#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৫০
জায়িন রুমে ঢুকে একটু থতমত খেয়ে যায়। কারণ রুমটা আঁধারে ঢেকে রয়েছে। জানালার থাইগ্লাসগুলো লাগিয়ে তাতে পর্দা মেলে দেওয়ায় বাহির থেকে কোন আলো রুমে প্রবেশ করছে না, যার কারণে রুমটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আছে।
সে একটা হতাশা মিশ্রীত শ্বাস ফেলে পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে রুমের লাইটের সুইচের কাছে যায়। সেকেন্ডের ব্যবধানে রুমটা আলোয় পরিপূর্ণ করে তুলে সে। লাইট জ্বালিয়ে পেছনে ফিরে জায়িন বড়সড় একটা ঝটকা খায়। সে দেখতে পায় তার আদর-যত্নে বড় করে তোলা বউ তারই বাসর পন্ড করে দিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমাচ্ছে। পার্টিতে পড়া শাড়ি খানা খুলে হ্যালো কিটির লেডিস টি-শার্ট ও ট্রাউজার পরেছে।
বেচারা জায়িন বড্ড আহত হয়। কোথায় সে ভেবেছিল তার বউটা ফুলে সজ্জিত বিছানায় একহাত লম্বা ঘোমটা টেনে বসে বসে তার অপেক্ষা করবে, জায়িন রুমে এসে তার পাশে বসে আস্তে করে ঘোমটা তুলে তার চাঁদ মুখখানা দেখবে। কিছু প্রেমময় উক্তি দ্বারা প্রেয়সী কপোলে লজ্জার লালিমা রাঙিয়ে দিবে। বউয়ের সেই মোহনীয় রূপ দেখে জায়িন আবারও পাগল হয়ে পুনরায় তাকে নিজের ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নিবে।কিন্তু কোথায় কি, বউ তো তার মাথায় বারি মারার নামান্তর কাজ করে বসে আছে।
এমন না তারা আজই প্রথম কাছে আসবে। কিন্তু ভাই বাসরটা তো তারও আজ প্রথম হবে। তাদের বিয়ের দিন বড় ভাইয়ের সেই করুণ অবস্থা দেখে জায়িন বা আদিবা কারোই মনের অবস্থা ভালো ছিল না। যার কারণে বাসর রাতে কিছুই হয়নি। ফ্রেশ হয়ে দুইজনই ঘুমিয়ে পরেছিল। কিন্তু তাই বলে আজও এমনটা হবে?
হঠাৎই জায়িনের মাথায় ক্রোধ চেপে বসে। না, সে কিছুতেই এটা সহ্য করবে না। সে পুরো বেশি পাওয়ারের লাইট নিভিয়ে দিয়ে ডিম লাইট জ্বালিয়ে বেডে উঠে পড়ে। আদিবার পাশে আধশোয়া হয়ে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–
—আদিবা, এই বউ উঠ। উঠ বলছি। এমনিতে তো কত রাত হয়ে যায় ঘুমাস না, কিন্তু আজ বারোটা বাজতে না বাজতেই ঘুমিয়ে পরলি যে? উঠ না রে বাবা, আজ না আমাদের বাসর। আমরা বাসর করব না।
কানের পাশে জায়িনের অনবরত বকবকানিতে আদিবা একটু নড়েচড়ে উঠে। তারপর পিটপিট করে চোখ মেলে জায়িনকে দেখতে পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে আবারও ঘুমিয়ে পরে। তাকে চাইতে দেখে জায়িন খুশি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার খুশি নিমিষেই কর্পূরের ন্যায় উড়ে যায়।
আদিবা জায়িনের বুকে মুখ ডুবিয়ে ঘুমুঘুমু গলায় বলে–
—আজ সকাল থেকে দৌড়ের উপর আছি। সন্ধ্যার পর থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত ভারী শাড়ি আর চার ইঞ্চি মোটা মেকআপের আড়ালে নিজেকে মুড়িয়ে পুতুলের মতো বসে ছিলাম। তারপরও জিজ্ঞেস করছো, কেন ঘুমিয়ে গেলাম এত তাড়াতাড়ি? কি নিষ্ঠুর তুমি জায়িন।
আদিবার কথাগুলো শুনে জায়িনের মায়া হয়। সে শুধু নিজের কথাই ভাবছিল, অথচ তার ভালোবাসার মানুষটির কথা একটুও ভাবল না। এই পর্যায়ে এসে জায়িনের নিজের প্রতি রাগ হয়। সে আর আদিবাকে বিরক্ত করে না বরং সে নিজেও গায়ের ব্লেজারটা খুলে বউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।
__________________________
জায়িনের ঘুম ভাঙে হালকা কাঁপুনি-মেশানো এক ডাকের শব্দে। গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক তিনটায়। চোখ মেলতেই তার নিঃশ্বাস আটকে আসে মুহূর্তে।
আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে আছে আদিবা যেন রূপকথার কোনো পরী বাস্তবে তার ঘরে এসে হাজির হয়েছে। মাথাভর্তি খোঁপা করা চুলে গুঁজে রাখা এক টুকরো জুঁইফুল, চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা গোলাপি ছোঁয়া, আর গায়ে হালকা রঙের শাড়ি যা তার কোমল গড়নটাকে আরও নরম, আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
জায়িন ধপ করে উঠে বসে, চোখ কচলে নিশ্চিত হয় সে জেগেই আছে।
—কিরে… মাঝরাতে এমন সাজগোজ? মাথায় আবার কোন পেত্নী চাপল নাকি?
আদিবা হেসে ওঠে। এক হাত কোমড়ে রেখে ভ্রু নাচিয়ে বলে–
—পেত্নী কেন? আজ তো আমাদের বাসর রাত না, তাই ভাবলাম আমার স্বামীর পছন্দের মতো হয়ে উঠি। বলো তো, কেমন লাগছে আমাকে?
জায়িন আর উত্তর দিতে পারে না। শুধু অপলক তাকিয়ে থাকে তার দিকে। আদিবা এবার ধীরে ধীরে তার হাত দুটো দুই পাশে ছড়িয়ে দেয়, যেন নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়েছে তার কাছে। তার মেদহীন কোমর আর কোমল পেটের বাঁক চোখে পড়ে জায়িনের। গলার স্বর শুকিয়ে আসে তার, ঠোঁটের কোণায় খেলতে থাকে নিঃশব্দ হেসে যাওয়া।
আদিবা এবার ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে এসে জায়িনের বুকে আঙুল বুলিয়ে বলে–
—আজ আমি শুধু তোমার, জায়িন। তোমার ভালোবাসা আমাকে ছুঁয়ে যাক এমনভাবে, যেন স্নিগ্ধময় ভোরও হিংসে করে তোমার আমার ভালোবাসা দেখে।
জায়িন এবার আদিবাকে নিজের কোলে টেনে নেয়। আদিবাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে নিয়ে মৃদু গলায়
বলে—
—আমি শুধু আজকের জন্য তোর না, তোর আগামী সব দিনের জন্য আমি তোর। তালুলদাররা ভালোবেসে হাত ধরলে সেই হাত মরার আগ পর্যন্ত ছাড়ে না, বুঝতে পারলি আমার ইনা, মিনা, টিনার আম্মু?
আদিবা জায়িনের সম্বোধন শুনে একটু হেসে উঠে, তারপর লজ্জা আর ভালোবাসায় মুখ গুঁজে দেয় জায়িনের বুকে। কিন্তু জায়িন বাঁকা এক চাহনি দিয়ে তাকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলে–
—তবে শোনো, আজ সারারাত আমি তোমায় ভালোবাসার সেই শাসনে বেঁধে রাখব, যেটা থেকে পালানো তো দূরের কথা, ভুলে যাওয়াও অসম্ভব। প্রস্তুত তো আমার রাজরানী?
আদিবার ঠোঁটে কাঁপতে থাকা একটুকরো হাসি আর চোখে জমে ওঠা আলোয় শুধু ভালোবাসারই প্রতিচ্ছবি ছিল।
আর বাকিটা রাত… ছিল ভালোবাসার অমলিন কবিতা।
_______________________
রাত দু’টোয় রাহাতের পানি তৃষ্ণায় ঘুম ভেঙে যায়। শোয়া থেকে উঠে বসে বেডসাইড টেবিলে রাখা জগ থেকে এক গ্লাস পানি খেয়ে নেয়। তারপর আবারও শুয়ে পড়ে। বাম কাত হয়ে শুতেই তার নজরে পড়ে মুনতাহার ফাঁকা জায়গাটা। দীর্ঘ ২৫টা বছর একই বিছানায় শুয়ে এসে এখন একা একা শুতে ভালো লাগে না তার আর। মাঝরাতে যখনই তার ঘুম ভাঙে তখনই এই জায়গাটায় তাকিয়ে তার ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
হঠাৎই তার মন ইচ্ছা পোষন করে স্ত্রীকে একপলক দেখার। তীব্র ভাবে ইচ্ছাটা বুকেই ধামাচাপা দিতে চায় কিন্তু অবাধ্য মন তা মানে না। অবাধ্য মনের প্রবঞ্চনায় রাহাত হাঁটা দেয় গেস্টরুমের উদ্দেশ্য, যেখানে বর্তমানে তার অর্ধাঙ্গিনীর বাস।
রাহাত গেস্টরুমের কাছে গিয়ে দেখে রুমটার দরজা হালকা করে ভিড়ানো। রাহাত রুমে উঁকি দিলে ডিম লাইটের আবছা আলোয় দেখতে পায় মুনতাহা গুটিশুটি হয়ে বিছানায় শুয়ে শুধু ছটফট করছে আর গোঙাচ্ছে। রাহাত তাকে এমন ছটফট করতে দেখে দ্রুত পায়ে রুমের ভেতরে প্রবেশ করে তার পাশে গিয়ে বসে পড়ে। মুনতাহার এক গালে হাত রেখে ক্ষীণ গলায় তাকে ডাকতে থাকে–
—মুন! এই মুন! কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ লাগছে?
রাহাত তার গালে হাত রেখে চমকে যায়। প্রচন্ড গরম হয়ে রয়েছে তার গাল। সে একে একে মুনতাহার গাল, কপাল, গলা চেক করে বুঝতে পারে মুনতাহার জ্বর এসেছে। আর এই সেই জ্বর না গা কাঁপানো সেই জ্বর। রাহাত মুনতাহাকে আরো কয়েকবার ডাকে কিন্তু মুনতাহা বেগম কোন সাড়াশব্দ করে না। অতিরিক্ত জ্বরের প্রকোপে মুনতাহা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
রাহাত মুনতাহার থেকে সরে এসে দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে একটা বালতিতে করে পানি নিয়ে এসে মুনতাহাকে বেডের কিনারে শুইয়ে দিয়ে মাথায় পানি ঢালতে থাকে। মুনতাহার হুঁশ না থাকার কারণে তাকে কিছু খাওয়াতেও পারছে না। আধা ঘণ্টার মতো মাথায় পানি ঢালার পর মুনতাহার গায়ের তাপ মাত্রা একটু কমে। তার ছটফটানি বন্ধ হয়। রাহাত বালতিটা ওয়াশরুমে রেখে এসে একটা টাওয়াল ভিজিয়ে এনে তার হাত-মুখ ভালো করে মুছে দেয়। রাহাত কাজটা শেষ করে ভাবে এবার মুনতাহাকে কিছু খাওয়ানো উচিত। কিন্তু মুনতাহাকে একা রেখে যেতে তার মনটাও সায় দিচ্ছে না।
আকস্মিকভাবে সেখানে এসে উপস্থিত হয় তাদের ছেলে রায়হান। কাল তার এক্সাম থাকার কারণে আজ রাত জেগে পড়ছিল। প্রতিরাতেই সে মায়ের কাছে এসে কিছুক্ষণ বসে থাকে নিঃশব্দে। মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মনটাকে শান্ত করে তারপর ঘুমাতে যায়। রাহা আর রায়হান দুই ভাই-বোন দুই মেরুর মানুষ। রাহা যেমন বাবা পাগলি, রায়হান তেমন মা পাগল ছেলে।
অন্যান্য দিনের মতো আজও মা’কে দেখতে এসেছিল রায়হান। কিন্তু রুমের কাছে এসে মুনতাহার রুমের লাইট জ্বালানো দেখে সে একটু অবাকই হয়। তারপর দরজার কাছে নিঃশব্দে দাড়িয়ে দাড়িয়ে তার বাবার কাজগুলো দেখে। রায়হান খেয়াল করে পুরোটা সময় রাহাতের চোখ-মুখে দুঃশ্চিতায় ছেয়ে ছিল। তার মনটা হঠাৎই ভালো হয়ে যায়। বাবার জন্য তার মনে জমে থাকা ক্ষোভ গুলো কিছুটা কমে যায়।
হুট করেই রাহাতের নজর যায় দরজার দিকে। এত রাতে ছেলেকে জেগে থাকতে দেখে রাহাত কিছুটা অবাকই হয়। রাহাত তাকে বলে–
—রায়হান, এত রাতে না ঘুমিয়ে এখানে কি করছো আব্বু?
রায়হান তার ডাক শুনে ভেতরে প্রবেশ করে। শান্ত গলায় বলে–
—কাল পরীক্ষা তো তাই পড়ছিলাম পাপা। আম্মুকে দেখতে এসেছিলাম, এসে দেখি তুমিও এখানে আছো। আম্মুর কি হয়েছে পাপা?
—আর বলো না বাবা, তোমার আম্মুর সেই কি জ্বর। আমি না আসলে সারা রাত বোধহয় জ্বরে এভাবেই পড়ে থাকত।
—ওহহ।
মায়ের দিকে তাকিয়ে মলিন গলায় বলে রায়হান। রাহাত তাকে বলে–
—তুমি এখানে দশ মিনিটের জন্য বসতে পারবে? আমি তোমার মায়ের জন্য কিছু বানিয়ে নিয়ে আসতাম ততক্ষণে। আসলে তাকে একা ছেড়ে যেতে সিকিউর ফিল করছিলাম না।
—সেটা আবার বলতে হয়। আমি এমনিতেও থাকতাম। আম্মুর অসুস্থতা দেখে আমার আর ঘুমই আসবে না। তুমি যাও পাপা, আমি আম্মুর কাছে আছি।
রাহাত নিশ্চিন্ত মনে চলে যায় মুনতাহার জন্য স্যুপ বানাতে। পনেরো মিনিটের মাথায় এক বাটি গরম গরম স্যুপ নিয়ে হাজির হয় রাহাত। রাহাত বাটিটা টেবিলে রেখে ছেলেকে বলে–
—তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে পরো আব্বু। আমি তোমার আম্মুর কাছে আছি না, চিন্তা করো না। রাতে ঘুম না হলে কাল এক্সামও ভালো হবে না।
—কিন্তু পাপা……
—তুমি চিন্তা করো না। এই স্যুপটা খাইয়ে ঔষধ খাওয়ালেই তোমার আম্মুর জ্বর ছেড়ে যাবে ইনশা আল্লাহ। আর তাছাড়া আমি আছি তো তার পাশে।
“আমি আছি” শব্দটা ছোট হলেও এটার তাৎপর্য অনেক। রায়হান চলে যায় নিজের রুমে। মুনতাহার জ্বর না ছাড়া অব্দি রাহাত তার সেবা করতে থাকে।
~চলবে?
[অনিয়ম ও ছোট করে দেওয়ার জন্য দুঃখিত। মাইগ্রেন ও ভাইরাল ফিভারে আক্রান্ত হয়ে চিৎপটাং অবস্থা। আমি চেষ্টা করবো পরের পর্ব যত জলদি দেওয়া যায়। আমার জন্য দোয়া করবেন।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

