#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪৫
আশিয়ান, জাহান ও জায়িন হায়াকে খুঁজতে খুঁজতে পাগলপ্রায়। সম্ভাব্য সব জায়গা, চেনা-পরিচিত সকলের কাছে জিজ্ঞেস করা হয়ে গিয়েছে হায়ার কথা, কিন্তু হায়াকে কোথাও খুজে পাওয়া যায় নি। বাসায় জানাবে না জানাবে না করেও একসময় জানিয়ে দেওয়া হয়। তারপর থেকেই হাসি-খুশি, আনন্দে ঘেরা মহলটা বিষন্নতায় ছেয়ে গিয়েছে।
আট ঘণ্টা হয়ে যাওয়ার পরও যখন আশিয়ান হায়াকে দিকে টেনশনে প্রেশার বাড়িয়ে ফেলেছে, তাই জাহান-জায়িন জোর করে তাকে ধরে বাসায় নিয়ে এসেছে। কিন্তু আশিয়ান হায়াকে না দেখা অব্দি শান্ত হচ্ছে না কিছুতেই।
হঠাৎই কলিংবেলের আওয়াজ শোনা যায়। হেল্পিং হ্যান্ড মহিলা গিয়ে দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলে সে একদম অবাক হয়ে যায়। কারণ তার সামনে হায়া দাড়িয়ে আছে আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে হায়ার না হওয়া বর মানে ফারাবি। হায়ার মুখে গম্ভীর্যতার কালো আধার লেপ্টে আছে, অন্যদিকে ফারাবির হাসিহাসি মুখে দাড়িয়ে আছে।
হায়া গম্ভীর গলায় বলে–
—ভেতরে ঢুকতে দেন খালা।
কাজের মহিলাটি প্রায় অনেক বছর ধরেই তালুকদার বাড়িতে কাজ করছে। এতদিনের কর্মজীবনে হায়া তার সাথে কখনোই এমন গম্ভীর গলায় কথা বলেনি। এই বাড়ির সকলে তাকে পরিবারের একজনের মতো ট্রিট করে। হায়াও তাকে “খালা” বলে ডেকে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। সেই মেয়ে আজ প্রথম এমন গম্ভীর গলায় আদেশের মতো কথা বলায় মহিলাটি একটু না বেশ ভালোই চমকে যায়। সে তাদের ভেতরে যাওয়ার জায়গা করে দেয়।
জাহান-জায়িন আশিয়ানকে বাসায় রেখে হায়াকে খুঁজতে আবারও বের হচ্ছিল, ঠিক তখনই তাদের সামনে এসে উপস্থিত হয় হায়া। দুই ভাই কতক্ষণ ভ্যাবলার মতো বোনের দিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে এটা কি আসলেই তাদের বোন, নাকি তাদের কোন হ্যালুসিনেশন হচ্ছে।
এদিকে ভাইদের এমন অদ্ভুত কান্ডে হায়ার মেজাজ গরম হয়। এমনিতেই মন মেজাজ ভালো না, তারউপর তার ভাইয়েরা এমন কাজ করছে, সে রেগে খানিকটা ধমকের সুরে বলে–
— সামনে থেকে সরবে নাকি ধাক্কার দিবো?
হায়ার ধমক খেয়ে জাহান-জায়িন সিউর হয় এটা তাদের হ্যালুসিনেশন না। দুই ভাই হুট করে আদরের বোনকে জড়িয়ে ধরে। হায়া কয়েক কদম পিছিয়ে যায় ভাইদের এমন হুট করে জড়িয়ে ধরায়, সে পরতে পরতো নিজেকে সামলে নেয় কোন মতো। সেও কোন মতে দুই ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলে–
—আরে বাবা, পরে যেতাম তো। এমন করে কেউ।
জাহান বোনকে ছেড়ে দিয়ে তার দুইগালে হাত রেখে অস্থির গলায় বলে–
—বনু, কই গিয়েছিলে তুমি? জানো আমরা কত চিন্তা করছিলাম তোমার জন্য।
জায়িনও জাহানের সুর ধরে এবার নিজেই ধমক দিয়ে বলে–
—হ্যাঁ, কোথায় গিয়েছিলি তুই? বেশি পা বড় হয়ে গিয়েছে না তোর? আশিয়ান ভাইকে বলে তোর পা ভাঙাচ্ছি আমি দাঁড়া।
হায়া জায়িনের কথায় পৃষ্ঠায় তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে–
—দেখো তোমার আশিয়ান ভাইকেই না আবার চৌদ্ড শিকের পেছনে দেখতে পাও।
হায়ার কথা শুনে জাহান-জায়িনের আক্কেলগুড়ুম অবস্থা। জায়িন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে–
—মানে? কি বলতে চাইছিস তুই?
হায়া গুরুগম্ভীর গলায় বলে–
—সবাইকে ডাকো, সবার সামনে বলছি আমি কোথায় ছিলাম আর কেনো ছিলাম।
জায়িন আরো প্রশ্ন করতে চায় কিন্তু জাহান তাকে থামিয়ে দেয়। জায়িন যায় সকলকে ডাকতে। একে একে সকলকে ডাকা শেষ করার পর সবার লাস্টে জায়িন আসে হায়ার রুমে। যেখানে বর্তমানে অবস্থান লরছে আশিয়ান ও স্পর্শ। আশিয়ানকে পাহারা দেওয়ার জন্যই মূলত স্পর্শ তার পাশে বসে আছে, যাতে আশিয়ান অসুস্থ শরীর নিয়ে আবার বের না হতে পারে।
জায়িন হাঁপাতে হাঁপাতে বলে–
—আশিয়ান ভাই, নিচে চলো। হায়া ফিরে এসেছে।
আশিয়ানকে আর থামায় কে। সে ঝড়ের গতিতে নিচে নামতে শুরু করে। স্পর্শ আর জায়িন তার হওয়ার মতো ছুট দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে যায় তারপর তারাও নিচে চলে যায়। নিচে এসে দেখতে পায় আশিয়ান সকলের সামনেই হায়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে কিন্তু হায়া নির্বাক চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে। আশিয়ানকে জড়িয়ে ধরে নি সে।
আশিয়ান হায়ার হাত,গাল ছুয়ে দিতে দিতে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করে –
—এই বউ, কই গিয়েছিলে তুমি? জানো তোমার জন্য আমার কত টেনশন হচ্ছিল। এমনটা করে কেউ? জানো না তোমাকে একমুহূর্ত না দেখলে আমি কেমন অস্থির হয়ে যাই? তাও কেন এমনটা করো আমার সাথে তুমি বারংবার?
আশিয়ানের শেষের কথাটা ভীষণ করুণ শোনায়। হায়া এক দৃষ্টিতে আশিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। আশিয়ান বা অন্য কারো একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিচ্ছে না।
বাকিরা আশিয়ানের এমন জড়িয়ে ধরা বা পাগলামো করায় কিছু মনে করছে না। কারণ সকলেই জানে আশিয়ান তার বউয়ের জন্য কতটা পাগল। জাভিয়ান পেছন থেকে সামনে এসে হায়াদের সামনে এসে দাঁড়ায়। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে–
—কোথায় গিয়েছিলে তুমি কাউকে না জানিয়ে?
হঠাৎই পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ফারাবি সামনে এসে বলে–
—হায়াকে আমি আমার সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম আঙ্কেল কিছু সত্য জানানোর জন্য।
ফারাবিকে তো আশিয়ান এমনিতেই দেখতে পারত না, তারউপর এমন কথা শুনে আশিয়ানের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়। সে হায়াকে ছেড়ে দিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ফারাবির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। “ইউ বাস্টার্ড” বলে ফারাবিকে এক ঘুষি দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। তার শার্টের কলার ধরে নিচ থেকে টেনে তুলে পুনরায় ঘুষি মারতে যাবে তখনই হায়া এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফারাবির থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আর চেঁচিয়ে বলতে থাকে–
—অসভ্য লোক দূরে থাকুন ফারাবির থেকে। আর কত উনার ক্ষতি করবেন? এবার তো একটু রহম করুন লোকটার উপর।
ঘটনাগুলো এত তাড়াতাড়ি ঘটে যায় যে সবটা বাকিদের মাথার উপর দিয়ে যায়। আশিয়ানসহ বাকিরা হতভম্ব হয়ে যায় হায়ার এমন কথায়। আশিয়ান নিজেকে সামলে হায়ার কাছে এসে তার দু’গালে হাত রেখে বলে–
—এই বউ, কি বলছো তুমি এসব? কি ক্ষতি করেছি আমি ফারাবির?
হায়া আশিয়ানের হাত দু’টো নিজের গাল থেকে ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে বলে–
—আবার নির্লজ্জের মতো জিজ্ঞেস করছেন, কি ক্ষতি করেছে আপনি তার? কেন মনে নেই, আমাদের বিয়ে আপনি সেই ব্যক্তি যে কিনা, ফারাবির বোনকে কিডন্যাপ করেছিলেন? নাকি ভুলে গিয়েছেন সময়ের সাথে সাথে সবটা?
হায়ার কথা শুনে আশিয়ান ও তাদের পরিবারের সবাই আরো একবার হতভম্ব হয়ে যায়। আশিয়ান এটা ভেবে হতভম্ব হয়ে যায় যে, হায়া এসব জানতে পারল কিভাবে? আর বাকিরা হতভম্ব হয় এটা জেনে যে, আশিয়ান ফারাবির বোনকে কিডন্যাপ করিয়েছে।
আশিয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে–
—তুমি জানলে কি করে এসব? কে বলেছে তোমায় এগুলো?
—আমি বলেছি।
ফারাবি আশিয়ানের প্রশ্নের জবাব দেয়। জায়িন তার কথা শুনে বলে উঠে–
—তোমার কাছে কি প্রমাণ আছে যে, তোমার বোনকে আশিয়ান ভাইয়াই কিডন্যাপ করিয়েছিল বিয়ের দিন? তুমি যে আশিয়ান ভাই আর বনুর সম্পর্কে চিড় ধরাতে এসব করছ না এটার কি প্রমাণ?
ফারাবি একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলে–
—আমি জানতাম এমন প্রশ্ন উঠবে। তাই সব ব্যবস্থা নিয়েই এসেছি। একটু ওয়েট করো, সবটা প্রমাণ করে দিচ্ছি।
কথাটা বলে ফারাবি পকেট থেকে ফোন বের করে কাকে যেনো কল করে ভেতরে আসতে বলে আবার কলটা কেটে দেয়। কল কাটার দুই মিনিট পর দু’টো কালো মতো লোক আসে। একটা লোককে উদ্দেশ্য করে ফারাবি বলে–
—যা জানো সবটা বলো।
ফারাবির নির্দেশ মোতাবেক লোকটি বলতে থাকে–
—৫মাস আগে উনি (আশিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে) আর উনার এক ডাক্তার বন্ধু, তার নাম মনে হয় আফিফ। উনারা দুইজন আমাগো ডেড়ায় আসে একটা মাইয়ারে অপহরণ করানো লেগা। ডা.আফিফ আমারে চিনে কারণ আমার বাপ বহুদিন তার কাছে চিকিৎসা নিছিল তাই। তারা দু’জন আমারে উনার (ফারাবি) বোনের ছবি দেখাইয়া বলে মাইয়া ডারে দুইদিনের জন্য নাকি অপহরণ কইরা রাখতে হইবো। আমি এইসব কাজ অনেক আগেই ছাইড়া দিছিলাম, খালি ডা. সাহেবের কারণে আমার বাপে সুস্থ হইয়া উঠছিলো বইলা কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আমি কাজটা করি।
সকলে লোকটার কথা শুনে আরো একবার হতভম্ব হয়ে যায়। তাদের সকলকে না চাইতেও বিশ্বাস করতে হয় কারণ, লোকটা যদি মিথ্যে বলত তাহলে আফিফ সম্পর্কে তার ধারণা থাকার কথা না। লোকটা ফরফর করে আশিয়ান আর আফিফের বন্ধুত্বের কথাটা বলে দিয়েছে। এটাও বলে দিয়েছে যে, আফিফ একজন ডাক্তার। ফারাবি আফিফ সম্পর্কে জানে না। কারণ টা সিম্পল। বন্ধু টা হলো আশিয়ানের, তাই যেখানে আশিয়ান সম্পর্কেই তার ধারণা খুবই নগন্য, সেখানে আফিফের কথা জানা তো বহু দূরের কথা।
________________________
—আই ওয়ান্ট ডিভোর্স। আমি কোন ক্রিমিনালের সাথে সংসার করতে চাই না।
হায়ার এই একটা কথায় আশিয়ানের পুরো সত্ত্বা নাড়িয়ে দেয়। হায়া কথাটা বলে কাঁদতে কাঁদতে সিড়ি বেয়ে উপরে চলে যায় নিজের রুমে। আশিয়ান কেবল অশ্রু সিক্ত চোখে তার প্রস্থান দেখে।
শব্দসংখ্যা~১২০০
চলবে?
[বিশাল এক পর্ব ছিলো। কপি করতে গিয়ে ভুল বসত ডিলেট হয়ে গিয়েছে। ক্লিপ বোর্ডেও ছিলো না। বিয়ে বাড়ি থেকে এসে দুই ঘণ্টা লাগিয়ে আবার লিখলাম এতটুকু। চাইলেই না দিতে পারতাম, কিন্তু কাল আপনাদের কথা দিয়েছিলাম আজ দিবো তাই এত রাত হওয়া সত্ত্বেও আবার লিখলাম।
রিচেক দেওয়া হয়নি। ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়েন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

