#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ
৪.
আজ পাঁচদিন পরে তুলি সম্পন্ন সুস্থ। ক্ষতগুলো পুরোপুরি শুকায়নি তবে হাঁটা-চলা করতে কোনো সমস্যা নেই তার। তুলি যাতে কোথাও না যায়‚ সে কথা সকালে আজাদ বলে গেছে জমিদার বাড়িতে যাবার আগে। সাবিনা ভাত আর লাল-শাঁক ভেঁজেছে। তুলি সকালে সেগুলো খেয়ে সাবিনার সাথে জঙ্গলে গেছে খড়ি আনতে। খড়ি কুড়িয়ে বোঝা করে মাথায় তুলে সাবিনা আর তুলি বাড়িতে আনছে। সেই খড়ি কখনো আজাদ হাটে বেচতে নিয়ে যায় নয়তো রান্নার কাজে ব্যবহার হয়।
🫧🫧🫧🫧🫧
আজ সাজাদের বিয়ের জন্য বড়লোক বাড়ি থেকে সম্মন্ধ এসেছে। বড়লোক বাবা একমাত্র মেয়ে সহিনী। সাজাদ যথেষ্ট শিক্ষিত তাই হয়তো রঞ্জু মোল্লা এ সম্মন্ধ এনেছে। নয়তো শহর ছেড়ে গ্রামে এসে মেয়েকে তিনি বিয়ে দিতে আসতেন না। আর সাজাদ তো সব সময় শহরেই থাকে। তাহলে আর সমস্যা কই? রঞ্জু মোল্লা আর কথা বাড়ালেন না। তার পরিবার পরিজন দেখে সবকিছু ভালো লেগেছে। সহিনীও এসেছে তার বাবা রঞ্জুর সাথে। জমিদার বাড়ি চারপাশে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে কোনো খুঁত পেলো না তারা। অবশ্য পাওয়ারও কোনো কথা নয়। কেননা জমিদার বাড়ির সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর সৌন্দর্য বজায় রাখে এই বাড়ির চাকর বাকরেরা।
আজ জমিদার বাড়িতে বেশ আনন্দ উৎসব। সাজাদের বাগদান আজকে। রঞ্জু মোল্লা একেবারে বাগদান শেষেই শহরে ফিরবেন। শহর থেকে ডালা ডালা হরেক রকমের জিনিসপত্র। আজকে সাবিনাও জমিদার বাড়িতে গেছে কাজ করতে। তুলি আজাদের বাড়িতে আছে ১২দিন হলো। তার মায়ের কথা ভীষণ মনে পরছে। যদি মধু আর মায়ের সাথে একটু দেখা করতে পারতো? কিন্তু যদি ঐ লোকটা তাকে না পেয়ে তার বাবা-মায়ের কিছু করে? না আপাতত গোপনে থাকাই উচিত। সাবিনা সকাল থেকে জমিদার বাড়িতে আছে। একা একা বাড়িতে ভালো লাগছে না তুলি। সে জমিদার বাড়িতেও যেতে পারবে না। কেননা আজাদ আর সাবিনা সেখানে আছে। আর ধরা পরে গেলে সমস্যা হতে পারে। শাড়ির আঁচলে আঙুল পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে এদিক থেকে ওদিক পায়চারি করছে তুলি। কি করবে ভাবছে। দুপুরে কচু শাঁকের ভর্তা আর ভাত খেয়েছে। বাড়িতে থাকলে মাধুরী হয়তো হাসের ডিম ভেঁজে দিতো। কিন্তু তা তো আর হচ্ছে না। তুলি মনস্থ করলো সে বাড়ি যাবে। বাঁশের বেড়া পার হতেই সাবিনা ডাকল„ —“ও তুলি? কই যাও মা?”
তুলি ধরা পরা চোরের মতো আমতা আমতা করলো„ —“আসলে খালা। বাইরে যাইতাম। একা একা বাড়িতে আর ভালো লাগে না।”
সাবিনা হাসলো„ —“লও মা খাবারডি খাইয়া লও তোমারে নিয়া জমিদার বাড়িতে যাওন লাগবো। আজ মালিকের বড় ছেলে বাগদান। কাজের মানুষ লাগবো। তুই একটু করলে দুদিন ভালো মতো খাইতে পারুম।”
এ যে মেঘ না চাইতেই জল। তুলি হেঁসে বলল„ —“হ খালা আমিও যাবো।”
সাবিনা তুলির মাথায় হাত বুলালো„ —“আয় আগে খাইয়া ল।”
দুজনের বারান্দায় বসে খেতে লাগলো। আলু‚ মটরশুঁটি‚ পালংশাক দিয়ে খিচুরি রান্না হয়েছে জমিদার বাড়িতে। সেগুলোই এনেছে সাবিনা। দুজনে মিলে পেট ভরে খেয়ে নিলো। জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো দুজনেই। জঙ্গল পার হতেই তুলি প্রশ্ন করল„ —“আচ্ছা খালা। চূড়ায় কি হয়? না মানে চূড়া কাইটা সমান করলে আমাদের ভালা হতো?”
সাবিনা শক্ত করে তুলির হাত ধরল„ —“জানি না মা। আর জানতেও চাই না। তয় পূর্ণিমার রাতে এখানে ভুতে ভর করে। মাইয়াগো কান্দনের শব্দ হুনা যায়।”
তুলির সেদিনের কথা মনে পরলো। হিসেব মতো আর ১৮দিন পরেই পূর্ণিমা। বুকের ভেতরটা জ্বালাপোড়া শুরু করে দিলো তুলির। মুখে স্মিত হেসে বলল„ —“আচ্ছা খালা তুমি কি কখনো চূড়ায় গেছো?”
সাবিনা ডান হাত দিয়ে দুই গালে পরপর চাপড়াইতে চাপড়াইতে বলল„ —“তবা‚ তবা। ভয়ে ঘর থেইকা বার হইনা। তোর খালুই তো হেই রাইতে সুরা-দুরুদ পাঠ করে।”
তুলি আর কিছু বলল না। যে করেই হোক তাকে চূড়ায় আবারও যেতেই হবে। হয়তো আগামী পূর্ণিমায় সে অথবা আরও অন্য মেয়েদের জীবন বলী হবে। তবে সেদিন লোকটা তাকে দেখেছিল। নিশ্চয়ই এতদিন তাকে খুঁজেছে। পেলে তো জীবিত রাখবে না। যে করেই হোক তাকে বাঁচতেই হবে আর বাকিদেরও বাঁচাতে হবে।
—“ঐ দেখ সামনে জমিদার বাড়ি।”
তুলি সামনে তাকিয়ে দাড়িয়ে পরলো। সেদিন শশি জমিদার বাড়ির কথা বলেছিল। বলেছিল জমিদারের ছেলে তাকে ডেকেছে। যদি সেদিন চূড়ায় দেখা লোকটা এই বাড়িতেই থাকে তাহলে তাকে দেখে নিশ্চয়ই চিন্তে পারবে। নাহ এভাবে যাওয়া ঠিক হবে না। তুলি এদিকে সেদিকে তাকালো সাবিনা জিজ্ঞেস করলো„ —“কি খুঁজোস তুই?”
তুলি এক গাল হেসে বলল„ —“আমি তো কোনো দিন বেশি মানষের লগে মিশি নি তাই এক কাম করি খালা।”
সাবিনা মুখ তুলে বলল„ —“কি কাম করবি তুই? ভেতরে কাম আছেই?”
তুলি প্রাচীরের ধার থেকে চুলার কালি তুলে মুখে ভালো করে লেপ্টে নিলো। সাবিনার সামনে এসে হেঁসে বলল„ —“খালা এবার ঠিক আছে না?”
ভুতের মতো কালো মুখখানায় সাদা ফকফকা দাঁতকপাটি দেখে ভয় পেলো সাবিনা। জোরে চিৎকার করল„ —“ও মাগো ভুত।”
তুলি সাবিনাকে ধরলো„ —“আরে খালা৷ আমি তুলি। তোমার মেয়ে তুলি।”
সাবিনা বুকে হাত রেখে জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিলো„ —“পেত্নীর লাহান সাজছোস ক্যা? কামে দেরি হইতাছে আয়? ভেতরে গিয়া মুখ ধইয়াবি?”
তুলিকে আর কিছু বলতে না দিয়েই হাত ধরে টেনে টেনে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলো। সদর ঘরে আসতেই জমিদার গিন্নীর সাথে দেখা হলো সাবিনা। জমিদার গিন্নী পেছনে তুলির কালো মুখখানা দেখে বলল„ —“কই সাবু? এ কেডা? আর মুখে এতো কালি ক্যা?”
সাবিনা মাথা নিচু করলো„ —“আসলে গিন্নীমা হেই আমার মাইয়া। মানষেরে ভয় পায় তাই মুখে কালি দিছে যাতে লোক জন হেরে দেইখা ভয় পায়।”
জমিদার গিন্নী নাক ছিটকালো„ —“বাড়িতে মেহমান আইছে। কোনো ভুল করলে তোগো মা মেয়েরে কাম থেইকা বাইর কইরা দিতাম। যা হাত মুখ ধুয়ে আমার লগে কামে আইতে ক।”
সাবিনা খপ করে আবারও তুলির হাতটা ধরলো। পাশ কাটিয়ে দ্রুত টান দিলো তুলিকে। ওমনি কারও সাথে ধাক্কা লেগে হুমড়ি খেয়ে পরে গেলো দুজনেই। সাইর চোখ খুলে পেত্নীকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলো„ —“মা গো৷ আমাদের বাড়িতে পেত্নী কেন? বাঁচাও আমার ঘাড় মটকে দেবে?”
জমিদার গিন্নী পেছনে ফিরে সাইর আর তুলিকে পরে থাকতে দেখে বলল„ —“ঐ মাইয়া উঠ। তোরে না কইলাম আগে মুখ ধুয়ে আয়।”
তুলি উঠে দাড়ালো। সাইরও উঠলো। মাজায় হাত রেখে শটান হয়ে দাঁড়ালো„ —“এসব কি কাজের লোক আনো মা? পেত্নীর থেকেও কালো। এদের দেখেই তো তোমার ছেলের বিয়ে ভেঙে যাবে।”
সাইরের কথাটা জমিদার গিন্নীর কানে যেতেই রেগে চেতে উঠলেন তিনি। তুলির চুলের মুঠি চেপে ধরে বলল„ —“আসতে না আসতেই এমন অঘটন যদি ঘটাস তুই তাহলে তোকে খুন করে ফেলবো।”
সাবিনা করুন সুরে মিনতি করলো„ —“গিন্নী মা। আর এমন হবে না। এবারের মতো মাফ করে দিন।”
তুলিকে ছেড়ে দিতেই সাবিনা তাকে নিয়ে কলপারে গেলো। তুলি যেতে যেতে সাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। সাবিনা বিরবিরিয়ে বলছে„ —“তুই কি ডোবাবি মা? গিন্নী মা রাগ করলে কাউরে সহ্য করবার পারে না কিন্তু হিসাবে হেই অনেক ভালা।”
তুলি কোনো কথাই বলছে না। তার কাছে এখন সবকিছু ঘোলাটে লাগছে। সেদিন শশি যদি জমিদারের ছেলের কথাই বলে তাহলে এই ছেলেটা কে? যাকে আমি চূড়ায় দেখেছিলাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে এই ছেলেটিই সেদিনের ছেলের।
চোখে-মুখে পানির ঝাপ্টা দিতেই ভাবনারা পালিয়ে গেলো তুলির। মুখ ভেংচে বলল„ —“আমি ধুয়ে নিচ্ছি তুমি যাও।”
সাবিনা চলে গেলো। তুলি পানি দিয়ে চোখ-মুখ ধুলো তবুও কালি ঠিতমতো উঠছে না। হঠাৎ সাইর পেছন থেকে বলল„ —“তোমার কি চোখ নেই? পাশে সাবান রাখা আছে দেখতে পাচ্ছো না?”
তুলি উপুড় হয়ে চোখ-মুখ ধুচ্ছিল। আঁড়চোখে দেখলো সাইরকে। সে তুলির দিকেই তাকিয়ে আছে। নিজেকে আড়াল করতে মাথার কাপড়টা আর একটু টেনে নিলো তুলি। তা দেখে সাইর রাগান্বিত হলো„ —“বাঙালির মূর্খতার শেষ নাই। মাথায় কাপড় টেনে মুখ ঢাকবে আর কাপড় সড়িয়ে পেট দেখাবে।”
তুলি ছটফট পেটের দিকে কাপড় টেনে নিলো। সাবান মুখে মেখে কলের ডাট খুঁজতে লাগলো পেয়েও গেলো সহসাই কিন্তু বিপত্তি ঘটলো সে কল ঠাসতে পারছে না। হাত পিচ্ছিল হয়ে আছে সাবানে। চোখ খুলে তাকাতেই পারছে না। নাহ এবার তাকে কারও সাহায্য নিতে হবে। সোজা দাঁড়ালো তুলি„ —“শুনছেন?”
কোনো উত্তর এলো না। তুলি আবারও ডাকলো„ —“কেউ আছেন?”
—“জ্বি।”
ছোট বাচ্চা আওয়াজ সে আর কি সাহায্য করবে তুলিকে। নিজেই তো কল ঠাসতে পারবে না। তুলি বলল„ —“দেখো তো আসে-পাশে কেউ আছে কি না। আমি কল ঠাসতে পারছি না।”
পাশ দিয়ে জমিদার গিন্নী যাচ্ছিল। তুলির কথা শুনে রাগে চোয়ালদ্বয় শক্ত করল„ —“নবাবজাদী এসেছেন বাড়িতে। কাজ করতে নয় আমাদের দিয়ে কাজ করাতে।”
তুলি কথাগুলো শুনলো। খুব খারাপ লাগলো তার। অন্যের বাড়িতে কাজ করার মনে হয় এই প্রতিদান। তুলির মা ও তো গোলামের বাড়িতে কাজ করে তাকে খেতে দেয়। সে তো দিব্যি মধুকে নিয়ে সারাদিন ঘুরেফিরে এসে ভাত খেতে বসে। এক থাল ভাতের কি অনেক মুল্য? গাল বেয়ে অশ্রু নামলো তুলির। সাবানের ফেনায় আর কতক্ষণ থাকবে সে। হাত শাড়িতে মুছে কল ঠাসতে নিতেই হাত পিছলে কলের ডাট মাথায় লাগলো তুলির।
—“মাাাাাাাাাাাাাা।”
সাবিনা এগিয়ে এলো„ —“কি হয়েছে মা?”
তুলি মাথা চেপে ধরলো„ —“কলের ডাট লেগেছে খালা।”
সাবিনা তুলিকে পিরীতে বসালো। মগে পানি নিয়ে চোখ-মুখ ধুয়ে দিলো। অনুতপ্তের সুরে বলল„ —“তখনই বললাম পারবি না‚ পারবি না। কিন্তু কে শুনে কার কথা।”
তুলি মুখ ধুয়ে সম্পন্ন পরিষ্কার হয়েছে এখন। শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘোমটা টেনে বেরিয়ে পরলো সাবিনার সাথে কাজ করতে। প্রতিটি ঘরের কাজ বুঝিয়ে দিলো সাবিনা। কোথায় কি আছে‚ কিভাবে কি করবে প্রায় সব কাজই বুঝিয়ে দিলো সাবিনা। তুলিও বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলো সব কাজের কথা। সাবিনার থেকে খবরও নিয়েছে যে জমিদার তিন ছেলে-মেয়ে। কোন সদস্য কেমন? তারা কোন কাজে রাগ করে সবকিছু। এটাও জেনে নিলো সে আজ বড় ছেলে সাজাদের বিয়ের জন্যই এত আয়োজন। তুলি মুখ ঢেকে সব কাজই করছে। সাইর বার কয়েক উঁকি দিয়েছে কিন্তু কাজ হয় নি।
এক ডালা ফুল হাতে একটা ঘরে আসলো সাবিনা আর তুলি। এই ঘরটাতে সাজাতে হবে। তুলি বেশ অবাক হলো দিনের বেলায়ও ঘরটাতে আলোর কোনো বেগ নেই। যেন অন্ধকার ঘরটায় একটা মানানসই। সামনে যেতেই টেবিনের কোণে পা লাগলো তুলির।
—“আউচ।”
সাবিনা পেছনে তাকালো। তুলির হাতে থাকার ডালার ফুলগুলো সব পরে গেলো এদিকে সেদিক। সাবিনা বেশ বিরক্ত হলো„ —“দেখে কাম করতে পারোস ত?”
তুলি রেগেমেগে বলল„ —“জমিদারের ঘরেই যদি আলো না থাহে তাইলে থাকবো কার ঘরে? আর এনে দেখে কেমনে কাজ করুম খালা?”
বাইরে থেকে ডাক আসলো„ —“সাবু? রান্নাঘরে আয় অনেক কাজ বাকি আছে?”
সাবিনা ফুলের ডালাটা রেখে বলল„ —“তুই ঘরটা সাজাইয়ে দে। আমি আইতাছি।”
সাবিনা যেন দৌড়ে পালিয়ে গেলো। তুলি উঠে দাড়ালো। হাতড়ে হাতড়ে ঘরের জানালা পেলো সে। ছিটকিনি খুলতেই বাইরের দক্ষিণা বাতাস তড়পাতে তড়পাতে ভেতরে প্রবেশ করলো। দুপুরে সূর্যের তীক্ষ্ণ আলোয় পুরো ঘর আলোকিত হলো। তুলি প্রাণ খুলে একটা নিশ্বাস ছাড়লো। তার কাছে এখন ঘরটা ভালো লাগছে। ঘরটন আলো-বাতাস পেয়ে মনো হলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। শাড়ির আঁচল মাথা থেকে নামিয়ে কোমড়ে পেঁচিয়ে নিলো সে। পেছনে তাকাতেই আশ্চর্য হলো। কোমড়ে হাত রেখে বলল„ —“এই ঘরে তো দেহি একটা চৌকি আর টেবিল ছাড়া কিছুই নাই।”
পাশ থেকে ঝাটা নিয়ে পুরো ঘরটাকে ঝাড়লো তুলি। নাকে কাপড় চেপে ধরল„ —“ইস কি ধুলা। গরুও এহানে ঘুমাইতে আইবো না। জানি না কোন গন্ডার এনে ঘুমায়।”
পুরো ঘরটাকে ঝাড়লো তুলি। তারপর ফুলগুলো সাজিয়ে সুতা দিয়ে মালা গাঁথলো। জালানার উপরে মালা লাগিয়ে দিতেই বাইরে বাগান থেকে দেখে ফেললো সাইর। দুতলায় তার ঘর। যে জালানা সে গত তিন বছর যাবৎ বন্ধ করে রেখেছে সে জালানা হঠাৎই খোলা। তাও আবার একটা কাজের মেয়ে খুলেছে তার ঘরের জালানা। রেগে চেয়ার ছেড়ে নিজ ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করলো সাইর।
ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পরলো সে। কেননা দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ধাক্কা দিচ্ছে কিন্তু দরজা নড়ে আবার একই জায়গায় এসে থাকছে। কাঠের তল্লার দুই কপাট যদি জোড়ে ধাক্কাতে খুলে যায় তখন। কিন্তু ভেতরে তো তার মায়াবী শক্তি আছে যা দিনের আলোয় নষ্ট হতে পারে। জোড়ে ধাক্কা দিলো দরজায় ওমনি টেবিল থেকে পরে গেলো তুলি। সামনে তুলিকে পরতে দেখে হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললো সাইর। শাড়ির আঁচলে মুখ বাঁধা। সাইরের কোলে পরতেই বাঁধন হালকা হয়ে গেলো। এলোমেলো চুলগুলো চোখে-মুখে উপচে পরলো। তুলি বেশ ভয় পেয়ে গেলো। যদি সাইর তার চেহারা দেখে নেয় তাহলে খুব খারাপ হবে তার সাথে। এতটায় ভয় পেলো যে নড়াচড়া করার কথাটাও মাথা থেকে বেরিয়ে গেলো।
—“সাইর।”
ডাকতে ডাকতে সাইরের ঘরের দিকে এলো সাজাদ। সাইরের কোলে তুলিকে দেখে অকপটে বলল„ —“সরি সরি সরি। আমি মনে হয় ভুল সময় এসেছে।”
সাইর তুলিকে নামিয়ে দিলো। সাজাদের উদ্দেশ্যে বলল„ —“ভাইয়া দাঁড়াও। কি বলবে বলো?”
সাজাদ হাসলো„ —“না পরে বলবো তুই?”
সাজাদ তুলির দিকে তাকাতেই সাইর আরও রেগে গেলো। সে তো মেয়েটিকে শাস্তি দিতে এসেছিলো তার ঘরের জালানা খোলার জন্য তাহলে দিবে না কেন? রাগান্বিত চোখে তাকালো তুলির দিকে„ —“এই মেয়ে তোমাকে আমার ঘরে আসতে কে বলেছে? আমার ঘরে এসেছো কেন? আর আমার ঘরে জালানা কেন খুলেছে?”
তুলি কোনো উত্তর দিলো না। সাইর আরও রেগে গেলো। তুলির বাহু চেপে ধরে বলল„ —“কি সমস্যা তোমার? কথা বলতে পারো না? বোবা তুমি?”
তুলি মাথা ঝাকালো। সাজাদ হাসলো„ —“বকছিস কেন মেয়েটাকে? নতুন কাজে এসেছে ভালো করে বুঝিয়ে দিলেই তো হয়। আর সামান্য জালানায় তো খুলেছে ও। যদি বকতে হয় মাকে গিয়ে বকে আয়। মাইতো পাঠিয়েছে ওকে।”
সাইর রেগে মেগে ঘরের ভেতরে গেলো„ —“বুঝি না। এসব বোবা‚ কানা‚ লেংড়া কাজের লোক কোথা থেকে নিয়ে আসে মা।”
সাজাদ হাসলো। তা দেখে সাইর আরও রেগে গেলো। তুলি ঠায় মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকতে দেখে সাইর বলল„ —“এখনো দাড়িয়ে আছো কেন? যাও এখান থেকে। আমার ঘর সাজাতে হবে না আর ভুলেও আমার ঘরে আসবে না।”
তুলি ফুলের ডালা তুলে বেরিয়ে আসলো। সাজাদ প্রশ্ন করলো„ —“ও এমনই কিছু মনে করো না তুমি। এগুলো আমাকে দিয়ে তুমি রান্নাঘরে যাও।”
তুলি মাথা নেড়ে বলল„ —“আমি নিয়ে যেতে পারো আপনি চলুন।”
সাইর হকচকিয়ে গেলো। একটু আগে যে মেয়েটাকে সে এত এত গালাগাল করলো তবুও কোনো কথা বলল না আর সেই মেয়েই কি না তার ভাইয়ের সাথে কথা বললো একটু আগে? নাকি সে ভুল শুনলো। বাইরে এসে সাজাদকে বলল„ —“ভাইয়া? মেয়েটি কি কথা বলতে পারে?”
সাজাদ মাথা নাড়ালো„ —“হুম পারে তবে তোদের সাথে বলবে না?”
সাইর ভ্রু- কুঁচকালো„ —“আমাদের সাথে?”
—“হুম তোদের সাথে। তুই‚ মা আর মুন্নি। তোরা একটু কথায় রেগে যাস এজন্য। কেননা রাগের সময় যদি অন্যপ্রান্তের লোকটাও তর্ক করে তাহলে ঝামেলা হয়। আর মেয়েটি ঝামেলা চায় না তাই তোদের বলা গালাগালিতে কোনো জবাব দেয় না।”
সাইর বিস্মিত হলো। একটা মানুষ এতটা গালিগালাজ কিভাবে হজম করতে পারে তা তুলিকে না দেখলে বুঝতো না সে„ —“সেই সকাল থেকেই মা‚ আমি‚ মুন্নি কতই না বকাঝকা করেছি তবুও কিচ্ছু বলল না। ভাবা যায়?”
—“তুই বসে বসে ভাব। আমি আসছি কাজ আছে।”
সাজাদ চলে গেলো। সাইর ঘরে ঢুকে পুরো ঘরটাকে দেখলো। সূর্যের আলো আর দক্ষিণা বাতাসে ঘরটা প্রানবন্ত হয়ে উঠেছে। জালানায় লাগানো ফুলের সালা বাতাসের তোপে নড়াচড়া করছে। দরাার উপরে লাগলো মালাটা একদিকে হেলে আছে। পুরো ঘরটা আজকে পরিষ্কার। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সাইর। পরপরই মায়াবী শক্তির কথা মনে হতেই দ্রুত উঠে জালানা লাগিয়ে দিলো। সামনে বিছানায় এসে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কিছু দোয়া পরলো। হাতের মুষ্টি ফু দিতেই ধোঁয়া ছড়িউে পরলো। ধোঁয়ার মাঝে আয়নার প্রতিবিম্ব হলো। স্পষ্ট দেখা গেলো তুলিকে। কখন কিভাবে এ গর পরিষ্কার করছে সে। কিন্তু আশ্চর্য তুলির মুখ দেখতে পাচ্ছে না সাইর। রাগে পিন ছুঁড়ে মারলো আয়নায়। আয়না ভেঙে চূড়মাড় হয়ে পরে রইলো এদিকে সেদিকে।
সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ 🕊️
[ ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন! আজকের পর্বটা কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু? ভালো থাকুন‚ সুস্থ থাকুন‚ ধন্যবাদ ]

