#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৪৬
রাতটা কোন মতে সবাই পাড় করে। সকালের আলো ফুটতেই পুনরায় বাড়ি সাজানোর কাজ শুরু হয়ে যায় আগের দমে। হায়াই সবটা তদারকি করছে শুধু আগের মতো তার মুখে হাসিটা আর নেই। ভাবীদের পার্লারে পাঠানো থেকে শুরু করে ভাইদের বাসরঘর তৈরি করা সবটাই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে করছে।
ভাইদের বিয়ে নিয়ে তার এক্সাইটমেন্ট অনেক আগে থেকেই। দুই ভাইয়ের একমাত্র কলিজার টুকরা সে। হায়া অনেক আগে থেকেই বলে আসছিল ভাইদের বিয়েতে সব কিছু সে নিজে দাড়িয়ে থেকে করবে। আজ যখন সে সময়টা আসল তখন সে যদি নিজের পারসোনাল প্রবলেমগুলোর কারণে ঘরবন্দী হয়ে থাকে, তাহলে তার ভাইরা যে এক বাক্যে সব অনুষ্ঠান ক্যান্সেল করে দিবে সেটা হায়া বেশ ভালো করেই জানে। তাই তো নিজের বুকে অসীম কষ্ট লুকিয়ে রেখে সবকিছুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।
কাল রাতের পর আশিয়ানকে আর দেখেনি হায়া। হায়া অবচেতন মন বারংবার তার প্রিয় পুরুষটিকে দেখতে চাইলেও হায়া অবাধ্য মনকে কঠোরভাবে শাসিয়ে দমিয়ে রাখছে। বাড়ির সকলেই তার হাতে হাতে সাহায্য করছে কিন্তু ঐ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে নিলেই হায়া এড়িয়ে যাচ্ছে। হানিয়া মেয়ের অযাচিত সিদ্ধান্তে রাগারাগি করে নিজের প্রেশার বাড়িয়ে বর্তমানে স্বামীর তত্তাবধানে রেস্ট নিচ্ছে বেডরুমে।
___________________________
অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ গরমটা একটু বেশিই পরেছে। সূর্য মামা তার সমস্ত তেজ যেন আজ সরাসরি পৃথিবীর বুকে ঢেলে দিয়েছে। বাতাসে নেই এক চিলতে শান্তি, ঘামে ভিজে যাচ্ছে শরীর, ক্লান্ত করে তুলছে ক্ষণে ক্ষণে।
বাগানে জাহান-জায়িনদের জন্য স্টেজ সাজানো হচ্ছে, সেখানেই দাড়িয়ে সবকিছুর তদারকি করছে।প্রচন্ড তেষ্টায় হায়ার বুক শুঁকিয়ে কাঠকাঠ হয়ে গিয়েছে। তার উপর অতিরিক্ত গরম পরায় মাথা ঘুরচ্ছে হায়ার। কাল রাতে খায়নি সে, আজ সকালে কি থেকে কি খেলো তার নিজেরই মনে নেই। শরীর দূর্বল লাগছে। স্টেজ সাজানোর লোকগুলো ভালো করে সবটা বুঝিয়ে দিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে যায় তার। মাথা ঘুরে পরে যেতে নিলে একটা পুরুষালি হাত এসে তাঁকে ধরে ফেলে।
হায়া কোন মতো নিজেকে সামলে পুরুষ টির দিকে তাকালে দেখতে পায় ব্যক্তিটি আর কেউ না তার শ্বশুর মশাই, তার দ্বিতীয় বাবা। আবরার চিন্তিত গলায় বলে–
—কি হয়েছে মামুনি? বেশি খারাপ লাগছে? চলো বাসায় চলো তো। এত গরমে তোমায় কে বলেছে এখানে দাড়িয়ে থাকতে?
হায়া তার কথার উত্তরে শুধু এইটুকুই বলে–
—আমি ঠিক আছি বাবাই।
—তা তো দেখতেই পারছি। চলো বাসার ভেতরে চলো রেস্ট নিবে কিছুক্ষণ।
হায়া বিনা বাক্য ব্যয়ে আবরারের সাথে বাসার ভেতরে এসে পড়ে। আবরার তাকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে কিচেনের দিকে চলে যায়, যেখানে আপতত তার সহধর্মিণী আছেন।
আবরার কিচেনে যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পরেই স্পর্শ এক গ্লাস শরবত আর আবরার এক প্লেট খাবার নিয়ে হায়ার কাছে ফিরে আসে। স্পর্শ হায়ার কাছে এসেই তার পাশে বসে অস্থিরভাবে হায়ার শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করতে থাকে–
—তোর কি বেশি খারাপ লাগছে রে মা? তোরে এত করে বললাম এই কড়া রোদের মধ্যে বাহিরে এতক্ষণ থাকিস না তুই শুনলি না। নে এই শরবতটা একটু খা ভালো লাগবে।
স্পর্শ হায়ার জন্য লেবুর শরবত বানিয়ে এনেছে। অতিরিক্ত গরমে ও খাওয়ায় অনিয়ম হওয়ার জন্য হায়ার প্রেশার ফল করেছে। হায়া অর্ধেকটা শরবত খেয়ে রেখে দেয়। স্পর্শ আবরারের হাত থেকে খাবারের প্লেট টা হাতে নিয়ে হায়ার সামনে এক লোকমা খাবার ধরে। হায়া তাঁকে বলে–
—মাম্মাম একটু আগে না ব্রেকফাস্ট করলাম, এখন আবার খাবার কেনো? আমার পেটে একটুও জায়গা নেই গো।
স্পর্শ চোখ গরম করে বলে–
—ঠাটিয়ে লাগাব এক থাপ্পড় তারপর ঠিকই জায়গা হয়ে যাবে। ঐটাকে খাওয়া বলে? দুই লোকমা ঠিক করে খেয়েছিস নাকি বলা মুশকিল। চুপচাপ খাবার খেয়ে রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে শাওয়ারে যাবি। আমার কথার এদিকে ওদিক হলে কিন্তু তুই আমার জল্লাদ শ্বাশুড়ির রূপ দেখবি বলে দিলাম।
স্পর্শ কথায় হায়া ভয় তো মোটেই পায় না বরং আরো মজা পায়। সে একটু নাটক করে ভীতু গলায় আবরারকে বলে–
—বাবাই, তোমার বউয়ের মধ্যে আজ জল্লাদ শ্বাশুড়ির ভুত চেপেছে। আমায় বাঁচাও বাবাই, নাহলে এই নারী আজ আমায় খাবারের নিচে চেপে মেরে ফেলবে। আমার ভীষণ ভয় করছে তাঁকে দেখে।
কথাটা শেষ হওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড সব শান্ত থাকে হুট করেই হায়া আর আবরার হাহা করে উচ্চস্বরে হেঁসে দেয়। তাদের হাসির মানে স্পর্শ প্রথমে বুঝতে না পারলেও খানিক পরেই বুঝতে পারে যে, হায়া আর আবরার তার খিল্লি উড়াচ্ছে। স্পর্শ রেগেমেগে হায়াকে কিছু বলতে নিলে হায়া তাকে হঠাৎই জড়িয়ে ধরে তার এক গালে জোরেসোরে একটা পাপ্পি দেয়। তারপর আদুরে গলায় বলে–
—এই শাশুমা, খবরদার আমার মাম্মাম থেকে শাশুড়ি হতে চেয়েছ তো। তোমার নামে কেস ঠুকে দিবো আমি। তুমি আমার মাম্মাম, মাম্মামই থাকবে সারাজীবন।
—তা তো থাকবই, কিন্তু আমার কথা না শুনলে আমি জল্লাদ শ্বাশুড়ির হয়ে যাবো বলে দিলাম। আর এখন ছাড় আমায়, খাবারটা মুখে নে।
হায়া স্পর্শকে ছেড়ে সোফায় পা উঠিয়ে বাবু হয়ে বসে। স্পর্শ তাকে খাবার খাইয়ে দিতে থাকে আর টুকটাক গল্প করতে থাকে। আবরারও তাদের সঙ্গ দেয়।খাবার শেষ করে হায়া উপরে যেতে নিলে আবরার তাকে কিছুক্ষণের জন্য বসতে বলে। হায়া বসে পড়লে আবরার আগের জায়গা ছেড়ে হায়ার পাশে এসে বসে।
হায়ার একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে ধরা গলায় বলে–
—আই এম সরি মামনি।
আবরারের সরি বলায় হায়ার কপালে কয়েকটা ভাজ পড়ে। সে ভ্রু জোড়া কুঁচকে বলে–
—কিসের জন্য সরি বলছো বাবাই?
—কালকের থাপ্পড়ের জন্য মা। আমার তোমায় মারার কোন ইনটেনশন ছিলো না। তাও….
আবরারের পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই হায়া মুখ চোখ আরো কুঁচকে নিয়ে বলে–
—উফফফফো বাবাই! তুমি এর জন্য এখনও গিল্টি ফিল করছো? আরে বাবা, আমি জানি তো তুমি ইচ্ছে করে মারো নি। আমিই তো যেচে তোমার আর উনার মাঝে চলে এসেছিলাম। আর ধরলাম ইচ্ছে করেই মেরেছ, তাতে কি হয়েছে? বাবারা কি সন্তানদের শাসন করে না? এতে সরি বলার কি আছে? তুমিও বাচ্চাদের মতো কথা বলো বাবাই।
হায়ার কথা শুনে আবরারের মন থেকে অপরাধবোধ টা সরে যায়। আবরার তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে–
—তুমি তো মা ভালোই বুঝদার। তাহলে একটা কথা বলি। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করো।
আবরারের কথা শুনে হায়ার মুখের হাসিটা সরে যায়। সে কিছুটা বুঝতে পারছে আবরার কি নিয়ে কথা বলতে চাইছে। সে ঐ বিষয়ে কিছু শুনতে চাইছে না কিন্তু শ্বশুর + ফুপার কথা না শুনে উঠে যাওয়া বেয়াদবির মধ্যে পড়ে তার হায়া মুখটা গম্ভীর করে বসে থাকে আবরারের কথা শোনার জন্য।
আবরার তাকে বলে–
—আমি জানি আশিয়ান যা করেছে সেটা একদমই ঠিক হয়নি এবং সেটা অন্যায়ের মধ্যে পড়ে। কিন্তু মা রে, মানুষ মাত্রই ভুল। কোন মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয়। আশিয়ান একটা ভুল করে ফেলেছে তুমি তাকে শাস্তি দাও, যেমনটা আমি কাল দিয়েছি। কিন্তু ডিভোর্সের চিন্তা মাথায় এনো না মা। তুমি নিজেও জানো আশিয়ান তোমাকে কতটা ভালোবেসে ফেলেছে। এখন তুমি যদি পূর্বের একটা ভুলের রেশ ধরে তোমাদের এই সুন্দর সম্পর্কটাকে মৃত্যুদান করো তাহলে সেটার জেরে আরো কতগুলো সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে তুমি বুঝতেও পারছ না। তোমার মাকেই দেখো না, তোমার এমন সিদ্ধান্তের কথা শুনে প্রেশার বাড়িয়ে ফেলেছে। তোমার বাবাও চিন্তিত। আমরা দু’জন যে চিন্তা মুক্ত তাও কিন্তু না। তোমাদের দু’জনকে কেন্দ্র করে আমরা সবাই চিন্তিত, অস্থিরতা ভুগছি। ছেলে-মেয়ে যখন সুখী থাকে, তাদের সুখ দেখে বাবা-মায়েরাও সুখ অনুভব করে। আমার ছেলেটা কাল ঐ রাতে বের হয়ে কোথায় গিয়েছে সেটা আমি একটু আগে খবর পেয়েছি। কাল সে বাড়িতে থেকে বের হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আমি আফিফকে পাঠায় তার পেছনে। আফিফ তার বেস্টফ্রেন্ড হওয়ার কারণে সে জানে আশিয়ানের মন খারাপ হলে কোথায় যেতে পারে। কাল সারারাত দুটোতে একসাথেই ছিল। আফিফ আমায় বলেছে, আশিয়ান নাকি কাল সারারাত পাগলামি করেছে তোমার এমন সিদ্ধান্ত শুনে। একটা বার ভাবো, তুমি তাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেছ শুধু তাতেই এত পাগলামি। যদি কথাটা সত্যিই ফলে যায় তাহলে আমার ছেলেটার কি হবে? একবার ভাবো শুধু।
আবরার কিছুটা সময়ের জন্য থামে। তার চোখ জোড়া অশ্রুতে টইটম্বুর হয়ে গিয়েছে। সেই সাথে স্পর্শ আর হায়ারও। খানিক বাদে আবার আবার বলতে শুরু করে–
—একটা কথা বলো তো, তুমি কি পারবে আশিয়ানকে ছাড়া ভালো থাকতে?
হায়া আবরারের প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর তার ফোঁপানোর আওয়াজ পাওয়া যায়। আবরার তার ফোঁপানোর আওয়াজ শুনে নিঃশব্দে হেঁসে দেয়। তারপর বলে–
—তুমি নিজেও যে ভালো থাকবে না সে তুমিও জানো। শুধু শুধু তাহলে বিচ্ছেদের মতো কঠিম শাস্তি নিজেদের উপর নিচ্ছো কেনো? বিচ্ছেদ কি এতই সহজ? বিচ্ছেদ পরবর্তী জীবন কতটা ভয়াবহ তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তাই বাবা হিসেবে একটা পরামর্শ দিচ্ছি, রাগ করো, অভিমান করো। শাস্তির নামে নাকানিচুবানি খাওয়াও কোন সমস্যা নেই। সবটাতে আমাকে অন্তত তোমার পাশে পাবে কিন্তু ডিভোর্সের মতো ভাবনা ভুলেও মস্তিস্কে এনো না। বুঝেছ আমার কথা?
হায়া মাথা নাড়িয়ে আবরারের কথায় সম্মতি জানায়। সে সত্যিই বুঝতে পেরেছে, বিচ্ছেদ কোন সমাধান না। আসলে কাল ফারাবি তার কাছে আশিয়ানের নামে অনেক নেগেটিভ কথা বলেছিল। সবচেয়ে বড় কথাটা ছিল, আশিয়ান নাকি হায়া’র সুখে থাকা দেখতে পারে না। আশিয়ান বিদেশে যাওয়ার পরে হায়ার ভেঙে পরা দেখে নাকি খুশি হতো। যখন আশিয়ান দেখল, হায়া তাকে ভুলে ফারাবির সাথে নতুন করে সবটা শুরু করতে চাইছিল তখনই আশিয়ান বাংলাদেশে ফিরে আসে হায়ার সুখে হস্তক্ষেপ করার জন্য। হায়াকে পুনরায় সমাজের সামনে লাঞ্চিত, অপমানিত করার জন্য আশিয়ান ফারাবির সাথে হায়ার বিয়েটা হতে দেয়নি।
এমনই আরে ভুজুংভাজুং কথা বলে হায়াকে আশিয়ানের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়। ফারাবি যেহেতু ডাক্তার তাই সে মানুষের সাইকোলজি খুব সহজেই ধরে ফেলতে পারত। হায়ার সাইকোলজি ধরা তার দুই মিনিটের ব্যাপার ছিল। এছাড়া সে আগের থেকেই হায়া আর আশিয়ানের বিষয়টা সব জানত বলে হায়াকে প্রভোক করতে বেশি সময় লাগে না।
শব্দসংখ্যা~১৪১৪
চলবে?
[আজকে কিন্তু ছোট বলে নালিশ করতে পারবেন না😒🥹 বড় করে দিয়েছি। আপনারা যদি বেশি বেশি রেসপন্স করে তাহলে কালও গল্পও আসবে। আগামী পর্বের বেশ খানিকটা কিন্তু লেখা হয়ে গিয়েছে😁 পরবর্তী পর্বে বোল্ড কিছু আসতে চলেছে।🥱🙊 তাই বেশি বেশি রেসপন্স করে পরবর্তী পর্বটা কাল নিজেদের নামে লিখিয়ে নিন।🤭🤗
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 😘🤍]

