#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_২৬
রাত্রির অবসান ঘটিয়ে নতুন দিনের সূচনা হয়েছে। পূর্বাকাশে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে হালকা সোনালি আভা। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়ে রেখেছে এই ভোরকে। বাতাসে এক ধরনের নির্মলতা, যেন সে ক্লান্ত হৃদয়কে শান্ত করতে চায়। চারপাশে পাখিদের সুরেলা ডাকে পরিবেশ যেন এক অপরূপ স্নিগ্ধতায় মোড়ানো। অথচ এই নিসর্গময় সকালে কারো কারো মনোভারসা বিষাদের কালো ছায়া কাটিয়ে উঠতে পারছে না। হৃদয়ের ভারে ক্লান্ত কায়া আজও মলিন।
হায়া রাতভর বসে ছিল বারান্দার কাঠের কাউচে। চোখে ঘুম নেই, মনে অস্থিরতা। কাউচটা বারান্দায় এমনভাবে রাখা, যেখান থেকে বাড়ির মূল ফটক পরিষ্কার দেখা যায়। সে অপেক্ষায় ছিলো যদি হঠাৎ তার মানুষটা ফিরে আসে, যদি হঠাৎ তার অপেক্ষার অবসান ঘটে। কিন্তু রাত পেরিয়ে সকাল এলেও সেই প্রিয় মুখের দেখা মেলেনি।
আকাশে আলো বাড়ে, আর হায়া’র চোখে জমে অন্ধকার। চোখের কোণ থেকে নীরব অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ে মুখের পাশে। শরীর আর মানতে চায় না দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা ক্লান্তি। সে ধীরে ধীরে গা এলিয়ে দেয় কাউচের গায়ে। হৃদয়ে এক ধরণের হাহাকার, এক অপ্রকাশ্য দীর্ঘশ্বাস। চোখ আপনা থেকেই বুঁজে আসে, ক্লান্ত মন অবশেষে ঘুমে ডুবে যেতে চায়।
আর ঠিক সেই সময়, মস্তিষ্কের গহীনে হায়া’র মনে পড়ে কাল রাতের কিছু কথা—কিছু এমন স্মৃতি, যা বিষাদকে আরও ঘনীভূত করে তোলে, যা চোখের ঘুম কেড়ে নেয়, অথচ মনে গেঁথে থাকে অনন্তকালের জন্য।
________________________
গতকাল রাত~
হায়া আমতাআমতা করছে। কি জবাব দিবে সে বুঝে উঠতে পারছে না। একে তো ফারাবি’র সাথে দেখা করতে গিয়েছে, দুয়ে এমন হাত ধরাধরি করে কথা বলেছে। যদিও সেটা বুঝানোর উদ্দেশ্য ছিলো কিন্তু আশিয়ান তো সেটা মানবে না। তিনে, মিথ্যা বলেছে। মানে বাঁশ খাওয়ার সব ব্যবস্থা নিজ হাতে করে রেখেছে।
এদিকে আশিয়ানের ধৈর্য ধীরে ধীরে শেষ হচ্ছে। সে আবারও শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে–
—কার পারমিশন নিয়ে ফারাবি’র সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে? আর মিথ্যে বললে কেন?
—আমি মিথ্যে বলতে চায় নি, ভেবেছিলাম ধীরে সুস্থে আপনার রাগ কমলে তারপর,….
—তারপর গুছিয়ে আরেকটা মিথ্যে বলে দিবে তাই না? এটাই তো প্ল্যান ছিলো?
হায়া নাবোধক মাথা নাড়িয়ে বলে–
—না না, এমনটা না। আমি বলতাম আপনাকে।
—বলতে তাহলে মিথ্যে বললে কেন?
হুংকার দিয়ে কথাটা বলে উঠে আশিয়ান নিজের হাতে থাকা ফোনটা দূরে কোথাও ছুড়ে ফেলে। ফোনটা কয়েক ভাগ হয়ে অবহেলায় মাটিতে পড়ে থাকে। আশিয়ানের ধৈর্যের বাধ ভেঙে গিয়েছে। তার একটাই কথা কেন দেখা করতে যাবে প্রাক্তনের সাথে? তাও আবার এসে মিথ্যা বললো হায়া।
আশিয়ান হায়া’র বাহুদ্বয় শক্ত হাতে চেপে ধরে ইস্পাত কঠিন কণ্ঠে বলে–
—তুই কার পারমিশন নিয়ে গিয়েছিলি? আমি তোর হাসবেন্ড, আমার পারমিশন না নিয়ে তুই কেন তোর প্রাক্তনের সাথে দেখা করতে গেলি? বল।
হায়া’র আত্মা সহ কেঁপে উঠে আশিয়ানের এমন হুংকার শুনে। সে প্রচন্ড ভয়ে কাঁপতে থাকে। আশিয়ানের এমন রাগ সেই ছোট্ট বেলায় তার কলমটা ফেলে দেওয়ার পর দেখেছিলো আর আজ আবার দেখলো।
হায়া কিছুটা সাহস নিয়ে বলে–
—হাসবেন্ড হয়েছেন তাই বলে আপনাকে সব কথা বলে করতে হবে? আমি আমার পরিচিত কারো সাথে দেখা করতে পারি না?
—পারবি না কেন? অবশ্যই পারবি। কিন্তু এই একজন ব্যক্তি ব্যতীত।
—কেন তার সাথে দেখা করলে কি হয়েছে?
—তুই জানিস না কি হয়েছে? বুঝিস না ওর চোখ তোকে কি বলতে চায়?
—তার আমার জন্য ফিলিংস থাকলেও আমার তো তার জন্য কোন ফিলিংস নেই, তাহলে দেখা করতে সমস্যা কই?
—ওর জন্য নেই তো কার জন্য আছে?
এই প্রশ্নের জবাবে হায়া নিরবতা অবলম্বন করে। মন বলছে বলে দে সত্যি টা। কিন্তু মস্তিষ্ক মুখকে আটকে রেখেছে। মন ও মস্তিষ্কের লড়াইয়ে এবারও মস্তিষ্ক জিতে যায়।
আশিয়ান গম্ভীর গলায় বলে–
—ভালোবাসো আমায়?
—(নিশ্চুপ)
—আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করেছি তোমায়। ভালেবাসো কিনা আমায়? হ্যা অথবা না তে জবাব দিবে।
—দেখুন, আপনি কিসের মধ্যে কি আনছেন? আমার ভুল হয়েছে না বলে যাওয়াটা, এর জন্য আমি সরি।
—আমার প্রশ্নের জবাব দাও। ডু ইউ লাভ মি? জাস্ট এন্সার উইথ ইয়েস ওর নো।
—(নিশ্চুপ)
—এন্সার মি ড্যাম ইট।
পূর্বের ন্যায় হুংকার দিয়ে বলপ কথাটা আশিয়ান। হায়া ফট করে বলে দেয়–
—না বাসি না। না আপনাকে আর নাই বা ফারাবি ভাইয়াকে, কাউকে ভালোবাসি না। আপনারা দু’জনই আমায় নির্মমভাবে কাঁদিয়েছেন।
চিৎকার করে কথা গুলো বলে হায়া। কথা শেষ করে সে কয়েক পা পিছিয়ে যায়। আশিয়ানও তার থেকে দূরে সরে আসে।
আশিয়ান ঘরের মাঝেই এলোমেলো পায়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করে। তারপর হুট করেই একটা ফ্লাওয়ার ভাস উঠিয়ে ছুড়ে মারে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে। বিকট শব্দ হয়ে যায় আয়না টা। আশিয়ান নিজের রাগ কিছুতেই কন্ট্রোল করতে পারছে না। সে কিছুতেই মানতে পারছে না হায়া তাকে ভালোবাসে না।
বেশ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতার মাঝে কেটে যায়। আশিয়ানই প্রথমে কথা বলা শুরু করে। সে বলে–
—বেশ ভালো। আমায় ভালোবাসো না তারমানে আমার থাকা না থাকায় তোমার কিছু যায় আসে না। তাই না?
হায়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। কি বলবে সে? মনে এক কথা রেখে মুখে আরেকটা বলে দিয়ে এখন সে চরম ভাবে পস্তাচ্ছে।
—আমায় যদি ভালো না বাসো তাহলে কিসের জোরে আমি তোমার উপর অধিকার ফলাবো। শুধু মাত্র কবুলের জোর অধিকার ফলানো আমার নীতির বিরুদ্ধ কাজ। এটা আমি মরে গেলেও করতে পারবো না। তাই আজ থেকে তুমি তোমার মতো থাকবে আর আমি আমার মতো। যতদিন না আমরা একে অপরকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসতে পারবো ততদিন কেউ কারো জীবনে কোন অধিকার ফলাবো না। না তুমি আর নাই আমি।
আশিয়ান নিজের কথা শেষ করে প্রথমে রুম থেকে তারপর বাসা থেকে বের হয়ে যায়। হায়া তার পেছন ডাকলেও শুনে না। আশিয়ান চলে যেতেই হায়া ধপ করে নিচে বসে পড়ে। কি থেকে কি হয়ে গেলো সে এখনো বুঝতে পারছে না।
______________________
বর্তমান~
হায়া’র চোখটা মাত্রই লেগে এসেছিলো তখনই সে গাড়ির হর্ণের আওয়াজ শুনে। সে চোখ মেলে দেখতে চায় আশিয়ান এসেছে কিনা কিন্তু তার অনেক দূর্বল লাগছে। উঠার শক্তিটা পর্যন্ত পাচ্ছে না।
আশিয়ান গাড়ি পার্ক করে এসে কলিংবেলে বাজালে তাদের হেল্পিং হ্যান্ড মহিলা দরজা খুলে দেয়। সময় এখন সাড়ে ছয়টা। এত সকালে আবরার-স্পর্শ কেউই উঠে না। তারা ফজরের নামাজ পড়ে আবার একটু ঘুমায়।
দরজা খুলে দিলে আশিয়ান গটগট করে রুমে চলে আসে। রুমে এসে হায়া’কে না দেখতে পেয়ে তার কপালে কয়েকটা ভাজ পড়ে। সে তড়িঘড়ি করে ওয়াশরুমে চেক করে। সেখানে না পেয়ে বেলকনিতে আসলে হায়া’কে ঘুমন্ত অবস্থায় পায়।
হায়া’কে পেয়ে আশিয়ান বড় করে একটা হাফ ছাড়ে। সে বিড়াল পায়ে হেঁটে হায়া’র কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। হায়া’র চোখের কোণে শুকিয়ে থাকা পানির দাগগুলো আশিয়ানের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে দেয়। আশিয়ান হায়া’র কপালের উপর পরে থাকা এলোমেলো চুলগুলোকে কানের পেছনে গুঁজে দেয়। তারপর হায়া’র কপালে ভালোবাসার পরশ দিতে নেয়। কিন্তু কি মনে করে যেনে আর দেয় না।
সে আলতো হাতে হায়াকে কোলে তুলে রুমে চলে আসে। তারপর তাঁকে বেডে শুইয়ে দিয়ে নিজে জামা কাপড় নিয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায়। এদিকে আশিয়ান চলে যেতেই হায়া চোখ মেলে তাকায়। আশিয়ান যখন তার মুখটা হায়া’র কাছে এনেছিলো তখন সে সিগারেটের গন্ধ পেয়েছিলো। হায়া ভীষণ ব্যথিত হয় এটা জানতে পেরে যে আশিয়ান সিগারেট খেয়েছে। হায়া ছোট থেকে দেখে এসেছে না তার পাপা আর ভাইয়েরা নাই বা তার শ্বশুর কেউ সিগারেট বা নেশা পানি করে না। আশিয়ানও করত না। কিন্তু আজ?।
হায়া জানে না তাদের সম্পর্কটা কবে আবার আগের মতো মিষ্টি মধুর হবে। কিন্তু যা করার তা সবটাই যে হায়া’কে করতে হবে এটা সে খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারছে
~চলবে?
[জানি ছোট হয়ে গিয়েছে, এটার বর্ধিতাংশ পর্ব আসবে। রিচেক করি নি, ভুল গুলো ধরিয়ে দিলে এডিট করে ঠিক করে দিবো।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

