প্রেমের ঘাটের মাঝি #পর্ব ২০ #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
135

#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ২০
#লেখনিতে খুশবু আকতার

দিনের আলো ফুরিয়ে তখন ধরণীতে রাতের অন্ধকার নেমেছে।রাতে জামশেদ সকলের মুখোমুখি হলো।হাতে ব্যান্ডেজ করতে হয়েছে।মতিউর হাতের অবস্থা বেশ খারাপ করেই ছেড়েছে।সকালে মতিউরের জন্য তার চোখে মুখে যে উপচে পড়া ভয়ে ছিল জুঁইকে দেখে সে ভয়ের বিন্দুমাত্র দেখা গেল না।বরং হিংস্রতা ফুটে উঠল।

“আজ শুধু মাত্র তোর জন্য আমার এত অপমান সহ্য করতে হলো।তোদের একটাকেও ছাড়বো না।মতিউর কতদিন তোদেরকে বাঁচায় আমি সেটাই দেখব।”

জুঁই তাচ্ছিল্য গলায় বলল,

“আগে নিজে তো ঠিকঠাক থাকো তারপর না হয় আমাদের মারার পরিকল্পনা করো।তোমার ভাগ্য ভালো ছিল যে সকালে আপা ছিল ওখানে,আমি ছিলাম না।জবার জায়গায় যদি জুঁই থাকত না তবে এখন তুমি আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলার মতন অবস্থাতেই থাকতে না।”

“একদম মুখে মুখে তর্ক………”

জামশেদকে নিজের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে জুঁই পুনরায় বলে উঠলো,

“তুমি কিন্তু আবার বেশি কথা বলছো।আর যদি একটু বাড়াবাড়ি করেছো আমি কিন্তু আবার দুলাভাইকে ডাকবো।আর এখন বোধহয় দুলাভাইকে লাগবে না।তোমার তো এক হাত অচল হয়ে গেছে,আমিই বোধহয় সামলে নিতে পারব।”

কথাটা বলে জুঁই সেখান থেকে চলে গেলে। জাফরের গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে আসতে একটু দেরি হলো।যদিও জামশেদ আর জুঁইয়ের কথাবার্তা জাফরের কানে গেছে।বলা চলে ইচ্ছে করে একটু দেরিতে এলো যেন জুঁইয়ের মুখোমুখি না পড়তে হয়।ওই যে সে বরাবর এসব ঝামেলা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায়।

“ভাইজান চলো।”

“ওই মেয়ের সাহস দেখেছিস?সাপের পাঁচ পা দেখেছে!”

“তুমি চুপ করো তো।তুমি আসলে ভীষণ বোকা।ও জহিরকে বিয়ে করতে চাইছে করতে দাও না।আমাদেরই তো ভালো।”

জাফরের কথাটা জামশেদের ঠিক বোধগম্য হলো না।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কিভাবে তুই আমাদের ভালো ভাবলি?কি করে ওই ভিখিরিকে আমি এই বাড়ির জামাই হিসেবে মেনে নেব?”

“আরে ভিখিরি জামাই হলো না বড়লোক জামাই হলো তাতে আমাদের কি?দেখো যে করেই হোক আমাদের দুজনের জবা আর জুঁইয়ের অংশ সম্পত্তিটুকুও চাই।এখন যদি জুঁইয়ের জহিরের সাথে বিয়ে হয় তাহলে কি জহির আমাদের সামনে টিকতে পারবে?সাহসই হবেনা সম্পত্তির দাবি করার।আর এতসব ঝামেলার মাঝে জুঁইয়ের নামে সম্পত্তিগুলো লিখে দেওয়ার ব্যবস্থাই করা হয়ে উঠবে না।তাহলে কি আমাদেরই লাভ না?”

“তাই বলে ওকে মেনে নেব?তাহলে তো মতিউরের কাছে হার মানা হয়ে গেল।”

“হার না মেনে কি কোনো উপায় আছে? তোমার কি মনে হয় যে আমরা মতিউরের সাথে জিততে পারবো?আর মাঝে মাঝে বড় জয়ের জন্য ছোট ছোট হার মেনে নিতে হয়।সালিশে তুমি কিছু বলবে না,আব্বা যা বলে সেসব মেনে নেবে।ওনার মেয়ে যার সাথে ইচ্ছে বিয়ে দেক,তাতে আমাদের কি?”

জাফরের কথায় যুক্তি খুঁজে পেলে জামশেদ। তবে মতিউরের কাছে হারার তার ইচ্ছে ছিলনা।অবশ্য সকালে যেভাবে নিজের প্রাণ ভিক্ষে চেয়েছিল তাতে আর হারা বাকি কি আছে?সম্মানের তো কিছু বাকি নেই।সারা গ্রাম শুদ্ধ মানুষ এতক্ষণে নিশ্চয়ই জেনে গেছে মাতব্বরের বড় ছেলে তার বাড়ির জামাইয়ের হাতে মার খেয়েছে।একদম মাটিতে ফেলে রেখে পিটিয়েছে।

______
সারা জীবন যে গ্রামের অন্যান্য মানুষদের বিচার করে এসেছে আজ তার নিজের ঘরে বিচারসভা বসেছে।তবে আজ বাইরে থেকে আর কোন লোক ডাকার প্রয়োজন হয়নি।উঠোনে একটা চেয়ারে জলিল তালুকদার কে বসানো হলো।তার সামনে আরো বেশ কয়েকটা চেয়ারে অন্যান্য সদস্যের বসার ব্যবস্থা।গ্রামের বেশ অনেকে উকিঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল তবে একেবারে সরাসরি এসে ঘটনা শোনার কিংবা দেখার সাহস তাদের নেই।

জলিল তালুকদার গম্ভীর গলায় জামশেদ এর উদ্দেশ্য করে বললেন,

“তোমার সাহস হলো কি করে আমার মেয়ের গায়ে হাত তোলার?কে দিয়েছে তোমায় এই অধিকার?আজ অব্দি আমিই কখনো আমার মেয়েদের গায়ে হাত তুলিনি,সেখানে তুমি এই সাহস পেলে কোথায়?”

জামশেদ কোন উত্তর দিলো না।ওকে চুপ করে থাকতে দেখে মতিউরের রাগ আরও বেড়ে গেল।রাগি গলায় জলিল তালুকদারকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওর সাহস হলো কি করে আমার স্ত্রী র গায়ে হাত তোলার?আমি এর জবাব চাই।”

“তুমি একটু শান্ত বাবা।আমি ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে তোমার অসম্মানের জন্য।”

“আপনাকে ক্ষমা চাইতে হবে না আব্বা।ভুল তো করেছে জামশেদ।”

জামশেদের ইচ্ছে তো করছে মতিউরের গলাটা টিপে দিতে যেন ওই মুখ দিয়ে আর কোন কথাই না বের হয়।কিন্তু সে নিরুপায়। জাফর হাজার বার করে বুঝিয়ে নিয়ে এসেছে যেন কোন তেরাবেকা কথা না বলে,না হলে পরিস্থিতি আরো বিগড়ে যাবে।সম্পত্তি এখনো তাদের হাতে আসেনি,এখনই জলিল তালুকদারকে চটানো ঠিক হবে না।
জামশেদ নিজের কন্ঠস্বর শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলল,

“আমি আমি জানি আমি ভুল করেছি আব্বা।আমি ক্ষমা চাইছি,আর কথা দিচ্ছি এমন কখনো হবে না।”

মতিউর পুনরায় রাগান্বিত কন্ঠে জামশেদ উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোর ক্ষমার গুষ্টি কিলাই আমি।তুই কি কথা দিবি যে এমন আর কখনো হবে না?যদি আর কখনো হয়েছে তাহলে তুই বাঁচবি নাকি?আজ ক্ষমা করে দিয়েছি জন্য আবারও ক্ষমা করে দেবো এটা ভাবিস না।”

জাফরের এবার একটু মতিউরকে কিছু বলার ইচ্ছে হলো।বড্ড বার বেড়েছে মতিউরের।তাই বলে এত প্রভাব সহ্য করা যায় না।ওদের বাড়িতে এসে ওদের কেই অপমান করে যাবে।

“তোমার কি মনে হয় না মতিউর যে তুমি একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছ?ভাইজান কিন্তু সম্পর্কে আর বয়সে তোমার থেকে বড়।তুমি এ বাড়ির জামাই হয়ে বাড়ির বিষয়গুলোতে একটু বেশি নাক গলাচ্ছো না?”

“নাক আছে তাই গলাচ্ছি।তাতে তোর কি?আর হঠাৎ করে তুই মুখ খুললি কেন?খুব ভাইজানের জন্য দরদ উঠলে পড়ছে না? সকালে যখন মার খাচ্ছিল তখন তো এক কোণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলি মূর্তির মত।আর একদম বেশি কথা বলবি না, জামশেদের কি অবস্থা করেছি দেখিস নি? তোরও কিন্তু এক হাত ভাঙবো।”

জাফর ভীষণ অপমানিত বোধ করল।বয়সে না হোক সম্পর্কে তো তার থেকে বড় হয়। এভাবে ভরা সভাশ সবার মাঝে তুই তুকারি করে এভাবে গালাগালি করছে ব্যাপারটা হজম করতে পারল না।অনেক আশা নিয়ে জলিল তালুকদারের দিকে তাকালো তবে তিনিও কিছু বললেন না।মাথা নিচু করে বসে আছেন।জাফর আশা ছেড়ে দিল।বুঝল আজ পরিস্থিতি তাদের একদম অনুকূলে নেই।মতিউর পুনরায় জলিল তালুকদারকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“শুধু যে জবা কে মেরেছে এমনটা না আব্বা। সুজনের কি অবস্থা করেছে দেখেছেন?আমি ঠিক সময়ে এসে না পৌঁছালে তো মেরেই ফেলত।আপনি একটা খুনির জন্ম দিয়েছেন আম্মা বলতেই হচ্ছে।ক্ষমা করবেন আমায় আপনার খারাপ লাগবে জানি তবে আমি বলতে বাধ্য হলাম।”

আনোয়ারা তাচ্ছিল্য গলায় বললেন,

“আমি খালি জন্মই দিছি আব্বা আর কিছু করতে পারি নাই।এই বাড়িতে আমার কোন দাম আছে নাকি?যার দাম দেওনের কথা সেই দাম দেয় নাই আর কার থেকে কি আশা রাখুম?ছোটবেলা থেকে আমার পোলারা দেইখা আইছে তাগরে আব্বা আম্মারে দাম দেয় না।তারাও তাই শিখছে।আম্মা কেডা? আম্মার কথা শুনতে হইব ক্যান?”

“কথা শুনবে না মানে,ঠ্যাং ভেঙে বাড়িতে বসিয়ে রাখতেন।”

“সেই ক্ষমতা কি আমার আসছিল নাকি?নিজের পোলা মাইয়ারে কখনো শাসন করার অধিকার পাই নাই।তারা হইলো তালুকদার বংশের ছাওয়াল,তাগরে যা ইচ্ছে হয় তাই করে।শাসনের বেলায় মায়ের কোন দাম নাই অথচ যখনই বিগড়ে যাইবো তখন সবাই কইবো মায়ে শিক্ষা দিবার পায়নাই,নাড়িই খারাপ।”

মতিউর দমে গেল।বুঝলো আনোয়ারা কে কিছু বলেই কোন লাভ হবে না।এই সংসারে আনোয়ারার কোন প্রভাবই নেই।তিনি আছেন সেটা সবাই জানে তবে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা গুলোতে সেটা অনুভব হতে দেন না।

জলিল তালুকদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আমার শরীর ভালো না,এত কথা এত দুশ্চিন্তা আমি নিতে পারি না।জুঁইয়ের বিয়ে আমি ঠিক করেছি যার ভালো লাগবে বিয়েতে থাকবে যার ভালো লাগবে না এই বিয়েতে থাকবেনা।আমি উঠছি।”

জলিল তালুকদার উঠে যেতে উদ্যত হলে সুজন বাঁধা দিলো।একটু সময় চেয়ে নিলো কিছু কথা বলার জন্য।জলিল তালুকদার মানা করলেন না।তবে সুজন কিছু বলার আগে জামশেদ বলে উঠলো,

“আব্বা তার আগে আমার আপনাকে কিছু দরকারি কথা বলার আছে।সুজনের সাথে আপনাদের সবার সম্পর্কটা আমার সূত্র ধরে। ওর এ বাড়িতে আসাটাও আমার সুত্র ধরেই। আমি আর চাই না তাই ও আমাদের ব্যবসার কোন কাজে থাকুক।ওকে এই মুহূর্তে আমি চাকরি থেকে বের করে দিলাম।”

সুজন ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“আপনি কি আমাকে চাকরি থেকে বের করবেন?আমিই আপনার চাকরি আর করব না।সেটা বলার জন্যই মাতব্বর সাহেব কে একটু থামতে বলেছিলাম।এমন অমানুষের সাথে কাজ করার আমার বিন্দুমাত্র কোন ইচ্ছে নেই।এতে যদি না খেয়ে মরতে হয় তাও ভালো।”

পাশেই মুক্তা দাঁড়িয়ে ছিল।জামশেদের কথাটা শুনে তার কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখা গিয়েছিল।এই চাকরিটা তো সুজনের দরকার না হলে বাড়িতে মা,বাবা,বোন তো না খেয়ে মারা যাবে।ভেবেছিলো জামশেদ যাই বলুক না কেন পরে হাত পা ধরে হলেও রাজি করিয়ে নেবে।দরকার হলে দু-চারটা মা/রও হয়ে খেয়ে নেবে।কিন্তু সুজন কেন এই কথাটা বলল?

“তোর কি মাথা খারাপ হইয়া গেছে?কি কস এইসব?উনি তোর গুরুজন হয়,বয়সে বড়। রাগের মাথায় দুই একটা কথা কইতেই পারে।মাফ চা ওনার কাছে।”

“আর কত স্বার্থপর হবে বুবু?এই মানুষটার সাথে নিজের সংসার বাঁচানোর জন্য আর কতটা নিচে নামবে?নিজের আত্মসম্মানবোধ তো রাখইনি।এখন আমি যখন আমার সম্মানটুকু বাঁচিয়ে চলে যেতে চাইছে আমাকে কেন আটকাচ্ছো?”

“আমারে তোর স্বার্থপর মনে হয়?”

“না মনে হওয়ার কি একটা কারণ আছে?সকালে তোমার স্বামী অন্যায় ভাবে জহিরের গায়ে হাত তুললো,জবার গায়ে হাত তুললো, তোমার ভাইকে রক্তাক্ত করল অথচ তোমার মুখ দিয়ে একটা কথা বের হলো না।একবার তুমি মানুষটাকে আটকানোর চেষ্টা করেছিলে?তুমি হাসপাতালে তোমার স্বামীর সাথে ছুটে গেলে অথচ তোমার ভাই রক্তাক্ত হয়ে একাই হাসপাতালে গেল।তুমি একবারও এগিয়ে গেলে না।আমি হাসপাতাল থেকে ফেরার পর একবারও খোঁজ নাওনি আমার। এসব তুমি কেন করছ আমি বুঝি না?নিজের সংসার বাঁচানোর জন্য আমার আর জবার ব্যাপারটা মতিউর সাহেবের থেকে আড়াল করেছো।তুমি শুধুমাত্র তোমার সংসার বাঁচানোর জন্য তোমার স্বামীর সব অন্যায় সহ্য করে গেছো।তুমি কারো পরোয়া করো নি, কারো ভালো থাকা খারাপ থাকাতে তোমার কিচ্ছু যায় আসে না।হোক সেটা তোমার নিজের ভাই।এতগুলো বছর এখানে চাকরি করছি,এত অপমানের পরও তুমি কখনো মুখ খোলো নি তোমার সংসার বাঁচানোর জন্য। আমার বাবা মা এ বাড়ি থেকে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে গেছে তাও তুমি কিছু বলোনি তোমার সংসার বাঁচানোর জন্য।তোমার ছোট বোন যাকে নাকি তুমি প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসো সে এসে একদিনও তোমার বাড়িতে থাকতে পারেনি,তাও তুমি কিছু বলোনি শুধুমাত্র তোমার সংসার বাঁচানোর জন্য।এত কিছুর পরেও তুমি বলবে তুমি স্বার্থপর না?তুমি স্বার্থপর বুবু,তুমি ভীষণ স্বার্থপর।”

মুক্তা ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,

“তো কি করতাম?দুইটা বাচ্চা লইয়া আবার বাপের বাড়ি যাইয়া তোর ঘাড়ের উপরে বসতাম?তুই খাওয়াইতি ক্যামনে?চারডা পেট চালাইতে পারিস না তার উপরে আরো তিনটা যায়ে গাইড়া বসতাম ঐ অভাবের সংসারে?শোন সুজন,আমি স্বার্থপর এমনি এমনি হই নাই।আমি স্বার্থপর হইছি জন্য তোর কোন সমস্যা হয় নাই,আমি স্বার্থপর জন্যই এতদিন তুই এই বাড়িতে কাজ করতে পারছস।যেদিন আমি মুখ খুলতাম সেদিনই তোর চাকরি যাইতো।তুই কি খাওয়াইতি?”

সুজন আরো কিছু হয়তো বলতে যাবে তবে জবা থামতে বলল সুজনকে।

“বাদ দাও ওসব কথা সুজন।ভাবির দিকটাও বোঝার চেষ্টা করো।আমার ভাইয়ের মতন একটা মানুষের সাথে এতগুলো বছর চুপচাপ মুখ বুঝে সংসার করা যার তার কথা না। কতটা নিরুপায় হলে একটা মানুষ এই সংসার করতে পারে সেটা একটু ভেবে দেখো।”

“তো আমার কথাটা একবার ভাবো না জবা। আমি কতটা নিরুপায় হলে এই কথাগুলো বলি।বুবুকে আমি সব স্বার্থপরতার জন্য ক্ষমা করে দিতাম যদি শুধু আমার আর তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করতো।আরে সময় মতো কথাটা বলে দিলে আজ আমি তোমায় পেয়ে গেলেও যেতে পারতাম।আরে তোমাকে অন্য কারো সাথে দেখার কষ্ট কেউ আন্দাজ করতেও পারবেনা জবা?তোমাকে হারানোর কষ্ট কতটা তীব্র সেটা কেউ বুঝবে না।আমি আমার এই কষ্ট গুলো কাকে দেখাবো? আমার জীবনে তো কেউ রইল না,তুমিও নেই।”

মতিউর মাথা নিচু করে বসে আছে।জবা একবার আড় চোখে মতিউরের দিকে তাকালো।মানুষটা এই মুহূর্তগুলো তে কেন চুপ করে থাকে জবা তা বুঝতে পারেনা।অবশ্য করবেই বা কি?এখন যদি সুজনের সাথে খারাপ ব্যবহার করে তবে তো জবারই খারাপ লাগবে।মতিউরের প্রতি যে শ্রদ্ধা টুকু জন্মেছে সেটা হয়তো হারিয়ে যাবে,যে অল্প একটু ভালোবাসা জন্মেছে হয়তো সেটাও থাকবে না।

“যা হওয়ার ছিল না সেটা হয়নি সুজন,ভুলে যাও।যদি আমার আর তোমার এক হওয়ার থাকতো তবে এমনিতেই হয়ে যেতাম।কারো স্বার্থপরতায় কিছু শেষ হতো না।”

“কিন্তু কারো স্বার্থপরতার জন্য আমি শেষ হয়ে গেলাম জবা।আমার অস্তিত্বই যেন এই দুনিয়া থেকে কেউ মুছে দিয়েছে।আমি নিঃশ্বাস নিলে এখন আর অনুভব করতে পারিনা,কোন কষ্ট আমায় কাঁদাতে পারে না, কোন সুখ আমায় হাসতে পারে না।তোমায় হারিয়েছি তো বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাও হারিয়েছি।তুমি গেলে তো গেলে আমার সুখ, দুঃখ,বেঁচে থাকার ইচ্ছে সব নিজের সাথে নিয়ে গেলে।সবাই সবকিছু পেলো শুধু আমি কিছু পেলাম না জবা।আজ তুমিও ধীরে ধীরে মতিউর সাহেবকে আপন করে নিচ্ছো,দুদিন পর হয়তো ভালোবেসেও ফেলবে,আমায় ভুলে যাবে।কিন্তু আমায় দেখো আমি ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি।আজও তোমার স্মৃতি আকড়ে বেঁচে আছি।আমার কিচ্ছু রইলো না।না সুখ,না তুমি।”

কথাটা বলে সুজন সেখান থেকে চলে গেলো। মতিউর আড় চোখে একবার জবার দিকে তাকিয়ে ওর চোখে অশ্রু দেখতে পেল।সে চোখের জল মতিউরের ভেতরটা নাড়িয়ে তুলল।অযাচিত কিছু প্রশ্ন মস্তিষ্কে হানা দিল।মতিউর নিজেও আর সেখানে বসে থাকতে পারলো না,ঘরে চলে গেল।একে একে যে যার মত নিজের ঘরে চলে গেলো।উঠোনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলে জবা আর জুঁই।জবা তখনো কাঁদছে।জুঁই এগিয়ে এসো জবার কাঁধে হাত রেখে বলল,

“দুলাভাই কষ্ট পেয়েছে আপা।জানি সুজন ভাইয়ের মুখ থেকে কথাগুলো শুনে তোমারও নিজেকে সামলানো খুব কষ্টকর হয়ে পড়ছে কিন্তু দুলাভাইয়ের কথাটা একবার ভাবো।একবার গিয়ে ওনাকে বোঝানোর চেষ্টা করো যে তুমি আর সুজন ভাইয়ের কাছে ফিরে যেতে চাও না।নাহলে মানুষটা কষ্ট পাবে,ভুল বুঝবে।এই সম্পর্কের মাঝে আর কোন ভুল বোঝাবুঝি আসতে দিও না।”

জুঁইয়ের কথাটা জবার কাছে একদমই ঠিক লাগলো।সকাল থেকে মতিউর অযথা এক বিষয়ে রাগারাগি করছিল।আর সে রাগের পেছনে যে শুধুমাত্র জামশেদের বিষয়টা ছিল না সেটাও জবার আন্দাজে এসেছে।এখনো কিছু বলল না চুপচাপ উঠে চলে গেল।এবারে যেন সবটা জবা আন্দাজ করতে পারছে।জুঁইকে আশ্বস্ত করে ঘরে চলে গেল জবা।

_______
“সুজন ভাই!”

পরিচিত কণ্ঠস্বরে সুজন পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো নিতু দাঁড়িয়ে আছে।এই অসময়ে নিতুকে এখানে দেখে একটু চমকালো সুজন।প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“তুই এখন এখানে কেন?এই জায়গাটা তেমন ভালো না জানিস না?রাতের বেলা এসেছিস কেন?

“তোমার শরীর কেমন সেটা জানতে আইছিলাম?মাথা খুব ব্যথা করতাছে?”

“না,আমি ঠিক আছি।তুই ঘরে যা কেউ দেখলে আবার খারাপ ভাবতে পারে।”

নিতু আলতো হাসলো।সেই একই কথা।কেউ দেখলে খারাপ ভাবতে পারেজবা এখন এখানে এলেও কি সুজন একই কথাটা বলতো।কক্ষনোই না।বরং চাইতে যেন জবা একটু বেশি সময় থেকে যায়।নিতুই বা কেন সুজনের থেকে এসব আশা করছে।সুজন তো আর তাকে ভালোবাসে না।নিতুকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুজন পুনরায় বলে উঠল,

“কি হলো যা!যেতে বললাম তো আমি।”

“জবা আইলেও কি তুমি একই কথাটা কইতা? ওরে চলে যাইতে কইতা নাকি আমি জন্যই কইতাছো?”

সুজনের কাজের হাতটা থেমে গেল।নিতুর সাথে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে কথা বলতে সুজনের বেশ অস্বস্তি হয়।নিতু অন্যের স্ত্রী, কিছুদিন পর মাও হবে।এখন অন্তত নিতুর মুখ থেকে কথাগুলো সুজন আশা করেনি।

“তুই আর জবা কি এক আমার জীবনে?আমার জীবনে জবার কি জায়গা সেটা তুই জানিস না?বারবার তোকে বলেছি এই কথাগুলো বলবি না।জাকির ভাই ভালো মানুষ।অযথা ওনাকে কষ্ট দিস না।”

“সবাই শুধু অন্যের কথাই ভাবে।তুমি যে আমারে কষ্ট দাও এইটা বোঝনা?”

সুজন এবার মৃদু রাগী গলায় বলল,

“আমি এখন এসব কথা বলার মত কিংবা শোনার মতন পরিস্থিতিতে নেই।আজ সকাল থেকে কি কি ঘটেছে সে সবই তোর জানা।দয়া করে আমার মাথাটা আরো গরম করিস না।তুই জীবনে এগিয়ে গিয়েছিস,আমার জীবনে কখনোই তোর জায়গা ছিল না তাহলে এগুলো কেন বলিস বারবার?যা এখান থেকে,ভালো লাগছে না।দয়া করে আর এমন কিছু বলিস না যেন আমার মনে হয় তোকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই আমি জবাকে পাইনি।”

কথাটা সুজন হঠাৎ করেই বলে ফেললো। কখনো এমন কোন কথা তার মনে আসেনি,না বলতে চেয়েছিল।তবে বলার পর আজ কেন যেন মনে হলো এটাই কারণ নয়তো জবাকে হারানোর।নিতু ততক্ষণে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছে।সুজন একবার ওর নাম ধরে ডাকলে নিতু দাঁড়ালো।পিছন ফিরে তাকাতেই সুজন বলল,

“তুই কি কখনো আমায় কিংবা জবাকে অভিশাপ দিয়েছিলি নিতু?সত্যি করে বলবি?”

“ক্যান তোমার এমন মনে হইলো?”

“জানিনা।তোকে আমি কষ্ট দিয়েছি।আমার অজান্তে হোক তবুও কষ্ট দিয়েছি,আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও কষ্ট দিয়েছি।তোর চোখের জল কি তবে আমাদেরকে অভিশাপ দিয়েছিল?আমি তোকে তোর ভালোবাসা দেইনি জন্য কি তোর অভিশাপ আমাকে আমার ভালোবাসা পেতে দিল না নিতু?”

নিতু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,

“যারে ভালোবাসি তারে কখনো স্বপ্নেও অভিশাপ দেওয়া যায় না।আমি সজ্ঞানে হোক কিংবা স্বপ্নে হোক সব সময় তোমার ভালোই চাইছি সুজন ভাই।না তোমার উপরে কোন অভিযোগ ছিল না জবার উপরে।বিশ্বাস করো আমি মন থেকে চাইছি তুমি যান জবারে পাইয়া যাও।”

“তুইও অভিশাপ দেস নি তাহলে এমনটা কেন হলো?”

“ভাগ্যের মেলা জোর গো সুজন ভাই।তোমার ভাগ্যে জবা ছিল না।আমার ভাগ্যে তুমি ছিলা না।তার মানে এই না আমি তোমারে অভিশাপ দিছি।”

“আচ্ছা ঠিক আছে,যা আর আমার কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেস।আর হয়তো দেখা হবে না।”

“ক্যান দেখা হইব না?”

“চাকরি ছেড়ে দিয়েছি,চলে যাচ্ছি এ বাড়ি থেকে।হয়তো এই গ্রামে আর পাও রাখবো না। তাহলে দেখা হবে কি করে?”

“বুবুরেও দেখতে আইবানা?বোন হিসেবেও কি আমার কথা মনে পরবো না?খোঁজ নিতে আইবানা?”

“তোর নিজের ভাই আছে তো।চাচাতো ভাই না আসলেও চলবে।আর পারলে আমার বুবুরে একটু খেয়াল রাখিস।অনেক আজেবাজে কথা হয়তো রাগের মাথায় বলে ফেলেছি আর সামনে দাঁড়ানোর সাহস হবে না কখনো।আর বলিস সুজন ক্ষমা চেয়েছে।যা এখন।”

নিতু আর কথা বাড়ালো না।বাইরে পা রাখতে দেখলো ঘরের পাশে জাকির দাঁড়িয়ে আছে।নিতু আতকে উঠলো।কম্পিত গলায় বলল,

“আপনে এইখানে?”

নিতু আশা করেছিল জাকির নিশ্চয়ই রেগে যাবে।হয়তো বকা দেবে।তবে তেমন কিছুই হলো না।আলতো হেসে বলল,

“তোমায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না।অনেক রাত হয়েছে তো তাই চিন্তা হচ্ছিল জন্য খুঁজতে এসেছিলাম।বেশি কোথাও যেতে হয় নি। আন্দাজ করিয়েছিলাম যে তোমায় এখানেই পাবো।কথা শেষ?”

“হ।আপনি কিছু শুনছেন?”

জাকির শব্দ করে হেসে ওঠে বলল,

“তোমার বয়স টা অনেক কম তো সেজন্য তুমি এখনো অনেক বোকা।এমনিতে আমি সবই শুনেছি তবে যদি শুনে নাও থাকতাম তোমার এই প্রশ্ন শুনে কিন্তু সন্দেহ জাগতই যে তুমি কি বলতে এখানে এসেছিলে।বোকা মেয়ে এভাবে কেউ বলে?”

নিতু একটু লজ্জা পেলো।নিজের বোকামোর জন্য না,অন্য পুরুষের প্রতি নিজের ভালোবাসা স্বামী শুনে ফেলেছে জন্য লজ্জা পেলো।একটু ইতস্তত বোধ করল।জাকির তা বুঝলো।সেই জন্য এই নিয়ে আর কোন কথাই তুললো না।নিতুর হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,

“ঘরে চলো,রাত হয়েছে।বৃষ্টির কারণে রাস্তাটাও পিছলে হয়ে আছে পড়ে গেলে সমস্যা হবে।আমার হাতটা শক্ত করে ধরে থাকো কেমন?আমি তোমাকে পরতে দেব না।”

_________
জবা ঘরে এসে দেখলো মতিউর বিরতিহীন ভাবে এ পাশ থেকে ওপাশে শুধু পায়চারি করে যাচ্ছে।জবা চুপচাপ ভেতরে এসে আগে দরজাটা বন্ধ করে দিল।মতিউর জবাকে খেয়াল করেছে ঠিকই তবে জবাকে বুঝতে দিল না।

“এখনো রাগ কমেনি?”

এবারে মতিউরের খেয়াল না করে কোন উপায় নেই।মতিউর থামলো।চোখ পড়লো জবার ফর্সা মসৃণ গালের ওপর।জামশেদের হাতের আঙুলের ছাপ যেন বসে গেছে জবার গালে।মতিউর আলতো হাতে জবার গালটা ছুঁয়ে বলল,

“খুব লেগেছে তাই না?আমায় ক্ষমা করে দিও জবা।আমি ঠিক সময়ে এসে তোমায় বাঁচাতে পারিনি।”

“মা/রলে তো একটু লাগবেই তাই না?কোন ব্যাপার না,ভুলে যান।আর নিজেকে দোষারোপ করাও বাদ দিন।তবে আপনাকে রেগে থাকতে দেখে আমি বেশি কষ্ট পাচ্ছি।”

“তোমার ভাইকে খুন করতে পারলে রাগটা আমার কমতো।কি বলো করে আসি খুন? বিশ্বাস করো খুব বেশি কষ্ট হবে না।পাঁচ মিনিট লাগবে।”

জবা মতিউরের চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল,

“কিন্তু আমার নিজের স্বামীকে খু/নি হিসেবে পরিচয় দিতে খুব কষ্ট হবে।আমি কাঁদতেও পারি।এরপরও করবেন খুন?”

“আমার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছো জবা?”

“একটা সত্যি করে কথা বলুন তো আমায় এই রাগটা কি শুধুই ভাইজানের উপরে না আমার আর সুজনের ওপরেও?”

মতিউর একটু ভরকালো।আশেপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে একটা অজুহাত খোঁজার চেষ্টা করলো তবে হাতের নাগালে কোন অজুহাত খুঁজে পেল না।তবু পরিস্থিতিটা সামাল দেয়ার চেষ্টা করে বলল,

“এই পৃথিবীতে আমার রাগ শুধু তোমার ভাইই তুলতে পারে।আর সুজন মিয়ার ওপর রাগতে যাব কেন?ওই বেচারা তো সব হারিয়ে নিঃস্ব। আমি কেড়ে নিয়েছি ওর থেকে সব আর তোমার উপর আমি রাগ করবে তা হতেই পারে না।”

“তবে অভিমান জমেছে?”

“কিচ্ছু জমে নি।তোমার বললাম না আমার শুধু এখন ইচ্ছে করছে জামশেদ কে খুন করতে।আচ্ছা জবা একটা কাজ করো,তুমি সুজনকে নিয়ে পালিয়ে যাও।না না পালিয়ে যেতে হবে না,আমি ব্যবস্থা করে দেব।জুঁই আর জহিরের বিয়ে দেব না,ওদের সাথে তোমার বিয়েও দিয়ে দেবো কেমন?”

জবা এবারে নিশ্চিত হলো।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আমাকে তালাক দিতে পারবেন?”

“আশ্চর্য!তোমায় তালাক দিতে হবে কেন?”

“আমায় তালাক না দিলে আমি আবার বিয়ে করবো কি করে?সেই বিয়ে তো বৈধ হবে না।”

জবার এই কথাটায় মতিউর ভীষণ কষ্ট পেলো।ভাবলো তার মানে মতিউর তালাক দিয়ে দিলে জবা সত্যিই সুজনকে বিয়ে করে নেবে।

“তারমানে আমি তালাক দিয়ে দিলেই তুমি চলে যাবে?সুজনকে বিয়ে করে নেবে?”

“আপনি তো তাই করতে বললেন।”

মতিউর এবার কিঞ্চিত রাগ দেখিয়ে বলল,

“আমি যা বলব তাই করতে হবে?তুমি নিজে কি চাও সেটা বলো?আমার থেকে তালাক চাও?”

“আপনি দিতে চাইলে তা আমার করার কিছু থাকবে না।”

“তুমি চাইলে দেব।”

“আপনি দিলে আমি মেনে নেব।”

মতিউর নিজেই দুহাতে নিজের চুল খাঁমছে ধরলো।নিজেকে কেমন যেন পাগল পাগল লাগছে।সকালে শহরে যেতে চেয়েও যেতে পারেনি।কেন যেন মনে হয়েছিল জবা কে ওর প্রয়োজন হবে।বাড়িতে জামশেদ কোনো না কোন অশান্তি ঠিক বাঁধাবে ওর অনুপস্থিতিতে।সেজন্যই তো মাঝ রাস্তা থেকে ফিরে এসেছে।এসে জবা আর সুজনকে অতটা কাছাকাছি দেখে,জবার চোখে মুখে সুজনের জন্য চিন্তা দেখে,জবার প্রতি এখনো সুজনের ভালোবাসা দেখে সব যেন গুলিয়ে ফেলেছিল মতিউর।তারপর একটু আগে উঠোনে আবার সুজনের নিজের ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দেওয়া সবার সামনে নির্ভয়ে, সুজনের ভালোবাসার কথা শুনে জবার চোখে জল এসব কিছু মেনে নিতে মতিউরের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।এখন নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে মতিউরের।মনে হচ্ছে ওর জন্য সুজন আর জবা কেউই ভালো নেই।

“আমিই যত নষ্টের মূল।না তোমায় দেখে ভালোবাসতাম,না তোমায় বিয়ে করতাম,না এত অশান্তি হতো।কি করে ভুলটা শোধরানো যায় বলতো জবা?এখন না পারছি তোমায় ছাড়তে,না পারছি শান্তি মত সংসার করতে।আমা………”

মতিউর কথা আরো কিছু বলতো তবে বলতে পারল না।এই প্রথম মতিউরকে কোন আগাম বার্তা না দেয় ওকে অবাক করে দিয়ে জবা মতিউরকে জড়িয়ে ধরল দু হাতে।মতিউরের বুকে জবা মাথাটা রাখতেই মতিউর শান্ত হয়ে গেল।যত অস্থিরতা সব দূর হয়ে গেল।সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেল।

“আপনি আমায় তালাক দিলেও আমি আর কাউকে গ্রহণ করবোনা হোক সেটা সুজন।”

“তারমানে তুমি আমার সাথে সংসার করতে চাও?”

“সেটা এতদিনে বোঝেননি?এই কথা তো আপনি আগেও বলেছেন যে আমি সুজনের সাথে যেতে চাইলে যেতে পারি।আমি কি গিয়েছি তখন?যাবার হলে অনেক আগেই চলে যেতাম।থাকতে চাই জন্যই থেকে গিয়েছে।তবে আজ আপনি আমায় তাড়িয়ে দিতে চাইছেন কেন?ভালো লাগছে না আর আমায়?

মতিউর উৎকণ্ঠিত গলায় বলল,

“কি বলছো এসব?ভালো লাগবে না কেন? তুমি আমার বউ জবা,তোমাকে আমি ভালোবাসি।”

“ভালো আপনি আমায় বাসেন,জড়িয়ে ধরার কথাও আপনার ছিল।তবে আমি ধরেছি।দুজন কিন্তু সমান সমান হয়ে গেলাম।”

“আমি তো ভয়ে ধরতে পারছিনা নাহলে আমি একটু এগিয়ে যেতাম তোমার থেকে।”

“এত কিসের ভয়?আপনার আম্মা যদি শোনে না আপনি বউকে দেখে এত ভয় করেন তাহলে আমার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে দেবে। ভাববে তার ছেলের উপর বোধহয় আমি নির্যাতন করি,হয়তো রাতে একা পেয়ে মা/রপিট করি।”

“একটা কথা বলি জবা?সত্যি সত্যি উত্তর দেবে।আমার মন রাখার জন্য বলবে না,কোন বাধ্যবাধকতা থেকে বলবে না।”

“বলুন।”

“তুমি কি সত্যি সুজনের কাছে যেতে চাও না? আমার উপরে কি দয়া করে থেকে যাচ্ছ?সুজন কিন্তু এখনো তোমায় চায়।তুমি যখনই যাও না কেন ও তোমায় হাসি মুখে গ্রহণ করবে।তুমি বরং চলে যাও।আমার সাথে হয়তো কখনোই ভালো থাকতে পারবে না। আমি তো আর সুজন নই।আমায় দেখে তোমার শান্তি কোনদিনও লাগবে না।”

“কে বলল?আজকাল তো আপনার মুখটা দেখলেই আমার শান্তি লাগে।এই যে আপনাকে জড়িয়ে ধরে আছি এখনো আমার শান্তি লাগছে।আপনি আমার আশে পাশে থাকলে আমার শান্তি লাগে,আমার সব ভয় দূর হয়ে যায়।জানেন আজ সকালে যখন ভাইজান আমার মে/রে ছিলো,আমি আপনাকে খুঁজছিলাম,সুজনকে না।আমি মনে মনে বারবার শুধু আল্লাহকে বলছিলাম যেন আপনাকে তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেয়। আমি জানি আপনি থাকলে আমার কিচ্ছু হবে না।”

“সুজনও তো তোমার কিছু হতে দেয়নি।”

জবা এবারে রেগে গেল।মতিউরের বুক থেকে মাথা তুলে রাগী দৃষ্টিতে মতিউরের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আর একবার সুজনের নাম মুখে তুললে আপনার মুখ আমি সেলাই করে দেব।আমি ভুলতে চাই আর আপনি মনে করিয়ে দেন কেন বারবার আমায়?বেশি বাড়াবাড়ি করলে সত্যি চলে যাব।এত দূরে চলে যাব যে আপনি কিংবা সুজন কেউ খুঁজে পাবে না।”

মতিউর কাতর গলায় বলল,

“চলো না জবা এসব অশান্তি থেকে বের হয়ে আমরা একটু শান্তিতে সংসার করি।এই ঝামেলা আর ভালো লাগছে না।জানো সুজন যখন এভাবে তোমায় ভালোবাসার কথা বলে তখন আমার খুব কষ্ট হয়।মনে হয় আমি বোধহয় তোমায় কম ভালোবাসি।তুমি যখন সুজনের জন্য কাঁদো তখন আমার কষ্ট হয়, মনে হয় তুমি আমায় ভালোবাসো না।জানো আমার তোমায় খুব ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে কিন্তু সাহস করে উঠতে পারিনা।রাতে আমি তোমার শাড়ির আঁচল টুকু ধরে ঘুমোই।”

“এত কষ্ট না করে যদি কখনো আমায় বলতেন তবে এতদিনে আমায় ধরে ঘুমানোর অনুমতি পেয়ে যেতেন।শুনুন মতিউর,আমি আপনাকে ভালোবাসতে পেরেছি কিনা জানিনা তবে আমি আপনাকে ছেড়ে যেতে চাই না।সংসার আমি আপনার সাথেই করতে চাই।”

মতিউর আলতো হাসলো।এবার সে নিশ্চিত হলো যে জবা কক্ষনো ওকে ছেড়ে যাবে না। সাহস করে এই প্রথম দুই হাতের শক্ত করে জড়িয়ে ধরল জবাকে।জবাও কিচ্ছু বলল না।

“একবার শুধু এই ঝামেলা গুলো শেষ হয়ে যাক,আমরা দুজন খুব সুন্দর একটা সংসার সাজাবো আমাদের।তোমায় নিয়ে আমি গ্রামে থাকবো না।আমি বুঝতে পেরেছি এখানে থাকলে ওরা তোমায় জ্বালিয়ে মারবে।শহরে গিয়ে আমাদের দুজনের ছোট্ট একটা ঘর সাজাতে আচ্ছা?”

জবা সায় জানিয়ে বলল,

“ঠিক আছে।আর আমায় কথা দিন আজ থেকে সুজনের কথা তুলবেন না।অতিরিক্ত রাগারাগি করবেন না,মা/রপিট করবেন না, কাউকে খু/নের কথা মুখেও তুলবেন না।আর সব থেকে বড় কথা আমায় আর সুজনের কাছে চলে যাওয়ার কথা বলবেন না।”

মতিউরের হাতের বাঁধন আর একটু শক্ত হলো।আশ্বস্ত করে বললাম,

“কথা দিলাম।”

চলমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here