#উৎসর্গ
#পর্ব:২০
#তানজিনা ইসলাম
মায়া লাইব্রেরির সিড়িতে বসে আছে।লাইব্রেরীর এই জায়গাটা একেবারে নিরিবিলি।সবুজ ঘাসে ঘেরা,বিভিন্ন দেশি, বিদেশি গাছ নিয়ে এক বিশাল উদ্যানের মাঝখানে অবস্থিত একটি লাইব্রেরি।প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনে ক্লান্ত আমাদের আর সময় হয় না সাহিত্যের চর্চার। তাই ক্লাস চলাকালীন এদিকে তেমন একটা কেও আসে না।এমনিতে ফাঁকাই থাকে যায়গাটা।বেশিরভাগ বাংলাসাহিত্যের ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট আর বই পড়ুয়ারা আসে।আবার অনেকে তাদের অবসরে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়া গুছিয়ে নিতে আসে এখানে।
মায়া নিশ্চুপ, নির্লিপ্ত ।রোজকার মতো ওর বন্ধুদের সাথে হৈ-হুল্লোড় এ ব্যস্ত নেই।সামনে ফাইনাল এক্সাম।তাই প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে রেজিস্ট্রেশন,এডমিড কার্ড দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলছে।ক্লাস হবে না আজকে।ক্লাসরুমে সবাই প্রচন্ড হল্লাহল্লি করছে।প্রচন্ড হৈচৈ, উচ্চ শোরগোলে মায়ার বিরক্ত লাগছিলো।অন্যদিন হলে মায়া নিজেও ওদের সাথে জোগ দিতো,ওর বন্ধুদের সাথে মিলে ক্লাসের অবস্থা আরো খারাপ করে ফেলতো।কিন্তু আজকে এসব ভালো লাগছে না।তাই বন্ধুদের সবাইকে ক্লাসে ফেলে নিরব পরিবেশ খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে এসেছে।ইদানীং জীবনটা কেমন জানি হয়ে গেছে। যাকে পুঁজি করে জীবনে ভালো থাকতে চেয়েছিলো,সেই মানুষটাই যে প্রতিনিয়ত বুঝিয়ে দিচ্ছে তাকে যে,ওর সাথে থাকলে সে ভালো থাকতে পারবে না।প্রতিনিয়ত রুদ্রর বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে মায়া। কিন্তু নিজের অকূল ভাবনা হাতড়েও মায়া এর কোনো সমাধান বের করতে পারে না।কী করলে সব আবার আগের মতো হয়ে যাবে মায়ার জানা নেই।শুধু এটুকু জানে ও, যেদিন রুদ্রকে ছাড়তে হবে সেদিনই সবকিছু শেষ হয় যাবে ওর।মৃত্যুকে ছাড়া আর কোনো কিছু গ্রহণ করার থাকবে না।
মায়ার এসব ভাবনার মাঝেই কেও একজন পেছন থেকে ওর মাথায় গাট্টা মারে।মায়া চোখমুখ কুঁচকে কিছু বলার জন্য পেছনে তাকালো।তখনই পেছন থেকে আরিয়ান হাস্যজ্বল মুখে সামনে এলো।মায়া দমে গিয়ে কিছু বললোনা।আরিয়ান সামনে এসে মায়ার পাশে বসলো।মায়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো
-“এখানে একা একা বসে আছিস কেন?জানিস ক্লাসে কী কী কাহিনি হচ্ছে?অনেক কিছু মিস করে ফেললি রে। টিচার ঢোকার একটু আগে চুপিচুপি বের হয়ে চলে এসেছি ক্লাস থেকে।কিন্তু ওইগুলা বের হতে পারেনি।বেচারাগুলা যখনই বের হতে যাবে তখনই স্যার এসে ঢুকলো ”
-“ধুর।এরা আসলে আমার কান আরো ঝালাপালা করে দিতে।ভালোই হয়েছে বের হতে পারেনি।
একটু থেমে বললো
-“ভালো লাগছে না রে কিছু।তাই বসে আছি এখানে।সবাই চেচামেচি করছে ক্লাসে,ভালো লাগছিলো না এসব।”
মায়া ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো।
আরিয়ান অবাক হয়ে বললো
-“ও মাই গুডনেস।এসব কার কাছে শুনছি আমি।যার চিৎকার চেচামেচিতে পুরো ক্লাসের সবাইকে ছাড়িয়ে যেত তার নাকি এখন বিরক্ত লাগছে এসবে।”
-“এই ছেলে, এই এখানে এসে বিরক্ত করছিস কেন? কতো সুন্দর এখানে নিরবতা কাটাচ্ছিলাম।এসে বিরক্ত করা শুরু করে দিয়েছে।”মায়া বিরক্তিকর স্বরে বললো।
আরিয়ান এবার সিরিয়াস হয়ে বসলো।পর পর মায়ার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো
-“তোর কী মন খারাপ? ”
-“মন খারাপ হবে কেন?এমনি বসে থাকতে পারি না?প্রতিদিনতো একরকম নাও লাগতে পারে।”
-“সত্যি করে বলতো রুদ্রর সাথে আবার ঝগড়া লেগেছে?একমাত্র রুদ্রর সাথে ঝগড়া লাগলেই তুই এভাবে মনমরা হয়ে থাকিস।”
-“ঝগড়া লাগবে কেন?এমনিই এভাবে বসে আছি।”
মায়া গাছের ঢাল দিয়ে সিড়ির মেঝেতে আঁকিবুঁকি করতে করতে বললো।আরিয়ান মায়ার হাত থেকে ঢালটা নিয়ে দুরে ছুড়ে মারলো।
গম্ভীর কন্ঠে বললো
-“যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দে।কয়েকদিন ধরেই দেখছি, দুজন দুজনের সাথে ভালো করে কথা বলিস না।একসাথে বসিস না পর্যন্ত। কাহিনি কী বলতো।ঝগড়া লেগেছে? ”
মায়া মাথা নিচু করে ফেললো।কপালের ছোটো ছোটো চুলগুলো মুখের উপর এসে মুখমণ্ডল ঢেকে দিয়েছে।আরিয়ান ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে।
মায়া কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো
-“ওর সাথে আমার ঝগড়া লাগে না রিয়ান।কিন্তু ওর সাথে কী হয় আমি নিজেই বুঝতে পারি না।আমি বুঝি ও থাকতে চায়না আমার সাথে।কিন্তু আমিতো থাকতে পারবো না ওকে ছাড়া।আমি আমার সব দোষ, সব অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছি।আমি জানি আমিই দোষী।তারপরও থাকতে চাই আমি ওর সাথে।
একটু থেমে ঢোক গিলে আবার বললো
-“জানিস রিয়ান, ও আমাকে সহ্য করতে পারে না।আমাকে দেখলেই রেগে যায়।আমার মুখ দেখলেই নাকি ওর প্রতি হওয়া অন্যায়ের কথা মনে পরে যায়। ও নাকি আমাকে বউ হিসেবে মানতে পারে না।আমিও বুঝি ও আমার চেয়েও বেটার কাওকে ডিজার্ভ করে।”
এই বলে মায়া থামলো।এখনো একবারো চোখ তুলে দেখেনি আরিয়ানকে।আরিয়ান বিষ্ফোরিত নয়নে চেয়ে আছে।রুদ্র যে এসব বলতে পারে তা ওর ধারণার বাইরে।মায়াকে সহ্য হয় না রুদ্রর এটাও বিশ্বাস করার মতো কথা?
আরিয়ান ক্ষীণ কন্ঠে বললো
-“আমার বিশ্বাস হয় না মায়ু। রুদ্র এমন করতে পারে তা আমার বিশ্বাস হয় না।আরশির সাথে ও কখনই সিরিয়াস রিলেশনে ছিলো না।ওর অন্য গার্লফ্রেন্ডের মতোই আরশিও ছিলো ওর লাইফে।আরশির জন্য তোর সাথে এমন করছে না ও।
-“তাহলে কীসের জন্য এমন করছে?বলতে পারবি কীসের অভিযোগে আমার সাথে এমন করছে? জোর করে বিয়ে করা ছাড়া আর কোনো অভিযোগ আমার নামে থাকার কথা না।”
-“আমি রুদ্রকে বোঝাবো দোস্ত। তুই এভাবে কষ্ট পাস না। কিছুতো একটা সমস্যা হয়েছে,সেটা খুঁজে বের করতে হবে। আমি জিজ্ঞেস করবো মায়ু।আমি কথা বলবো ওর সাথে।”
-“কথা বলেও কোনো লাভ হবে না।যাকে আমি আমার নিরবতা দিয়েও কিছু বোঝাতে পারিনি,তাকে রচনা লিখে দিলেও বুঝবে না।ও আমাকে ভলোবাসবে না রিয়ান।কোনোদিন বাসবে না।আমি ওকে পেয়েও প্রতিনিয়ত হারিয়ে ফেলছি।”
মায়া ভাঙ্গা গলায় বললো।আরিয়ান মায়ার হাত ধরতে চেয়েও ধরলো না।উৎকন্ঠা নিয়ে বলে উঠলো
-“কে বলেছে তোকে ভালোবাসে না ও?তোর মতো একজনকে ভালো না বেসে থাকা যায় নাকি?এখন কিছু একটা হয়েছে ওর তাই এমন করছে।দেখিস তুই তোর ভালোবাসাকে হারাবি না।হারাতে পারিস না।
-“হারিয়ে যাবে রে রিয়ান।আমি আমার ভালোবাসাকে হারিয়ে ফেলবো।আর যেদিন আমার ভালোবাসা হারিয়ে যাবে,সেদিন আমিও এই দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাবো।”
আরিয়ান আঁতকে উঠলো। কী সব ভাবছে মেয়েটা? বিরহে কী দিক্বিদিক হারিয়ে ফেললো?এতো শক্ত মেয়েটা কিভাবে হেরে যাওয়ার কথা বলছে। এতোটা অসহায় কখন হয়ে গেছে ও!
আরিয়ান মায়ার বসা সিঁড়ি পেরিয়ে নিচের সিঁড়িতে নামলো।বিরহে ভেসে যাওয়া মায়াকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করে বললো
-“এসব কী বলছিস তুই?পাগল হয়ে গেছিস? কেন তোর এসব মনে হচ্ছে? কেন মনে হচ্ছে যে তুই তোর ভালোবাসাকে হারিয়ে ফেলবি?”
-“কারণ তুই আমাকে অভিশাপ দিয়েছিস”।
আরিয়ান স্তব্ধ, বিমূঢ় হয়।কী বলছে এসব মেয়েটা?ঠিক কী কারণে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে কেও অভিশাপ দিবে? মায়া কী জানে, আরিয়ান নিজের মা-বাবার পর এ মেয়েটাকে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছে। সারাজীবন এ মেয়েটার ভালো চেয়েছে। কী করে আরিয়ান ওঁকে অভিশাপ দিতে পারে।
আরিয়ান কাঠ গলায় বললো
-“আমি? আমি অভিশাপ দিয়েছি তোকে?”
-“হ্যাঁ।”
মায়া উদাস স্বরে বললো।
-“কেন অভিশাপ দেবো তোকে আমি?কোনোকালে আমার ক্ষতি করেছিস বলে তো মনে পরে না আমার। যার কারণে অভিশাপ দিবো তোকে।”
-“অভিশাপ তুই দিসনি।অভিশাপ দিয়েছে তোর ভালোবাসা।তুই আমাকে ভালোবেসে কষ্ট পেয়েছিস,তাই তোর ভালোবাসা অভিশাপ দিয়েছে আমাকে।”
আরিয়ান বাকরুদ্ধ। যাকে না পাওয়ার কারণে এতোটা যন্ত্রণা পেয়েছে,কষ্টে প্রতিনিয়ত দগ্ধ হয়েছে, কতো রাতের ঘুম নষ্ট করেছে তারপরও তাকে ভালোবাসার কিচ্ছু বুঝতে দেয়নি।তারপরও সে বলছে তাকে অভিশাপ দিয়েছে সে।এত বড় অপবাদ?
মায়া এতক্ষণে চোখ তুলে তাকিয়েছে আরিয়ানের দিকে।আরিয়ান অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।
অনেক কষ্টে তুতলিয়ে বলার চেষ্টা করলো
-“কী বলছিস এসব? আমি কেন তোকে ভালোবাসতে যাব?”
মায়া আরিয়ানের চোখে চোখ রাখলো। শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো
-“ভালোবাসিস না?”
-“ভালোবাসি না তা না।ভালোবাসি,একজন বন্ধুর মতো।কোনো ছেলে তার প্রেমিকা কে যেভাবে ভালোবাসে সেভাবে না।”
-“তাই বুঝি?মিথ্যে, মিথ্যে বলছিস তুই।আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল, আমাকে ভালোবাসিস না তুই? আমার জন্য তোর মনে বন্ধুত্ব ব্যাতিত আর কোনো অনুভূতি নেই।”
আরিয়ান মায়ার চোখের দিকে তাকাতে পারলো না। মায়া মলিন হাসলো। বললো
-“কেনোএভাবে লুকিয়ে কষ্ট পেলি, রিয়ান?লাইব্রেরি তে দেখলাম যে দুটি চিঠি লেখা? চিঠির শব্দ তো মিথ্যে হয় না।যে নিজর সাথে কথা বলে, দিনলিপি লেখে তার অনুভূতি কী করে মিথ্যে হতে পারে?”
আরিয়ান বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো।তারমানে লাইব্রেরি তে রাখা চিঠি দুটো পেয়েছে মায়া।কিন্তু ওগুলো তো তাকের মধ্যে বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছিলো।পেলো কিভাবে মেয়েটা? আরিয়ান আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো
-“কী পেয়েছিস?আর কোন চিঠির কথা বলছিস তুই? ”
-“আমাকে গাধা মনে হয় তোর?বই পড়তে গিয়েছিলাম।তোর চিঠি দুটো পড়ে আর বই পড়া হলো না।এতবড় চিঠি লিখেছিস যে পড়তে পড়তে প্রায় এক ঘন্টা চলে গেলো। চিন্তা করিস না আবার আগের জায়গায় রেখে এসেছি।”
আরিয়ান কিছু বললো না।সব জেনেই যখন গিয়েছে বলে আর লাভ কী?শুধুমাত্র বন্ধুত্ব ভাঙ্গার ভয়েই তো কোনোদিন নিজের ভালোবাসার কথাটা জানায়নি ওকে।তাহলে কেনো ওই চিঠি দুটো পেয়ে গেলো ও?আরিয়ানের ভয় লাগছে মনে মনে।এখনতো মায়া সব জেনে গেছে। এখন কী ওর সাথে বন্ধুত্ব ভেঙে দেবে?কত হাবিজাবি লিখেছে চিঠি দুটোতে।কত অভিমান,দুঃখ প্রকাশ করেছে।ভালোবাসার কথা জানিয়েছে। কষ্টগুলো সব যেন ভরে ভরে লিখেছে কাগজের পাতায়।ইশ!মায়াতো সব দেখে ফেললো।
আরিয়ানের নিরবতা দেখে মায়া নিজেই বললো
-“কিছু বলতে চাস?”
আরিয়ান নিশ্চুপ।
-“বল আরিয়ান, কিছুতো বল।চুপ থাকিস না এভাবে। চিঠি দুটো কখন লিখেছিস?আমি সব জানতে চাই।”
-“বাদ দে না।জেনে কী করবি?”
আরিয়ান উদাস কন্ঠে বললো।
-“কিছু করবো না।তারপরও শুনতে চাই সব।কখন লিখেছিস চিঠি দুটো? ”
-“একটা তোর বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন, আরেকটা ওই যে তোর সাথে সকালে দেখা করতে গিয়েছিলাম সেদিন।”
-“বলিসনি কেন আমাকে?”
-“বললে বুঝি তুই রুদ্রকে ছেড়ে আমাকে বিয়ে করতি?”
মায়া উত্তর দিলো না।এই উত্তর দিলে আরিয়ান কষ্ট পাবে।এমনিতেই তো অনেক দুঃখ পেলো ছেলেটা।
আরিয়ান তাকালো মায়ার মুখের দিকে উত্তরের আশায়।উত্তর না পেয়ে মলিন হাসলো।ওতো জানে উত্তর টা।তারপরও জিজ্ঞেস করেছে। বেহায়া মনটা যে মানে না।তাকেই উড়ে উড়ে ভালোবাসতে যায়, যে অন্যের ভালোবাসায় বুদ হয়ে আছে।
-“আমাকে কেন ভালোবাসলি আরিয়ান?”
মায়া আকাশ পানে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো।
-“কষ্ট পাওয়ার জন্য। “অকপট স্বীকারোক্তি।
-“পাচ্ছিস?”
-“হুম।কষ্ট পাওয়ার জন্যই তো ভালোবাসলাম।এটা জেনেও ভালোবাসলাম যে আমার ভালোবাসা কোনোদিন আমাকে ভালোবাসবে না।কোনোদিন চায়বে না আমাকে।তাহলে এখন কষ্ট পাবো না কেন?তুইও তো কষ্ট পাচ্ছিস! ভালোবাসলেই কী কষ্ট পেতে হয়?”
-“ভালোবাসা মানেই তো কষ্ট পাওয়া। কারো আচরণ তোকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে ফেলছে, তবুও তুই তাকে ঘৃণা করতে পারছিস না! যেমন আমি।”
আরিয়ান মলিন হাসলো। মায়া ঢোক গিলে বললো
-“খারাপ লাগে না তোর?কী করে না বলে থাকলি এতোদিন?”
আরিয়ান আবার হাসলো।নম্র কন্ঠে বললো
-“লাগেতো মায়ু।অসম্ভব যন্ত্রণা হয় বুকের মধ্যে। কিন্তু কাউকে দেখাতে পারি না।নিজের ভালোবাসার মানুষকে অন্যের সাথে সহ্য করা এতো সহজ না দোস্ত। তারপরও তোদের দুজনকে আমি প্রতিনিয়ত চোখের সামনে একসাথে দেখি।জানিস,এমন মনে হয় যে কেও প্রতিনিয়ত বুকের মধ্যে ছুরিকাঘাত করছে।আমি সইতে পারি না।”
আরিয়ানের গলা কাঁপছে।প্রতিটা কথা বেজে বেজে বের হচ্ছে।
মায়া এগিয়ে গেলো আরিয়ানের কাছে।পিঠে আলতোভাবে হাত রাখলো।আরিয়ান মুখে হাত দিয়ে জানে-প্রাণে তার কান্না আটকাচ্ছে।শুধুমাত্র আজ ছেলে বলেই হয়তো মনের কষ্টগুলো চোখের পানি দিয়ে বের করতে পানছে না।এদিক দিয়ে মেয়েদের অনেক সুবিধা, একটু কষ্ট পেলেই কেঁদে সাগর বানিয়ে ফেলতে পারে।আজকে হয়তো আরিয়ান মেয়ে হলে কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিতো।
মায়া সান্ত্বনার সুরে আরিয়ানকে বললো
-“কষ্ট পাস না রিয়ান।জীবনে সবকিছু পেতে হবে এমন কোনো কথা নেই।কিছু অপূর্ণতা না থাকলে আফসোস করবি কী নিয়ে?আমাকে দেখ, তুই না পেয়ে আফসোস করছিস,আর আমি পেয়েও আমার আফসোস শেষ হচ্ছে না।”
-“বিশ্বাস কর মায়ু,আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি।অনেক যন্ত্রণা বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছি।তারপরও কোনোদিন আমার মুখ দিয়ে অভিশাপ বের হয়নি তোর জন্য। আমি সবসময় দোয়া করেছি যাতে তুই আর রুদ্র সবসময় ভালো থাকিস।তোদের যাতে একটা সুখের সংসার হয়।আমি তোকে পাইনি তাতে কী হয়েছে?আমার ভালোবাসা তো কোনোদিন শেষ হবে না।আমি দুর থেকেই ভালোবেসে তোর ভালো চাইবো।”
-“রিয়ান, আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে।নিশ্চয়ই এতে আমাদের ভালো ছিলো,তাই এমন হয়েছে। এখন যদি তুই কষ্ট পাস,আমার অসম্ভব গিল্ট হবে।তোর সামনে আসলে অপরাধবোধে আমার মুখ দিয়ে কথা বের হবে না।আমাদের স্বাভাবিক বন্ধুত্বের সম্পর্কে জড়তা চলে আসবে। তুই কী চাস, এমন হোক?
-“আমি চাই না মায়ু।এসব ভুলে যা।আমাদের বন্ধুত্ব আগের মতোই থাকবে।তুই,রুদ্র সারাজীবন আমার বেস্টফ্রেন্ড থাকবি।এসবে যাতে আমার বন্ধুত্বের উপর প্রভাব না পরে।”
-“পরবে না।প্রমিস করছি।”
-“আমি রুদ্রকে বোঝাবো মায়ু।ওর এসব কাহিনির পেছনের কারণ জানতে চাইবো। তোদের সমস্যাটা সল্ভ করার সম্পূর্ণ চেষ্টা করবো।
মায়া আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে দাঁত দেখিয়ে হাসলো।আরিয়ানও মায়ার হাসি দেখে হেসে দিলো।পরপর উঠে দাড়ালো বসা থেকে।হাঁটু ভাঁজ করে বসতে বসতে হাটু ব্যাথা হয়ে গেছে।
মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“উঠে পড়। ক্লাসে যেতে হবে।এতক্ষণে নিশ্চয়ই এডমিট কার্ড দেওয়া শেষ হয়ে গেছে। আমরা লেইটে গেলে শাস্তিস্বরূপ নাও দিতে পারে।আর ওইগুলােও নিশ্চিত বোম হয়ে বসে আছে ক্লাসে।”
মায়া তাকালো আরিয়ানের দিকে।সূর্যরশ্মি আরিয়ানের চোখেমুখে এসে পরেছে।কতটা সরল আর বাচ্চা দেখাচ্ছে ছেলেটাকে।মায়া মনে মনে দোয়া করলো যাতে সৃষ্টিকর্তা ওে সকল দুঃখ দুর করে দেয়। যে ভালোবাসার জন্য এতটা কষ্ট পেলো ছেলেটা সেই ভালোবাসায় যেন জীবনটা আনাচে কানাচে পরিপূর্ণ হয়ে যায়।
‘
‘
‘
#চলবে

