#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৫৩
—আমি লন্ডন চলে যাওয়ার পর যখন একা থাকতে শুরু করলাম, তখন আমার একাকিত্ব আমার ভুল গুলো বুঝাতে শুরু করল। সবসময় বাবা-মায়ের ছায়াতলে থেকে বড় হয়ে সেখানে গিয়ে বড্ড একা হয়ে পরেছিলাম। তারপর আমি এমন ভাবে চলে যাওয়ার জন্য যখন আম্মু আর বাবা আমার সাথে কথা বলত না তখন তো কষ্টে বুকটা ফেটে যেতো। তারা আমার সাথে কথা না বললেও আমি তাদের খোজ খবর ঠিকই নিতাম।
—কিভাবে?
হায়া প্রশ্ন করে উঠে। আশিয়ান হায়ার চুলে ভাঁজে নিজের আঙুলের স্পর্শ দিতে দিতে বলে–
—আফিফের মাধ্যমে। তখন পরিবারের খোঁজ খবর নেওয়ার একটাই মাধ্যমে ছিল আফিফ। আফিফের কাছ থেকেই পরবর্তীতে তোমার সম্পর্কে জানতে পারি। আমি যখন চলে গিয়েছিলাম তখন আমার কারো কথা মাথায় ছিল না। সকলের উপর প্রচন্ড রাগ নিয়ে, বিশেষ করে তোমার উপর একপ্রকার ঘৃণা নিয়ে দেশ ছেড়ে ছিলাম। তখন মাথায় শুধু এটাই ঘুরছিল– বিয়ে মানে আমার স্বাধীনতার অপমৃত্যু, অপর একজন মানুষের অযাচিত দায়িত্ব। আমি এসবের থেকে মুক্তি নেওয়ার জন্যই দেশ ছেড়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে যখন তোমার সামাজিক দূর্দশার কথা জানতে পারি ভীষণ গিল্টি ফিল হতে থাকে। লন্ডন যাওয়ার ছ’মাস পর বাবা-মা, ও বাবাই-মাম্মামের সাথে যোগাযোগ করি। বাবা আমার সাথে কথা না বললেও বাকিরা কথা বলে আর আমায় ক্ষমাও করে দেয়। তারপর আমি বাবাইয়ের কাছে তোমাকে দিতে বললে সে বলে, তোমার মাত্রই একটু অভারকাম করছ সবকিছু থেকে, এখন যদি আবার আমার সংস্পর্শে আসে তাহলে তোমার মেন্টাল হেলথ আবারও বিগড়ে যেতে পারে তাই আমি যেনো তোমার সাথে যোগাযোগ না করি।
বিষয়টা প্রথমে মেনে নিলেও কয়েকদিন যাওয়ার পর তোমার সাথে কথা বলার জন্য মনটা কেমন ছটফট শুরু করল। অপরাধবোধ নাকি অন্যকিছু জানি না, একসময় না পেরে তোমার সাথে যোগাযোগ করেই ফেললাম। কিন্তু তুমি তো দিলে আমায় ব্লক মেরে। তখন অদ্ভুত একটা জেদ চেপে বসল। তোমার থেকে ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত আমি কিছুতেই তোমার বিষয়টা ভুলতে পারব না, এই ভেবে একটা ফেইজ আইডি খুললাম। নামটা কি জানো?
—কি?
ঘুমুঘুমু কণ্ঠে বলে হায়া।
—রুমা মাহবুব।
নামটা বলে আশিয়ান দাঁত কেলিয়ে হেঁসে দেয়। অন্যদিকে আশিয়ানের মুখে এই নামটা শুনে হায়ার সব ঘুম পালিয়ে যায়। সেখানে ঠায় নেয় অবাকতা। রুমা মাহবুব তো তার সেই ফেসবুক ফ্রেন্ড যে কিনা প্রায় একবছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল। হায়া মনে মনে সময়ের হিসাব করলে সেটা গিয়ে দাঁড়ায় আশিয়ানের বাংলাদেশে ফেরার সময়ে। তারমানে আশিয়ানই সেই রুমা মাহবুব।
হায়া বিস্ময় নিয়ে বলে–
—তার মানে আমার সেই হারিয়ে যাওয়া ফ্রেন্ড টা আপনি?
—হ্যা আমার জান। আমি অজানা কারণে তোমার মায়ায় পড়ে গিয়েছিলাম। তোমার সাথে কথা বলার জন্য মনটা ছটফট করত। আমায় ব্লক করার পর আমার সেই ছটফটানি আরো বেড়ে গেলো। আর তখনই আমি রুমা মাহবুব নামের ফেইক আইডি খুলে তোমার সাথে কথা বলা শুরু করি। আস্তে আস্তে তোমার মায়া আরো বাড়তে থাকে, এবং একসময় গিয়ে আমি উপলব্ধি করতে পারি আমি তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু কিভাবে তোমায় আমার মনের লঘা জানাবো এসব ভাবতে ভাবতে দিন কাটছিলো তখনই তোমার আর ফারাবীর এনগেজমেন্টের খবর পাই। সেদিন লন্ডনে ইতিহাসের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা পড়েছি। সেই ঠান্ডার মাঝে আমি দুই ঘন্টা শাওয়ার নেই। পরবর্তী অবশ্য এক সপ্তাহ বিছানায় চিৎপটাং হয়ে ছিলাম। সুস্থ হয়ে ওঠার পর সিদ্ধান্ত নেই, জীবনে প্রথমবারের মতো যাকে মনে ধরেছিল তাকেই সঙ্গিনী করব। তারপর আমার জব ছেড়ে রিসার্চের কাজে লেগে পড়ি। উদ্দেশ্য ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রিসার্চ পেপার জমা দিয়ে দেশে ফিরে তোমায় আমার ঘরনী করা। দেশে আসার পর তোমার ইগনোর আমায় আরো জেদি করে তুলেছি। সত্যি বলতে, তখন আমার মেইল ইগো কিছুটা কাজ করছিল। আর তখনই আমি ফারাবীর সাথে তোমার বিয়ে আটকাতে ওর বোনকে কিডন্যাপ করাই।
আশিয়ান এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করে। হায়ার কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে সে নিজের বুকের দিকে তাকালে দেখতে পায় হায়া ঘুমিয়ে পড়েছে। নিচের ঠোঁটটা বাচ্চাদের মতো একটু উল্টে ঘুমাচ্ছে। আশিয়ানের কাছে হায়াকে এত আদর আদর লাগছে যে, সে টপাটপ কয়েকটা চুমু এঁকে দেয় হায়ার অধরে। তারপর আলতো হাতে তাকে নিয়ে রুমে এসে অতি সাবধানে বিছানায় শুয়ে দেয়। জানালার পর্দাগুলো সুন্দর করে মেলে দিয়ে এসির পাওয়া বাড়িয়ে দিয়ে নিজেও বিছানায় শুয়ে পড়ে। প্রিয়তম নারী টিকে নিজের বক্ষে আগলে নিয়ে নিদ্রা পরীর কোলে ঢলে পড়ে।
_________________________
বহু দিন কেটে যায় সময়ের শান্ত সরোবরে। আশিয়ান-হায়া, জাহান-মেহরিমা, জায়িন-আদিবা তাদের সংসার যেন একেকটি শব্দহীন গানের মতো, যার প্রতিটি নোটে মিশে আছে মমতা, ভালোবাসা আর নির্ভরতার অনুপম সুর। তাদের দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি সকাল যেন হয়ে ওঠে নতুন শুভারম্ভ, আর প্রতিটি সন্ধ্যা ধরা দেয় একটি শান্ত পূর্ণতা হিসেবে।
তারা সকলেই পরিপূর্ণ হৃদয়ে নিজেদের সঙ্গীদের গ্রহণ করেছে। যেখানে গ্রহণে নেই কোনো অতৃপ্তি, নেই কোনো অভিমান। আছে কেবল গভীর সন্তুষ্টি, আর এক চিরন্তন ভালোলাগার আশ্রয়।
সন্তানদের সুখে দেখে তাদের সকলের বাবা-মায়েদের চোখ খুশিতে ভিজে উঠে মাঝে মধ্যেই। কিন্তু এই তিন জুটির বাহিরে আরেক জুটি রয়েছে আমাদের এই ভালোবাসার গল্পে যাদের মাঝে চলছে অঘোষিত বিচ্ছেদ। সেই জুটি কোনটা আপনারা কি আন্দাজ করতে পারছেন? হ্যাঁ, তারা হলো আফিফ ও রাহা। তাদের কাছাকাছি আসার সেই দিনটার পর থেকেই তাদের বিচ্ছেদ শুরু হয়েছে। কেনো চলছে সেটা তাদের কারোর কাছেই নেই।
____________________________
হায়া, মেহরিমা আর আদিবার ভার্সিটি আবার শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের রেজাল্ট দিয়েছে এবং হায়া ও মেহরিমা ফার্স্ট ক্লাস পেলেও আদিবা পায় নি। এতে যদিও তার কিছু যায় আসে না কারণ সে তো আর পড়ালেখাই করতে চাইছে না আর। কিন্তু তার স্বামী মহাশয় ও শ্বশুর বাড়ির লোক শুনলে তো। তাদের এক কথা, আগে পড়ালেখা পরে সংসার। সংসার তুমি করার সময় পাবে, কিন্তু পড়ালেখার সুযোগ একবার চলে গেলে একসময় না এটার জন্য আফসোস করতে হয়। তাই তো আদিবার শত বিতৃষ্ণা, অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
হায়া, মেহরিমা ও রাহা এক ভার্সিটিতে পড়লেও, আদিবা অন্য ভার্সিটিতে পড়ে। ভার্সিটিতে হায়া ও মেহরিমা একসাথেই থাকে। ছুটির পর মেহরিমার জন্য বাসা থেকে গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয় সেটাতে করে মেহরিমা বাসায় এসে পড়ে। আর হায়া চলে যায় তার বাড়ি।
____________________________
ক্লাস শেষ করে দুই বান্ধবী ভার্সিটির মাঠের দিকে হাঁটা দেয়। আরেকটা ক্লাস রয়েছে কিন্তু সেটা এক ঘন্টা পর। তাই এই এক ঘন্টা তারা গল্প করে কাটাবে বলে ঠিক করেছে। যেই ভাবা সেই কাজ। তারা মাঠে গিয়ে বসার জন্য জায়গা খুঁজতে থাকে। তখনই তাদের নজরে পড়ে খানিকটা দূরে একটু শান্ত জায়গায় উদাসীন মুখ ও অশ্রু ভর্তি চোখ নিয়ে বসে থাকা রাহাকে।
হায়া ও মেহরিমা নিজের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারপর নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে তার পাশে গিয়ে বসে পড়ে। তারা দু’জন রাহা পাশে বসার পরও রাহার কোন খেয়াল নেই। সে এক ধ্যানে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। হায়া তার কাঁধে হাত দিয়ে ডেকে উঠে–
—রাহা, কি হয়েছে তোমার? চোখমুখ এমন লাগছে কেনো তোমার?
রাহা চমকে উঠে হায়ার গলা শুনে। তার চেয়েও বেশি চমকে যায় হায়া ও মেহরিমাকে নিজের পাশে বসে থাকতে দেখে। মেহরিমার দিকে এক নজরে কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে হায়ার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসার ভান করে বলে–
—কেমন আছো তোমরা?
—আমরা আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। কিন্তু তোমার কি হয়েছে? কাঁদছ কেনো তুমি?
কান্নার বিষয়টা হায়াদের সামনে প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় হায়া একটু বিব্রতবোধ করে। সে মেকি হেসে বলে–
—আরে কি আর হবে? কিছু হয়নি তো। আর কাঁদব কেনো? তাহলে অনেকক্ষণ চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে ছিলাম তো তাই চোখে পানি জমেছে।
হায়া বা মেহরিমা কারোরই রাহার কথা বিশ্বাস হয় না। রাহার চোখই বলে দিচ্ছে সে ভালো নেই। এবার মেহরিমা তার কাছে এসে তার কাঁধে হাত রেখে কোমল গলায় জিজ্ঞেস করে–
—তুৃমি বলছো এক আর তোমার চোখ বলছে আরেক কথা। তুমি চাইলে আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারো।
রাহা মেহরিমার কথা শুনে তার দিকে একধ্যানে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটাকে একসময় সে ও তার বাবা কতটা কষ্ট দিয়েছিল আজ সেই মেয়েটাই তার বিষাদ কারণ জানতে চাইছে, তাও আবার এত কোমল গলায়। মেয়েটা আসলেই সহজ-সরল আর ভীষণ ভালো মনের। নাহলে তার জীবনের এতবড় একটা ক্ষতি করতে চাওয়া মানুষের সাথে এত ভালো আচরন করে নাকি কেউ? রাহা তো পারবে না নিজের শত্রুর সাথে এত ভালো আচরন করতে।
মেহরিমা আবারও বলে–
—কি হয়েছে রাহা? সব ঠিক আছে তো?
প্রশ্নটা শুনে রাহা দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হুহু করে কেঁদে দেয়। হায়া ও মেহরিমা চমকে যায় তাকে এমনভাবে কাঁদতে দেখে।তারা বুঝতে পারে বিষয়টা সিরিয়াস তাই রাহা এমনভাবে কাঁদছে। রাহাকে তারা মন খুলে কাঁদতে দেয়। অনেক সময় কাঁদতে দেওয়া উচিত এতে করে মনের অর্ধেক বিষাদ দূর হয়ে যায়।
বেশ কিছুক্ষণ কান্না করার পর একটা সময় রাহা একা একাই থেমে যায়। রাহাকে থামতে দেখে মেহরিমা নিজের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে তার দিকে এগিয়ে দেয় খেতে। রাহা চুপচাপ সেখান থেকে কিছুটা পানি খেয়ে নেয়।
পানি খাওয়া শেষে একটু সময় থম মেরে বসে থেকে নিজে থেকেই বলতে থাকে–
—জানো আমি মেয়েটা না ছোট থেকে ভীষণ স্বার্থপর ছিলাম। বুঝ হওয়ার পর থেকে নিজেরটা ছাড়া আর কারোটা ভাবতাম না। অনেকের থেকে তার প্রিয় জিনিস ছিনিয়ে নিয়েছি বা নেওয়ার চেষ্টা করছি, যার শাস্তি এখন এসে পাচ্ছি।
ভাঙা ভাঙা গলায় কথা গুলো বলে রাহা। হায়া ও মেহরিমা কিছুই বুঝতে পারছে না। রাহা আবার বলে–
—আমার বোধহয় তোমাদের মতো সংসার করা হবে না। আফিফ আমায় ছেড়ে দিবে। তার জীবনে নতুন নারীর আগমন ঘটেছে।
রাহার কথাটা শুনে হায়া ও মেহরিমা যেমন কষ্ট পায় তার চেয়েও বেশি অবাক হয়ে যায়। মেহরিমা আফিফ সম্বন্ধে তেমন একটা কিছু না জানলেও হায়া বেশ ভালোই জানে। আফিফ সেই আদর্শবান বাবার ছেলে যে কখনো নিজের ব্যক্তিগত নারীর ব্যতীত অন্যকোন নারীর দিকে ভালোলাগার চোখে তাকায় না। সেই আফিফ কিনা বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও অন্য নারীকে জীবনে এনেছে?
~চলবে?
[গল্পটা আর বেশি পর্ব নেই। কয়েকদিনের মধ্যেই শেষ হতে চলেছে। গল্পটা আপনাদের কেমন লাগছে জানাবেন সকলে।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

