#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#পর্ব ২১
#লেখনিতে খুশবু আকতার
অত রাতে সুজন আর কোন গাড়ি পায়নি। এতটা পথ হেঁটে যাওয়াও সম্ভব না।আর তালুকদার বাড়িতে যে রাতটা কাটাবে সেটাও তার পক্ষে সম্ভব না।তাই আর বাড়ি ফিরে যায়নি,নদীর পাড়ে বসে সারা রাতটা কাটিয়েছে।আজ বেশ সকাল সকাল রুমির ঘুম ভেঙেছে।সারা রাত অস্থিরতায় কেটেছে, ঘুমই হয়নি বলতে গেলে।বাড়িতে আর ভালো লাগছিল না তাই ভোর ভোর হাঁটতে হাঁটতে তালুকদার বাড়ির দিকে গেলো।ভাবলো জুঁইয়ের সাথে কথা বলে যদি একটু ভালো লাগে!তবে বাড়ির কাছে আসার পর মনে হলো এত সকালে বোধহয় জুঁই ঘুম থেকে ওঠেনি।তাই ভাবলো একটু নদীর পাড় থেকে ঘুরে আসা যাক।সেখানে গিয়ে অসময়ে সুজন কে বসে থাকতে দেখে কিঞ্চিৎ চমকালো রুমি।
“আরে সুজন মিয়া,তুমি এত সকালে এখানে কেন?”
পরিচিত কারো কন্ঠ শুনে সুজন পিছন ফিরে তাকালো।রুমিকে দেখতে পেয়েও আজকে তার মধ্যে কোন বিরক্তিকর ভাব ফুটে ওঠলো না বরং আলতো হাসলো।উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“কাল রাত থেকে এখানে আছি।যাওয়ার জন্য কোন গাড়ি পায়নি তো তাই।”
“তো বাড়িতে গিয়ে থাকো নি কেন?”
“ইচ্ছে হয়নি।”
“এ আবার কেমন কথা?তুমি তো প্রায়ই থাকো ও বাড়িতে তাহলে কাল থাকলে কি হতো?আর অত রাতে তোমার নিজের বাড়িতে ফেরারিই বা কিসের এত তাড়া ছিল?”
“অনেক তাড়া ছিল।ও তুমি বুঝবে না।আর হয়তো আমাদের কখনো দেখা হবে না।”
সুজনের মুখ থেকে কথাটা শুনতেই রুমি আতকে উঠলো।কম্পিত গলায় বলল,
“কেন?”
“আমি এ বাড়ির চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি,না বাড়িতে আর কখনো আসার ইচ্ছে আছে,আর না এই গ্রামে।খুব তাড়াতাড়ি চেষ্টা করবো শহরে কোন একটা চাকরি খোঁজার। আর একবার আমি শহরে চলে গেলে তোমার সাথে তার দেখা হবে না।”
রুমির চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো।বিশ্বাসই করতে পারছে না যে ওর সুজন মিয়া এতটা নিষ্ঠুর।সত্যি তবে রুমির ভালোবাসাকে চির জীবনের মতন উপেক্ষা করে ওকে একা করে দিয়ে চলে যাচ্ছে সুজন।
“তুমি এত নিষ্ঠুর সুজন মিয়া?যে হৃদয়ে কারো প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা ছিল সেই হৃদয়টা এতটা পাথর হলো কি করে?”
“হৃদয় পাথর করতে হয়েছে আমায়।আমি তোমায় অনেক আগেই বলেছিলাম আমার থেকে কিছু আশা রেখো না।জবা নিজের জীবনে এগিয়ে গেলেও আমি আজও সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি।”
“আর আমার কি হবে?আমার কথা একটা বারও ভাবলে না?”
“তোমার কথা ভাবার আমার কখনোই কথা ছিল না।তুমি ভালো ঘরের মেয়ে,অনেক ভালো বাড়িতে তোমার বিয়ে হবে।তুমি সেখানে অনেক ভালো থাকবে।যে ভালোলাগাটুকু ছিল সেসব মুছে ফেলো মন থেকে।”
“আমার ভালবাসাকে ভালোলাগা বলে ছোট করছ কেন?তোমার কি মনে হয় শুধু তুমি একাই ভালোবাসতে জানো?”
“তা কখন বললাম?তবে একটা কথা শোনো সত্যিকারের ভালোবাসা গুলো বোধহয় কখনোই পূর্ণতা পায় না।অন্তত আমার এটাই মনে হয়।তোমার ভালোবাসা যদি অপূর্ণ থেকে যায় তবে বুঝে নিও সেটা সত্যি,সেজন্যই প্রকৃতি এক হতে দিলো না।”
“তাহলে জুঁই আর জহির মিয়ার ভালোবাসাটাকে মিথ্যে বলতে চাইছো?যদি ওদের ভালোবাসা মিথ্যে হতো তাহলে ওরা পূর্ণতা পাচ্ছে কেন?”
রুমির যুক্তির কাছে বোধহয় সুজন হার মেনে নিল।এই ব্যাপারটা ভেবে দেখেনি তবে সুজনের কাছে ভালোবাসা মানেই অপূর্ণতা।
“এত কিছু জানিনা তবে এতোটুকু বলতে পারি আমার জীবনে ভালোবাসা মানে অপূর্ণতা।তুমি ভালো থেকো কেমন!তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি,অনেক কষ্ট দিয়ে কথা বলেছি তোমায়।পারলে আমায় ক্ষমা করে দিও।”
রুমি এবার কেঁদে ফেলল।তবে রুমির চোখের সেই জল সুজনের মন গলাতে পারল না।যদিও খারাপ লাগলো তবে সেসব প্রকাশ করলো না।সুজন নিজের দুর্বলতা দেখালে যে রুমিও সুযোগ পেয়ে যাবে।
“আমার সুজন মিয়া এতটা নিষ্ঠুর ছিল না।তুমি জানো ভালোবাসার মানুষটাকে না পাওয়ার কতটা কষ্ট তারপরেও সে কষ্টটা আমায় দিচ্ছো কেন?”
সুজন রুমির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আমি দোয়া করি যেন তোমার একটা সুখের সংসার হয়,যে সংসারে তোমার সুখ শান্তির কোন কমতি হবে না,ভালোবাসার কোন কমতি হবে না।সবসময় ভালো থেকো রুমি।হয়তো আর দেখা হবে না আমাদের।আসছি।”
সুজন নিজের ব্যাগটা হাতে নিয়ে চলে গেল। রুমি কেন যেন চেয়েও আটকাতে পারল না।নিজের অনুভূতি জানানো তো বাকি রাখেনি। এত কিছু শোনার পরও যখন সুজন থামলো না তবে ওকে আর আটকানোর কোন উপায় রুমির জানা নেই।
_____
মাস দেড়েক পর……
“জুঁই কিছু খাইয়া ল মা।খালি পেট লইয়া পরীক্ষা দেওয়া হয় না।”
জুঁঃ ব্যস্ত কন্ঠে আনোয়ারাকে বলল,
“এখন আমার কোন ভাবেই খাওয়ার সময় হবে না আম্মা,খেতে গেলে পরীক্ষা দিতে পারবো না।”
“আচ্ছা খাড়া,আমি খাওয়াইয়া দিতাছি।”
“না আম্মা,খাওয়ারই সময় হবে না।তুমি চিন্তা করো না আমি এসে খেয়ে নেব।”
আনোয়ার হাজার চেষ্টা করেও মেয়েকে রাজি করাতে পারলেন না।পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে তাই আর বেশি বাঁধাও দিল না।জুঁই ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা গেলো বাড়ির পিছন দিকটায় যেখানে জলিল তালুকদারকে কবর দেয়া হয়েছে এক মাস আগে।এই জায়গাটায় আসলে এখনো জুঁইয়ের বুকটা ভার হয়ে আছে।বিশ্বাসই করতে পারে না যে কিছুদিন আগেও যে মানুষটা জুঁইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিত আজ সেই মানুষটাই মাটির নিচে।
“আজ আমার পরীক্ষা আব্বা।আমি জানি তুমি যদি আজ আমার পাশে থাকতে তাহলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে দোয়া করতে আমার জন্য।পরীক্ষার হলে আমায় ছেড়ে দিয়ে আসতে।এই যে আমি না খেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি তুমি আমায় একটু বকাও দিতে।তুমি আমার আম্মার স্বামী হিসেবে কেমন ছিলে সে হিসেবে বরং আজ আর না যাই।তবে তুমি আমার দেখার সেরা আব্বা।”
না চাইতেও জুঁই কেঁদে উঠলো।সত্যি বলতে এই মানুষটা জুঁইকে ভীষণ ভালোবেসেছে।সে সময় সে নিজের সম্মানের কথা না ভেবে শুধুমাত্র মেয়ের সুখের কথা ভেবে জহিরের সাথে জুঁইয়ের বিয়ে দিয়ে গেছে।মেয়ের সুখের সংসার দেখে গেছে।জুঁই ভীষণ ঋণী মানুষটার কাছে।বেশিক্ষণ আর সেখানে দাঁড়ালো না,না হলে পরীক্ষা দিতে যেতে দেরি হয়ে যাবে না।উঠোনে আসতেই মুখোমুখি এসে জামশেদ দাঁড়ালো।এই শেষ মুহূর্তে জামশেদের মুখটা দেখার ইচ্ছে জুঁইয়ের বিন্দুমাত্র ছিল না।পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে জামশেদ পথ আটকে দাঁড়ালো।গম্ভীর গলায় বলল,
“সেদিন তো আব্বার সামনে খুব বড় মুখ করে বললি যে তোর এসব সম্পত্তি চাই না।এখন আবার সম্পত্তি নেওয়ার জন্য ঘনঘন আসতে শুরু করেছিস তাই না?”
জুঁই বহু কষ্টে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“আমি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি ভাইজান।এখন অন্তত এসব কথা বাদ রাখুন।”
“তারমানে বলতে চাইছিস আমি সত্যি বলেছি, তাই তো?”
“আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করবেন যে আমি আপনাকে ব্যাখ্যা দিতে যাব?আর না আমার আপনাকে ব্যাখ্যা দেওয়ার সময় আছে,না ইচ্ছা আছে।সামনে থেকে সরুন।”
“তা এবার একা এলি যে?ওই ফকিন্নির বাচ্চা কোথায়?ছেড়েটেড়ে দিলো নাকি?আর আরেক ফকিন্নির বাচ্চার কি খবর?অনেকদিন হলো আসে না এ বাড়ি।”
“কার কথা বলছেন?”
“তোর পিরিতের সুজন ভাই।”
“কেন?কোন দরকার নাকি?দরকার ছাড়া তো ফকিন্নির বাচ্চার খবর নেওয়ার কথা না আপনার।”
“আমার কিসের দরকার হবে?তোদের ছাড়া আমার কোন ঠেকা নেই।”
“এতটা অবজ্ঞা করা ঠিক না।বলা যায় না কখনো হয়তো আমাদেরই দরকার পড়লো। যাইহোক সামনে থেকে সরুন তো,আপনার অশান্তিতে যা পড়েছিলাম সব ভুলে গেলাম।বিরক্তিকর!”
কথাটা বলে জুঁই জামশেদের পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে জামশেদ ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠলো,
“মূর্খর বউকে শিক্ষিত বানাচ্ছে।বলে দিস ঐ ফকিন্নির বাচ্চাকে যে জামশেদ বলেছে এই জুঁই শিক্ষিত হওয়ার পর ওই মূর্খ কে চিনবেও না।”
রাগে জুঁইয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
পিছন ফিরে তাকিয়ে কড়া কণ্ঠে জামশেদকে বলল,
“সবাই তো আর আপনার মতন না যে নিজের স্ত্রীকে সারা জীবন ধরে বেঁধে রেখে শুধু অপমান করবে।আমার স্বামীর আমার উপরে ভরসা আছে।ও নিজে চেয়েছে যেন আমি আমার পড়াশোনা শেষ করি।আর আপনাকে শেষবারের মতন বলছি আমার ব্যাপারে কোন কথা বলবেন না।আর জানেন তো কাল আমাকে এখানে কে রেখে গিয়েছে?দুলাভাই নিজে এসে দেখে গিয়েছে আমাকে।আর একটাও বাজে কথা বললে শুধু একবার দুলাভাইকে খবর দেব আপনার গুষ্টি উদ্ধার করে রেখে যাবে কিন্তু।”
কথাটা বলে জুঁই হনহন করে বেরিয়ে গেল। জামশেদ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কোনরকমে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করল।
___________
“কে?”
হঠাৎ করে পিছন থেকে এসে কেউ রুমির চোখের উপরে হাত রাখল।প্রথম দফায় রুমি চিনতে পারল না ঠিকই তবে খুব বেশি দেরি হলো না জুঁইকে চিনতে।উচ্ছ্বোসিত গলায় জুঁই বলে ডাকতেই জুঁই চোখ ছেড়ে দিল।রুমি পিছন ফিরে জুঁইকে দেখে গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“কতদিন পর তোকে দেখলাম!আমি তো ভাবতেই পারিনি যে তুই পরীক্ষাটা দিবি।”
“আমিও ভেবেছিলাম পরীক্ষাটা হয়তো দেবো না।সত্যি বলতে গ্রামে আর ফেরার ইচ্ছে ছিল না আমার।কিন্তু কালা জোর করে পাঠালো।বললো এরপর শহরে ভর্তি করিয়ে দেবে।”
“ভালো করেছিস এসে।আচ্ছা চল রুমে যাই।”
যাওয়ার পথে নাদিমের সাথে দেখা হলো।এই মানুষটার কাছে জুঁই ভীষণ কৃতজ্ঞ।যেখানে নিজের আপন মানুষদের থেকে সে সাহায্যের আশা ছেড়ে দিয়েছিল সেখানে নাদিম তাকে ভীষণভাবে সাহায্য করেছিল।জুঁই কে দেখতেই ছেলেটার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
“কেমন আছেন জুঁই?”
জুঁই পাল্টা হেসে বলল,
“ভালো আছি।আপনি কেমন আছেন?”
“আমিও ভালো আছি।আপনি যে পরীক্ষা দিতে আসবেন সেটা আমি সত্যি আশা করিনি।আপনার হাজব্যান্ড তাহলে বেশ সাপোর্টিভ।”
“হ্যাঁ।আমার না আর গ্রামে ফেরার ইচ্ছে ছিল, না পরীক্ষাটা দেওয়ার ইচ্ছে ছিল।ওই জোর করে পাঠিয়েছে সেজন্য তো গতকাল রাতে এসেছি।”
“প্রস্তুতি কেমন?”
“গত এক মাস ধরে কিছু পড়া হয়নি।তার আগে যা পড়েছি ওই দিয়ে কোনমতে পরীক্ষাটা দিতে হবে।শুধু পাস করতে পারলেই হয়।”
“চিন্তা করবেন না আপনি ভালো ফলাফলই করবেন।”
জুঁইয়ের নাদিমকে একটা প্রশ্ন করতে ভীষণ ইচ্ছে করছে যে নাদিম বিয়ে করেছে কিনা। কিন্তু একটু সংকোচ হচ্ছে।তবে জুঁইকে আর কোন কষ্ট করতে হলো না।পাশ থেকে রুমি বলে উঠলো,
“জানিস তুই আমাদের মাস্টারমশাই কে এমন কষ্ট দিয়েছিস যে উনি আর বিয়েই করতে পারছেন না।”
রুমির কথা শুনে জুঁই অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। তবে নাদিমের মাঝে তেমন কোন অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা গেল না।আলতো হেসে বলল,
“তেমন কোন ব্যাপার না।এই তো কয়েকদিন হলো এর মাঝে বিয়ের এত তাড়া কিসের!”
জুঁই অপরাধী গলায় বলল,
“ক্ষমা করবেন আমায়।আমি আপনার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি।সত্যি বলতে মনে মনে আপনাকে মাঝে মাঝে গালিও দিয়েছি কিন্তু কখনো ভাবতে পারিনি যে আপনি আমায় এতটা সাহায্য করবেন তাও নিঃস্বার্থভাবে।”
“কোন ব্যাপার না।আপনার ঐ সামান্য ভুলটুকুও আমি কখনো ধরিনি,ক্ষমা করবো কি?”
“আপনি দেখবেন আপনি আমার থেকে অনেক ভালো কাউকে নিজের জীবনে পাবেন।”
নাদিম আলতো হেসে বলল,
“যা চেয়েছিলাম সেটা বাদে যতই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জিনিস পেয়ে যাই না কেন সে তৃপ্তিটা তো আর হবে না।আমি কি পাবো সেটা জানি না তবে আমি কি হারিয়েছি সেটা আমার সারা জীবন মনে থাকবে।”
কথাটা বলে নাদিম সেখান থেকে চলে গেল। নাদিমের শেষ চার লাইনে জুঁই যেন গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারলো ওর প্রতি নাদিমের ভালোবাসাটা।তবে সবার ভালোবাসা যে পূর্ণতা পেতে নেই।নাদিমের ভালোবাসা পূর্ণতা পেলে যে অন্য কারো ভালোবাসা অপূর্ণ থেকে যেত।
_________
খুঁজতে খুঁজতে সুজন অবশেষে মতিউরের বাড়িটা পেল।বেশ বড় একটা উঠোন।উঠানের চারিপাশে অনেকগুলো ঘর দেখা যাচ্ছে। সুজন জানেনা এর মাঝে মতিউর আর জবার ঘর কোনটা।কাউকে দেখাও যাচ্ছে না যে তাকে জিজ্ঞেস করবে মতিউর বাড়িতে আছে কিনা।সুজন উঠোন পেরিয়ে আরেকটু এগিয়ে গেল।একজন মহিলার দেখা পেলো।তবে তিনি সুজনকে দেখে এড়িয়ে যেতে চাইলেন। মনে হয় অপরিচিত পুরুষ মানুষের সাথে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না তবে সুজন ওনাকে যাওয়ার সুযোগ দিল না।
“একটু শুনবেন?”
ইচ্ছে থাকলেও ডাকটা উপেক্ষা করে যেতে পারল না শিল্পী।চোখে মুখে একরাশ প্রশ্ন রেখে জিজ্ঞেস করল,
“কারে চাই?আগেতো এই গ্রামে দেখছি বইলা মনে হইতেছে না।”
“হ্যাঁ আমি এই গ্রামে থাকি না।বলছিলাম যে এটা কি মতিউর সাহেবের বাড়ি?”
“হ।কি দরকার?”
“উনি কি বাড়ি আছেন?”
“হ আছে।”
“একটু ডেকে দেবেন ওনাকে?না হলে গিয়ে বলুন যে সুজন এসেছে।”
শিল্পী একরাশ আপত্তি জানিয়ে বলল,
“পারুম না।হে আইছে কাল রাতে শহর থেকে,এখনো ঘর থেকে বাহির হয় নাই।মনে হয় বউ আর কারো নাই!ওগো এসব প্রেম পিরিতি আমার সহ্য হয় না।এখন আমি যদি গিয়া ওরে ডাকি ওই মতিউর আমারে গরম দেখাইব।আবার ওর বউরে ডাকলে তাও বিরক্ত হইবো।আমি ঘর দেখাইতেছি আপনি যান ডাকেন গা।”
সুজন অপ্রস্তুত গলায় বলল,
“আমি কি করে গিয়ে ডাকবো?আপনি ডাকুন না।”
“কইলাম তো পারমু না।ওই ছ্যাড়ার কথাবার্তার সাইজ নাই।কি কইতে আমারে কি কইয়া দিবো,আমার সহ্য হইব না।শেষে ঝগড়া লাইগা যামু।আপনার যদি কথা কওনের এতই তাড়া থাকে ঐযে ওই ঘরটায় অরে পাইয়া যাবেন।আর শোনেন আপনার ভালোর লিয়াই কইতাছি বেশি ডাইকেন না।ওই যখন ওর বউয়ের লগে থাকে কেউ ডাকলে চেইত্তা যায়।বউও পাইছে একখান,ওই মাইয়ার ঢং দেখলে আমার গা জ্ব/ইলা যায়।”
মতিউরের ব্যাপারে যা ইচ্ছে বলুক না কেন তাতে সুজনের কিছু যায় আসে না কিন্তু ওর সামনে জবা কে নিয়ে এভাবে কেন বলব? কোন সাহসে বলবে?মৃদু রাগী গলায় বলল,
“অদ্ভুত!জবাকে নিয়ে এভাবে বলছেন কেন?ও ঢং করতে জানে না।ও যা করে সব মন থেকে করে।”
“আপনার আবার কি হইল?কই একজনের বউয়ের কথা আর বুকে আগুন লাগে আপনার!তা কেডা হয়ে জবা আপনের?”
“যে হয় হোক,সে সব জেনে আপনার কোন কাজ নেই।দয়া করে গিয়ে মতিউর সাহেব কে ডেকে দিন।না হলে আমার ডাক শুনে যদি উনি বেরিয়ে আসে তখন কিন্তু আমি বলব যে আপনাকে বলেছিলাম তাও আপনি ডেকে দেননি।”
শিল্পী পড়লো ভ্যাবাচ্যাকার মাঝে।অপরিচিত ছেলে কিনা ওকে এসব ভয় দেখাচ্ছে।তার মানে মতিউর এই বাইরের লোকগুলোকে কতটা সাহস দিয়ে রেখেছে যে ঘরের মানুষকে এভাবে খোঁচাচ্ছে?উপায় না পেয়ে শিল্পী গেল।দরজায় দুবার করাঘাত করতে ভিতর থেকে মতিউরের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“কি প্রয়োজন?”
“আমার কোন দরকার পড়ে নাই।তোমার লগে কোন সুজন জানি দেখা করতে আইছে।বউরে ছাইড়া ওঠো।”
লজ্জায় জবা দুচোখ বন্ধ করে নিল।শিল্পীকে তো বোঝাতেও পারবেনা যে মতিউরের থেকে ও বেশি অনেকটা দূরত্বেই আছে।মতিউর জবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখেছো জবা,তোমাকে ধরে না থেকেও ধরে থাকার অপবাদ দিলো?আর তুমি কিনা অপবাদের জন্য আমায় ধরতে দিচ্ছিলে না?”
“কথা না বাড়িয়ে বাহিরে গিয়ে দেখুন।সুজন নাম বলল ভাবি।আমি যে সুজনকে চিনি সেই সুজন এলো কি?”
“আমি তো বাপের জন্মে আর কোন সুজনের নাম শুনিনি।তোমার সুজনই এসেছে বোধহয়।”
“আবার আমার সুজন বলছেন?”
“তো?বিয়ে তো করেনি সুজন মিয়া এখনো যে অন্য কারো সুজন বলবো।দাঁড়াও দেখি আগে কে এলো।”
মতিউর দরজা খুলে বাইরে উঁকি দিতেই সুজনকে দেখতে পেয়ে বেশ অবাক হলো।এগিয়ে গেল সুজনের দিকে।
“আরে সুজন মিয়া তুমি এখানে?বিয়ের দাওয়াত দিতে এলে নাকি?”
সুজন হালকা হেসে বলল,
“ঠিকই ধরেছেন।বিয়ের দাওয়াতে দিতেই এসেছি।তবে আমার না,আমার ছোট বোনের। সেই সাথে আপনার সাথে কিছু দরকার ছিল।”
“তা বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন?কেউ তোমায় বসতে বলেনি নাকি?”
“ও কোন ব্যাপার না।”
“ব্যাপার না মানে?অবশ্যই ব্যাপার।তুমি আমার বিশেষ অতিথি যদিও আজ বিনা নিমন্ত্রণে চলে এসেছে কিন্তু তোমায় একদিন আমার বাড়িতে আনার আমার ভীষণ ইচ্ছে ছিল।তবে কখনো বলার সাহস হয়নি।তুমি এসেছো আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।চলো সুজন মিয়া আমার ঘরে নিয়ে যাই তোমায়।”
মতিউর সুজনকে টেনেই নিয়ে গেল।দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে জবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“জবা দেখো,তোমার সুজন মিয়া এসেছে।”
জবা এক কোনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।অনেকগুলো দিন পর আবার সুজনকে দেখলো তবে আজ আর চোখে চোখ রাখল না।জবার সাহস হলো না আর না ইচ্ছে।মতিউর সুজনকে বিছানার উপর বসিয়ে জবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোমরা দুজন ততক্ষণ একে অন্যকে জিজ্ঞেস করো কেমন আছোআমি ভাবিকে বলে আসি একটু চা মিষ্টির ব্যবস্থা করতে।”
জবা মতিউরকে বাঁধা দিয়ে বলল,
“এসব আপনার কাজ নাকি?আপনি বসে কথা বলুন,আমি যাচ্ছি।”
জবা আর মতিউরের কিছু বলার অপেক্ষায় রইলো না।তার আগেই হনহন করে বেরিয়ে চলে গেল।সুজন খেয়াল করলো আজ ওর খুব একটা বেশি কষ্ট হচ্ছে না তবে হচ্ছে কষ্ট।মতিউর সুজনের পাশে এসে বসলো।
“বলো কি দরকার?ভালো পাত্রীর সন্ধান চাইছো নাকি?”
“আমার বিয়ে নিয়ে আপনারা এতো মাথাব্যথা কেন বলুন তো?এমনটা তো নয় যে আমি বিয়ে না করলে আপনার সংসারে কোন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে?বেশ ভালোই সংসার করছেন তো তবে আমার বিয়ে নিয়ে পড়ে আছেন কেন?”
মতিউর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“নিজেকে অপরাধী মনে হয়।তোমার জীবনটা যদি গোছানো দেখি তবে শান্তি পাবো।শুধু আমি না জবাও শান্তি পাবে।মাঝে মাঝে ওর বুক চিরে যে দীর্ঘশ্বাসটা বেরিয়ে আসে সেটা থামবে।”
“ওকে বলে দেবেন আমি খুব ভালো আছি।”
“আবার মিথ্যে বললে তুমি।জবা কে ছাড়া যে সুজন মিয়া কেমন থাকতে পারে সেটা আমরা সবাই জানি।যাক বাদ দাও সেসব কথা,এবার বলো তোমার কি দরকার ছিল?”
“আসলে আমার ছোট বোনের বিয়ে ঠিক করেছি,ছেলে আপনাদের গ্রামেরই।ভরসাযোগ্য কারো থেকে তেমন খোঁজখবর নিতে পারছিলাম না তাই ভাবলাম আপনার কাছে আসি।”
“ওহ্!তা ছেলের নাম কি?বাপের নাম কি?করে কি?”
সুজন পরিচয় বললো।মতিউর একটু ভাবনা চিন্তা শেষে বলল,
“খুব একটা ভালো না আবার খুব একটা খারাপও না।মায়ের আঁচলে বাঁধা আর বাবার খুব একটা কথা শোনে না।এখন বউয়ের সাথে কেমন আচরণ করবে এটা তো আমি বলতে পারব না।”
“চরিত্র কেমন মনে হয়?মদ,সিগারেট এসব খাওয়ার অভ্যাস আছে?”
“এত বিস্তারিত তো জানিনা।তবে খোঁজ নিয়ে জানাতে পারি।একটা দিন সময় দাও খোঁজ নিচ্ছি।শুধু ওর চরিত্র কেন ওর বাপের চরিত্র সহ বের করে দেব।”
“ধন্যবাদ।আমি আজ তবে উঠি।”
“সে কি কথা?এখনো তো তোমার জবার হাতের রান্নাই খেলে না।জানোতো জবার রান্না আরো সুন্দর হয়েছে।দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে তারপর যেও।”
সুজনের মতিউরকে বলতে ইচ্ছে করলো যে ওর গলা দিয়ে খাবার নামবে না।এই ঘরটাতে বসতেই তো দম বন্ধ হয়ে আসছে।সামনের আলনায় মতিউর আর জবার জামা কাপড় একসাথে গোছানো,বিছানার দুটো বালিশ একসাথে।এতকিছু কি সুজনের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নাকি?
“না অন্য দিন আসবো,আজ একটু তাড়া আছে।”
“আচ্ছা দাঁড়াও,আমারও তোমার সাথে একটা দরকারি কথা আছে।আমিও তোমার কাছে যেতাম।তুমি এসেছ ভালো করেছো।”
“বলুন।”
“তুমি কি কোন চাকরি করছ এখন?”
“হ্যাঁ,একটা ছোটখাটো চাকরি করছি।”
“বেতন কেমন পাও?”
“কোনোমতে চলে যায়।”
“আমার ব্যবসায় কাজ করবে?আসলে গত কয়েক মাস ধরে ব্যবসার হিসেবে খুব গরমিল হচ্ছে।আমি তো সবসময় শহরে থাকতে পারিনা।যাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম তার ওপর এখন আর ভরসা করতে পারছি না।তোমায় সে দায়িত্বটা দিতে চাই।”
“আমাকে এত ভরসা করার কারণ কি?”
“জবা।”
“মানে?”
“মানেটা হলো জবার থেকে শুনেছি জানো, তুমি কখনো তোমাদের সম্পর্কের সুযোগ নিতে চাওনি,ওর হাতটাও নাকি ওর থেকে অনুমতি নিয়প ধরতে।তুমি এখনো কিছু পাবে না যেনও নিঃস্বার্থভাবে শুধু জবাকে ভালোবাসো।আর যাই হোক তুমি কখনো কারো ভরসা ভাঙতে পারে না সুজন মিয়া। তুমি কথা দিয়েছিলে না যে সারাজীবন শুধু ওকেই ভালোবাসবে?এখনো তুমি তাই করে যাচ্ছ।তোমায় ভরসা না করে কি থাকা যায়?”
“তবু এতটা ভরসা করা ঠিক না।”
“ভরসা করা আমার ব্যাপার তুমি বলো রাজি আছো কিনা?আমি কথা দিচ্ছি বেতন নিয়ে তোমার কোন সমস্যা হবে না,থাকার ব্যবস্থাও আমি করে দেব।শহরে থাকতে হবে তোমায়।ওখানে কিন্তু রোজ জহিরের সাথেও দেখা করতে পারবে,জুঁইও আছে।দরকার পড়লে জুঁই রা যেখানে থাকে তার আশেপাশেই ব্যবস্থা করে দেব আমি।”
“একটু সময় দিন আমাকে ভাবার।বোনের বিয়েটা দিয়ে নিয়ে তারপরে জানাই উত্তর?”
“আচ্ছা।”
“এখন তবে আসি!”
কথাটা বলে সুজন উঠে চলে যেতে নিলে জবার মুখোমুখি পড়লে সুজন।
“কোথায় যাচ্ছো?”
“থাকতে তো আসেনি জবা?চলে যাচ্ছি।”
“একটু কিছু খেয়ে যাও?”
“অন্য কোনদিন।”
“তাই বলে না খেয়ে চলে যাবে?”
“গলা দিয়ে নামবে না।”
মতিউরের কেন যেন মনে হলো ওদের দুজনকে একা কথা বলতে দেয়া উচিত।যদিও মন খুব একটা সায় দিচ্ছিললো না,তবে সব সময় মনের কথা শুনতে নেই।মাঝে মাঝে মনকে দুই একটা চড় থাপ্পর দিয়ে চুপ করিয়ে দিতে হয়।
“তোমরা কথা বলো আমি একটু আসছি।”
কথাটা বলে মতিউর বেরিয়ে গেল।ওর পিছন পিছন সুজনও চলে যেতে নিলে জবা আটকালো।
“তোমায় বলেছিলাম জীবনটা নতুন করে শুরু করার জন্য।”
“তোমার জন্য যতটা সহজ ছিল আমার জন্য ততটা সহজ না।তোমার যেমন খুশি তুমি তোমার জীবন কাটাচ্ছো,আমি কি তোমায় কিছু বলেছি জবা?তাহলে?আমাকেও আমার জীবনটা আমার মতন করে কাটাতে দাও না।আমি একাই বেশ আছি,মরে তো যাইনি।”
“বেঁচেও তো নেই।”
“তুমি কি চাও আমাকে বাঁচাতে?”
“আমার আর সেই ক্ষমতা বা অধিকার কোনটাই নেই।আমাকে চাওয়া ছেড়ে দাও সুজন।”
সুজন তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“তোমার সুখের সংসার দেখার পরও তোমার মনে হয় আমি তোমাকে চাই?আমি তো বুঝে গিয়েছি জবা তোমার জীবনে আমার গুরুত্ব ফুরিয়েছে।তবে বিশ্বাস করে এর জন্য তোমার প্রতি আমার কোন রাগ নেই।মতিইর সাহেব তোমার স্বামী,তুমি যে তাকে ভালোবাসতে পেরেছো এতে আমি খুশি।আমার জবা পবিত্র,সেটা আরো একবার প্রমাণ হয়ে গেল।তবে জানো তো আফসোস একটাই?”
“কি?”
“তোমার স্বামী আমি হতে পারলাম না।”
চলমান।

