আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_২ #জান্নাত_সুলতানা

0
38

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_২
#জান্নাত_সুলতানা

সকালের নাশতা শেষ আজ সানায়া দ্রুত স্কুল চলে গেলো। সে কিছুতেই নির্ভাণ নামক নিষ্ঠুর পুরুষ টার সামনা-সামনি হতে রাজি নয়।

কোচিং শেষ সানায়া লাইব্রেরিতে এসে বসলো। অপেক্ষা বান্ধবীদের জন্য। এই লাইব্রেরির ছেলেটা খুবই ভালো। এখন পার্টটাইম জব করে ছেলেটা। পড়াশোনার পাশাপাশি সকাল টা এখানে কাজ করে সে৷ সানায়া এখানে প্রায় আসে বলে ছেলেটার সাথে টুকটাক কথার মাঝে পরিচয় ও হয়েছে।

আজ সে আগেই এসছে। একটা কোণে চুপচাপ বসে সে নিজের ব্যাগ থেকে একটা বই বের করলো। মোটেও সে একাডেমি বই বের করে নি। এটা একটা উপন্যাসের বই। অর্ধেক টা পড়েছে আজ বারো দিন লাগিয়ে। মা দেখলে কপালে দুঃখ আছে তার। এইজন্যই সে বইটা লুকিয়ে রাখে আর স্কুলের এই সময় টা সে বই টা পড়ে।

“সানায়া!”

নিজের নাম শুনে সানায়া বই থেকে দৃষ্টি তুলে সামনে চাইলো। গতকালের সেই জুনিয়র ছেলেটা। খেলার নিয়ম অনুযায়ী যার জন্য সে গান গেয়েছিলো। ছেলেটাকে দেখেই অপ্রস্তুত হলো সানায়া। পরক্ষণেই নিজের নাম নিয়ে ডাকায় গম্ভীর স্বরে বললো,

“আমি তোমার সিনিয়র। পরেরবার আপু বলে ডাকবে।”

ছেলেটা কিছু বললো না। বরং নিজের হাতে থাকা একটা ছোট প্যাকেট সানায়ার সামনে টেবিলে রাখলো। সানায়া ভ্রু কুঁচকে নিতেই ছেলেটা মৃদু হেঁসে বললো,

“এটা তোমার।”

“কী এটা?”

“নিজেই দেখে নিয়ো।”

“এই ছেলে এই তোমাকে না বলেছি আমাকে আপু বলবে।”

ছেলেটা আর শুনলো না কিছই। লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে গেলো হন্তদন্ত হয়ে। সানায়া বিরক্ত হয়ে প্যাকেট হাতে নিলো। সেটা খুলে চক্ষু কপালে উঠে গেলো। একটা গোলাপ সাথে একটা লিপস্টিক। সানায়া অবাক। এসব কেনো দিয়েছে তাকে ওই ছেলে? যাকগে যে কারণেই দিয়ে থাকুক সানায়া তৎক্ষনাৎ ফুল টা ডাস্টবিনে ফেলে লিপস্টিক ব্যাগে নিতে যাবে তখনই ওর তিন বান্ধবীর এন্ট্রি হলো। এসেই ঘিরে ধরলো বেচারি কে। সানায়া সব বলে দিলো। বলতে গিয়ে লজ্জায় ঠোঁট মুখের ভেতর পুরে নিচ্ছিলো। যতোই হোক কিশোর মন বলে কথা।

—–

নির্ভাণ সকাল থেকে খুব দৌড়ের ওপর আছে। তারা ভার্সিটির সিনিয়র। ভার্সিটির বিভিন্ন প্রোগ্রামের দায়িত্ব বেশিরভাগই তাদের ওপর। সামনে মাসে ষোল ডিসেম্বর আর সেটারই প্রস্তুতি চলছে। পাবলিক ভার্সিটির নিয়ম অবশ্য বেশ ভালো। পড়াশোনার পাশাপাশি সব কিছুর সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায় এখানে। সাংস্কৃতিক উৎসব থেকে প্রায় সব রকম দিবস ও পালন করা হয়। আর সেই সাথে কিছু প্রতিযোগিতা হয় এই দিনগুলোতে। ষোল ডিসেম্বরে বিজয় দিবস উপলক্ষে সেভাবেই চলছে আয়োজনের পরিকল্পনা। হল রুমে নির্ভাণ একটা খাতা কলম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লিস্ট করছে যারা বিভিন্ন খেলাতে অংশগ্রহণ করছে। ছাত্রছাত্রীরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নির্ভাণ একটা খাতায় নাম লিখছে। গান, কবিতা, নাচ, আবৃতি, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে নাম লিখচ্ছে স্টুডেন্টরা। নির্ভাণের পাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি ছেলেপেলে। ভার্সিটিতে সাধারণ যেমন হয়ে থাকে। কিছু জুনিয়র সিনিয়রদের খুব মানে তেমনই। তাদের মধ্যে নির্ভাণের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হচ্ছে ইকবাল এবং তিয়ান। তিয়ান ছেলেটার বাড়ি গ্রামে। আর ইকবাল হচ্ছে নির্ভাণের কিন্ডারগার্টেনের বন্ধু। ওদের মধ্যে ভালো বন্ডিং।
দুপুর হতেই লাঞ্চ টাইমে ব্রেক পাওয়া গেলো। তবে নির্ভাণ খেতে যায়নি। সে কিছু কাজ এখনোই গুছিয়ে রাখছে। কারণ সন্ধ্যায় তাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে।

“এই নে খা ভাই। খেয়ে কাজ কর।”

ইকবাল ক্যান্টিন থেকে নির্ভাণের জন্য খাবার নিয়ে এসছে। নির্ভাণ পাত্তা না দিয়ে কাজ করছে তখনও। একজন জুনিয়র ছেলে অন্য পাশ থেকে বলে উঠলো,

“বাহ্ ইকবাল ভাই, আপনি তো একজন চমৎকার বন্ধু। আর আমার বন্ধুদের দেখুন। না খেয়ে সাতদিন থাকলে-ও খোঁজ নেবে না।”

ইকবাল মেকি হাসলো। জোর করে মাথা দুলিয়ে ঘাড় চুলকে একটা চেয়ারে বসলো। আর তখন তিয়ান পানির বোতল হাতে সেখানে উপস্থিত হলো।

“এতো খুশি হওয়ার কিছু নেই। তুই যে কাজের ভয়ে এসব করছিস কেউ না জানলেও আমি নির্ভাণ ঠিকই জানি।”

“ভাই ব্যাপার টা কী?”

তিয়ানের কথায় ছেলেটা কৌতূহল হয়ে জিজ্ঞেস করলো। গত বছর তাদের সিনিয়রদের এক্সামের আগে ভার্সিটিতে একটা প্রোগ্রাম ছিলো। সেটার দায়িত্ব ফাইনালে ইয়ারের তারা নিতে পারেনি। এটার দায়িত্ব তখন স্যারেরা থার্ড ইয়ারের তাদের দেয়। আর প্রথমবারের মতো এতো বড়ো দায়িত্ব পেয়ে ওরা দুই দিন ঘুম খাওয়া বাদ দিয়ে কাজ করছিল। যার ফলে নির্ভাণ প্রোগ্রামের একদিন আগে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এতে করে বাকি কাজ টা সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে বাকিদের। কারণ নির্ভাণ যতোটা সহজে সব কিছু সামলে নিতে পারে তা কেউই পাড়ছিল না। সাথে সিনিয়রা একটু মজাও নিয়েছিলো ওদের। সেই থেকে ইকবাল ভার্সিটির সব প্রোগ্রামের আগে নির্ভাণের খুবই যত্ন করে। ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেরা এই গল্প শোনার পর ড্যাবড্যাব করে তাকালো ইকবালের দিকে। তিয়ান নির্ভাণের দিকে তাকিয়ে দুজনেই সুর টেনে বললো,

“এটা আমাদের ইক বাল।”

সাথে সাথে হাসির বন্যা বয়ে গেলো পুরো হল রুম জুড়ে। সবার মধ্যে একটা উত্তেজনা তৈরী হলো। এই ফাঁকে তিয়ান গিয়ে নির্ভাণের পাশে বসলো। আর পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে টেবিলের ওপর রাখলো। নির্ভাণ ভ্রু কুঁচকে কাগজের ভাজ খুলে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে পরপরই ওটা ছিঁড়ে ফেললো। চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে ওঠে যুবকের। এটা আজ নতুন নয়। প্রায়ই এমন হয়। তিয়ান তাই অবাক হয় না।

“নেক্সট টাইম এসব দিলে বলে দিবি সিট অলরেডি বুকিং।” নির্ভাণ গম্ভীর স্বরে বললো। তিয়ান শুধু মাথা নাড়ে।

—–

অংক সানায়া খুবই দুর্বল। তারমধ্যে সে কিছুতেই স্কুলের ম্যাথ স্যারের অংক বুঝতে পারে না। কোনো টিউশন দিলেও সে পড়তে চায় না। এক দুই দিন পড়ে আর কিছুতেই পড়তে চায় না৷ আরোরার এই নিয়ে ভীষণ চিন্তায় ছিলো। নিজাম সিদ্দিকী একদিন এক ভার্সিটির স্টুডেন্ট ঠিক করেন। ছেলেটা ভালোও ছিলো। তবে দু’দিন পড়িয়ে ছেলেটা না করে দিলো। এরপর থেকে নির্ভাণ নিজেই ওকে পড়াচ্ছে। নির্ভাণ বাড়ি থাকলে প্রায়শই সন্ধ্যায় সানায়ার ডাক পড়ে ওই নিষ্ঠুর যুবকের রুমে। আজ-ও নির্ভাণ জলদি বাড়ি ফিরেছে। আর বাড়ি ফিরেই সে এক কাপ কফি চেয়েছে। সাথে বইখাতা নিয়ে সানায়া কে তার রুমে আসার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে।

“ভাইয়ার চোখ লাল আজ?”

অংক বইটা আর খাতা এবং কলম টা নিতে নিতে কৌতূহল হয়ে জিজ্ঞেস করলো সানায়া। সেহের গম্ভীর। দুই দিকে মাথা নাড়ে। আর জানায়,”না।”

সেহের যখনই ওকে নির্ভাণ ভাইয়ের ডাক পৌঁছে দিতে আসে তখনই সানায়া এই একটা প্রশ্ন করবে। আজ দেড় বছর ধরে করে আসছে এটা। এইজন্য এখন আর সেহের কিছু জিজ্ঞেস করে না। শুধু ছোট করে উত্তর দিবে হ্যাঁ বা না তে। সে খুব জানে তার ফুফাতো বোন খুবই দুষ্ট। আর স্কুলে যখন সানায়া কোনো গন্ডগোল করে সেদিনই নির্ভাণ চোখ লাল করে বাড়ি ফিরবে। সুযোগ বুঝেই চুল টেনে ধরবে৷ নয়তো থাপ্পড় লাগিয়ে দিবে গালে। সানায়া সেহের কে রেখে গুটিগুটি পায়ে নির্ভাণের রুমে এসে উপস্থিত হলো। আসার সময় কফি ও নিয়ে এসছে বেচারি। যদিও হাত কাঁপছে ও-ই দিনের থাপ্পড়ের কথা মনে পড়ে তবুও সে নিজেকে সামলে নিচ্ছে। রুম সম্পূর্ণ খালি ছিলো। তবে ব্যালকনি থেকে কথা বলার শব্দ আসছিল। সানায়া ভ্রু কুঁচকে মুখ ভেংচি কাটে। মনে মনে দোয়া-দরুদ পড়ে যেনো আজ আর কোনো ভুল তার দ্বারা না হয়।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দৃষ্টি বুলিয়ে দরজায় নক করলো সানায়া।

“কে?” ব্যালকনি থেকে উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলো নির্ভাণ। সানায়া ধীরে কণ্ঠে উত্তর করলো, “সানা। আসবো?”

“হুঁ,আয়।” ব্যালকনি থেকে রুমে এসে নির্ভাণ ফোন বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে কাবার্ডের দিলে এগিয়ে গেলো। যুবকের বলিষ্ঠ দেহ প্রায় উপরিভাগ উন্মুক্ত। পেশিবহুল বাহু তার ভেসে কয়েক খন্ডে। মেরুদন্ডটির খাঁজ স্পষ্টতই ফুটে আছে। সানায়া আস্তে করে ঢোক গিলে। এরমধ্যে নির্ভাণ টি-শার্ট নিয়ে গায়ে জড়িয়ে ফেলেছে। সানায়া কে দরজায় থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো, “তাড়াতাড়ি আয়। তোর পড়ার শেষ আমাকেও পড়তে হবে।”

সানায়া পা টিপে টিপে রুমের ভেতরে এলো। বই গুলো সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে কফিটা নির্ভাণের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, “আপনার কফি।”

নির্ভাণ বিছানা থেকে নিজের ল্যাপটপ টা নিয়ে এলো। এরপর সোফায় বসে কফি হাতে নিলো। সানায়া ফ্লোরে গুটিশুটি মেরে বসলো। বসতে গিয়ে সানায়ার মুখে বিরক্তি ফুটে উঠলো। ইয়া বড়ো একটা স্টাডি রুম আছে তিনতলায়। তারপর নির্ভাণের রুমেও স্টাডি টেবিল আছে। কিন্তু নির্ভাণ সব কিছু ছেড়ে তাকে ফ্লোরে বসিয়ে নিজে আরাম করে সোফায় বসে তবেই পড়াবে।

“বই খুল। দু’দিন আগে যে অংক গুলো দিয়েছিলাম করে এনেছিস কিছু?”

নির্ভাণ ল্যাপটপে স্ক্রিনে দৃষ্টি রেখেই সানায়া কে বললো। সানায়া মাথা নাড়ে। করেছে সে। কিন্তু হয়েছে কি-না সে নিশ্চিত না। কেননা গাইড টা তো নির্ভাণ সেদিন তাকে ফেরত দেয়নি। এখন অংক হয়েছে কি-না সে নিশ্চিত না।

নির্ভাণ এবার চোখ তুলে তাকাল। ধমকের গলায় বলে উঠলো, “মানে কী মাথা নাড়ছিস? করেছিস না-কি করিসনি এই দুইটার মাঝখানে আবার কোনো অপশন আছে নাকি?”

“করেছি। কিন্তু ঠিক হয়েছে কি-না জানি না।”
সানায়া ধমক খেয়ে তড়িঘড়ি করে খাতা খুললো। নির্ভাণের সামনে খাতা টা সুন্দর করে রাখলো।

“করে এসে জানিস না?” নির্ভাণ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু দেখছে যেনো।

সানায়া চোখ গোল করে সেদিকে এক পলক তাকিয়ে ফের দৃষ্টি নত করে বললো, “একটা অংক তিনবার তিনভাবে মিলিয়েছি। তিনবারই আলাদা উত্তর।”

নির্ভাণের চলতে থাকা হাত স্থির হলো। তাচ্ছিল্যের সাথে তাকালো ফ্লোরে বসা সানায়ার দিকে। খাতা হাতে তুলে দৃষ্টি বোলাল খাতায়। পরপরই ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, “এক্সিলেন্ট। তুই নতুন ম্যাথ থিওরি আবিষ্কার করেছিস, কংগ্র্যাচুলেশনস।”

#চলবে….

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here