শুভ্রফুল — ২২ #কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

0
27

#শুভ্রফুল — ২২
#কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

[ কপি নিষিদ্ধ ]

শুভ্র ডক্টর এর কেবিন থেকে বের হতেই নীলিমা চৌধুরী জেঁকে ধরলো, একের পর এক প্রশ্ন করে,

” কি হয়েছে শুভ্র? ডক্টর কি বললো তোকে? আলো ঠিক হবে তো? তোকে একা ডাকলো কেন? বলনা? টেনশন হচ্ছে তো আমার!

শুভ্র কিছু না বলে OT এর পাশে চেয়ারে বসলো জড়োসড়ো হয়ে। নীলিমা চৌধুরী পাশে এসে তড়িঘড়ি করে বসলেন ফের শুধালেন,

” কিরে চুপ করে আছিস যে, কিছু বল না.. আমার তো ভয় করছে।

” কিছুই হয়নি কাকিয়া। আলো ঠিক হয়ে যাবে ছোট্ট একটা অপারেশন করলেই হবে।

বড় করে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলেন নীলিমা চৌধুরী,

” আলহামদুলিল্লাহ! টেনশনে আমার হাত-পা কাঁপছিলো। যাক মেয়েটা দ্বিতীয়বার সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে ফিরে এলেই বাঁচি। কিন্তু, তুই তোর কি হলো হঠাৎ? আলো তো ঠিক হয়ে যাবে। তাহলে তুই এতো টেনশন করছিস কেন?

” না কাকিয়া আমি ঠিক আছি। আলোর অপারেশন সাকসেসফুল হলেই হবে।

” ইনশা’আল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো। সময় যেনো যাচ্ছেই না
দু’জনের। নীলিমা চৌধুরী বার বার বাইরে তাকাচ্ছে। কেউ আসছে না কেন? এতোক্ষণে তো আসার কথা। ভয় লাগছে শুভ্রর মুখের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত নীলিমা চৌধুরী। জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলছে না সে। হঠাৎ খানিকটা দৌড়েই ‘বলা চলে’ দুজন মানুষ এদিকে ছুটে আসছেন। আরিফ চৌধুরী ও আসিফ চৌধুরী। ভরসা পেলো নীলিমা চৌধুরী।

” কি হয়েছে হঠাৎ? আলো কোথায়?

” ও না ঠিক ছিলো কি হলো?

দু’জনেই একের পর এক প্রশ্ন। নীলিমা চৌধুরী বলেন,

” জানি না হঠাৎ করে পেট ব্যাথা উঠেছে। এখন ডক্টর বলছে আবার ও অপারেশন করতে হবে।
সকলের মুখে কেবল টেনশন। অপেক্ষাকৃত কখন
OT এর ভেতর থেকে ডক্টর আসবে শেষ হবে কখন
এই অপারেশন?

খানিকবাদে ডক্টর বের হলো হাসি মুখে।

” অপারেশন সাকসেসফুল। আপনার টেনশন করবেন না। পেশেন্ট ঠিক আছে।

তিনি চলে গেলেন৷ সবাই যেনো হাফ ছাড়লো।
___________________

“আমার কি হয়েছে? সামান্য পেট ব্যাথার কারনে
আবার ও অপারেশন করেছে কেন?

এই একটা কথা বার বার পুরো সপ্তাহ বলে গিয়েছে
আলো। জানার আগ্রহ বেশ। তবে শুভ্র ও বলেছে,
আগের অপারেশন সাকসেসফুল হয়নি বলে ফের করেছে অপারেশন। আলো বুঝলো না। তবে বাড়িতে আসার পর থেকে চুপচাপ থাকে। কারোর সাথে তেমন কথা বলে না। খাবার সামনে রেখে আনমনে কোথাও ডুবে আছে সে। কি ভাবছে মেয়েটা শুভ্র জিজ্ঞেস করলো এবার,

” আলো খাবারটা খাচ্ছো না কেন? আমি খাইয়ে দিচ্ছি দাঁড়াও।

” নাহ! আমার খিদে নেই৷ আপনার লেইট হচ্ছে তো।

” হোক! সমস্যা নেই এদিকে আসো।

” আমার শান্তি লাগছে না। খেতে ইচ্ছে করে না কেন জানি।

আলোর পাশে বসলো শুভ্র হাত ধরলো আলোর।
ভরসা স্বরূপ আশ্বাস দিলো,

” ভয় নেই আমি আছি তো কিছুই হয়নি। এমন মন খারাপ থাকলে ভালো লাগে বলো? মন খারাপ থাকলে শরীর ও খারাপ থাকে আর শরীর খারাপ মানে সুস্থতার অবনতি। সো নো টেনশন। তাহলে বলো আমি যাবো না ভার্সিটিতে।

” না না আমার জন্য আপনার আর ঝামেলায় পড়তে হবে না। আমি খেতে পারবো আপনি সাবধানে যান।

” বলেছিলাম জব টব করতে হবে না। নিজের বাবার বিজনেসে জয়েন করলে এখন পরাধীনতায় ভুগতে হতো না। মেয়েটাকে একটু সময় দিতে পারতি। সবসময় অন্যের কাছে অনুমতি নিতে হতো না।

আফিয়া চৌধুরী রুমে আসতে আসতে কথাটা বলে উঠলেন। শুভ্র জবাব দিলো না৷ আফিয়া চৌধুরী আলোর কাছে এলেন। পায়েসের প্লেটটা হাতে নিলেন। বললেন,

” নীলিমা অপেক্ষা করছে শুভ্র নিচে যেয়ে খেয়ে তারপর বের হবি। আমি আলোকে খাইয়ে দিচ্ছি। ওর মন খারাপ খাবে না নিশ্চয়ই। আর এই অবস্থায় না খেয়ে থাকলে সুস্থ হওয়ার কোনো চান্সই থাকবে না।

” আমি আসছি মম ওর দিকে একটু খেয়াল রেখো
আর আঁধারকে ওর কাছে আসতে দিও না।

” আচ্ছা।

শুভ্র আলোর দিকে তাকালো ফের রুম থেকে প্রস্থান করলো। খাওয়া শেষ হতেই তিনি আলোর দিকে তাকিয়ে বলেন,

” আলো মন খারাপ কেন? কিছু হয়েছে তোদের মধ্যে?

” না মামুনি কি হবে?

” তাহলে এভাবে মুড অফ করে আছিস কেন?

” এমনি ভালো লাগছে না।

” মেডিকেল থেকে আসার পর না কথা বলছিস ঠিক মতো, না খাচ্ছিস। শুভ্রকে ও দেখি চুপচাপ থাকে।
কি হয়েছে তোদের দুজনের?

আলো খেয়াল করলো ঠিকই তো শুভ্রর ও কিছুটা মন খারাপ কি ভাবে ও? আলো বলে,

” জানি না মামুনি৷ এমনি অসুস্থ থাকলে মন খারাপ থাকবে এটাই কি স্বাভাবিক নয়?

আফিয়া চৌধুরী বলেন,

” তা ঠিক বলেছিস। তোর বাবা জানালো তোর চাচিতো আসতে চাইছে। কি চাস ওনি আসুক?

আলো অবাক হলো। ওনার তো বাবার বাড়ি অনেক বড়লোক টাকা পয়সার অভাব নেই। তিনি তার বাবার বাড়ির একমাত্র মেয়ে। চাচার সাথে প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন বিদায় নিঃসন্তান হওয়ার পরও ছেড়ে যাননি চাচাকে। আর এখন বাবার বাড়ি না গিয়ে এখানে আসতে চাইছে কেন? তিনি তো সহ্য করতে পারেননা আলোকে। আলো ভাবতে লাগলো। ওমনি বাইরে হাঁক ছেড়ে ডাকতে লাগলো নীলিমা চৌধুরী।

” আপা একটু নিচে আসো তো। একজন মহিলা এসেছেন গ্রাম থেকে।

বুঝতে বাকি রইলো না দুজনের কে আসছে।

” আমি যাবো মামুনি।

” না তোকে যেতে হবে না। আমি দেখছি কে আসছে।

” চাচি আসছে আর কেউ কি গ্রাম থেকে আসার কথা?

” না তো।

জোড় করেই ওঠে দাঁড়ায় আলো। যাবে সে নিচে।
আফিয়া চৌধুরী ধরলেন আলোর হাত। আস্তেধীরে নিচে আসলেন। চাচিকে দেখে প্রায় অবাক হলো আলো। এমন ছন্নছাড়া দেখাচ্ছে কেন মহিলাটাকে। যাকে কাজ তো দূর ধুলোবালি ও ছুঁতে পারতো না। আর এই কদিনে এই অবস্থা হলো?

আলোকে দেখে দ্রুত পায়ে কাছে আসলেন আলোকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করতে নিলেই আফিয়া চৌধুরী বাধ সাধে। বলেন,

” এভাবে ধরবেন না ব্যাথা লাগবে ওর।

” ও না সুস্থ তাহলে? কেমন আছিস আলো? তুই আমাকে মাফ করে দিস মা। তোর সাথে আমি অনেক অন্যায় করেছি। ভাইজান আমাকে বোকা বানিয়ে সব সম্পত্তি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছে এখন আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। দরকার হলে আমি তোর স্বামীর বাড়িতে কাজ করবো। কাজের লোক ভেবে রেখে দে না মা।

” শান্ত হও চাচি। বসো তারপর যা বলার বলো।

চাচি মানে আলিয়া জাহান বসলেন সোফায়। আলো ও আফিয়া চৌধুরীসহ নীলিমা চৌধুরী বসলেন। আলিয়া জাহান আবার ও বলেন,

” আমি স্বীকার করছি আলো আমি তোর সাথে অন্যায় করেছি কিন্তু ভুল তো মানুষই করে আমাকে কি মাফ করা যায় না? একটু দয়া কর আমার উপর। আমি ও যে তোর মতো এতিম।

” আলো এতিম নয় ওর মা বাবা পরিবার ভাই বোন সবাই আছে। আলো ওনার কথায় গলে যাবি না। আমার মনে হয়না ওনি নিজেকে শুধরে নিয়েছে। খারাপ কখনো ভালো হয় না। ওনি পরিস্থিতির জন্য অসহায় সাজতেছেন।

” নীলিমা এভাবে কথা বলছিস কেন? ওনি তোর বড় হয়।

” না বেয়ান ওনি ঠিকই বলেছে। আমি অনেক খারাপ। ছোট্ট মেয়েটাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি আমি। কখনো মায়ের আদর ভালোবাসা দেওয়া তো দূর খেতে অব্দি দিতাম না। কত কাজ করেছে তবুও মন গলেনি। ঠিক আছে আপনারা জায়গা না দিলে রাস্তায় থেকে ভিক্ষা করতে হবে আমায়। আচ্ছা আপনাদের অনেক কষ্ট দিলাম আমি আসি।

আলো অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। শত হোক
চাঁচি হয় ওর। কিন্তু এটা তার শশুর বাড়ি ওরা যদি না চাই সেখানে ও কি বলবে তাই সাহস করলো না কিছু বলা কিংবা আটাকনোর। আফিয়া চৌধুরী আলোর মুখপানে তাকালো। শুধালো,

” যাবেন না বেয়ান। আপনি আলোর সাথেই থাকবেন৷

নীলিমা চৌধুরী খুশি ছিলেন আলিয়া জাহান চলে যাওয়াতে কিন্তু আফিয়া চৌধুরীর কথায় মনটা বিষণ্ণ হয়ে এলো। ওনি আলোকে অনেক অত্যাচার করেছে আর এখন সাথে রাখবে যদি কোনো ক্ষতি করে? সাপকে কি কখনো বিশ্বাস করা যায়? দুধ কলা দিয়ে পুষলে ও দিনশেষে ছোবল দেয়। নীলিমা চৌধুরীর কাছে ও ওনাকে সাপের মতো লাগে কারন তিনি আলিয়া জাহানের আসল রুপ দেখেছেন কতটা হিংস্র তিনি তা খুব ভালো করেই বুঝেছেন। তিনি আলোর হাত ধরে মৃদু স্বরে বলেন,

” আলো ভুল করছিস তুই। আপাকে বল ওনি চলে যাক। ওনি তোর ক্ষতি করবে। ভালো মানুষ নন।

” কাকিয়া ওনার তো যাওয়ার মতো জায়গা নেই।
কোথায় যাবে চাচি। নারণ করলে আমি ও তো ওনার মতো হয়ে যাবো। তাহলে দুজনের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

বিরক্ত হলো নীলিমা চৌধুরী। মহিলাটা খুশি হয়ে ভেতরে আসে। আফিয়া চৌধুরীর সাথে বসে তৎক্ষনাৎ। বলে,

” আপনি না জায়গা দিলে এখন আমায় রাস্তায় থাকতে হতো বেয়ান। কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবো সেই ভাষা আমার নেই।

আফিয়া চৌধুরী আলিয়া জাহানের কথায় হাসলেন। বলেন,

” মানুষ কিংবা জিনিস সবার কাছে মূল্য পায় না বুঝলেন বেয়ান। কারোর কাছে কাজের হলে ও তুচ্ছ ভাবে। আবার কারোর কাছে তুচ্ছ হলে ও মূল দেয়। সেটায় মনুষ্যত্ব। সর্বশ্য হারিয়ে আপনার বিবেকবোধ জাগ্রত হলো ভেবে ভালো লাগলো। আলোর মন খারাপ হচ্ছিলো আপনার চলে যাওয়াতে। তাই না আঁটকে থাকতে পারলাম না। আপনি আলোর সাথে সবসময় থাকবেন। ওর ও ভালো লাগবে।

” আমি আলোর সাথেই থাকবো। ওকে অনেক অবহেলা করেছি এখন ওকে মেয়ের মতো আগলে রাখার পালা তবেই তো আমার অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত হবে।

” এই রেখা ওনাকে গেস্ট রুমটা দেখিয়ে দাও তো।
আপনি যান অনেক দূর থেকে আসছেন রেস্ট নেন। পড়ে কথা হবে। রেখা ওনার খাবারটা ও পাঠয়ে দিও রুমে।

আলিয়া জাহান চলে যেতেই নীলিমা চৌধুরী বলে উঠলো,

” তোমরা খুব বড় ভুল করেছো আপা। ওই মহিলা ভালো নয়। আলো তুই ও চুপ করে রইলি? পস্তাবি কিন্তু বলে দিলাম। কিছু হলে আমি ওনাকে ছেড়ে কথা বলবো না।

আলো মাথা নুইয়ে ফেললো। আফিয়া চৌধুরী বলেন,

” বাদ দে নীলিমা৷ বিপদে পড়েছেন ওনি। কোথায় যাবে বল? আর আমরা আছি না আলোর পাশে কিছুই হবে না।

নীলিমা চৌধুরী রাগ করে চলে গেলেন৷ আলোর মুখটা ভার, বুঝলো না তার কি করা উচিত। প্রায় দোটানায় আঁটকে পড়লো। আফিয়া চৌধুরী আলোর কাঁধে হাত রেখে বলে,

” আমি জানি তোর কষ্ট হচ্ছিলো ওনার চলে যাওয়াতে। তাই তো রাখলাম ওনাকে। কিন্তু সাবধানে থাকবি। ভালো হলে ভালো আর যদি আগের মতোই থাকে ভয় হয়। নীলিমা তো রাগ করে চলে গেলো।

” চিন্তা করো না মামুনি। কিছুই করবে না কারন ওনার এই বাড়িতে থাকা ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। তাই ওনি কিছুই করবে না এতে নিজেরই বিপদ।

পুরোটা দিন কেটে গেলো। আলিয়া জাহান নিজের রুমে রেস্ট করছেন। সেই যে গিয়েছেন আর বের হয় নি। আলোকে উপরে দিয়ে আসলেন রেখা। নীলিমা চৌধুরীর রাগ কমেনি। তিনি ও রুমে চলে গিয়েছেন। আঁধার ঘুমিয়েছিলো। আর আলোর কাছে আসতে দেয়নি গতকাল মেয়েটাকে ব্যাথা দিয়েছিলো বলে।

আলো অপেক্ষা করছে কখন শুভ্র আসবে বাসায়।
রাতে ঘুমোতে পারেনি ঠিক মতো। ক্লাস করাতে পারবে তো লোকটা? আলোর খারাপ লাগলে নিজের ঘুম একপাশে রেখে দিয়ে শুভ্র আলোর জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। কেবলি রাতের শেষ প্রহরে ঘুমিয়েছিলো। এখনো আসছে না কেন?
_____________________

” এই যে হ্যান্ড’সাম বয় ভুলে বসলে নাকি আমাকে?

চলবে,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here