#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৩০
[গল্পের শেষে কথা গুলো পড়ার অনুরোধ রইলো]
সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে খেতে বসেছে তালুকদার পরিবার। হানিয়া সকলকে ব্রেকফাস্ট দিয়ে নিজেও বসে পড়ে স্বামীর পাশে। খেতে খেতে হঠাৎই জাভিয়ান তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে–
—আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাবা।
বৃদ্ধ মি.তালুকদার প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকান। কথাবার্তা তেমন একটা বলতে পারেন না বয়সের ভাড়ে। রুম থেকে বেরও হন খুবই কম। শুধু ব্রেকফাস্ট আর ডিনার করেন পরিবারের সাথে। এছাড়া সারাক্ষণ রুমেই থাকেন।
জাভিয়ান বলে–
—জাহান-জায়িনের তো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ, এখন ভাবছি ওদের বিয়ে দিয়ে আমরা আমাদের ফরজ কাজটা সেরে ফেলবো। এবিষয়ে তুমি কি বলো বাবা? মাম্মাম তোমার মতামত কি?
রোজিকেও জিজ্ঞেস করে জাভিয়ান। তারা দু’জনই জাভিয়ানের কথা শুনে খুশি হয়। রোজি বেগম কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন–
—ভালো ভেবেছিস বাবা। আমরাও আমাদের পুতি দেখে মরতে পারবো। কি বলো ভাই?
মি.তালুকদারও বোনের কথায় মাথা দুলিয়ে সম্মতি দেয়। জায়িন হইহই করে বলে উঠে–
—এই ছোট দাদী তুমি কিন্তু এসব বলবে না। আমার ভালো লাগে না এসব শুনে।
কথাটা বলে মন খারাপ করে বসে থাকে সে। রোজি বেগম হেঁসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মি.তালুকদার জাভিয়ানকে বলে–
—মেয়ে দেখা শুরু করো তাহলে। শুভ কাজে দেরি কেনো।
—মেয়ে আমাদের দেখা শেষ। আমি আর হানিয়া আমাদের পুত্রবধুদের পছন্দ করে ফেলেছি। এখন শুধু বিয়ের ডেট কনফার্ম করার পালা। ভাবছি এই মাসের শেষ শুক্রবার মানে চারদিন পর জাহান-জায়িনের বিয়ের ডেট রাখবো।
এত তাড়াতাড়ি মেয়ে পছন্দ করে আবার বিয়ের ডেটও কনফার্ম করে ফেলবে তাদের বাবা মা এটা জায়িন কল্পনাও করতে পারেনি। সে ভেবেছিলো বিয়ের কথা উঠলে সে আস্তে ধীরে বলবে, এখন দেখে তার না হওয়া সংসার টা আগেই ভেঙে যাচ্ছে তাও তার নিজেরই বাবা-মা’ বদৌলতে।
জায়িন বসা ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে বলে–
—এটা হতে পারে না। আমি এই বিয়ে করতে পারবো না।
হানিয়া-জাভিয়ান এই কথাটা শোনারই অপেক্ষা করছিলো, তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেঁসে দেয়। জাভিয়ান নিজের হাসি গিলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলে–
—মেয়ের পরিবারকে কথা দিয়ে ফেলেছি আমরা। তারা বিয়ের তোরজোড় শুরুও করে দিয়েছে অলরেডি। আজ ডেটও কনফার্ম হয়ে গিয়েছে। আমি আর তোমাদের আম্মু আত্মীয়দের দাওয়াত দিতে বের হবো একটু পর। এর মধ্যে তুমি যদি বলো বিয়ে করতে পারবে না, তাহলে বুঝতে পারছো তোমার হবু বউয়ের পরিবারকে কতটা অপমানিত হতে হবে? বাচ্চাদের মতো কথা বলো না জায়িন, তোমার ভাইও রাজি এই বিয়েতে আশা করি তুমিও আমাদের সিদ্ধান্তে রাজি থাকবে। আমরা তোমার বাবা-মা, তোমাদের খারাপ চাওয়ার আগে আমরা যেনো দুনিয়া থেকে নিঃশেষ হয়ে যাই। এখন চুপচাপ খাওয়া শুরু করো।
জায়িন তার বাবার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে কথাগুলো শুনে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না এটা তার বাবা। যেই বাবা তাদের জীবনের ছোট বড় সব সিদ্ধান্তে তাদের স্বাধীনতা দিয়েছে। সেই বাবা আজ তাদের জীবনের এত বড় সিদ্ধান্ত নিজে একা-একা নিয়ে নিলো? একবার তাদের জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধটাও করলো না?
জায়িন হতভম্ব হয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়ে। মাথার মধ্যে একটা কথাই ঘুরপাক করছে, সে আদিবাকে কোন মুখে তার বিয়ের কথাটা জানাবে? মেয়েটা যে ছোট থেকে তার বউ হওয়ার স্বপ্ন দেখে আসছে, এছাড়া সে নিজেও তো তাঁকে কত কত স্বপ্ন দেখিয়েছে। সে বর সাজবে আর আদিবা তার বউ সাজবে। বিয়ের পর তাদের খুনসুটি পূর্ণ ছোট একটা সংসার হবে। তারা কথায় কথায় ঝগড়া করবে, কিন্তু দিন শেষে একে অপরের সাথে লেপে ঘুমাবে। সেই স্বপ্ন যে আজ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো তার বাবা-মায়ের একটা হটকারি সিদ্ধান্ত। নাহ! সে আর ভাবতে পারছে না।
জায়িন হাত ধুয়ে টেবিল ছাড়তে ছাড়তে বলে–
—অফিসের জন্য লেট হচ্ছে, আসছি।
কথাটা বলে চেয়ারে ঝুলানো কোর্টটা ও ব্যাগটা নিয়ে হনহনিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। ছেলেকে এমন বিবস মুখে না খেয়ে চলে যেতে দেখে হানিয়ার খারাপ লাগে। সে রাগী গলায় জাভিয়ানকে বলে–
—দেখলেন ছেলেটা না খেয়েই চলে গেলো। সব আপনার জন্য। বলে দিলে কি হতো ওদের বিয়েটা ওদের পছন্দের মানুষগুলোর সাথেই ঠিক করা হয়েছে?
জাভিয়ান হাসতে হাসতে বলে–
—আরে টেনশেন নিও না। একটু পরীক্ষা করা যাক না। দেখি ছেলে আমাদের উপর কতটা ভরসা করে। বিয়ের দিন যখন আদিবা মামুনিকে বউয়ের জায়গায় দেখবে তখন ওর এক্সপ্রেসনটা কেমন হবে সেটা একবার ভাবো। তুমি চিন্তা না করে কাদের কাদের দাওয়াত দিবে সেটার একটা লিস্ট রেডি করে ফেলো। আর হ্যাঁ, হায়া’কে ঐবাড়ির লোক সহ আজ-কালের মধ্যে জানি এসে পরে সকলে। আমি আমার বিজনেস পার্টনারদের ইনভাইট করতে একটু পরই বের হবো।
মি.তালুকদার আর রোজি বেগম জাভিয়ান-হানিয়ার কথা কিছুই বুঝে না। তারা প্রশ্নবোধক চাহনি নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। হানিয়া তাদের উৎকণ্ঠ বুঝতে পেরে নিজে থেকেই বলে–
—আপনাদের নাতিরা প্রেম করছে কয়েক বছর ধরে। কিন্তু ভয়ে বলেনি। উনি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন এসম্পর্কে। তাই আমরা ভাবলাম ছেলেদের একটু সারপ্রাইজ দেওয়া যাক, এর মধ্যে আজ উনি এমন উল্টাপাল্টা বলে ছেলেটার মাথা খারাপ করে দিলো।
হানিয়া তাদের দু’জনকে সবটা খুলে বললেও তারা হেঁসে দেয়।
_______________________
আজ অফিসে জায়িন সকলের সাথে মেজাজ খারাপ করছে। ভুল হলেও বকছে আবার ভুল না হলেও বকছে। সকলে তার এমন ব্যবহারে অবাক। কারণ জায়িন চঞ্চল, ছটফটে আর মিষ্টিভাষী একটা ছেলে। সকলের সাথে হেঁসেখেলে, মজামাস্তি করে চলে। কারো মন খারাপ থাকলে তাকে হাসানো দায়িত্ব তুলে নেয় নিজের কাঁধে। সেই ছেলের এমন ব্যবহার অবাক করারই বিষয়।
নিজের ছঠফটানি না দমিয়ে রাখতে পেরে জায়িন অফিস থেকে বের হয় যায়। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় কতক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায় গাড়ি নিয়ে। সবশেষে সিদ্ধান্ত নেয় আদিবার সাথে এবিষয়ে সোজাসুজি কথা বলবে। আদিবাকে মুক্ত করে দিবে তার বাঁধন থেকে। যেই ভাবা সেই কাজ। সে গাড়ি নিয়ে চলে যায় আদিবার বাসায়। তাদের বাসার সামনে গাড়ি থামিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে গেলে দারোয়ান জানায়, আদিবা ও তার পুরো পরিবার আজ সকালের ট্রেনে বাড়ি গিয়েছে। জায়িনের তো মাথায় হাত।
কারণ আদিবাদের গ্রামের বাড়ি একটুও নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না ফোনে। সে যে ফোনেও জানাবে সেটাও করতে পারবে না। সে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে–
—তারা কবে আসবে সে সম্পর্কে কিছু জানিয়েছে?
—সপ্তাহ এক থাকবে মনে হয়।
—আচ্ছা।
জায়িন মন খারাপ করে গাড়িতে উঠে বসে।
,________________________
বিরতিহীনভাবে একের পর এক কল দিয়েই চলেছে জাহান মেহরিমাকে। আজ সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেহরিমার এমন আচরন সম্পর্কে খোলাখুলি কথা বলবে। সামনে তারা নতুন জীবন শুরু করতে চলেছে তার আগে এমন অবস্থা হলে ভবিষ্যতের পরিণতি নিয়ে সে একটু শঙ্কিত।
এবারও মেহরিমার ফোন বিজি বলছে। জাহান ভাবে–
—বিগত এক ঘণ্টা ধরে মেহু কার সাথে কথা বলছে? হায়া’র সাথে?
সে মেহরিমাকে কল লাগানো বাদ দিয়ে কি মনে করে হায়া’কে কল লাগায়। হায়া’র ফোন রিং হচ্ছে দেখে সে একটু অবাকই হয়। হায়া’র সাথে কথা বলছে না তাহলে কার সাথে এক ঘণ্টা ধরে কথা বলছে? হায়া তখন ঘুমে থাকায় কলটা রিসিভ করতে পারে না।
জাহান হায়া’কে রেখে আবারও মেহরিমার নাম্বারে কল লাগায়। এবার মেহরিমা কল রিসিভ করে। আগের দিনের মতো আজও কোন সালাম বিনিময় ব্যতীত মেহরিমা রুক্ষ গলায় বলে–
—কি ব্যাপার? সাতসকালে এত ফোন দিচ্ছেন কেন?
জাহান গম্ভীর গলায় বলে–
—আজকাল দেখছি সালাম দেওয়াও ভুলে গিয়েছো। বেশ ভালোই পরিবর্তন হয়েছে তোমার দেখা যাচ্ছে।
মেহরিমা তার এমন কথায় কিছুটা দমে যায় তাই চুপ করে থাকে। জাহান পুনরায় বলে–
—বিগত এক ঘণ্টা ধরে তুমি কার সাথে কথা বলছিলে?
মেহরিমা তার এমন প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে যায়। সে আমতা আমতা করতে থাকলে জাহান ধমক দিয়ে বলে–
—কি হলো বলছো না কেনো? কার সাথে এক ঘণ্টা ধরে কথা বলছিলে?
মেহরিমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে–
—সব কথার কৈফিয়ত কি আপনাকে দিতে হবে?
জাহান তার এমন কথায় স্তব্ধ হয়ে যায়। সে কৈফিয়ত চাইলো কই? ভালোবাসার মানুষটিকে কি সে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারবে না? জাহান নিস্তেজ গলায় বলে–
—আমি কিছু জিজ্ঞেস করা তোমার কাছে কৈফিয়ত লাগে মেহু?
“মেহু” এই ডাক টায় যে কতটা ভালোবাসা মিশে থাকে সেটা মেহরিমা খুব ভালো করে জানে। কিন্তু আজ মেহরিমা সব জেনেও অজানা হওয়ার ভান করে। সে ককর্শ গলায় বলে–
—আপনি যেভাবে জিজ্ঞেস করেছেন সেটাকে কৈফিয়ত ছাড়া অন্য কিছু বলে ভাবা যায় না। শুনেন, ভালোবাসেন ভালো কথা, তাই বলে আমার পারসোনাল লাইফেও দখলদারি করবেন এটা আমি মেনে নিবো না। আমি কি করছি, কার সাথে কথা বলছি এতকিছুর জবাবদিহি আপনাকে করতে পারবো না। আমার কিছু কাজ আছে আমি রাখছি।
কথাটা বলে জাহানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কলটা কেটে দেয় মেহরিমা। কল কেটে যাওয়ার পরও জাহান ফোনটা কানে ধরে বসে থাকে। মিষ্টি, কোমলভাষী মেহরিমার থেকে এমন ব্যবহার তার বুকে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।
______________________
হায়া ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে আশিয়ান ফোন করেছে। সে খুশি মনে ফোনটা রিসিভ করে কানে লাগালে অপর পাশ থেকে একটা অপরিচিত কণ্ঠ শুনতে পায়। একজন ব্যক্তি হুড়মুড়িয়ে বলে–
—এই ফোনের মালিকের একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে, তাকে সিটি হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি আমরা। আপনি তার পরিবারের লোক হলে তাড়াতাড়ি সেখানে চলে আসুন।
হায়া’র হাত থেকে ফোনটা নিচে পরে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। তার কানে শুধু একটা কথাই বাজছে,”এই ফোনের মালিকের একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। ”
এরপর হায়া’র আর কিছু মনে নেই। সে শকটা নিতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যায়। কিছু একটা পরে যাওয়ার আওয়াজে স্পর্শ কিচেন থেকে বাহিরে আসলে হায়া’কে অজ্ঞানরত অবস্থা পায়।
~চলবে?
[ভাই ও বোনেরা, আমি নিশ্চয়ই গল্পের প্লটা আগে থেকে ভেবে গল্পটা লেখা শুরু করেছি। সব গল্পেই বিচ্ছেদ, রাগ-অভিমান এবং বিভিন্ন ট্র্যাজেডি হয়। এসব ছাড়া কি একটা গল্প জমে? চালাচ্ছিলাম তে গল্পটা সব ছাড়া, তখন আপনাদের কেমন একঘেয়েমি লাগে নি? সত্যি করে বলবেন কিন্তু। এই গল্পটা তেও এসব স্পাইসেস থাকবে গল্পটাকে জমানোর জন্য। তাই বলে কি আপনারা আমায় লেখা ছেড় দিতে বলবেন এটা কি ঠিক?
আপনারাও জানেন আর আমিও জানি সব ভালোবাসায় পূর্ণতা পায় না। এমন অনেক গল্প আছে যেটা পড়লে মনে হয় “ইশ এটায় পূর্ণতা থাকলে ভালো হতো” কিন্তু একটু নিরিবিলি যখন ভেবে দেখবেন তখন ঠিকই বুঝতে পারবেন, পূর্ণতা সব গল্পে মানায় না। আমি বলছি না আমার গল্পটা স্যাড হবে, কিন্তু সাময়িক বিচ্ছেদ তো হতেই পারে তাই না?
আমার কথায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি দুঃখিত কিন্তু আমার মনে হয়েছে এসব না বললে আমি শান্ত হতে পারবো না।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 🖤]

