#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৫৪
—কি হয়েছে একটু খুলে বলবে? আমি যতটা আফিফ ভাইয়াকে চিনি, সে এমনটা করতেই পারে না। আর বিয়েটা তো সে নিজের ইচ্ছেতেই করেছিল, তাহলে বিয়ের চার মাসের মাথায় আবার অন্য সম্পর্ক?
হায়ার প্রশ্ন শুনে রাহা ডুবে যায় তার জীবনের সুন্দরতম রাত কাটানোর পরের দিনে।
_________________________
অতীত~
আফিফ ঘুম থেকে উঠে নিজেকে এলোমেলো অবস্থায় পায়। চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এদিক সেদিক তাকালেও সেই রমনীটিকে পায় না যার জন্য আজ তার এই এলোমেলো অবস্থা। রাহাকে দেখতে না পেয়ে আফিফ চিন্তায় পড়ে যায়। রাহা আবার তাকে ভুল বুঝলো না তো? কথাটা মনে উঠতেই তার বুকটা প্রচন্ড জোরে ধক করে উঠে। সে তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হতে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে হসপিটালের জন্য রেডি হয়ে একেবারে নিচে নামে।
আজ তার উঠতে দেরি হয়েছে ঘুম থেকে। আফরা ও আদিয়াত অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর রাহাই তাদের ব্রেকফাস্ট করে নিতে বলে। তারা দু’জন পুত্রবধূর কথা মতো ব্রেকফাস্ট করে নেয়। আফিফ নিচে নামলে রাহা আফরাকে দুপুরের রান্নার তাড়া দেখিয়ে নিজে কিচেনে থেকে যায়। আর আফরাকে বলে সে যেনো আফিফকে ব্রেকফাস্টটা বেড়ে দেয়। আফরা বেশি না ভেবে তাই করে।
আফিফ ব্রেকফাস্ট করতে করতে অনেকবার উঁকিঝুঁকি মারে কিচেনের দিকে, একটা বার রাহাকে দেখার জন্য। কিন্তু রাহা তার কাছে ধরাই দেয় না। আফিফের জরুরি একটা অপারেশন থাকায় সে রাহার সাথে কথা না বলেই চলে যায়। ভাবে এসে কথা বলবে বিষয়টা নিয়ে।
কিন্তু এসে আর রাহাকে বাসায় পায় না। কেনো? কারণ সে তার বাবার বাড়ি গিয়েছিল। বিয়ের পর প্রথম সেদিন গিয়েছিল রাহা তার বাবার বাড়ি। তাও যেতো না কিন্তু তার মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে না গিয়ে আর থাকতে পারে না। আদিয়াত আর আফরা গিয়ে তাকে রেখে আসে চৌধুরী বাড়ি।
মুনতাহার শরীর বেশ ভালোই খারাপ ছিল। অসুস্থতার জেরে তাকে হসপিটালেও ভর্তি করা হয়। মাকে নিয়েই কয়েকদিন রাহা বেশ চিন্তিত ছিল যার কারণে আফিফের সাথে সেই বিষয়ে আর কথা হয় না। মূলত সে নিজেই বলে না। তার কেমন লজ্জা লাগছিল বিষয়টা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলায়। ভেবেছিল সময়ের সাথে সাথে একসময় স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তাই নিজ থেকে আগ বাড়িয়ে আর কিছু বলে। কিন্তু তার এই ভাবনাটাই তাদের সম্পর্কের কাল হয়ে দাড়ালো।
রাহা ২০দিনের মতো তার বাবার বাড়ি ছিল। এই বিশ দিনে সে মাত্র হাতে গোনা কয়েকবার আফিফের সাথে কথা বলেছে। কেমন আছেন? খেয়েছেন? কি করছেন? এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের কথোপকথন।
রাহার এমন লুকোচুরি পনায় আফিফ ধরে নেয় রাহা তাকে খারাপ ছেলে ভাবছে, যে কিনা তার বউয়ের নেশাগ্রস্ত অবস্থার সুযোগ নিয়েছে। একসময় আফিফও তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলা শুরু করে। মাঝে একটা ক্যাম্পিংয়ে যায় দুই সপ্তাহের।
আফিফ ক্যাম্পিংয়ে চলে যেতেই রাহা হাফ ছেড়ে বাঁচে। সে ভাবে আফিফ ক্যাম্পিং থেকে ফিরলে তাকে সুন্দর একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার মাধ্যমে আফিফকে নিজের অনুভূতি জানাবে। কিন্তু ক্যাম্পিং থেকে ফিরে আসার পর আফিফের ব্যবহার বদলে যেতে থাকে। রাত করে বাড়ি ফিরে, বাসায় একদিন আসলে তিনদিন আসে না। সারাক্ষণ হসপিটালেই পরে থাকে। রাহা তিনটা প্রশ্ন করলে একটার উত্তর দেয়। যেই আফিফ সবার সাথে সবসময় হাসি মুখে কথা বলত, সে এখন কথায় কথায় রাগ দেখায়।
একদিন রাহা তাদের রুমের বেলকনিটা সুন্দর করে সাজায়। নিজের হাতে আফিফের জন্য কয়েক পদের রান্না করে। নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে আফিফের জন্য। কিন্তু আফিফ আসে রাত একটায়। রাহার বরাবরই ধৈর্য একটু কম। সে রাত নয়টা থেকে সব কিছু রেডি করে আফিফের জন্য অপেক্ষা করছিল। আর আফিফ বাসায় যায় রাত একটায়। যার কারণে তার বেশ রাগ হয়।
আফিফ বাসায় এসে তার ক্লান্ত শরীরটা টেনে রুম পর্যন্ত নেয়। রুমে এসে সোফায় বসে একটু জিরচ্ছিল তখনই রাহা রেগেমেগে তার সামনে এসে হাজির। গলাটা খানিকটা উঁচু করে বলে–
—এত লেট হলো কেন আজ হ্যাঁ? কোথায় ছিলেন? কার সাথে ছিলেন?
কোথায় ছিলেন পর্যন্ত ঠিক ছিল কিন্তু কার সাথে ছিলো এই প্রশ্নটা শুনে আফিফ প্রচন্ড রেগে যায়। এমনিতেই সেই বিষয়টা নিয়ে মানসিকভাবে এখনও ডিস্টার্ব সে তারউপর রাহার এমন প্রশ্ন যেনো আফিফকে বলছে সে ঘরে স্ত্রী রেখেও বাহিরে পরকীয়া করছে। আফিফ তড়াক করে দাড়িয়ে গিয়ে রাহার দু’হাতে বাহু চেপে ধরে বলে–
—সব কথার কৈফিয়ত কি তোমায় দিতে হবে? আর কার সাথে ছিলাম মানে? আমাকে কি চরিত্রহীন মনে হয়? শুনো আগে নিজের চরিত্র ঠিক করো তারপর অন্যের চরিত্রে আঙ্গুল তুলতে আসবে।
কথাটা বলে আফিফ রাহাকে ছেড়ে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। রাগের মাথায় কি বলতে কি বলে ফেলেছে আফিফের খেয়াল নেই। আসলে শান্ত মানুষদের রাগ এমনই হয়। তারা সবসময় রাগে না, আর যখন রেগে যায় তখন কি রেখে কি করে বা বলে তাদের নিজেরও খেয়াল থাকে না। পরে রাগ পড়ে গেলে তখন এটা নিয়ে আফসোস করে।
এদিকে আফিফের কথাটা শুনে রাহা স্তব্ধ হয়ে যায়। সে বাকরুদ্ধ হয়ে কতক্ষণ দাড়িয়ে থাকে। আফিফের কথাটায় যে খুব হার্ট হয়েছে সেটা যে কেউ তার মুখ দেখে বলে দিতে পারবে। কিছুক্ষণ পর রাহা নিজেকে সামলে নিয়ে বেলকনির দিকে হাঁটা দেয় তখনই আফিফের ফোনটা বেজে ওঠে। রাহার সমানেই ফোনটা বাজতে বাজতে কেটে যায়। কলটা কেটে যাওয়ার সেকেন্ড কয়েক পরপরই একটা ভয়েস মেসেজ আসে। রাহা কি মনে করে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে মেসেজটা দেখার উদ্দেশ্য। হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ এসেছে। নিম্মি নাম দিয়ে নাম্বারটা সেভ করা। পাশে একটা রেড হার্ট ইমোজি। এটা দেখে রাহার ভেতরের কষ্ট আরে বেড়ে যায়। কিন্তু সে যখন ভয়েসটা শুনে আরো একবার স্তব্ধ হয়ে যায়। একটা মেয়ে ভয়েস মেসেজটা পাঠিয়েছে। সেটায় মেয়েটা বলেছে–
—আফিফ আপনি কল ধরছেন না কেনো? প্লিজ একটু বাসায় আসেন না। অনেক বড় সমস্যা হয়ে গিয়েছে। প্লিজ একটু কষ্ট করে আসেন।
ভয়েটা শুনে রাহার চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়তে থাকে। সে ফোনটা আগের জায়গায় রেখে দিয়ে বেলকনিতে চলে যা। ঝটপট হাতে সব ডেকোরেশন নষ্ট করে শুধু খাবারের প্লেট গুলো সেন্টার টেবিলের উপর রেখে রুম থেকে বের হয়ে গিয়ে আদিবার রুমে গিয়ে কাঁদতে থাকে।
আফিফ অনবরত নিজের ফোন বাজার শব্দে ওয়াশরুম থেকে বের হয়। তড়িঘড়ি করে কলটা তুলে দেখে সেই নিম্মি নামের মেয়েটি কল করেছে। আফিফ সময় অপচয় ব্যতীত কলটা রিসিভ করে কানে লাগায়। তারপর অপর পাশ থেকে কিছু একটা বলতেই সে অস্থির হয়ে বলে–
—আমি আসছি। আপনি কান্না করবেন না প্লিজ।
কথাটা বলে আফিফ ফোন কেটে একটা টি-শার্ট গায়ে জড়িয়ে বাসার কাপড়েই দৌড়ে চলে যায়। আফিফের গাড়ি স্টার্ট করার আওয়াজে রাহা আদিবার রুমের বেলকনিতে গিয়ে দেখে আফিফ রাত দুটো বাজে আবার কোথাও যাচ্ছে। নিশ্চয়ই নিম্মি নামক সেই রমণীর কাছে। দৃশ্যটা দেখে তার পাঁজর ভাঙার মতো কষ্ট হতে থাকে। হাঁটু ভেঙে সেখানেই বসে কাঁদতে কাঁদতে রাতটা পার করে।
পরেরদিন বেশ বেলা করে বাসায় ফিরে আফিফ। বাসায় এসে মায়ের সাথে কয়েকটা কথা বলে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কয়েক ঘন্টা ঘুমায়। তারপর ঘুম থেকে উঠে লাঞ্চ করে হসপিটালে চলে যায়। তখন রাহা ভার্সিটিতে ছিল বলে তার সাথে দেখা হয় না। রাতেও অনেক দেরি করে আসে। ছুটির দিনগুলোতেও বাসায় কম থাকে, বাহিরেই বেশি থাকে। বাসায় থাকলেও রাহার সাথে খুব কম কথা হয়। মূলত ঘরে ভেতরে তাদের তেমন কথাই হয় না। যা হয় বাবা-মায়ের সামনেই হয়।
__________________________
~বর্তমান~
—বিয়ের আগে আমি যদি কোন ছেলে নিয়ে ভাবতাম, পাগলামি করতাম তাহলে সেটা শুধু জাহান ভাইয়াকে নিয়েই। ছাড়া আমার এতবছরের জীবনে কোন ছেলে ফ্রেন্ড বানাইনি আমি। সবসময় মাথায় একটা কথাই ঘুরত, কোন ছেলে ফ্রেন্ড বানালে যদি জাহান ভাইয়া আমায় খারাপ ভাবে? আমাকে খারাপ চরিত্রের মেয়ে ভাবে? এসব ভেবেই আমি ছেলেদের থেকে কয়েকশ’ হাত দূরে থাকতাম।
বিয়ের পর আফিফের যত্ন, তার বাবা-মায়ের স্নেহ-ভালোবাসায় আমি জাহান কেও ভুলে গিয়েছি। এখন আফিফ ব্যতীত অন্য কোম পুরুষের কথা ভাবতেই কেমন গা গুলায়, অস্বস্তি হয়। আমি অনুভব করতে পারি আমার পুরো সত্ত্বা জুড়ে এখন শুধু আফিফের রাজ। কিন্তু সে আমার পুরোটা জুড়ে থাকলেও আমি যে তার কোথাও নেই। আমাকে সে খারাপ চরিত্রের মেয়ে মনে করে। তাই তো অন্য একজনকে নিজের জীবনে নিয়ে এসেছে। হয়ত আমাকে ছেড়ে তাকেই নিজের জীবনসঙ্গিনী বানাবেন কয়েকদিন পর। কিন্তু তোমরা বিশ্বাস করো, আমি খারাপ চরিত্রের মেয়ে না। আমি আফিফের সাথে সংসার করতে চাই। আমি চাই আমাদের দু’জনের একটা সুখের সংসার হোক।
কথাগুলো বলতে বলতে রাহা আবারও হুহু করে কেঁদে। বেচারী জাহানকে ভুলতে পেরেছিল আফিফের সাপোর্টের কারণে। কিন্তু এখন আফিফও যদি তাকে ছেড়ে দেয় তাহলে সে বোধহয় নিজের ভালোমন্দ কিছু একটা করে দিবে।
কাঁদতে কাঁদতেই হঠাৎই রাহা বমি করতে শুরু করে। হায়া আর মেহরিমা তার পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দুয়ে তাকে শান্ত করায়। রাহার বমি থামলেও তার শরীর ছেড়ে দিয়েছে আর ঘামতে থাকে দরদর করে। রাহার এমন অবস্থা দেখে হায়া আর মেহরিমা ঘাবড়ে যায়। তারা রাহাকে ধরাধরি করে স্টুডেন্ট হেল্থ কেয়ার সেন্টারে নিয়ে যায়। সেখানে ডাক্তার প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা দিয়ে তাকে বাসায় যেয়ে রেস্ট নিতে বলে।
হায়া মেহরিমাকে ক্লাসের পাঠিয়ে দিয়ে নিজে একটা উবার ডেকে সেটাতে করে রাহাকে নিয়ে রওনা হয় মাহমুদ বাড়িতে।
আশিয়ান থার্ড ইয়ারে হায়াদের একটা কোর্সের ক্লাস নেয়। সে ক্লাস নিতে আড়ঁচোখে কয়েকবার হায়াকে খুঁজে কিন্তু পায় না। হায়া রাহার বিষয়ে তাকে টেক্সট করে বললেও তার ফোন অফিস-রুমে থাকায় সে টেক্সট টা দেখেনি। বিধায় এখন বউকে না দেখে সে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠে।
________________________________
হায়া রাহাকে দিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে দুপুর দু’টো বেজে যায়। এসে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসে কিন্তু কিছুই খেতে পারে না। তার দুই রকমের পছন্দের মাছ রান্না করে রেখেছে স্পর্শ কিন্তু আজ তার হঠাৎ কি যেনো হলো,মাছ দেখলেই গা গুলিয়ে আসছে। তাই সে ভাজি আর ডাল দিয়ে কয়েক লোকমা ভাত খেয়ে রুমে চলে আসে। পেটের ক্ষুধা তার এখনও মিটেনি তাও তার কিছুই খেতো ইচ্ছে করছে না। ক্ষুধা পেটে রেখেই সে ঘুমিয়ে যায়।
_________________________
—আই লাভ ইউ রাহা। আই লাভ ইউ সো মাচ। উইল ইউ বি মাই সোলমেট?
মাঝরাতে তরতাজা একগুচ্ছ গোলাপ রাহার দিকে এগিয়ে দিয়ে হাঁটু মুড়ে প্রপোজ করে উঠে আফিফ। রাহা হুট করে আফিফের এমন প্রপোজালে হতভম্ব হয়ে যায়। তার কি রিয়াক্ট করা উচিত, বা কি বলা উচিত সে বুঝে উঠতে পারছে না। বড় বড় চোখ করে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। বেচারীকে আফিফ ঘুম থেকে টেনে তুলে এনে হুট করেই প্রপোজ করে বসে।
চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

