আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_১৩

0
31

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_১৩
#জান্নাত_সুলতানা

“ইকবাল তুমি গোসল দিয়েছিলে ভালো করে? নয়তো কিন্তু সমস্যা হবে।” নেয়ামত সিদ্দিকীর চিন্তিত গম্ভীর স্বর। ইকবাল এখানে থাকা সকল বাচ্চাদের দিকে আঁড়চোখে চাইলো। ভদ্রলোকের কথায় সবার মনে যে কৌতূহল জড়ো হয়েছে সেটা সবার দৃষ্টিতে স্পষ্ট। গোসল দিয়েছে সবার কাছে এটা স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ছিলো। কিন্তু হঠাৎ এমন উল্লেখযোগ্য কথায় সবাই উৎসুক দৃষ্টি ইকবালের পানে চেয়ে রইলো।

“এতো সকালে গোসল দিয়েছিস এই ঠান্ডায়?” তিয়ান ফিসফিস করলো। আফি বলে উঠলো,

“গোসল তো গোসলই। ভালো খারাপ আবার হয় না-কি ছোট আব্বু!”

নেয়ামত সিদ্দিকী আফির প্রশ্নে আরও গম্ভীর হলেন। থমথমে স্বরে জানালেন,

“ওর মাথায় কাক পটি করে দিয়ে ছিলো তখন।” কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক দফা হাসলো সকলে। রাহা ইকবালের দিকে নিমেষেই চেয়ে রইলো। ইকবাল লজ্জা পাড়ে না এই জনসমাবেশ ছেড়ে দৌড়ে পালিয়ে যেতে। সকালে কী ভাব টাই না নিয়ে ছিলো সবার সামনে। ইশ!

—–

সানায়া ডাইনিং থেকে পানি খেয়ে রান্না ঘরের দিকে গেলো। বড়ো মামুনি রান্না ঘরে ডেকে পাঠিয়েছে তাকে।
সানায়াকে দেখেই তন্বী রহমান কফি মগে নিতে নিতে এক পলক ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

“এসছিস তুই? ভালো হয়েছে। নির্ভাণ কে কফি টা একটু দিয়ে আয় কষ্ট করে।”

তন্বী রহমান এগিয়ে এলো। সানায়া মাথা নেড়ে বললো, “আচ্ছা।”

তন্বীর হাঁটুতে অল্প সমস্যা আছে। এতো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে মামুনির পায়ে ব্যাথা হবে। সানায়া তাই কফি হাতে নিলো। আর তিন তলার উদ্দেশ্য হাঁটতে লাগলো। লিভিং রুমে তখন কেউ নেই। যেহেতু মাহফিল তাদের মসজিদের তাই কাজ ও তাদের ও করতে হচ্ছে। সানায়া দোতলায় গিয়ে তিন তলার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই পেছন থেকে অপরিচিত এক কণ্ঠে ডেকে উঠলো, “হেই মিল্ক টি।”

সানায়া অবাক হলো। তাকেই ডেকেছে কী? সে কৌতূহল হয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকালো। টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরনে একান্ত চৌধুরী দাঁড়িয়ে। সানায়া জোরে করে মুখে হাসি টানলো। আশেপাশে তাকিয়ে বুঝলো তাকেই সম্বোধন করা হয়েছে এই নামে। এই বয়লার মুরগী তাকে মিল্ক টি বলছে? হুঁ। সানায়ার রাগ হলো। তবে পর মূহুর্তেই গলায় গম্ভীরতা এটে বললো,

“আমার নাম সানায়া এহমাদ।”

“বাট ইউ লুক দুধ চায়ের মতো। অ্যান্ড আই লাইক মিল্ক টি।” একান্ত দুই হাত ট্রাউজারের পকেটে গুঁজে এসে সানায়ার নিকটে দাঁড়াল। হাতে থাকা কফির দিকে তাকাতেই সানায়া এবার জোর করে মুখে হাসি টানলো।

“দুঃখিত আমার মিল্ক টি পছন্দ নয়। আমার কফি পছন্দ।”

এরপর আর সেখানে দাঁড়ানো কোনো প্রয়োজন মনে করলো না সানায়া। ভদ্রতার খাতিরে কথা বললেও তার এই লোকের প্রতি বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই৷ ছুটে গেলো নির্ভাণের রুমের দিকে।

একান্ত সিঁড়ির রেলিঙে ঠেশ দিয়ে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে মেয়ে টার যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলো। অল্প গোলাপি আভার ওষ্ঠপুট, চিকন ভ্রু আর টান টান চক্ষুদ্বয় বড়ো করে যখন তাকে দেখছিল তখন বুকের ভেতর কিছু হচ্ছিল কী? একান্ত মাথা নাড়ে। ও তো বাচ্চা একটা মেয়ে। সবেমাত্র টেনে পড়ে। তারউপর বয়স মাত্র ষোল। একান্ত দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। চোখ বন্ধ করতেই বন্ধ চোখে ভেসে উঠলো লাল টকটকে নাক। ঝালের জন্য চকচক করতে থাকা ঠোঁট। একান্ত তৎক্ষনাৎ চোখ খুললো। আর সামনে দেখা মিললো এক সুন্দরী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে লাজুক মুখে।

“তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তুই শ্বশুর বাড়িতে আছিস।” একান্তর রসাত্মক স্বর। আফি পূর্ণ দৃষ্টিতে সামনের যুবকের দিকে তাকাল। ফের মাথা নুইয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“আপনি কতদিন থাকবেন দেশে?” আফির প্রশ্নে একান্ত ভ্রু কুঁচকে নিলো। সন্দিহান কণ্ঠে বলে উঠলো,

“তুই মনে হচ্ছে আমাকে সহ্য করতে পারছিস না। আসতে না আসতে যাব কবে তা নিয়ে পড়েছিস।”

আফি হতভম্ব হয়ে গেলো। সে কী এমন কিছু উল্লেখ করেছে? সে তো শুধু জানতে চেয়েছে। এরজন্য এমন অপবাদ? আফি কিছু বলবে তার আগেই একান্ত আবারও বললো, “হয়েছে আর ভালো সাজতে হবে না। আমি এমনিতেও কাউকে কৈফিয়ত দেওয়া লাইক করি না। তবুও বলছি যেহেতু তুই জানতে চাইছিস, এক মাস পর চলে যাব।”

একান্তর কথাটার সাথে দীর্ঘ শ্বাস ফেলার ও শব্দ পাওয়া গেলো। আফিকে রেখেই একান্ত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলো। আফি তাগড়া দেখতে যুবকের পিঠের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার গলায় তখন কিছু একটা দলাপাকিয়ে আঁটকে আছে যেনো। সে অনেক বার চেষ্টা করেও তা গিলতে পারলো না।

——

সানায়া যখন নির্ভাণের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে রুমের ভেতরে উঁকি দিলো রুম সম্পূর্ণ খালি ছিলো। সানায়া দরজায় শব্দ করলো। ওয়াশরুম থেকে নির্ভাণের রাশভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“কে?”

“আমি।”

সানায়া সাথে সাথে জবাব দিলো। নির্ভাণের আর কোনো শব্দ পাওয়া গেলো না। সানায়া কফিটা বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে নিজে থেকেই জানাল,

“কফি রেখে গেলাম।”

এরপর সে বেরিয়ে গেলো না। ঘুরঘুর করে রুম জুড়ে চক্কর কাটতে লাগলো। এই বাড়িতে মনে হয় এই একটা মাত্র রুম এতো বড়ো। রাজকীয় একখানা বেড কক্ষের ঠিক মাঝখানে। দেয়ালের একপাশে পুরনো কাঠের বিশাল এক বইয়ের ওয়াল শেলফ। সম্পূর্ণ টা জুড়ে বই আর বই। সানায়া সেদিকে এগিয়ে গেলো। মন মূহুর্তেই খুশিতে দুলিয়ে উঠলো। অনেকদিন হয়ে গেলো সে স্কুলের লাইব্রেরি যায়নি। বইয়ের সাথে সাথে সে নিজের ফ্রেন্ড’দের সাথে আড্ডা, গল্পগুজব কেও খুব মিস করছে। বই নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে প্রায় তিন চার মিনিট চলে গেলেও টের পায়নি সানায়া। খেয়াল তার সময়ের দিকে নয় বইয়ের দিকে। তাই তো ওয়াশরুমের পুরনো কাঠের দরজা টা কড়কড়ে করে যখন খুলে গোসল শেষ অর্ধ উন্মুক্ত শরীর নির্ভাণ বেরিয়ে এলো তখন মেয়ে টা নিজেকে সামলাতে পারলো না। চমকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়ে মাথা ভারি খেলো বইয়ের তাকে। হড়বড়িয়ে বই কয়েকটা মাথায় এবং গায়ে পরলো। ব্যাথায় আর আতংকে চোখ বন্ধ করে ব্যাথাতুর শব্দ করে উঠলো।

নির্ভাণ হতভম্ব। ট্রাউজার পরনে গলায় টাওয়াল ঝুলি সেটার একপ্রান্ত দিয়ে চুলের পানি ছাড়াচ্ছিল। আকস্মিক ঘটনায় সে নিজেও যেনো ব্যাথা অনুভব করলো। মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো, “উহ্, ষ্টুপিড।”

সানায়া মাথা তুলে সামনে তাকিয়ে নির্ভাণ কে দেখলো। সাথে ঠান্ডা দানবীয় হাতের শীতল স্পর্শ নিজের কব্জিতে অনুভব করতেই শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো। নির্ভাণ টেনে ওকে একটু সাইডে নিলো। অস্থির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, “বেশি লেগেছে? দেখি।”

বলতে বলতে মাথায় হাত দিয়ে চেক করলো। সানায়ার দম গলায় এসে যেনো আঁটকে গেলো। মানুষ টার উষ্ণ নিঃশ্বাস মাথার ঠিক মাঝ বরাবর লাগছে। সানায়া তৎক্ষনাৎ ঝট করে সরে গেলো এক পা পেছনের দিকে। নিজেকে কোনো রকম সামলে হড়বড় করে বলে উঠলো, “ঠিক আছি আমি।”

কিন্তু কথা টা মিথ্যা ছিলো সম্পূর্ণ। কাঁধের দিকে মোটা ভারি একটা বই পড়েছে। সেখানে প্রচন্ড ব্যাথা সে কয়েক সেকেন্ড আগের অনুভূতির কারণে অনুভব করতে পারছে না। ওড়না ভালো করে কাঁধের দিকে টানলো। মাথায় ঘোমটা তুলে এলোমেলো পা ফেলে দ্রুত কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
নির্ভাণ ফ্লোরে হাঁটু গেঁড়ে বসলো। বই গুলো তুলে রাখার সময় সে ফ্লোরে বইয়ের সাথে আরও কিছু একটা পেলো। রুমে কেউ আসার শব্দ পেয়ে তা নিজের ট্রাউজারের পকেটে গুঁজে রাখলো। আশ্চর্য! এটা সে কেনো করলো? যুবকের মস্তিষ্কের কাছে এই প্রশ্নের কোনো সঠিক উত্তর ছিলো না।

#চলবে…..

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here