চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড় লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ ১৮.

0
30

#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ

১৮.
রাত অনেক গভীর হয়েছে। চারপাশে গাঢ় নীরবতা নেমেছে। অদূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাকছে। রাতের সুনসান নীরবতায় সবকিছু কানে ভাসছে তুলির।

জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে তাদের ঘরের মেঝেতে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে তুলি। কিছুতেই ঘুম আসছে না তার। তার বুকের ভেতর এক অজানা ভয় আর কৌতূহল কাজ করছে। পাশে শুয়ে আছে সাইর। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে বুঝা গেলো যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তুলি ধীরে ধীরে চোখ খুললো। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে নিশ্চিত হলো যে সাইর সত্যিই গভীর ঘুম আছে।

ধীরে ধীরে উঠে বসলো তুলি। খুব সাবধানে পা নামালো মাটিতে। একবার তাকালো সাইরের দিকে। লোকটা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। পা টিপে টিপে চৌকির পাশে গেলো। চৌকির নিচে হাতড়ে হাতড়ে বইটা খুঁজতে লাগলো। অবশেষে পেয়েও গেলো। হাতে তুলে পুস্তকটা খুলতেই আবারও সেই আলো। সেই অদ্ভুত ঝলমলে আলো ছড়িয়ে পড়লো ঘরে। মুহুর্তেই পুরো ঘর আলোকিত হলো। তুলির বুক ধড়ফড় করতে লাগলো। যদি সাইর টের পেয়ে যায়। তবুও সাহস করে পুস্তকটা খুলল সে। চৌকিতে বসে পৃষ্ঠা উল্টালো। এবার লেখাগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে আছে। যেন জীবন্ত মানুষের তাজা রক্ত দিয়ে লেখা।

তুলি পড়তে শুরু করলো„ —“নেকড়ের দেহ হারানোর পর অর্কা বুঝতে পারলো, শুধুমাত্র আত্মা দিয়ে সে কিছুই করতে পারবে না। তার প্রয়োজন শক্তিশালী মানবদেহ। যা তাকে যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখবে।”

তুলির নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো„ —“তাই সে খুঁজতে লাগলো এমন এক রক্তধারা‚ এমন এক বংশ‚ যার মধ্যে লুকিয়ে আছে অদ্ভুত শক্তি। বহু বছর পরে সে খুঁজে পেল সেই রক্তধারা একটি বংশ যার মধ্যে প্রবেশ করলে সে নিজেকে আরও শক্তিশালী করতে পারবে।”

তুলির হাত কেঁপে উঠলো। না চাইতেও সে বারবার সাইরের দিকে তাকাচ্ছে। যদি এখনিই ঘুম ভেঙে যায় তার। তখন? তখন কি করবে সে? সব ভাবনা রেখে আবার পড়তে শুরু করলো তুলি„ —“যার শরীরে থাকবে সুরক্ষার শক্তি। যে শক্তি তাকে অমর না করলেও মৃত্যুর হাত থেকে বারবার ফিরিয়ে আনতে পারে। খুঁজতে খুজতে তার দেখা হলো জমিদার মামুনের সাথে। সাইরের বাবা। যে ছিল অত্যন্ত লোভী মন মানসিকতার মানুষ। সে চূর্ণচূড়ায় পূজা করতো বিভিন্ন হিন্দু ধর্মের লোকদের নিয়ে। বিভিন্ন পন্ডিত আর পুরোহিত নিয়ে সে জোগ্য করতো।”

তুলির চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। সাইরের বাবা মুসলিম হয়েও হিন্দুদের সহযোগী ছিল। ভাবতেই শরীর গুলিয়ে এলো তুলির। হঠাৎই জানালার পাল্লা খুলে হুড়মুড়িয়ে বাতাসেরা ভেতরে ঢুকলো। বইয়ের সব আলো নিভে গেলো।

তুলি দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলো কিন্তু কিছুই নেই। পরের পৃষ্ঠাগুলো পরপর উল্টিয়ে গেলো তুলি কিন্তু কোথাও কিছুই নেই।

ঠিক তখনই পেছন থেকে সাইরের কন্ঠ ভেসে এলো„ —“কি খুঁজছো?”

সাইরের গলা শুনে জমে গেলো তুলি। ভয়ে ভয়ে পেছনে ফিরলো সে। সাইর দাঁড়িয়ে আছে। দুই হাত কোমড়ে রেখে ভ্রু উঁচিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সাইরের ভয়ে তুলির হাত থেকে পুস্তকটা পড়ে গেলো মাটিতে।

তুলি আমতা আমতা করে বলল„ —“আ আমি। ক কই আ আমি কিছু না তো।”

সাইর ধীর পায়ে এগিয়ে এলো তুলির দিকে„ —“মিথ্যে বলতে শিখে গেছো?”

তুলি পিছু হটতে লাগলো„ —“না আসলে আমি শুধু ঐ”

সাইর নিচু হয়ে পুস্তকটা তুলে নিলো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো বইটার দিকে। তারপর ধীর গলায় বলল„ —“এটা তোমার পড়ার কথা ছিল না।”

তুলির গলা শুকিয়ে এলো„ —“এতে যা লেখা আছে সেগুলো কি সব সত্যি?”

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো সাইর। তারপর মাথা তুলে বলল„ —“হ্যাঁ সব সত্যি।”

তুলি স্তব্ধ হয়ে রইলো। সাইর পুস্তকটা আবারও আলমারিতে রেখে দিলো। তুলি পেছন থেকে প্রশ্ন করলো„ —“পরের লেখাগুলো পড়তে দিলেন না কেন?”

সাইর তাকালো তুলির দিকে„ —“তুমি পুস্তকটা পড়লে আমাকে ভুল বুঝবে।”

—“আপনাকে তো আমি বিশ্বাসই করি না। তাহলে ভুল বুঝবো কেন?”

সাইর রাগান্বিত চোখে তাকালো তুলির দিকে„ —“তুমি ভুল যাচ্ছো যে‚ আমি তোমার স্বামী। তোমার উচিত মন-প্রাণ দিয়ে আমাকে বিশ্বাস করা।”

তুলি ভ্রু উঁচিয়ে বলল„ —“যদি বিশ্বাস না করি তাহলে কি করবেন?”

সাইর একটানে তুলিকে নিজের সাথে চেপে ধরলো। তুলির কানের কাছে মুখ এনে বিরবিরিয়ে বলল„ —“বিশ্বাস করা না করা তোমার বিষয়। কিন্তু আমি যা করবো তাতে তুমি নিজেকেও সামলাতে পারবে না। আমি কিন্তু খুউউব খারাপ।”

সাইরকে ধাক্কা মারলো তুলি। কিন্তু এতে কোনো লাভ হলো না। সাইর আরও আড়ষ্ট হলো তুলির সাথে। তুলি কটমটিয়ে বলল„ —“আমি জানি আপনি খারাপ। এটা আর বলতে হবে না আমাকে।”

সাইর উচ্চস্বরে হাসলো। যেন তুলি তার সাথে মজা কোনো মজা করলো। তুলি অবাক হয়ে প্রশ্ন করল„ —“হাসলেন যে। আমি তো দেখেছি আপনি কতটা খারাপ।”

সাইর তুলির ঠোঁটে তার আঙুল ছোয়ালো। বলল„ —“তুমি কিছুই দেখো নি তুলি। এই যে আমার মাকে দেখছো তুমি? ওটা কিন্তু আমার নিজের মা নয়। আমার নিজের মাকে আমি নিজের হাতে মে’রে ফেলেছি।”

তুলির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরলো। ছিটকে দূরে সরে গেলো সাইরের থেকে। সাইর কি তাকে মিথ্যে বলছে এসব? নাকি তার সাথে মজা করছে? তুলি সাইরের চোখের দিকে তাকালো। সাইরের চোখে না আছে কোন ভয় আর না আছে কোনো সংকোচ। তুলি অপ্রস্তুত হয়ে প্রশ্ন করল„ —“এসব কি বলছেন আপনি?”

সাইর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। দুই হাত জানালার কপাটের পাটে রেখে বাইরের দিকে তাকালো। তুলির উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করলো„ —“সাজাদ ভাইয়া আর মুন্নি আর ছিল জমজ দুই ভাই-বোন। তাদের জন্মের পর থেকেই বাবা হিন্দুদের সাথে চূড়ায় বসে পূজো-পাঠ করতো। তখনই অভ্র রহিম কাদিজ। অ র কা প্রত্যেক নামের প্রথম শব্দ মিলিয়ে অর্কা। অর্কা সাথে দেখা হয় বাবা। তখন তিনি খুবই উদ্ভান্ত ছিলেন। বাপ-দাদার জমিদারি পেয়েও মনের স্বাদ মেটেনি তার। হিন্দুর এক মেয়েকে বিবাহ করেন তিনি। আর সেই হিন্দু মেয়ের সন্তান আমি। যার শরীরে হিন্দু মুসলিম দুজনেরই রক্ত বহমান।”

তুলি অকপটে প্রশ্ন ছুড়ল„ —“হিন্দু হোক বা মুসলিম। কিন্তু আমাদের সবার রক্ত তো লাল’ই।”

সাইর তাচ্ছিল্য করলো„ —“তুমি বড়ই সহজ সরল মেয়ে তুলি।”

—“এতে সহজ সরলের কি আছে। যা সত্যি আমি দো তাই বললাম।”

সাইর জানালার দিকে ফিরলো„ —“কেউই আমার বাবা মায়ের বিয়েটা মেনে নেয় নি আমার মা হিন্দু ছিলেন তাই। তখনই আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে যায়। মা যখন অন্তঃসত্ত্বা ছিল তখনই বাবা মাকে নিয়ে জমিদার বাড়িতে যায়। কিন্তু দাদু মাকে অস্বীকার করে বাবা আর মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। বাবা ছিল একরোখা জেদি মানুষ। তিনিও চলে আসেন সেখান থেকে। ঐ যে চূড়ায় যে খুপরিতে আমরা থাকতাম সেটা বাবা আর মা মিলিয়ে বানিয়েছিল তাদের থাকার জন্য। আমার মা যখন প্রসব বেদনায় কাতর তখন কেউই আমাদের সাহায্য করতে আসে নি। বাবা জমিদার বাড়ি ছেড়ে ঐ দিনই চলে এসেছিল। যার কারণে তাদের সংসার চালানোর একটা খরচ লাগতো। তখন বাবা কালো জিরের ব্যবসা করতো। একটা সাইকেলে করে কালো জিরে নিয়ে গিয়ে গায়ে গায়ে বিক্রি করতো। সকালে খেয়ে-দেয়ে বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে সন্ধ্যায় আসতো। মা সারাটা দিন একা একা ঐ খুপরিতে থাকতো। হঠাৎ করেই সেদিন মায়ের মা ঐ খুপরিতে আসে তাকে দেখতে। মায়ের ওমন অবস্থা দেখে তিনি দ্রুত তার সঙ্গী-সাথীদের জানায়। এতে করে অনেক জন মিলে আমার মায়ের পাশে ছায়ার মতো ছিলো। তাকে মৃত্যুর যন্ত্রণা দিয়ে ভূমিষ্ঠ হলাম আমি। মায়ের কাছে শুনেছিলাম যে আমি নাকি এতটাই সুন্দর বাচ্চা ছিলাম যার কারণে আমার দাদু আমাকে দেখার পরে তাদের সম্পর্কটা মেনে নিয়েছিল। ঐ যে জমিদার গিন্নী দেখছো না? সে আমার বাবার বড় বউ। আর সাজাদ ভাইয়া ও মুন্নি আপা তারই সন্তান। আর আমার মা তো দুনিয়ায় নাই শুধু রয়ে গেছি আমি। বেশ ভালোই চলছিল আমাদের সংসার। কিন্তু বাবা ছিল চরিত্রহীন। আমার বয়স যখন চার বছর ছিল তখনই থেকেই দেখতাম বাবা মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করতো। যখন তখন কথা শুনাতো। মার’ধর তো লেগেই থাকতো। আমার চোখের সামনে যে কতবার মাকে মেরেছে তার কোনো হিসেব নেই। আমার ছোট চাচা আর চাচিও মাকে সহ্য করতে পারতো না। চাচি সব সময় মা’কে আদেশ করতো। কিন্তু জমিদার গিন্নী মানে বড় মা তিনি আগে থেকেই ছিলেন মাটির মানুষ। দাদি সব সময় মাকে হিন্দু বলে খোঁটা দিতো। বাড়ির সব কাজ মা’কে দিয়ে করাতো। বড় মা সবসময় বাড়ির পরিবেশ শান্ত রাখতে পছন্দ করতেন। আমার মাকে নিজের ছোট বোনের মতো ভালোবাসতেন। বাড়ির সব কাজ তারা দুজন মিলে শেষ করতো। কিন্তু দাদি আর ছোট চাচি ছিল অন্য মন-মানসিকতার মানুষ। তারা একবার মা’কে কথা শুনাতে নিলে আর ছাড়তো না। এক সময় আমার চাচি অন্তঃসত্ত্বা হয়। পরে পরে জানা যায় বাচ্চাটা আমার বাবার’ই। নিজের বাবার প্রতি ঘৃণায় সিদ্ধান্ত নিলাম যে তাকে মে’রে ফেলবো। তখন আমার বয়স ছিলো ছয় বছর। এইটুকু বয়সে পরিবারের পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে নিতে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম আমি। অনেক দিন ধরে বাবার কাছে বায়না ধরেছিলাম যে বাবা আর আমি বাইরে বেরাতে যাবো। একদিন বাবা রাজিও হলো। সেদিন মায়ের বিছানার নিচ থেকে লুকিয়ে একটা ছুড়ি নিয়েছিলাম। ছুড়িটা মা’ই রেখেছিল নিজেকে শে’ষ করবে বলে। আমি যখন ঘুমের ভান ধরে থাকতাম তখন দেখেছি মা ছুড়িটা বের করে সম্মুখে ধরে বসে থাকতো। বাবার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নিজেকে শেষ করতে চাইতো বারবার। মায়ের এমন আচরণে আমি তখন মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতাম। তখন মা হাতের ছুড়ি ফেলে আমাকে জড়িয়ে কাঁদতো। সেইদিন থেকেই আমি মনে মনে পরিকল্পনা করি যে বাবাকে মে’রে ফেলবো। সেদিন ঘুরতে ঘুরতে বাবা আমাকে চূড়ায় নিয়ে গেছিল। আমিও সুযোগ বুঝে ছুড়িটা বের করেছিলাম বাবাকে মারবো বলে। কিন্তু কোথা থেকে মা এসে হাজির হলো। মা বুঝে গিয়েছিল তার বালিশের নিচ থেকে ছুড়িটা আমিই এনেছি। বাবা তখন মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলো। আমি পেছন থেকে ছুড়িটা বাবার পিঠে বসিয়ে দিবো তখনই মা সামনে চলে আসে। একজন ব্যবিচার পুরুষকে বাঁচাতে এসেছিল আমার মা। মায়ের ওপরে অনেক রাগ হয়েছিল তখন আমার। তাই পরের রাগ গুলো কমাতে নিজের মায়ের পেটেই ছুড়ি বসিয়েছি বার কয়েক। মায়ের নিস্তেজ হয়ে পরে রইলো ঐ চূড়ায়। বাবা সেদিন খুশি হয়ে আমাকে কোলে নিয়েছিল। আর ছয় বছর বয়সে বাবা কোনদিন আমাকে কোলে তুলে নেয় নি। শুরু মাকে তার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম বলে আমাকে কোলে তুলে নিয়েছিল। সেদিন আমি আর কাদি নি। সেদিন মনে মনে বলেছিলাম যে কোন কিছুর বিনিময়ে হলেও ঐ মামুনুর জমিদার কে আমি একদিন না একদিন খু’ন করবোই। এর পরে ষোলো’টা বছর কেটেছে। আজ আমি একুশ বছরের যুবক কিন্তু জমিদারের কোনো ক্ষতি করতে পারিনি। কেন জানো?”

তুলি বিস্মিত চেয়ে বলল„ —“কেন?”

সাইর তাকালো তুলির দিকে„ —“কারণ সে জানতো আমি তাকে খু’ন করবো তাই সে বিভিন্ন কৌশলে আমাকে ব্যবহার করতো। তারপর অর্কা’র সাথে আমাকে দেখা করিয়ে দেয়। বারবার বুঝিয়ে বুঝিয়ে আমাকে বানিয়ে দিলো অমানুষ। কিন্তু আমি সুযোগে ছিলাম কবে তাদের দুজনকে শেষ করতে পারবো। পরে জানতে পারলাম যে তুমি নিজে অর্কা’কে শেষ করতে পারবে তখন আমিও ভাবলাম বাবা’কে আমিই শেষ করবো। পূর্ণিমা আসতে আর মাত্র চারদিন বাকি আছে। আর এবার পূর্ণিমায় তাদের বিনাস হবে।”

তুলি ছলছল চোখে প্রশ্ন করলো„ —“ আমাকে কেন বিয়ে করেছেন আপনি?”

সাইর গভীরভাবে তাকালো তুলির চোখের দিকে„ —“আমি তোমাকে ভালোবাসি। তা চেয়ে বড় কারণ কারণ আমি জানতাম অর্কা তোমাকে খুঁজবে। কারণ তুলিই তার বিনাসের কারণ। যখন তোমাকে খুঁজে পেয়েছিলাম প্রথম দিনই তোমাকে আমার ভালো লাগে। কিন্তু অর্কা চেয়েছিল যাতে তার বিনাসের কথা আমি না জানতে পারি। সবারই একটা না একটা দুর্বলতা থাকে। অর্কা’র ও ছিলো। কিন্তু আমি জানি তুমিই পারবে অর্কা’কে শেষ করতে।”

তুলি এগিয়ে এলো সাইরের সম্মুখে। অজান্তেই খুব কাছে পেতে চাইলো সাইরকে। সাইরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল„ —“আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরি?”

সাইর মুচকি হেসে বলল„ —“আমি স্বামীটা তোমার’ই। তোমার যা খুশি করতে পারো।”

তুলি আর এক মুহুর্ত দেরি করলো না। ঝাঁপিয়ে পরলো সাইরের বুকে। আষ্টেপৃষ্টে জমিয়ে ধরলো। যেন এখানেই তার শান্তির জায়গা। সাইরও সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব বাদ দিয়ে তুলিকে জড়িয়ে নিলো বুক পাঁজরে।

🕊️🕊️🕊️🕊️
অনেক আগেই ভোরের আলো ফুটেছে। তাতে তুলির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে চুপচাপ বসে আছে চৌকির কোণে। দুই হাত হাঁটুর ওপর ভাজ করে বসে আছে সে। চোখ তার স্থিরতা কাজ করছে। ঘুম থেকে উঠে সাইরকে দেখতে পায় নি সে। অথচ রাতে সাইরের বুকেই ঘুমিয়েছিল সে। কিন্তু কখন যে তাকে ফাঁকি দিয়ে সাইর চলে গেছে বুঝতেই পারে নি সে। মন খারাপ নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করলো তুলি।

হঠাৎই দরজার বাইরে শব্দ এলো„ —“বউমা ঘুম ভাঙেনি তোমার?”

জমিদার গিন্নীর গলা। অন্যমনষ্ক থাকায় চমকে উঠলো তুলি। দ্রুত পায়ে উঠে দাঁড়ালো। দরজা খুলে দাঁড়ালো জমিদার গিন্নীর সামনে। দরজা খুলতেই জমিদার গিন্নী ভেতরে ঢুকলেন। চোখে-মুখে কৃত্রিম হাসি। বলল„ —“চল। আজকে অনেক কাজ বাকি আছে। বাড়িতে আছো তো তিনদিন হলো। রান্নাঘরের কাজ করতে হবে না? চলো চলো।”

তুলি মাথা নিচু করে বলল„—“আপনি আসুন মা আমি যাচ্ছি।”

দরজার ওপাশ থেকে কেউ বলল„ —“বাড়িতে তো আরও একটা বউ আছে। কই তাকে তো কোনো কাজ করতে বলো না?”

জমিদার গিন্নী পেছনে তাকালো। সাইরের দাঁড়িয়ে আছে দরজার ওপাড়ে। সাইরের এমন কথায় জমিদার গিন্নী কটমটিয়ে বলল„ —“সাজাদ চাকরি করে আর সহিনীও বড়লোক ঘরের মেয়ে তার দ্বারা এসব মানায় না।”

—“তাহলে কি আমার বউ’য়েরই সব কাজ মানায়।”

জমিদার গিন্নী বলল„ —“অবশ্যই মানায়। তুই নিজেও তো কোনো কাজ করিস না। আবার বউ এনেছিস কোথা থেকে তাও জানি না৷ সাথে তো শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি ফ্রি। সুতরাং তোর বউকেই সব কাজ করতে হবে।”

—“তুমি একটু বেশি বলে ফেললে না কথাগুলো?”

তুলির কথা এড়াতে বলল„ —“মা চলুন। দেরি হয়ে যাচ্ছে অনেক কাজ আছে।”

সাইর ঘরের ভেতরে এসে তুলির হাত চেপে ধরলো„ —“না তুমি কোথাও যাবে না।”

—“যেতে দিন আমাকে। আমি এসব কাজ করতে পারি। আমার কোন অসুবিধা হবে না। তার চেয়ে এটা আমার বড় সুযোগ যে বাড়ির মানুষদের আমার হাতের রান্না খাওয়াতে পারবো। আমি কিন্তু খুব ভালো রান্না করতে পারি। আপনিও খেতে পারবেন।”

সাইর অনিচ্ছা সত্ত্বেও তুলিকে যেতে দিলো। তুলিও শান্ত মেয়ের মতো জমিদার গিন্নীর পিছু পিছু রান্নাঘরে চলে গেলো।

মমতা একা একা মাথা নিচু করে সবজি কাটছিলো। জমিদার গিন্নীকে আসতে দেখে দ্রুত হাত চালাতে লাগলো। জমিদার গিন্নী এগিয়ে গিয়ে রান্নার জন্য চাল ডাল বের করলো। তুলি শাড়ির আঁচল কোমড়ে পেঁচিয়ে থালা-বাসন বের করে কলপারে ধুতে গেলো। জমিদার গিন্নী পরিমাণ মত চাল-ডাল বের করে রাখলো। সামনে সবজি সহ যাবতীয় সব তরি-তরকারি রাখলো।

তুলি থালা-বাসন ধুয়ে রান্নাঘরে আসলো। বাসন রাখতেই জমিদার গিন্নী বলল„ —“নাহ এখানে সবকিছু রেখেছি। তুমি এখন কি রান্না করবে সেইটা তোমার বিষয়।”

তুলি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো„ —“আচ্ছা আম্মা। আমি সবকিছু করে নেবো। আপনি আসুন।”

জমিদার গিন্নী চলে যেতেই তুলির মাথা মাধুরী রান্নাঘরে আসলো। তুলি চাল বেছে নিতেই মাধুরী তাকে ধমক দিলো„ —“এতসব কথা করতে পারবি না তুই। আমাকে দে আমিও করি।”

তুলি মুচকি হেসে বলল„ —“লাগবে না মা। আমাকেও তো করতে দাও কাজ। শ্বশুড় বাড়িতে নিজেকে একটু মানিয়ে নিতে দাও।”

—“কে কাকে মানিয়ে নিতে চাচ্ছে?”

কথাটা বলে হাসি হাসি মুখে রান্নাঘরে আসলো সহিনী। তুলি অবাক হয়ে বলল„ —“ভাবি তুমি এখানে?”

সহিনী কোমড়ে দুই হাত রেখে বলল„ —“কেন আমি কি আসতে পারি না?”

তুলি মাথা নিচু করলো„ —“তেমন কিছু না ভাবি। তুমি তো বড়লোক বাড়ির মেয়ে। এই ছোট রান্নাঘরে তোমার পোষাবে না।”

সহিনী তুলির হাতে এসে তুলির থুতনিতে হাত রেখে উঁচিয়ে বলল„ —“এটা তোমারও শ্বশুড় বাড়ি আমারও শ্বশুড় বাড়ি। সুতরাং সব কাজ যেমন তোমার তেমনি সব কাজ আমারও। আমার মা নেই৷ ছোট থেকে বাবা কখনো আমাকে মায়ের অভাব পেতে দেয় নি। কিন্তু এ বাড়িতে এসে বুঝলাম। মায়েরা কেমন হয়? আরও আগে এ বাড়িতে আসা উচিত ছিল আমার। চলো চলো কাজ শুরু করি দুজন মিলে।”

মাধুরী সহিনীর এমন ব্যবহারে খুব খুশি হলো। কাজে এসে দুজনকে জড়িয়ে নিলো বক্ষ-পিঞ্জরে। সহিনী আর তুলিও জড়িয়ে ধরলো মাধুরীকে। মাধুরী কান্না মিশ্রিত গলায় বলল„ —“আমার মেয়েটার ভাগ্য অনেক ভালো।”

সবাই দ্রুত কাজ শুরু করলো। সকালের রান্নায় আলো চালের বিরিয়ানি‚ খাসির গোস্ত‚ আলু গাজর শিম দিয়ে সবজি‚ পায়েস‚ শিম ভাজি। সবকিছু রান্না করে খাবার টেবিলে সাজিয়ে রাখলো তুলি‚ সহিনী আর মাধুরী। খাবারের গন্ধে সকলেই দ্রুত খাবারের টেবিলে এসে পড়লো। একে একে সবাই উপস্থিত হতেই সহিনী সবাইকে খাবার বেরে দিলো। সবাই বেশ মজা করে খাবার খেতে লাগলো। পায়েস মুখে দিতেই জমিদার বলল„ —“বাহ পায়েস তো সেই স্বাদ হয়েছে। আজ-কাল মমতার হাতের উন্নতি ঘটেছে বুঝি।”

মমতা পায়েস দাড়িয়ে ছিল। সে বলল„ —“আসলে কর্তা মশাই পায়েস তো আমি রান্না করি নাই।”

জমিদার ভ্রু উঁচিয়ে বলল„ —“তাহলে কে রান্না করেছে?”

মমতা খুশিতে গদগদ হয়ে বলল„ —“ছোট বউ রাঁধছে।”

জমিদার একবার তুলির দিকে তাকিয়ে পায়েসের বাটিটা সরিয়ে রাখলো। সহিনীর উদ্দেশ্য বলল„ —“বড় বউ। খাবার দাও। আমি ততটাও মিষ্টি খাই না। যা খেয়েছি এটাই অনেক।”

সহিনীর মনটা খারাপ হয়ে গেলো। সে বিরিয়ানির গামলা এগিয়ে নিয়ে গিয়ে জমিদারের থালায় দিলো। সাথে খাসির গোস্ত ও সবজি দিলো থালায়। সাইর আসলো কেবল খাবার টেবিলে। চেয়ারে বসতেই সহিনী পায়েসের বাটি এগিয়ে দিলো। সাইর মুখ কুঁচকে বলল„ —“ভাবি আমি পায়েস পছন্দ করি না।”

সহিনী মলিন মুখে বলল„ —“তুলি কত শখ করে রেঁধেছে তবুও তুমি খাবে না সাইর?”

সাইর একবার তুলির দিকে তাকালো। মেয়েটা মন খারাপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক কোণে। সাইর মুচকি হেসে বলল„ —“দাও দাও। আমার বউ রেঁধেছে খেতে তো হবেই।”

পায়েসের বাটি থেকে এক চামচ পায়েস মুখে দিয়ে তুলির দিকে তাকালো সাইর। তুলি এতক্ষণ সাইরের দিকেই তাকিয়ে ছিল। চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিলো তুলি। সাইর মুচকি হেসে বলল„ —“আজ মনে হয় আমার পায়েস খাওয়া সার্থক হলো।”

সহিনী মুচকি হেসে বলল„ —“কেন? হঠাৎ এমন কেন মনে হলো তোমার?”

জমিদার গিন্নী মুখ ভেঙচে বলল„ —“সার্থক হবে না আবার? এতদিন আমার হাতের পায়েস খায় নি। যদি আমি বিষ মিশিয়ে দিই এজন্য। আর নিজের বউ তো বিষ দিলেও সেটা খেয়ে জীবন সার্থক হবে।”

উপস্থিত সকলেই জমিদার গিন্নীর কথায় হেসে উঠলো শুধু তুলি আর সাইর বাদে। মুন্নি খাসির গোস্ত খেতে খেতে বললো„ —“বড় ভাবি তোমার হাতে কিন্তু জাদু আছে। খাসির গোস্ত কিন্তু সেই স্বাদ হয়েছে।”

সহিনী এক গাল হেসে বলল„ —“আজকে সবকিছু তুলি’ই রান্না করেছে।”

মুন্নি ভ্রু কুঁচকে বলল„ —“তাহলে তোমাকে যে দেখলাম রান্নাঘরে?”

—“আমি ছিলাম ঠিকই কিন্তু আমাকে কোনো কাজই করতে দেয় নি তুলি।”

তাদের এত এত উৎসাহ দেখে এবার সাজাদ বলল„ —“সাইর আর যাই করুন। বউ কিন্তু এক্কের আনছে। যেমন রূপ তেমনি গুণও আছে।”

সহিনী ভ্রু উঁচিয়ে বলল„ —“তাই বুঝি?”

সাজাদ থতমত খেলো„ —“আসলে তোমার তো রান্না খাইনি তাই একটু সংকোচ হচ্ছে। তবে আমি জানি তুমিও খুব ভালো রান্না পারো।”

সহিনী হেসে বলল„ —“ঠিক আছে তাহলে কালকে আমি রান্না করবো।”

জমিদার গিন্নী আপত্তি জানালো„ —“তুমি। নাহ মা তুমি কেন রান্না করবে। অনেক লোকজন আছে এবাড়িতে তারাই রান্নাবান্না করবে। তোমার রান্না করার দরকার নেই।”

—“না আম্মা। আমি তো রান্না করব’ই। দেখি আপনার ছেলের আমার হাতের রান্না খেয়ে কি বলে।”

খাবারের শেষ মুহুর্তে জমিদার বলল„ —“আগামীকাল মুন্নিকে দেখতে আসবে শহর থেকে।”

হঠাৎই এমন কথা মুন্নি নাকচ করলো„ —“কিন্তু বাবা দুই মাস বাদে আমার দ্বিতীয় সেমিনার পরিক্ষা।”

জমিদার আদেশ করলো„ —“বিয়ের পরেও সেমিনার দিতে পারবে। ছেলের পরিবার ভালো। ছেলেও চাকরিজীবী। এমন ছেলে হাত ছাড়া করতে পারবো না আমি।”

—“কিন্তু বাবা।”

—“কোনো কিন্তু নয়। আমি যা বলেছি তাই হবে।”

জমিদার গিন্নী মেয়েকে শান্ত করতে বলল„ —“তুই চিন্তা করিস না মা। দেখতে আসলেই তো আর বিয়ে হবে না।”

মুন্নি খাবার ছেড়ে থালায় হাত ধুয়ে উঠে চলে গেলো। জমিদার গিন্নীও উঠে মেয়ের পিছু পিছু গেলো।

সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ 🕊

[ ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। পর্বটি কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু। ভালো থাকবেন‚ সুস্থ থাকবেন‚ ধন্যবাদ ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here