#শুভ্রফুল —১৬
#কলমে_লিজা_আক্তার_আলো
[ কপি করা নিষিদ্ধ ]
” আ’আমি চাই এই তদন্ত এখানেই স্থগিত করা হোক! আপনারা প্লিজ আর কাউকে হেনস্তা করবেন না। আমি কাউকে দেখিনি।
পুলিশ অফিসার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন,
” আ’ম সরি মিসেস চৌধুরী এটা সম্ভব নয়। ব্যাপারটা এখন আর আমার আর আপনার মধ্যে নেই। এটা উপরমহলে অব্দি চলে গিয়েছে আর তার দায়িত্ব এখন আমার হাতে। আমার পক্ষে এখানে থামিয়ে দেওয়া ইম্পসিবল!
আলো অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেললো মুখ থেকে।
বলে উঠলো সে,
” আমার জীবন আমার জন্যই তো আপনি ন্যায় চাচ্ছেন সেখানে আমি চাচ্ছি দরকার নেই এই তদন্তের। আপনি আর কাউকে এই বিষয় নিয়ে জড়াবেন না। প্লিজ!
” আমাদের আইন মেনে চলতে হয়। আর আপনি কি কাউকে বাঁচাতে চাচ্ছেন? আইমিন আপনি জানেন কে?
আলোর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তবুও বলে,
” না আমি কাউকে বাঁচাতে বা কে সে কিছুই জানি না। কিন্তু, আমি চাই না আমার জন্য সবাই বিরক্ত হোক! প্লিজ স্যার আপনি একটু চেষ্টা করুন।
” ওকে ফাইন আমি দেখছি কি করা যায়৷ নার্স ওনি ঠিক নেই মনে হচ্ছে। প্লিজ কাইন্ডলি দেখুন,
” আমি দেখছি স্যার।
পুলিশ অফিসার বেরুতেই শুভ্র এলো অফিসারের সামনে।
” আলো কি বলেছে অফিসার?
” ওনি চাইছে তদন্ত এখানে বন্ধ করে দেওয়া হোক!
শুভ্রর এখন পুরো বিশ্বাস হলো আলোর সন্দেহের তালিকায় প্রথমেই তার নাম আর সেইজন্যই তাকে বাঁচাতে চাইছে।
” আপনি এই তদন্ত অফ করবেন না অফিসার। আমি আপনাকে হেল্প করবো। আমার ওয়াইফকে যে বা যারা মারার চেষ্টা করেছিলো আমি ও তাদের দেখতে চাই।
” কিন্তু আপনার ওয়াইফ তো বুঝতেছে না বিষয়টা। আপনি ওনাকে বুঝান নয়তো, নয়তো এতো বড় একটা অপরাধ অপরাধী পার পেয়ে যাবে। আমরা এখন আসি।
” জ্বি!
পুলিশ অফিসার চলে যাওয়ার পরই আসিফ চৌধুরী ও আরিফ চৌধুরী আসলো, আসিফ চৌধুরী বলেন,
” কি বললেন ওনি? কোনো…
” নাহ ড্যাড! আলো চাইছে তদন্ত অফ করে দিতে।
আমার সাথে ও কথা বলছে না। গেলেই সে ওভার রিয়াক্ট করছে। অস্থির হয়ে যাচ্ছে। এতে তো ওর আরো শরীর খারাপ করবে তাই এই মুহুর্তে আমার ওর সাথে কথা বলা যাবে না। প্লিজ ড্যাড এবং চাচ্চু তোমরা ওকে একটু বুঝাও। আর আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না। আ……
ফোন বেজে উঠলো শুভ্রর। কথা থামিয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিতেই হন্তদন্ত হয়ে বলে উঠলো
আহি,
” স্যার আমি জানি আলোকে কে মারতে চেয়েছিলো।
শুভ্র তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
” কে সে? বলো?
” স্যার আগে আমার কথা শুনুন আলো এখনো বিপদের মধ্যে রয়েছে। আপনাদের আশেপাশে বড়বাবার লোকজন আছে। আলোকে মেরে ফেলবে। বড়বাবা তাদের বলে দিয়েছে মেরে ফেলতে।
” বড়বাবা মানে?
আহি দরজা বন্ধ করে কথা বলছিলো। দরজায় কড়া নাড়লো শাহানা বেগম। চমকে উঠলো আহি,
তাড়াহুড়ো করে বললো,
” মমমিহুল ভাইয়ার বাবা। আমি রাখছি প্লিজ স্যার আপনি আলোকে বাঁচান।
কল রেখে দিলো আহি। একহাতে কপালে পড়ে থাকা এলোমেলো চুল গুলো পেছনে ঠেলে দিলো।
তারমানে সব মিহুলের বাবার কাজ? বুঝতে সময় নিলে ও দৌড় দিতে সময় লাগলো না শুভ্রর কারোর অনুমতির প্রয়োজন পড়েনি ভেতরে ডুকতেই কারোর সাথে ধাক্কা লাগে শুভ্রর। নার্স এর ড্রেস পড়া ছেলের সাথে। চোখ দেখেই চিনে ফেলে সে। দ্রুত ধরে ফেলে নাক মুখ বরাবর ঘুষি মারে। সাথে সাথে লুটিয়ে পড়ে ছেলেটা। পেছনে আসিফ চৌধুরী এবং আরিফ চৌধুরী ও এসেছে। ছেলেটাকে ধরে তারা। শুভ্র দ্রুত বোঝার চেষ্টা করে আলোর কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে কিনা তখন দেখা গেলো স্যালাইনের প্যাকেডের মধ্যে ইনজেকশন পুশ করা আছে। হয়তো কারোর আসার আওয়াজ পেয়ে ইনজেকশন না খুলেই পালানোর চেষ্টা করেছিলো। শুভ্র কোনো কিছু না ভেবে দ্রুততার সাথে আলোর হাতে থাকা স্যালাইনের ইনজেকশন
টা খুলে ফেললো।
ব্যাথায় ঘুমন্ত আলো মৃদু চিৎকার করে উঠলো।
” ড্যাড ডক্টরকে ডাকো ফাস্ট ওর শরীরে কোনো বিষাক্ত মেডিসিন দেওয়া হয়েছে।
আরিফ চৌধুরী গুন্ডা টাকে ধরে রাখে আসিফ চৌধুরী ডক্টরকে ডাকতে যান।
” তোর এতো বড় সাহস তুই আমার মেয়েকে মারতে চেয়েছিস তোর আজ এমন অবস্থা করবো যা সারাজীবন মনে রাখবি নেহাৎ এটা আইসিইউ
নয়তো এখানেই শুরু করতাম।
আইসিইউ রুম এর বাইরে নিয়ে গেলো আরিফ চৌধুরী।
গুন্ডা ছেলেটা মুচড়া মুচড়ি করছে ছুটার জন্য আরিফ চৌধুরীর থেকে কিন্তু পারছে না। কথা বলার শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো আলোর চোখের সামনে শুভ্রকে অস্থির হয়ে তাকাতে দেখে অবাক হলো। তার আগেই আলোকে সজাক দেখে শুভ্র বলে উঠলো,
” শরীর খারাপ লাগছে?
” আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই না। কেন এসেছেন আপনি?
” আমি জানতে চাচ্ছি তুমি ঠিক আছো কি না?
আমার সাথে যতোই রাগ থাকুক প্লিজ তা পরে দেখিও। এখন বলো তোমার খারাপ লাগছে কি না।
আলো জবাব দেয় না। শুভ্র কথা বাড়ালো না। এর মধ্যে নার্স ও ডক্টর আসলো।
” সরি স্যার আমার মাথাটা হঠাৎ কেন জানি ঘুরে উঠেছিলো তাই আসতে লেইট হয়ে গিয়েছে।
” কি হয়েছে পেশেন্টের?
” ডক্টর ওই গুন্ডাটা একটা ইনজেকশন পুশ করেছিলো স্যালাইনে প্লিজ চেইক করুন এটা কিসের আর আমার ওয়াইফের শরীর তা গিয়েছে কি না। প্লিজ কুইক!
” ইয়েস! নার্স এদিকে আসুন।
নার্স ও ডক্টর দুজনেই তাদের কাজ লেগে পড়েছিলো। নার্স জানাই যে ,
” ভয়ের কোনো কারন নেই, ওনার শরীরে তা যাওয়া সম্ভব নয় কারন স্যালাইন দেওয়া অফ ছিলো আমিই অফ করে দিয়েছিলাম।
সস্থির নিঃশ্বাস ফেলে শুভ্রসহ সকলে। শুভ্র বাইরে এসে রক্ত চক্ষু নিয়ে তাকালো এবার ছেলেটার পানে, এগিয়ে গেলো সেদিকে,
” তোর অবস্থা আজ খুবই করুন হবে আয় আমার সাথে।
” এখানে কোনো সিনক্রিয়েট করিস না শুভ্র আমরা
পুলিশকে ইনফর্ম করে দিয়েছি চলে আসছে তারা।
” না ড্যাড আমাকে কিছুক্ষণের জন্য ওর সাথে একা ছেড়ে দাও তারপর দেখো আমি কি করি।
” আর কোনো ঝামেলা চাই না আমরা। ওকে পুলিশের হাতে তুলে দিলে আসল অপরাধী ও সামনে চলে আসবে।
শুভ্র কিছুই বললে না পুলিশ অফিসার আসার অপেক্ষায় আছে সে।
__________________
এতো এতো লোক থাকতে ও কিভাবে পালালো?
ওকি আমার দেওয়া কথার কথা ভুলে গিয়েছে আমি কি করতে পারি? আর কিছুক্ষণের মধ্যে যখন মৃত্যুর খবর আসবে তখন বুঝবে আমার কথার অবাধ্য হওয়া কতটা ভয়ংকর হয়।
আহি কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে শাহানা বেগম
এর পাশে। মিহুলকে পালানোর সময় সাহায্য করেছিলো আহি। সবার আড়ালে বাড়ির পেছনে
নিজের বিয়ের শাড়িকে রশি বানিয়ে পালাতে সাহায্য করেছে সে। কারন মিহুলের এমন অবস্থা সহ্য করা যাচ্ছিলো না। ভয়ে আঁটশাঁট অবস্থা তার।
ইতিমধ্যে লোক পাঠিয়ে দিয়েছেন মিহুলকে খোঁজার জন্য এবং আলোকে মেরে ফেলার জন্য। আহি ভয় পাচ্ছে আলো কি ঠিক আছে? জানার প্রবল ইচ্ছে
তার। কিন্তু এই মুহুর্তে যা পরিস্থিতি কথা বললেই বিপদ।
_________________
” অফিসার আমার ওয়াইফকে আমি বা মিহুল নয় বরং অতি সম্মানিত ব্যক্তি সাবেক চেয়ারম্যান এবং
বিশিষ্ট ব্যবসায়িক জামিল আহমেদ ওরফে মিহুলের বাবা মারতে চেয়েছেন। এই নেন এখানে তারই ভাতিজির বলা কথা। আর ওই গুন্ডাকে একটু চাপ দিলেই সব সত্যি বের হয়ে আসবে। আমি চাই এই মুহুর্তে ওনার সাথে দেখা করুন।
” এই ছোট্ট প্রমানই আমাদের কাছে যথেষ্ট। আসছি আমরা। এই নিয়ে চলো ওকে।
” ইয়েস স্যার।
ভেতরে গেলো সবাই,
” আলো মা তুই ঠিক আছিস তো?
আসিফ চৌধুরীর কথায় মাথা নাড়ালো আলো।
বললো,
” আমি ঠিক আছি বাবা। তোমরা কোনো চিন্তা করো না।
” চিন্তা কি আর এমনি এমনি আসে রে মা! আচ্ছা তুই রেস্ট নে আমরা পাশেই আছি।
আরিফ চৌধুরী আসিফ চৌধুরীকে নিয়ে গেলো।
শুভ্রকে ইশারা করলেন আলোর কাছে যেতে। নার্স এবং ডক্টর ও বেরিয়ে গেলেন। শুভ্র ভেতরে এসে পাশে বসলো আলোর হাতটা শক্ত করে ধরলো।
” আমি কি করলে আমার উপর তোমার সব রাগ মুছে যাবে বলো তো?
আলো তাচ্ছিল্যের হাসলো। এই কথার জবাব না দিয়ে বলে উঠলো সে,
” মরে না গিয়ে বেঁচে থাকাটা আমার কাছে আফসোস হচ্ছে খুব!
কেন জানেন চৌধুরী সাহেব…?
দেহ থেকে আত্মাটা মুক্তি পেতো আর আমার থেকে আপনি মুক্তি পেতেন। আপনার প্রিয় রং সাদা শুভ্র কাফনে জড়িয়ে শেষ বারের মতো আপনাকে বিরক্ত করতাম। আমাকে আমার স্থায়ী ঘর অব্দি নিজের কাঁধে করে পৌঁছিয়ে দিতেন। আপনি মুক্তি পেতেন আলো নামক অন্ধকার অভিশাপ থেকে।
” আলো!
” আমি ঠিকই বলছি মি. চৌধুরী।
” আমার প্রতি তোমার এতো অবিশ্বাস এতো ঘৃণা?
আলো অক্সিজেন মাস্কের ভেতরেই হাসলো। আর বড় বড় শ্বাস নিচ্ছিলো। অনেকক্ষণ কথা বলেছে যে,
” নিজের প্রতি বিশ্বাসটাই হারিয়ে ফেলেছি আমি। অন্যের প্রতি বিশ্বাস থাকবে কি করে। আর কার উপর বিশ্বাস করবো আমি? দুদিন এসে কেউ আপন হয়ে যায় নাকি যেখানে এতোগুলা বছর আপন হয়েও দূরে ছিলো।
” আমাকে যেতে দিন আমি আলোর সাথে দেখা করবো। আমি আলোর কোনো ক্ষতি করবো না। বলছি তো আমি। প্লিজ ডক্টর ট্রাই-টুআন্ডাস্ট্যান্ড!
শুভ্র কন্ঠ শুনে রেগে দাঁড়িয়ে গেলো। বাইরে যেতে নিবে হাত ধরে ফেললো আলো। আলোর আলতো হাতের স্পর্শে থেমে গেলো শুভ্র।
” আপনি যাবেন না। প্লিজ কোনো ঝামেলা করবেন না।
” তুমি জানো তোমায় কে মারতে চেয়োছিলো?
তখন থেকে আমাকে ভুল বুঝতেছো। মিহুল তোমাকে ভালোবাসার অপরাধে নিজের ছেলেকে কিছু না বলে তোমার মেরে ফেলতে চেয়েছিলো। আমার থেকে তোমাকে আলাদা করতে চেয়েছিলো। নিজের ছেলেকে না সামলিয়ে ও তোমায় মারতে চেয়েছিলো। আজ আমি ওকে ছাড়বো না। সব ওর কারনে হয়েছে।
” না আপনি যাবেন না।
” আলো!
মিহুল দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। ভেতরে ডুকলো জোর করে।
” তুমি ঠিক আছো তো আলো? আ’ম সরি আলো
আমার জন্য তোমার এই অবস্থা। আব্বু আমার জন্য তোমার মারতে চেয়েছিলো। আমি পুলিশকে জানিয়ে দিয়েছি তোমার কিছুই হবে না। আমি এসে গিয়েছি। তোমার কিছুই হবে ন..
আলোর হাত ও শুভ্রর হাত একসাথে মুঠো বন্দী দেখে তাকিয়ে রইলো মিহল । চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে তৎক্ষনাৎ। শুভ্র বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
” বাবা মারবে আর ছেলে সহানুভূতি দেখাবে?
মিহুল চলে যাও তুমি। এটা আইসিইউ এখানে কোনো ধরনে সিনক্রিয়েট করতে চাচ্ছি না।
” আমি যাবো না আমি আলোর সাথে কথা বলতে আসছি। ও কিছু বলছে না আপনি বারন করার কে?
” আমি ওর হাসবেন্ড বুঝেছো তুমি?
” তাহলে এতোদিন কোথায় ছিলেন যখন ও একা একা কষ্ট পাচ্ছিলো। এখন আসছেন ভালোবাসা আর অধিকার দেখাতে?
” আপনার কি শুরু করে দিয়েছেন এটা আইসিইউ এখানে এভাবে কথা বলা বারন। এতো রোগীর অবস্থা আরো ক্রিটিকাল করে পারে।
” আপনি চলে যান মিহুল ভাই। আগে ও বলেছি আজ ও বলছি আমি আপনাকে ভালোবাসি না।
চলবে,,,,,,,

