#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ
৩.
বিস্তর দুই পাখনা মেলে উড়াল দিয়েও তুলিকে খুঁজে পেলো না সাইর। ক্লান্ত হয়ে জমিদার বাড়িতে ফিরে গেলো সে। আজ রাতের মতো বিশ্রামই শ্রেয়। পূর্ণিমা আসতে এখনো ঢেড় বাকি।
এদিকে মাঝ-রাত পর্যন্ত মাধুরী বারান্দায় বসে তুলির জন্য অপেক্ষা করছিল। মধু সেই কখন থেকে ভ্যা ভ্যা করেই যাচ্ছে থামার নাম নেই। জেগে জেগে মেয়ের পথ চেয়ে বসে আছে এক অভাগী মা।
🫧🫧🫧🫧
সকাল হতেই আজাদ মিয়া বনের দিকে রওনা হলো। সকালের খড়ি জোগাড় করে তাকে আবার জমিদার বাড়িতে যেতে হবে বাগান পরিষ্কার করতে। বনের উত্তর দিক থেকে বিভিন্ন পাখ-পাখালির কিচিরমিচির ভেসে এলো। আজাদ সেদিকে চলতে লাগলো। সচরাচর এদিকে আসে না আজাদ। এদিকে বিভিন্ন হাড়-গোড় পরে থাকে দ্বিধায় সে খুব ভয় পায় এদিকে আসতে। কিন্তু আজকে পাখিদের কিচিরমিচির তাকে বড্ড টানছে সেদিকে।কুড়ালটা কাঁধে রেখে গামছাটা কোমড়ে বেঁধে নিলো আজাদ। অল্প কিছুক্ষণের ব্যবধানে সকালের সূর্য উদয় হলো বলে। সামনে একটা মেয়েকে পরে থাকতে দেখে কুড়াল রেখে দৌড়ে গেলো সেদিকে। মেয়েটিকে সাপটে জড়িয়ে নাকে হাত দিলো। নাহ বেঁচে আছে। কিন্তু শরীর ক্ষত-বিক্ষত। শরীরে এমন কোনো জায়গা নেই যে ক্ষত নেই। আজাদ মেয়েটিকে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলো।
🫧🫧🫧🫧
ফজরের নামাজের মোনাজাতে দীর্ঘক্ষণ কাঁদলো মাধুরী মেয়েটা দুদিন হলো বাড়ি থেকে নেই। চিন্তায় চিন্তায় গলা দিয়ে ভাত নামছে না মাধুরীর। মধুর সামনে এককরা ঘাস দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।
—“ভোলা? ও ভোলা? বাড়ি আছো বাপ?”
মাধুরীর ডাকে সাড়া দিলো না ভোলা। মাধুরী বেরা ঠেলে বাড়ির ভেতরে গেলো„ —“ভোলা?”
—“হ্যাঁ খালা বলো?”
মাধুরী দেখলো ভোলা কলপাড়ে ডুব দিচ্ছে„ —“বাবা দোয়াত-কালি টা আছে?”
ভোলা গোসলখানা থেকে উত্তর দিলো„ —“উঠানে টেবিলে আছে চাচি আর কাগজ ঘরের ভেতরে।”
মাধুরী উঠান থেকে দোয়াত-কালি নিয়ে ঘরের ভেতর থেকে কাগজ নিয়ে এলো। ভোলা বেরিয়ে এলো„ —“খালা? তুমি ভোর সকালে? খালুকে আসতে বলবে নাকি?”
মাধুরী মাথা দোলাল। ভোলা এসে সামনে বিছানা বিছিয়ে বসলো। মাধুরীও বসলো। কাগজ-কালি ভোলার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল„ —“নে লিখ?”
ভোলা লিখতে আরম্ভ করলো। মাধুরীর পানে চেয়ে বলল„ —“বলো খালা আমি লিখছি।”
মাধুরী বলল„ —“সময় নেই তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলো। যত কাজই থাক তোমার জলদি বাড়ি এসো। বিপদ হয়েছে। বড় বিপদ।”
ভোলা চেয়ে রইলো„ —“খালা এভাবে বললে খালু ভয় পাবে। তুমি সবকথা খুলে বলো।”
মাধুরী তার আঁচল থেকে কড়ি খুলল„ —“নে। এখানে ১৭ কড়ি আছে। তোর খালুর কাছে চিরকুটটা পাঠিয়ে দিস। আর বলিস তাড়াতাড়ি আসতে।”
চলে গেলো মাধুরী। ভোলা এক হাতে চিরকুট আর অন্য হাতে কড়ি নিয়ে বসে রইলো। কিছুই তার মাথায় ঢুকলো না। মাধুরীর চোখ-মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে। মনে হচ্ছে দীর্ঘক্ষণ কেঁদেছে। ভোলা দরজার কপাট থেকে ফতুয়া গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পরলো পোস্ট অফিসের দিকে।
🫧🫧🫧🫧🫧
আজাদ বাড়ির সামনে এসে জোরে জোরে ডাকতে লাগলো„ —“সাবিনা? ও সাবিনা? আরে জলদি আসো। দেখো কারে আনচি?”
সাবিনা গোয়াল-ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো। আজাদের কোলে রক্তাক্ত মেয়েটিকে দেখে বলল„ —“কারে আনছো?”
আজাদ উঠানে মেয়েটিকে শুইয়ে দিলো„ —“চূড়ার পাশে পরে আছিলো। কাক-পক্কির ডাক শুনে যাইয়া দেখি মাইয়াডা পরে আছে।”
সাবিনা হকচকিয়ে গেলো„ —“এটা মানুষ নাও হইতে পারে? বলাতো যায় না জ্বীন-ভূত। চূড়ায় তো কান্দন রোজই শুনি। তুমি এক কাজ করো। মাইয়াডারে জঙ্গলেই রাইখা আসো।”
আজাদ রেগে গেলো„ —“এটা কি কও তুমি? মাইয়াডা মরার মতন অবস্থা আর তুমি কও ফালাইয়া আসতে। তুমি গরম পানি করো। আমি বৈদ্য ডাইকা আনি।”
আজাদ চলে গেলো বৈদ্যকে ডাকতে। সাবিনা ভয়ে ভয়ে মেয়েটার কাছে গেলো। চোখে মুখে হাত রাখলো মেয়েটা অচেতন। সুন্দর মুখ-খানায় কঞ্চির আঘাতে কেটে গেছে। হাতে বাহুতে কঞ্চি ঢুকে গেছে। সাবিনা কঞ্চিটা টেনে বের করতেই মেয়েটি নড়ে উঠল। দূরে সরে গেলো সাবিনা। ঘর থেকে মাটির পাতিল এনে চুলায় বসালো।
পানি গরম হতেই কাপড়ে ভিজে ক্ষত জায়গায় সেঁক দিচ্ছে সাবিনা। আজাদও বৈদ্যকে নিয়ে এসেছে। বৈদ্য মেয়েটিকে ভালো করে দেখলো। পায়ের তালুতে একটা কঞ্চি গেঁথে আছে সেটাকে টেনে বের করতে তালু থেকে রক্ত বের হচ্ছে। বৈদ্য পট্টি বেঁধে দিলো পায়ে। গরম পানিতে নিমপাতা ভিজিয়ে শরীর মুছিয়ে দিতে বললো সাবিনাকে। কিছু গাছের শেকড় দিয়ে গেলো বৈদ্য। বলল„ —“এগুলো পিষিয়ে খাইয়ে দিস। কচু শাক‚ লাল শাক এগুলো খাওয়া আর প্রতিদিন নিমপাতা আর গরম পানি সেঁক দিতে হবে।”
বৈদ্য চলে গেলো। আজাদ মেয়েদিকে ঘরে শুইয়ে দিলো। সাবিনা পাশে বসে নিমপাতার সেঁক দিতে লাগলো। আজাদ কিছু না খেয়েই বেরিয়ে গেলো জমিদার বাড়িতে।
—“অনেক বেলা হয়েছে হুজুর দেখলে আজকে খবর করবে?”
—“আজাদ তুই এত দেরি করে এলি যে?”
আজাদ ভয়ে ভয়ে পেছনে তাকালো। বেশ তো চুপচাপ জমিদার বাড়িতে ঢুকছিল সে। কিন্তু পেছন থেকে বাগানের পূর্ব পাশ থেকে জমিদার বাবু দেখে ফেললো আর প্রশ্ন করল। আজাদ পেছনে ফিরে ভয়ে ভয়ে বলল„ —“আসলে হুজুর আমার মাইয়াডার খুউব অসুক। তয় আইতে দেরি হলো। আপনে চিন্তা করেন না আমি সব কাম এখনি করে দিমু।”
গামছা ঝেড়ে বাগানের দিকে চলে গেলো আজাদ। কড়াত নিয়ে পাকড় গাছের দিকে গেলো। বড় পাকড় গাছটা কেটে খড়ি করতে হবে তাকে। জমিদার মনছুর বাগানের পূর্ব পাশে চেয়ার পেতে বসে আছে। সামনে তার ছেলে মামুন সাজাদ। সবাই সাজাদ বলেই ডাকে। জমিদার মনছুর এর তিন সন্তান। বড় ছেলে মামুন সাজাদ। মেঝো মেয়ে মুন্নি সারা আর ছোট ছেলে সাইর। সাজাদ বিভিন্ন কাজ-কামে শহরেই যাতায়াত করে। আজকে তার বাবার সাথে বেশ কিছু কাজের জন্য বসেছে।
কাগজগুলো উলটিয়ে ভালোভাবে পড়ে নিলো মনছুর। সাজাদ আর একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল„ —“বাবা। ভাছি মুন্নির বিয়ে দিবো কি বলো? পড়াশুনা তো করে না। গ্রামে ভালো মাস্টারও নেই। শহরে পাঠানো যাবে না। তাই বলি কি বিয়ে দিলো ভালো হয়।”
জমিদার মনছুর নাকের ডগায় চশমা ঘষে বলল„ —“মুন্নিকে বিয়ে দেওয়ার কথা বলছো। তোমার মা তো অসুস্থ। মুন্নি চলে গেলে আমাদের কি হবে। তাই বলি কি তুমি আগে বিয়ে করো।”
সাজাদ কিছুটা আপত্তি জানালো„ —“বাবা আমি এখনি এত তাড়াতাড়ি?”
মনছুর হুকুম করলো„ —“তুমি বিয়ের জন্য রাজি হও। আমি হপ্তা খানেকেই বিয়ে করাবো। তার পরের হপ্তা মুন্নির বিয়া।”
সাজাদ সম্মতি জানালো। মনছুর খুশি হয়ে সবাইকে বিষয়টা জানালো। গ্রামে ঢোল পিটিয়ে দেওয়া হলো„ —“শুনুন শুনুন শুনুন। জমিদার মনছুর হুজুরের বড় ছেলের বিয়ে দেওয়ার জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে। আপনাদের মাঝে আগ্রহী পিতা-মাতা’রা কাল সকালে জমিদার বাড়িতে দেখা করবেন?”
পরের দিন লম্বা লাইন জমিদার বাড়িতে। জমিদার বাড়ির বাগান ঘেড়াও করা মানুষজন। আজাদ আজকে কাজে আসে নি। সে ছোট হুজুর সাইরের সাঝে গিয়েছে গ্রাম ঘুরতে। সাইর বরাবরই জমিদার বাড়ি থেকে বের হয়না। কিন্ত আজ পুরো গ্রাম ঘুরে দেখতে বের হয়েছে।
সকাল থেকে দুপুর পেরিয়ে গেলো। কোনো মেয়েকেই পছন্দ করতে পারলো না সাজাদ। রাগ করে নিজের ঘরে গেলো সে। তার বাবা মনছুর এখন বসে বসে মেয়ে দেখছে। তারও কোনো মেয়ে পছন্দ হলো না। সন্ধ্যা হয়েছে। জমিদার বাড়ি ছেড়ে সবাই চলে গেছে কিন্তু সাইর এখনো বাড়িতে আসেনি। সাজাদ কিছু একটা নিতে সাইরের ঘরে আসলো। সাইরকে দেখতে না পেয়ে ঘরেই বসলো সাজাদ। এদিকে সেদিকে দেখতে দেখতে টেবিলের উপরে একটা বড়সড় কাগজ দেখলো সাজাদ। উঠে গিয়ে কাগজটা হাতে নিলো। এতো একটা মেয়ের ছবি। সাজাদ বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখলো ছবিটি। মায়াবী‚ হৃদয়হরণী এক রমনী। চোখ ধাদিয়ে গেলো সাজাদের। কিন্তু নিচে লেখাটি দেখে চুপসে গেলো সে। ‘যে কোনো কিছুর বিনিময়ে তোমাকে আমার চাই’ই চাই। তুমি যেখানেই থাকো না কেন মেয়ে। আমি তোমাকে ঠিকই খুঁজে বের করবো।’ সাজাদ ভ্রু – কুঁচকালো। সাইর কি মেয়েটিকে চিনে? তার সাথে কি এই মেয়ের সম্পর্ক আছে? সাজাদ যতদুর জানে সাইর ঘর থেকেই বের হয় না। দিনের আলোয় সে অসুস্থ হয়ে পরে৷ তাহলে মেয়েটিকে কোথায় দেখেছে সে। আর এত সুন্দরই বা ছবি কিভাবে আকলো সাইর৷ তার অঙ্কন দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটি হয়তো তার সম্মুখে বসে ছিল।
—“ভাইয়া তুমি এ ঘরে?”
সাইরের গলা শুনে হকচকিয়ে গেল সাজাদ। পেছনে তাকিয়ে সাইরকে বুকের সাথে চেপে কোলাকোলি করলো। মুচকি হেসে বলল„ —“কোথায় ছিলিস সারাদিন?”
সাইর মাথা চুলকালো„ —“বাইরে গেছিলাম ভাইয়া। অনেকদিন হলো গ্রামটা ঘুরে দেখিনা তাই আরকি।”
শব্দ করে হাসলো সাজাদ„ —“তুই আর ঘুরাঘুরি।”
আবারও হাসতে লাগলো সাজাদ। সাইর হাবলার মতো প্রশ্ন করলো„ —“হাসছো কেন ভাইয়া?”
সাজাদ ছবিটা সামনে ধরে বলল„ —“বল যে মেয়েটিকে খুঁজতে গিয়েছিলিস?”
—“আসলে ভাইয়া?”
সাজাদ হাসলো„ —“চিন্তা করিস না৷ মুন্নির বিয়ের দুদিন পরেই তোরও বিয়ের কথা বাবাকে বলবো।”
হাসতে হাসতে চলে গেলো সাজাদ। সাইর ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিলো। অনেক খুঁজেছে সে‚ অনেক ঘুরেছে সে‚ তবুও মেয়েটিকে খুঁজে পায় নি সে। কোথায় খুঁজবে সে। যদি সত্যি সত্যি মেয়েটি তার মৃত্যুর কারণ হয়? না এ হতে পারে না। মেয়েটিকে সে কিছুতেই বাঁচতে দিবে না। আগামী পূর্ণিমার আগেই তাকে খুঁজে বলী দিতে হবে।
🫧🫧🫧🫧🫧
আজ চারদিন পরে সুস্থ হলো মেয়েটি। শরীর সেরে উঠলেও শরীরে থাকা দাগগুলো কিছুতেই সেরে উঠে নি। গলায় তিনটে দাগ গাঢ় হয়ে রয়ে গেছে। বাম গালে কানের কাছে কঞ্চির একটা দাগ রয়ে গেলো আজীবনের জন্য। সাবিনা ভাত রেখে আনলো।
সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল„ —“নে মা। খেয়ে নে?”
মেয়েটি কিছু না বলে খেয়ে লাগলো। সাবিনা পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল„ —“নাম কি তোর?”
মেয়েটি সামনে তাকালো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল„ —“তুলি। আমার নাম তুলি?”
সাবিনা এগিয়ে এলো„ —“বাড়ি কোথায় মা তোর? বাড়িতে কে কে আছে?”
খাওয়া থামালো তুলি। মাটির দিকে তাকিয়ে বলল„ —“আমার বাড়ি-ঘর নেই। আমার এ দুনিয়ায় কেউ নেই।”
আজাদ ঘরের ভেতরে এলো„ —“তুমি মাইয়াডারে খাইতে দাও। আজ থেইকা আমরা দুজনই ওর সব। তুই আর একা নস মা?”
সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ🕊️
[ ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। রিচেক দিই নি সুতরাং ভুলগুলো ধরিয়ে দিবেন। পর্বটি কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু? ভালো থাকুন‚ সুস্থ থাকুন ধন্যবাদ ]

