শুভ্রফুল —১৭ #কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

0
37

#শুভ্রফুল —১৭
#কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

[ কপি করা নিষিদ্ধ ]

আমি আপনাকে ভালোবাসি না মিহুল ভাইয়া। কথাটা কানের মধ্যে তীব্রভাবে বাজতেছে মিহুলের।
আলোর বলা কথাটা শুনে শুভ্রর একমুহূর্তও দেরী হলো না আলোর হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে মিহুলের হাতটা শক্ত করে ধরে আইসিইউ এর বাইরে নিয়ে আসতে৷

পুরোটা সময় আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো
মিহুল। এতোটা অসহায় লাগছিলো যে কথা বলতে বা বাঁধা দিতে ও ভুলে গিয়েছিলো সে৷ বুঝতে সময় লাগলো তার। যখন মেয়েটার মুখটা চোখের আড়াল হয়ে এলো। তাকালো শুভ্রর দিকে,

” স্যার আমার হাত ছাড়ুন। আমার ওর সাথে কথা আছে৷ প্লিজ স্যার!

” এই মুহুর্তে এই মেডিকেল থেকে বেরিয়ে যাবে তুমি। নয়তো পুলিশ ডাকতে বাধ্য হবো।

” না স্যার আমার আলোর সাথে কথা আছে। আমি ওর সাথে কথা না বলে একপা ও নড়বো না।

শুভ্র মিহুলের কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,

” সী ইজ মাই ওয়াইফ। তার সাথে তোমার কোনো কথা থাকতে পারে না৷ আমি ভালোভাবে বলছি চলে যাও চোখের সামনে থেকে নয়তো তোমার বাবার করা অন্যায়ের শাস্তি তোমায় পেতে হবে৷

মিহুল ও চেঁচিয়ে উঠলো,

” আমি আলোকে ভালোবাসি ওকে আমার চাই।

থাপ্পড় মারলো শুভ্র। রেগে বলে উঠলো,

” মরার সখ জেগেছে তোমার তাই না?

পাল্টা রাগ দেখালো মিহুল,

” মরার ভয় এই মিহুল করে না। ভালো যখন ভেসেছি নিজের করে ছাড়বো’ই।

মারতে নিলে চিৎকার চেঁচামেঁচি শুনে আসিফ চৌধুরী ও আরিফ চৌধুরী দৌড়ে আসেন প্রায়। সাথে ডক্টর সহয় কয়েকজন নার্স ও আসেন। আসিফ চৌধুরী শুভ্রকে আটকায় অন্যদিকে আরিফ চৌধুরী ধরে মিহুলকে।

” কি শুধু করেছিস তুই শুভ্র? এটা হসপিটাল এখানে এভাবে চিৎকার করছিস কেন?

আসিফ চৌধুরীর কথায় শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে মিহুলের দিকে রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বলে,

” ও আমার সামনে আমার আলোকে ভালোবাসার কথা বলছে। বলছে ও আমার থেকে আলোকে কেঁড়ে নিবে। ওর কতবড় সাহস ওর জিহ্বাটা কেটে ফেলতে ইচ্ছে করছে। ছাড়ো আমায় ড্যাড ট্রাস্ট মি ওকে আমি এখানে পুঁতে ফেলবো।

” এই যে মিহুল তুমি কাজটা ঠিক করছো না। তুমি তো জানো আলো বিবাহিত তার হাসবেন্ড আছে তাহলে কেন ওর পিছু পড়ে আছো।

আরিফ চৌধুরীর কথায় মিহুলের কোনো ভাবান্তর হলো না সে নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে বিবেকহীন কথা বলে,

” ভালোবাসি তাই।

” ড্যাড আমায় ছাড়ো বলছি…

” কি শুরু করেছেন আপনারা এখানে? এটা কি পাবলিক প্লেস নাকি এভাবে চিৎকার করছেন কেন ?
আপনারা চান না পেশেন্ট বেঁচে থাকুক?

শান্ত হয়ে এলো দু’দিক থেকেই। শুভ্র শান্ত স্বরে বললো,

” ড্যাড আমি কোনো সিনক্রিয়েট করতে চাচ্ছি না।
তুমি ওই ছেলেকে বলো চলে যেতে।

মিহুল শব্দ করলো না কোনো। বেরিয়ে গেলো সে
হসপিটাল থেকে। আরিফ চৌধুরী ও আসিফ চৌধুরী সস্থি পেলেন। আরিফ চৌধুরী শুভ্রর কাছে এসে বলেন,

” চলে গিয়েছে ও। এখন আয় রেস্ট নিবি। সেই কখন থেকে আইসিইউর বাইরে বসে আছিস।

” না চাচ্চু আমি এখানেই ঠিক আছি । তোমরা ঘুমিয়ে পড়ো।

” তুই তো অসুস্থ হয়ে যাবি!

” কিছুই হবে না। আমি আলোকে একা ছাড়তে পারবো না চাচ্চু। মিহুল শান্ত হয়ে গিয়েছে মানে সে কিছু না কিছু করবেই। ও শান্ত থাকার ছেলে নয়৷

তারা আর কথা বাড়ালো না চলে গেলো। শুভ্র ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করলে বারণ করে নার্স ও ডক্টর। মেয়েটা ঠিক নেই তার মধ্যে ওরা যা করছে ভেতরে তো এলাউ করা যায় না।

” ডক্টর আমি ওর সাথে কথা বলবো জাস্ট দেখে চলে আসবো।

” সরি মি. চৌধুরী যাওয়া যাবে না। আপনাদের ঝামেলার কারনে পেশেন্টের অতিরিক্ত চাপ পড়ছে
তাই না যাওয়ায় ব্যাটার!

বাইরে বসে রইলো শুভ্র।
_______________

” আপনারা চিনেননা আমি কে অফিসার আমার
কথাটা শুনুন বলছি!

পুলিশ অফিসার কথা শুনলেন না। উল্টো জামিল আহমেদ এর হাতে হাতকড়া পরিয়ে বলেন,

” সরি আপনি কে সেটা আমাদের দেখার কোনো ইচ্ছে নেই। এই মুহুর্তে আপনি একজন অপরাধী।
মি. শুভ্র শাহরিয়ার চৌধুরীর ওয়াইফ মিসেস আলো চৌধুরীকে হত্যা চেষ্টায় আপনাকে এরেস্ট করা হলো।

তেতে উঠলেন জামিল আহমেদ। পুলিশ অফিসার
এর দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলে উঠলেন,

” ফাইন ওকে! বাট এই জামিল আহমেদ কে থানা
অব্দি নিতে পারবেন তো?

পুলিশ অফিসার হাসলেন। নিজের পোষাকের মধ্যে হাত ছুঁইয়ে বলে উঠলেন,

” এই পোষাকটা পড়ি কেন জানেন? আপনাদের মতো কিছু সয়তানদেরকে শায়েস্তা করার জন্য। এটার পাওয়ার যতোক্ষণ আছে ততোক্ষণই আপনার রেহায় নেই।

হেঁসে উঠলেন জামিল আহমেদ। বলেন,

” যদি গায়ে পোষাকটা না থাকে?

সাথে হাসলেন অফিসার ও।

” যতোক্ষণ থাকবে আপনার মতে অপরাধীরা জেলেই থাকবে। মুক্ত আকাশের নিচে নয়। এই কনস্টেবল নিয়ে চলো একে৷

শাহানা বেগম ও আহি কান্না করছে। সব শেষ হয়ে গেলো। শান্তিপূর্ণ বাড়িটা আর সম্পর্ক সব এলোমেলো হয়ে গেলো৷

” দাঁড়ান অফিসার।

জামিল সাহেব এর সামনে এসে দাঁড়ালো মিহুল।
মিহুলকে দেখে জামিল আহমেদ বলেন,

” মিহুল বাপ এসেছিস তুই? দেখনা ওরা আমায় বিনা অপরাধে এরেস্ট করেছে৷

কি সুন্দর নিস্পাপ কথাবার্তা। সুন্দর মানুষের আড়ালে লুকিয়ে আছে কুৎসিত মন সেটা দেখে ফেলেছে মিহুল।

” অফিসার কোনো প্রমান লাগলে আমাকে বলবেন
আমি সাক্ষী দিবো ওনার বিরুদ্ধে। ওনি যেনো জেলের বাইরে না আসতে পারে। একটা মানুষকে বিনা কারনে মারার চেষ্টা করায় যতোটা শাস্তি প্রাপ্য তিনি যেনো এক বিন্দু ও কম না পায় সেইদিকে খেয়াল রাখবেন৷

আশাহত হলেন জামিল আহমেদ। ভেবেছিলেন ওনার পাশে থাকবেন কিন্তু তা হলো কই। তবুও তিনি হাসলেন। বলেন,

” যা ইচ্ছে করো। থানা অব্দি যাবে কি না ওইটা আগে দেখো।

” আমি ও দেখবো আপনাকে কে বাহির করে। ছাড়ানোর চেষ্টা করে।

” টাকা হলে সবই করা যায়৷ টাকার কাছে সবাই হার মানে বাপ।

” নিয়ে যান ওনাকে অফিসার।

চলেন গেলেন তারা। শাহানা বেগম এগিয়ে এসে কেঁদে ওঠলেন ছেলেকে জড়িয়ে ধরে।

” কেন মেয়েটার জন্য এতো পাগলামি করছিস বাবা? দেখ ওই মেয়ের জন্য আজ সব এলোমেলো হয়ে
গেলো। তোর বাবাকে তো তুই চিনিস তাহলে কেন গেলি? কেন মেয়েটার জীবনটার কথা ভাবলি না?

” ভাইয়া আলো কেমন আছে?

দুজনের কথার কোনো জবাব দিলো না মিহুল। মাকে ছাড়িয়ে রুমে চলে গেলো সে৷

দুজনেই মন খারাপ করে ফেলেন । ভেতর থেকে তীব্র ভাঙচুরের শব্দ এলো দুজনের কানে। ভয়ে আহি গেলো না। শাহানা বেগম দরজায় কড়া নাড়লেন কিন্তু মিহুল খুললো না৷ ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হলো শাহানা বেগম কে।

” আমি আমার আলোকে নিজের করবোই করবো।
জোড় করে হোক বা কিডন্যাপ করেই। ও আমার অন্য কারোর নয়।
_______________

সকাল আটটা বাজতে চলেছে। আফিয়া চৌধুরী ও
নীলিমা চৌধুরী এসেছেন৷ সাথে আতিকা বেগম ও
আসছেন। ছেলে ও মেয়েকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। তাদের এসব ন্যাকামি নাকি ভালে লাগে না। তাই অজুহাত দেখিয়ে চলে যায় দুজন।

আলোর সাথে দেখা করতে আসেন আফিয়া চৌধুরী।

” কেমন আছিস এখন?

আলো সামান্য হাসলো। বললো,

” ভালো আছি মামুনি। ততুমি তো শুঁকিয়ে গিয়েছো একদম! খাওনি?

আফিয়া চৌধুরী আলোর মাথায় আলতো হাত বুলালেন,

” আমার কথা বাদ দে। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যা।
তোর জন্য আমরা কেউ ভালো নেই রে। কবে যে বাড়ি ফিরবি।

চুপ করে তাকিয়ে রইলো আলো। সময় কম তাই চলে যেতে হলো আফিয়া চৌধুরীকে।

শুভ্রকে জোড় করে বাসায় পাঠানো হয়েছে। যে শুভ্র ময়লা একদমই পছন্দ করে না সে নিরদ্বিধায় একই জামাকাপড় ও নাওয়াখাওয়া ভুলে ছন্নছাড়ার মতো পড়েছিলো করিডোরের চেয়ারে।
_________________

নির্ঘুম রাতের পর শেষ প্রহরে চোখে লেগে এসেছিলো মিহুলের। ঘুম ভাঙতেই নিজেকে ফ্লোরে আবিষ্কার করলো সে। তাও দিনের বেলা খুবই খারাপ একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ধরফরিয়ে উঠে। তারমধ্যে দরজায় বার বার কেউ কড়া নাড়ছে।

বিরক্ত হয়ে ওঠে দরজা খুলতেই বিরক্তের রেশ কিছুটা বেড়ে গেলো মিহুলের।

” তুমি জেলে না থেকে এখানে কি করছো? ওরা তোমায় ছাড়লো কেন?

হাসতে হাসতে রুমের ভেতর এলেন জামিল আহমেদ।

” আমাকে কি ধরে রাখার জন্য নিয়ে গিয়েছে? যায় হোক আমি সব ভুলে গিয়েছি। তুমি ও তোমার অতীত ভুলে সুন্দর করে জীবন শুরু করো।

” আমার জীবন আমার ডিসিশন। তা নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। আমি কি করবো না করবো সেটা আমি জানি।

” মেয়েটা বেঁচে আছে ভালো লাগছে না বুঝি? তার চেয়ে বড় কথা অন্যের বউয়ের দিকে চোখ দিতে তোর লজ্জা করে না মিহুল?

” না করে না আমি ওকে ভালোবাসি।

” তোর এই ভালোবাসার কারনে দেখবি একদিন মেয়েটা মরে যাবে। ওদেরকে ওদের মতো বাঁচতে দে বাপ।

” আমি ওকে ছাড়া বাঁচবো না। কি চাও তুমি মরবো আমি? ফাইন!

এই বলে কিছু খুঁজতে লাগলো মিহুল। রাতে ভেঙে ফেলা কাচঁ দেখে এক টুকরো হাতে নিতে চাইলে ছেলেকে ঝাপটে ধরলো জামিল আহমেদ।

” কিচ্ছু করবি না তুই। তোকে মরার জন্য বড় করিনি।
বাবার কথা শোন। তুই ভালো থাকবি। তোর ভালোর জন্য বলছি।

” ভালো মাই ফুট! আমার ভালোর জন্য তোমায় টেনশন করতে হবে না।

” কি শুরু করেছো তোমরা? এই মিহুল কি করছিস তুই বাবা?

” ধরো ওকে ও যা শুরু করেছে ওকে বাঁধতে হবে। পাগল হয়ে গিয়েছে ছেলেটা। বাইরে রনিকে ডাক দাও
আর রশি নিয়ে আসো। তিনি বাইরে গিয়ে দ্রুত রনিকে নিয়ে আসলেন।

বাঁধ্য হয়ে রশি ও আনলেন শাহানা বেগম। কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে দিলেন স্বামীর দিকে। দুজনে মিলে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে বাঁধলো মিহুলকে।

” তোমরা কি আমায় পাগল বানাতে চাচ্ছো মা? প্লিজ আমার সাথে এমন করো না। আমাকে আলোর কাছে যেতে হবে। নয়তো স্যার ওকে নিয়ে যাবে। আলোকে স্যার ভালোবাসে না। কষ্ট দিয়েছে শুধু বোকা আলো ওর ভোলাভালা কথায় মেমে নিয়েছে সব। আমার কষ্ট আমার ভালোবাসা বুঝলো না ও।

” এভাবে বেঁধে রাখা যায় বলো?

” আমাদের ফ্যামিলি ডক্টরকে ফোন দাও। ওকে ক’দিন
মেডিসিন দিয়ে আটকে রাখতে হবে। নয়তো সম্ভব নয়।
ও পাগল হয়ে যাবে।

” আমার আলোকে মারার চেষ্টা করেছো তোমার আর স্যারের দুজনের কাউকে আমি ছাড়বো না আব্বু। আম্মু
আমার হাতের পায়ের বাঁধন খোলো বলছি। প্লিজ আম্মু!

” আমাকে মাফ করে দিস বাবা আমি কিছুই করতে পারবো না। তুই ওই মেয়েকে ভুলে যা। তুই ঠিক হয়ে যা
তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।

” আমি টিক হবো না আম্মু। আমি আলোকে চাই। ওকে কেন অন্য কেউ ভালোবাসবে? কেন ওকে অন্য কারোর সাথে থাকতে হবে? আমাকে যেতে দাও তোমরা! আমার আলো কষ্ট পাচ্ছে। তোমার স্বামী আমার আলোকে কতটা যন্ত্রণা দিয়েছে তা তুমি ভাবতে ও পারছো না। আমি ছাড়বো না কাউকে।

তিনজনই চলে গেলো দরজা লক করে।

চলবে,,,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here