চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড় লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ ২.

0
37

#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ

২.
অন্ধকার ঘরটা মোমবাতির আলোয় পরিপূর্ণ। স্টার অঙ্কনের পাঁচ রেখায় পাঁচটা মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা আছে। আটা দিয়ে স্টার অঙ্কন করা তা সহজেই বুঝে গেলো তুলি। মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় চোখ বন্ধ করে বসে আছে শশি। জোড়ে জোড়ে শ্বাস গ্রহণ করছে সে। মুহুর্তেই কেমন উতলা হয়ে পরলো। সামনে একটা লোক কিছু দোয়া-দরুদ পাঠ করছে। কালো কাপড় পরিধানরত অবস্থায় আছে লোকটা। মাথায় টুপি দেওয়া আছে। দেখে ততটাও বয়স নয় মনে হলো তার। পঁচিশ কিংবা ছাব্বিশের মাঝবর্তী হবে। শশি চড়াৎ করে উঠে সোজা দাড়ালো শটান হয়ে। তুলি ভয় পেয়ে গেলো সহসায়। শশির চোখগুলো অসম্ভব লাল হয়েছে মুখে বিদঘুটে হাসি। ঘর ছেড়ে বাইরে যেতে লাগলো সে। তার পেছন পেছন লোকটাও গেলো। তবে লোকটার হাতে ছিল রামদা। বোরখার মতো মাঝ বরাবর চেরা পোশাক পরেছে লোকটি। যাকে পরধুতি বলা হয়। হাঁটলেই এপাশ-ওপাশ দৌড়ে বেড়াচ্ছে কাপড়গুলো। শশি সোজা পাহাড়ের দিকে গেলো। চূর্ণচূড়া পাহাড়। পাহাড়টির নাম রেখেছিল সাহিন জমিদার। তিনি ছিলেন এই জমিদারের পূর্ব পুরুষ। পাহাড়টির বেশ জায়গায় ধ্বসে যায় মাঝে মধ্যেই তাই একে চূর্ণ বলে আখ্যায়িত করা হয়। আর এর অবতারণ ছিলো আকাশ ছোয়ার মতো। বিশাল উচু চূড়া। তাই চূর্ণচূড়া পাহাড়। পাহাড়ের উপরের চূড়ায় একটা ছাপড়ি আছে। খড়ের সন দিয়ে তৈরি। সেখান থেকে পূর্ণিমার রাতে প্রায় অতৃপ্ত কান্নার শব্দ শুনা যায়। চূড়ার সম্মুখে বড় একটা বটগাছ। বিশাল বড় গাছটা ছায়ার মতো ছড়িয়ে আছে পাহাড়ের বিশালতায়। বটগাছের গোড়ায় পুকুর খনন করা আছে। এই উচু চূড়ায়ও পুকুরে পানি থৈথৈ করছে। শশি আর লোকটা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পরেছে। বিদুৎ গতিতে চোখের পলকেই যেনো তারা পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছালো। কিন্তু তুলি তা পারলো না। ভাঙা চুড়া মাটির সিঁড়ি বইয়ে চূড়ায় উঠতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। ঘন্টা খানেক সময় নিয়ে সে চূড়ায় পৌঁছাল। কিন্তু ততক্ষণে খুব বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল। ছাপড়ির ভেতরে শশি আর লোকটি একে অপরের সাথে মিলিত হয়েছে। জালানায় ফোকড় দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলো তুলি। চাঁদের আলো যেনো তাদেরকে আরও ফুটিয়ে তুলছে ধরার মাঝে। তুলি সরে দাঁড়ালো। তার বড্ড ভয় হচ্ছে এখানে। দুই হাতে শাড়ি খাঁমচে ধরলো। চোখ বন্ধ করে বড় বড় নিশ্বাস নিলো। এখান থেকে কি সে চলে যাবে? না। যদি যেতেই হয় তাহলে শশিকে নিয়ে যাবে সে। আচ্ছা আজকের আগে যতগুলো কুমারী মেয়ে নিখোঁজ হয়েছে তারাও কি এখানে এসেছিল? তারাও কি লোকটার সাথে মিলিত হয়েছিল? তারপর কি হয়েছিল? এখান থেকে তারা কোথায় গিয়েছিল? তুলি গিয়ে পাশের বটগাছের আড়ালে দাড়ালো। লোকটা ঘর ছেড়ে বাহিয়ে এলো। শশি জোড়ে জোড়ে কাঁদতে লাগলো। তুলি ভয়ে কেঁপে উঠলো। শশি গগন ফাটিয়ে চিৎকার করলো„ —“নআ-হ-না-হহহহহহহ”

লোকটি দ্রুত শশির কাছে এলো। শশি ছাপড়ির ভিতরে বসে বসে কাঁদছে। দুই হাতে চুল খামচে ধরে টানছে আর চিৎকার করছে। লোকটিকে দেখেই শশি জড়োসড়ো হলো। শাড়ির অংশ দিয়ে নিজেকে আবৃত্ত করলো। ঘৃণার তীক্ষ্ণ তীর ছুঁড়ে বলল„ —“লম্পট। কাপুরুষ। একা পেয়ে একটা মেয়ের সর্বনাশ করতে লজ্জা করে না। কে তুই?”

কথাটা শুনেই তুলি চমকালো। শশি যদি লোকটাকে নাই বা চিনে থাকে তাহলে সে এখানে এলো কেন? আর আসার সময় তাকে জমিদারের ছেলের কথায় বা কেন বলল? এই লোকটি কে? আর শশি তো নিজেই এই চূড়ায় আসলো তাহলে সে কেন লোকটাকে চিনলো না? এতটা পথ যে শশি একা এলো? নাকি সে কোনো মায়াবী জাদুর ছলে পরলো? বার কয়েক চিমটি কাটলো তুলি। নাহ সে ঘোরের মাঝে নেই। সব কিছু সত্যি হচ্ছে। কিন্তু কি হচ্ছে এসব?

—“কাপুরুষ তোকে আমি খুন করবো।”

বলেই পাশে রাখা রামদা টা হাতে নিলো শশি। ছুঁটে লোকটির কাছে যেতেই লোকটি কিছু একটা ছুঁড়ে দিলো শশির দিকে। ধোঁয়ার মতো কিছু একটা উড়তেই শশি স্বাভাবিক হলো। লোকটি গম্ভীর গলায় বলল„ —“রামদা রেখে আমার সাথে এসো?”

শশি কোনো কথা না বলে রামদা টা টুলে রাখলো। চুপচাপ লোকটির পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো। লোকটি শশিকে নিয়ে সেই পুকুরে গেলো ডুব দিতে। শশিও নিঃশব্দে লোকটির সাথে চূড়ার টলমল পানিতে ডুব দিলো। পুকুর থেকে উঠে বটগাছের গোড়ায় রাখা সাদা থান টা বিনা বাক্যে পরিধান করলো শশি। সামনে রাখা গোলাপ জলটা নিজের গায়ে ছিটিয়ে নিলো। তুলি নিঃশব্দে সবকিছু দেখলো। লোকটি উঠে নিজেও সাদা থান পরিধান করলো। সামনে রাখা খাঙকা ঘরের দিকে ইশারা করলো শশিকে„ —“এখানে মাথা দাও।”

শশি গিয়ে সেখানে মাথা রাখলো। তুলি চিৎকার করতে গিয়ে দুই হাতে মুখ চেপে ধরলো। এখানে কোনো মতেই তাকে চিৎকার করা যাবে না। সামনে চোখ পাকিয়ে সবকিছু দেখলো। বিরবিরিয়ে বলল„ —“আমাদের এখানে দুম্বাকে এভাবে জবাই করা কতো। তাহলে কি শশিকে এখানে জবাই করবে? হিন্দু উপাসকেরা তো এভাবে পাঠা বলী দিতো। তাহলে কি শশিকে এখানে বলী দিবে?”

জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো সে। ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে গেলো। কোথা থেকে আওয়াজ আসলো„ —“কোনো কিছুর বিনিময়ে বলী থেকে পিছুপা হবে না সাইর। তোমাকে সর্বশক্তিমান হতে এখন সবাই আটকাতে চাইবে। তাই তুমি তোমার কাজে মনোযোগ দাও।”

তুলি ছাপড়ির পেছনে লুকিয়ে পরলো। আওয়াজটা কোথায় থেকে আসছে সেটা জানার কৌতুহল বেরে গেলো তার। আশেপাশে খোঁজ করলো কোথাও কেউ নেই। তাহলে কথা কে বলল? লোকটির নাম সাইর। কিন্তু লোকটি কে? কেনই বা শশিকে বলী দেবে? কি তার উদ্দেশ্য?

সাইর মাথা নত করে বলল„ —“আপনি যা বলবেন তাই হবে।”

সাইর রামদা শশির থুতনিতর ধরে বলল„ —“হে কুমারী কালেমা পড় তুমি শাহাদত বরণ করতে চলেছো?”

শশি কালেমা পড়তে লাগলো। সাইর রামদা উঁচু করতেই আবারও গায়েবি আওয়াজ এলো„ —“থামো? তুমি বস্তু পরিত্যাগ করো আগে। অন্যথায় আমি ক্ষিপ্ত হবো।”

সাইর তার বস্তু পরিত্যাগ করলো। চাঁদের আলো একরাম ঝলক দিয়ে তার শরীরে প্রবেশ করলো। সুবর্ণ চাঁদের ন্যায় গাঢ় তীক্ষ্ণ সাদা ধবধবে শরীরের রঙ। মুহুর্তেই লোকটিকে কুষ্ঠ রোগী মনে করলো তুলি৷ কিন্তু চাঁদ রখন নিস্তেজ হয়ে তার সব সৌন্দর্য সাইরকে ঢালছিল তখন তার শরীর আরও সৌন্দর্য ধারণ করলো। তুলি চাঁদের দিকে তাকালো„ —“আজ তো পূর্ণিমা।”

বিস্ময়ে ঢোক গিলল তুলি। সাইর দুই হাত উঁচু করে চিৎকার করলো„ —“আমি পেরেছি। নিজেকে সর্বশক্তিমান বানাতে আমি সবকিছু করতে পারবো। পুরো পৃথিবীকে বিনাস করে হলেও আমি সর্বশক্তিমান হবোই হবো।”

তুলি দৌড়ে গেলো শশিকে বাঁচাতে সে বুঝতে পেরেছে লোকটি তাকে বলী দেবে। তুলি শশির কাছে যেতেই সাইর রামদা দিকে শশির গর্দানে কোপ বসিয়ে দিলো। রক্তগুলো ছিটকে সাইর আর তুলির শরীরে লাগলো। তুলি চিৎকার করলো„ —“নাহহহহহহ। শশিিিিিিি। এসব কি হলো আল্লাহ। তুমি এটা কি করলে আল্লাহ আমার শশির সাথে।”

পেছনে তাকালো সাইর। দ্রুত নিজের বস্তু পরিধান করলো। তুলির দিকে এগিয়ে আসতেই গায়েবি আওয়াজ এলো„ —“মেয়েটি তোমার কাজে বাঁধা দিতে এসেছে। তার দিকে মনোযোগ দিও না। তাহলে তোমাকে আবার তপস্যা করতে হবে। তুমি তোমার দিকে মনোযোগ দাও।”

সাইর শশির তাজা রক্তগুলো সুষে খেয়ে নিলো। তুলি তা দেখে সঙ্গে সঙ্গে বমি করে দিলো। মানুষের তাজা রক্ত আর একজন মানুষ কিভাবে খেতে পারে? শশির দেহটাকে মাটিয়ে শায়িত করলো সাইর। রামটা দিয়ে শশির বক্ষে কোপ দিলো। মাঝের হাড় ভেঙে হড়ম্বর শব্দ হলো। বুক চিঁড়ে পৃত্তিথলি বের করলো। কলিজা বের করে পাশে রাখলো। রামদা দিয়ে দেহটাকে কুপিয়ে কুপিয়ে টুকরো টুকরো করলো। পাশের রাখা কলিজা নিয়ে উঠে দাড়ালো। কলিজা সম্মুখে ধরে চিৎকার করল„ —“এটা ছিল আমার অর্ধ সমাপ্ত কাজ। আগামী পূর্ণিমা হবে আমার সমাপ্ত কাজ।”

কলিজা মুখের সামনে এনে কাঁচাই কচমচিয়ে খেতে লাগলো। তুলি আর সইতে পারছে না। মাথা ঘুরছে তার। পেছনে সরতে সরতে চূড়ার শেষ কিনারায় এলো তুলি। ব্যাস আর এক ধাপ পেছনে দিতেই চূড়া থেকে নিচে পরে গেলো। জোরে চিৎকার করল„ —“বাঁচাওওওওওওও।”

সাইর চিৎকার শুনেও কোনো প্রতিক্রিয়া করল না। সে নিজ মনে কলিজা চিবিয়ে খেতে লাগলো। ঠোঁটের কোণ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পরছে সাইরের তবুও সে থামছে না। খাওয়া শেষ করতেই গায়েবি আওয়াজ আসলো„ —“আর মাত্র একটা পূর্ণিমার অপেক্ষা তাহলেই তুমি হবে সর্বশক্তিমান।”

সাইর চিৎকার করে বলল„ —“হ্যাঁ আমি হবো। সবকিছু বিনাস করবো।”

ধমকের আওয়াজ আসলো„ —“এত খুশি হইয়ো না সাইর। মেয়েটি তোমার শরীর দেখে ফেলেছে। এখন ভাবো তোমার কি হবে?”

সাইর হাসলো„ —“হ্যাঁ আমি জানি আমাকে এখন কি করতে হবে। তুমি চিন্তা করো না। মেয়েটি হয়তো এতক্ষণে মরে গিয়েছে।”

জোড়েসোড়ে ধমক এলো„ —“থামো তুমি। তুমি জানো না। তোমার বিনাসকারী একজন মেয়ে। যে মেয়েটি তোমার চাঁদ শরীর দেখবে সে হবে তোমার বিনাসকারী। আর মেয়েটি তোমার শরীর দেখে ফেলেছি। তাই পরবর্তী পূর্ণিমায় ঐ মেয়েটিকে বলী দিতে হবে তোমার।”

সাইর মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। চূড়ায় কিনারায় গিয়ে এদিকে সেদিকে দেখলো কোথাও মেয়েটি আছে কি না। কিন্তু এখান থেকে শুধু চূর্ণবিচূর্ণ গাছপালায় দেখা যাচ্ছে। মেয়েটির কোনো চিহ্ন সেখানে নেই। সাইর প্রশ্ন করল„ —“আমি মেয়েটিকে চিনবো কিভাবে তার চেহারা তো আমি দেখি নি?”

সঙ্গে সঙ্গে সামনে একটা মায়াবী আয়নায় তুলির চেহারা ভেসে উঠলো। সাইর চেহারাটা মগজে এমন ভাজে স্থানান্তর করলো যাতে বহুবছর আগেও সে মেয়েটিকে দেখেছে। তারপর দুই হাত ওসাড় করতেই পিঠের দু-পাশ থেকে মস্ত বড় দুটো ডানা বেরিয়ে এলো। উড়াল দিয়ে চূড়া থেকে নিচের দিকে উড়তে উড়তে নামলো। তার চোখ জোড়া এখন ঈগলের মতো তুলিকে খুঁজছে।

সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ 🕊️

[ সাইর কি তুলিকে খুঁজে পাবে? তুলি কি অক্ষত অবস্থায় আছে? নাকি চূড়া থেকে পরে পরলোকে গমন করেছে? সাইর কি তুলিকে বলী দিতে পারবে? তুলি কি সাইরের থেকে বাঁচতে পারবে? নাকি সেও বাকি মেয়েদের মতো সাইরের খাবার হবে? ]

[ আজকের পর্বটি কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু? ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। রিচেক দিই নি সুতরাং ভুলগুলো ধরিয়ে দিবেন। ভালো থাকবেন‚ সুস্থ থাকবেন ধন্যবাদ ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here