আমার উপমা তুমি (২৩) আফরোজা আঁখি

0
27

আমার উপমা তুমি (২৩)
আফরোজা আঁখি

১ ঘন্টা ধরে ইয়াশের অফিসে বসে আছে কাশফিয়া। বিরক্ত হচ্ছে সে,আর বসে থাকতে পারবে না এখানে, এই ভেবে উঠে দাঁড়িয়েছিল চলে যাবে বলে, তখনই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশকে দেখল। দুই হাত বুকে ভাঁজ করে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াশ, রেগে তাকিয়ে আছে কাশফিয়ার দিকে। ইয়াশের এমন রাগান্বিত চেহারা দেখে দ্রুত চেয়ারে বসে পড়ল কাশফিয়া, তাকিয়ে রইলো মেঝের দিকে। ইয়াশ হেঁটে আসল ওর কাছে, কথা না বলে হাতটা ধরে নিয়ে গেল বাইরে।

কাশফিয়া বসে আছে ইয়াশের মার্সিডিস কারটাতে, ইয়াশ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে অন্য এক প্রফেসারের সাথে। কথা শেষ হলে চলে আসবে এমন সময় মেহেক ছুটে এসেছে কোথা থেকে। ইয়াশের সামনে দাঁড়িয়েছে সে। ইয়াশ বিরক্ত হলো, চলে যেতে নিলেই বলল মেহেক,

“চলে যাচ্ছেন কেন স্যার? আমি তো আপনার সাথে কথা বলতেই আসলাম!”

“আমি তোমার কথা শুনতে চাই না মেহেক। জাস্ট লিভ নাও।বলেছি না আমার সামনে আসবেনা?”

ইয়াশ চলে যাচ্ছিল, দ্রুত গিয়ে ওর পথ আটকালো মেহেক। ইয়াশ পাত্তা দিল না তেমন চলে যাচ্ছিলো নিজের মতো করেই, মেহেক ওর যাওয়ার পানে তাকিয়েই বলল,

“আমি আপনাকে পছন্দ করি স্যার। ঔ মেয়েটার মধ্যে কি আছে যা আমার মধ্যে নেই? আমাকে আপনি বলুন, আপনার কেমন মেয়ে ভালো লাগে, আমি চেষ্টা করব ওরকম হওয়ার।”

সাইফান দৌড়ে এসেছে মেহেকের পিছু পিছু। ওর পাগলামিতে বিরক্ত হচ্ছে সাইফান, ধমক দিয়ে বলেছে ওকে,

“আর ইউ ক্রেইজি? স্যার বিবাহিত, তুই জানিস না?”

“চুপ কর সাইফান। তুই জানিস না আমি উনাকে ভালোবাসি!”

“এটাকে ভালোবাসা বলে না মেহেক। অন্যায় করছিস তুই।”

কিছুক্ষণ তর্কাতর্কি হলো সাইফান আর মেহেকের মধ্যে। সাইফানের চোখ গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশের দিকে। চোখ মুখে রাগের আভাস ওর। কখন এসে ওদের সামনে দাঁড়িয়েছে, দুজনের কেউ-ই তা খেয়াল হয়নি। সাইফান প্রচণ্ড ভয় পায় ইয়াশকে ওর রাগ কেমন, সেটাও অজানা নয়। মেহেকও সমানভাবেই ভয় পায় ইয়াশকে, তবে আজ ওর কি হলো কে জানে! পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সাইফান আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,

“কি… কিছু বলবেন স্যার?”

ইয়াশ তাকাল গাড়িতে বসে থাকা কাশফিয়ার দিকে। মনোযোগ দিয়ে ইয়াশের ফোন ঘাটছে সে। এখানে এত সময় কি হলো না হলো, কিছুই হয়তো কানে যায়নি কাশফিয়ার। যাবেই বা কি করে! ওদের থেকে গাড়ির দূরত্ব একটু বেশিই! ইয়াশ কাশফিয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে মেহেকের দিকে তাকাল, বলল ওকে,

“প্রথমত তুমি আমার স্টুডেন্ট, এর বেশি কিছুই নয়।বার বার আমি তোমাকে ক্ষমা করব না মেহেক। নেক্সট টাইম এমন ভুল করলে আমি তোমাকে পানিশ করব।”

ইয়াশ ওর গাড়িটার দিকে ইয়াশা করে বলল আবারও,—-“এন্ড লিসেন,ওই যে দেখছো গাড়িতে বসে থাকা মেয়েটা, সে আমার ওয়াইফ। আমার ভালো থাকার কারণ। পুরো দুনিয়ার কাছে হেরে গিয়ে ক্লান্ত হলে একমাত্র ওর কাছে গিয়েই আমি শান্তি খুঁজে পাই। ইয়াশের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতাও কেবল তাঁর উপমারই আছে। তুমি কেন মেহেক, পৃথিবীর কেউ-ই আমার উপমার মতো হতে পারবে না। হলেও, তার প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মাবে না।”

মেহেক হয়তো বুঝল সে ভুল করেছে। চুপ করেই প্রতিটা কথা শুনল ইয়াশের। ছোট্ট করে—-‘সরি’ বলল ইয়াশকে। ইয়াশ শুনেছে কিনা সন্দেহ, ওদেরকে ওখানে রেখেই চলে গেছে সে। ইয়াশের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে সাইফান মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলছে,
“ভালোবাসলে তো এভাবেই ভাসতে হয়!”

________________

রাত প্রায় ১২টার কাছাকাছি। কাশফিয়ার শরীরটা আজ খারাপ লাগছে। সকাল থেকেই বমি হচ্ছে, ইয়াশকে বুঝতে দেয়নি কিছুই। বুঝলেই তো এই রাত বিরাতে নিয়ে যাবে হসপিটালে!

ইয়াশ বসে আছে সোফায়। শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না কাশফিয়ার, বিছানা থেকে উঠে কাবার্ডটা খুলেছে, কতগুলো জামাকাপড় বের করে বিছানায় ফেলেছে, একটা একটা করে গায়ে লাগিয়ে দেখছে আয়নার সামনে গিয়ে ওকে কেমন লাগছে। সবকিছুই করছে ইয়াশের মনোযোগ নিজের দিকে আনবে বলে, কিন্তু এই ইয়াশ তো ল্যাপটপে মুখ গুঁজে আছে, একবারও তাকাচ্ছে না কাশফিয়ার দিকে। বিরক্ত হয়েই ইয়াশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো কাশফিয়া, বলল ওকে,

“শুনুন।”

নিজের কাজে ব্যাস্ত থেকেই উত্তর দিল ইয়াশ,
“বলুন।”

“আমি আগের থেকে অনেকটা মোটা হয়ে গেছি, তাই না?”

ইয়াশ তাকাল কাশফিয়ার দিকে, পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করল ওকে, মুচকি হেসে বলল,

“কই, না তো। তুমি আগের মতোই সুন্দর।”

“হ্যাঁ, আমি আগের থেকে অনেকটা মোটা হয়েছি, ভালো করে দেখুন। আরেকটা জিনিস কি জানেন?”

“না, বললে জানব কী করে?”

“আমার না ইদানীং অনেক টক খেতে ইচ্ছে করে, এনে দিবেন?”

ইয়াশ ল্যাপটপের দিকে চোখ রেখেই আস্তে করে বলল,

“হুম,এনে দিব।”

কাশফিয়ার রাগ হলো, হাতের জামাটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে বিড়বিড় করে বলল,

“বোকা লোক একটা, এতো কিছু বলি, তাও বুঝে না।”

ইয়াশ ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল কাশফিয়ার দিকে। কী বলেছে না বুঝলেও মুখের ভাবভঙ্গি দেখে বুঝল কাশফিয়া রাগ করেছে কোনো কারণে। ইয়াশ উঠে এসে পাশে দাঁড়ালো কাশফিয়ার, পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল ওকে,

“কি হয়েছে উপমা?”

“কি হবে? কিছুই হয়নি। ছাড়ুন আমাকে।”

“ছাড়ব না। তোমার না বাবু চাই?”

কাশফিয়া ঘুরে তাকাল ইয়াশের দিকে, ওর বুকে হাত রেখেই মিষ্টি হেসে বলল,—-“চাই তো।”

ইয়াশ হেসে কাশফিয়ার কানের কাছে গেলো ফিসফিস করে বলল ওকে,
“তাহলে এতো পালাই পালাই করছ কেন? চলো বাবু আনার প্রসেস শুরু করি। আর ইউ রেডি?”

কাশফিয়া হাসল, দু’হাত দিয়ে গলা আঁকড়ে ধরল ইয়াশের। ইয়াশ একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছিল ওর দিকে। তখনই কাশফিয়ার গা টা গুলিয়ে উঠল, ইয়াশের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দ্রুত ছুটে গেল ওয়াশরুমে। কী হলো বুঝতে না পেরে ওর পিছু পিছু গেল ইয়াশও। মাথাটা ঘুরছে কাশফিয়ার, পেটে যা ছিল উগলে দিয়েছে সব। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলে, দু’হাতে আগলে নিয়েছে ইয়াশ। কাশফিয়ার এমন অবস্থা দেখে চিন্তা হলো ওর। সময় নষ্ট না করে ওকে কোলে তুলে নিয়ে গেল বিছানায়। উদ্বিগ্ন হয়ে বলল বারবার,

“উপমা, কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ লাগছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে, আমাকে বলো!”

নিভু নিভু চোখে ইয়াশের চিন্তিত মুখটার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল কাশফিয়া,
“আমি ঠিক আছি।”

“না না, তুমি ঠিক নেই। তুমি অসুস্থ উপমা,আমাকে আগে বলোনি কেন তোমার শরীর খারাপ লাগছে? ”

কথাগুলো বলে ইয়াশ দ্রুত উঠে দাঁড়ালো, ফোন খুঁজে নিয়ে এল, কাউকে কল দিবে বলে। কাশফিয়ার বুঝতে বাকি নেই, ডাক্তার ডাকতে চাইছে ইয়াশ। কাশফিয়া ইয়াশের শার্টের কলার টেনে ধরতেই ইয়াশ মাথাটা নুইয়ে তাকাল ওর দিকে, এই সুযোগে ইয়াশের কানে ধরে রাখা ফোনটা কেড়ে নিল কাশফিয়া, ওর হাতটা টেনে এনে রাখলো নিজের উদরের উপর। ইয়াশ কাশফিয়ার মুখপানে তাকাতেই হেসে বলল কাশফিয়া,

“আমাদের জুনিয়র আসছে।”

ইয়াশ কিছুসময় থম মেরে বসে ছিল ওভাবেই। কাশফিয়া কী বলেছে নিউরনে পৌঁছাতেই চোখ মুখে অদ্ভুত এক ভালো লাগা প্রকাশ পেল ইয়াশের। কাশফিয়ার ধরে রাখা হাতটার দিকে একবার তাকিয়ে, পরে আবার তাকাল ওর দিকে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল হাসি। দ্রুত কাশফিয়াকে বুকে টেনে নিল ইয়াশ, চুমু দিল ওর পুরো মুখে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,

“আমি যা শুনলাম, তা কি সত্যিই? আমি বাবা হতে চলেছি! আমার ভিতরে এক অদ্ভুত কাঁপুনি হচ্ছে উপমা।আমার আনন্দ হচ্ছে, খুব আনন্দ হচ্ছে। আমি তোমাকে কি বলে ধন্যবাদ দিব, বলো তো?”

ইয়াশের বুক থেকে মাথা তুলে ওর মুখপানে তাকাল কাশফিয়া। মিষ্টি হেসে বলল ইয়াশকে,

“আমি আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ দিব? আপনি যে আমার মন খারাপের নির্ভরযোগ্য ঔষধ, আমার ভালো থাকার কারণ। আমার ছন্নছাড়া জীবনে আপনি আশার দীপ্ত আলো। ভালোবাসি প্রফেসর সাহেব, ভালোবাসি আপনাকে।”

সাথে সাথে উত্তর এল ইয়াশের থেকে,

“আমিও তোমাকে ভালোবাসি উপমা। তোমাতেই আমার সূচনা আর তোমাতেই সমাপ্তি।”

হাসল কাশফিয়া, ইয়াশের মতোই শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ওকে। মনে মনে ভাবল সে, এই মানুষটা এতো পাগল কেন ওর জন্য?এতো কেন ভালোবাসে ওকে? সবার সামনে কঠোর বদমেজাজি, আর কাশফিয়ার সামনে এতোটা শান্ত! ছেলেদের ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়? ভালোবাসার মানুষ ব্যতীত অন্য সবার কাছে তারা বেপরোয়া। যেমনটা ইয়াশ, পুরো পৃথিবীর কাছে সে কঠোর, বেপরোয়া হলেও কাশফিয়ার কাছে শান্ত একটা মানুষ, যে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসতে জানে কেবল। কাশফিয়া মুচকি হেসে বিড়বিড় করে বলল,
“রোহি আপু ঠিকই বলতো। আমি সত্যিই ভাগ্যবতী।”

____________

কাশফিয়া বিছানায় পড়ে ঘুমোচ্ছে বেঘোরে। ওর মাথার কাছটায় বসে আছে ইয়াশ। ফোনের রিংটোন কানে আসতেই সেন্টার টেবিলের উপর থেকে ফোনটা এনে চোখের সামনে ধরল ইয়াশ। উজ্জ্বলের নাম্বার থেকে কল এসেছে দেখে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো ওর। কলটা রিসিভ করে ফোনটা কানে ধরতেই উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করল উজ্জ্বল,
“কাশফিয়া নাকি অসুস্থ? ওর কি হয়েছে ইয়াশ? ডাক্তার দেখিয়েছ? চিন্তার কিছু নেই তো?”

“হ্যাঁ, দেখিয়েছি। চিন্তার কিছুই নেই।”

“চিন্তার কিছু নেই মানে! তোমার আপু তো বলল অসুস্থ। কী হয়েছে বুঝিয়ে বলো।”

ইয়াশ হাসল, মাথার চুলগুলো ঠেলে পিছনের দিকে সরাল, আস্তে করে বলল উজ্জ্বলকে,
“ইউ আর গোইং টু বি অ্যান আংকেল!”

উজ্জ্বল উৎফুল্ল হয়ে বলল সাথে সাথে,
“রিয়েলি? আমি ঠিক শুনলাম!”

“হুম,তুমি একদম ঠিক শুনেছ।

সুখবর পেয়ে খুশি হলো উজ্জ্বল, তবুও ইয়াশকে লজ্জা দিতে বলল,

“কিন্তু ইয়াশ, তুমি না বললে তোমার বউ ছোট, ওকে বড় হওয়ার সময় দিলে না যে? বাসর সেরে জুনিয়রকে নিয়ে আসার দাপ তো দেখি আগেই অতিক্রম করে ফেলেছ! আমার সামনে নিরামিষ সেজে ভাব দেখাতে, তাই না?”

“কি করব বলো, সামনে ভাজা মাছ রেখে লোভ সামলাতে পারে কেউ? বউ ছোট তো কি হয়েছে, আমি ওকে পেলেপুষে বড় করে নিব। লজ্জা না দিয়ে অভিনন্দন জানাও আমাকে।”

নিজের কাজে ব্যার্থ হলো উজ্জ্বল,মুখে হাসি টেনে বলল ইয়াশকে,
“অভিনন্দন ইয়াশ। কলটা কাটো, বাড়ির সবাইকে এক্ষুনি জানিয়ে আসি খুশির খবরটা।”

ইয়াশ কলটা কেটে দিল। জানত উজ্জ্বলের রিঅ্যাকশন এমনই হবে। ফোনটা হাত থেকে রেখে কাশফিয়ার পাশে বসল ইয়াশ। ওর পেটের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে স্পর্শ করল ইয়াশ। ইয়াশের ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেল মুহূর্তেই। এ কেমন অনুভূতি হচ্ছে ওর? মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব সুখ ইয়াশের কাছেই। বাবা হওয়ার অনুভূতি কি তবে এমনই? আবারও রিংটোন বেজে উঠল ইয়াশের ফোনে। ভাবল উজ্জ্বলই কল দিচ্ছে, কিন্তু ফোনটা হাতে নিতেই সাইফানের নামটা ভেসে উঠল ফোনের স্ক্রিনে। ইয়াশ প্রথমে রিসিভ না করলেও বারবার কল আসায় বিরক্ত হয়ে রিসিভ করল। ও কিছু বলবে, তার আগেই ভয়ার্ত কন্ঠে বলল সাইফান,
“সা…স্যার আমি সাইফান বলছি।”

“হ্যাঁ, আমি চিনেছি। কী হয়েছে সাইফান? আর ইউ ওকে? কোনো সমস্যা হয়েছে?”

“হ্যাঁ, বিরাট বড় সমস্যা হয়েছে স্যার।”

“কি হয়েছে?”

“আপনি এক্ষুনি মেহেকদের ফ্ল্যাটে আসুন স্যার। ও আপনার সাথে কথা বলতে চাইছে।”

কপালে ভাঁজ পড়ল ইয়াশের, সাথে বিরক্তির ছাপ পড়ল চোখ মুখে। সাইফানকে যথেষ্ট ম্যাচিউরড বলেই জানে ইয়াশ। তবে আজ কেন মেহেকের সাথে তাল মিলাচ্ছে সাইফান! নিশ্চয়ই ওকে বিভ্রান্ত করতে এসব বলছে সাইফান! ইয়াশ কলের লাইন কেটে দিতে চাইলে আবারও ভেসে আসল সাইফানের কণ্ঠস্বর।
“আই অ্যাম নট জোকিং, স্যার। মেহেক আপনার সাথে কথা বলতে চাইছে। ওর বাসা ভর্তি পুলিশের লোক, কেবল আপনি আসবেন বলেই বসে আছে।”

ইয়াশ চিন্তায় পড়ল সাইফানের কথা শুনে। মেহেক মেয়েটা ওকে পছন্দ করে, এটা অজানা নয় ইয়াশের।তখনকার ঝামেলার কথাটাও মনে আছে স্পষ্ট। মেহেকের আব্বুর সাথেও ইয়াশের সম্পর্ক তেমন ভালো না। তার উপর কৌশিকের এক্সিডেন্টের কারণও উনিই। লোকটার সাথে ওর সম্পর্ক যেমনই হোক, মেহেক মেয়েটা শান্তশিষ্ট আর ভালো। ইয়াশকে রেসপেক্ট করে সে। আজকের বিষয়টা তেমন পাত্তা দেয়নি ইয়াশ, এই বয়সে ছেলে মেয়েরা এমন করে। বুঝিয়ে বললে আবার ঠিক ভুল বুঝে যায় তারা। যেমনটা মেহেক বুঝেছে। হুট করেই মাথায় আসল ইয়াশের, মেহেকদের বাড়ি ভর্তি পুলিশ কথাটা বা কেন বলল সাইফান? তবে কি কোনো বিপদ হলো? কথাটা ভেবেই ইয়াশ বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। যাওয়ার আগে সার্ভেন্টকে বলে গেল কাশফিয়ার খেয়াল রাখতে।

ফ্ল্যাটের দরজাটা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল ইয়াশ। রুমে মানুষের ভিড় জমেছে। কাউকে ঘিরে রেখেছেন সবাই মিলে। ইয়াশ আস্তে আস্তে ভিড় ঠেলে ভিতরে গিয়ে ঢুকল। সামনের দৃশ্য দেখে ফর্সা মুখটা ঢেকে গেল অন্ধকারে। রুমের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে মেহেক, এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে মেঝেতে পড়ে থাকা ওর আব্বু সালমান চৌধুরীর রক্তাক্ত শরীরটার দিকে। লোকটা হয়তো মা’রা গেছে, দেখে তাই মনে হচ্ছে ইয়াশের। কিন্তু উনাকে এমন নৃশংসভাবে মা’রল কে? ইয়াশ দাঁড়িয়ে আছে আগের অবস্থানেই। মেহেক মুখ তুলে তাকাল ওর দিকে। এত সময়ে এখনই বোধ হয় নড়াচড়া করল ও। এতক্ষণ ফ্ল্যাট ভর্তি লোকজন, পুলিশ অফিসাররা একটা কথাও বলাতে পারেনি ওকে দিয়ে, জড়বস্তুর মতো বসে ছিল এক জায়গাতেই। একবার শুধু সাইফানকে বলেছে ইয়াশের সাথে কথা বলতে চায় সে। ইয়াশকে দেখে কষ্ট করে হাসল মেহেক। উঠে দাঁড়ালো সে, ইয়াশের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল ওকে,
“আমি আব্বুকে খুন করতে চাইনি স্যার। কীভাবে যেন গুলিটা বেরিয়ে গেছে। আমি জানি না কীভাবে হলো, সত্যিই আমি জানি না।”

ইয়াশের থেকে কিছু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে সাইফান আর ওর পাশের পুলিশের পোশাক পরিহিত লোকগুলো। উনারা চোখের ইশারায় কিছু বললেন ইয়াশকে, ইয়াশ হয়তো বুঝল উনাদের ইশারার মানে। একে একে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন সবাই, রইলো কেবল সাইফান আর ইয়াশ। সাইফান মেহেককে নিয়ে বসাল সোফায়, পাশে গিয়ে বসল ইয়াশ আর সাইফান নিজে। মেহেক ভয় পেয়ে আছে।কান্না করতে করতে চোখ মুখ ফুলে গেছে ওর। তাকানো যাচ্ছে না মুখটার দিকে। ওর এমন অবস্থা দেখে সেন্টার টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা মেহেকের সামনে এনে ধরল ইয়াশ, বলল ওকে,
“শান্ত হও মেহেক। কী হয়েছে আমাকে বুঝিয়ে বলো।”

মেহেক শান্ত হলো কিছুটা, পানির গ্লাস হাতে নিয়ে ঢকঢক করে পান করল সে। কিছু সময় নীরব থেকে আচমকাই কান্না করে দিল। কান্না করতে করতে বলল ইয়াশকে,
“আ…আমার আব্বু খুনি,উনি নারী পাচারকারী চক্রের সাথে জড়িত। উনার বন্ধুর সাথে ফোনে কথা বলছিলেন আমি পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন। আমি নিজের কানে শুনেছি, আমার আম্মুকে উনি নিজ হাতে মে’রেছেন। সেদিন ক্যাফেতে আপনাকে মা’রার জন্য লোক পাঠিয়েছিলেন।আমি জেনে ফেলেছি সব। আমাকেও আব্বু মে’রে ফেলতে চেয়েছিলেন। ত…তখনই…”

“তখনই কী হলো মেহেক?”

“আমি রিভলভারটা হাতে নিয়ে আব্বুর দিকে তাক করলাম। উনি ওটা কেড়ে নিতে চাইলেন আমার থেকে। জোড়াজোড়িতে কখন যে আমার হাত লেগে গুলি বেরিয়ে গেছে, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি। আমি আব্বুকে মারতে চাইনি, বিশ্বাস করুন। কিন্তু আমার কোনো আফসোস নেই, ওমন খুনির সন্তান হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই ভালো আমার জন্য।”

মেহেকের আব্বুর সাথে কৌশিকের ব্যাপারটা নিয়েই ঝামেলা হয়েছিল ইয়াশের,কিন্তু তার জন্য যে কেউ কাউকে মা’রতে চাইবে ধারণাতেও ছিলো না ওর।এই লোকটার জন্যই তবে রোহি মা’রা গেছে?ঈশানও অনুশোচনাবোধ থেকে বাঁচতে আত্যহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। সব কিছুর মূল তবে মেহেকের আব্বু সালমান চৌধুরী! মাথাটা কেমন করছে ইয়াশের বিরক্ত লাগছে সবকিছু।কিন্তু মেহেক যে একটা বাচ্চা মেয়ে, বাবার ভুলের শাস্তি মেয়েটাকে পেতে হবে? ইস মেহেকের কথা ভেবে খারাপ লাগছে ইয়াশের। ইয়াশকে কথাগুলো বলে আবারও অঝোরে কান্না শুরু করল মেহেক। ইয়াশ আর সাইফান কত কী বলে সান্ত্বনা দিল ওকে। কিন্তু মেহেক তো জানে, তাকে শাস্তি পেতেই হবে। নিজেকে কোনো রকমে সামলালো মেহেক, চুপচাপ উঠে দাঁড়ালো সোফা থেকে। পুলিশের সামনে গিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল সে,
“এরেস্ট মি!”

সাথে সাথে মহিলা পুলিশগুলো চলে এল মেহেকের কাছে। ওকে তোলা হলো পুলিশদের নিয়ে আসা গাড়িটাতে। নির্বাক দৃষ্টিতে চলন্ত গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল সাইফান আর ইয়াশ।

#চলবে……

পরের পর্বেই সমাপ্তি। যারা রেসপন্স করেননি এতোদিন, আর করতে হবেনা। আপনারা এভাবেই চুপচাপ পড়ে যান।😊😵‍💫

(০১)
পড়ুন রোমান্টিক ই-বুক “প্রাণ প্রণয়িনী”
https://link.boitoi.com.bd/4T8X

(০২)
পড়ুন রোমান্টিক ই-বই “রাগে অনুরাগে সিক্ত কাব্য”
https://link.boitoi.com.bd/GQcM

গল্প রিলেটেড সব আপডেট পেতে গ্রুপে জয়েন হোন।
https://facebook.com/groups/569604222322147

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here