শুভ্রফুল — ১৮ #কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

0
33

#শুভ্রফুল — ১৮
#কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

[ কপি করা নিষিদ্ধ ]

পুরো পনেরোদিন কেটে গেলো আলোর অবস্থা এখন আগের থেকে উন্নতি হয়েছে। শুভ্র ভার্সিটি থেকে ছুটি নিয়েছে। এই ক’দিন আলোর কাছে থেকে শুভ্র প্রয়োজন ব্যথিত একমুহূর্তের জন্য ও দূরে থাকেনি। কিন্তু, আলোর সাথে বেচারা কথা বলতে পারছে না। আলো কথা বলছে না শুভ্রর সাথে কেন বলছে না সেটা হাজার বললে ও আলো কিছুই বলে না।

আজ আলোকে ডিসচার্জ করে দেওয়া হবে। শুভ্র এদিক সেদিক করে সব ঠিকঠাক করলো। নীলিমা
চৌধুরী ও আরিফ চৌধুরী এসেছেন আলোক নিয়ে যাওয়ার জন্য। আলো এখনো ভালোভাবে দাঁড়াতে পারছেনা একজনের সাহায্য লাগেই। ডক্টর সাজেস্ট করেছিলো আর কিছুদিন থাকার জন্য কিন্তু আলো থাকবে না মানে থাকবে না। আলো ভোর হয়ে গিয়েছে মেডিকেলে থাকতে থাকতে।

শুভ ধরতে নিলে এড়িয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। তবুও স্ত্রী হয় জোড় করেই সাবধানে পাঁজা কোলে তুলে নিলো আলোকে। বললো,

” একদম মোচড়ামুচড়ি করবা না। আমার সাথে রাগ
দেখিয়ে নিজের ক্ষতি করার কোনো মানে হয় না।

” আমি আপনার সাথে যেতে চাই না৷ আমি হাঁটতে পারি। আর আপনি আমার থেকে দূরে থাকবেন।

” আমি দূরের মানুষ নয়।

” আপনি তো কাছের মানুষ ছিলেন না। দূরেরই তো ছিলেন।

” যেদিন থেকে জানলাম আমার একটা বউ আছে আমার অপেক্ষায় অপেক্ষাকৃত সেদিন থেকে আমি বউয়ের খুব বড় ফ্যান হয়ে গিয়েছি। কাছে না এসে উপায় নেই। আর যা ঝামেলা ঘটেছে সেগুলো দুঃস্বপ্ন মনে করে ভুলে যাও।

” ভুলবো না। আর মানবোও না আপনাকে।

” ওকে না মানলে মানিয়ে নিবো৷

বিরক্ত হলো আলো। কথা বাড়ালো না। কথায় পেরে উঠবে না বুঝলো সে। শিক্ষক না কথার মারপেঁচ তার থেকে তিনগুণ জানে। আলোর মুখ দেখে শুভ্র হাসলো।
বললো,

” গুড গার্ল! এভাবেই কথা শুনবা। ভালোবাসি ডিয়ার #শুভ্রফুল

” অসহ্য লাগে আপনার ভালোবাসা।

” নো প্রবলেম সহ্য হয়ে যাবে মানে মানিয়ে নিবা আমার মতো।

” ধ্যাত!

শুভ্র হাসতে হাসতে নিচে আসলো। গাড়িতে নিজের সাথে বসালো। আরিফ চৌধুরী ড্রাইভিং করছিলো পাশে ছিলো নীলিমা চৌধুরী। তারা শুধু মিটিমিটি হাসছিলো শুভ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে। কতটা সহ্য করছে ছেলেটা তবুও রাগ ভাঙাতে পারছে না। এতোগুলা বছরেরে জমে থাকা রাগ কি এতো সহজে কমে যায়?

অতিরিক্ত পাওয়ারফুল মেডিসিন নেওয়ায় জেগে থাকা সম্ভব হয়না আলোর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুভ্রর কাঁধে মাথাটা এলিয়ে দেয়। শুভ্র খুবই সন্তপর্ণে আগলে নেই আলোকে।
_________________

আফিয়া চৌধুরী রান্না করছেন আলোর জন্য। মেয়েটা এখন খাবার খেতে পারবে কিছুটা। তিনি অপেক্ষায় আছেন কখন আলো আসবে।

” মেয়েটা এসে পড়বে কিচেন থেকে বের হও তো।

আসিফ চৌধুরীর কথায় আফিয়া চৌধুরী হাসি মুখে বললেন,

” আজ নতুন করে জীবন পেলো মেয়েটা তাও আমার ছেলের সাথে ছেলের বউ হয়ে আসছে এই বাড়িতে । কি যে আনন্দ লাগছে বলে বুঝাতে পারবো না তোমাকে ।

দূর থেকে ভেঙছি কেটে একা একা বলে উঠলো
আতিকা বেগম,

” ডং দেখে বাঁচিনা। আমার মেয়ের জন্য একদিন ও একটু ভাবে না রান্না তো দূর! আমি ও দেখবো এই আদর কোথায় যায়। আমি তোমাদের হাত দিয়েই এই মেয়েকে এই বাড়ির বাইরে বের করবো।

চলে গেলেন নিজের থাকার ঘরে।

কিছুক্ষণ বাদে শুভ্ররা চলে আসলো। সাথো নতুন অতিথি ও আসছে। অর্নব ও অরিন আসছে। আলোকে দেখতে। তাদের বিয়েতে শুভ্র উপস্থিত থাকতে পারেনি।
অর্নবের মন খারাপ হলে ও আলোর অসুস্থতার জন্য মেনে নিয়েছে। নয়তো কতশত প্ল্যান ছিলো তার।

আলোকে সোজা রুমে নিয়ে গেলো শুভ্র। সাথে সবাই গেলো দেখা করতে।

” কেমন আছো ভাবি? আমি কিন্তু তোমার অনেক বড় ফ্যান!

আলো অবাক হলো,

” মানে!

অরিন চঞ্চল স্বভাবের। সামান্য হেঁসে বলে উঠলো,

” অর্নব তো সারাক্ষণ ভাইয়া ও তোমার কথায় বলে
শুনতে শুনতে তোমায় যেনো আমি চিনে ফেলেছি।
তুমি মানুষটা অম্যরকম।

” হয়েছে মেয়েটা আসছেই মাত্র এসেই তোমার কথা জুড়ে দিয়েছো?

চুপ করে গেলো অরিন।

ওর এখন ফ্রেস হতে হবে। তাই সবাই বাইরে বের হয়ে গেলো। শুভ্র ধরতে চাইলো, আলো বারণ করে বললো,

” আপনাকে কষ্ট করতে হবে না আমি পারবো।

” তোমায় বলতে হবে না আমি জানি তুমি কেমন পারবে।

” বললালম তো পারবো। কেন যেচে পড়ে সাহায্য করতে আসেন?

” আমি তোমার হাসবেন্ড হই। তোমার পাশে তো আমাকেই থাকতে হবে।

” লাগবে না আমার পাশে কাউকে। আমি একা ছিলাম একাই থাকবো। আর একাই যেতে পারবো।

শুভ্র হাত চেপে ধরলো আলোর, অপরাধীর মতো বললো,

” এই ধরলাম এই হাতটা আর কখনোই ছাড়বো না। ভালোবাসি #শুভ্রফুল!

আলো বললো,

” আমি জানি মি. চৌধুরী আপনি আমায় নয় বরং আমার মোহের প্রেমে পড়েছেন। ভালোবাসা মন থেকে হয় মোহ থেকে নয়। মোহ দু’দিন পর বা দুবছর, অথবা দুই যুগ পর কেটে যাবে। আমি এমন ভালোবাসা চাই না।

দু’হাতে আলোর হাতটা আগলে নিলো শুভ্র। বললো,

ভুল ভেবেছো তুমি আলো। যে মানুষটাকে কেউ এতো তীব্র ভালোবাসার পর ও সে যদি অনিশ্চিত ভালোবাসার অপেক্ষায় থাকতে পারে তাকে আর যায় হোক ছেড়ে দেওয়া যায় না। আমি তো ছাড়বোই না। আজীবন আমৃত্যু রেখে দেবো যত্ন করে মনের এক কোণে।
আমায় তুমি শুধু লাস্টবারের মতো একটা সুযোগ দিও।

” সরুন সামনে থেকে আমি ফ্রেস হবো।

” আমার কথার জবাব দাও….

” ভালোবাসা মুখে বলতে হয় না। ভালোবাসা প্রকাশ পায় মানুষের বিশ্বাসে, যত্নে আর আচরনে।

পড়ে যেতে নিলে ধরে ফেলে শুভ্র। ভয়ে খিঁচিয়ে আসা
চোখ মুখের দিকে তাকিয়ে শুভ্র বলে উঠলো,

” এভাবেই পাশে থাকবো সারাজীবন।

সামান্য হাসি ফুটলো আলোর ঠোঁটের কোণে। শুভ্র
ও হাসলো আলোর চোখের আড়ালে।
__________________

” ওই জামিল আহমেদ এর কোনো খোঁজ পাওয়া গিয়েছে? এতো বড় একটা অন্যায় করে কিভাবে পার পেয়ে গেলো আমি সেটাই ভাবতে পারছি না।
এখনকার আইন টাকার কাছে এতোটা নিচে নেমে গিয়েছে যে তারা নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে নিরাপত্তা কেঁড়ে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। টাকার কাছে হার মেনে অপরাধীকে ছেড়ে দিয়েছে। এজন্যই তো অপরাধীরা অপরাধ করতে দু’বার ভাবে না। আর না মনে ভয় জন্মায়।

আসিফ চৌধুরীর কথায় অর্নব বলে,

” পায়নি আংকেল। বাড়িটা একদম খালি পড়ে আছে। কেউ নেই বাড়িতে। আশেপাশে কেউ কিছু বলতে পারছে না তারা কোথায় গিয়েছে। আমি ভাবছি মিহুল ছেলেটার কথা সে তো আলোর জন্য জীবন দিয়ে দিচ্ছিলো এখন কোথায় সে? নাকি সবই মিথ্যা ছিলো?

” ওদের কথা কেউ বলো না জাস্ট মাথায় রক্ত ওঠে যায়। হাতের কাছে পেলে দেখাতাম। ছেলেকে শাসন না করে আমাদের মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়েছিলো। পুলিশকে না জানিয়ে আমাদেরই কিছু একটা করার দরকার ছিলো তাহলেই ওই খুনিটা শাস্তি পেতো।

” যা হওয়ার হয়ে গেছে আলো ঠিক আছে এতেই
শান্তি। তোমরা খেয়ে নাও আমি আলো আর শুভ্রর জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছি।

আফিয়া চৌধুরী খাবার প্লেট নিয়ে চলে যান দোতলায়।

অরিন, অর্নব সহ সবাই খেতে থাকে একসাথে।

” আসবো শুভ্র?

” আসো মম!

শুভ্র আলতো হাতে আলোর একহাত লম্বা চুল গুলো মুছতেছিলো। ভেজা থাকলে ঠান্ডা লাগতে পারে। কিন্তু আলো দিচ্ছিলো না তবুও জোর করে মুছতেছিলো সে।

” এই অবস্থায় শাওয়ার নিয়েছে কেন আলো? ডক্টর বারণ করেছিলো তো।

শুভ্র বললো,

” সেটা এই মেয়েকে জিজ্ঞেস করো কেন? একটা ফাজিল মেয়ে কথা শুনে না একদম।

” আপনি ফাজিল আমি এতোগুলা দিন কিভাবে থেকেছি আমিই জানি। আমার খারাপ লাগছিলো
তাই শাওয়ার নিয়েছি। কিছু হবে না মামুনি।

” তুই এক লাইন বেশি বুঝিস আলো। আমরা চাই
সমস্যা এড়াতে আর তুই চাস সমস্যা বাড়াতো।

” এখন দুজনে মিলে বলতে থাকো।

” বলবোই তো। শুভ্র আমি খাবারটা রেখে গেলাম
খেয়ে নিস দু’জনে। নিচে যেতে হবে না।

” ঠিক আছে মম।

চলে গেলেন আফিয়া চৌধুরী। আলো রেগে তাকালো শুভ্রর দিকে,

” মামুনির সামনে আপনি আমায় অপমান অপমান করলেন কেন?

শুভ্র ভাতের প্লেটটা হাতে নিয়ে নির্লিপ্ত ভাবে বললো,

” মিথ্যা বলছি কোথায়? তুমি তো আমার কথা শুনছো না আর ফাজিল মেয়েরাই তো কথা শুনে না।

” আপনি ফাজিল। যারা বিয়ে করে বউ রেখে চোরের মতো পালিয়ে যায়। তারাই আস্ত একটা ফাজিল।

” বউটা সাথে নেওয়ার দরকার ছিলো। ইট’স ওকে পরেরবার বিয়ে করলে বউ সাথে করে নিয়ে যাবো।

রেগে ফুঁসে ওঠলো আলো। বলে উঠলো সাথে সাথে,

” কি বললেন আপনি একবার বিয়ে করে সাধ মেটেনি আনার বিয়ে করার কথা বলছেন আপনি?

বলেই তেড়েফুঁড়ে আসতে নিলে, হালকা ব্যাথায় আর্তনাদ করে ওঠে আলো,

” আহ!

” জামাইকে দাম ও দেয় আর বিয়ের কথা বললে মারতে আসে আজব মেয়ে তুমি আলো। নড়বা না একদম। না হলে আর ব্যাথা পাবা। মেয়েটা ভুলেই যায় যে সে অসুস্থ।

” আর একদিন বিয়ের কথা বললে আপনার অবস্থা খুব কারাপ হবে বলে দিলাম।

আলোর রাগান্বিত মুখশ্রী দেখে শব্দ করে হেসে উঠলো শুভ্র।

” হিংসে হয় বুঝি?

” নাহ ভালো লাগে শুনতে।

” আবার বলবো?

” শুধু সুস্থ হয়ে নিই তারপর আপনি দেখবেন এই আলো কি করতে পারে।

” হুম আলো শুধু ঝগড়া করতে পারে।

” মারতে ও পারে।

” তাই!

” ভালোবাসতে পারে?

চলবে,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here