#সায়েবা_আসক্তি
#লেখিকা_সানজিদা_বিনতে_সফি
#শেষ_পর্ব(শেষাংশ)
বাইরের অন্ধকার আকাশের দিকে একমনে তাকিয়ে আছে সায়েবা।এখন কোন কিছুতেই তার খুব একটা আগ্রহ হয় না। মাঝে মাঝে শোয়েবের সাথে করা খুনশুটি গুলো মনে পড়লে ভিতরে ভিতরে গুমরে মরে সে।সব কিছুতেই তিক্ততা। মন থেকে বেচে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে সে।নিজের উপর নিজেই বিরক্ত। কি দরকার ছিল এসব ভালোবাসার।আজ যদি সে ফারহান কে ভালো না বাসতো তাহলে শোয়েব তাদের মাঝে বেচে থাকতো। তার ভালোবাসা ই কাল হয়ে দাড়ালো তাদের জীবনে। এখন ফারহান কে ও অসহ্য লাগে। কাছে আসতে চাইলে গলা টি*পে ধরতে ইচ্ছে করে। এই আদর সোহাগের লোভে পরেই তো ভাই কে হারালো সে।এর চেয়ে ভালো নিজেকে শেষ করে দেয়া।সমস্ত লেটা চুকে যায়।
ফারহান আনমনা সায়েবার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মেয়েটা কি আর কখনো ঠিক হবে না! এই প্রশ্ন তার শক্ত হৃদয়ে বারবার দুর্বলতা হয়ে আঘাত করছে।নিজেকে ধৈর্য ধরে সামলে রাখা মুশকিল হয়ে পরেছে।
আজ সায়েবা কে নিয়ে একটু উত্তরার দিকে যাচ্ছে ফারহান। পাচ মাস অনেক মেহনত করেছে সে।আজ তার ফলাফল পাওয়ার দিন।সায়েবার মুখের হাসি তাকে লেটার মার্ক নিয়ে উত্তির্ন করবে।
রাত আনুমানিক এগারো টা।উত্তরা শপং কমপ্লেক্স এর সামনে গাড়ি পার্ক করে সায়েবা কে সাবধানে নামালো ফারহান।টিস্যু দিয়ে কপালের ঘাম গুলো মুছে দিয়ে নিকাব টা একটু ঠিক করে দিলো।সায়েবা নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে ফারহানের দিকে। এই দৃষ্টি বারবার ফারহান কে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়।
শপিং কমপ্লেক্সের সামনের ফুটপাতের দিকে এগিয়ে গেলো ফারহান।সায়েবার হাত তার বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় যত্ন করে আগলে রাখা।সায়েবা ফারহানের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ফুটপাতের কাছে কয়েকজন ভিক্ষুক বসে ভিক্ষা করছে।সবাই বৃদ্ধ হলেও তার মধ্যে একজন কম বয়সী মেয়েও আছে।যার দুটো চোখ ই নেই।এক কথায় পুরো পুরি অন্ধ সে।মেয়েটিও সবার মতো ভিক্ষা চাইছে।দেখে মনে হচ্ছে এ বিষয়ে খুব অভিজ্ঞ সে।ফারহান হাটুতে ভর দিয়ে বসলো মেয়েটার সামনে।পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে হাজার টাকার কয়েকটি নোট রাখলো থালায়। মেয়েটি হাত দিয়ে হাতড়ে বুঝতে পারলো কেউ তাকে অনেকগুলো টাকা দিয়েছে।খুশি তে নেচে উঠলো তার মন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে বারবার ধন্যবাদ দিতে লাগলো ফারহান কে। ফারহান বাকা হেসে বললো,
— নতুন জীবন কেমন লাগছে লিজা?কোন অসুভিধা হচ্ছে না তো?
মুহুর্তেই কেপে উঠলো যুবতি।হাতের হাজার টাকার নোট গুলো খসে পড়লো নিচে।ভয়ার্ত মুখে গুটিয়ে নিলো নিজেকে। শব্দ করে হেসে উঠলো ফারহান।সায়েবা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ফারহানের দিকে। এই মেয়েটা লিজা কি করে হতে পারে?ছেড়া জামায় অন্ধ মেয়েটি কিছুতেই লিজা নয়! ফারহান সায়েবার অবস্থা বুঝতে পেরে ও কিছু বললো না।ঢাকা শহরে রাত এগারো টা মানে সন্ধ্যা। ফারহান লিজার দিকে তাকিয়ে ফিচলে গলায় বলল,
— বলেছিলাম না,আমার পরিবারের কারোর গায়ে একটা আচড় লাগলেও তোকে দুনিয়াতে জাহান্নাম দেখিয়ে দিবো।তোর কি মনে হয়, আমি আমার কথা রাখতে পেরেছি?
ডুকরে কেঁদে উঠলো লিজা।বারবার মাফ চাইতে লাগলো ফারহানের কাছে।ফারহান একটু ও মায়া দেখালো না।বিমর্ষ গলায় বলল,
— শোয়েব ও এভাবেই আকুতি করেছিলো তাই না রে?
চমকে উঠলো সায়েবা।তার মন বারবার বলছিলো লিজাই কিছু করেছে শোয়েব কে।কিন্তু এটাই যে সত্যি হয়ে যাবে তা সে কল্পনা ও করে নি। চৈত্রের খরার মতো শুকিয়ে যাওয়া চোখ গুলো তে হঠাৎ ই অশ্রুর প্লাবন দেখা দিলো। তবে মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারলো না।
— আমাকে ক্ষমা করে দাও ফারহান।আমাকে যেতে দাও।আমি আর কখনো তোমাদের জীবনে আসবো না।আমি দেশ ছেড়ে চলে যাবো। প্লিজ আমাকে যেতে দাও।
লিজার আর্তনাদে পাত্তা দিল না ফারহান। খুশি খুশি গলায় বলল,
— তা কি করে হয়?এখন তো তোকে আমাদের জীবনে খুব দরকার। আমাদের চোখের শান্তির জন্য হলেও তোকে দরকার।তোর এই করুন পরিনতি দরকার। তোর বাবা তোকে রাজরানী বানানোর আশায় সব কিছু তে তোকে সাহায্য করেছে।এখন তোকে পাগলের মতো যখন চারিদিকে খুজে বেড়ায় তখন আমার মনে শান্তির পরশ দিয়ে যায়।তার মেয়ে যে এখন রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করছে এটা যখন জানবে তখন কেমন হবে বল তো? ভাবতেই তো শান্তি লাগছে।
লিজার কান্নার বেগ বেড়ে গেলো। নাইট ক্লাবে পার্টি করা মেয়েটা আজ রাস্তায় ভিক্ষা করছে। ফারহান তার চোখ গুলো নষ্ট করে দিয়েছে। একটা হাত আর একটা পা ও অকেজো। একটি ছেলে সারাক্ষণ তাকে পাহারা দিয়ে রাখে।যাতে সে কোন ভাবেই পালাতে না পারে।একেকদিন একেক জায়গায় নিয়ে যায় ভিক্ষা করানোর জন্য। সব টা ফারহানের নির্দেশে। শোয়েব কে মা*রার কথা লিজা নিজ মুখে শিকার করেছে।তাকে সাহায্য করেছে তার বাবা।উদ্দেশ্য ছিল সায়েবা,কে সায়েস্তা করা।
— বেচারি কে কিছু টাকা ভিক্ষা দাও সায়েবা।
সায়েবা কিছু না বলে সেখানেই ফারহান কে জরিয়ে ধতে কাদতে লাগলো। কষ্টের পাথর গলতে শুরু করেছে যে।
🌸
জানালার পর্দা টা একটু পর পর মৃদু বাতাসে উড়ে উঠছে।দুজন মানব মানবীর ভাড়ী নিশ্বাসে রুমের উষ্ণতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।এতো বছরের অপেক্ষার শোধ আদিব কড়ায় গন্ডায় উশুল করে
নিচ্ছে। ফায়জা মাঝে মাঝে আর্তনাদ করে উঠলেও সে দিকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না আদিব।সে এখন ফায়জা তে মত্ত।কিছুক্ষণ পর ফায়জা ডুকরে কেঁদে উঠতেই ফায়জা কে ছেড়ে দিলো আদিব।ফায়জার কপালে চুমু খেয়ে নেশালো গলায় বলল,
— বলেছিলাম না, আমাকে দেয়া যন্ত্রণা কড়ায় গন্ডায় ফিরত দিবো।আজ থেকে প্রতি রাতে তুমি ও কাদবে।পার্থক্য শুধু এতটুকু আমি তোমার অবহেলায় কেদেছি,তুমি আমার ভালোবাসায় কাদবে।বুঝেছো সোনা।
ফায়েজা আদিবের বুকে কয়েক ঘা লাগিয়ে উল্টো ঘুরে শুয়ে পরলো।আদিব মুচিকি হেসে পিছন থেকে জরিয়ে ধরলো ফায়জা কে। ফায়জার লম্বা চুলে মুখ ডুবিয়ে গাঢ় চুমু খেয়ে আগলে নিলো তাকে।ফায়জা ও চুপ করে পরে রইলো আদিবের বুকে।
চার বছর পরে,,,,
সায়েবা বিরক্ত হয়ে ফারহান আর তার চার বছরের ছেলে ফারশিতের দিকে তাকিয়ে আছে।দুজনেই গম্ভীর হয়ে ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছে।সায়েবা কে কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না।সায়েবা আবার ও প্রেগন্যান্ট। চার মাস চলছে।ফারশিত হওয়ার সময় সায়েবার অনেক প্রবলেম হয়েছিলো। তাই ফারহান আর বাচ্চা নিতে চায় নি।কিন্তু সায়েবার জেদের কাছে হার মানতে হলো তাকে।সাহেরা বেগম মেয়ের এই সময় মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে নি।সে চলে এসেছে সায়েবার কাছে।ফারশিত হওয়ার পরে তাকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। ফারশিত দেখতে অনেকটা শোয়েবের মতো। নাক আর ঠোঁট পুরো শোয়েবের মতো হলেও চেহারার আদল ফারহানের। এ নিয়ে সায়েবার আফসোসের শেষ নেই।ছেলেটা কেন তার মতো হলো না!হয়েছে ও বাপের মতো গম্ভীর। আল্লাহর কাছে বিরবির করে প্রার্থনা করছে সায়েবা।মেয়েটা যেন তার মতো হয়।এতগুলো করলা নিয়ে সংসার করা যায় না।
নীতি আর ফরহাদের এখনো কোন ছেলে মেয়ে হয় নি। তাতে তাদের কোন আফসোস নেই।আল্লাহ যখন চাইবে তখন হবে।নীতি মাঝে মাঝে মন খারাপ করলেও ফরহাদ সামলে নেয়।সাবা আর নীলের এক ছেলে। দুই বছর বয়স।তারা এখন কানাডায় সেটেল্ড হয়ে গেছে।তবে কথা হয় ফোনে নিয়মিত। ফায়জা আর আদিবের টুইন মেয়ে হয়েছে।দেখতে একেবারে পুতুলের মতো। আদিব মেয়ে অন্ত প্রান।মেয়েদের ছাড়া সে অচল।তবে ফায়জার উপর প্রতি*শোধ সে এখনো নেয়।সকালে ফায়জার ফোলা ফোলা লাল লাল চোখ দেখে তৃপ্তির হাসি হেসে বলে, তোমার এই কান্নায় ফুলে যাওয়া চোখের প্রেমে বারবার আছাড় খেয়ে পড়ি বউ।ফায়জা শুধু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কেন যে এই ছেলে কে বিয়ে করতে গিয়েছিলো!
আজ সায়েবার ডেলিভারি। হসপিটালের সামনে গাড়ি থামতেই তৃপ্তির হাসি হাসলো সায়েবা।সামনের রাস্তায় লিজা বসে ভিক্ষা করছে।সে আর ফারহান ছাড়া এ বিষয়ে কেউ জানে না।তাই সেদিকে কারোর ধ্যান নেই। ফারহানের বুকে মাথা রেখে সেদিকে তাকিয়ে রইলো সায়েবা।ভাইয়ের থেতলানো মুখটা ভেসে উঠতেই গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পরলো।ফারহান যত্ন সহকারে মুছে দিলো সেই অশ্রু।কপালে চুমু খেয়ে এগিয়ে গেলো হসপিটালের দিকে।যেখানে নতুন এক অধ্যায় তাদের জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে।
সমাপ্ত।
(কেমন হয়েছে জানি না।মন খুব খারাপ।ছেলেটা আজ আবার চলে গেলো ঢাকায়। সে ওখানের হোস্টেলে থেকে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। মা ও চলে গেলো। আবার কবে দেখা হবে জানি না। আমার ছেলের জন্য সবাই দোয়া করবেন।আজ নেক্সট নাইস না লিখে গল্প সম্পর্কে দু লাইন লিখে যান।এতো দিন এতো ভালোবাসা দেয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। নামাজ কায়েম করুন। আল্লাহ হাফেজ।)

