ মেলে তাকাতেই সুজনের মুখটা দেখতে পেলো যে জবা কে আঁকড়ে ধরে বসে নিজে আঘাত পেল।ব্যাথার তীব্রতায় সুজনের চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে গেল।জবা আর্তনাদ করে বলল,

“তুমি কেন সামনে আসতে গেলে?”

সুজন নিজের ব্যথাটুকু আড়াল করার চেষ্টা করে মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল,

“আমি থাকতে তোমায় এত কষ্ট কি করে পেতে দেই জবা?আজও তুমি আঘাত পেলে কষ্ট যে হয় আমার।আঘাত আমি পেয়েছি ঠিকই,কষ্টও হচ্ছে তবে তুমি আঘাত পেলে যতটা কষ্ট হতো তার থেকে কমই হচ্ছে।”

এদিকে জামশেদ বোধ হয় আজ ঠিক করেছেই যে কোন একটা বড় অঘটন ঘটিয়েই ছাড়বে।তবে আর কোনরূপ বাড়াবাড়ি করতে পারল না।পুনরায় মা/রার জন্য উদ্যত হতেই একটা বলিষ্ঠ হাত জামশেদকে আটকে দিল।উক্ত ব্যক্তিটা কে সেটা দেখার জন্য চোখ তুলে তাকাতেই মতিউরের হিংস্র রক্তলাল চোখ দুটো জামশেদের নজরে এলো।জামশেদ যতই বলুক না কেন মতিউরকে দেখে ভয় করেনা কিন্তু ইতোমধ্যে তার গলা শুকিয়ে গেছে।মতিউরের সাথে আরো বেশ কয়েকজন লোক লাঠি নিয়ে আছে।

জামশেদের হাতের বাঁধন হালকা হয়ে এলো।মতিউর লাঠিটা কেড়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“তোর সাহস হলো কি করে আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার?তোর অনেক বাড়াবাড়ি এতদিন আমি সহ্য করেছি,তোকে বারবার বলেছি নিজের সীমার মধ্যে থাকতে আর আজ আমার অনুপস্থিতিতে তুই আমার স্ত্রীর গায়ে হাত দিলি।আজ তোর বুক চিরে তোর কলিজা বের করে আমি ওজন করব।আমি দেখতে চাই তোর এই কলিজা কত বড় যে তুই আমার কলিজার দিকে হাত দিয়েছিস।”

জামশেদ ভয় পেল ঠিকই তবে মতিউরের সামনে এত তাড়াতাড়ি নিজের দুর্বলতার প্রকাশ করা যাবে না।

“কি করবি তুই?”

“যে হাত তুই আমার স্ত্রীর গায়ে তুলেছিস তোর সেই হাতই আমি রাখবো না।”

কথাটা বলে মতিউর হাতে থাকা মোটা ডালটা দিয়ে সজোরে জামশেদের পায়ে আঘাত করলো।এই ব্যথাটা সামলে উঠতে না উঠতেই মতিউর জামশেদের দ্বিতীয় পায়েও আঘাত করলো।ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লো এবারে জামশেদ।মুক্তা এখনও সেই একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।জামশেদ কে মা/রার জন্য মুক্তার যে কষ্ট হচ্ছে না হচ্ছে না সেই বিষয়টা ঠিক বোঝা গেল না।এদিকে সুজনের মাথায় আঘাত করেছে জামশেদ।জবা খেয়াল করলো ওর ঘাড় বেয়ে র/ক্ত গড়িয়ে পড়ছে।এতক্ষণ মতিউর কে লক্ষ্য করছিলো জন্য সুজনের যে মাথা ফে/টে গেছে সেদিকে খেয়াল করা হয়নি।

ঘাড়ের ওপরে হাত রাখতেই জবার হাতটা র/ক্তে লাল হয়ে উঠলো।চিৎকার করে উঠে বলল,

“সুজন তোমার মাথা ফে/টে গেছে।”

“আমার কিছু হয়নি জবা,তুমি জহিরকে দেখো।আমার থেকে ও বেশি অসুস্থ।”

জবা এবার মতিউর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মতিউর,সুজনের মাথা ফে/টে গেছে।ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”

মতিউর তখন জামশেদকে মাটির উপর উপুড় করে ফেলে জামশেদের পিঠের উপরে এক হাঁটু গেড়ে বসে যে হাতটা দিয়ে জবা কে চ/ড় মে/রেছিল সে হাতটা পেছনে মুঁচড়ে ধরেছে।জামশেদ ব্যথায় আর্তনাদ করছে কিন্তু মতিউরের মাঝে কোন বিশেষ হেলদোল দেখা গেল না।বরং মজাই পাচ্ছে যেন মতিউর।জামশেদ যত চিৎকার করছে মতিউর ততই শক্ত করে হাতটা মুঁচড়ে ধরছে।
জবার কণ্ঠে সেদিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি সুজনকে নিয়ে হাসপাতালে যাও জবা।আমি ওদেরকে বলে দিচ্ছি।”

সুজন আপত্তি জানিয়ে বলল,

“জবা কে যেতে হবে না আমি চলে যাচ্ছি।আপনি জহির কে দেখুন।ও আঘাত পেয়েছে।”

“তোমাদের দুজনকেই হাসপাতালে যেতে হবে সুজন মিয়া।আর একা একা দুটো অসুস্থ মানুষকে শুধু আমার এই লোকদের ভরসায় ছাড়া ঠিক হবে না।জবা যাক তোমার সাথে।”

“বললাম তো প্রয়োজন নেই।জবা তুমি থাকো।আমি মতিউর সাহেবের লোকজনদের সাথে জহিরকে নিয়ে যাচ্ছি।”

জবা সুজনের কথাতেই সায় জানালো।কেননা মতিউর এখন যে পরিমাণ রেগে আছে ওকে সামলানোর জন্য হলেও জবাকে প্রয়োজন।জবা দৌড়ে ঘরে গিয়ে একটা গামছা এনে সুজনের মাথায় বেঁধে দিল।ঘাড় বেয়ে যে র/ক্তটুকু পড়েছিল সেটুকু শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দিল। কপালের ঘামটকুও সযত্নে মুছে দিল।

“চিন্তা করো না কেমন।কিছু হবে না তোমার।”

সুজন আলতো হাসলা।সুজন আর জহির চলে যাওয়ার সাথে সাথে জবা মতিউরের দিকে এগিয়ে গেল।জামশেদের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,

“কি করছেন ছাড়ুন।ম/রে যাবে তো।”

“তো তোমার কি মনে ওকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমি এভাবে ধরেছি?ওকে না মে/রে আমি আজ উঠবো না।”

“আপনি খু/নি না মতিউর,ছাড়ুন।”

জামশেদ অনুরোধের গলায় জবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“জবা ক্ষমা করে দে আমায়।আর ওকে উঠতে বল,আমায় ছাড়তে বল।আমার হাতটা মনে হয় ভেঙ্গে গেল।”

মতিউর আরেকটু হাতটা মোচড় দিয়ে ধরে দাঁত পিষে বলল,

“খুব ক্ষমতা দেখাচ্ছিলি এই হাতের।এই হাত দিয়ে আমার জবার গায়ে হাত তুলেছিলি না?তোর এই হাত তো আজ আমি কে/টে ফেলবো রে।”

“ভুল হয়ে গেছে মতিউর।আর কখনো এমন হবে না কথা দিচ্ছি।এবারের মতন ক্ষমা করে দাও।”

“তোর সব অপরাধ ক্ষমা করে দিতাম যদি না তুই শুধু জবার গায়ে হাত তুলতি।এই অপরাধের কোন ক্ষমা নেই।”

জবা বুঝলো মতিউর রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।অনেক কষ্টে,অনেক অনুরোধের পর মতিউরের থেকে জামশেদ কে ছাড়াতে সক্ষম হলো।এতক্ষণে জাফর এগিয়ে এলো জামশেদের কাছে।চিন্তিত গলায় বলল,

“ভাইজান ঠিক আছেন আপনি?আপনার হাত মনে হয় ভেঙ্গে গেছে।”

“আমারও তাই মনে হচ্ছে।আমি হাত নাড়াতে পারছি না।হাসপাতালে নিয়ে চল।”

“হ্যাঁ চলুন।”

জাফর অনেক কষ্টে জামশেদকে তুলে যেতে নিলে পিছন থেকে মতিউর জাফর কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওই সম্বন্ধি,তোমারও কিন্তু এক হাত ভাঙ্গা বাকি আছে।ওকে নিয়ে ফিরে এসো তারপর আবার তোমায় হাসপাতালে পাঠাবো।তোমাদের দুটোই খুব বার বেড়েছে।”

জাফর আর সেখানে দাঁড়ালো না।তাড়াহুড়ো করে বাইরে গিয়ে একটা গরুর গাড়ি দাঁড় করিয়ে জামশেদকে নিয়ে গেল।জামশেদের সাথে মুক্তাও গেল।

“এভাবে মা/রলেন কেন ভাইজানকে?”

“তার আগে তুমি বলো তুমি সুজনের সাথে গেলে না কেন?ওকে একা ছাড়াটা ঠিক হলো না।ওর এখন তোমার প্রয়োজন ছিল।”

“প্রয়োজন তো এখন আপনারও আমার আছে।সুজন নিজেকে সামলে নেবে।”

“তা আমিও নিজেকে সামলে নিতাম।”

“সেটা তো দেখতেই পারছি।”

মতিউরের কানে এবার জুঁইয়ের চেঁচানোর শব্দ এলো কিন্তু শব্দ টা কোথায় থেকে আসছে বুঝতে পারছে না। প্রশ্নাতক গলার জবা কে জিজ্ঞেস করলো,

“জুঁই কোথায়?”

“ওকে ঘরের ভেতরে আটকে বাইরে তালা দিয়ে চাবি নিজের কাছে রেখেছিল বড় ভাইজান।”

“শালা জামশেদ!”

মতিউর জুঁইয়ের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।ওর পিছু পিছু জবাও গেল।বেশ অনেকক্ষণের প্রচেষ্টায় তালাটা ভাঙলো।

“দুলাভাই কি হয়েছে?আমার ঘরে তালা দেওয়া কেন?আপা কি হয়েছে?”

“তোমার বড় ভাইকে পা/গলা কু/ত্তায় কা/মড় দিয়েছিলো।আর সেই কু/ত্তার কা/মড় খেয়ে সুজন আর জহির কে তাড়া করেছিল,কা/মড়েও দিয়েছ অবশ্য।আমার বউটা আটকাতে গিয়েছিল বলে ওকেও কা/মড় দিয়েছে।শা/লা কু/ত্তা কোথাকার।”

মতিউরের কথাটা জুঁইয়ের ঠিক বোধগম্য হলো না।পুনরায় বলল,

“বুঝলাম না আপনার কথাটা।”

মতিউর একে একে সবকিছু জুঁই কে বলল।বাইরে থেকে দরজা বন্ধ দেখে আন্দাজ করেছিল যে কিছু একটা হয়েছে তাই বলে যে এত কিছু হয়ে যাবে সেটা ভাবতে পারেনি।চিন্তিত গলায় বলল,

“ওরা দুজন এখন কেমন আছে?”

“হাসপাতালে নিয়ে গেছে।কেমন আছে জানিনা আমি এখন যাব।”

“আপনি ঠিক আছেন তো?”

মতিউর গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“আমার কি হবে?তোমার ভাইয়ের আমার গায়ে হাত তোলার ক্ষমতা নেই।”

জুঁই আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই জবার কণ্ঠস্বর ভেসে গেল ওদের কানে।মতিউর পাশে তাকিয়ে দেখলো জবা নেই।এতক্ষণ তো এখানেই ছিল।পরে বুঝলো ডাকটা জলিল তালুকদারের ঘর থেকে আসছে।কোনোরকম সময় ব্যয় না করে দুজনেই গেল।জলিল তালুকদারের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিলো।তবে এখন আগের থেকে একটু ভালো আছেন।মতিউরকে দেখতে পেয়ে তিনি আরেকটু নিশ্চিন্ত হলেন।

“সব ঠিক আছে তো বাবা?”

মতিউর আশ্বস্ত করে বলল,

“সব ঠিক আছে আপনি চিন্তা করবেন না।এত চিন্তা করলে আপনার শরীর খারাপ করবে।”

“চিন্তা করো না।আমার এতসব অশান্তি থেকে এত তাড়াতাড়ি রেহাই নেই সেটা আমি বুঝে গিয়েছে।জীবনে কম অন্যায় করিনি,কম অবিচার করিনি।শেষ বয়সে এসে নিজের ছেলেদের এমন অমানুষি আচরণ না দেখেই ম/রব নাকি আমি?না এমনটা হবে না।খোদা আমাকে আগে আমার কৃতকর্মের শাস্তি দেবেন তারপরে নিয়ে যাবেন।”

চলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here