আমার উপমা তুমি (২০)
আফরোজা আঁখি
মাত্রই ওয়াশরুম থেকে বেরুলো ইয়াশ। মাথার ভেজা চুলগুলো টাওয়ালের সাহায্যে মুছতে মুছতে এসে দাঁড়িয়েছে আয়নার সামনে। একবার নিজেকে ভালো করে পরখ করলো, তারপর গিয়ে দাঁড়ালো বিছানায় শুয়ে থাকা কাশফিয়ার পাশে। মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে এক ধ্যানে কাশফিয়ার মুখটার দিকে তাকিয়ে আছে ইয়াশ,মনে মনে ভাবছে, —-“আমার মতো হ্যান্ডসাম, ড্যাশিং, গুড লুকিং একটা ছেলেকে কিনা এই মেয়ে আধবুড়ো বলে! এমন অন্যায় মানা যায়?”
পাশে কারো উপস্থিতি ঠের পেয়ে কাশফিয়া চোখ খুলে তাকাল, ইয়াশকে সামনে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল,
“কি দেখছেন?”
“আমার উপমাকে।”
কথাটা বলেই মিষ্টি হাসল ইয়াশ, উঠে বসল বিছানায়। কাশফিয়ার কাছে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ালো কাশফিয়ার ঠোঁটে। হঠাৎ স্পর্শে কেঁপে উঠল কাশফিয়া, শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ইয়াশকে। ইয়াশের ঠোঁটের ছোঁয়া গভীর হচ্ছে, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে কাশফিয়ার। ইয়াশকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল সে,
“কি করছেন এসব? রোমান্টিক ভুতটা বিরক্ত করছে?”
“আমাকে আধবুড়ো বলার শাস্তি দিচ্ছি।”
প্রতিউত্তর করল না কাশফিয়া, কি যেন ভাবছে সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে তাকাল ইয়াশের দিকে। পরনের এলোমেলো শাড়িটা ঠিক করে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ইয়াশের কানের কাছে গিয়ে বলল,
“আপনাকে আধবুড়ো বলার শাস্তি যদি এতো মিষ্টি হয় তাহলে আজকের পর থেকে আমি আপনাকে উঠতে বসতে ১০০ বার আধবুড়ো বলব।”
কথাটা বলেই এক দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেছে কাশফিয়া। বারবার ডেকেও ইয়াশ দাঁড় করাতে পারল না তাকে। ওর থেকে পালাতেই যে এটা করল, বুঝতে বাকি নেই ইয়াশের। ওয়াশরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ইয়াশ। কাশফিয়াকে ডেকে বলছে,—-“উপমা।”
আস্তে করে উত্তর দিল কাশফিয়া,—-“কি হলো?”
“বিছানার উপরে রাখা শাড়িটা পড়ে রেডি হয়ে এস, আমি অপেক্ষা করব।”
ইয়াশের কথা কাশফিয়ার কানে গেলো কিনা সন্দেহ! উত্তর না পেয়ে আবারও ভাবল ডাকবে ওকে। উজ্জ্বল তখন ওর রুমের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল, দরজা খোলা তাই চোখ পড়ল ইয়াশের দিকে। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল উজ্জ্বল,
“বাবাহ! বদমেজাজি ইয়াশ কিনা বউ পাগল ইয়াশে পরিণত হয়েছে! প্রেম ভালোবাসা তো ভালোই চলছে, তা আমি চাচ্চু হচ্ছি কবে?”
ইয়াশ ঘুরে তাকাল উজ্জ্বলের দিকে, আস্তে আস্তে দরজার দিকে এগিয়ে এসে বলল,—-“খুব শীঘ্রই।”
উজ্জ্বল হাসল কেবল, চলে গেল নিজের রুমে। ইয়াশ বসে আছে সোফায়, ফোন ঘাটছে নিজের। কখন কাশফিয়া ওয়াশরুম থেকে বেরুবে তারই হয়তো অপেক্ষা করছে এতো সময় ধরে।উজ্জ্বলের নাম্বারটা থেকে কল আসছে বার বার ইয়াশ ভাবলো দরকারী কিছু বলবে উঠে পা বাড়ালো বাইরে যাবে বলে তখনই সামনে এসে দাঁড়ালো কাশফিয়া। পেটিকোট ব্লাউজ ছাড়া পরনে আর আর কিছুই নেই কাশফিয়ার, ইয়াশের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসছে সে। ইয়াশের রাগ লাগছে কাশফিয়ার এমন আচরণে দ্রুত দরজা আটকে দাঁড়িয়েছে এসে ওর সামনে বলেছে মেজাজ দেখিয়ে,
“জামা কাপড় নেই তোমার,এসব কি?”
কাশফিয়া হাতে ইয়াশের দেওয়া শাড়িটা নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলো। ইয়াশের এমন রাগান্বিত চেহারা দেখে শাড়িটা ছুড়ে ফেলল বিছানায়। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে বলল অভিমান করে,
“সবসময় এভাবে বকাঝকা করেন কেন? আমাকে এখন আর ভালো লাগে না তাই?”
চোখ বন্ধ করে একটা শ্বাস ছাড়ল ইয়াশ,মনে মনে বকাবকি করলো নিজেকেই। মাঝেমধ্যে যে কেন এমন করে নিজেও জানেনা সে। কাশফিয়ার অভিমান হয়েছে বুঝল ইয়াশ,পিছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরল গিয়ে।
“যে শাসন করে, সেই তো বেশি ভালোবাসে উপমা!ভালোবাসি কথাটা কি মুখে বলতে হয় বারবার? ভালোবাসি না বললেও তোমাকে আমি ভালোবাসি। আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি তোমাকেই ভালোবেসে যাব। তুমি আমার সূচনায় ছিলে, আর শেষ নিঃশ্বাসেও তুমিই থাকবে। আমি তোমাকে ভালোবাসি উপমা, নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসি। আমি চাই তুমি কেবল আমার থাকো তোমার ভাবনা, ভালোবাসা সবটাই হোক আমাকে ঘিরে।তাইতো এতো আগলে রাখি তোমায়।”
শান্ত হলো কাশফিয়া, তাকাল ইয়াশের মুখপানে। মনে মনে নিজের উপরেই রাগ হলো ওর বার বার না বুঝেই কেন ভুল ভাবে ইয়াশকে! ইয়াশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল কাশফিয়াকে, কাশফিয়াও নিজের মাথা রাখল ইয়াশের বুকে। ভুল বোঝাবুঝি মিটে গেলো দুজনের। কিছু সময় না যেতেই হইচই শুরু হয়েছে নিচে। কানে এল ইয়াশ কাশফিয়া দুজনেরই। কাশফিয়াকে রুমে বসতে বলে ইয়াশ নিচে নামলো কি হয়েছে জানবে বলে। উজ্জ্বলের মুখে সবটা শুনে বুঝল, বাড়ির আশেপাশে ঈশানকে দেখেছে সিমিসহ অন্যরাও। রাগ হলো, ঈশানের ফর্সা চেহারাটা অন্ধকারে ঢেকে গেল মুহূর্তেই। কাউকে কিছু না বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল ইয়াশ। পিছু পিছু গেল উজ্জ্বলও।
——————–
কাশফিয়াদের চলে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে, হয়তো আরও কিছুদিন এখানে থাকবে, তারপর আবার লন্ডন ব্যাক করবে ওরা। আজকে কাশফিয়া সকাল থেকেই রান্নাঘরে, শাশুড়িকে সাহায্য করছে সকল কাজে। আফিয়া মাত্রই এসেছে রান্নাঘরে, কাশফিয়াকে এতো কাজ করতে দেখে বারবার বলছে ওকে রুমে যেতে। কিন্তু কাশফিয়া শুনল না ওর কথা। আফিয়া এগিয়ে গেল, কাশফিয়ার হাতে থাকা খুন্তিটা কেড়ে নিয়ে বলল,
“তোমাকে এসব করতে হবে না কাশফিয়া। তুমি আমার ভাইয়ের একমাত্র আদরের বউ। এসব করছ জানলে সে আমাদের গর্দান নেবে। তুমি বরং আমাকে ফুপি ডাক শুনানোর দায়িত্বটা পালন করো।”
শেষের কথাটায় কিছুটা লজ্জা পেল কাশফিয়া। সুফিয়া বেগমও মুচকি হাসছেন, মেয়ে-বউমার কথা শুনে। কাশফিয়ার চোখ গেল দরজার দিকে। মমী এসে দাঁড়িয়ে আছে অসহায়ের মতো। কাশফিয়ার কেমন মায়া হলো ওকে দেখে। কাছে গিয়ে কোলে নিল মমীকে। আফিয়া আর সুফিয়া বেগমের কথা মেনে, যেতে শুরু করল নিজের রুমের দিকে।
রোহির রুমের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল কাশফিয়া। দরজাটা খোলা দেখে চোখ গেল নিস্তব্ধ রুমটার দিকে। পা জোড়া থেমে গেল ওর। দরজায় লাগানো পর্দাটা সরাতেই দেয়ালে টাঙানো রোহির ছবিটায় চোখ আটকে গেল ওর। আস্তে আস্তে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালো ছবিটার সামনে। রোহির শ্যামলা মুখের মন ভোলানো সেই হাসিটা আবারও দেখল কাশফিয়া। নিঃসন্দেহে ওকে নাম দেওয়া যায় মায়াবতী। এই অতি সুন্দর মেয়েটাকে ইয়াশ এতো অবজ্ঞা করল ওর জন্য! মাঝেমধ্যে এগুলো ভাবলে মনে হয়, রোহি সত্যিই বলতো কাশফিয়া ভাগ্যবতী।
দেয়ালে টাঙানো রোহির ছবিটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল কাশফিয়া। ও নেই ভাবতেই বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সেদিন যদি কোনোভাবে রোহির জায়গায় কাশফিয়া গিয়ে দাঁড়াত, কোনোভাবে যদি বেঁচে যেত রোহি, হয়তো মেয়েটার অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো কিছুটা হলেও সত্যি হতো! সিমির ডাকে ধ্যান ভাঙলো কাশফিয়ার। নিজেকে স্বাভাবিক করে বেরুলো রোহির রুম থেকে। যাওয়ার আগে পুরো রুমটাতে চোখ বুলিয়ে গেল সে।
————————
ঈশানকে পাগলের মতো খুঁজে যাচ্ছে ইয়াশ। ওর নামটা মাথায় এলেই রাগে রক্তবর্ণ ধারণ করছে ওর চোখ দুটো। ঈশানকে নিজ হাতে মারতে না পারলে শান্তি পাবে না সে। এগুলো ভাবতে ভাবতে পারিবারিক কবরস্থানের দিকে যাচ্ছিলো ইয়াশ। আজকে একবার ঘুমন্ত পরীকে দেখে আসবে সে। রোহির কবরের সামনে আসতেই থমকে দাঁড়ালো ইয়াশ। ওর উপস্থিতি টের পেয়েই কেউ একজন দ্রুত চলে গেলো ওখান থেকে। ইয়াশের সন্দেহ হলো মনে হলো লোকটাকে আগেও দেখেছে। কিছু না ভেবেই পিছু নিল। কিছুদূর যেতেই সুফিয়া বেগমের সাথে ধাক্কা লাগল ইয়াশের। উনার চিন্তিত মুখটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে আম্মু? আমার উপমা ঠিক আছে?”
সুফিয়া বেগমের কেমন লাগছে ইয়াশকে এখানে দেখে, ভয়ে হাত পা কাঁপছে উনার। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
“না… আ, বউমা ঠিক আছে।”
“তাহলে এই অসময়ে এখানে আসলে যে? আমি এখানে আসছি এটা তো তোমাকে বলেই আসলাম।”
কি উত্তর দেবেন বুঝতে পারলেন না সুফিয়া বেগম। শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বললেন,
“এ…এমনি ইয়াশ। পুলিশের মতো জেরা করছ কেন?”
“কারণ আছে তাই! তুমি ঈশানের সাথে দেখা করতে এখানে এসেছো, তাই না আম্মু?”
কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন সুফিয়া বেগম। ইয়াশ বুঝল কী করে বিষয়টা। মায়ের থমথমে মুখটা দেখে বুঝতে বাকি নেই, তার আন্দাজটা তাহলে ঠিক! ইয়াশের রাগ হলো প্রচণ্ড। এত কিছুর পরেও ঈশানের প্রতি ওর মায়ের মায়া কমেনি! ছেলের রাগান্বিত মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে আছেন সুফিয়া বেগম। সামনের রাস্তা ধরে ইয়াশ যেতে চাইলে উনি থামিয়ে দিয়ে পর হাত ধরে বললেন,
“ঈশান রোহিকে মা’রেনি ইয়াশ। রোহি তো ওর বোন, কীভাবে ওকে মারবে বল?”
ইয়াশ এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল মায়ের থেকে। রেগে কিছু বলতে যাচ্ছিল, থেমে গেল উজ্জ্বলের চোখের ইশারায়। ওদের থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে উজ্জ্বল। আস্তে ধীরে সুফিয়া বেগমের পাশে এসে দাঁড়াল, রাগত্ব স্বরে বলল উনাকে,
“আপনার আবেগ আপনি নিজের কাছেই রাখুন চাচি। ক্যাফের সিসি টিভি ফুটেজ দেখে আমি আন্দাজ করেছি, ওটা ঈশানই। বাংলাদেশ পুলিশ ওকে খুঁজছে, সেজন্যই তো পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে! ও এসে যেই না মন বোলানো কথা বলল, আপনি গলে গেলেন? আমার অসুস্থ বোনটাকে ও মে’রে ফেলেছে। আপনি যদি ওর ছটফটানি দেখতেন তাহলে বুঝতেন, কতোটা কষ্ট পেয়ে সে মা’রা গেছে। আমার বোনের জায়গায় আপনার মেয়ে থাকলেও ঈশানের প্রতি এভাবে মায়া দেখাতেন?”
কিছু বললেন না সুফিয়া বেগম। বলার ভাষাও নেই উনার। সত্যিই তো, ঈশানের মিথ্যা কথায় এতো প্রমাণ পাওয়ার পরেও তিনি বিশ্বাস করে নিলেন, ও কিছুই করেনি! না না, উনি ভুল। কিন্তু ঈশানের প্রতি যে উনার আলাদা মায়া। শতবার ভুল করেও কাছে এসে আম্মু বলে ডাকলেই উনার মন গলে যায়!
ইয়াশ আর উজ্জ্বল দুজনেই ছুটলো রেলস্টেশনের রাস্তাটা ধরে। সুফিয়া বেগম পাথরের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন ওখানে, তারপর আবার হাঁটতে শুরু করলেন ওদের সাথে। কিছুদূর গিয়েই ঈশানকে পেয়েও গেলো ইয়াশ। ঈশান দাঁড়িয়ে আছে রেল লাইনে। অন্যদিক থেকে ঝনঝন শব্দ তুলে এগিয়ে আসছে ট্রেন। ইয়াশ বুঝল, ঈশান আ’ত্মহ’ত্যা করতে চাইছে। কিন্তু ইয়াশের যে ইচ্ছে করছে ওকে ইচ্ছেমতো মার’তে, মার’তে মা’রতে মে’রে ফেলতে! বাঁচিয়ে রেখে মৃত্যুর স্বাদ দিতে! ইয়াশ এগিয়ে যাচ্ছিলো ঈশানের দিকে, উজ্জ্বল ওর হাত ধরে নিল। চোখের ইশারায় বাধা দিল যেতে। সুফিয়া বেগম লক্ষ্য করলেন সবটা, চিৎকার দিয়ে ডেকে উঠলেন ঈশানকে,
“ঈশান, চলে আয় বাবা! ট্রেন আসছে!”
ঈশান নিষ্প্রাণ চোখে তাকাল মায়ের দিকে। মৃত্যু অতি সন্নিকটে, বুঝতে পারল সে। তবুও ঠোঁটে হাসি টেনে বলল সুফিয়া বেগমের উদ্দেশ্যে,
“আমি পাপ করেছি আম্মু, আমার প্রতি কোনো মায়া বাঁচিয়ে রেখো না, আমাকে মর’তে দাও। আমি কাশফিয়ার ক্ষতি করতে চেয়েছি। হুশ জ্ঞান হারিয়ে, টাকার লোভে ইয়াশকে মারতে চেয়েছি। রোহির মৃত্যুর কারণও আমি। আমি যে ম’রার মতো বেঁচে আছি! চোখ বুজলেই রোহি বারবার আমার সামনে আসে, কৈফিয়ত চেয়ে বলে ভাইয়া, আমার ভুল কী? কেন এমন করলে আমার সাথে? আমার ভেতরটায় যন্ত্রণা হয় আম্মু, আমি মুক্তি পেতে চাই। মৃত্যু ছাড়া যে এর উপায় নেই। তুমি ভালো থেকো আম্মু, তোমার এই পাপী ছেলেটাকে ভুলে যেও।”
কথাগুলো বলে থামল ঈশান। ইয়াশের কানে বাজছে বারবার
টাকার লোভে মা’রতে চেয়েছি মানে? কে ঈশানকে টাকা দিয়েছে ওকে মা’রার জন্য?
ভাবনার জগৎ থেকে বেরুলো ইয়াশ, দ্রুত ছুটে গেল ঈশানকে বাঁচাতে। কিন্তু হাত উঁচিয়ে ওকে থামতে বলল ঈশান। ইয়াশ তবুও শুনল না ওর কথা। কাছে যাওয়ার আগেই ট্রেনের নিচে কাটা পড়ল ঈশান। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল ওর শরীরটা। পায়ের গতি কমে গেল ইয়াশের। থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল ওখানেই। মনের মধ্যে একটু হলেও খারাপ লাগা কাজ করছে ওর। ছেলেটার চোখে যে আফসোস দেখেছিল, বাঁচতে চাওয়ার প্রবল ইচ্ছা দেখেছিল মানুষ তার ভুল বুঝতে পারলে তো তাকে বাঁচার সুযোগ দেওয়া উচিত। এই ভেবেই ইয়াশ ছুটে গিয়েছিল ওকে বাঁচাতে। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। একদিক থেকে ঈশানের জন্য খারাপ লাগলেও রোহির মুখটা মনে পড়লেই ঈশানের প্রতি রাগ লাগছে। ওর মনে হচ্ছে এটাই ওর প্রাপ্য।
উজ্জ্বল দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশের থেকে কিছু দূরে। ঈশানের মৃত্যুতে যায় আসে না ওর। এত ঘৃণা জন্মেছে বোনের মৃত্যুর পরেই, আর আজ তো ঈশান নিজ মুখেই বলল সবটা! সুফিয়া বেগম তখনই দপ করে বসে পড়েছিলেন মাটিতে। চোখের সামনে ছেলের মৃত্যু মানতে পারছেন না তিনি। পাথরের মতো বসে আছেন এখনও। কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন সুফিয়া বেগম। উনার স্বামী আনোয়ার সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন সামনে। শুরু থেকে সবটাই শুনলেন তিনি। স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই উনার কাছে। তবুও বললেন,
“এটাই ঈশানের নিয়তি, মেনে নাও সুফিয়া। আমরা কান্নাকাটি করলেও ও আর ফিরে আসবেনা।”
——————-
ঈশানের মৃত্যুর আজ চতুর্থ দিন। সুফিয়া বেগম সেদিন থেকেই দরজা লাগিয়ে বসে আছেন নিজের রুমে। প্রয়োজন ছাড়া বের হন না তেমন। যতই ভুল করুক ঈশান, চোখের সামনে ওর এমন যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু কষ্ট দিচ্ছে উনাকে। বারবার দৃশ্যটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। ওকে তো ছোটবেলা থেকে মানুষ করেছেন কোলে পিঠে করে। সবার থেকে ভালোবাসা দিয়েছেন বেশি সেই ছেলে কিনা চোখের সামনে মারা গেল ওভাবে! কিছুতেই যে ছেলের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে পারছেন না সুফিয়া বেগম।
দরজাটা হালকা খোলা ছিল। সুফিয়া বেগমের চোখ গেল দরজার দিকে। বুঝলেন, কেউ দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। নিজেকে স্বাভাবিক করে, দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে প্রশ্ন করলেন,
—-“কে ওখানে?”
সাথে সাথেই দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল কেউ। তাকিয়ে দেখলেন সুফিয়া বেগম, কাশফিয়া এসেছে উনার রুমে। বউমাকে দেখে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো মুহূর্তেই। কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বললেন,
“কি হয়েছে মা? কিছু লাগবে?”
“উঁহুম, তোমাকে দেখতে আসলাম।”
সুফিয়া বেগম মিষ্টি হেসে বললেন কাশফিয়াকে,—-“আচ্ছা।”
কাশফিয়াও হাসল উনার হাসির উত্তরে। হেঁটে গিয়ে বসল বিছানায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল সুফিয়া বেগমকে,—-“তোমার ছেলে পাঠালো।”
অবাক চোখে তাকালেন সুফিয়া বেগম। ইয়াশ পাঠিয়েছে তার বউকে, সুফিয়া বেগমের খবর নেওয়ার জন্য! ছেলের সাথে সম্পর্কটা উনার এতোটার তিক্ত হয়ে গেছে যে, শেষ কবে সুন্দর মতো কথা বলেছিলেন, তাও মনে নেই। মুখে মিষ্টি হাসি টেনে বললেন সুফিয়া বেগম,
“আমার মন ভালো নেই দেখে এসব বলে সান্ত্বনা দিচ্ছ?”
“না, আমাকে তো উনিই পাঠালেন। তুমি নাকি একা একা বসে আছো মন খারাপ করে। আমাকে বললেন, কিছুক্ষণ এসে কথা বলতে।”
কথাগুলো শুনে মনের মধ্যে ভালো লাগা কাজ করল সুফিয়া বেগমের। অজান্তেই চোখ বেয়ে দু ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল উনার।ইয়াশের তবে রাগ কমেছে ওর মায়ের প্রতি! এই দিনটার জন্যই যে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। এক ছেলের পরিবর্তনে খুশি হলেও অন্য ছেলের মৃত্যু যে ভিতরটা পোড়াচ্ছে উনার!
#চলবে……
কভার পিক আর্ট করেছেন— “Farhana” আপু। ❤️🕊️
পড়ুন রোমান্টিক ই-বই “রাগে অনুরাগে সিক্ত কাব্য”
https://link.boitoi.com.bd/GQcM
গল্প রিলেটেড সব আপডেট পেতে গ্রুপে জয়েন হোন।
https://facebook.com/groups/569604222322147

