##সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৩৬
রাতের ডিনারটা সকলে নিজেদের ঘরেই করে ফেলে। কারো মনমানসিকতা তেমন একটা ভালো নেই, কিন্তু কেউই সারাদিন ভালো করে খায়নি তাই যার যার রুমে খাবার পৌঁছে দিয়েছে হানিয়া। জাহান খেতে না চাইলে জাভিয়ান অনেক কষ্টে খাওয়ায়। মেহরিমাকে হানিয়া খাইয়ে তার কাছেই শুইয়ে দেয়। মাতৃস্নেহে তাঁকে আগলে নেয় নিজের আরেক সন্তানের মতো।
শুয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তার জীবনের অনেক কথাই শোনায় মেহরিমাকে যা তার সন্তানরাও হয়ত জানে না। সে মেহরিমাকে বলে–
—মা রে, পুরুষের ভালোবাসা কতটা সুন্দর তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। একজন পুরুষ যখন তোমায় নিজের সবটা দিয়ে ভালোবাসবে তখন সে তোমার জন্য পুরো পৃথিবীর বিপক্ষে গিয়েও দাঁড়াতে দুইবার ভাববে না। আজ তোমায় কিছু কাহিনী শোনায়, এসব কাহিনী আমার সন্তানরাও তেমন একটা জানে না। জাহানের বাবা আমাকে বিয়ে করেছিল একটা প্রতিশোধের নেওয়ার জন্য। প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট দিতো, আমি শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে ধৈর্য চাইতাম। আমার জীবনের প্রথম পুরুষ সে হওয়ায় বিয়ের পরপরই তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, তাই তার দেওয়া কষ্টটা আমার বেশিই আহত করত। তার মনে আমার জন্য কিছু ছিলো না এমনটা কিন্তু নয়, কিন্তু সে প্রতিশোধের নেশায় ডুবে গিয়ে সেটাকে ফিল করতে পারত না। একসময় তার ভুল ধারণা গুলো নিজ দায়িত্ব নিয়ে ভেঙে দিলাম। সে ক্ষমা চাইল, কিন্তু আমার মন ততদিনে অর্ধমৃত । তাকে অন্য এক নারীর হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলাম দূর অজানায়। ভেবেছিলাম আমি দূরে গেলে সকলে ভালো থাকবে, সে ভালো থাকবে।
মেহরিমা অনেক আগ্রহ নিয়ে শুনছে। সে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে–
—তারপর কি হলো আন্টি? আপনারা আবার এক হলেন কিভাবে?
—আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম সবার জন্য। উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় হাঁটছিলাম তখন রাতুল ভাইয়ার গাড়ির সামনে এক্সিডেন্ট হয় আমার। রাতুল ভাইয়া হলো রাহা বাবা। (রাতুলের কথা শুনে মেহরিমার মুখটা আঁধারে ছেয়ে যায়) তারা আমায় হসপিটাল নিয়ে চিকিৎসা করায় আর আমার এমন অবস্থার কারণ জিজ্ঞেস করে। আমি তাদের সবটা বললে তারা আমার দিকে সাহায্য, সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেয়। নিজেদের সাথে করে নিয়ে যায়। আমায় প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে। বিসিএস ক্যাডার হলাম তাদের অনুপ্রেরণা আর আল্লাহর অশেষ রহমতে। ঢাকায় ট্রেনিংয়ে এসে আবার দেখা হলো তোমার আঙ্কেলের সাথে। জানতে পারলাম, আমার চলে যাওয়া নাকি সে মানতে পারেনি। আড়াই বছর পাগল হয়ে এই রুমেই বন্দি ছিল সে।
কথাগুলো বলতে বলতে হানিয়ার গলা ভারি হয়ে আসে। চোখে অল্পবিস্তর অশ্রুদের আনাগোনাও দেখা মিলে কিন্তু সেগুলো গড়িয়ে পড়ে না। মেহরিমা এসব শুনে হা করে তাকিয়ে থাকে হানিয়ার দিকে। সে ভাবতে থাকে ঠিক কতটা ভালোবাসলে একজন পুরুষ তার ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল।
হানিয়া আবার বলা শুরু করে–
—আমি তার জীবনে ফিরে আসার কিছুদিন আগে তার অবস্থা একটু স্থিতিশীল হয়েছিল কিন্তু পুরোপুরি ভালো হয়নি তখনও। আমি বিগত বছর গুলোর ঘটনা জানতে পেরে তার থেকে আর মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারলাম না। তাকে ক্ষমা করে পুনরায় শুরু করলাম সংসার। আলহামদুলিল্লাহ আজ ৩১ বছর পার হয়ে কয়েকমাস পর ৩২ বছরে পা দিবে আমাদের সংসার। তোমাকে এসব বলার কারণ কি জানো?
মেহরিমা অবুঝের মতো মাথা নাড়ায়। সে জানে না কেন বললো হানিয়া এসব। হানিয়া বলে–
—আমি ফিরে এসে জাভিয়ানকে যেমন উদ্ভ্রান্তের মতো পেয়েছিলাম, তুমি চলে যাওয়ার পর আমার জাহানেরও সেই অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। সে কিছু খেতো না, কারো সাথে কথা বলত না, নিজের বা তার কাজের প্রতি কোন খেয়াল ছিল না। আমার পরিপাটি, গুছানো ছেলেটা কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছিল। শুধু কান্না করত আর বলত– আম্মু, আমি ওকে আমার সবটা দিয়ে ভালোবেসেছিলাম, ও তাও কেন আরেকজনের কথায় আমায় ছেড়ে গেলো? আমায় কেন ভালোবাসল না আমার মতো করে? ওকে আমার কাছে এনে দাও আম্মু।
হানিয়ার কাছ থেকে জাহানের এমন দুর্দশার কথা শুনে মেহরিমা নিজের চোখের পানি আটকে রাখতে পারে না। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হুহু করে কেঁদে দেয়। সেও তো জাহানের ভালো থাকার কথা ভেবে থাকে ছেড়ে গিয়েছিল। সে যে এতিম, তার জন্মপরিচয়ের কোন ঠিক নেই আর নাই বা আছে স্ট্যাটাস। সে কি জাহানের পাশে মানায়? মানায় না তো। জাহানরা হাইক্লাস ফ্যামিলির লোক আর তার তো কোন ক্লাসই নেই। এতিমদের আবার ক্লাস, হাহ্!
এসবই তার মাথায় ঢুকিয়েছে রাহাত। বেশ কয়েকদিন সময় নিয়ে ভালোভাবে তার ব্রেইন ওয়াশ করেছে। যার কারণে সে জাহানের ভালোবাসার কথা না ভেবে, তাকে ভবিষ্যতে যাতে কারো কাছ থেকে কটুক্তি শুনতে না হয় তাই তো রাহার কাছে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু সে তো ভাবতে পারেনি জাহান এতটা কষ্ট পাবে, নিজের এমন হাল করবে।
হানিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে তাক শান্ত করার চেষ্টা করে–
—হুশ, কাদে না আর। আহা মেয়ে দেখো কথার আগে কান্না করে। এত কান্না করলে শরীর খারাপ করবে তো মামুনি। কান্না থামাও নাহলে আমি কিন্তু এবার জল্লাদ শ্বাশুড়ির রূপ নিবো। এতদিন ছিলাম বান্ধবীর মা, আজ থেকে তোমারও মা তাই কথা না শুনলে কান মলে দিতে দুইবার ভাববো না কিন্তু।
মেহরিমা হানিয়া জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। হানিয়া সময় দেয় তাকে শান্ত হতে। মেহরিমার কান্না থেমে গেলেও তার ফুঁপানো বন্ধ হয় না। সে ফুপাতে ফুপাতে বলে–
—আন্টি আমিও তো তার ভালোর জন্যই ছেড়ে গিয়েছিলাম। আমি যে এতিম আন্টি, আমার কোন সঠিক জন্মপরিচয় নেই। তাকে যখন কেউ জিজ্ঞেস করবে তার বউয়ের বাবা মা কে? তারা কোথায় বা কি করে তখন তো তাকে বিব্রতকর অবস্থায় পরতে হবে। আমি তো তাকে এমন বিব্রতকর অবস্থায় দেখতে পারব না বলেই দূরে চলে গিয়েছিলাম। ভালো তো আমিও বাসি তাকে আন্টি, ভালোবাসি বলেই তাকে লজ্জা-বিব্রতকর পরিস্থিতে দেখতে পারব না বলেই চলে গিয়েছিলাম। রাহাত আঙ্কেল বলেছিলেন, বিয়ে করলে নাকি একসময় ঠিক হয়ে যাবে। রাহা নাকি তাকে সামলে নিতে পারবে তাই তো চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি কখনো কল্পনাতেও উনার এমন দূর্দশার কথা ভাবি নি।
কথাগুলো বলতে বলতে মেহরিমা আবারও কাঁদতে থাকে। হানিয়া তাকে বলে–
—তুমি তোমার পিতামাতার পরিচয়ে না নিজের আলাদা পরিচয়ে পরিচিত হবে। আমাকে দেখো, আমি কি তোমার আঙ্কেলের কাছে ফিরে আসার পর চাকরিটা আর কন্টিনিউ করতে চাইনি। পুরোদস্তর গৃহিণী হয়ে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার উনি আমায় এক গুরুদায়িত্ব দিলেন। বললেন, সমাজ সব স্ত্রী’রা তো তাদের স্বামীর নামে পরিচিত হয় আমি আমার স্ত্রীর নামে পরিচিত হতে চাই।
আমায় বললেন— “সমাজে যেনো তুমি ওয়াইফ অফ জাভিয়ান তালুকদার নামে পরিচিত না হয়ে আমি যেনো হাসবেন্ড অফ হানিয়া মির্জা নামে পরিচিত হতে পারি”। তারপর লেগে পরলাম দায়িত্ব পালন করতে, আলহামদুলিল্লাহ আমি সেই দায়িত্ব পালনে সফল হয়েছি। তেমনি তুমিও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করবে। তুমি অন্যের নামে না নিজের নামে পরিচিত হবে। আমাদের পরিবারে মেয়েদের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে কঠোর নজর রাখা হয়। সংসার নিয়ে তেমন চাপ নিবে না, আমায় আল্লাহ তায়া’লা যতদিন সুস্থ রেখেছেন ততদিন আমিই সংসারের দেখভাল করব। তোমরা দুই জা মন দিয়ে পড়ালেখা করবে আর মিলেমিশে থাকবে এইটুকুই আমার চাওয়া। কি পারবে না মামুনি?
মেহরিমা হানিয়ার কথা শুনে অনেক অনুপ্রাণিত হয়। সেই সাথে মুগ্ধও হয় তার মনমানসিকতা দেখে। সে হানিয়াকে জড়িয়ে ধরেই বলে–
—পারবো আন্টি। আপনি শুধু আমাদের পাশে অভিভাবক হয়ে থেকেন আমরা সব পারব ইনশা আল্লাহ।
—আরেকটা কথা, এখন কিন্তু আমি আর তোমার বান্ধবী মা নই, তোমার শ্বাশুড়ি। তাই আন্টি ডাকলে কিন্তু বকা দিবো আমি। আদিবার মতো আমায় আম্মু ডাকতে হবে বলে দিলাম আমি।
মেহরিমা একটু লজ্জা পায় তার কথায়, সে আমতাআমতা করে বলে–
—আচ্ছা আন্টি।
কথাটা বলেই সে জিভে কামড় দেয়, তারপর হানিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখপ সে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে। মেহরিমা হুড়মুড়িয়ে বলে–
—সরি আম্মু।
হানিয়া হেঁসে দেয়। তারপর দু’জনে আরো কিছু কথা বলে ঘুমিয়ে পড়ে।
_________________________
সকালে ঘুম থেকে উঠে হানিয়া মেহরিমাকে একটা মেরুন রঙের একটা শাড়ি পরতে দেয়। নতুন বউ তাই শাড়ি পরাটা অবশ্যক। হানিয়া নিচে চলে যায় ব্রেকফাস্ট বানাতে আর মেহরিমাকে শাড়ি পরে নিচে আসতে বলে। মেহরিমা শাড়িটা পরে মাথার চুলগুলো মাঝ বরাবর সিঁথি কেটে ছেড়ে দেয়। গোসল করায় চুল গুলো ভিজে থাকায় ছেড়ে রেখেছে। মাথায় ঘোমটা দিয়ে নিচে নেমে আসে।
জাহান-জায়িন আর জাভিয়ান তখন মর্নিংওয়াক করে ফিরেছে বাসায়। কলিংবেল বাজার শব্দ শুনে মেহরিমা এগিয়ে যায় দরজা খুলতে। সে দরজা খুলে দিতেই জাহান জায়িনের সাথে কথা বলতে বলতে বাসায় প্রবেশ করে। মেহরিমাকে খেয়াল করে নি সে। জাভিয়ানও ফোনে কথা বলতে বলতে ভেতরে চলে যায়।
তারা তিনজন সোফায় গিয়ে বসতেই মেহরিমা ডাইনিং টেবিল থেকে তিনজনের জন্য তিন গ্লাস পানি নিয়ে আসে। জাভিয়ানকে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিতেই জাভিয়ান হালকা হেঁসে বলে–
—ধন্যবাদ মামুনি।
মেহরিমা মুচকি হেসে জাহান আর জায়িনের দিকে এগিয়ে যায়। জায়িনকে পানিটা দিতে সেও বলে উঠে–
—ধন্যবাদ ভাবী সাহেবাাাাাাাা।
একটু টেনে টেনে দুষ্টুমি করে কথাটা বলে জায়িন। এদিকে জায়িনের ভাবীসাহেবা ডাক শুনে জাহান ফোন থেকে চোখ তুলে তার দিকে তাকায়। আর এই তাকানো টাই যেনো তার সর্বনাশের কারণ হয়ে দাড়ায়। মেহরিমাকে আজ প্রথম শাড়ি পরা দেখছে সে। শাড়ি পরুয়া মেহরিমাকে এত মোহনীয় লাগছে যে জাহান পানির গ্লাসটা না নিয়েই হা করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
মেহরিমা লজ্জা পেয়ে যায় জাহানের এমন করে তাকানোতে। তার চিবুকজোড়ায় রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে। আঁড়চোখে জায়িনের দিকে তাকিয়ে দেখে সে মিটমিটিয়ে হেঁসে তাকিয়ে আছে জাহানের দিকে। এটা দেখে মেহরিমা আরো লজ্জা পেয়ে যায়। মেহরিমা গলা খাঁকারি দিয়ে মিনমিনিয়ে বলে–
—পানি টা নিন।
জাহানের ঘোর তখনও ভাঙেনি। সে সম্মোহনী দৃষ্টি নিয়েই মেহরিমার হাত থেকে পানিটা নেয়। জাহান পানির গ্লাসটা নিতেই মেহরিমা ট্রে’টা নিয়ে তড়িঘড়ি করে সেখান থেকে কিচেনে চলে যায়। তার চলে যাওয়ার পর জাহানের ঘোর ভাঙে। সে চোখ নামিয়ে একবার হাতের গ্লাস টার দিকে তাকায় আরেকবার তার বাবা আর ভাইয়ের দিকে তাকায়। জাভিয়ান পুরো বিষয়টা খেয়াল করেছে আর ফোন চালানোর বাহানায় মিটমিটিয়ে হাসছে। বাবাকে হাসতে দেখে জাহানও লজ্জা পেয়ে যায়।
জায়িনের দিকে তাকিয়ে দেখে তার গুনধর ভাই দাঁত সবগুলো বের করে হাসছে। জাহান জানে জায়িন এখন তাকে লজ্জার সাগরে ডুবিয়ে মারার পায়তারা করছে। তাই সে পানিটা এক ঢোকে শেষ করে সেখান থেকে উঠে হাঁটা লাগায় নিজের রুমের উদ্দেশ্য। কয়েকটা সিঁড়ি উঠতেই নিচে বাবা আর ভাইয়ের হাসির আওয়াজ শুনতে পায়। তার মুখেও হাসি ফুটে ওঠে। মাথার পেছনের দিকে চুলকাতে চুলকাতে বিড়বিড়িয়ে বলে–
—বিয়ে হতে না হতেই আমার চরিত্র দোষের মিশনে নেমে গিয়েছে।
~চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 😘]
রাতের ডিনারটা সকলে নিজেদের ঘরেই করে ফেলে। কারো মনমানসিকতা তেমন একটা ভালো নেই, কিন্তু কেউই সারাদিন ভালো করে খায়নি তাই যার যার রুমে খাবার পৌঁছে দিয়েছে হানিয়া। জাহান খেতে না চাইলে জাভিয়ান অনেক কষ্টে খাওয়ায়। মেহরিমাকে হানিয়া খাইয়ে তার কাছেই শুইয়ে দেয়। মাতৃস্নেহে তাঁকে আগলে নেয় নিজের আরেক সন্তানের মতো।
শুয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তার জীবনের অনেক কথাই শোনায় মেহরিমাকে যা তার সন্তানরাও হয়ত জানে না। সে মেহরিমাকে বলে–
—মা রে, পুরুষের ভালোবাসা কতটা সুন্দর তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। একজন পুরুষ যখন তোমায় নিজের সবটা দিয়ে ভালোবাসবে তখন সে তোমার জন্য পুরো পৃথিবীর বিপক্ষে গিয়েও দাঁড়াতে দুইবার ভাববে না। আজ তোমায় কিছু কাহিনী শোনায়, এসব কাহিনী আমার সন্তানরাও তেমন একটা জানে না। জাহানের বাবা আমাকে বিয়ে করেছিল একটা প্রতিশোধের নেওয়ার জন্য। প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট দিতো, আমি শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে ধৈর্য চাইতাম। আমার জীবনের প্রথম পুরুষ সে হওয়ায় বিয়ের পরপরই তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, তাই তার দেওয়া কষ্টটা আমার বেশিই আহত করত। তার মনে আমার জন্য কিছু ছিলো না এমনটা কিন্তু নয়, কিন্তু সে প্রতিশোধের নেশায় ডুবে গিয়ে সেটাকে ফিল করতে পারত না। একসময় তার ভুল ধারণা গুলো নিজ দায়িত্ব নিয়ে ভেঙে দিলাম। সে ক্ষমা চাইল, কিন্তু আমার মন ততদিনে অর্ধমৃত । তাকে অন্য এক নারীর হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে গেলাম দূর অজানায়। ভেবেছিলাম আমি দূরে গেলে সকলে ভালো থাকবে, সে ভালো থাকবে।
মেহরিমা অনেক আগ্রহ নিয়ে শুনছে। সে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে–
—তারপর কি হলো আন্টি? আপনারা আবার এক হলেন কিভাবে?
—আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম সবার জন্য। উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় হাঁটছিলাম তখন রাতুল ভাইয়ার গাড়ির সামনে এক্সিডেন্ট হয় আমার। রাতুল ভাইয়া হলো রাহা বাবা। (রাতুলের কথা শুনে মেহরিমার মুখটা আঁধারে ছেয়ে যায়) তারা আমায় হসপিটাল নিয়ে চিকিৎসা করায় আর আমার এমন অবস্থার কারণ জিজ্ঞেস করে। আমি তাদের সবটা বললে তারা আমার দিকে সাহায্য, সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেয়। নিজেদের সাথে করে নিয়ে যায়। আমায় প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে। বিসিএস ক্যাডার হলাম তাদের অনুপ্রেরণা আর আল্লাহর অশেষ রহমতে। ঢাকায় ট্রেনিংয়ে এসে আবার দেখা হলো তোমার আঙ্কেলের সাথে। জানতে পারলাম, আমার চলে যাওয়া নাকি সে মানতে পারেনি। আড়াই বছর পাগল হয়ে এই রুমেই বন্দি ছিল সে।
কথাগুলো বলতে বলতে হানিয়ার গলা ভারি হয়ে আসে। চোখে অল্পবিস্তর অশ্রুদের আনাগোনাও দেখা মিলে কিন্তু সেগুলো গড়িয়ে পড়ে না। মেহরিমা এসব শুনে হা করে তাকিয়ে থাকে হানিয়ার দিকে। সে ভাবতে থাকে ঠিক কতটা ভালোবাসলে একজন পুরুষ তার ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল।
হানিয়া আবার বলা শুরু করে–
—আমি তার জীবনে ফিরে আসার কিছুদিন আগে তার অবস্থা একটু স্থিতিশীল হয়েছিল কিন্তু পুরোপুরি ভালো হয়নি তখনও। আমি বিগত বছর গুলোর ঘটনা জানতে পেরে তার থেকে আর মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারলাম না। তাকে ক্ষমা করে পুনরায় শুরু করলাম সংসার। আলহামদুলিল্লাহ আজ ৩১ বছর পার হয়ে কয়েকমাস পর ৩২ বছরে পা দিবে আমাদের সংসার। তোমাকে এসব বলার কারণ কি জানো?
মেহরিমা অবুঝের মতো মাথা নাড়ায়। সে জানে না কেন বললো হানিয়া এসব। হানিয়া বলে–
—আমি ফিরে এসে জাভিয়ানকে যেমন উদ্ভ্রান্তের মতো পেয়েছিলাম, তুমি চলে যাওয়ার পর আমার জাহানেরও সেই অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। সে কিছু খেতো না, কারো সাথে কথা বলত না, নিজের বা তার কাজের প্রতি কোন খেয়াল ছিল না। আমার পরিপাটি, গুছানো ছেলেটা কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছিল। শুধু কান্না করত আর বলত– আম্মু, আমি ওকে আমার সবটা দিয়ে ভালোবেসেছিলাম, ও তাও কেন আরেকজনের কথায় আমায় ছেড়ে গেলো? আমায় কেন ভালোবাসল না আমার মতো করে? ওকে আমার কাছে এনে দাও আম্মু।
হানিয়ার কাছ থেকে জাহানের এমন দুর্দশার কথা শুনে মেহরিমা নিজের চোখের পানি আটকে রাখতে পারে না। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হুহু করে কেঁদে দেয়। সেও তো জাহানের ভালো থাকার কথা ভেবে থাকে ছেড়ে গিয়েছিল। সে যে এতিম, তার জন্মপরিচয়ের কোন ঠিক নেই আর নাই বা আছে স্ট্যাটাস। সে কি জাহানের পাশে মানায়? মানায় না তো। জাহানরা হাইক্লাস ফ্যামিলির লোক আর তার তো কোন ক্লাসই নেই। এতিমদের আবার ক্লাস, হাহ্!
এসবই তার মাথায় ঢুকিয়েছে রাহাত। বেশ কয়েকদিন সময় নিয়ে ভালোভাবে তার ব্রেইন ওয়াশ করেছে। যার কারণে সে জাহানের ভালোবাসার কথা না ভেবে, তাকে ভবিষ্যতে যাতে কারো কাছ থেকে কটুক্তি শুনতে না হয় তাই তো রাহার কাছে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু সে তো ভাবতে পারেনি জাহান এতটা কষ্ট পাবে, নিজের এমন হাল করবে।
হানিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে তাক শান্ত করার চেষ্টা করে–
—হুশ, কাদে না আর। আহা মেয়ে দেখো কথার আগে কান্না করে। এত কান্না করলে শরীর খারাপ করবে তো মামুনি। কান্না থামাও নাহলে আমি কিন্তু এবার জল্লাদ শ্বাশুড়ির রূপ নিবো। এতদিন ছিলাম বান্ধবীর মা, আজ থেকে তোমারও মা তাই কথা না শুনলে কান মলে দিতে দুইবার ভাববো না কিন্তু।
মেহরিমা হানিয়া জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। হানিয়া সময় দেয় তাকে শান্ত হতে। মেহরিমার কান্না থেমে গেলেও তার ফুঁপানো বন্ধ হয় না। সে ফুপাতে ফুপাতে বলে–
—আন্টি আমিও তো তার ভালোর জন্যই ছেড়ে গিয়েছিলাম। আমি যে এতিম আন্টি, আমার কোন সঠিক জন্মপরিচয় নেই। তাকে যখন কেউ জিজ্ঞেস করবে তার বউয়ের বাবা মা কে? তারা কোথায় বা কি করে তখন তো তাকে বিব্রতকর অবস্থায় পরতে হবে। আমি তো তাকে এমন বিব্রতকর অবস্থায় দেখতে পারব না বলেই দূরে চলে গিয়েছিলাম। ভালো তো আমিও বাসি তাকে আন্টি, ভালোবাসি বলেই তাকে লজ্জা-বিব্রতকর পরিস্থিতে দেখতে পারব না বলেই চলে গিয়েছিলাম। রাহাত আঙ্কেল বলেছিলেন, বিয়ে করলে নাকি একসময় ঠিক হয়ে যাবে। রাহা নাকি তাকে সামলে নিতে পারবে তাই তো চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি কখনো কল্পনাতেও উনার এমন দূর্দশার কথা ভাবি নি।
কথাগুলো বলতে বলতে মেহরিমা আবারও কাঁদতে থাকে। হানিয়া তাকে বলে–
—তুমি তোমার পিতামাতার পরিচয়ে না নিজের আলাদা পরিচয়ে পরিচিত হবে। আমাকে দেখো, আমি কি তোমার আঙ্কেলের কাছে ফিরে আসার পর চাকরিটা আর কন্টিনিউ করতে চাইনি। পুরোদস্তর গৃহিণী হয়ে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার উনি আমায় এক গুরুদায়িত্ব দিলেন। বললেন, সমাজ সব স্ত্রী’রা তো তাদের স্বামীর নামে পরিচিত হয় আমি আমার স্ত্রীর নামে পরিচিত হতে চাই।
আমায় বললেন— “সমাজে যেনো তুমি ওয়াইফ অফ জাভিয়ান তালুকদার নামে পরিচিত না হয়ে আমি যেনো হাসবেন্ড অফ হানিয়া মির্জা নামে পরিচিত হতে পারি”। তারপর লেগে পরলাম দায়িত্ব পালন করতে, আলহামদুলিল্লাহ আমি সেই দায়িত্ব পালনে সফল হয়েছি। তেমনি তুমিও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করবে। তুমি অন্যের নামে না নিজের নামে পরিচিত হবে। আমাদের পরিবারে মেয়েদের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে কঠোর নজর রাখা হয়। সংসার নিয়ে তেমন চাপ নিবে না, আমায় আল্লাহ তায়া’লা যতদিন সুস্থ রেখেছেন ততদিন আমিই সংসারের দেখভাল করব। তোমরা দুই জা মন দিয়ে পড়ালেখা করবে আর মিলেমিশে থাকবে এইটুকুই আমার চাওয়া। কি পারবে না মামুনি?
মেহরিমা হানিয়ার কথা শুনে অনেক অনুপ্রাণিত হয়। সেই সাথে মুগ্ধও হয় তার মনমানসিকতা দেখে। সে হানিয়াকে জড়িয়ে ধরেই বলে–
—পারবো আন্টি। আপনি শুধু আমাদের পাশে অভিভাবক হয়ে থেকেন আমরা সব পারব ইনশা আল্লাহ।
—আরেকটা কথা, এখন কিন্তু আমি আর তোমার বান্ধবী মা নই, তোমার শ্বাশুড়ি। তাই আন্টি ডাকলে কিন্তু বকা দিবো আমি। আদিবার মতো আমায় আম্মু ডাকতে হবে বলে দিলাম আমি।
মেহরিমা একটু লজ্জা পায় তার কথায়, সে আমতাআমতা করে বলে–
—আচ্ছা আন্টি।
কথাটা বলেই সে জিভে কামড় দেয়, তারপর হানিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখপ সে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে। মেহরিমা হুড়মুড়িয়ে বলে–
—সরি আম্মু।
হানিয়া হেঁসে দেয়। তারপর দু’জনে আরো কিছু কথা বলে ঘুমিয়ে পড়ে।
_________________________
সকালে ঘুম থেকে উঠে হানিয়া মেহরিমাকে একটা মেরুন রঙের একটা শাড়ি পরতে দেয়। নতুন বউ তাই শাড়ি পরাটা অবশ্যক। হানিয়া নিচে চলে যায় ব্রেকফাস্ট বানাতে আর মেহরিমাকে শাড়ি পরে নিচে আসতে বলে। মেহরিমা শাড়িটা পরে মাথার চুলগুলো মাঝ বরাবর সিঁথি কেটে ছেড়ে দেয়। গোসল করায় চুল গুলো ভিজে থাকায় ছেড়ে রেখেছে। মাথায় ঘোমটা দিয়ে নিচে নেমে আসে।
জাহান-জায়িন আর জাভিয়ান তখন মর্নিংওয়াক করে ফিরেছে বাসায়। কলিংবেল বাজার শব্দ শুনে মেহরিমা এগিয়ে যায় দরজা খুলতে। সে দরজা খুলে দিতেই জাহান জায়িনের সাথে কথা বলতে বলতে বাসায় প্রবেশ করে। মেহরিমাকে খেয়াল করে নি সে। জাভিয়ানও ফোনে কথা বলতে বলতে ভেতরে চলে যায়।
তারা তিনজন সোফায় গিয়ে বসতেই মেহরিমা ডাইনিং টেবিল থেকে তিনজনের জন্য তিন গ্লাস পানি নিয়ে আসে। জাভিয়ানকে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিতেই জাভিয়ান হালকা হেঁসে বলে–
—ধন্যবাদ মামুনি।
মেহরিমা মুচকি হেসে জাহান আর জায়িনের দিকে এগিয়ে যায়। জায়িনকে পানিটা দিতে সেও বলে উঠে–
—ধন্যবাদ ভাবী সাহেবাাাাাাাা।
একটু টেনে টেনে দুষ্টুমি করে কথাটা বলে জায়িন। এদিকে জায়িনের ভাবীসাহেবা ডাক শুনে জাহান ফোন থেকে চোখ তুলে তার দিকে তাকায়। আর এই তাকানো টাই যেনো তার সর্বনাশের কারণ হয়ে দাড়ায়। মেহরিমাকে আজ প্রথম শাড়ি পরা দেখছে সে। শাড়ি পরুয়া মেহরিমাকে এত মোহনীয় লাগছে যে জাহান পানির গ্লাসটা না নিয়েই হা করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
মেহরিমা লজ্জা পেয়ে যায় জাহানের এমন করে তাকানোতে। তার চিবুকজোড়ায় রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে। আঁড়চোখে জায়িনের দিকে তাকিয়ে দেখে সে মিটমিটিয়ে হেঁসে তাকিয়ে আছে জাহানের দিকে। এটা দেখে মেহরিমা আরো লজ্জা পেয়ে যায়। মেহরিমা গলা খাঁকারি দিয়ে মিনমিনিয়ে বলে–
—পানি টা নিন।
জাহানের ঘোর তখনও ভাঙেনি। সে সম্মোহনী দৃষ্টি নিয়েই মেহরিমার হাত থেকে পানিটা নেয়। জাহান পানির গ্লাসটা নিতেই মেহরিমা ট্রে’টা নিয়ে তড়িঘড়ি করে সেখান থেকে কিচেনে চলে যায়। তার চলে যাওয়ার পর জাহানের ঘোর ভাঙে। সে চোখ নামিয়ে একবার হাতের গ্লাস টার দিকে তাকায় আরেকবার তার বাবা আর ভাইয়ের দিকে তাকায়। জাভিয়ান পুরো বিষয়টা খেয়াল করেছে আর ফোন চালানোর বাহানায় মিটমিটিয়ে হাসছে। বাবাকে হাসতে দেখে জাহানও লজ্জা পেয়ে যায়।
জায়িনের দিকে তাকিয়ে দেখে তার গুনধর ভাই দাঁত সবগুলো বের করে হাসছে। জাহান জানে জায়িন এখন তাকে লজ্জার সাগরে ডুবিয়ে মারার পায়তারা করছে। তাই সে পানিটা এক ঢোকে শেষ করে সেখান থেকে উঠে হাঁটা লাগায় নিজের রুমের উদ্দেশ্য। কয়েকটা সিঁড়ি উঠতেই নিচে বাবা আর ভাইয়ের হাসির আওয়াজ শুনতে পায়। তার মুখেও হাসি ফুটে ওঠে। মাথার পেছনের দিকে চুলকাতে চুলকাতে বিড়বিড়িয়ে বলে–
—বিয়ে হতে না হতেই আমার চরিত্র দোষের মিশনে নেমে গিয়েছে।
~চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 😘]

