#উৎসর্গ
#পর্ব:১৯
#তানজিনা ইসলাম
রাত্রির তৃতীয়-প্রহর চলছে।কক্ষে সবকিছু নিশ্চুপ, নির্লিপ্ত। এসি চলছে না।এমনকি ফ্যান পর্যন্ত বন্ধ করে রাখা।
মায়া খাটের সামনে মেঝেতে বসে আছে। খাটের উপর মাথা রেখে সিলিংয়ের বন্ধ ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে।চুলগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিছানা আর মেঝে জুড়ে। চোখের কার্নিশ বেয়ে টপ টপ করে পানি পরছে।কিন্তু তাতে মায়ার কোনো হেলদোল নেই।চোখের পানি কানের ডগা পেরিয়ে এলোমেলো চুলে গিয়ে পৌঁছায়,তবুও মায়া তা মোছার প্রয়াস চালায় না।কাঁদতে কাঁদতে চোখমুখ ফুলে গেছে।চোখের পাতা ফেলতেও যেন কষ্ট হচ্ছে।
কিছুক্ষণ আগের অভিজ্ঞতা মনে করতেই বুকের মধ্যে কষ্ট গুলো আঁচড়ে পরছে। সন্ধ্যার পরপরই রুদ্রর সাথে তুমুল ঝগড়া হয়েছে মায়ার।
সেই যে ছেলেটা বেরিয়ে গেছে,এখনো পর্যন্ত বাড়ি ফিরেনি।রাতের খাবারও খাওয়া হয়নি নিশ্চয়ই। রুদ্র যাওয়ার পর সেই যে দোর দিয়ে এভাবে বসেছে এখনো পর্যন্ত দরজা খুলেনি।এখনো গাট হয়ে ওভাবেই বসে আছে,আর চোখের পানি ফেলছে।রাফানা চৌধুরী খাবার খেতে অনেকবার ডেকেছে,দরজা ধাক্কিয়েছে।কিন্তু মায়া দরজা খোলেনি।
মায়ার যন্ত্রণা হচ্ছে বুকের মধ্যে। কেনো ছেলেটা এমন করছে মায়ার জানা নেই।বিয়ের পর কতো মাস সংসারও করে ফেললো,কই এমনতো কোনোদিন করে নি।যদি জোর করে বিয়ে করা নিয়ে সমস্যা হয় তাহলেতো প্রথম থেকেই হতো।এভাবে মাঝে এসেতো সব বদলে যেতো না।রুদ্র প্রথম কয়েকদিন হয়তো রাগারাগি করেছিলো কিন্তু তারপরতো সব মেনে নিয়েছে।মায়া ফিল করেছিলো রুদ্র নিজেও তাদের সংসার টা সুন্দর করে গড়তে চেয়েছিলো। মানিয়ে নিতে চেয়েছিলো সবটা। বিয়েটাও মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছিলো আস্তে আস্তে। তাহলে এখন কেনো এমন করছে? মায়ার জানা নেই।
ঝগড়ার সূত্রপাত ঘটেছে আরশির ফোন করা নিয়ে। ভার্সিটি থেকে ফিরে আসার পর থেকেই আরশি কল করছিলো রুদ্রকে।মায়া প্রথমে কিচ্ছু বলেনি।রুদ্র তো এসব হরহামেশাই করে থাকে ওঁকে দেখিয়ে দেখিয়ে।
কিন্তু আসার পর থেকে রুদ্র ফোনটা রাখেনি নিজের কান থেকে একবারও।
কোনো না কোনো কথা বলছিলোই আরশির সাথে। মায়া প্রথমে শান্তভাবে বলেছিলো যাতে কথা না বলে।ওর অসম্ভব খারাপ লাগে, কষ্ট হয়।মায়া বোঝাতে পারে না কাঁদতে পারে না। কিন্তু ওর হৃদয়টা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়। রুদ্রর অন্য মেয়ের সাথে কথা বলাও সহ্য হয় না ওর।
কিন্তু রুদ্র ওর ইমোশনের একটুও দাম দেয়নি। ওর আবেগি কথাবার্তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি ওর উপর।
অনুতপ্ত হওয়ার বদলে আরো ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলেছে।এটাও বলেছে যে এটা নাকি ওর পার্সোনাল বিষয়। ওর পার্সোনাল বিষয়ে যেন মায়া বা-হাত না ঢোকায়।
রুদ্র কথা বলছিলো ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। মায়া গিয়ে ফোনটা ছিনিয়ে নিলো ওর হাত থেকে। চেচিয়ে বললো
-“এই তোর লজ্জা করে না, আরেকজনের হাসবেন্ড কে ফোন দিয়ে কথা বলছিস। নির্লজ্জ! আরেকজনের জিনিসে এতো কিসের আবেগ তোর! বেহায়া কোথাকার! যদি তোর লজ্জা থাকতো…
মায়া আর বলতে পারলো না। রুদ্র ছিনিয়ে নিলো ওর ফোনে। রেগেমেগে আগুন হয়ে বললো
-“ওঁকে কেন এসব বলছিস হ্যাঁ। আমার যার সাথে মন চায় তার সাথে কথা বলবো। আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না ওর সাথে কথা বলতে।তোর এতো কিসের সমস্যা! বেহায়া তো তুই! তোর লজ্জা নাই। আমি এতো করে বলছি আমি তোর সাথে থাকতে চাই না, তারপরও পরে আছিস কেন?আরেকজনকে নির্লজ্জ বলার আগে নিজের দিকে তাকা।”
তারপরই মায়ার সাথে তুমুল কথা কাটাকাটি শুরু হয়েছিলো ওর। মায়াকে আরো অনেক কথা শুনিয়েছি রুদ্র। অনেক কিছুর জন্য দায়ী করেছে তাকে।আর তারপর বাড়াবাড়ির এক পর্যায়ে বাড়ি ছেড়েই বেরিয়ে গেছে।
মায়া মাথা তুলে তাকালো ঘড়ির দিকে। একটা বেজে পয়ত্রিশ মিনিট।এখনো ছেলেটার বাড়ি ফেরার কোনো নাম নেই। কোথায় আছে ছেলেটা?মায়া একবার ভাবলো কল করবে।কিন্তু ও কল করলে যদি আরো রেগে যায়, রেগে একেবারে বাড়িই না ফেরে তাহলে?সে জন্য আর কল করলো না।মায়ার একদিকে যেমন কষ্ট লাগছে,অন্যদিকে তেমনি চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে।
বাইরে থেকে কিছুর আওয়াজ আসছে।কিন্তু দরজা বন্ধ থাকায় মায়া ভালোভাবে কিছু শুনতে পারছে না।এতো রাতে আবার কী হলো? মায়া কোনোমতে টালমাটাল পায়ে গিয়ে দরজা খুললো।রুদ্রর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তারমানে চলে এসেছে ও।মায়া এতোক্ষণে মনে শান্তি পেলো।কিন্তু নিচ থেকে রাফানা চৌধুরীর আওয়াজও শুনতে পেলো মায়া।কাউকে ধমকে ধামকে কিছু বলছেন।রুদ্রকে বকছে?
মায়ার মস্তিষ্কে এই প্রশ্নের উদয় হতেই খালি পায়ে দৌড় দিলো ও। সিড়ির উপর দাঁড়িয়েই নিচে দেখলো। রুদ্র মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাফানা চৌধুরীর সামনে।রাফানা চৌধুরী একের পর এক বাণী শুনিয়েই যাচ্ছে তাকে।
-“সমস্যাটা কী তোমার?এতো রাতে কোত্থেকে এসেছো?দিনে দিনে উশৃংখল আচরন করছো তুমি। কেনো ঝগড়া করেছো তুমি মায়ার সাথে।আর ঝগড়া হলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হবে নাকি?তুমি জানো মেয়েটা তোমার জন্য রাতের খাবার পর্যন্ত খায়নি।”
রাফানা চৌধুরী রেগে বললেন। এতক্ষণ চুপ থাকলেও রুদ্র এবার মুখ খুললো
-“আমি বলিনি ওকে না খেয়ে থাকতে।এতো আলগা পিরিতি দেখাতে কে বলেছে।নাটক আসলে ভালোই পারে বুঝেছো।আসলে আমাকে খারাপ প্রুফ করে নিজে সবার সামনে মহান সেজে থাকার প্রয়াস চালাচ্ছে। ”
-“রুদ্র।” রাফানা চৌধুরী ধমকে উঠলেন।গাঁট গাঁট স্বরে বললেন
-“মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছো তুমি।আগেতো এমন ছিলে না, কী হয়েছে তোমার?মেয়েটা তোমার জন্য খায়নি রুদ্র আর তুমি বলছো নাটক করছে।কতোটা ভাবে ও তোমার জন্য, কতোটা ভালোবাসে তোমাকে।এর প্রতিদানে এসব দিচ্ছো।”
-“আমি বলেছি নাকি ভালোবাসতে আমাকে। তাহলে কেন এতো ভালোবাসা দেখাচ্ছে?যদি ভালোবাসতোই তাহলে ছলনা করে বিয়ে করতো না।আর শোনো এই দুনিয়াতে আমার ভালোবাসার মানুষের অভাবে নেই।ওর ভালোবাসা না হলেও চলবে।”
মায়া দাঁড়িয়ে ছিলো সিঁড়ির উপর। এখনো দুজনের মধ্যে একজনও খেয়াল করেনি তাকে।রুদ্রর এই অকপট স্বীকারোক্তি হৃদয় কে যে এফোড় ওফোড় করে দিচ্ছে।ওকে নিয়ে এতটা ঘৃণা কখন জমলো রুদ্রর মনে? এতটা ঘৃণা কী আসলেই ডিজার্ভ করতো ও?
রাফানা চৌধুরী কথার খেই হারিয়ে ফেললেন।তারপরও নিজেকে সামলে বললেন
-“কেন এমন করছো রুদ্র?মানছি বিয়েটা তোমার নিজের ইচ্ছায় হয়নি। কিন্তু তুমি তো বিয়েটা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছিলে বলো।এখন কী হলো?আর তোমাকে ভালোবাসার অনেক মানষ বলতে আরশিকে বোঝালে তাই তো?তুমি কী ভুলে গেছো বিবাহিত তুমি?তারপরও কোত্থেকে আরশির জন্য এতো ভালোবাসা উতলে পরছে তোমার। ”
-“আমার ভালোবাসা উতলে পরছে কিনা জানিনা।কিন্তু তোমাদের ভালোবাসা সবসময়ই উতলে পরে মায়ার জন্য।শুধু তোমাদের না আমার বন্ধুদেরও।সবাইকে জাস্ট জাদু করে রেখেছে ও।আর তোমার কথাতো বাদি দিলাম।ওই যে একটা প্রবাদ আছে না মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। ”
সজোরে রুদ্রর গালে চ*ড় বসালেন রাফানা চৌধুরী। মধ্যরাত হওয়ায় সেই আওয়াজে ড্রইংরুম যেন কেপে উঠল।মায়া আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুখে হাত দিয়ে ফেললো।রুদ্র গাট হয়ে দাড়িয়ে আছে। মুখে টু শব্দটুকু করেনি।রাফানা চৌধুরী ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।দৃষ্টিতে যেন আগুন ঝরে পরছে। রাফানা চৌধুরী চিৎকার করে বললেন
-“অসভ্য, বেয়াদব। মায়ের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটুকুও জানো না তুমি?ভুল টা আমারই আমিই তোমাকে শিক্ষা দিতে পারিনি।তাই আজকে আমাকে এই দিন দেখতে হচ্ছে। ”
রাফানা চৌধুরীর গলা কাপছে। মায়া দৌড়ে এসে সামলালো তাকে।হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো
-“মামনি, ওকে মারছো কেন?সামলাও নিজেকে।মেরো না ওকে।
মায়া আসাতে,রুদ্রর সব রাগ গিয়ে পরলো মায়ার উপর। জোরপূর্বক মায়াকে রাফানা চৌধুরীর কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পাশে দাঁড় করালো।তাচ্ছিল্য করে বললো
-“নাটক করছিস তাই না?এতো নাটক পাস কোত্থেকে?এই সবকিছু তো তোর জন্যই হয়েছে।নিশ্চিত উপরে দাঁড়িয়ে থেকে মজা নিচ্ছিলি তুই।আসলে তোর মতো স্বার্থপর মেয়ে আমি আমার লাইফে আর দুইটা দেখিনি।”
রাফানা চৌধুরী আবার মারতে যাবেন তার আগেই মায়া হাত ধরে আটকালো তাকে।রাফানা চৌধুরী বড় বড় করে শ্বাস নিলেন।রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে রাগে কাপতে কাপতে বললেন
-“আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও রুদ্র।আমার তোমাকে সহ্য হচ্ছে না।”
রুদ্র বড় বড় পা ফেলে সিড়ি বেয়ে দোতলায় চলে গেলো।একবার পিছনে ফিরে পর্যন্ত তাকালো না।
মায়া জড়িয়ে ধরলো তার মামনিকে। পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো
-“শান্ত হও মামনি।এমন করো না।অসুস্থ হয়ে পরবে তুমি।”
-” ও এমন কেন করছে মায়া?হয়েছেটা কী ওর?কীরকম ব্যবহার করলে দেখলি আমার সাথে।”
-” রেগে আছে মামনি,তাই এমন করে ফেলেছে।তুমি চিন্তা করো না এটা নিয়ে।আমি কথা বলছি ওর সাথে।”
-“আবার তোকে অপমান করবে ও।”
মায়া মলিন হেসে বললো
-“ভুল যখন করেছি তখন অপমানতো সহ্য করতেই হবে।তুমি যতই প্রটেক্ট করার চেষ্টা করো না কেন , কিন্তু এটাতো সত্যি যে ওর বিয়েতে মত ছিলো না।ওর রাগ স্বাভাবিক মামনি।আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো।”
-“ঠিক হবে? আমার তো মনে হচ্ছে না। দিন দিন আরো উশৃংখল আচরণ করছে ও!”
রাফানা চৌধুরী উদাস কন্ঠে বললেন।
রুদ্র খাটের পাশে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে।মায়া হন্তদন্ত হয়ে কক্ষে এলো।হাঁটু ভাজ করে রুদ্রর শিয়রে বসলো।কীভাবে কথা শুরু করবে বুঝতে পারলো না।নিশ্চয়ই এখন স্বাভাবিক কথা বলার অবস্থায় নেই রুদ্র।একজন মা তার এতবড় ছেলের গায়ে হাত তুলেছে এটাতো চারটি খানি কথা নয়।রুদ্রর বাহুতে হাত দিয়ে আস্তে করে ডাকলো মায়া
-“রুদ্র।”
না, কোনো সাড়াশব্দ নেই। মায়া আবার ডাকলো তাকে।কয়েকবার ডাকার পর রুদ্র মাথা তুলে চোখ মুছলো।পাশে থাকা মায়াকে এক প্রকার উপেক্ষা করেই উঠে দাড়ালো।
মায়া কিছু বলতে যাবে তার আগেই থামিয়ে দিলো তাকে।উল্টো ঘুরে না তাকিয়েই বললো
-“অতি খবরদারি দেখাস না।তুই মান বা না মান আজকে মামনির সাথে যা হলো তার জন্য একমাত্র দায়ী তুই।সো, প্লিজ কোনো সাফাই গাওয়ার দরকার নেই।
মায়া রুদ্রর নিষেধ অমান্য করে অসহায় কন্ঠে বললো
-“আমিতো চাইনি এমন হোক।বিশ্বাস কর মামনি যে এমন করবে সেটা কল্পনাও করতে পারিনি আমি।অনেক ব্যাথা পেয়েছিস তাই না?একটু দেখতে দে আমাকে।”
রুদ্র এবার মায়ার দিকে ঘুরলো।অতিরিক্ত শান্তস্বরে বললো
-“দেখে কী করবি?থাপ্প*ড়ের ব্যাথার চেয়েও যে মনের ব্যাথা হাজার গুণে বেশি।ওটা কমাবো কীভাবে?প্রথমবার এমন ব্যবহার করেছি আম্মুর সাথে,কষ্ট দিয়েছি তাকে। জানিস,হাজারও অপরাধ করলেও আম্মু আমাকে কোনোদিন কিচ্ছু বলেনি।কিন্তু আজকে তোর জন্য আমি এভাবে মার খেলাম।আমার কাছের সবাইকে কেঁড়ে নিয়েছিস তুই।কোনোদিন ক্ষমা করবো না তোকে।”
মায়াকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রুদ্র ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।ঠাস করে ওয়াশরুমের দরজা বাঁধে।মায়া টলমল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো বদ্ধ দরজার দিকে।
,
মায়া গুটিগুটি পায়ে বেলকনি থেকে কক্ষে এলো।পাশ থেকে মোড়া টেনে রুদ্রর মুখ বরাবর বসলো।রুদ্র নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। মায়া এতক্ষণ বেলকনিতেই ছিলো।রুদ্র ঘুমানোর অপেক্ষা করছিলো, যাতে ওর সামনে পরতে না হয়।
মায়া ড্রয়ার হাতড়ে মলম বের করে আবার মােড়ায় বসলো।সন্তর্পণে রুদ্রর গালের উপর মলম লাগিয়ে দিলো,পাছে রুদ্র টের না পায়।এখনো লালচে আবরণের ছেয়ে আছে মুখমন্ডলের একপাশ।নিশ্চয়ই অনেক ব্যাথা পেয়েছে ও।মায়ার মনটা আবার খারাপ হয়ে গেলো।শুধু শুধু মার খেলো ছেলেটা।মায়া রুদ্রর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।বিড়বিড় করে বলল “সরি”। অনেক সময় ধরে দ্বিধাদন্দ নিয়ে ভাবলো রুদ্রর বুকে মাথা রাখবে কিনা।তারপর সব দ্বিধা দন্দকে এক সাইডে সরিয়ে রুদ্রর বুকে মাথা রেখে শুয়ে পরলো।নয়তো ঘুম আসবে না পুরো রাত। শান্তির ঘুমের জন্য একটু নাহয় ছ্যাঁচড়া হলো।কালকে সকালে আগেভাগে ঘুম থেকে উঠে পরবে।তাহলে আর রুদ্র দেখবে না।
,
পাহাড়গঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের অন্যতম বিদ্যাপীঠগুলোর একটি।শহরের যান্ত্রিকতা থেকে বেরিয়ে প্রকৃতিতে মন ভালো করার এক সুযোগ্য স্থান। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও বিকেলের সময়টা উপভোগ করতে অনেকেই এখানে আসে।অনেকে তাদের বাচ্চা আর পরিবার নিয়ে আসে কিছু সুন্দর সময়, সুন্দর মুহুর্ত কাটানোর জন্য।
বন্ধুমহলের সবাই মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল পার্কে ঘুরতে এসেছে আজকে।শুধু রুদ্র অনুপস্থিত। ও আজকে অফিসে গেছে তাই ভার্সিটিতে আসেনি।ছুটির পর রাহুল সবার কাছে প্রস্তাব রেখেছে যে ওরা আজকে ছুটির পর পার্কে ঘুরতে যাবে।সবাই হইহই করে সম্মতি জানিয়েছে।যদিও মায়ার আসার একটুও মন ছিলো না,তারপরও আসতে হয়েছে ওদের সাথে।কারণ ও না আসলে কেউই আসতো না। রুহানি মায়ার মন ভালো করার জন্য একপ্রকার টেনে নিয়ে এসেছে ওকে।
সবাই বেঞ্চের উপর বসে আছে। সামনে ফুচকাওয়ালা মামা ফুচকা বানাচ্ছেন।ছয় প্লেট ফুচকা অর্ডার করেছে রুহানি।রুহানি নিজের প্লেটে বেশি করে ঝাল দিতে বলেছে।সেটা খেয়েই অবস্হা খারাপ ওর।সাহিল রিয়ানার প্লেট থেকে ফুচকা নিয়েছে তাই দুজনের কাড়াকাড়ি চলছে।আরিয়ান আর রাহুল দুজনকে থামানোর চেষ্টা করছে। মায়া এসব দেখে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে।একেকজন একেক কান্ড করছে।আসলেই ওদের সাথে থাকলে ওর মন খারাপ এক নিমিষেই উধাও হয়ে যায়।
কিছু বাচ্চা ছেলে পার্কে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে।কে কার ঘুড়ি কাটতে পারে সেটা নিয়েই তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে। তারমধ্যে দুজন বন্ধু একেবারে জানপ্রাণ লাগিয়ে দিয়েছে একজন আরেকজনের ঘুড়ি কাটার জন্য। মায়া তাদের দিকে তাকিয়ে হাসলো।ছোটোবেলার সেই সোনালী দিনগুলোর কথা মনে পরে যাচ্ছে।কতোদিন ঘুড়ি ওড়ানো হয়না।ছোটবেলায় তারা সাতজন মিলে এভাবেই ঘুড়ি ওড়াতো।তবে সবার ঘুড়ি কাটার পারমিশন থাকলেও রাহুলের ঘুড়ি কখনো কাটা যেত না।রাহুলের ঘুড়ি কাটা মাত্রই ও ভ্যা ভ্যা করে কান্না করে ওর মায়ের কাছে দৌড় দিতো।তারপর নালিশ ঠুকতো বন্ধুদের নামে।দিনগুলো খুব তাড়াতাড়িই কেটে গেছে।তবে তাদের বন্ধুত্ব একটুও বদলাইনি।
হঠাৎ এক বন্ধু অন্য বন্ধুর ঘুড়ি কেটে দিলো। মায়া মনোযোগ দিয়ে চেয়ে থাকলো কাটা ঘুড়ির দিকে।ঘুড়িটা ওদের কিছুটা সামনে এসে পরলো।মায়া এগিয়ে গিয়ে ঘুড়িটা তুললো।তখনই সাত-আট বছরের একটা বাচ্চা ছেলে দৌড়ে ওর কাছে আসলো।হাটুতে ভর দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিলো।বোঝাই যাচ্ছে অনেক দৌড়ে তারপর এসেছে।মায়ার ওড়না ধরে আদুরে কন্ঠে বললো
-“আপুনি,ঘুড়িটা আমার। ওখান থেকে উড়ে এখানে এসেছে।আমার ঘুড়ি আমাকে দিয়ে দাও।”
মায়া মুচকি হাসলো। কী আদুরে বাচ্চা!মায়া হাটু গেঁড়ে বসলো।তারপর বাচ্চাটির গাল টেনে দিয়ে বললো
-“ঘুড়িটা আগে কার ছিলো সেটাতো আমি জানি না।কিন্তু এখন যখন আমি পেয়েছি তখন ঘুড়িটা আমার।দিব না তোমাকে।”
বাচ্চা ছেলেটি মুখ কালো করে ফেললো।আবার অনুরোদের সুরে বললো
-“প্লিজ আপুনি দিয়ে দাও আমাকে।তুমিতো অনেক ভালো মেয়ে।”
-“উহু। আমি একটুও ভালো না।একেবারে পঁচা আপু। যায় করো না কেন ঘুড়ি পাচ্ছো না কিন্তু আমার কাছ থেকে।”
মায়ার মায়া হলো বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে। মুখে একদম অমাবস্যা নেমেছে যেন।থাক অনেক হয়েছে দুষ্টুমি।মায়া যখনই ঘুড়িটি ফেরত দিতে যাবে তার আগেই বাচ্চাটি বলে উঠলো
-“অন্যের জিনিস কেড়ে নিতে নেই আপুনি। তুমি আমার ঘুড়ি নিয়ে নিলেও বেশিদিন নিজের কাছে রাখতে পারবে না।মা বলে অন্যের জিনিস নিয়ে নিলে সেটা বেশিদিন নিজের কাছে থাকে না।”
মায়া থমকে গেলো।অন্যমনষ্ক হয়ে ঘুড়িটা দিয়ে দিলো বাচ্চাটির কাছে।বাচ্চাটি দৌড় দিলো পার্কের দিকে।যাওয়ার আগে ধন্যবাদ জানাতেও ভুললো না। এইটুকু বাচ্চা যে কথাটা বললো সে কথাটাতো কোনোদিন ভেবে দেখেনি।আসলেইতো, আরেকজনের জিনিস কেড়ে নিয়েছে ও।সে জিনিস কেঁড়ে নিয়ে ভালো থাকতে পারছে না ও। তাই জীবন ওর থেকে কেড়ে নিচ্ছে তাকে।রুদ্র ওর ছিলোই না কোনোদিন।তারপরও আরশি থেকে কেড়ে নিয়েছে,নিজের করতে চেয়েছে তাকে।তাই বুঝি রুদ্র এমন করছে।ছাড়া পেতে চাইছে ওর কাছ থেকে।
#চলবে

