#শুভ্রফুল — ১৯
#কলমে_লিজা_আক্তার_আলো
[ কপি নিষিদ্ধ ]
শুভ্রর করা প্রশ্নে কোনো জবাব দিলো না আলো। চুপ করে মাথা কিছুটা নুইয়ে রেখেছিলো সে। মনে হলো লজ্জা নয় বরং এড়িয়ে যেতে চাইছে আলো।
শুভ্র আলোকে এভাবে দেখে কথা ঘুরালো যেহেতু মেয়েটা পছন্দ করছে না এখন কথাটা না বলায় শ্রেয়। শুভ্র খাইয়ে দিতে চাইলে আলো বারণ করে বলে উঠলো,
” আপনাকে কষ্ট করতে হবে না আমি খেতে পারবো এখন। এমনিতেই এই কয়দিন আমার চেয়ে আপনাকে বেশি সাফার করতে হয়েছে। প্লিজ
আমি পারবো। দিন আমার কাছে।
শুভ্রকে কিছু বলতে না দিয়ে প্লেটটা নিজের কাছে নিয়ে আসলো৷ শুভ্রর দিকে তাকালো বললো,
” খেয়ে নিন আপনি। মেডিকেলে তো খেতেই পারেননি ঠিক মতো। আপনার মতে মানুষের জন্য ওই জায়গা একদমই ঠিক না৷
” সবকিছুই তাহলে খেয়াল রেখেছো তুমি ৷ আমাকে ও?
” বাজে কথা রেখে খাবেন নাকি আমার খাওয়া ও
অফ করে দিবো৷
” আমার না থাকতে কষ্ট হয়। তাকাতে ও মেয়েটা বিরক্ত হয়। আসলেই মেয়েদের মন বোঝা বড়ই দায়।
খেতে খেতে কথাটা বললো শুভ্র। শুভ্রর দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো আলো। কোনো কথা বললো না সে৷
খাওয়া শেষ হতেই প্রশ্ন করলো আলো,
” আচ্ছা আপনি কখনো কারোর সাথে প্রেম করেছেন?
” নাহ! তো কেন?
” আমার বিশ্বাস হয় না আপনার মতো হ্যান্ডসাম
একটা ছেলে প্রেম না করে প্রফেসর হয়ে গেলো।
শুভ্র রেডি হচ্ছিলো প্রিন্সিপাল স্যার জানিয়েছেন একটা ছোট্ট মিটিং হবে সেটাই এটেন্ড করতে হবে।
সেভাবেই বলে উঠলো,
” প্রেমিকার অভাব ছিলো না কিন্তু, প্রেমিকের ভালোবাসার অভাব ছিলো যার কারনে প্রেম এসে
ধরা দিলে ও তা অবহেলা পেয়ে মুক্ত পাখির মতো অনত্রে নিজ ঠিকানা খুঁজতে ব্যস্ত হয়েছিলো। তবে
একটা পাখি হয়তো সুতোর বাঁধনে আঁটকে পড়েছিলো। যার কারনে সে আজ ও ভালোবাসার
অভাবে পালাতে পারেনি। অপেক্ষায় ছিলো সেই
প্রেমিক নামক হাসবেন্ডের৷ হয়তো ভালোবাসবে।
হুমায়ুন আহমেদের অপেক্ষা বইটাকেই ভরসা করেছিলো। মানুষটা তো জিবিত আছে মরে যায়নি। অপেক্ষা করাটা মন্দ নয়৷ কারন অপেক্ষার অবশন কেবল আত্মার মুক্তিতেই মিলে। আর সেই
পাখিটা পাখি নয় তার ফুল হয়ে থেকে গেলো।
তাইতো মিসেস আলো চৌধুরী।
আলো নীরব দর্শকের মতো শুনে গেলো শুভ্রর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে। হঠাৎ আবার ও বলে উঠলো,
” আচ্ছা আমি যদি মরে যেতাম৷ তাহলে তো আপনি আরেকটা বিয়ে করতেন তাই না?
ঘড়িটা পড়তে গিয়েও হাত থেমে গেলো শুভ্রর। তাকালো নীরব দৃষ্টিতে আলোর মুখপানে। বললো,
” ভালো না লাগলে বলো কোথাও ঘুরিয়ে নিয়ে আসি বা কি ইচ্ছে করছে বলো আমায়? কিন্তু, এমন উদ্ভট কথা বার্তা বলছো কেন তুমি?
আলো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো শুভ্রর দিকে,
নীরিহ ভাবে বললো,
” আপনি এতো কিছু বুঝেন কেন? আমি কি বলেছি আপনাকে আমার ভালো লাগছে না?
” সেই রাতেই তোমাকে যা চেনার চিনে ফেলেছি।
মুড সুয়িং হলে যে এমন করে তোমায় না দেখলে জানতামই না।
এগিয়ে আসলো আলোর কাছে। চুল গুলো শুঁকিয়ে গিয়েছে। মুখের উপর পড়ছে এসে বারবার
সামনের ডিস্টার্বিং করা চুল গুলো সরিয়ে কানের পাশে গুঁজে দিলো শুভ্র। কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
” তোমার মুড সুয়িং না হয় আমি সামলে নিবো কিন্তু আমার হলে সামলাতে পারবো তো আমায়?
কানটা বোধহয় গরম হয়ে এলো লজ্জায আলোর।
খানিকটা সরে এলো শুভ্রর কাছ থেকে। সাথে সাথে বলে উঠলো,
” অসভ্য পুরুষ মানুষ যা তা কথা বার্তা ছাড়া ভালো কথা নেই।
” আমি ক..
“শুভ্র আসবো?
শুভ্র কথা বন্ধ করে দিলো। অর্নব ও অরিন আসছে
দেখ করতে।
” আমরা চলে যাচ্ছি আলো আপু। তুমি সুস্থ হলে ভাইয়াকে নিয়ে আমাদের বাসায় যাবা।
অরিনের কথায় আলো বলে উঠলো,
” তোমরা তো কেবলই আসলে আর এখনই চলে যাবা? অর্নব ভাইয়া এই তোমাদের আসা?
” ওকে আর বলো না আলো আপু। আমাদের দু’জনকে একটু আমার বাবার বাসায় যেতে হবে।
দাদু অসুস্থ। আবার আসবো আমরা। ভাইয়া আলো আপুর খেয়াল রেখো আমরা যাই এবার।
” আসি শুভ্র, আলো। পরে দেখা হবে। ইমারজেন্সি না হলে আজ থেকে যেতাম। আসি।
” চল একসাথেই যায়। আমাকে ও বেরুতে হবে এখন।
” আচ্ছা চল।
” তোরা যা আমি আসছি।
অরিন ও অর্নব বেরুতেই শুভ্র আলোর কাছে এলো
অতঃপর দু’হাত দিয়ে আলতো করে আলোর চোয়াল চেপে ধরে কপালটায় চুমু খেলো কয়েকবার।
” আসি। কিছু লাগলে মমকে বা মনিকে বলো।
” সাবধানে যাবেন।
” ঠিক আছে।
বেরিয়ে গেলো শুভ্র। আলো মাথাটা এলিয়ে দিলো
বালিশে। মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগলো আলোর,
” আচ্ছা মিহুল ভাইয়া কোথায়? সেইদিনের পর থেকে তার আর দেখা পাওয়া গেলো না। সে কি এখনো অবুঝের মতো পাগলামি করে? আহি কোথায় সে তে একটিবারের জন্যও আমাকে দেখতে এলো না? তার বড় বাবার ভয়ে? কোথায় তারা?
ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলো আলো।
__________________
আতিকা বেগম রুমে পায়চারি করছেন। সব ঠিকঠাক হয়ে গেলো এটা ওনার সহ্য হচ্ছে না। সব ঠিক হলে ওনার মেয়ের কি হবে? এতো বড় বাড়ির বউ এই মেয়ে হবে এটা ওনি মানতেই পারছেন না।
কিন্তু শুভ্র যেভাবে আলোর যত্ন করছে, আগলে রাখছে তাতে ওই মেয়ে সব ভুলে মেনে নিবে নিশ্চিত ওনি। কিন্তু ভুল বুঝালে মেয়েটা বিশ্বাস করবে কি? মনে তো হয় না।
তিনি তাড়াহুড়ো করে ফোন করলো কাউকে,
” হ্যালো তুই কোথায় আছিস? আজই চৌধুরী বাড়িতে চলে আয়।
” আমি তোমার কথা শুনতে পারবো না মা। আমার এসব ভালো লাগে না। কেন অযথা এদের মধ্যে নাক গলাচ্ছো তুমি?
” একটা থাপ্পড় দিবো কিন্তু, আজই আসবি।
রাফা কাঁদো কাঁদো অবস্থা। তবুও বাধ্য হয়ে মায়ের ভয়ে বলে,
” আচ্ছা আসবো। তোমাদের সাথে কেন যে দিলো আমায় উপরওয়ালা বুঝি না।
” আয় তারপর বোঝাচ্ছি কেন দিয়েছেন উপরওয়ালা তোকে আমার ঘরে।
” ধমকাবা না একদম। আসছি তো আমি।
ফোন রেখে দিলেন তিনি। মনটাতে একটু শান্তি লাগছে।
বহুত অপমানিত হয়েছেন আতিকা বেগম । শুধু মেয়ের ভবিষ্যৎ নয় অপমানের জবাব ও যে পাওনা এই চৌধুরী পরিবার। এতো সহজে ভুলা যায় নাকি? না যায় না।
_________________
” আঁধার তুই এইসময় বাড়িতে আসছিস কেন?
” মা তুমি চুপ করো তো। আপুনি অসুস্থ আর তোমরা কেউ আমায় জানাওনি। কোথায় আপুনি?
আঁধার কারোর কথা শুনার প্রয়োজন মনে করলো না।
দ্রুত পায়ে ছুটলো আলোর ও শুভ্রর রুমের দিকে।
নীলিমা চৌধুরী ও আফিয়া চৌধুরী তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো।
” ওকে আটঁকিও না তোমরা। যেতে দাও ও কাঁদছিলো
এতোক্ষণ।
আরিফ চৌধুরী লাগেজ নিয়ে ভেতরে আসতে আসতে বলেন উক্ত কথাটা,
” তুমি নিয়ে আসছো আমাকে বলোনি তো?
” সময় পায়নি। আর ছেলেটা আলোর অসুস্থতার কথা শুনে কেঁদে ওঠেছিলো। তাই আর না করতে পারিনি।
” ঠিক করেছো আরিফ। ছেলেটা অনেকদিন হলো বাড়িতে আসে না। হঠাৎ পরিবার ছাড়া ও কতটা কষ্টই না পেয়েছে একা থাকতে। এবার কদিন থেকে তারপর যাবে।
আফিয়া চৌধুরীর কথায় আরিফ বলে,
” তোমায় বলতে হবে না ভাবি ও আগেই বলে দিয়েছে ও আর যাবেই না হোস্টেলে। আলোকে ছাড়া আমাদের ছাড়া থাকতে ওর কষ্ট হয়।
” তোমরা কেউ ওকে ওর কথায় হ্যা তে হ্যা মেলাবা না একদমই। তাহলেই আর কিছু বলতে পারবে না। বাড়িতে থাকলে পড়েই না। শুধু সকলকে বিরক্ত করে। ওর জন্য আলো শান্তি পাবে বলে মনে হয় না। দেখো কি করতেছে মেয়েটার সাথে।
” বাদ দে তো নীলিমা। ওরা আনন্দ করবে না তো কে করবে।
” আনন্দ না ভাবি ও দুষ্টুমি করে অনেক। মেয়েটা শান্তি পাবে না। বিজ্ঞদের মতো কথাবার্তা বলে কান ঝালাপালা করে ফেলবে।
” আচ্ছা ওর লাগেজটা নাও। ওর রুমে রেখে আসো আগে।
” দাও।
যে যার রুমে চলে যায় তারা।
” আপুুুুউউউউউনিনিনিনিনি…
হঠাৎ আকস্মিক চিৎকারে ভয়ে হকচকিয়ে ওঠে বসে পড়লো আলো। চোখ দু’টো ভয়ার্ত দৃষ্টি ও বড় বড় হয়ে আছে। ব্যাথা অনুভব করে হালকা আর্তনাদ করে উঠলো। অসুস্থতার কথা খেয়াল ছিলো না ধরফরিয়ে উঠলো সে। সামনে আঁধার কে দেখে ব্যাথাতুর কন্ঠটা মিলিয়ে গিয়ে হাসি ফুঠলো আলোর ঠোঁটের কোণে,
বলে উঠলো অতি উৎসাহে,
” আঁধার তুই কখন এসেছিস? আপুকে তো সারপ্রাইজ করে দিয়েছিস একদম।
” হ্যা আপু সারপ্রাইজ উইত মি! কেমন লাগলো?
” আমি অনেক খুশি হয়েছি তুই আসাতে। আয় বস।
আঁধার বসতে বসতে বলে উঠলো,
” কোন বজ্জাতের হাড্ডি আমার আপুনিকে মেরেছে নামটা বলো আপুনি তার অবস্থার ব্যবস্থা করে দিবো।
হাসলো আলো। ছেলেটা শুধু উল্টা পাল্টা কথাবার্তা বলবে,
” হয়েছ তোমার ব্যবস্থা,অবস্থা রেখে বসো তো আমার পাশে কতদিন পর দেখলাম মিস ইউ ভাইই..
” মিথ্যা কথা। আমি মিস করি কিন্তু তুমি না। তুমি আমার সাথে এতোদিন কথা বলোনি।
” ও অসুস্থ ছিলো কথা বলবে কিভাবে?
” চেনা চেনা লাগে তাই না আপুনি? কে ইনি? আর তোমার রুমে কি করছে? কেন আসছেন আপনি?
শুভ্র রুমে আসতে আসতে কথাটা বলে। শুভ্রকে চিনতে পারেনি আঁধার। ছোট মানুষ কেবল পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ে। সেই কবে তিন বছর আগে দেখেছিলো৷ মনে পড়লে ও চিনতে অসুবিধে হচ্ছে খানিকটা। জুহুরি চোখে তাকিয়ে দেখতে লাগলো আঁধার শুভ্রকে। চেনার চেষ্টা বলা যায়,
” তোর ভাই হই আমি, কোনো জিনিস না এভাবে দেখছিস কেন আমায় ?
” জিনিস না জানি তবে চেইঞ্জ হয়ে গিয়েছো। কিন্তু, তুমি আমার আপুনির রুমে কি করো? লজ্জা করে না তোমার এতো বড় একটা ছেলে হয়ে মেয়েদের রুমে আসতে?
বোকাবনে গেলো আলো ও শুভ্র। ফের আঁধার বললো,
” জামি এটা একসময় তোমার রুম ছিলো। কিন্তু, এখন এটা আমার আপুনির রুম। কখনো আসবা না এটা আঁধার চৌধুরীর আদেশ।
হেঁসে উঠলো আলো। ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর বৃথা চেষ্টা করছে। শুভ্র অবাক হলো এইটুকুনে ছেলের কথা শুনে।
” এসেছিস দেখেছিস এবার যা তো ভাই ডিস্টার্ব করিস না।
চোখ পাকিয়ে তাকালো আঁধার। বড়দের মতো করে বলে উঠলো,
” ভাইয়া তুমি তো অসভ্যতামি করছো। তুমি এতো বড় ছেলে হয়ে একটা মেয়ের রুমে আসছো কেন? এখন মামুনি আর মম দেখলে কি মনে করবে? আমার আপুনির একটা সম্মান আছে না?
” আরে ভাইইই ওটা আমার বউ হয়। তোর মতো পুঁচকে ছেলে এতো কথা জানে কিভাবে? বড্ড পেকে গিয়েছিস তো তুই ।
” ভুল বলছো তুমি। মানুষ নয়, ফুল আর শবজি পাকে। যায় হোক! আমি এখনই মামুনিকে বলছি তোমার ছেলে বিদেশ থেকে কিছুই শিখতে পারেনি৷ আর আমাকে ও যেনো বিদেশ না পাঠায়। অশিক্ষিত ছেলে কোনো মেনার্স নেই। আমার আপুনিকে ডিস্টার্ব করছে শুধু। আমি তার ভাই হয়ে মেনে নিবো? কখনোই না।
” এই আঁধার যাস না। কিসব উল্টা পাল্টা কথা বলছিস তুই?
আঁধার শুনলো না চলে গেলো।
” কি দিনকাল আসলো বউয়ের কাছে আসলে ও পুঁচকে
ছেলের ধমক খেতে হয়।
আলো এবার শব্দ করে হেঁসে উঠলো। আঁধার একটু বেশিই পাকনা। আলে আঁধার কে হারে হারে চেনে। আর এই পাকা পাকা কথার কারনেই তাকে তার মা হোস্টেলে রেখে এসেছন। বড়দের মতো কথাবার্তা যে কেউ শুনলে তব্দা খেয়ে যায়।
চলবে,,,,,

