#উৎসর্গ
#পর্ব:৩৪
#তানজিনা ইসলাম
শহরজুড়ে বৃষ্টি। বৈরী আবহাওয়ায় বৃষ্টি থামার কোনো নামই নেই।চট্টগ্রাম শহরে হাটু সমান পানি।পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড় ধ্বসে পরেছে।এছাড়াও নিম্ন গ্রামাঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে।বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের তান্ডবে অনেকে হারিয়েছে তাদের ঘরবাড়ি,জায়গা-জমি, সম্পদ।একটু বেঁচে থাকার আসায় অনেকে গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি দিয়েছে।সবদিকে কেমন জানি হাহাকার অবস্থা।
বিকেলের শেষ সময়।কিন্তু আকাশের অবস্হা দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যা নেমেছে পৃথিবীর বুকে। একদিন আগে দুনিয়া ত্যাগ করা মানুষটাকে আজ দাফন করা হবে।আছরের নামাজ শেষে জানাজা।চৌধুরী ম্যানশনে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যেই মায়াকে গোসল দেয়া হয়েছে। আশেপাশের প্রতিবেশীরা সহ অনেক আত্মীয় এই বৃষ্টির মধ্যেই জানাজা পড়তে এসেছে।
খাটিয়ার মধ্যে শোয়ানো হয়েছে মায়াকে। এলাকার বড় মসজিদের সামনের মাঠেই জানাজা সম্পন্ন করা হবে।
রাহুল এসে মায়ার খাটিয়ার খুঁটিতে হাত দিলো।সামনের আরেকটি খুঁটি ধরলো মুস্তাফিজ খান।পেছনের দুটি খুঁটি ধরলো আরিয়ান আর সাহিল।তাদের সাথে রুয়ান চৌধুরী সহ সবাই কালিমা পড়তে পড়তে সামনে রওনা দিলো। সদর দরজায় দাঁড়িয়ে মেয়েরা কাঁদছে।রুহানি আর রিয়ানা মাহেরা খান কে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। রাফানা চৌধুরী বসে আছেন সদরদরজার সামনে।তাকে ধরে রেখেছে তার দুই বোন।বাড়ির ভেতরটা মানুষে গিজগিজ করছে।রুদ্র আর মায়ার আত্মীয় সহ ওদের বন্ধুদেরও অনেক আত্মীয় এসেছে।
ছেলেরা গেইট পার করতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো।এই বৃষ্টির মাঝেও এক ঝাঁক মানুষ খাটিয়ার আশেপাশে আছে।রাহুল হাটতে পারছে না।কান্নার তোপে শরীর কাঁপছে।ঝুম বৃষ্টির মধ্যে কীভাবে মায়াকে সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে রেখে আসবে ও?এই খাঁটিয়া কেন ধরতে হলো ওকে?এভাবেই তো মায়ার পালকির খুঁটি ধরেছিলো ।সেদিনও এভাবেই সবাই একসাথে গিয়েছিলো মায়ার পালকি নিয়ে। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে সেদিন সবাই হৈ-হুল্লোড় করতে করতে পালকি করে মায়াকে স্টেজের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন বিয়ে ছিলো ওর, ছিলো একটা নতুন জীবনের শুরু।কিন্তু আজ?আজ সব শেষ! বিমর্ষ,বিধ্বস্ত হয়ে সবাই ওঁকে খাঁটিয়া করে মাটির নিচে রেখে আসতে যাচ্ছে, যেখান থেকে ওকে আর কোনদিন ফিরিয়ে আনা যাবে না।রাহুল হিচকি তোলে কাঁদে।বৃষ্টির পানির সাথে চোখের পানি মিশে যাচ্ছে সবার।এই বজ্রপাতের শব্দের চেয়েও মানুষগুলোর হৃদয়ের হাহাকারের শব্দ আরো বেশি।শুধু সেই শব্দগুলো শোনা যাচ্ছে না।
ছেলেরা সবাই খাটিয়া নিয়ে গেইট পার করতেই মাহেরা খান দৌড় দিলেন।বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে জমির মাঝখানে এসে বসে পরেন।চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মায়াকে ডাকেন তিনি।তার মেয়েটা যে একটু অন্ধকার দেখলেই ভয় পায়, সে কী করে ঐ অন্ধকার মাটির নিচে থাকবে? রুহানি দৌড়ে আসে তার কাছে।হাটু মুড়ে বসে আগলে নেয় তাকে।শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
কবরস্থানে পৌঁছে খাটিয়া নামালো সবাই।রাহুল,আরিয়ান আর সাহিল লাঙ্গল দিয়ে কবর খুড়লো।মুস্তাফিজ খান খাটিয়ার সামনে এসে ধ্বপ করে বসলেন।কাঁপা কাঁপা হাতে কাফন সহ নিজের কলিজার টুকরাকে নিয়ে বুকে জড়ালেন।কাঁদতে কাঁদতে নিম্নস্বরে বললেন ‘প্রিন্সেস। ভালো থেকো তুমি।তোমার সুন্দর মুখটা আমি আর দেখতে পাবো না,আম্মু।বাবা তোমাকে অনেক মিস করবে। ‘ মুষলধারে বৃষ্টিতে কাফন ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভেতরে রাখা মানুষটার অবয়ব বোঝা যাচ্ছে না এতে।
সবাই কাফন বাঁধানো মানুষটাকে ধরে কবরে শোয়ালো।আকাশ থেকে টুপটাপ বৃষ্টি পরছে তার শরীরে।আরিয়ান কবরে মাটি দিতে দিতে শব্দ করে কাঁদে। উপরে মেঘে ঢাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে ‘কেন এমন করলে তুমি আল্লাহ?যার সুখের জন্য আমি আমার ভালোবাসাকে ছেড়ে দিয়েছি,তাকেই তুমি তোমার কাছে নিয়ে গেলে।আরেকটু আয়ু দিয়ে ওকে এই দুনিয়ায় কেন পাঠালে না?এতদিন অন্তত এই বলে আমি আমার মনকে শান্ত করেছি যে,আমরা একই আকাশের নিচে আছি,মন চাইলেই তাকে দেখতে পারছি।কিন্তু এখন কীভাবে আমি আমার মনকে বুঝ দিব?”
মায়ার দাফন কার্য সম্পন্ন হয়।মুস্তাফিজ খান নিজেকে সামলাতে না পেরে কবরের সামনে বসে পরেন।কবরের মাটি ছুয়ে দিয়ে চিৎকার করে কাঁদেন। রাহুল, আরিয়ান আর সাহিল তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদে।মুষলধারে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে চারজনকে।ধুয়ে দিচ্ছে তাদের পাঞ্জাবি তে ছিটে ফোটায় লেগে থাকা কাদামাটি। কিন্তু বুকের মধ্যে যে প্রিয় জন হারানোর পাহাড় সমান দুঃখ তা কী ধুয়ে দিতে পারছে?বৃষ্টির যে সে ক্ষমতা নেই।
,
নিকষ কালো আধারে ছেয়ে আছে চারিদিক।বজ্রপাতের শব্দে বিজলি চমকানোর কারণে কক্ষে আলোর ছটা পড়ে।নয়তো অন্য কোনো আলোর উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন।বজ্রপাতের বুক কাঁপানো শব্দে রুদ্র চোখ মেলে তাকায়।কিন্তু এই আঁধারের মাঝে নিজেকে অবশ মনে হয়।মস্তিষ্ক স্বাভাবিক হতে সময় নেয় কিছুটা।বেডে হাত ঠেকিয়ে কোনো মতে উঠে বসে।হাতে ভর দিয়ে উঠার ফলে হাতে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব হয়।মাথা ঘুরছে ওর।আশেপাশে তাকিয়ে মনে হচ্ছে যেন কোনো পাতালপুরী তে ফেঁসে গেছে।
রুদ্র হাতের ব্যাথায় চোখমুখ কুচকে নেয়।আলোর ছটায় হাত সামনে এনে দেখে ক্যানোলার স্ট্রিপ লাগানো।স্যালাইন দেওয়া হয়েছিলো ওকে?কিন্তু, কেন?রুদ্র কিছু মনে করতে পারে না।অবশ মনে হচ্ছে নিজেকে।
পানির পিপাসা লাগে ওর।দেওয়ালের সাথে হাত ঠেকিয়ে কোনোমতে নিচে নেমে দাঁড়ায়। কিছু সময় দাঁড়িয়ে ধাতস্থ করে নিজেকে।টালমাটাল পায়ে কক্ষের বাইরে বেরোতেই আগরবাতির গন্ধ নাকে এসে লাগে।রুদ্র ভেবে পায় না হঠাৎ আগরবাতি জালানো হলো কেন এই বাড়িতে?
আশেপাশে তাকিয়ে খোঁজার চেষ্টা করে এই বাড়ির মানুষগুলোকে।কিন্তু কাউকেই খুঁজে পায় না।আশ্চর্য? এই বাড়ির মানুষগুলো গেলো কোথায়?আর মায়া? সেও ওকে এই অবস্থায় রেখে কোথায় চলে গেল? রুদ্র এলোমেলো পায়ে হেটে নিচে নামে।এলোমেলো ভাবে হাটার ফলে এক পায়ের সাথে আরেক পা বেজে হোচট খেয়ে পরে যায়।রুদ্র চুল টেনে বসে মেঝেতে।ঘটে যাওয়া সব ঘটনা মস্তিষ্কে হানা দিচ্ছে। রুদ্র বামে ডানে মাথা নাড়ে।না,না সব মিথ্যা।বোকার রাজ্যে বসবাস করা পুরুষটি মনে করলো হয়তো কোনো ভয়ঙ্কর স্বপ্ন ছিলো এসব।রুদ্র হাটুর মধ্যে মুখ গুঁজে বসে।
রুদ্রকে ঐ ভাবে বসে থাকতে দেখে রাহুল দৌড়ে আসলো ওর কাছে এসে মাথায় হাত দিয়ে উৎকন্ঠা নিয়ে বললো
-“রুদ্র,ঠিক আছিস তুই?পরে গেলি কীভাবে?”
রুদ্র মাথা উচিয়ে ছলছল নয়নে তাকায়।রাহুলের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় প্রশ্ন ছোড়ে
-“মায়া কোথায়?”
রাহুল এলোমেলো চোখে তাকায়।জিভ খসিয়ে উত্তর টা দিতে পারে না।রুদ্র আবার প্রশ্ন ছোড়ে
-“কীরে?? বলনা মায়া কোথায়?আমাকে এইভাবে রেখে কোথায় চলে গেছে? ”
রাহুল মেঝেতে পা ছিটিয়ে রুদ্রর মতো করে বসে ওর সামনে।
রাহুলের বিধ্বস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করে
-“তুই কী কাঁদছিলি?কেন কাঁদছিলি?? ”
রাহুল উত্তর দেয় না।মাথা নিচু করে বসে থাকে।রুদ্র অধৈর্য হয়ে বলে
-“কেন কিছু বলছিস না?উত্তর দে!বাড়ির সবাই কোথায়?মায়া কোথায়?”
রাহুল চকিতে উঠে দাঁড়ায়। রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলে
-“উঠ।”
রুদ্র কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলে
-“উঠতে পারছি না।শক্তি নেই শরীরে।”
রাহুল হাত ধরে উঠায় ওকে।কাঁধে করে সিড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে যায়। প্রতিটা সিড়িতে শুধু রুদ্র একটায় প্রশ্ন করে ‘মায়া কোথায়?ওকে একা রেখে কোথায় গেছে?
রাহুল উত্তর দেয় না ওঁকে। কক্ষে গিয়ে বালিশ দিয়ে পিঠ ঠেকিয়ে বিছানায় বসায়।রুদ্র সমানে প্রশ্ন করে যাচ্ছে ‘মায়া কোথায়??’
রাহুল বিছানার উপর পা তুলে ওর সামনে বসে।রুদ্র ওর দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলে
-“মায়া নেই।”
-“নেই মানে?কোথায় গেছে?”বাচ্চাসুলভ প্রশ্ন।
-“চলে গেছে। ”
-“আবার রাগ করে বাবার বাড়ি চলে গেছে? কিন্তু এখনতো আমি রাগ করার মতো কিছু করিনি।”
রাহুলের চোখ থেকে পরপর কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পরে।বড়ো বড়ো শ্বাস নিয়ে ভেজা গলায় বলে
-” ও বাবার বাড়ি যায়নি রুদ্র।ও রাগ করে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে।গতকালকে আমরা ওকে সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে রেখে এসেছি।”
রুদ্র বোকা বোকা চোখে তাকালো রাহুলের দিকে।শান্ত স্বরে বললো
-“স্বপ্ন ছিলো না ওসব!”
রাহুল মুখে হাত চেপে কাঁদে। চোখ মুছার প্রয়াস চালায় না।রুদ্রকে বলে
-“আমরা তোর জন্য অপেক্ষা করেছিলাম রুদ্র।কিন্তু ডক্টর বলেছিলো তোর মস্তিষ্কে চাপ পরেছে।তুই জানাযা পরার মতো অবস্থায় ছিলি না।তারপরও তোকে তোলার চেষ্টা করেছি অনেকবার।পারিনি তোকে তুলতে।দুইদিন ধরে সেন্স ছিলো না তোর।স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছিলো তোকে।
রাহুল ঢোক গিললো।রুদ্রর দিকে না তাকিয়ে বললো
-“তোর জ্ঞান ফেরার কোনো চান্স ছিলো না।অপেক্ষা করার মতো পরিস্থিতি ছিলো না রুদ্র। বেশিক্ষণ রাখা সম্ভব ছিলো না ওকে।রাখলে ও আরো কষ্ট পেতো। তুই কী চাস তোর মায়া কষ্ট পাক?”
রাহুল তাকালো রুদ্রর দিকে।তাকিয়ে অবাক হলো ভীষণ। রুদ্রর শান্ত দৃষ্টি, যেন কিছুই হয়নি।রাহুল চোখ মুছে বললো
-“রুদ্র, তোর কান্না পাচ্ছে না?তোর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ টা আর নেই রুদ্র!তোকে কখনো আর নাম ধরে ডাকবে না সে!তোকে আর কখনো শাসন করবে না।তোর জন্য আর কখনো অপেক্ষা করবে না।তোকে ছেড়ে চলে গেছে সে।আর আসবে না কখনো।তুই হাজার ডাকলেও আর আসবে না।”
রুদ্র তবুও নির্লিপ্ত, নিশ্চুপ। রাহুল ভয় পায় ওর এই নিশ্চুপতা দেখে।কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বলে
-“কাঁদ রুদ্র।একটু কান্না কর।হালকা কর নিজেকে।নয়তো এই ভার সইতে পারবি না তুই!”
রাহুল কান্না করে দেয় রুদ্রকে জড়িয়ে ধরে।রুদ্রর তবুও কোনো ভাবাবেগ হয় না।রাহুলের ভয় করে।রুদ্রর এই শান্ত ব্যবহারে মনের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
,
সময়টা ঠাওর করা যাচ্ছে না।রাতের ঠিক কোন সময় চলছে সেটা জানা নেই।রুদ্র মেঝেতে পা ছড়িয়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। আলগোছে হাতে কালো রঙের মলাটে আবৃত একটা ডাইরি ধরে রাখা।শুষ্ক,ভারাক্রান্ত দুটি চোখে চিন্তা, আবেগের লেস মাত্র নেই।যেন দেহ এখানে থাকলেও মন-মস্তিষ্কের চিন্তা অন্য কোথাও পাড়ি জমিয়েছে।
ডাইরির কভার উল্টাতেই প্রথম পৃষ্ঠায় গুটিগুটি অক্ষরে লেখা, ‘ডাইরির লেখা আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির জন্য। অন্য কারো হাতে পরলে নিজ দায়িত্বে রেখে দিবেন।’
রুদ্র দ্বিতীয় পৃষ্ঠা উল্টায়।পড়তে থাকে
-“আমার জীবনের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি কেটেছে আমার মা-বাবা আর আমার বন্ধুদের সাথে।ওরা শুধু আমার বন্ধু নয় আমার পরিবার,ভালো থাকার প্রেরণা। ছোটোবেলা থেকে ঐ মানুষগুলোর সাথেই মারামারি,হৈ-হুল্লোড় করে বড় হয়েছি।কিন্তু এই মারামারি, দুষ্টামির সম্পর্কে যখন কেও একজনের প্রতি অন্যরকম অনুভুতি চলে আসে তখন!ছোটোবেলা থেকে মা-বাবার অতি আদরে বড় হওয়া সন্তান আমি।হয়তো কিছুটা বিগড়ে গেছি।অনেকের ভাষায় এই কিছুটা বাড়াবাড়ি রকমের।মা-বাবার কাছে যখন যা চেয়েছি তাই পেয়েছি।তাই যেটা চেয়েছি সেটা পেতেই অভ্যস্ত আমি। ছোটোবেলা থেকে এমন ধারণা মনের মধ্যে পুষে রেখেছি যেটা আমার সেটা শুধুই আমার।আমার জিনিসের দিকে কেও নজর পর্যন্ত দিতে পারবে না।এভাবেই এমন একজনকে খুব করে চেয়েছি আমি।কিন্তু সে আমাকে চায়নি।সে আমাকে শুধু বন্ধুর মতোই চেয়েছে।আমি ছাড়া অন্য সব নারীকেই সে প্রেমিকা হিসেবে গ্রহন করতো।আমার ভয় লাগতো তাকে নিজের মনের কথাগুলো বলতে,যদি সে বন্ধুত্ব ভেঙে দেয়।কিন্তু সে আমার সামনেই অন্য নারীর সাথে মিশতো।আমার হিংসা হতো,অসম্ভব হিংসায় বুক জ্বলতো।কিন্তু সে মানুষটা বুঝতো না আমার অনুভূতি। হয়তো বুঝেও কষ্ট দিতে ভালো লাগতো আমাকে।
হুট করে একদিন ওর মা-বাবা আর আমার মা-বাবা ওর সাথেই আমার বিয়ে ঠিক করলো।সেদিন আমি জীবনের সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলাম।এমন মনে হয়েছিলো আমি আমার জীবনের সবকিছু পেয়ে গেছি।এই দুনিয়ায় আমার আর কিছু চাওয়ার নেই।কিন্তু সবাই রাজি থাকলেও আমার প্রিয় মানুষ টা বিগড়ে বসলো।সে কোনোমতেই বিয়ে করতে রাজি ছিলো না আমাকে।
কিন্তু আমি যে ডেস্পারেট ছিলাম তাকে পাওয়ার জন্য। আমার সবকিছুর বিনিময়ে হলেও তাকে পাওয়ার ছিলো।এই অতিরিক্ত চাওয়ার কারণে ছলনা করে বসলাম তার সাথে।হয়তো কোনো না কোনোভাবে ঠকিয়েছি তাকে।মিথ্যা নাটক সাজিয়েছি।কষ্ট পেয়েছিলো সে।আমি তাকে কষ্ট দিতে চাই নি।আমিতো শুধু তাকে নিজের করে পেতে চেয়েছিলাম।
আমার ভালোবাসাটা সে দেখলো না।সে শুধু দেখলো আমার ছলনা টা।
সে আমার সাথে থাকতে চায়নি।আমার মনে হয়েছিলো কোনো না কোনো একদিন ও আমাকে ভালোবাসবে।হয়তো আমার সাথে ভালো থাকবে।কিন্তু ও আমার সাথে থাকতেই চায়নি কোনোদিন।আমার না অনেক কষ্ট হতো,যখন আমি দেখতাম, ও আমার সাথে ভালো নেই।ও আমাকে চায় না।”
কিছু পৃষ্ঠা খালি।ছয় পৃষ্ঠা থেকে আবার লেখা শুরু।
আরশি সুইসাইড করে বসলো।আমার প্রিয় মানুষটার প্রাক্তন।ও এখন বেশিরভাগ সময় আরশির সাথে থাকে।আরশির খেয়াল রাখে।আমি ভুল ধরি না এতে।একজন অসুস্থ মানুষের পাশে থাকতেই পারে ও। কিন্তু আমার সাথে কেন এমন করে ও?প্রতিনিয়ত আমাকে বুঝিয়ে দেয়, ও আমাকে চায় না।আমি ওর জীবনে বোঝা।ও অনেক চেষ্টা করেছে আমার সাথে ভালো থাকার,সংসার করার।কিন্তু ও নাকি ব্যর্থ হচ্ছে বারংবার।ও সমঝোতা করতে করতে ক্লান্ত। আমার সাথে থাকা ওর পক্ষে সম্ভব না।ও মুক্তি চায়,ডিভোর্স চায়।এই পুতুলখেলার সংসার ও আর করতে পারছে না।কিন্তু আমি কী করে থাকবো ওকে ছাড়া? ওকে এক বিন্দু না দেখলে যে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে।
বাড়িতে চলে এসেছি।ওর একটু সময় দরকার।ও বুঝতে পারছে না ওর কী করা উচিত! ও কনফিউজড হয়ে গেছে,আমার সাথে থাকবে নাকি না?
কতদিন হলো আমি ও বাড়ি থেকে চলে এসেছি।কিন্তু রুদ্র একবারো খোঁজ নেয়নি আমার।বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি সেটাও জানে না ও।ভালোই আছে আমাকে ছাড়া।আমি মরি বা বাঁচি তাতে ওর কী? আজ ভার্সিটি তে দেখলাম আরশির সাথে।ভালোই লাগছিলো দুজনকে।হাসছিলো দুজন।খুশি উপচে পরছিলো দুজনের মুখে।কিন্তু আমার সাথে থাকলে ও একটুও হাসতো না।উল্টো বিরক্ত হতো আমার সব কথায়।গোমড়ামুখে কথা বলতো আমার সাথে।
আমার আর সহ্য হচ্ছে না।কী করব আমি? কোথায় যাব?কী করলে এই মানসিক যন্ত্রণা গুলো থেকে মুক্তি পাবো?কী করলে ওর স্মৃতি আমাকে আর তাড়া করে বেড়াবে না?প্রতিটি সেকেন্ডে মনে পরছে।খুব করে মন চাচ্ছে একটু করে কথা বলতে ওর সাথে।একটু করে ফোন করে কথা বলতে মনটা কেমন করছে।কিন্তু পারছিনা!ও আবার বিরক্ত হবে আমার নাম্বার দেখে।নাকমুখ কুচকে বিরক্তির সহিত হয়তো ফোন কেটে দেবে।
রাতে ঘুম হচ্ছে না।ঘুমোতে গেলেই আজেবাজে স্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায়।ওর স্মৃতি আমাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না।আমি ক্লান্ত, ঘুমের মেডিসিন নিতে নিতে।কোথায় গেলে একটু শান্তি মিলবে।কোথায় গেলে আমি আমার বেস্টফ্রেন্ড কে খুঁজে পাবো?যে আমাকে বন্ধু হিসেবে হলেও ভালোবাসতো।কিন্তু আমি যে ওকে নিজের করে পাওয়ার আশায় নিজের বন্ধুত্বও হারালাম।আমি ক্লান্ত হয়ে পরেছি ওর ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা করতে করতে।আমি আর পারছি না।অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে আমার।এই কষ্ট থেকে মুক্তি কখন মিলবে?একমাত্র মৃত্যুই আমাকে এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারবে।একমাত্র মৃত্যুই আমার প্রিয় মানুষটাকে আমার থেকে মুক্তি দিতে পারবে।আর আমার থেকে মুক্তি পেলেই ও ভালো থাকবে।নিজের প্রিয় মানুষ টাকে অন্যের সাথে দেখার মতো মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করার চেয়ে মৃত্যুই কী শ্রেয় নয়।
প্রতিটা পৃষ্ঠা কুচকে আছে।নিঃসন্দেহে প্রতিটি লাইন লেখার সময় মায়ার চোখের পানি টপটপ করে পরেছে ডাইরির পাতার উপর।কয়েকটা খালি পৃষ্ঠার পর চিঠির ন্যায় লেখা
প্রিয়া রুদ্র,
ভালোবাসা বুঝিস?বুঝবি কী করে?কোনোদিন তো কাউকে ভালোবাসিস নি।কোনোদিন তো কারো ভালোবাসার জন্য বুক পেতে বসে থাকিস নি।কীভাবে বুঝবি এক তরফা ভালোবাসার জ্বালা।কিন্তু,আমি ভালোবেসেছি রুদ্র। কাউকে খুব করে ভালোবেসেছি আমি। এমন একজনকে ভালোবেসেছি যে আমাকে ভালোবাসে না।প্রতিনিয়ত তার কাছে ভালোবাসার দাবি নিয়ে গিয়েছি,তারপর ভাঙা মন নিয়ে ফিরে এসেছি।সে আমাকে ভালো না বাসুক রুদ্র।কিন্তু তার প্রতি তো আর আমার ভালোবাসা কমবে না।তাকে ভালোবাসতে গিয়ে আমার মৃত্যু হোক।কিন্তু তারপরও তার প্রতি আমার ঘৃণা না আসুক।
বন্ধু,
অনেক অনেক সরি তোকে।অনেক অন্যায় করেছি তোর সাথে।ছলনা করেছি।মাফ করে দিস আমাকে।মনের মধ্যে কষ্ট রাখিস না কেমন!জীবনটাকে আরেকবার সুযোগ দিস।যেভাবে সবসময় আমাদের বিয়ে টাকে পুতুল খেলা বলতিস,সেভাবে পুতুল খেলা মনে করে ভুলে যাস বিয়েটা।কিন্তু আমাকে ভুলে যাস না আবার।তোর ছোটোবেলার বেস্টফ্রেন্ড হিসেবে সারাজীবন মনে রাখবি আমাকে।আর হয়তো বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না এই দুনিয়ায়।দোয়া করবি আমার জন্য। আরশি কে বিয়ে করেনিস।ভালো থাকিস দুজনে কেমন!তুই ভালো থাকলে আমিও ভালো থাকবো।আমি সবসময় তোর সাথেই থাকবো রুদ্র।তুই আমাকে ছুতে না পারলেও অনুভব করতে পারবি।আমাদের আবার দেখা হবে।কোথাও না কোথাও আমাদের দেখা হবেই। ইহকালে তোর দাবি ছেড়ে দিলেও পরকালে আমি তোর দাবি ছাড়বো না।স্বর্গদারে তোর অপেক্ষায় থাকবো আমি।সেদিন আমার থেকে তোকে কেও কেড়ে নিতে পারবে না।সেদিন তুই শুধু আমার হবি।শুধুই আমার।
ইতি
তোর বেস্টফ্রেন্ড।
রুদ্র ডাইরি বন্ধ করলো।বুকের ভেতরটা হাসফাস করছে চিৎকার করে কাঁদার জন্য।কিন্তু কাঁদতে পারছে না ও।চোখ দিয়ে একটু পানি পরছে না।রুদ্র বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয়।নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আশেপাশে তাকিয়ে চেনা মুখকে খোঁজার প্রয়াস চালায়।কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও খুঁজে পায় না তাকে।কী করে পাবে?মানুষ টা যে ছেড়ে চলে গেছে ওকে। অনুভূত হচ্ছে না কিছুই।ওর দেহটা বেঁচে আছে। কিন্তু আত্মা যে ঐ মানুষ টার সাথেই সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে দাফন হয়ে গেছে।
#চলবে

